‘বই ছুঁয়ে কই’
হেলাল চৌধুরী-র কণাগদ্য
. . .

বই ছুঁয়ে কই
প্রকৃতি ও পরের সুখ-দুঃখ এবং ব্যর্থ-অব্যর্থ প্রেমের গল্প, নিজের মধ্যে উপলব্ধি করবার ক্ষমতাই কবিত্ব।
. . .
রবিবিত্তান্ত
তিন কানা একদিন হাতি দেখার অনুভূতি প্রকাশ করছে যার যার মতো করে। প্রথম কানা হাতির কান ধরে বলল—হাতি কুলার মতো। দ্বিতীয় কানা হাতির বিশাল পা ধরে বলল—হাতি ঘরের খুঁটির মতো। তৃতীয় কানা হাতির লেজ ধরে বলল—হাতি দড়ির মতো। এই নিয়ে তিন কানার শুরু হয়ে গেল চরম হাতাহাতি।
আমরা কেউ কেউ এই তিন কানার হাতি দেখার মতো রবীন্দ্রনাথ পাঠ করছি আর কেবল তিন কানার হাতাহাতি করে যাচ্ছি। ওপারে বসে তিনি নীরবে কেবল হেসেই যাচ্ছেন।
ইদানিং খুব বেশি করে দেখছি…কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথের বিরূপ সমালোচনা করছেন এই এক বিষয় নিয়ে-যে,—মুসলমানদের জন্য তিনি কিছুই লিখে যাননি। এমনকি তিনি মুসলিমবিদ্বেষী ছিলেন। তাদের উদ্দেশ্যে আমার ছোট্ট একটা অনুরোধ—দয়া করে আপনারা রবীন্দ্রনাথের সর্বশেষ লেখা ছোটোগল্প ‘মুসলমানীর গল্প’টি পড়বেন। পড়লে আশা করি ভালো করে অনুধাবন করতে পারবেন-যে, মুসলমানদের সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের কতটুকু উচ্চমার্গীয় ধারণা ছিল।
বলাবাহুল্য, আমি নিজেও আজও রবীন্দ্রনাথ আপাদমস্তক পাঠ করতে পারিনি। তাই আমি রবীন্দ্রনাথের বিরূপ সমালোচনা করতে গেলে অন্তত তিনবার ভাবি। কেননা রবীন্দ্রদেখা মানে হাতিদেখা। আমার তো এখনও আপাদমস্তক হাতিদেখা হয়ে ওঠেনি। অতএব, আপনারা হাতি দেখতে হাতাহাতি করতে থাকুন। আমি কিন্তু হাতাহাতি নেই।
. . .
বকধার্মিক
বিজ্ঞানীদের ভুল ধরলে বিজ্ঞানীরা খুশি হয়;—ধর্মভণ্ডদের ভুল ধরলে ধর্মভণ্ডরা বেজার নয় শুধু, তারা ক্ষেপেও যায়। বিজ্ঞানীরা ভুল শুধরে নেয়;—ধর্মভণ্ডরা হত্যায় লিপ্ত হয়।
. . .
যে-ই লাউ, সে-ই কদু
ফরাসি বিপ্লবের ফল নেপোলিয়ন। ফরাসি বিপ্লব মুক্তি চেয়েছিল। অন্ধকার নয়, আলো চেয়েছিল। পেলো কুয়াশার মোড়কে মোড়ানো সূর্য। এলো একনায়ক। যে-ই লাউ, সে-ই কদু।
আমাদের বাজারেও চলছে লাউ-কদুর বাণিজ্য। এ-বাণিজ্যে লাউয়ের বদলে কদু কিনে আমরা আজ আমাদের মহা-বোকামিতে ডাহাখুশি!
. . .
ছাগবিত্তান্ত
যে-সংঘে ভালোমানুষদের অবমূল্যায়ন করা হয়, সে-সংঘে দুর্দশা অতীব আকারে বেড়ে যায়। কারণ, ভালোমানুষদের অনুপস্থিতিতে সেখানে দুঃশাসনের ন্যায় মন্দলোকেদের পদভার বেড়ে যায়।
আর সংঘ…মন্দলোকেদের সুরক্ষা করলে সেখানে চুরি, ডাকাতি, অনিয়ম, দুর্নীতি ও দুঃশাসনের সংখ্যা বেড়ে যায়। ফলে রাষ্ট্রে প্রবল আকারে অসন্তোষ ও মানহানি দেখা দেয়। জনগণ দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হতে থাকে।
. . .

মেঘবতী
মেঘবতী ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাসে প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। তিনি ইন্দোনেশিয়ার প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি সুকর্নের কন্যা। ইন্দোনেশিয়া একটি ১০০ভাগ মুসলিম প্রধান দেশ। মুসলিম প্রধান একটি দেশের প্রেসিডেন্টের কন্যার হিন্দুয়ানী নাম কী করে হয়…আমার কাছে তা আসলেই একটি অবাক করার মতো বিষয়।
এর পেছনের মূল ইতিহাসটি ছিল এরকম…বিজু পাটনায়েক ছিলেন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ এবং কলিঙ্গ এয়ারওয়েজের পাইলট। প্রেসিডেন্ট সুকর্ণের সঙ্গে যখন তার পরিচয় হয়, তখন সুকর্ণের স্ত্রী সবেমাত্র একটি কন্যসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। সুকর্ণ তার নবজাতকের জন্য একটি সুন্দর নাম খুঁজছেন। এই সময়েই বিজু পাটনায়েকের সঙ্গে তার দেখা। সুকর্ণ তাঁর কন্যাসন্তানটির নাম রাখার ভার দিলেন বিজু পাটনায়েকের ওপর। আকাশে তখন মেঘের ঘনঘটা। বিজু পাটনায়েক মেঘের দিকে তাকিয়ে বললেন—মেঘবতী। সুকর্ণ মেয়ের নাম মেঘবতীই রাখলেন।
আর এভাবেই ১০০ ভাগ মুসলিম প্রধান দেশের প্রেসিডেন্টের সন্তানের নাম হিন্দু নামে পরিচিত হয়ে উঠল। তবে আমার কাছে হিন্দু নাম কিংবা মুসলিম নাম অথবা খ্রিস্টান নাম বলে কোনও কিছুর ঠাঁই নেই। নাম আমার কাছে একটা প্রতীক। এই প্রতীক নির্দিষ্ট কোনও জাত নয়—হোক মানুষের প্রতীক।
বহু বছর পর রাজনীতির চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে সুকর্ণের এই সুযোগ্য কন্যা মেঘবতী ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রথমে ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং পরে ২০০১ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন।
. . .
কঙ্কর
মক্কা-মিনায় যেয়ে, জামারাতে বলো কঙ্কর মেরে
অর্থের অপচয় তুমি, কেন করো…
তোমার মনের জামারাতে, যে-শয়তান বাস করে
হেলাল, তুমি তারে আগে মারো।
. . .
মহান-১
‘যারা মহান, যারা বড়ো, তাদের কাছে ধর্ম হলো বন্ধুত্ব সৃষ্টির এক মধুর পন্থা। ক্ষুদ্র মানসিকতার লোকরাই ধর্মকে হানাহানির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে’।
. . .
মহান-২
আমরা অন্যকে মহান হওয়ার কথা বলি। নিজে মহান হওয়ার চেষ্টায় থাকি না। অথচ প্রত্যেকটা মানুষের মহান হওয়া দরকার। মহান না-হলে মহানের সান্নিধ্য পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।
অতএব, মানুষেরই প্রথমত মহান হওয়ার চেতনায় প্রাণিত হওয়া উচিত।
আমরা প্রতিনিয়ত তাঁকেই শুধু মহান হতে বলি কিন্তু নিজে মহান হতে চাই না। তাইতো, পৃথিবীতে এত হানাহানি এবং এত মারামারি।
. . .

চকিতালাপ
[থার্ড লেন স্পেস হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে সংকলিত]

রবিসাহিত্যে মুসলমান গৌণ দেখে যারা ফরহাদ মজহারের মতো ‘রক্তের দাগ মুছে রবীন্দ্রপাঠ’-র খবর করে, তাদের জিগান তো,—হিন্দু বা অন্য সম্প্রদায়কে নিয়ে কয়টা লাইন আপদগুলা লিখেছে আজ পর্যন্ত! কবিতা-গল্প-আখ্যানে হিন্দু চরিত্র ও যাপন কি তারা লিখেছে কলম ফাটিয়ে? সেখানেও তো মুসলমান চরিত্র ও যাপনটাই আসে স্বাভাবিক নিয়মে। এমনকি বাংলাদেশের হিন্দু লেখকরাও দেখবেন, মুসলমান পরিসরকে ব্যবহার করে লিখছেন। সংখ্যাগরিষ্ঠের চাপ আপনা থেকে তাদেরকে সেদিকে টানে, যেখানে নিজের অংশের প্রতি সুবিচার করা আর হয়ে ওঠে না।
বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুকে যদি কেউ সজ্ঞানে বিষয় করে থাকেন,—তিনি কায়েস আহমেদ। তাঁর গল্পবিশ্ব হিন্দু সংখ্যলঘুর যাপন মানচিত্র বড়ো বিষয় ছিল। ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৈতৃক ভিটে ও মালপদিয়ার রমণী মুখুজ্জে’-র মতো গল্প কায়েস আহমেদ লিখেছেন। এরকম আরো আছে। এটা উনার অভিরুচি। সবার তা নাও থাকতে পারে। এর জন্য কোনো লেখককে আসামি করাটা আমার কাছে ফালুত লাগে এখন।
একজন লেখক কী লিখবেন তা তার অভিরুচির ওপর নির্ভর করে। আপনার পোষালে নেবেন, না পোষালে নেবেন না। রবি ঠাকুরকে বাদ দিয়ে আপনার যদি চলবে মনে করেন, তো বাদ দেন বেচারাকে। খামোখা এসব সাম্প্রদায়িক জিগির তোলার দরকার তো নাই।
প্রব্লেমটা এখানেই,—লোকটিকে আপনার লিস্ট থেকে ছাটাই করতে পারছেন না। রবি ঠাকুরের কাজের পরিধি ব্যাপক ও বহুমাত্রিক হওয়ার কারণে ছাটাই সম্ভব নয়। যেদিকে যাবেন, ছ’ফুটি লোকটার ছায়া আপনার ঘাড়ে শ্বাস ফেলবে। নিরুপায় হয়ে আপনি তখন বাহানা খুঁজবেন ছাটাইয়ের। তা সেই চেষ্টা খালি আমাদের এখানকার বদ মুসলমানগুলা করে, তা কিন্তু নয়। রবিছাটাইয়ের চেষ্টা ও এর ইতিহাস অতি সুদীর্ঘ।
ঠাকুর বেঁচে থাকার দিনকালে বাঙালির একাংশ তাঁকে পছন্দ করেনি। উনার জমিদার হওয়া থেকে শুরু করে দেশ-বিদেশে নামধাম অনেকের ঈর্ষার কারণ হয়েছে। অক্ষমের আক্রোশ থেকে পিছনে লাগত সারাক্ষণ। বাঙালি শিক্ষিত সমাজের এই প্রবণতা ঠাকুর নিজের জীবদ্দশায় সহ্য করেছেন অনবরত। অন্য লোক হলে গলায় দড়ি দিতো নির্ঘাত।
ঘরের ভিতরে তাঁকে সইতে না-পারা লোক ছিলেন। মেয়েকে (নাম মনে পড়ছে না এখন) কলকাতার নামকরা আইনজীবীর সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। শ্বশুরকে উনি পছন্দ করতেন না। মেয়েকে দেখার জন্য রবি ঠাকুরের মন যখন ছটফট করত, লুকিয়ে দেখা করতেন। সেই সময়টা বেছে নিতেন, যখন মেয়ের জামাই ঘরে নেই। এরকম শত-শত পেইন ঠাকুরবাড়ির ভিতরমহলে তাঁকে সইতে হয়েছিল।
বাঙালি শিক্ষিত সমাজে রবি ঠাকুর বরাবর সমস্যা ছিলেন ও এখনো তাই আছেন। ভক্তের দল তাঁকে দেবতা বানিয়ে মধ্যবিত্ত গণ্ডিতে বন্দি করেছে। রবিকিরণ কি কোনো গণ্ডিতে আটকে থাকার জন্য? পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজের এই অতি ভক্তির কারণে কিরণ আজো সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া যায়নি। ভক্তের মধ্যে আরেকটি অংশ আছে, তারা আবার নিজমাপে তাঁকে বোতলবন্দি করে আসছে যুগ-যুগ ধরে। রকিকিরণ কি বোতলবন্দি হওয়ার জিনিস? প্রশ্নটি এই গাধার দলের মনে কখনো জাগে না!

বিরোধীরা ওদিকে তাঁকে বাতিল ও কাটছাটের তালে থাকে সারাক্ষণ। ভারতবর্ষে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ঢেউ যখন তীব্র ছিল, রবি ঠাকুরকে বুর্জোয়া আপসকামী দাগিয়ে কমিউনিস্টদের একটি অংশ বাতিল করতে মরিয়া ছিল। ঠাকুরের সাহিত্যে বুর্জোয়া স্খলন খোঁজা তেনাদের একমাত্র কাজ ছিল তখন। বিপ্লব করে জাতির কী ছিঁড়েছেন তারা কে জানে!
হাংরি আন্দোলনের পুরোহিতরা জীবনানন্দকে নিয়েছিল,—রবি ঠাকুরকে নয়। রবি ঠাকুরের অপরাধ? তিনি এস্টাবলিশমেন্টের লোক! তাঁর সাহিত্য নিম্নবর্গকে (তেনাদের ভাষায় ছোটলোক) রিপ্রেজেন্ট করেনি। এই সাহিত্য ও নান্দনিকতা ছোটলোকের জীবনবোধ ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ ঘটাতে ব্যর্থ। সংযোগ ঘটানোর বন্যায় তেনারা যেন জাতিকে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন একেবারে!
পাকিমনা মুসলমান (তারা সংখ্যায় অতি বৃহৎ) আগাগোড়া রবীন্দ্রবিরোধী! দেশভাগের পর থেকে রবীন্দ্রনাথকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিত্যক্ত করার পরিকল্পনা সরকার নিয়েছিল। তাঁকে ছাটাইয়ের সে-ইতিহাসে আর না যাই! বাংলাদেশের জন্ম-পরিস্থিতি এমন একটা পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছিল তখন, যে-কারণে মুছে ফেলতে পারেনি। হার মেনেছিল সাময়িক।
রবিকিরণ আসার পথ রোখা সম্ভব নয় বুঝে কিরণকে আবার ওই বোতলবন্দি বা নানা মাপে ঢুকিয়ে ম্লান করার তালে আছে প্রেতের দল। নজরুলকে হাতিয়ার করে রবিকে ম্লান করার ঘটনাটি তো আমরা দেখে-দেখে বড়ো হয়েছি! সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক মন যেন ধরা না পড়ে, তার জন্য ক্লাস কনফ্লিক্টকে ব্যবহার করত সেখানে। নজরুল যদি জমিদার হইত আর সায়েব-মেমেদের সঙ্গে খাতির থাকত তার, নোবেল ঠিক পাইত! লালন মাজারের শিষ্য ও খাদেমের অনেকে যেমন এখনো বিশ্বাস করে, সাঁইজির গান চুরি করে রবি ঠাকুর গান লিখেছে ও নোবেল বাগিয়েছে পরে!
ফরহাদ মজহারের মতো অগণিত পতিত বামের মধ্যে আমি এরকম সব মুসলমানের মুখ দেখতে পাই। সলিমুল্লাহ খান নামের নিম্নমানের বুদ্ধিজীবী নামধারী ভাঁড়টাও তাই। বঙ্গদেশে রবি ঠাকুর নিয়ে অসূয়াপ্রবণ বাঙালি শিক্ষিত সমাজের বড়োসড়ো একটি অংশের এসব রঙ্গ দেখতে দেখতে গা-সহা হয়ে গেছে।
কোনো লেখক সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। রবি ঠাকুরও তা নন। তিনি ‘বহুমাত্রিক জ্যের্তিময়’ হওয়ার কারণে তাঁকে ডিগ বা খনন করা সবসময় দরকারি হয়ে থাকবে। এই কাজটি খুব কম লোক আজোবধি করে উঠতে পেরেছেন। যারা পেরেছেন, তারা রবিকিরণের তেজ ও স্নিগ্ধতা অনুভব করেছেন চিত্তে।
রবিকে নানাভাবে আবিষ্কার করা ও নতুন পথে বিনির্মাণ করা যদি হয় লক্ষ্য, তাহলে সোনা ফলবেই ফলবে। লক্ষ্য যদি হয় ওসব ছাতার মাথা শ্রেণি সংগ্রামের নাম ভাঙিয়ে ফালতু বামবিকার ও সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা… তাহলে ফল মিলবে বিষম।
রবির শক্তিটা এখানে-যে, ঘৃণা করতেও তাঁকে লাগছে, ভালোবাসতেও লাগছে। বাতিলের খেলায় নামার উদ্দেশ্য হলো, তাঁকে প্রান্তিক করা, যেন আর মেইনস্ট্রিমে লোকটার নাম নিতে না হয়। চেষ্টা তো চলছে যুগ-যুগ ধরে। চেষ্টাকারীর দলকে বরং মুছে যেতে দেখছি ফিরে-ফিরে। রবিকিরণ যথারীতি ছড়ায় আলো। আরে ভাই, সূর্য আকাশে দেখা দিবেন বলে মনস্থ করেছেন। মেঘের সাধ্য কি তাকে রোখে!
. . .
পুনশ্চ
রবি ঠাকুর মুসলমান নিয়ে একটি অক্ষরও যদি না লিখতেন, আমার তাতে কিচ্ছু যেত আসত না। ওই এলাকা বাদ দিয়েও তাঁকে পাঠ করা, তাঁর সঙ্গে কোমরবেঁধে ঝগড়া করার বহুত জায়গা রয়েছে। যত ঝগড়া তত ফায়দা। কারণ, আপনি নিজেকে ভাঙার পথ খুঁজে পাবেন।
আমি তো বলব, রবির একদম উচিত হয়নি ‘মুসলমানের গল্প’ লেখা। আখ্যানে ও প্রবন্ধে হিন্দু-মুসলমান সমস্যা নিয়ে কথা বলাটাও তাঁর উচিত হয়নি। ইসলামের নবিকে সম্মান জানিয়ে বাণী বর্ষণ করতে কে বলেছিল তাঁকে? ফিলিস্তিন ও জায়োনিস্ট ইহুদি নিয়ে আগ বাড়িয়ে বকবক করা একদম উচিত হয়নি। আরো উচিত হয়নি, মুসলমান প্রজাদের দুখদরদকে বৃহৎ পরিধিতে বোঝার চেষ্টা করা।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুরকে পছন্দ করতেন না। প্রকাশ্যে রা কড়েননি দাদুর প্রতি সম্মান থেকে। কারণ, দ্বারকানাথকে তিনি বৈশ্যকুলে মাথা কামানো ব্যবসাজীবী ভাবতেন। রক্তকরবীর রাজার মতো অচলায়তনে যে-নিজেকে বন্দি রেখেছে। সাহিত্যে দাদুকে ঝেড়েছেন ছদ্মনাম ও রূপকায়িত ভাষায়। এটি নিয়ে নতুন গবেষণা হচ্ছে বৈকি অদ্য।
রবি ঠাকুরের শালপ্রাংশু সাহিত্যবৃক্ষে বন্ধনমুক্তির ডাক হিন্দু-মুসলমানকে আলাদা ভেবে বিরচিত নয়। হিন্দু ঘরে জন্মেছেন। অন্তরঙ্গতা থাকবে এটা স্বভাবিক। চরিত্ররা যে-কারণে হিন্দু। আচার-বিচার হিন্দু। রেফারেন্সও তাই। ভিতরের বার্তা হিন্দু-মুসলমানে ভাগাভাগির জন্য কি? আমার সামান্য পাঠজ্ঞানে তা কখনো মনে হয়নি। বার্তাগুলো মানবিক সংবেদনের চিরায়ত অনুভবে ঠাসা। এটি তাঁকে যুগ-উত্তীর্ণ কেবল নয়, চিরকালের করে দিয়েছে।
চিরায়ত বিশ্বসাহিত্য কী-করে জন্ম নেয়, ওইটা বুঝতে বদ সলিমুল্লাহ গংকে বারবার ধরায় ভূমিষ্ট হতে হবে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির শিকার হয়ে চিরায়ত মানবিক অনুভবের সাহিত্য বোঝা যায় না।
. . .

মিনহাজ, লেখাটি পড়ে আরও ঋদ্ধ হলাম। রবীন্দ্রনাথ নিয়ে যে-চর্চা হচ্ছে আমাদের এখানে তাতে মনে হয় তারা অধিকাংশয় বোধহয় সলিমুল্লা বিশ্ববিদ্যালয়-এর ছাত্র নয়,—চামচা।
যেদিকেই যাবেন, ছ’ফুট লোকটার ছায়া আপনার ঘাড়ে পড়বেই
রবিকিরণ আসার পথ রোখা সম্ভব নয়
নজরুলকে হাতিয়ার করে রবিকে ম্লান করার ঘটনা
বদ সলিমুল্লা খান অতি নিম্নমানের বুদ্ধিজীবী
—বয়ানগুলো ভালো লেগেছে। তবে আমি তারে, সলিমুল্লা-রে,—বুদ্ধিজীবীও বলি না; বলি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী।
রবীন্দ্রনাথ নিয়ে ঘাটে-আঘাটে যা চলছে তা দেখে আমারও গা-সওয়া হয়ে গেছে। ‘রবীন্দ্রনাথ শালপ্রাংশু সাহিত্যবৃক্ষ’—কথাটি দারুণ লেগেছে! অজস্র ধন্যবাদ।
. . .
লেখক পরিচয় : হেলাল চৌধুরী : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপ দিন
. . .

অবদায়ক : হেলাল চৌধুরী; আহমদ মিনহাজ; থার্ড লেন স্পেস.কম
হেলাল চৌধুরী-র অন্যান্য ও প্রাসঙ্গিক রচনা পাঠের জন্য এখানে চাপুন



