দেখা-শোনা-পাঠ - পোস্ট শোকেস

কামাল রাহমানের ‘রাজাধিরাজ দেবপাল’

Reading time 12 minute
5
(7)

পাঠ মাঝেমধ্যে আপনা থেকে সংযোগ তৈরি করে! বাংলায় পাল রাজবংশের সফল নৃপতিদের অন্যতম ছিলেন পাল রাজা দেবপাল। তাঁর রাজত্বকাল ও রাজ্যশাসন নিয়ে কামাল রাহমানের অ্যাখ্যানটি পাঠ করতে বসে শওকত আলী মনের কোণে হানা দিলেন! সেন রাজত্বের অবসন্ন প্রহরে বাংলায় মুসলমান বিজেতাদের পদভারে কম্পিত হয়েছিল। এক নতুন যুগারম্ভের শুরু ছিল সেটি। বাংলার ইতিহাসে দেখা দেওয়া সেই সন্ধিক্ষণকে পাখির চোখ করে রচিত শওকত আলীর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ দীর্ঘদিন পর কখন আবার পড়তে শুরু করেছি, তার কিছু টের পাইনি তাৎক্ষণিক!

অন্যদিকে, কামাল রাহমানের পেন্টালজি সিরিজের প্রথম প্রয়াস ‘দেবপাল’ যেখানে এসে বিরাম নিচ্ছে, সেখানে দাঁড়িয়ে মুসলমান শাসনের পদধ্বনি পাল সাম্রাজ্যের তৃতীয় পুরুষ দেবপালের মনে জাগতে দেখছি। সেন রাজত্ব অবশ্য তখনো শুরু হয়নি। ম্যালা দেরি আছে সূচনার! তবু, অমোঘ এক যুগারম্ভের ভেরি বিচক্ষণ পাল রাজা আঁচ করতে পারছিলেন। বাংলার সবুজে শ্যামলে আর্দ্র জলবায়ুতে বাঁধভাঙা বন্যার বেগে ধেয়ে আসা প্রমত্ত তুর্কি বিজেতাদের জোয়ার তাঁর দুখানা পেন্টালজি ‘দেবপাল’ ও ‘রাজাধিরাজ’কে যেন একসুতোয় গেঁথে দিয়েছে।

‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’-এ শওকত আলী বাঙালি জাতিসত্তা ও জনজীবনে দেখা দেওয়া অভিনব তরঙ্গকে প্রাকৃতজনের চোখ দিয়ে অবলোকন করেছেন। সেন রাজবংশের বিড়ম্বিত নৃপতি লক্ষণ সেনের কারণে অবসন্নতা ও অবচয় প্রকট হচ্ছিল তখন। শওকত আলী ইচ্ছে করলে সেন রাজত্ব ও সেন রাজাকে নিয়েও আখ্যানভাগ গড়ে তুলতে পারতেন। এটি তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল না। তিনি খুব করে চাইছিলেন,—বাংলার জনসমাজে তুর্কি তরঙ্গের অভিঘাত ও অনিবার্য এক সাংস্কৃতিক রূপান্তর-সংঘাতের পরিণামকে আখ্যানে অনুসরণ করতে। সংগতকারণে সেন রাজত্ব তাঁর বহুপঠিত আখ্যানে প্রচ্ছন্ন। তা আছে, কিন্তু তা কেন্দ্রীয় নয়।

‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’-র বয়ানকৌশল এদিক থেকে ভেবে দেখলে অভিনব মানতে হবে। আখ্যানের মূল সুরকে রাজশাসনের কার্যকারণ ও পরিণাম সেভাবে নিয়ন্ত্রণ করেনি। প্রাকৃতজনের দেহ ও মনোজগতে সক্রিয় ক্যাওস বরং শওকত আলীর বয়ানকে আগাগোড়া গতিশীল রেখেছিল। অরাজক এক পরিস্থিতির সংকেত যেটি আখ্যানকে ভারাতুর রাখে। পক্ষান্তরে, কামাল রাহমান তাঁর প্রথম পেন্টালজি ‘দেবপাল’-এ যেমন, দ্বিতীয়টি পেন্টালজিতেও রাজার চোখ দিয়ে রাজত্বের পরিণাম অঙ্কনে সুস্থির থেকেছেন।

নানাদিকে সমৃদ্ধ ও সংহত পাল রাজ্যে যোগ্য উত্তসূরির আকাল সাম্রাজ্যের পতনকে অনিবার্য করে তুলছিল;—এই আভাসটি ‘দেবপাল’-এ বেশ উচ্চকিত দেখতে পাই। ‘অনিবার্যতা’ অবশ্য শওকত আলী ও কামাল রাহমান, উভয়ের আখ্যানেই অনুরণিত। প্রতিমাশিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শিল্পকলার বিস্তার ও এর কারিগরদের যেটি বিপন্ন করে তুলেছিল সেইসময়। তাদের শিল্পীজীবন ও ব্যক্তিজীবন এর কোপে ছারখার হতে দেখা সত্যিই মর্মান্তিক মানতে হবে! ‘দেবপাল’-এ বিনষ্টির রেশ মৃদুলা, আর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’-এ তা মোড় নিয়েছে প্রচণ্ড সংক্ষুব্ধ এক তরঙ্গভঙ্গে।

কামাল রাহমানের ‘দেবপাল’ ভাষাবয়নে পৃথক গুরুত্ব আরোপ করেনি। ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’-এ শওকত আলী সচেতনভাবে ভাষা নির্মাণ করেছেন। তথাপি, সেকালের গৌড় তথা বঙ্গীয় জনপদে কেন্দ্রীভূত হয়েও সমগ্র ভারতবর্ষে প্রভাববিস্তারী পাল সাম্রাজ্যের প্রাণবন্ত এক ছবি কামাল রাহমানের আখ্যানকে পাঠ-উপভোগ্য রাখে যথেষ্ট।

Book Cover: Debpal and Produshe Pakritojon; Image Source: Collected; Google Image

তিন পুরুষে গড়ে ওঠা পাল সাম্রাজ্যে গোপালদেব, ধর্মপাল ও দেবপালের পর আঁধার নেমে এসেছিল। মহীপালের জামানায় হৃতশক্তি পুনুরুদ্ধার হয়, তবে তা ছিল সাময়িক। পাল রাজত্ব তারপরেও বাংলার ওই সময়রেখাকে চিনিয়ে দিয়ে যায়, যখন বৌদ্ধ ধর্মে কেন্দ্রীভূত রাজ্য-শাসনে কাজ করছিল সুবিবেচনা। যখন কিনা রাজ্য শাক্য মুনির জীবনাদর্শে অটল থেকেই ভারসাম্যকে খারিজ করেনি।

একালের বিচারে অবশ্যই নয়, তবে সেকালের প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা বিচেনায় নিলে পাল রাজত্বকে সেকুলার ভাবা আশা করি আতিশয্য হবে না। রাজারা সকল ধর্ম-বর্ণ-গোত্র ও সংস্কৃতিকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন সমান প্রাসঙ্গিকতায়। দুর্বল নৃপতিদের শাসন-মেয়াদে মাৎস্যন্যায় ফিরে-ফিরে মাথাচাড়া দিয়েছে ঠিকই, তবে পাল রাজত্বের সামগ্রিক সুর তা ছিল না। বিষয়টি অবধানে ‘দেবপাল’-র বয়ান পাঠকের উপকারে আসে। আখ্যানকার এই রাজত্বের বিকাশ ও সংস্থিতির মূল দর্শনকে সচেতনভাবে গড়ে তুলতে ভুল করেননি। পাঠক এদিকটা খেয়াল করলে ভালো, এবং তারা তা করবেন নিশ্চয়।

হিন্দুত্ববাদের পুনর্জাগরণ ও ব্রাহ্মণ্য উত্থানের স্মারক সেন শাসনে সুবিবেচনাটি ভালোভাবে রক্ষিত হয়নি। তুর্কদের পদানত হওয়ার বড়ো কারণ রূপে একে ধরে নিতে পারি। নীহাররঞ্জন রায় হয়তো এ-কারণে তাঁর ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস : আদিপর্ব’-এ লিখেছেন :

গোপাল বাঙালী ছিলেন, পালবংশের পিতৃভূমি বাঙলাদেশ; সেই হিসাবে পাল-রাজারা যতটা বাঙালী জনসাধারণের হৃদয়ের নিকটবর্তী ছিলেন, সেন-রাজারা তাহা হইতে পারেন নাই। তারনাথের আমলে যেভাবে গোপাল-নির্বাচনের কাহিনী লোকস্মৃতিতে বিধৃত ছিল, ধর্মপালের যশ যেভাবে দোকানে-চত্বরে জনসাধারণের কণ্ঠে গীত হইত, মহীপাল-যোগীপাল-ভোগীপালের গানের স্মৃতি যেভাবে বাঙালী জনসাধারণ আজও ধারণ করে, বহুদিন পর্যন্ত লোকে যেভাবে ধান ভানতে মহীপালের গীত গাহিত, বল্লাল সেন ছাড়া সেন-রাজাদের কাহারও সে-সৌভাগ্য হয় নাই।

এই তথ্যের ঐতিহাসিক ইঙ্গিত অবহেলার জিনিস নয়। সেন-রাজাদের মহিমা যাহা যতটুকু গীত হইয়াছে তাহা সভাকবিদের কণ্ঠে; যেটুকু তাহাদের স্মৃতি আজও জাগরুক, তাহা ব্রাহ্মণ্যস্মৃতিশাসিত সমাজের উচ্চতর শ্রেণীগুলিতে মাত্র। এ-তথ্যও ঐতিহাসিকদের বিচারের বস্তু।… একটি লোকগীতিও সেন-রাজাদের কাহারও নামে রচিত হয় নাই; বাঙলা সাহিত্যে লোকস্মৃতিতে সেন-রাজারা বাঁচিয়া নাই।

রাজা ও রাজ্যকে বাঁচিয়ে রাখে লোকস্মৃতি;—যখন কিনা আমরা রাজা-রাজড়ার গণ্ডিকাটা ইতিহাস থেকে বেরিয়ে প্রজাসাধারণের ইতিহাসের তালাশে নামি। নীহাররঞ্জন আমাদের প্রথম ঐতিহাসিক, কাজটি যিনি সফলভাবে হাতে নিয়েছিলেন। তাঁর মন্তব্যের অনুরণন যে-কারণে ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’-র শুকদেবের গৃহ নীরব অধ্যায়ে শ্যামাঙ্গ ও লীলাবতির সংলাপে আমরা ছলকে উঠতে দেখি :

তাহলে শুনুন, অতি শীঘ্রই দুর্ধর্ষ এবং হিংস্র যবন জাতি এদেশে আসছে, ওরা এলে কিন্তু রাজপুরুষদের সত্যি সত্যিই যুদ্ধ করতে হবে–সে বড় কঠিন কাজ হবে তখন।

লীলাবতীর স্বরে আর বিদ্রূপ ধ্বনিত হয় না। সে ধীর পদে কাছে এগিয়ে আসে। বলে, এ সংবাদ আপনি কোথায় পেলেন? সত্যি সত্যিই কি যবন জাতি এদেশে আসবে?

সত্যি-মিথ্যা জানি না, শ্যামাঙ্গ জানায়, আপনাদের গৃহে যে যোগীটি অতিথি, সে–ই সংবাদটি নিয়ে এসেছে।

শ্যামাঙ্গ দেখলো, এখন লীলাবতী আর চপল নয়, তার স্বরে এখন বিদ্রূপ নেই, ক্রোধ নেই। সে বললো, সাবধানে থাকবেন–প্রয়োজন বোধ করলে এ গ্রাম ত্যাগ করুন– অহেতুক লাঞ্ছিত হওয়ার কোনো অর্থ হয় না।

এ গ্রাম ত্যাগ করে কোথায় যাবো বলুন? শ্যামাঙ্গ দেখে, লীলাবতী তার মুখপানে চেয়ে আছে।

শ্যামাঙ্গ মুখখানি দেখলো, চোখ দুটি দেখলো, কেশপাশ দেখলো, তার মুখে তখন আর বাক্য নিঃসৃত হয় না।

কই, বলুন? কোথায় যাবো এই গ্রাম ত্যাগ করে?

শ্যামাঙ্গের যেন সম্বিৎ ফেরে লীলাবতীর কথায়। মুহূর্তের জন্য সে বিভ্রান্ত হয়েছিলো। বললো, যেখানে হোক, চলে যান–এ গ্রাম নিরাপদ থাকবে না।

আপনি দেখছি আমার জন্য বিশেষ উদ্বিগ্ন হয়েছেন?

শ্যামাঙ্গ সচকিত হয়। এ কথাও কি বিদ্রূপ? সে বুঝতে পারে না। বলে, আপনার রোষ কি এখনও যায়নি?

না, যায়নি, লীলাবতী উত্তরে জানায়। বলে, আপনার উপদেশের কোনো অর্থ হয়–সমস্ত গ্রাম বিপন্ন হলে আমি কোথায় যাবো, কার সঙ্গে যাবো? আর বিপদ কি শুধু বহিরাগত যবনদের কারণে? কেন, সামন্তপতিদের উপদ্রব নেই? তারা আক্রমণ করে না? বরং আপনাকে বলি, আপনি নিজে সাবধান হন, যে কোনো দিন হরিসেনের অনুচররা এ গ্রামে আসতে পারে–

কথা কটি বলে লীলা চলে গেল। বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো শ্যামাঙ্গ।

Shawkat Ali: Author of his magnum opas Produshe Pakritojon; Collage; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’-এ উচ্চকিত এই অনুরণন নীহাররঞ্জনের মন্তব্যকে প্রতিধ্বনি করছে এখানে। অন্যদিকে, কামাল রাহমানের ‘দেবপাল’ নীহাররঞ্জনকে সরাসরি পিক করেনি, তবে সামন্ত রাজাদের সামলানোর ঝক্কি আরো সবিস্তারে চিত্রিত। ভারতবর্ষে কেন্দ্রীয় শাসন সত্যিকার অর্থে ইংরেজ আমলের আগে শক্ত শিকড় ছড়াতে পারেনি। এমনকি ইংরেজরা এখানে হিমশিম খেয়েছে অনেক! যার প্রমাণ দেশভাগের সময় পাঁচশোর অধিক প্রিন্সলি স্টেটের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের ওপর ছেড়ে দেওয়ার মধ্যে আমরা দেখেছি তখন।

পাল রাজাদের কৃতিত্ব এখানেই,—’গোপাল, দেবপাল, মহীপালরা সামন্ত রাজাদের সংহত রাখতে ভালোই কামিয়াব ছিলেন। সেইসঙ্গে এও আমলে নিতে হয়,—রাজশাসনে দুর্বলতা দেখা দেওয়া মাত্র উক্ত সংহতি বিপন্ন হয়েছে ও মাৎস্যন্যায় মাথাচাড়া দিয়েছে ঘনঘন। সেন রাজত্বের কাঠামো বিপন্ন করতে যেমন সামন্ত রাজাদের ভূমিকা অশেষ ছিল। ঘনঘন বিবাদের ধাক্কা রাজ্যশাসনে কেন্দ্রের ভূমিকাকে বিঘ্নিত করেছে। পাল রাজত্ব সে-তুলনায় অনন্য থাকতে পেরেছে বেশ লম্বা সময় ধরে। বুদ্ধের বাণী ও জীবনবেদ মর্মে ধারণ করে রাজধর্ম পালন সহজ কথা নয়, তবে পাল রাজবংশের অগ্রগণ্য রাজন্যরা তা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ‘দেবপাল’ উপন্যাসের বয়ানে যে-কারণে তুলনামূলক সুস্থির ও সংহত প্রজা-অনুকূল রাজ্য-শাসনের ছবি পাই। আখ্যানের ভাষা ও চরিত্রায়ন থেকে আরম্ভ করে যেসব আটপৌরে বিবরণ কামাল রাহমান দিয়েছেন, সেটি অস্থির, সংক্ষুব্ধ নয় অতখানি।

‘দেবপাল’-এ পাচ্ছি আসন্ন বিপন্নতা নিয়ে উদ্বেগ। রাজা দেবপালের বিদায়ের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে তাল দিয়ে উদ্বেগের আভাস আখ্যানে ভর করেছে। নাটকীয় অভিঘাত যদিও প্রবল নয় অতটা। যেন-বা বুদ্ধের মর্মবাণী মেনে সুস্থির একাগ্রতায় কর্মে ব্যাপৃত এক পরিসরকে ধরছেন আখ্যানশিল্পী কামাল রাহমান! যাই ঘটুক সামনে, তাকে শান্তচিত্তে মেনে নেওয়াকে দেবপালের জন্য অমোঘ করে তুলছেন তিনি। রাজা ধর্মপাল ও দেবপাল, আর ওদিকে অভিনন্দ ও তাঁর শিল্পী হয়ে ওঠা নাতি ধীমান অবধি ছড়ানো সময়রেখায় উপন্যাসে গতির আলোড়ন যে-কারণে প্রবল নয়। তবে এর জন্য পাঠ-উপভোগ্যতায় বিঘ্ন ঘটেনি।

যে-অরাজকতার বিবরণ কামাল রাহমান আখ্যানের সূচনায় তুলে ধরছিলেন, রাজা দেবপালের মেয়াদে তা সুস্থিরতা লাভ করায় আখ্যানের বয়ানকে এটি প্রভাবিত করেছে। মুসলমান বিজেতাদের ভারতবর্ষে প্রবেশের আওয়াজ দেবপাল টের পাচ্ছেন, এর পাশাপাশি পাল রাজ্যের স্থিতি ও সমৃদ্ধি ধরে রাখার মতো যোগ্য উত্তরসূরির অভাব তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছিল। সান্ত্বনাবাক্যে নিজেকে প্রশমিত করা ছাড়া করণীয় থাকেনি কিছু। আখ্যানের পরিশেষে পৌঁছে পালরাজার মনে পল্লবিত টানাপোড়েন রাজ্যরক্ষার গুরুভারকে পুনরায় মনে করিয়ে যায়। আখ্যানে যার আভাস পাঠককে দিয়েছেন কামাল রাহমান :

Devapala (810s–845 CE); The Third Emperor of Pala Dinesty; Image Source: Collected; Google Image

প্রকৃতপক্ষে গত একশো বছরে পালরাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোয় একটা সুদৃঢ় ভিত্তি দাঁড়িয়ে গেছে। এটার উপর নির্ভর করে আরও অনেকদিন রাজ্যটা টিকে থাকতে পারে। এখন শুধু প্রয়োজন একজন যোগ্য প্রশাসকের যে দৃঢ়তা নিয়ে সবকিছু সামলে রাখতে পারবে। ঐ দৃঢ়কঠিন রাজপুরুষটিকে দেবপালের দিব্যচোখ কোথাও খুঁজে পায় না। এ নিয়ে আর আক্ষেপও করে না এখন। নিজের জীবনে যা করণীয় ছিল তা করেছে। অন্যের জীবন তো সে তৈরি করে দিতে পারে না। ভবিষ্যতই নির্ধারণ করবে আগামী দিনগুলোয় কী ঘটবে।

আপাতশান্ত দিন কাটিয়ে চলেছেন মহারাজ দেবপাল । কোথাও থেকে বড়ো কোনো সুসংবাদ নেই। দুঃসংবাদও নেই। এতেই খুশি দেবপাল ।

এ হয়তো মনের সান্ত্বনা ছিল পাল শাসনামলের অন্যতম সফল এই রাজন্যের। নিজেকে প্রবোধ দেওয়া-যে,—রাজ্যের ভূত-ভবিষ্যৎ তার হাতে নেই। আগত সময় ঠিক করে দেবে পাল রাজ্য টিকবে অথবা ধসে যাবে কি-না। আখ্যানের উপসংহারে এসে দেবপালের মনে জাগুরক অবসন্নতা মনকে বেশ আর্দ্র করে! অন্যদিকে, তাঁর মেয়াদকালে অস্থিরতা মৃদু থেকে উচ্চলয়ে ওঠার বার্তা ধীমানপুত্র বীতপালকে উপলক্ষ্য করে আখ্যানকার দিতে থাকেন। দেবপালের সময়পর্বে সে বেড়ে উঠছে অনিকেত বোধি নিয়ে। রাজা দেবপালের পরে ও মহীপালের শাসনকাল আরম্ভ হওয়ার আগে পর্যন্ত স্থবিরতা পালরাজ্যকে গ্রাস করেছিল বলে ইতিহাসে লেখে। আখ্যানেও তা আভাসিত।

শওকত আলীর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ এখানে এসে ভিন্ন। অস্থিরতা সেখানে কেবল উদ্বেগের বিষয় থাকেনি। নিস্ফল সময় ও বিপন্নতার ক্রোধকে তা লেলিহান করেছিল। যেহেতু, অস্তরাগের সেন শাসন তেমনটাই দাঁড়িয়েছিল তখন। অজেয় তুর্কদের অনুপ্রবেশ রোখার জন্য যে-শক্তি ও সংহতি প্রয়োজন ছিল, তা আর বজায় থাকেনি। নতুন একটি ধর্ম তো শুধু নয়, নবীন এক সংস্কৃতিকে মোকাবিলার চাপ শওকত আলীর আখ্যানে ভাষার গতিরেখকে ভিন্ন চেহারায় মোড় নিতে হয়তো প্ররোচিত করেছিল।

কামাল রাহমান তাঁর পেণ্টালজির দ্বিতীয় ভাগ ‘রাজাধিরাজ’-এ সেনশাসনকে ধরেছেন সম্পূর্ণটা। সামন্ত সেন থেকে লক্ষণ সেন… কয়েক পুরুষের এই পরম্পরাকে আখ্যানের বিষয়বস্তু করায় ভাষার চলন এখানে ‘দেবপাল’-র ছক থেকে বেরিয়ে ঘটেনি। তবে, এর গতিরেখ ‘দেবপাল’ থেকে আলাদা। পাল শাসনের পতন দিয়ে শুরু হয় ‘রাজাধিরাজ’, এবং লক্ষণ সেনে এসে করুণ উপসংহার টানে। সেন রাজত্বের উত্তরপুরুষকে সেখানে নিশ্চেষ্ট দেখে পাঠক। তুর্ক ঠেকানোর সামর্থ্য এই রাজন্যের ছিল না! সেই উদ্যম ততদিনে তাঁর মধ্যে মৃত!

পিতা বল্লাল সেনের শাসন-মেয়াদে রাজ্যের পরিসীমা ও সমৃদ্ধি ঘটেছিল। পুত্র লক্ষণ সেনের আমলে পরিসীমা সেভাবে না-বাড়লেও স্থিতি ধরে রাখতে মেহনত করেছেন বটে! তবু, সময়ের গভীর থেকে পালাবদলের যে-আওয়াজ পালরাজত্বের যুগপর্ব থেকে উঠছিল, তা ততদিনে অনিবার্য হতে চলেছে। বল্লাল সেন উচ্চ কবিমনের অধিকারী লোক ছিলেন। বেদ-উপনিষদ থেকে আরম্ভ করে পদাবলী, জ্যোতিষ ও তান্ত্রিক শাস্ত্র… কিছুই তাঁর চর্চা থেকে বাদ যায়নি। কামাল রাহমান তাঁর আখ্যানে সেন রাজাদের রুচি ও বিদগ্ধতা প্রীতিকে ধরেছেন চমৎকার।

অদ্ভুতসাগর’-র মতো কাব্য রচনা করেছেন বল্লাল সেন। যেখানে, জ্যোতিষ শাস্ত্রের প্রতি তাঁর অনুরাগের প্রাবল্য বলে দিচ্ছিল এই রাজত্ব অন্ধভাবে নিয়তি নির্ভর পরিণামে নিজেকে বলি দিতে চলেছে। নতুন ধর্মজোশ ও সাহসিকতায় বলীয়ান, সেইসঙ্গে অতিমাত্রায় ক্ষিপ্র তুর্কদের এসব দিয়ে ঠেকানো বাতুলতার নামান্তর ছিল মাত্র। লক্ষণ সেন যা পরে হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছেন।

পিতার দেখানো পথে তাঁর মধ্যেও কাব্য, সংগীত ও তন্ত্রশাস্ত্রে অনুরাগ প্রবল হয়ে হানা দিয়েছিল। কবিতা রচনায় ঝোঁক ছিল প্রবল। আসন্ন পালাবদল ঠেকাতে যে-শক্তি ও মনোবল প্রয়োজন পড়ছে ওই সময়টায়, যে-পরিকল্পনা ও সাংগঠনিক দক্ষতা রাজার জন্য আবশ্যক, এখন এগুলো তো জয়দেব বা হলায়ূধ মিশ্রের মতো অতি উচ্চাঙ্গের সভাকবির বরাতে প্রাপ্য কবিতারস, আর শাস্ত্রীয় তন্ত্রমন্ত্র-জ্যোতিষ-পুরাণ দিয়ে ঘটবার কথা নয়! কর্নাটক থেকে বঙ্গে আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সফল সেন রাজত্ব বাংলার ইতিহাসে বেশ অদ্ভুতরকম স্থবিরতার সূচক। নীহাররঞ্জন রায় হয়তো সে-কারণে বাঙালি জনজাতির ইতিহাসে সেন রাজাদের নেতিবাচক মূল্যায়ন করেছেন। রায় লিখেছেন :

যাহা হউক, লক্ষ্মণসেন যে-রাজ্য ও রাষ্ট্র গড়িয়া তুলিয়াছিলেন, সেই রাজ্য ও রাষ্ট্র ভিতর হইতে আপনি দুর্বল ও ক্ষীণ হইয়া পড়িতে আরম্ভ করিল। স্থানীয় আত্ম-কর্তৃত্বের যে-ব্যাধি পাল-রাষ্ট্রকে ভিতর হইতে দুর্বল করিয়া দিয়াছিল, সেন-রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাহার ব্যতিক্রম হয় নাই। এই ব্যাধিরই এক রাষ্ট্ৰীয় রূপ সামন্ততন্ত্র।

Escape of Raja Raja Lakshman Sen (1178-1205/6) by Surendranath Ganguly (1908);

‘রাজাধিরাজ’-এ কামাল রাহমানের সেনবিবরণকে এখানে ব্যতিক্রম মনে হবে। সেন শাসনের অবক্ষয় ও মুসলমান বিজয়ের নেপথ্যে নীহাররঞ্জন রায় প্রধানত দায়ী করেছেন অনড় হতে থাকা সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোকে। এটি পাল রাজত্বকে যেমন ভিতর থেকে একটা সময় দুর্বল করেছিল, সেন রাজত্বও সেই পুনরাবৃত্তি এড়াতে পারেনি। যে-কারণে প্রজার সঙ্গে রাজার সংযোগ ভেঙে পড়েছিল। কামাল রাহমান তাঁর আখ্যানে ইতিহাসের এই সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাকে বড়ো করে দেখেননি। তিনি আমলে নিয়েছেন বল্লাল সেন হয়ে লক্ষণ সেনে সংক্রমিত ধর্মনিষ্ঠার প্রাবল্যকে, যেটি তান্ত্রিকশাস্ত্রের মারাত্মক অনুরক্তির জোয়ারে রাজশাসনের চিরাচরিত ক্ষত্রিয়বৃত্তিকে ভগ্ন করে তুলেছিল।

আখ্যানে রাজা লক্ষণ সেন ও কবিমনা আরণ্যের আলাপে সেন রাজবংশে মাত্রাতিরিক্ত ধর্মনিষ্ঠার প্রকোপ তুলে ধরছে। লক্ষণ সেন বিশ্বাস করে বসে আছেন,—মহাভারত-এ একেশ্বরবাদী এক অবতারের কথা বলা আছে। তার অনুসারীরা নাকি এই ভূবর্ষ একদিন দখলে নেবে! কল্কি অবতারের একখানা বিবরণ ‘মহাভারত’-এ নয়, বরং কল্কি পুরাণ-এ পাওয়া যায়। ভগবান বিষ্ণুর দশম অবতার রূপে কলিযুগে তার আবির্ভাব ঘটার কথা সেখানে বলা আছে জাকির নায়েকের মতো ইসলামি শাস্ত্রবিদ ও অনেকানেক হিন্দু শাস্ত্রবিদ মনে করেন,—ইসলামের নবি হযরত মোহাম্মদের কথা কল্কি পুরাণে বলা হয়েছে। দাবিটি নিয়ে মতান্তর রয়েছে। কল্কি পুরাণের অবতার বিষ্ণুযশ আসলেও মোহাম্মদের সঙ্গে সাদৃশ্য ধরেন বলে মনে হয় না। দাবিটির অসারতা প্রমাণে বিরোধীপক্ষ যেসব যুক্তি এ-পর্যন্ত হাজির করেছেন, সেগুলো আমলে নিলে মোহাম্মদকে কল্কি অবতার গণ্য করা উদ্ভট মানতে হয়।

সে যাইহোক, লক্ষণ সেনের এহেন শাস্ত্রবিশ্বাস যে-অসার ও রাজার জন্য শোভনীয় নয়, আরণ্য তা ধরিয়ে দিতে ত্রুটি করেনি। ‘রাজাধিরাজ’-র বয়ানে জ্যোতিষ গণনার ওপর সেন রাজাদের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার বিপরীতে দেশের-পর-দেশ পদানত করে চলা তুর্কিদের নবীন শক্তিকে কামল রাহমান পাশাপাশি টেনেছেন। তাদের বিশ্বাসের মর্মমূলে সক্রিয় জিহাদি প্রবৃত্তি, ভোগের শক্তি, যুদ্ধজয়ের বরাতে পাওয়া মুনাফা বা মালে গণিমতের ভাগ-বাটোয়ারা থেকে আরম্ভ করে খুঁটিনাটি অনুষঙ্গের উল্লেখ বুঝিয়ে দেয়,—নবীন এই শক্তির সঙ্গে কাব্য, সংগীত ও নতর্কীরঙ্গের সঙ্গে তন্ত্রমন্ত্র ও জ্যোতিষে মজে থাকা সেন রাজার পেরে ওঠার জো নেই।

লক্ষণ সেন প্রজাপীড়ক রাজা ছিলেন এমন নয়, সেন রাজারা কেউ তা ছিলেন না, কিন্তু প্রজাদের সঙ্গে সংযোগ (বল্লাল সেন বাদে) কারো নিবিড় ছিল বলে ইতিহাসে প্রমাণিত নয়। সমস্যাটি কামাল রাহমান তাঁর আখ্যানে বিস্তারিত পরিসরে টানলে আখ্যানের ভরকেন্দ্র পৃথক শক্তি পেত মনে হয়। সেন রাজ্যের ব্রাহ্মণ কবলিত মতিভ্রমের কবলে পতিত হওয়াকে নিজ আখ্যানে ব্যাপক প্রাধান্য দিয়েছেন কামাল রাহমান। সেন শাসনের অবক্ষয়ের মূল কারণ নিয়ে নীহাররঞ্জন রায়ের করা মন্তব্যের সঙ্গে এই সংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মানুরক্তির সংযোগ যারপরনাই পাঠকমনে গড়ে ওঠে। কেননা, নীহাররঞ্জন স্বয়ং এই মন্তব্য তাঁর সুখপাঠ্য ইতিহাসগ্রন্থে করে গেছেন :

বাঙলার স্মৃতি ও ব্যবহার-শাসন সেন-পর্বেরই সৃষ্টি। এই যুগে রচিত অসংখ্য স্মৃতি ও ব্যবহার-গ্রন্থাদিতে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অমোঘ ও সুনির্দিষ্ট আদর্শ সক্রিয়। 

Bengal coinage of Muhammad Bakhtiyar Khalji as governor (1204–1206 CE); Image Source: Collected; Wikipedia

ব্রাহ্মণদের প্রতি অতিরিক্ত অনুরক্তি ও সামাজিক সুবিধা প্রদানে আতিশয্য সেন রাজত্বের কাঠামোকে একরৈখিক সীমানায় বন্দি করেছিল। ভারসাম্যে বিঘ্ন ঘটেছে যে-কারণে। ব্রাহ্মণদের যথেচ্ছ ভূমিদান, পরিতোষক, যাগযজ্ঞের বহর বৃদ্ধি পাওয়ার মচ্ছবে রাজশাসনের সংহতি বিনষ্ট হয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। রাজ্যরক্ষার বাস্তবসংগত ‍বিচারবুদ্ধি লোপ পাচ্ছিল ক্রমাগত। সেন রাজত্বের করুণ পতনের মূল কারণকে ‘রাজাধিরাজ’ যেভাবে তুলে ধরেছে, একে যুক্তিগ্রাহ্য না-মানার কিছু নেই। ইতিহাসের নিখাদ অনুসরণ করতে আখ্যানকার বাধ্য কদাপি বাধ্য নন। ‘রাজাধিরাজ’ও বস্তুনিষ্ঠ ঐতিহাসিক বয়ান নয়। কল্পনাশক্তির বিস্তার এর মূল অবলম্বন, যে-কারণে তা ‘পেন্টালজি’। তবে, মূল সত্যটি কামাল রাহমান এমন এক ভাষায় সীবন করেছেন, যেটি ইতিহাসকে পরিত্যাগ করেনি।

ইতিহাস প্রসূত তথ্যের সঙ্গে কাল্পনিকতার রসায়ন মিলে ‘রাজাধিরাজ’ এখানে ‘দেবপাল’র চেয়ে গতিশীল আখ্যান। তবে, ‘দেবপাল’ একইসঙ্গে জনজাতি ও রাজপুরীকে যেমন ধরেছে সমান্তরাল, ‘রাজাধিরাজ’-এ তার খামতি চোখে পড়বে। সেন রাজাদের সঙ্গে প্রজাদের সংযোগ পাল রাজদের তুলনায় ক্ষীণ থাকার যে-তথ্য নীহাররঞ্জন রায় দিয়েছিলেন, তা অযথার্থ নয়। বিজয় সেন ও বল্লাল সেন বাদ দিলে বাকিরা প্রজাদের হৃদয়ে জায়গা নিতে পারেননি। কামাল রাহমানের আখ্যান, পুনরাবৃত্তি করি আবারো,—তাঁর আখ্যানে এদিকটা বিস্তারিত পরিসর পায়নি। তিনি স্থির থেকেছেন রাজা ও পর্ষদের খুঁটিনাটি বর্ণনায়। যদিও তা ভালোই পাঠ-উপভোগ্য।

আগেও বলেছি, সেন রাজাদের ব্যক্তিত্বের ধাচ শুধু নয়, এই রাজপর্বে বিকশিত সাহিত্যের অতুল ঐশ্বর্য কামাল রাহমান বেশ সজাগ মনে আখ্যানে ধরেছেন। তথাপি, সেন রাজাদের সভায় গুণী কবি-চিত্রী ও শাস্ত্রবিদের ভিড় ছাপিয়ে, ওই জয়দেব, হলায়ূধ মিশ্র, অনিরুদ্ধ ভট্টদের ছাপিয়ে, ওই বেদচর্চার প্রাবল্য ছাপিয়ে, এবং দুর্বার গতিতে রাজাদের বাণপ্রস্থ নেওয়ার বাসনা আর তন্ত্রশাস্ত্রে মতি ছাপিয়ে বড়ো হয়ে ওঠে এই সত্য-যে,—রাজ্য ও রাজা উভয়ে সমান অবসন্ন ও হৃতবল! লক্ষণ সেনের চরিত্রায়ণ আখ্যানের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও শক্তিশালী দিক সেখানে। এরকম বিবরণ পাঠককে অগত্যা ধরে রাখে :

গভীর ভাবনার রাজ্যে হারিয়ে যায় লক্ষণ সেন। চুপচাপ বসে থাকে আরণ্য। ওর মনের ভেতরও রাজ্যের দুশ্চিন্তা। জীবনের এত কটা বছর অতিক্রম করে এসে এখন বানপ্রস্থে যাওয়ার কথা ওদের। নির্মোহ নিরুদ্বিগ্ন এক জীবন যাপনের কথা। আর এখন কিনা ভাবতে হচ্ছে যুদ্ধভাবনা! শরীরে শক্তি নেই, মনে জোর নেই, রাজ্যে শৃঙ্খলা নেই! এই দুই বৃদ্ধ এখনও ভেবে চলেছে জীবন ও জগতসংসার নিয়ে! 

লক্ষণ বলে, ‘আরণ্য, চল আজ একটু পান করি।’ 

‘পারি না যে আর মহারাজ, অন্ত্রে ব্যথা হয় খুব।’ 

‘আমিও পারি না আরণ্য। তবুও কেন জানি ইচ্ছে হলো… আচ্ছা থাক। ‘না মহারাজ, সামান্য হোক।’ 

‘এসো, নাচঘরে।’ 

স্বল্প আলোর পিদিম জ্বালিয়ে পানপাত্র হাতে নাচঘরের ভেতর কিছুক্ষণ পায়চারী করে দুজনে। তারপর সামনাসামনি বসে কৈশোরের ঐ দিনগুলোর মতো। কিন্তু কোনো কথা যে আর খুঁজে পায় না ওরা। ঘুমে ঢলে পড়ে লক্ষণ সেন। চুপচাপ বেরিয়ে আসে আরণ্য। মাথার উপরে জ্বলছে তখন অসংখ্য নক্ষত্র। সেনরাজ্যটা রক্ষা করার জন্য মহর্ষিরা, মহামুনিরা জ্বলজ্বলে চোখ মেলে তাকিয়ে আছে লক্ষণাবতীর আকাশ থেকে…

Tantrik on Madhubai (Mithila Art) Painting; Image Source: Collected; Pinterest

এই অবসন্নতা রাজাধিরাজ আখ্যানের মৌলসুর। যাইহোক, অন্তে এসে ‘দেবপাল’-এ একবার ফেরা প্রয়োজন। পেন্টালজির প্রথম ভাগে কামাল রাহমানের বয়নকুশলতা রিজিয়া রহমানের ‘বং থেকে বাংলা’র প্রায় নিকটবর্তী এক ধারায় ধরতে চেয়েছিল সময়ের ভাষা। এবং তা করতে যেয়ে দু-এক জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত এমন বয়ন-পরিসর ‘দেবপাল’ থেকে দ্রুত ছেটে দিয়েছেন তিনি। যেমন :

কুশাসনের জের ধরে বঙ্গে অমোঘ মাৎস্যন্যায়ের বিবরণ দিয়ে আখ্যানটি শুরু হচ্ছে। শিল্পী ধীমানের পিতামহ অভিনন্দকে যার চাপ তখন সইতে হয়েছিল। সেখানে, নিপীড়নের চাপ সইতে না পেরে অভিনন্দরা পার্শ্ববর্তী অরণ্যবেষ্টিত সাঁওতাল পাড়ায় গিয়ে আত্মগোপন করে। সান্তাল মুখিয়াকে যেখানে তাদের রক্ষাকর্তার ভূমিকা নেভাতে দেখা যায়। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ জীবনধারার পাশাপাশি আরণ্যিক সাঁওতাল জীবনের প্রভেদ ও দুটি জীবনধারার ইন্টারক্ল্যাশের আভাস পায় পাঠক। বেশ প্রাণবন্ত ও সম্ভাবনাময় এক পরিসর আখ্যানের শুরুতিই টেনেছিলেন লেখক।

মুখিয়াকে কেন্দ্র করে আখ্যানের ভিতরে আখ্যান গড়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা এতে তৈরি হয়েছিল। লেখক তা সীমায়িত ও দ্রুত হাওয়া করে দিলেন! এটি পোষায়নি একদম। আখ্যানের বিস্তারকে যা আহত করেছে বেশ! মুখিয়া আগ্রহ তৈরি করেও বিকাশের পরিসর পায়নি! মাৎস্যান্যায়ের ওই সময়টা বা এর তোড়ে তাদের পরিণাম কী দাঁড়িয়েছিল, তা অনুমেয় হলেও, আখ্যানে এটি আরো জায়গা নিলে ক্ষতি ছিল না।

পাল রাজাদেরেকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট লোকসাহিত্যের ব্যবহার আখ্যানে আশা করেছিলাম। একদিকে ধর্মপাল ও দেবপালের চোখ দিয়ে পাঠক বঙ্গীয় জনপদকে দেখছেন বটে, ফিলার হিসেবে আখ্যানকার নিজে বিবরণ বা ছোট-ছোট তথ্যসূত্র ধরিয়ে দিচ্ছেন, কিন্তু জনজীবনে রাজাদের নিয়ে যেসব কাহিনি ও জনশ্রুতি প্রচলিত ছিল, সেগুলো যোগ করলে আরো সবল ও প্রাণবন্ত হতো এর গতি।

শওকত আলীর একটি সুবিধে ছিল এখানে। তিনি ভারতবর্ষে তুর্কী আগ্রাসনের প্রাক ক্ষণকে বেছে নেওয়ায় অনেকগুলো ইনার কনফ্লিক্ট ধরতে পেরেছিলেন। সংগতকারণে উপন্যাসের চরিত্র ও বর্ণনায় তা প্রভাব ফেলেছে। এদিক থেকে ‘দেবপাল’ অধিক ইতিহাসানুগ বিবরণে সুস্থির থাকায় বাংলা থেকে বৌদ্ধদের উবে যাওয়ার আগেকার শেষ ‍সুখী কালপর্ব থেকে গিয়েছে নিস্তরঙ্গ। যেখানে, রাজ্যের সীমানা সংহত করছেন পাল রাজারা। প্রজাশাসনে পরিচয় দিচ্ছেন সুবিবেচনার। এবং, তার মধ্যেই ধীরলয়ে অমোঘ হতে চলেছে অমাবস্যা। আখ্যানের শেষ অধ্যায়ে বয়োবৃদ্ধ ও প্রায় নির্মোহ সমাধিতে গমনরত দেবপাল, আর সবকিছু বিপর্যস্ত ভাবতে থাকা শিল্পী বীতপালকে ট্রাজিক ভাবতেই হচ্ছে।

পরিশেষে এটুকু বলার,—দুটি আখ্যানের সমাপ্তি যথার্থ; তবে আখ্যানকারের সুযোগ ছিল ইতিহাসের গণ্ডি কেটে আরো বেরিয়ে আসা ও ঝুঁকি নেওয়া। এতে করে আখ্যান-দেহে বাংলার জলবায়ুর কোমলে কঠোরে মেশানো জীবননাট্য মনে হয় এপিক বিস্তার পেত যথাযথ।
. . .

Odvhutsagor (Strange Sea) Mansucript: Written by Raja Ballal Sen; Image Source: Collected; Wiki

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 7

No votes so far! Be the first to rate this post.

thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *