মধুরবান্ধা গানকে কেবল অপেশাদার বা আঞ্চলিক গান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। নৃবিজ্ঞান ও লোকদর্শনের বিচারে এটা ভাটিবাংলার সাধারণ মানুষের আত্মপরিচয়, আধ্যাত্মিক আশ্রয় এবং সামাজিক জীবনধারার স্থায়িত্ব রক্ষার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। মধুরবান্ধা গানের দর্শন উচ্চমার্গীয় শুষ্ক উপনিষদিক দর্শন নয়;—এটা হলো ‘সহজিয়া দর্শন’।
-
-
একটু পরেই অসিতরা শুনে দুটি নয়, এখন কেবল একটি বাঁশির সুর ভেসে আসছে। অকল্পনীয় সে সুরসুধা পলেপলে জীবনকে তুচ্ছ করে। পতঙ্গের মতো পুড়ে মরতে সাধ জাগায়। সেই সুরের গভীর মন্ত্রণায় চারপাশের সব জড়-জীব যেন নৃত্য শুরু করেছে।
-
নিশিকালে যায় জমিনে হালের বলদ লইয়া/ কৃষাণী ডাকিয়া তুলে অভিসার ভুলিয়া/ জমিনেতে কৃষিকাজে নিশি হয়-যে ভোর/ পেটে ক্ষুধা লাগে তার উঠান-সমুদ্দুর॥
-
এই ধামাইল গানের নাচে যে-শৈল্পিক দুরন্তপনা ও তেজোদীপ্ত ভাব রয়েছে, আমি তা অন্য কোনো নৃত্যগীত নির্ভর গানে এতটা মূর্ত ও জীবন্ত দেখিনি! ঘুমভাঙা চোখ মুহূর্তে চনমনে নেশায় পড়ে যায়! মনে হয় কিছু কিছু গান যেন নাচকে প্রাধান্য দেওয়ার খেয়াল থেকে পদকর্তারা তৈরি করেছেন। যেখানে, তাঁদের গুরুর নামধাম অজ্ঞাত। লোকনৃত্যের অমূল্য এই রতনকে তাই সময় থাকতে সংরক্ষণ করা জরুরি।
-
সূর্যব্রত তাই কৃষিরক্ষার পদ্ধতি মাত্র নয়,—বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সাথে মানুষের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের অনুশীলনকে তা একসুতোয় বেঁধে রাখে। মানুষের দেহভাণ্ড যেখানে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অংশ রূপে ব্রহ্মাণ্ডের জন্য কাজ করে,—চর্চা ও সাধনা করে। মানুষ, বিশেষভাবে কৃষকের বিশেষত্ব এখানেই। কৃষক মানে কেবল মানবদেহের অধিকারী কেউ নয়, আর দেহটাও কেবল ব্যক্তিগত শরীর নয়।