‘একাকীত্বের ক্যানভাসে’ ও অন্যান্য
মেকদাদ মেঘ-এর গুচ্ছ কবিতা

মায়ের পায়ের ছাপ
মায়ের চেয়ে কোন মহৎ প্রাণপুষ্প দেখি না
মা যেন অন্য কোনো শ্রেষ্ঠ গ্রহ মহাবিশ্বের সংসারে
আয়নার এপাশ-ওপাশে সর্বত্র স্থির তাঁর ছায়া,
যেন প্রাচীন পাণ্ডুলিপি পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় সৌরজগৎ
আঁচলের ঘ্রাণে হীরকখণ্ডের মতো লবণের কণা টুকরো টুকরো মেঘ, বহুরূপী প্রাণ প্রকৃতির বিনম্র কোলাহল।
যাকে ঘিরে পরাবাস্তব ঘড়ির কাঁটা উল্টো ঘুরে,
নক্ষত্ররও খসে পড়ে ভাতের থালায়,
কক্ষপথে ময়া-মহামায়ার মিছিল শুরু হয়
ভাতের ঘ্রাণে জাগে যেন জলস্থল অদিম অরণ্য,
যেন সমস্ত জীবকূল মাতৃবিশ্বের ঘূর্ণনে
এক জগতের একই জলাশয়ে তৃষ্ণা মেটায়।
মাকে পৃথিবী পেরিয়ে মহাবিশ্ব মহাকাশে দেখতে দেখতে ভাবতে ভাবতে নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে একাকীত্বের ক্যানভাসে নিরন্তর আঁকি,
শুধু মুখস্ত মুখ নয়, নির্দিষ্ট আঙ্গিকে-বাচিকে নয়
আঁকি শূন্যবিন্দু থেকে শুরু করে বাতাসে ভাসমান দীর্ঘশ্বাসে।
যদিও মায়ের পায়ের ছাপ লেগে আছে মাটি থেকে নক্ষত্রের সিঁড়ি স্পর্শ করে
দূরবর্তী স্থানে অদৃশ্য স্থাপত্যে,
তোমার অস্তিত্ব আমাদের অস্তিত্বের ভেতর,
প্রাণবন্ত রাখে কম্পমান স্বপ্নশরীরের গ্রহের ভ্রমণ।
মাকে দুঃখে দুঃখী হতে দেখি নি
. . .
মাকে অনেক দুঃখের পাহাড় ঠেলতে দেখেছি
কষ্টে পুড়তে পুড়তে কখনো দুঃখ করতে দেখি নি,
রোদ-বৃষ্টির কফিন থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পায়রার দল বেরোতে দেখেছি মায়ের আঁচল থেকে
যেন মায়ের আঁচল অন্য মহাকাশ নক্ষত্রনন্দন
হতাশার স্রোতে ভাসতে তাকে খুব একটা দেখি নি।
মা যেন নক্ষত্রের নকশা তোলেন নকশিকাঁথায়
কথার ভূগোলে খেলা করেন গ্রহ ও গ্রহাণু নিয়ে
রান্নাঘর থেকে ব্ল্যাকহোলের দূরত্বের মতো
দেখেছি তাঁর আঙুলে পোড়াদাগ থেকেও নেই।
তাঁর চোখ দুটো যেন প্রাচীন মানচিত্র দুইটি গ্রহের,
যেখানে কান্নার বদলে আগন্তুক গ্রহের জলধারা
মাকে সেই জলের আয়নায় দেখেছি নিভৃতে একা।
মা যখন হাসেন, তখন ঝরে রঙিন বরফকুচি, দুঃখের পারদ বিন্দুও ঝরে তবু তিনি দুঃখী না
দুঃখ খুঁজতে গিয়ে দেখি তাঁর হৃদপিণ্ড মহাকর্ষ অভিকর্ষে আংশিক ভাঙা কম্পমান গ্রহ, সেখানে জলমাটিঅগ্নির ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় বাজে বাতাসের বাঁশি।
মা আশ্চর্য জীবনশক্তি নিয়ে দু:খ-শোকের ঋতুকে
ডালিমদানার মতো রোদে শুকোতে দেন। আলোকের দিব্যযানে অন্ধকারকে বাঘের থাবার মতো নিয়ে নিজের ছায়ার চাদর বানিয়ে জেগে থাকেন।
ছায়ার ভেতরের ছায়া হাঁটে সেই চাদরের নিচে কোনো দীর্ঘশ্বাস ছাড়া, ছায়াগুলোর সঙ্গে হাঁটে কয়েক কোটি বছরের পুরনো স্মৃতি বিস্মৃতির ছায়া।
মায়ের আঁচলখোলা নক্ষত্রের মাঠে সন্তান
চিরদিনই শিশু! যেন সর্বদা মায়ের আয়নামহলে
দুঃখের পাথর হয়ে দেবদূত হাসে
জগতের ব্যাকরণ পেরিয়ে মা যখন একটু হাসেন,
তখন পৃথিবী হাসে শূন্যে থাকা মহাশূন্যের হাসি
যেন অদৃশ্য মাছরাঙা গিলে খায় কঠিন বিষাদ।
তোমাকে দেখলেই রোদ ওঠে বৃষ্টি নামে
. . .
সৌরসংসারে নাগরিক আল্পনায়
তোমাকে দেখলে হেসে ওঠে সমস্ত নগর
মৌলিক ময়ূরনৃত্য করে একান্ত ভুবনে ক্যাফেটেরিয়ায় তোমার ছায়া হয়ে ওঠে গাছ যার পাতায় হাসি-কান্না জীবনমুদ্রার নৃত্য দেখি
তোমার আঙুল যেন নীল অপটিক্যাল ইল্যুশন
তোমার হাতের তালুতে মহাজাগতিক মানচিত্র
তোমার হাসিতে পাখি উড়ে ক্যাকটাস ফোটে,
বাতাসে হুইসেল বাজিয়ে জ্বলে ট্রাফিক সিগন্যাল। তোমার চোখে যেন আটকা পড়া জং ধরা জাহাজ — যার মাস্তুলে ঝুলে আছে রোদ্দুর,
সূর্যের সমান্তরালে দাঁড়িয়েও তোমার ছায়া যেন জলপ্রপাত, বিমূর্ত সুরের ভাঙন, চারপাশের ধূলো-বালি ধোঁয়াগুলো জ্যামিতিক নকশায় বদলে যায়, হেসে ফেলি রোদ বৃষ্টির ব্যাকরণহীন সহাবস্থান দেখে — যেন পরাবাস্তব ক্যানভাসে তোমার আমার সহবাস তোমার আমার বসবাস। চিনে নেই তোমার ঠোঁটের কোণে রামধনু, নক্ষত্রের তিল, উন্মুক্ত জমিন
আসমানের সংযোগসূত্র যেখানে রৌদ্রমেঘে বৃষ্টির সজীব কবিতা হাসে।
তোমাকে দেখলে খুব ব্যথিত ক্যালেন্ডার থেকে খসে পড়ে তারিখ,সময় হয়ে ওঠে নিরন্তর গোলকধাঁধা — তোমাকে দেখলেই রোদ ওঠে, বৃষ্টি নামে অশ্রু হয় ঝর্ণাপ্রপাত জলের হরফে হীরকচূর্ণ।
তোমাকে দেখলেই রোদ ওঠে বৃষ্টি নামে তোমার চোখের পাতায় ঘুমন্ত জ্যামিতিক নকশা ভাসে
বৃষ্টির মিছিলে তোমার ছায়া দীর্ঘ হতে থাকে—
যেন ছায়া নয়, প্রাচীন মহাকাব্যের অংশবিশেষ। তোমাকে দেখলে ভারসাম্য বদলে যায়, নক্ষত্রের ভিড়ে হেঁটে আসে জলপাই রঙের গোলক উড়ন্ত মেঘের দল। তোমার আঙুল স্পর্শে যেন মহাকর্ষ বল ভুলে পাথরখণ্ডগুলোও উপরে ভাসতে থাকে, অদ্ভুত বৃক্ষের সারি হেঁটে যায় উর্ধ্বলোকে দাউদাউ করে জ্বলে বরফবাগান পৃথক পাহাড়। তোমার হাসিতে জন্ম নেয় গ্রহাণুকণার হাসি, দিগন্তের ওপারে পুরোনো নক্ষত্রও ফিরে পায় সুর।
পরম শূন্যের খেলায়
রোদ-বৃষ্টির সন্ধি হয় যেন তোমার নাভিমূলে
মন ডুবে যায় কাগজের নৌকার মতোন
মন ডুবে যায় কাগজের নৌকার মতো,
দেহের কোষ নৃত্য করে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো তোমার পায়ের নিচে জেগে ওঠে প্রেমের আগুনমাখা চিরসবুজ ডাঙা, নক্ষত্র লাফায় উঠোনে তোমাকে দেখলে রোদ ওঠে বৃষ্টি ফোটে জলপুষ্পের মতো
কখনও সময় স্তব্ধ হয় বাস্তবতায়, আয়নামহলের স্মৃতি-বিস্মৃতি নিয়ে পৃথিবীর করুণ ডাঙায়, পৃথিবীর করুণ ডাঙায় ।
. . .

আলোর ফড়িং
ঘাসফুলগুলো শিশিরবিন্দু মেখে মাথা দোলায়
ঘাসফুলের জন্য মায়া লাগে
অথচ তোমার হৃদয়ে তেমন দয়া মায়া টের পাচ্ছি না
আলোক তরঙ্গে উড়ে যায় আলোর ফড়িং
. . .
গঙ্গাজল
গঙ্গার জল সেতো জলের প্রতীক
মানুষের সুখ শান্তি ক্লান্তি মুছে দিতে
সকল নদীর মতোই বইছে অহর্নিশ
আরব সাগরে নিমজ্জিত দুঃখ ক্ষণিক
. . .
শূন্যতার কোনো অনুবাদ হয় না
শূন্যতার অনুবাদ কতটুকু হয় বলো
বুকের ভেতরে অন্তহীন ক্যানভাস,
গহিন সাঁতারে পাতালে যাই চলো
রঙের উৎসব ফেলে নিরুৎসবের শ্বাস।
চারিদিকে দেখি মানুষের কোলাহল—
তবু বাতাসে দুলছে একাকীত্বেরই ঘাস।
ক্লান্তি নেমেছে নাগরিক জঞ্জালে,
কেবলই বন্দি পাত্র অপাত্রের জালে।
কলঙ্ক সে তো সুতীব্র এক প্রতীক,
ভুলের সাগরে মানুষ হারায় দিক।
. . .
চাঁদসংবাদ
ভেঙে যায় কত বাঁধ
দেখি বহুমাত্রিক একাকীত্বের ফাঁদ,
যেখানে প্রতিবিম্বিত নীলাভ যান্ত্রিক বিষাদের চাঁদ
মূলত মানুষই ছড়ায়, গোপন সংবাদ।
. . .

লেখক পরিচয় মেকদাদ মেঘ : এখানে অথবা ওপরে ছবিতে চাপুন
. . .

থার্ড লেন স্পেস অবদায়ক মেকদাদ মেঘ-এর অন্যান্য রচনা পাঠের জন্য এখানে চাপুন


