কবিতা সিরিজ : তোমার কটিমেখলায় আমি-২
রচনা : হেলাল চৌধুরী

ইতিলের তনু
মাঝে মাঝে তোমার বুক
জমে ওঠে বুঝি ইতিলের তনু
ইতিল কোনও মানুষ নয়
সে ভলগা নদী…
শীতের বাতাসে
ইতিলের বুকে
হেসে ওঠে, সাদা বরফের শরীর
স্লেজের সড়ক…
কুকুরের ঘাড় তখন — বন্ধুর হাত।
ইলার মখমল হাতে
বন্ধুর প্রেমে
বরফের নদী যখন
ইতিলের তনু
তখন
ভলগার বুক কুকুরের সড়কপথ।
. . .
ঝিনুক তোমার গতর
তোমার সমুদ্র বুকের ডুবুরি হই আমি।
মস্তকে কচ্ছপের মুখোশ মাখি
কোমরে জড়াই নারকেল দড়ি
তারপর নাসিকায় তার খোলস পরি
তোমাকে পেলে
দড়িতে খবর প্রেরণ করি;
দড়ির টানে
ফিরে যাই তবেই আমি আমার পাটাতনে।
অতঃপর ডাঙায় তোমার গতর চিরে নিই
খুলে আনি কঠিন বুক থেকে
তোমার ঘনক্ষীর আর নরম মাংসের পিণ্ড
তারপর তােমাকে বাতাসের স্পর্শ মাখাই;
বাতাসের স্পর্শে
তুমি তখন, আমার সমুদ্র-বেলার মুক্তো।
ঝিনুকের বুকে অসুখ
আমার অনাবিল সুখ
ঝিনুকের সন্ধ্যাবেলা
আমার সকালবেলা;
কেবল
ডাঙায় শুয়ে থাকে তখন
নিদারুণ অবহেলা ঝিনুক তোমার গতর।
. . .
সরীসৃপরাত শরীরে
আবারও রক্তে বহমান রোদ, তোমার ধলেশ্বরীর আল্পনা ধরে
জল কেটে উঠে আসে সরীসৃপরাত শরীরে, তোমার লোকালয়
জোছনাতেও; তারপর শকুনের ঠোঁটনখ গজায় পুনরায়
কুচক্রী কামাতুর মানুষে হামাগুড়ি দেয় দুঃশাসনী চোখ
বৃশ্চিক প্রজাতির নবরূপ শরীর;
সাপের মতো বিষদাঁত, ভাঙতে হবে জানি আজ বিষধর দুঃশাসনীদের।
সময়ের জটাজাল তোমার ধলেশ্বরীর প্ররোচনা প্রলোভন চরে
মূল্যবোধের ঢেউ আজ ম্রিয়মাণ কামাতুর কুমিরের গ্রাসে
ধলেশ্বরীর জরায়ু ছিঁড়ে কামার্ত আলখাল্লায় ঢাকা শিশ্ন
কামাগ্নি ঝরা রক্ত আলোয় আসুক বংশগতির বিধানে
না-কি অন্ধকারে ফিরে যাবে তোমার ঝরনার ঢল…
দুর্বিনীত দুরাচার ভাসুক আজ ধলেশ্বরী জলে কামাসক্ত কালনেমিদের।
কোথাও যেন আজ নিরাপদ আশ্রয় নেই, এই ধলেশ্বরীর ধর্মালয়েও — না
আচানক জলে ফাল্গুনেও স্ফীতদেহা অনসূয়ে — আমার কুমারিকা নদী।
. . .
গৌতম খুঁজছি আমি
তরুণীর ভোরের শরীরের বাঁক থেকে চুঁইয়ে পড়ছে
ঝরনার অবিরল ধারার মতন কবিতার নির্যাস
নির্যাসজলে ধুয়ে নেয় দেহরা
তাদের অশুদ্ধ অজস্র গদ্যের পাঠ;
তরুণীর হাত ধরে পাঠ করে তরুণ কাব্যের পরিভাষ।
জল তার নর্দমা ধরে হেঁটে যায়
থেমে যায় পরীবিবির ঘাট ছুঁয়ে নেয় তরুণীর ঘাস
পরীর শরীর জঙ্ঘায় শুয়ে যেন জলে সুন্দরী মারমা
মারমা-চোখের আকাশে তখন মেঘেদের নির্যাস;
চুঁইয়ে পড়ে বৃষ্টির জলে নিয়ত মানুষের দুঃখবিলাস।
তুমি যেন কতকাল, পাহাড়ে শায়িতা মারমা আকাশ
হেলালের দয়িতা
শুদ্ধির যোনি
জাগ্রত বুদ্ধ
পারমিতা জানি;
গৌতম খুঁজছি আমি হেলালের গৌতমত্ব হত্যার জন্য।
. . .

নারী
জুম চাষে পাহাড়ে আগুনে কৃষির প্রথম পাঠে।
জুম পাঠ শেষ… নেমে এলো তারা বিস্তৃত মাঠে
কবর ছুঁয়ে গন্ধ মাখালো হাতে উর্বর মাটি
উপত্যকায় চাই বুঝি তবে লাঙল ও জোয়াল…
পার্বতী দেখালো শিবের নয়নে লাঙলের সত্তা
শুনো পতি — বৃক্ষের ডালে
দেখো ঝোলে, লাঙল ও জোয়ালের গতর
লাঙল জোয়াল হাতে
তুমি তবে হও আজ জমিনের কর্ষক…
গৌরী দেখালো পাহাড়ের ঝরনা
শেখালো জলসেচ ধারণা
মাঠে নিয়ে যায় উমা পতির জন্য দুপুরের অন্ন।
নারী
তোমাকে মানি, আদি কৃষি ও অর্থনীতির শিক্ষক
পুরুষ সে তো
তোমার টোলে প্রথম অর্থনীতি ও কৃষির পাঠক।
. . .
চাণক্যভ্যালি
ত্রিশ সহস্র সৈন্য নিয়ে, তক্ষশীলা নামি আমি; পাঠ করি
সিন্ধুর জলের অজস্র আস্ফালন
হাতে নিই পাটলীপুত্র, চাণক্য মাখি আমি বোধে
চাই না তো রমণীর অঙ্ক। চাই সাফল্য, চাণক্যের ভূমি…
এখনও আলেকজান্ডারেরা দাপিয়ে বেড়ায়
দেশ হতে দেশান্তর
এখনও চায় তারা কান্দাহার পারস্য ও মিশরভূমি
চায় বাংলার প্রান্তর
পোড়াতে চায় পাটলিপুত্র জলপাইপাতায় ঘেরা পরিপাটি
হিজল করচ আর আশশেওড়ায় নিবিড় বাড়ি…
ঝিলমের কূলে বিপন্ন
তক্ষশীলায় এখনও বুঝি হিজল করচ আশশেওড়ার নগর!
দুর্বল করো পর্বতবুক, এখনও এখানে
অজস্র সিংহনাদ
বাঁচাও নগর, হও তুমি গান্ধারের সুন্দরী তরুণী চর
এখনও যুদ্ধের আগুনে পুত্র পোড়ায় পিতার পরান
অম্ভি যেমন পুড়িয়েছে গান্ধাররাজ…
তক্ষশীলা ছাড়ো, বিষ্ণুগুপ্ত ফিরো পাটলিপুত্র তুমি।
আলেকজান্ডারের কব্জায় পুরু
তবুও চায় স্বাধীনতা, সার্বভৌম…
বিস্মিত মহান
বললেন—
সত্যি সেলুকাস! এখানে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে বুক উঁচিয়ে
শত্রুর চোখে চোখ রেখে
সার্বভৌম ও স্বাধীনতা চায় পুরু পাহাড়বুক এক পৌরুষ…
পুরুর সিনায় দেখলাম চাণক্য, নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি
যমুনার জল, পৌরুষ চায় — চায় বাংলার ম্যাকিয়াভেলি।
ধননন্দের মতন এখনও হাঁটে দাপটে অজস্র দুঃশাসন
আমাদের হলুদ সবুজ গালিচা-গাঁ
লাই সরিষা ধানের মাঠে;
চাই চন্দ্রগুপ্ত তোমাকে সজ্জন, চাই কৌটিল্যে আমি
সরাই নগরের অজস্র সেলুকস; সিরিয়া ভারতে
দেখি, হলুদ সবুজ আমাদের লাই সরিষা ধানের মাঠ…
নিলাম হাতে তোমার কাবুল, কান্দাহার ও বেলুচিস্তান
হলুদ সবুজ গালিচা-গাঁ লাই সরিষা ধানের মাঠ
নিলাম হেলেনের হাত সোনালি আঙুল চন্দ্রগুপ্তে আমি;
ধননন্দ, আজ… হায় সেলুকাস! হায় সেলুকাস — তুমি!!
চন্দ্রগুপ্ত সিনায় দেখলাম চাণক্য, নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি
সবুজ গালিচা-গাঁ পৌরুষ চায়, চায় বাংলার ম্যাকিয়াভেলি।
আজ হলুদ সবুজ গালিচা-গাঁ লাই সরিষা ধানের মাঠ
তোমার আঙুল সাংহাই শহর রোদ-জোছনায় নিখাদ হাত
পদ্মা
মেঘনা
যমুনা
সুরমা
চায় পৌরুষ, চায় জৌলুস, চায় বাংলায় — চাণক্যভ্যালি।
. . .

based on collected photography; @thirdlanespace.com
আমার খাড়ুবিল প্রান্তর
মাঝে মাঝে
বানভাসি হয় আমার শিশুমন, ভাসে আমার খাড়ুবিল প্রান্তর…
একদিন
আমির আলি ভাই ড্রাইভারের গাড়িতে… তামাবিল চেকপোস্ট
তখন উনিশশো একাত্তর সাল
তারপর ডাউকি হয়ে শিলং
বাবার মামার বাড়ি কাঠের দুতলা বাড়ি
পরদিন ভোরে শিলং ছেড়ে হাইলাকান্দি আমাদের দাদার বাড়ি
জানি, সকলেই যায় ছুটিকালে নানাবাড়ি
আমরাই কেবল গেলাম দাদাবাড়ি
সন্ধ্যায় প্রস্থান দাদির — দাদার মাঠ ছেড়ে
তখন উনিশশো একাত্তর সাল
আকাশে যুদ্ধের অজস্র চিলের ওড়াওড়ি
মনে পড়ে—
সেদিন, পিতার হাত ধরে চেরাপুঞ্জি হয়ে মেঘালয় পাড়ি দিয়েছিলাম।
শিলং হয়ে গৌহাটি ছুঁয়ে আসামের হাইলাকান্দি রতনপুর স্ট্রিট…
পৃথিবীর মাঠে মাঠে তখন নেমে এসেছিল গভীরতম এক অন্ধকার, এবং মনে হয়েছিল এর চেয়ে বেশ ছিল মায়ের জঠরে রাত্রির মঠ…
মাঝেমাঝে
বানভাসি হয় আমার শিশুমন, ভাসে আমার খাড়ুবিল প্রান্তর…
সেইখানে
এক পৃথিবী ছিল আলোর আড়ম্বরে
নকশিয়ার আকাশ, সুনসান পরিচ্ছন্ন আরও এক সবুজ আলোর মাঠ। সেখানে আশ্চর্য সব মানুষ ছিল। ছিল মোকাপুঞ্জির রিতন জয় কিংবা রিয়া খংস্থিয়া… জরিনা ডিখারদের পানের বরজের বন।
সেই দেশে নেতা নেই। প্রভু নেই। ঈশ্বরের আভিজাত্য নেই—
আছে শান্তির মতো বন্ধুর হাতে হাত ধরে পাড়ি দেওয়া বহুদূরপ্রান্তর। আমার খাড়ুবিল প্রান্তর…
০২
মাঝেমাঝে
বানভাসি হয় আমার শিশুমন, ভাসে আমার খাড়ুবিল প্রান্তর…
সেইখানে ঈশ্বর প্রভু নয়। মানুষ তাঁর দাস নয়। তারা সকলে ঈশ্বর। তারা সকলে দাস। তারা বন্ধুর মতো হাতে হাত ছুঁয়ে রয়।
সেইখানে বলবন নেই। শশাঙ্ক নেই। আয়াতুল্লাহ নেই। হিটলার, মুসোলিনি, আইখম্যান, ফেরাউন, ইবলিশ, বুশ, সাদ্দাম, শয়তান নেই… বুর্জুয়াদের ট্রেড-ইউনিয়ন নেই। সিন্ডিকেট নেই। হতাশার নিঃশ্বাস নেই। পুঁজিবাদী সংকট নেই।
অনেক শ্রমিক আছে সেখানে। মাঝি আছে। মাছোয়াল আছে। আছে কৃষান কৃষানি। পিয়ারীবুর ভাতভাড়া ঘ্রাণে ভরা হাত আছে। আছে নিম্নশ্রেণি, মধ্যশ্রেণি — নিবারণ, খ্রিতিশের গায়ে মাছের আঁশটে ঘ্রাণ — সেখানে অন্তবিহীন বাতাসে আমি উড়ে উড়ে মাখি জৈন্তিয়াহিল…
অজস্র নাম আমি বলতে পারি। পৃথিবীর চেনাজানা সব নাম। আমরা একে-অন্যে বহুদিন থেকে সুপরিচিত। এইসব নাম কুশ্রী নয়। গৃহহীন নয়। অলস আর দুর্বোধ নয় — তারা শ্রমের হাত ধরে দিনমান হাঁটে। তারা সকালে স্কুলে যায়। বিকেল বেলা বণিক হয়। তারপর সদাই হাতে ঘরে ফেরে সন্ধ্যায়। রাতে বই খুলে পড়ে। পাঁচপ্রহরের রাত আসে। ঘুম আসে। তারা বিছানায় যায়। পৃথিবীর পরিক্রমায় আবারও ভোর হয়। সকাল হয়। বিকেল হয়। সন্ধ্যা হয়। আবারও ঘুমোবার পাঁচপ্রহর আসে।
আজ জানি না — কোথায় গেলে আমি এখন তোমার খয়চোরা টেন্ডেরা পিছইন বুলবুলিগোটা পাই
অথবা
নদীর জলে পানিভাত। ঢোঁড়া সাপ ধরবার দুঃসাহস।
কেন্দ্রিবিলে ভেটফল। কানিনানির জাম্বুরা-ডেফল। আমার সেই পৃথিবী — তার নদী হাওর খাল জলাশয় জল।
. . .
লেখক পরিচয় : হেলাল চৌধুরী : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপ দিন
. . .

অবদায়ক : হেলাল চৌধুরী : থার্ড লেন স্পেস.কম
…কবিতা সিরিজ তোমার কটিমেখলায় আমি-১ পড়তে এখানে চাপুন…
হেলাল চৌধুরী-র অন্যান্য ও প্রাসঙ্গিক রচনা পাঠের জন্য এখানে চাপুন



