
. . .

কে হিন্দু? কারা হিন্দু? : প্রসঙ্গ মিহির দালাল-১

জনতুষ্টির রাজনীতি ও ‘হিন্দু সুপ্রিমেসি’ শিরোনামে থার্ড লেন স্পেস-এ প্রকাশিত লেখায় মিহির দালালের বক্তব্যকে উপলক্ষ্য করে আপনি যে-প্রশ্ন তুলেছেন, তা বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে মিনহাজ ভাই। বিজেপি চর্চিত ‘হিন্দুত্ববাদ’ প্রসঙ্গে মিহির দালালের ব্যাখ্যা ও আলোচনায় ঘাটতি অবশ্যই রয়েছে। তাঁর এই গুরুত্বপূর্ণ লেখাটি বাংলায় ভাষান্তর ও পটভূমি ব্যাখ্যার সময় আমি নিজেও তা অনুভব করেছি। ‘হিন্দু’ পরিচয়টি ঐতিহাসিকভাবে অস্পষ্ট বা নির্মিত;—এই সত্য অস্বীকার করা যাবে না। তবে এর থেকে সরাসরি এরকম সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না-যে,—আধুনিক ‘হিন্দু সম্প্রদায়’ বা ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদ’ সম্পূর্ণ অবাস্তব ও ভিত্তিহীন। অধুনা যেসব রাজনৈতিক পরিচয়কে আমরা বিশ্বজুড়ে চর্চিত হতে দেখছি, সেগুলোর প্রকৃতিও কিন্তু অনেকাংশে নির্মিত। জাতি, রাষ্ট্র, এমনকি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আধুনিক রূপ যেখানে দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফসল মূলত।
ইতালি বা জার্মানির দিকে তাকালেও আমরা একই চিত্র দেখতে পাই। উনিশ শতকের আগে ‘ইতালীয়’ বা ‘জার্মান’ পরিচয় আজকের মতো সুসংহত ছিল না। ভাষা, অঞ্চল, উপভাষা, ক্ষুদ্র রাজ্য ও সংস্কৃতির সবকিছুই ছিল বিচ্ছিন্ন। আধুনিক জাতীয়তাবাদ বিচ্ছিন্ন উপাদানগুলোকে একক জাতিসত্তায় রূপ দিয়েছিল। ‘মুসলিম উম্মাহ’ নামক বহুল চর্চিত ধারণাও নবীজির সময়কার সরল সম্প্রদায় থেকে কয়েক শতাব্দীর রাজনৈতিক বিবর্তনে গড়ে উঠেছে। অনুরূপ,—আধুনিক রাজনৈতিক পরিচয় নির্মিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বাস্তব শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে এখনো।
আমার মনে হয়, সাভারকরের আকাঙ্ক্ষাকে এই জায়গা থেকে পাঠ করা জরুরি। তিনি আসলে ‘হিন্দুধর্ম’ নয়,—‘হিন্দু জাতি’ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। এ-কারণে বেদ, উপনিষদ বা পুরাণের ধর্মীয় সত্যের চেয়ে ইতিহাসকে ভিত্তি করেছিলেন। তাঁর কাছে ‘হিন্দু’ কোনো বিশুদ্ধ ধর্মীয় পরিচয় ছিল না;—একে তিনি সভ্যতাগত পরিচয় রূপে বিবেচনা করেছেন। আপনার পর্যবেক্ষণকে একঅর্থে এখানে তিনি মেনে নিচ্ছেন। সাভারকর জানতেন,—‘হিন্দু’ জগৎ বিচিত্র, বিভক্ত ও অসংগঠিত। ‘এক কিতাব, এক ঈশ্বর, এক গির্জা’র পথ তিনি যে-কারণে বেছে নেননি। একটি সাধারণ ভূখণ্ড, ঐতিহাসিক স্মৃতি, অপমানবোধ এবং ‘সম্মিলিত শত্রু’র ধারণাকে উপজীব্য করে বরং রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে তৎপর থেকেছেন। সাভারকরের একটি মৌলিকতা সুতরাং এখানে রয়েছে।
আপনি যথার্থ বলেছেন,—‘হিন্দু’ পরিচয়ের ভেতরে শৈব, বৈষ্ণব, শাক্ত, লোকায়ত, তান্ত্রিক, বৌদ্ধ, জৈন—সব গলেমিশে আছে। সাভারকর এই বহুত্বকে অস্বীকার করেননি। ‘হিন্দু সভ্যতা’র বৃহত্তর ছাতার নিচে বরং এসব পরিচয়কে তিনি একীভূত করতে চেয়েছেন। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়—‘একীভূতকরণ’ কি সত্যি বহুত্বকে স্বীকৃতি দানের জন্য ছিল? নাকি একটি রাজনৈতিক ক্ষমতা-কাঠামোর অধীনে একে সংগঠিত করার কৌশল ছিল তাঁর? আমার মনে হয়, হিন্দুত্ববাদকে বোঝার ক্ষেত্রে প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সাভারকর বিরচতি প্রকল্পের শক্তি যেমন এখানে রয়েছে,—বিপদও সেখানেই নিহিত থেকেছে।
অর্থাৎ, তাঁর ‘হিন্দুত্ব’ মূলত ধর্মীয় শুদ্ধতা নয়, বরং রাজনৈতিক ঐক্যের একটি প্রক্রিয়া ছিল। যেমন, একজন নাস্তিক তাঁর কাছে ‘হিন্দু’ হতে পারে, যদি সে ভারতকে নিজ পিতৃভূমি ও পুণ্যভূমি বলে মেনে নেয়। এই নমনীয়তা একঅর্থে হিন্দুত্বের বড়ো শক্তি। কারণ, এটি ধর্মীয় আচারের চেয়ে সাংস্কৃতিক আনুগত্যকে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে এখানে। ধর্ম, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়কে একসূত্রে বাঁধার শক্তির নজির তুলে ধরছে।
আপনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন,—‘হিন্দু’ পরিচয়ের উৎপত্তি তাহলে কোথা থেকে? এ-বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনাও করেছেন;—তারপরেও আমার মনে হয়, প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে অন্তত তিনটি স্তরকে একত্রে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি :

প্রথমত, ভারতীয় সভ্যতার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা। বৈদিক ধর্ম, উপনিষদীয় দর্শন, পুরাণ, মহাকাব্য, লোকদেবতা, তীর্থসংস্কৃতি, ভক্তি আন্দোলন মিলিয়ে উপমহাদেশে বহু শতাব্দী ধরে একটি বিস্তৃত সাংস্কৃতিক জগৎ তৈরি হয়েছিল। মানুষ হয়তো নিজেদের ‘হিন্দু’ বলত না এখনকার মতো, কিন্তু তারা একধরনের সাংস্কৃতিক পটভূমির অংশ থেকেছে তখন।
দ্বিতীয়ত, ‘হিন্দু’ পরিচয়ের বহিরাগত নির্মাণ। পারস্যবাসী, গ্রিক, পরে মুসলমান শাসকরা ‘সিন্ধু’ অববাহিকা ও সেখান থেকে ছড়ানো লোকজনকে একীভূতভাবে ‘হিন্দু’ নামে ডাকতে শুরু করে। মুসলমান শাসন চলাকালে ‘হিন্দু’ অনেকাংশে ‘অমুসলমান ভারতীয়’ বোঝাতে তারা ব্যবহার করেছে। ‘আমরা’ বনাম ‘তারা’;—এরকম একটি নেতিবাচক সীমারেখা কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে গড়ে উঠেছিল।
তৃতীয়ত, ঔপনিবেশিক আধুনিকায়ন। ব্রিটিশ ইতিহাসচর্চা, আইনি শ্রেণিবিন্যাস এবং ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদ ভারতীয় শিক্ষিত সমাজকে নিজ সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। শিক্ষিত সমাজ যেখানে নিজেকে ‘একক সম্প্রদায়’ বলে ভেবেছেন। ‘হিন্দুধর্ম’ মূলত ওই সময় এসে সংগঠিত পরিচয় রূপে গড়ে উঠতে শুরু করে। রাজা রামমোহন, বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্বামী বিবেকানন্দ থেকে শুরু করে সাভারকর… তাঁরা সবাই যেখানে উক্ত পুনর্গঠনের ভিন্ন ভিন্ন ধাপ হিসেবে দেখা দিয়েছিলেন।
এই প্রসঙ্গে ‘সনাতন’ শব্দটির প্রসারকে আমরা বিবেচনায় রাখতে পারি। ‘সনাতন’ শব্দের অর্থ হচ্ছে চিরন্তন, অনাদি, শাশ্বত ইত্যাদি। ‘সনাতন ধর্ম’ বলতে এমন এক নৈতিক-আধ্যাত্মিক জীবনপথকে বোঝায়, যা মানুষের অস্তিত্ব, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও জীবনবোধের সঙ্গে সম্পর্কিত থেকেছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,—বেদ, উপনিষদ, গীতা, যোগ, সাংখ্য, বেদান্ত, তন্ত্র, ভক্তি এবং লোকায়ত বিশ্বাস মিলেমিশে একটা বিশাল চিন্তাস্রোত ভারতবর্ষে গড়ে উঠেছিল। দীর্ঘ কালপর্বজুড়ে মানুষ মূলত এটাকেই ‘সনাতন’ বলে বুঝেছেন। কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠাতার ধর্ম তা ছিল না। বহু শতাব্দীর ধারাবাহিক চিন্তা, আচার ও অভিজ্ঞতার সমষ্টি এই ‘সনাতন’কে ফলবান করে তুলতে বহু মনীষা যুগান্তকারী অবদান রেখেছেন। অন্যদিকে ‘হিন্দু’ শব্দটির উৎসও ধর্মীয় নয়, ওটা ছিল মূলত ভৌগোলিক। এ-কারণে অনেক ঐতিহ্যবাদী হিন্দু আজও বলেন :—‘আমরা হিন্দু নই, আমরা হচ্ছি সনাতনী।’ তারা বোঝাতে চান,—তাদের ধর্ম ও ধর্মবিশ্বাস সম্প্রদায়গত পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়, এটা সেখানে চিরন্তন জীবন-সংস্কৃতি ও জীবন-দর্শনের প্রতিফলন।
আধুনিক যুগে এসে উক্ত ধারণা দুটি ধীরে ধীরে একীভূত হয়ে পড়ে। বিশেষত ঔপনিবেশিক শাসনামলে ইংরেজ সায়েবরা নিজের সুবিধার্থে ভারতীয় সমাজের শ্রেণিবিন্যাস করে। ‘হিন্দুধর্ম’ নামক একটি একক ধর্মীয় শ্রেণির ধারণায় তারা পৌঁছায়। এর ফলে বৈষ্ণব, শাক্ত, শৈব, স্মার্ত, লোকায়ত ও তান্ত্রিক নামে যত ধারা রয়েছে, এগুলোকে একযোগে ‘হিন্দুধর্ম’ নামক ছাতার নিচে নিয়ে আসে তারা। এইসময় থেকে ‘সনাতন ধর্ম’ ক্রমশ ‘হিন্দুধর্ম’ নামক কল্পিত এক আত্মপরিচয়ে একীভূত হয়।
‘সনাতন’ ধারণাটি মূলত বহুত্ববাদী, নমনীয় ও দার্শনিক। এখানে নানা পথ, নানা দেবতা, এমনকি নাস্তিকতাও জায়গা পায়। উপনিষদের অদ্বৈতবাদ, বৌদ্ধের অনাত্মবাদ, তন্ত্রের শক্তিচিন্তা, ভক্তির ব্যক্তিগত প্রেম—সব একসঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে অনায়াসে। কিন্তু আধুনিক হিন্দুত্ববাদ প্রায়শ এই বহুত্বকে কেন্দ্রীভূত রাজনৈতিক পরিচয়ে রূপ দিতে চায়। ‘সনাতন’টা যেখানে অনেকসময় আধ্যাত্মিক কোনো ধারণা নয়, সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পরিচয়ের মানদণ্ড রূপে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ, ‘সনাতন’ তখন কেবল জীবনদর্শন থাকছে না, এটা সেখানে ‘সভ্যতার পরিচয়’-এ মোড় নিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপট থেকে যদি দেখি, তাহলে ‘হিন্দু’ পরিচয়কে পুরোপুরি কৃত্রিম বলা যাচ্ছে না, আবার এটা চিরন্তন ও অপরিবর্তিত কিছু নয়। সুদীর্ঘ সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আধুনিক যুগে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের অস্ত্র রূপে একে পুনর্গঠন করা হয়েছে। ‘হিন্দু’ পরিচয়ের আভ্যন্তরীণ অস্পষ্টতাকে গুরুত্ব দেওয়াটা যুক্তিসংগত। তবে, এর রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াটিকে অস্বীকার করা আমাদের জন্য কঠিন।
মানুষ সবসময় ঐতিহাসিক নির্ভুলতার ওপর ভর দিয়ে আত্মপরিচয় গড়ে তোলে না। ভয়, অপমানবোধ, নিরাপত্তা, স্মৃতি এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিচয়ের অনুভূতি রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণে ভূমিকা রাখে। হিন্দুত্বের শক্তি সেখানে;—ইতিহাসকে তা কেবল ঘটনার বিবরণ নয়, বরং সমষ্টিগত মনস্তত্ত্ব গড়ে তোলার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করছে।
একইসঙ্গে এটাও সত্য-যে, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি ইতিহাসকে সরলীকৃত ও আক্রমণাত্মক রূপ দিতে ত্রুটি করে না। ‘হাজার বছরের মুসলমান শাসন’কে একরৈখিক নিপীড়নের ইতিহাস দেখিয়ে তারা ন্যারেটিভ বানায়, যার সত্যতা প্রামাণিক নয়। বাস্তব ইতিহাস বরং অনেক জটিল ও বহুমাত্রিক ছিল। অত্যাচার, নিপীড়ন, লুণ্ঠন, ধর্মান্তকরণ অথবা জবরদস্তির নানা ঘটনা যেমন রয়েছে, এর বিপরীতে প্রজাশাসনের স্বার্থে সহাবস্থান, সংমিশ্রণ ও সহযোগিতার নজিরও কম নেই। মুসলমানকে একক ও অপরিবর্তিত এক সম্প্রদায় হিসেবে হিন্দুত্ববাদ এমনভাবে তুলে ধরে, যার ঐতিহাসিক ভিত্তি মজবুত নয়। বাস্তবতার সঙ্গে বয়ান যে-কারণে পুরোপুরি মিলে না।
তবে, এহেন বাস্তবতাকে একপাক্ষিকভাবে পড়লে আবার ভুল হবে। ভারতীয় মুসলমান সমাজের ভেতর আলাদা জাতিসত্তাবোধ, প্যান-ইসলামি আবেগ ও রাজনৈতিক ইসলামের ছাতায় সমাজে আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা ও তৎপরতা অতীত কিংবা বর্তমানে চোখে পড়বে। দেশভাগের স্মৃতি ও পাকিস্তান প্রশ্নে জটিলতার জের ধরে জিহাদি সন্ত্রাসবাদের বাড়বাড়ন্ত-যে ভারতে নেই, তা কিন্তু বলা যাবে না। উগ্র ইসলামের অনুসারী কতিপয় লোকজনের এসব তৎপরতা ভারতীয় জনমনে নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। বিজেপি মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সমাজে চাউর এরকম অনুভূতি ও শঙ্কাকে ব্যবহার করছে এখন।
এগুলোর সত্যতা নেই তা নয়, তবে বিজেপি যেভাবে অতিরঞ্জিত করে বয়ান হাজির করে সেখানে সত্যের ভাগ অধিক নয়। বয়ানের নিচে বাস্তব সত্য ও কার্যকরণকে বরং দেখার উপায় তারা রুদ্ধ করে রাখে। প্রকৃত সত্য সুতরাং ঢাকা পড়ে যায়। কতিপয় বিচ্ছিন্নতাবাদী মুসলমান জঙ্গির জন্য হয়তো দেখা গেল ভারতবর্ষের মুসলমান সম্প্রদায়কে সন্দেহের চোখে দেখার জন্য হিন্দুসমাজকে তারা প্ররোচিত করছে। বিজেপির হিন্দুত্ববাদের বিপদ মূলত সেখানে নিহিত। সভ্যতাগত পরিচয় রাজনৈতিক সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষায় রূপ নিতে শুরু করলে তা অচিরে গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদের পরিসরকে সীমিত করে ফেলে।
বাস্তবে প্রশ্নটি ‘হিন্দু সত্য না মিথ্যা’,—এই জায়গায় আটকে নেই। বড়ো প্রশ্নটি হলো :—আধুনিক ভারত কি বহুত্ববাদী রাজনৈতিক সম্প্রদায় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবে, নাকি একটি সভ্যতাগত সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিচয়ের রাষ্ট্র রূপে নিজেকে পুনর্গঠন করবে? সাভারকর দ্বিতীয় পথ বেছে নিয়েছিলেন। আর, আজকের বিজেপি-আরএসএস তাঁর বেছে নেওয়া পথকে নতুন ভাষা, প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক কৌশলে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
আপনার আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো,—প্রক্রিয়াটির ঐতিহাসিক অস্পষ্টতাকে আপনি সামনে এনেছেন। আমার মনে হয়,—অস্পষ্টতাকে হিন্দুত্বের শক্তিতে পরিণত করতে পেরেছে বিজেপি। ‘হিন্দু’ পরিচয়ের নমনীয়তা, বহুত্ব এবং বিস্তৃত সাংস্কৃতিক পরিসর এমন-যে, একে বৃহৎ রাজনৈতিক ছাতায় রূপান্তরিত করা সম্ভব। হিন্দুত্বের সবচেয়ে বড়ো শক্তি ও বিপদটা প্রধানত এখানে নিহিত।
এমন এক পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করা হচ্ছে, যার ঐতিহাসিক শক্তি ছিল তার বহুত্ব, আর রাজনৈতিক শক্তি এসেছে সেই বহুত্বকে একক কল্পনায় রূপ দানের মধ্য দিয়ে। সন্দেহ নেই,—প্রক্রিয়াটি যত বেশি বহুত্বকে সংকুচিত করে একরৈখিক ও একমাত্রিক পরিচয় নির্মাণে অগ্রসর হবে, ততই তা গণতান্ত্রিক সহাবস্থান ও মানবিক বহুত্ববাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে থাকবে।
. . .

পাঠ – সংযোজন
[থার্ড লেন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে সংকলিত]

কে হিন্দু? কারা হিন্দু? : প্রসঙ্গ মিহির দালাল-২

চমৎকার লিখেছেন জাভেদ। প্রাঞ্জল ও যুক্তির নিরিখে সহমত থাকছে। তবে, এখানে বোধহয় বোঝার ভুল থেকেই গেল এখনো! ‘হিন্দু সম্প্রদায়’, ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদ’ ও ‘হিন্দু ধর্ম’কে আমি কিন্তু অবাস্তব বা ভিত্তিহীন বলিনি। এগুলোর একটি বাস্তবতা তো অবশ্যই রয়েছে। আপনি ও মিহির দালাল দুজনের ব্যাখ্যায় তা প্রাঞ্জলভাবে উঠে এসেছে। যে-কারণে থার্ড লেন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আপনার লেখার পাঠ-প্রতিক্রিয়ায় বলেছি,—এগুলোর বাস্তবতা হয়ে ওঠা নিয়ে আলাদা করে আলাপে যাবো না।
সাভারকরের নতুন করে ফেরত আসা ও বিজেপি-উত্থানের কার্যকারণ নিয়ে আলাপ করতে যেয়ে আপনারা পুরো বিষয়টি কাভার করেছেন যেহেতু,—ওটা নিয়ে পুনরায় আলাপে যাওয়ার প্রাসঙ্গিকও নয়। আমার কনসার্ন ছিল ন্যারেটিভের শূন্যতা নিয়ে। যেসব কার্যকারণে ‘হিন্দু ধর্ম ও হিন্দুত্বকে’ একীভূত করে সংখ্যাগরিষ্ঠের জাতীয়তা ভারতে তীব্র করা হলো, এখন এর অসারতা প্রমাণে যে-ন্যারেটিভ দরকার ছিল, তার কিছুই সেখানকার মুক্তচিন্তক, সেকুলার, প্রাগ্রসর বলে বিদিতরা হাজির করতে পারেননি।
কাউন্টার ন্যারেটিভের যথেষ্ট পরিসর ছিল, কিন্তু উনারা তা সঠিক পথে গড়ে তুলতে বিফল হয়েছেন। পশ্চিম থেকে ধার করা ভাবনার সাহায্যে হিন্দু শব্দের আড়ালে চলতে থাকা রাজনীতির খেলা ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ছাড়া কাজের কাজ কিছু হয়নি। এটা ছিল হঠকারিতার শামিল। উনাদের এসব ন্যারেটিভকে হিন্দুবিরোধী ও সংখ্যালঘু-তুষ্ট বলে প্রমাণ করা যে-কারণে বিজেপির পক্ষে কঠিন থাকেনি। ফলাফল?—রোমিলা থাপার কিংবা অমর্ত্য সেনের মতো গুণী আজ আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছেন জীবনের পড়ন্ত বয়সে!
ভৌগলিক ‘হিন্দু’ পরিচয়ের মধ্যে ভারতবর্ষে বিকশিত বহুমুখী দার্শনিক চিন্তার ঘরানাকে ‘হিন্দু জনজাতি’র ইতিহাসে রূপান্তরিত করা হয়েছে। ‘যবনাগত’ ধর্মে বিশ্বাসী ছাড়া বাকিগুলোকে এলাউ করার বাহানায় বিটকেল জাতীয়তাকে এভাবে পরিপুষ্ট করা হচ্ছে! এর ফলে ভারতীয় ও সনাতনের আদি অর্থটি আর অবিকল নেই। তথাকথিত মুক্তচিন্তক ও পলিটিক্যাল অ্যক্টিভিস্টরা এসব বুঝে ওঠার অবস্থায় অতীতে দড় ছিলেন না, এবং এখনো কাঁচাই থেকে গেছেন। পশ্চিম থেকে পাওয়া পুথিগত বিদ্যাজীবীর চোখ দিয়ে কেবল ভ্রান্ত ন্যারেটিভ তাঁরা আওরে যাচ্ছেন অবিরাম। এ-দিয়ে কী আর সাভারকরের চেতনাবাহী বিজেপিকে মোকাবিলা করা যায়?
খেয়াল করে দেখুন, ভারতবর্ষ বোঝাই এসব মুক্তচিন্তক ও তথাকথিত সেকুলার আসলে কী করেছেন এতগুলা বছর! সাভারকর হিন্দু নামে চিহ্নিত জনজাতির ধর্মীয় আচার-বিশ্বাস নিয়ে বাড়াবাড়ি সংস্কারে বিরক্ত ছিলেন। কেননা, এগুলো হিন্দু ন্যাশনালিজমকে শক্তিশালী করার জন্য মোটেও অনুকূল নয়। মুক্তচিন্তকরাও তাই বটে! তাঁরাও সাভারকরের মতো এসব নিয়ে পড়ে থেকেছেন;—যেখানে তাঁদের লক্ষ্য দাঁড়িয়েছিল হিন্দু ধর্মকে অবনমিত করা। কতটা জরুরি ছিল তা বলেন?
কথার কথা, সত্যজিৎ রায়ের ‘দেবী’ আমার পছন্দের চলচ্চিত্র। ভারতবর্ষে ধর্মীয় কুসংস্কারের জোয়ার নিয়ে সত্যজিৎ রায় অন্য অনেকের মতো যথেষ্ট বিরক্ত ছিলেন। ‘দেবী, ‘পরশপাথর’ এরকম ছবি বানিয়েছেন মানুষকে সচেতন করার ভাবনা থেকে। সবই ঠিক আছে, কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে বসে ছবিগুলো যখন সত্যজিৎ রায় তৈরি করছেন, সেখানে ‘হিন্দু বা ধর্মে সনাতন হিন্দু’র ধারণাকে পুঁজি করে হিন্দু জাতীয়তাবাদের মাথা তুলে দাঁড়ানোর ঘটনা তাঁকে ভাবিয়ে তোলেনি। মনে এটা নিয়ে জিজ্ঞাসার আলোড়ন আমরা তীব্র হতে দেখিনি। ‘হিন্দু জনজাতি’র বনেদ তৈরির পেছনে সক্রিয় ক্ষমতা-কাঠামোকে সত্যজিৎ পড়ার চেষ্টা করেননি বা পড়লেও একে ‘অবান্তর’ ভেবে ছাড় দিয়েছেন অজান্তে! মুসলমান উম্মাহর ক্ষতিকর রাজনীতির মতোই হিন্দু ন্যাশনালিজমও ক্ষতিকর। তো এর পরিণামকে উপজীব্য করে ছবি বানানোর ভাবনা কিন্তু সত্যজিৎ রায়কে দিয়ে হয়ে ওঠেনি।
হিন্দু ন্যাশনালিজমকে আপনি এখানে ইতালি, জার্মানির নিরিখে বিবেচনা করতে পারবেন না। ওখানে ওটা খ্রিস্টান ধর্মকে গ্লোরিফাই করতে মূলত জন্ম নেয়নি। উদ্দেশ্য ছিল, আর্যায়ন বা এমন এক জাতিসত্তার ধারণা গড়ে তোলা, যেটি বিশ্বের সকল জনজাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ গণ্য হবে। যেখানে, কেবল ইহুদি নয়, সকল বাম ও মুক্তচিন্তক তাদের কাছে জাতি-গৌরবের পরিপন্থী গণ্য ছিল। খ্রিস্টান ধর্মে বিশ্বাসীও যদি এর বিরোধিতা করেছে, তাকে প্রতিপক্ষ ভেবে প্রতিরোধ করত তারা।

এরকম কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিজমের সঙ্গে সাভারকরের ‘হিন্দু ন্যাশনালিটিকে’ মেলাতে গেলে বোধহয় পুরোপুরি মিলবে না। কেননা, সাভারকর এখানে ‘হিন্দু’র মধ্যে ‘সনাতন ভারতীয়’কে একীভূত করতে গিয়ে ধরা খেয়েছিলেন। বিজেপির মধ্যেও সমস্যাটি রয়ে গেছে। নরেন্দ্র মোদি যেমন ‘হিন্দু ন্যাশনালিটি’র কথা প্রায়শ জপ করেন;—এবং একই মোদি এই দেশে বংশ পরম্পরায় যারা বসবাস করে আসছে, তাদের সবাইকে ‘ভারতীয়’ বলে তালগোল পাকিয়ে তোলেন হামেশা! মুসলমানকে, তাঁর দল বিজেপি ওই সাভারকরের মতো সোজা বহিরাগত বলে পার পাওয়ার অবস্থায় এখন নেই। ‘তারা বহিরাগত’ দেখিয়ে ন্যারেটিভ বানানো যায়, কিন্তু হাজার বছরের ইতিহাসে মুসলমান আসলে করা? সম্প্রদায়টির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তো সনাতন থেকে ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছিল! তাকে এখন কেবল মুসলমান হওয়ার অপরাধে দেশ থেকে বের করে দেওয়া বা মার্জিনাল করে রাখা সম্ভব নয়।
নরেন্দ্র মোদিকে ‘আমরা সবাই ভারতীয় সনাতন’ কার্ডটি যে-কারণে অহরহ খেলতে দেখি। সনাতনের ‘মুসলমান’ হওয়া অংশের পক্ষ একে মেনে নেওয়া মুশকিল। কারণ, ইসলাম ধর্ম কবুল করার পর তার মস্তিষ্কে ‘উম্মাহচেতনা’র রাজনীতি ভালোভাবে গেড়ে বসেছে। ‘সনাতন’-এর আদি অর্থে বোঝার ক্ষমতাও তিরোহিত হয়েছে। উপরন্তু, বিজেপির বয়ান ‘সনাতন’কে যেভাবে প্রচার করে, তা আপনি যথার্থ বলেছেন,—আদি অর্থের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে না। এর ভিতর দিয়ে একটা ‘শিব ও রামপন্থী ধর্মবিশ্বাসকে’ তারা প্রতিফলিত করে। একজন মুসলমানের কাছে তখন তা নিছক ‘হিন্দু’ ধর্মবিশ্বাস ও আচার-উপাসনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায়! নরেন্দ্র মোদি যারপরনাই ‘সনাতন ভারত’-এ মুসলমানকে আহবান করেন বটে, কিন্তু এর বিশ্বাসযোগ্যতা সেখানে অস্পষ্টই থেকে যায়।
আরে ভাই, বংশ পরম্পরা মানে তো সেটলার। কোনো-না-কোনোভাবে এখানে এসে অন্যের সঙ্গে মিশে স্থায়ী হয়েছে নানা কালপর্বে। তো, আপনি এখন কালপর্ব কোনটা নেবেন? মুসলমান আগমনের আগে পর্যন্ত? নাকি পরবর্তীটাও নেবেন আপনি? মোদি এখানে এসে জটলায় পড়েন হামেশা। আজকের বাস্তবতায় সাভারকরের মতো সহিংস জাতীয়তার খায়েশ তিনি চাইলেও পূরণ করতে পারবেন না। এদিক থেকে বিজেপির ‘হিন্দুত্ববাদী’ জাতীয়তা’ হলো পলিটিক্যাল রেটোরিক। বিজেপি আখেরে বেনিয়া পার্টি। হিন্দুত্বের শ্রেষ্ঠত্ব তার দরকার মূলত কংগ্রেসের মতো আবোল-তাবোল সেকুলারিস্টকে ডান্ডাপেটা করে ঠাণ্ডা করার জন্য।
বিজেপির পক্ষে সবচেয়ে কঠিন সমস্যা হলো ‘হিন্দুত্ব’কে ডিল করা, যার কোনো বেইজ আসলেও নেই। যেটা আছে ও ছিল সবসময়, সেটা হলো সামাজিক শ্রেণিকরণের ভিতর দিয়ে সমাজকে সমন্বয়ের নামে আরো বেশি সেক্টে ভেঙে দেওয়া। বিজেপি কিন্তু সেটাই করছে এখন। সহজ উদাহরণ, উত্তরাখণ্ডে শিবের যে-স্বরূপ দাঁড়িয়েছে কালের বিবর্তনে, তাঁকে অন্যত্র প্রতিস্থাপন করার তালে আছে তারা। বাংলায় শিবের এই স্বরূপ কিন্তু আগে ছিল না! শিব এখানকার অনার্য ধারায় এসে ব্যোম ভোলানাথ হয়েছেন। তাঁর শক্তি অব্যবহৃত ও নারীর কাছে পরাস্ত। কৃষ্ণও উত্তরাবর্তের স্বরূপে বিলকুল থাকেননি। কারণ, দ্রাবিড় প্রভাব বাংলায় বরাবর তীব্র ছিল। জিন মানচিত্রে অনার্য আধিক্য উড়িয়ে দেওয়ার মতো কোনো বিষয় নয়। এটা ধরে আপনি পৌঁছে যেতে পারছেন সামাজিক শ্রেণিকরণ ও সাংস্কৃতিক আরোপণ ও প্রতিরোধের ইতিহাসে।
কোনো হিন্দু যখন দাবি করেন :—‘আমরা হিন্দু নই, আমরা সনাতনী।’ তারা বোঝাতে চান, তাদের ধর্ম কেবল একটি সম্প্রদায়গত পরিচয় নয়, বরং চিরন্তন জীবনদর্শন।’… তার এই দাবি ইতিহাসে সনাতনের ধারাবাহিক বিবর্তনের সঙ্গে কন্ট্রাডিক্ট করে। তারা-যে গ্রিক, মুসলমানকে বহিরাগত ভেবেছেন, ‘যবন’ নামে ডেকেছেন, এর পেছনে বর্ণপ্রথায় নিগড়বন্দি শ্রেণিকরণের রাজনীতি তীব্র ছিল।
অভিজাত হিন্দুসমাজ মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন অল্প। তারা শঙ্কিত ছিলেন ভেবে,—গ্রিক কিংবা মুসলমান কিংবা ইংরেজ তাদের বৈদিক আর্য থাকার গরব ছিনিয়ে নেবে। সমাজকে যে-কমফোর্ট জোনে বসে তারা ভাগ করে রেখেছেন, প্রতিটি ভক্তি আন্দোলনকে প্রথমে ডিনাই ও পরে একে নিজের মতো অভিজাতকরণ করেছেন,—এর শক্তি ও সুবিধা কমে যাবে। সুতরাং, এখানে মার্কসের ক্লাস কনফ্লিট খুব ভালোভাবে ছিল ও এখনো আছে। সব মিলিয়ে এভাবে একটি ব্রাহ্মণতুষ্ট ন্যারেটিভে তারা ‘হিন্দুত্বকে’ আজো গড় করে চলেছেন। আর, বাকিরা তা জেনেবুঝেও প্রতিরোধ করার মতো ন্যারেটিভ তৈরিতে বিমুখ রয়েছেন। ভারতবর্ষে ‘হিন্দুইজম’ বলে কিছু হতে পারে না, তা যত চেষ্টা করা হোক-না-কেন একে সমাজে চারিয়ে তোলার।
. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …
‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ ও রামনাথ ঝা-এর ‘ব্রহ্মব্যাখ্যা’ : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
নেটালাপ : ‘মনু’ নিয়ে ‘মনের গোলযোগ’
জনতুষ্টির রাজনীতি ও ‘হিন্দু সুপ্রিমেসি’ : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
কামাল রাহমানের ‘রাজাধিরাজ দেবপাল’
গণমানুষের কর্তাসত্তা ও বয়ান-পরম্পরা
. . .
লেখক পরিচিতি : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন
. . .

অবদায়ক : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ ও আহমদ মিনহাজ : থার্ড লেন স্পেস.কম
মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ-এর অন্যান রচনা ও
প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন



