দেখা-শোনা-পাঠ - পোস্ট শোকেস

‘গভীর নীরবতা’য় টেড চিয়াংয়ের ‘অ্যারাইভ্যাল’

Reading time 8 minute
5
(17)

. . .
ফার্মি প্যারাডক্সকে কখনো কখনো ‘গভীর নীরবতা’ও বলা হয়। মহাবিশ্ব তো হওয়ার কথা ছিল অসংখ্য কণ্ঠের এক কোলাহল—কিন্তু বাস্তবে তা অস্বস্তিকরভাবে নীরব।

কিছু মানুষ মনে করেন, বুদ্ধিমান প্রজাতিগুলো মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ার আগেই বিলুপ্ত হয়ে যায়। যদি তারা ঠিক হয়ে থাকেন—তাহলে রাতের আকাশের এই নীরবতা আসলে এক বিশাল কবরস্থানের নীরবতা।

কয়েক শতাব্দী আগে, আমাদের প্রজাতি এতই বিপুল ছিল যে রিও আবাহো অরণ্য (Rio Abajo forest—পুয়ের্তো রিকোর একটি সংরক্ষিত বন) আমাদের কণ্ঠে মুখর থাকত। এখন আমরা প্রায় হারিয়ে গেছি। শীঘ্রই হয়তো এই অরণ্যও হয়ে উঠবে মহাবিশ্বের বাকি অংশের মতোই নীরব।

. . .
একটি আফ্রিকান ধূসর তোতা ছিল—নাম অ্যালেক্স। তার বুদ্ধিমত্তার জন্য সে বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল—অবশ্য মানুষের মধ্যেই।

আইরিন পেপারবার্গ নামের এক মানব-গবেষক ত্রিশ বছর ধরে অ্যালেক্সকে নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তিনি দেখেন—অ্যালেক্স শুধু আকার আর রঙের নাম জানত না, সে আসলে ‘আকার’ আর ‘রং’ ধারণাটাই বুঝত।

অনেক বিজ্ঞানী বিশ্বাস করতে চাননি—একটা পাখি বিমূর্ত ধারণা বুঝতে পারে। মানুষ নিজেদের অনন্য ভাবতে ভালোবাসে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেপারবার্গ তাদের বোঝাতে সক্ষম হন—অ্যালেক্স কেবল শব্দ আওড়াচ্ছে না, সে যা বলছে—তা বুঝেই বলছে।

আমাদের প্রজাতির মধ্যে অ্যালেক্সই ছিল সেই একজন, যে মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি ‘যোগাযোগের অংশীদার’ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল।

অ্যালেক্স হঠাৎ করেই মারা যায়—তখনও সে তুলনামূলকভাবে তরুণ। মৃত্যুর আগের সন্ধ্যায় অ্যালেক্স পেপারবার্গকে বলেছিল—‘তুমি ভালো থেকো। আমি তোমাকে ভালোবাসি।’

মানুষ যদি সত্যিই অমানব কোনো বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সংযোগ খুঁজে থাকে, তাহলে এর চেয়ে বেশি আর কী-ই বা তারা চাইতে পারে?

. . .
হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছিল একটি শব্দ থেকে—‘ওম’। এমন একটি অক্ষর, যার ভেতরে নিহিত আছে যা কিছু ছিল এবং যা কিছু হবে।

যখন অ্যারেসিবো টেলিস্কোপ তার দৃষ্টি তারাদের মাঝের ফাঁকা জায়গায় স্থির করে, তখন সে এক ক্ষীণ গুঞ্জন শুনতে পায়।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একে বলেন—কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড। এটি বিগ ব্যাংয়ের অবশিষ্ট বিকিরণ—যে বিস্ফোরণ প্রায় চৌদ্দ বিলিয়ন বছর আগে মহাবিশ্বের জন্ম দিয়েছিল

কিন্তু এটাকে এভাবেও ভাবা যায়—সেই প্রাথমিক ‘ওম’-এর এক ক্ষীণ প্রতিধ্বনি হিসেবে। এমন এক অনুরণন, যা এত গভীর ছিল যে মহাবিশ্ব যতদিন থাকবে, রাতের আকাশ ততদিন কেঁপে কেঁপে উঠবে তার তরঙ্গে।

অ্যারেসিবো যখন আর কিছু শোনে না, তখন সে শুনতে পায়—সৃষ্টির কণ্ঠ।

. . .
আমাদের, পুয়ের্তো রিকোর তোতাদেরও নিজস্ব কিছু পুরাণ আছে। মানুষের পুরাণের মতো জটিল নয়, কিন্তু আমার মনে হয়—মানুষ সেগুলো শুনলে আনন্দ পেত।

দুঃখের বিষয়, আমাদের প্রজাতি বিলুপ্তির পথে—আর তার সঙ্গে আমাদের পুরাণগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ আমাদের ভাষা বুঝে উঠতে পারবে—এর আগেই আমরা হয়তো হারিয়ে যাব।

তাই আমাদের বিলুপ্তি মানে শুধু কয়েকটা পাখির হারিয়ে যাওয়া নয়—এর মানে আমাদের ভাষার অন্তর্ধান, আমাদের আচার, আমাদের ঐতিহ্য—সবকিছুর অবসান। এটা আমাদের কণ্ঠের স্তব্ধ হয়ে যাওয়া।

. . .
মানুষের কর্মকাণ্ড আমাদের এই প্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে—তবুও আমি তাদের দোষ দিই না। তারা এটা ইচ্ছা করে করেনি। তারা কেবল মনোযোগ দেয়নি।

আর মানুষ যে কত সুন্দর পুরাণ তৈরি করতে পারে—তাদের কল্পনা কত বিশাল! হয়তো সে কারণেই তাদের আকাঙ্ক্ষাও এত বিস্তৃত। অ্যারেসিবোর দিকে তাকাও—যে প্রজাতি এমন কিছু নির্মাণ করতে পারে, তার ভেতরে নিশ্চয়ই এক ধরনের মহত্ত্ব আছে।

আমাদের প্রজাতি হয়তো আর বেশি দিন টিকবে না—সম্ভবত আমরা সময়ের আগেই বিলীন হয়ে যাব, যোগ দেব সেই ‘মহা নীরবতা’য়। কিন্তু যাওয়ার আগে—আমরা মানুষের উদ্দেশে একটি বার্তা পাঠাচ্ছি। আমরা শুধু আশা করি—অ্যারেসিবোর সেই দূরবীক্ষণ তাদের তা শুনতে সাহায্য করবে।

বার্তাটি হলো—তুমি ভালো থেকো। আমি তোমাকে ভালোবাসি।

. . .
গভীর নীরবতা : টেড চিয়াং
ভাষান্তর : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
উৎস : আহমদ সায়েম সঞ্চালিত অনলাইন মুখপত্র
‘রাশপ্রিন্ট’
. . .

Ted Chiang; Image Source & Credit: Kate Joyce for SFI

রাশপ্রিন্ট-এ টেড চিয়াংয়ের ‘গভীর নীরবতা’ গল্পটি ভূমিকা-সহ পাঠ করলাম জাভেদ। ফার্মি প্যারাডক্সের ওপর নির্ভর করে ভিনগ্রহীদের নিয়ে কল্পবিজ্ঞান লেখার ধারায় চিয়াংয়ের গল্পভাবনা ব্যতিক্রম ও মানবিক। হায় খোদা! ডেনিস ভিলেনিউভ তাঁর অ্যারাইভ্যাল চলচ্চিত্রের ভাববীজ চিয়াংয়ের গল্প থেকে নিয়েছেন…! ছবিটি দেখার সময় তা একদম নোটিশ করিনি!

সরকার আশরাফের নিসর্গ ছোটকাগজে চলচ্চিত্র বিষয়ক একটি গদ্য লিখতে হয়েছিল বছর তিন আগে। নানান ধারার ছবির পাশাপাশি কল্পবিজ্ঞান নির্ভর ছবির প্রসঙ্গও লেখায় টানতে হচ্ছিল। তো সেই জগতে চটজলদি একপাক ঘুরে আসার ঠেকা থেকে যেসব ছবি বেছে নিতে হয়েছিল,—অ্যারাইভ্যাল তার মধ্যে অন্যতম বটে!

ব্যক্তিগত বিবেচনায় আমাদের যাপনকালে মুক্তি পাওয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছবি এটি। মেকিং মনে ধরেছিল। ‘গভীর নীরবতা’ গল্পের কাব্যিক বয়ানে টেড চিয়াং যে-বার্তা দিতে চাইছেন, তার সম্প্রসারণ আপনি পাবেন Story of Your Life থেকে নেওয়া এই ছবির প্রতি পরতে। গল্পের ভাববীজ ধরিয়ে দিতে ভূমিকায় আপনি লিখেছেন, রাশপ্রিন্ট থেকে আমি উদ্ধৃত করছি…

The Great Silence—ফার্মি প্যারাডক্সের এই ধারণার ভেতরেই এক ধরনের দ্বন্দ্ব কাজ করে : আমরা হয়তো একা নই—এটাই স্বাভাবিক মনে হয়; অথচ এত অনুসন্ধানের পরও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এই প্রশ্নের সঙ্গেই চিয়াং আরও একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন যোগ করেন আমরা কেন আকাশের তারায় বুদ্ধিমত্তার সন্ধানে এত আগ্রহী, অথচ পৃথিবীতেই যে অসংখ্য প্রজাতির মধ্যে সেই বুদ্ধিমত্তা বিভিন্নভাবে প্রকাশ পায়, তাদের কণ্ঠস্বরের প্রতি এত বধির? আর কেন আমরা এমন একটি শর্ত তৈরি করেছি, যেখানে কোনো অমানব প্রাণীকে বুদ্ধিমান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে কেবল তখনই, যখন সে মানুষের ভাষায় আমাদের সঙ্গে কথা বলতে পারবে—আর তারপর, যখন কিছু প্রাণী সত্যিই তা করতে সক্ষম হয়, তখন আমরা তাদেরই উপেক্ষা করি?

গল্পের নির্যাস চেনানোর জন্য যে-কথাগুলো আপনি বলেছেন এখানে, টেড চিয়াংয়ের ভাবনার ধরন বুঝতে তা সহায়ক। অ্যারাইভ্যাল যদি দেখে থাকেন, তাহলে আপনার বলা কথার প্রতিধ্বনি পাবেন বৈকি। ডেনিস ভিলেনিউভ সিনেপর্দায় সেটি ভালো তুলে ধরেছিলেন।

ছবিটি দেখার পর মূল গল্পটি পড়া আমার উচিত ছিল। অন্তত খোঁজ নেওয়া-যে, এর চিত্রনাট্য বা অ্যাডাপ্টেশন কার থেকে নিয়েছেন নির্মাতা। ছবি দেখার ঘোর ও উত্তেজনা মিলে তা আর হয়ে ওঠেনি। একটি চলচ্চিত্রের সাহিত্যিক উৎস… ভীষণ পরিচিত বা পঠিত না-হলে আমরা সচরাচর খেয়াল করি না। অভ্যাসটি ভালো কিছু নয়, তা আগেভাগে কবুল করছি অকপট।

যাইহোক, ভিনগ্রহে বুদ্ধিমান প্রাণীর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া নিয়ে এনরিকো ফার্মির কূটাভাস আমরা সমানে চর্চা করে আসছি। ফার্মি তো এই সরল জিজ্ঞাসা সামনে এনেছিলেন গণিতের ছকে :

মহাবিশ্ব যদি বিলিয়ন বিলিয়ন বছরের ফসল হয়, সেক্ষেত্রে আলোর সামান্যতম কাছাকাছি সময়ে যদি যাওয়া যায়, তাহলে কয়েক বিলিয়ন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীর পুরো মহাবিশ্বে যত গ্যালাক্সি আছে, তার সবগুলো ভ্রমণ বা সেখানে পৌঁছে যাওয়ার কথা! তাহলে কেন আমরা কোনো সংকেত পাচ্ছি না?

এইটা হলো ফার্মি কূটাভাসের বেসিক; এবং সেখানে (তাৎক্ষণিক গুগল করলেও পাবেন বা রেফারেন্সের ইয়ত্তা নেই অনলাইনে) দ্য গ্রেট ফিল্টার নামে একটি অংশ আছে বটে। ফার্মি কূটাভাসের সম্প্রসারণ বলে একে ধরা নিতে পারি। সেখানে আমরা এই ধারণাটি পাচ্ছি :

মহাবিশ্বে কোনো প্রজাতি যদি অতি উন্নত সভ্যতার জনক হয়, তাহলে এমনসব প্রযুক্তি সে তৈরি করতে সক্ষম, যেগুলো দিয়ে নিজেকে ধ্বংস করা ব্যাপার থাকছে না।

বিজ্ঞানীরা একে ওই প্রজাতির তৈরি ‘আত্মধ্বংসী প্রযুক্তি-ফাঁদ’ ভাবতে পছন্দ করেন। সুতরাং, কোনো একটি গ্যালাক্সিতে যদি বুদ্ধিমান প্রাণের অস্তিত্ব থেকেও থাকে, তারা হয়তো এরকম অতি উন্নত আত্মধ্বংসী প্রযুক্তির কারণে নিজেকে ধ্বংস করে বসে আছে ইতোমধ্যে। মানব প্রজাতি এরকম একটি ধাপে কি নেই এখন? পারমাণবিক সক্ষমতা সে অর্জন করেছে। একে দিয়ে নিজেকে ধ্বংস করা সম্ভব। এআই প্রযুক্তিও নতুন সম্ভাবনার সঙ্গে বিপজ্জনক ধ্বংসের কারণ হতে পারে সামনে।

এসব কারণে ফার্মি কূটাভাস ভিনগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব সন্ধানের আগে আমাদের নিজের দিকে তাকাতে বলে। নিজেকে যদি আমরা বিবেচনায় নেই, তাহলে অতি উন্নত বুদ্ধিমান প্রজাতির অস্তিত্ব খুঁজে না পাওয়ার একটি কিনারা হয়।

আপনার ভাষান্তরিত গল্প ও ডেনিস ভিলেনিউভের অ্যারাইভ্যাল ছবির কাহিনিতে ফার্মি কূটাভাসের এই জায়গাটিকে টেড চিয়াং ধরেছেন তীব্রভাবে। দেখিয়েছেন, ভিনগ্রহীকে ডিল করার প্রশ্নে মানুষ মোটেও বিবেচক নয়। একে সে আগে থেকে নিজের প্রতিপক্ষ ধরে নেয় ও সেভাবে তাকে মোকাবিলা করতে চায়। ভিনগ্রহী যদি থাকেও, সে হতে পারে মানুষের মিত্র… এই ভাবনা মানুষ গোড়ায় ভাবে না। তার মনে জাগে আক্রমণের আশঙ্কা। ভিনগ্রহীকে তার নিজের ভাষা ও মাপে গড় করে ও সেভাবে তাকে বুঝে উঠতে মরিয়া হয়। এর ফলে সংযোগ গড়ায় সংঘাতে।

সায়েন্স ফিকশনগুলো কিন্তু এই সংঘাতের সম্ভাবনাকে রংচং দিয়ে বেশিরভাগ সময় লেখেন সবাই। ছবিও বনে সেই ছক মেনে। ব্যতিক্রম আমরা দেখছি বিগত দুই-তিন দশকে তৈরি একগুচ্ছ ছবিতে। নিসর্গ ছোটকাগজে এরকম ছবিগুলো নিয়েই লিখেছিলাম। সেখান থেকে অ্যারাইভ্যাল-র অংশটুকু কেবল উদ্ধৃত করছি। তার আগে বলে নেই, গভীর নীরবতা গল্পটি চিয়াংয়ের কাব্যিক সংহতিকে চিনিয়ে দিচ্ছে; আর ভাষান্তরটিও পড়তে বেশ লেগেছে।

The Fermi Paradox: Sci-Fi Shortfilm; Source: Steve the Filmmaker YTC

. . .
কল্পবিজ্ঞান ঘরানায় মানুষ ও ভিনগ্রহী প্রাণের আন্তঃরসায়ন চোখে পড়ে এরকম অগুন্তি ছবির মধ্যে রবার্ট জেমেকিসের কন্ট্যাক্ট-র নাম আলাদা করে নিতে হয়। রিডলি স্কটের এলিয়েন, স্পিলবার্গের ক্লোজ এ্যানকাউন্টার অফ দ্য থার্ড কাইন্ডই.টি, নিল ব্লমক্যাম্পের ডিস্ট্রিক্ট নাইন অথবা একদম সাম্প্রতিক ডেনিস ভিলেনিউভের মাস্টারপিস অ্যারাইভ্যাল এই ঘরানার সিনেমায় আবেদন রাখে সন্দেহ নেই। যদিও, ছবিগুলোর কোনোটাই অন্য গ্রহের প্রাণীর সঙ্গে মানব-সংযোগের গল্প জুড়তে বসে জেমেকিসের কন্ট্যাক্ট-র মতো বিচিত্র প্রসঙ্গকে ছুঁয়ে যায়নি।

মনে রাখা প্রয়োজন পদার্থবিদ কার্ল সাগান নেপথ্য কুশীলব হিসেবে এই ছবিতে অবদান রেখেছিলেন। ছবির গল্পভাবনা ও অনুষঙ্গে তাঁর সম্পৃক্তি কন্ট্যাক্টকে ভিন্নমাত্রা দান করেছিল। ছবির উপসংহার যে-কারণে দর্শককে ভাবায়।

মহাবিশ্বে নিজেকে নিঃসঙ্গ ভাবার আপাত বৈজ্ঞানিক বিঘোষণা কার্ল সাগানকে কখনো বিশেষ আলোড়িত করেনি। মহাজাগতিক নিঃসঙ্গতার তাৎপর্য উপলব্ধিতে নিছক বিজ্ঞানে সীমাবদ্ধ না থেকে আধ্যাত্মিক সংবেদনের এলাকাগুলো তিনি প্রায়শ চষে বেড়িয়েছেন। মহাবিশ্বে প্রাণের স্পন্দন ও বিকাশকে বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ছকে ফেলে বিচার করলেও মরমি ভাবধারায় মর্মরিত সৌন্দর্য উপলব্ধির ক্ষমতা তাঁর ছিল। আপাত কিনারাবিহীন মহাবিশ্বের কোনো এক পরিধিতে ধরিত্রীর মতো পরিবেশ থাকতে পারে। অস্তিত্বের প্রাণবন্ত স্রোত একইসঙ্গে এখানে, এবং অন্যত্রও হয়তো বইছে।

ভিনগ্রহী প্রাণের সঙ্গে মানব-সংযোগ কোনো একদিন অনিবার্য হলে মানুষ এই সংযোগকে কীভাবে নিচ্ছে, সেটি তখন গুরুতর চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। কন্ট্যাক্ট-র সিনেবয়ানে সাগানের এসব ভাবনাকে রবার্ট জেমেকিস পর্দায় প্রাসঙ্গিক করেছিলেন। ডেনিস ভিলেনিউভ সম্প্রতি তাঁর অ্যারাইভ্যাল-র সিনেবয়ানে প্রসঙ্গটিকে আরো বৃহৎ পরিসরে ভাষা দিয়েছেন। সংক্ষেপে আমরা তা অনুসরণ করতে পারি এখানে :

টেড চিয়াংয়ের Story of Your Life থেকে নির্মিত অ্যারাইভ্যাল চলচ্চিত্রের কাহিনি সংক্ষেপ :

অজানা গ্রহ থেকে নভোযানে করে পৃথিবীর ষোলটি প্রান্তে অন্য গ্রহের প্রাণীরা অবতরণ করে। ধরিত্রীর বুকে তাদের আকস্মিক অবতরণের কারণ বুঝতে না পেরে বিশ্বের রাষ্ট্রসংঘ ভয়, আতংক আর আত্মরক্ষায় মরিয়া হয়। আপদগুলোকে পৃথিবীর মাটি থেকে বিতাড়নের ভাবনা একে অন্যের সঙ্গে একশো বাহানায় বিবাদে লিপ্ত রাষ্ট্রসংঘের হর্তাকর্তাদের মগজে অটল হয়ে চেপে বসে। সমরাস্ত্রের মহড়া শুরু করতে তারা দেরি করে না।

মার্কিন পরাশক্তি এখন যাকে নিজের প্রতিপক্ষ বা শত্রু ঠাউরায় সেই চীন ভিনগ্রহী নভোযানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পাঁয়তারা শুরু করে। পদার্থবিদ ইয়ান ডোনেলি ও ভাষাবিদ ড. লুইস ব্যাঙ্কসের সংযুক্তি না ঘটলে লড়াই ঠেকানো কঠিন হতো। নভোযান থেকে বেরিয়ে আসার ইচ্ছা পৃথিবীর ষোলটি প্রান্তে অবতীর্ণ ভিনগ্রহীদের মাঝে পরিলক্ষিত হয় না। মানবস্থাপনায় আঘাত হানা অথবা যুদ্ধবিগ্রহের সংকেত প্রেরণেও তারা বিরত থাকে। তাদের উদ্দেশ্য ধরতে না পেরে অনিশ্চয় আতঙ্কে রাষ্ট্রসংঘ যুদ্ধের তোড়জোর শুরু করে।

পৃথিবীর মাটি থেকে নির্দিষ্ট উচ্চতায় ক্যাপসুল আকৃতির নভোযানগুলো ওদিকে ঠাঁয় দাঁড়িয়েই থাকে। মাটি স্পর্শ না করে দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যে ইঙ্গিতটি হয়তো ভাষা পায় যে,—অন্য গ্রহের প্রাণীদের সঙ্গে মানবজাতির আন্তঃসংযোগে দূরত্ব ও ভুল বোঝাবুঝির নিরসন আজো ঘটেনি।

কাচের পর্দায় মুদ্রিত ভাষাচিহ্ন বা সাইন ল্যাঙ্গুয়েজের অর্থ উদ্ধারে পটু ভাষাবিদ ড. ব্যাঙ্কসের কল্যাণে সারসত্য সকলে জানতে পায়,—বিগত তিন হাজার বছর ধরে পৃথিবীবাসীর সঙ্গে মৈত্রী স্থাপনের চেষ্টায় তারা প্রাণপাত করে যাচ্ছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে ঢের অগ্রসর হলেও মৈত্রীর যে-বাণী তারা পৃথিবীতে বহন করে নিয়ে এসেছে, মানুষ তাকে আজো পড়তে পারেনি। অতীতে না পারলেও এখন পারবে এই আশায় বুক বেঁধে পুনরায় তারা ধরায় অবতরণ করেছে।

মানুষের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপনের কারণ নিয়ে ভাবনার দায়িত্ব পরিচালক দর্শকের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। শক্তির ভূতুড়ে স্রোত মহাবিশ্বের সর্বত্র বইছে। ছবির ঘটনাপ্রবাহ থেকে মনে তাই প্রশ্ন জাগে :

অনন্ত শক্তিস্রোতে নিজেকে নিঃসঙ্গ ভাবার যন্ত্রণা থেকে মুক্তির খোঁজে বেরিয়ে কি তারা পৃথিবীর দেখা পায়? পৃথিবীবাসীর সঙ্গে মৈত্রী স্থাপনকে নিঃসঙ্গতা ঘোঁচানোর হাতিয়ার করতে এখানে অবতরণ করে? পরিচালক মুখ না খুললেও এমতো অনুমান ছাড়া পৃথিবীর মাটিতে তাদের আগমনের কার্যকারণ মিলানো দুরূহই থাকে শেষপর্যন্ত।

The real reason aliens came to earth; Arrival Movie Clip by Denis Villeneuve; Source: Boxoffice Movie Scenes YTC

অ্যারাইভ্যাল-র ভিনগ্রহীরা আবার প্রিমোনিশন বা ব্যক্তির জীবনে ভবিষ্যতে কী ঘটবে সেই জ্ঞান রাখে। ড. ব্যাঙ্কসের জীবনে আগামীতে কী-কী ঘটতে চলেছে সে-সম্পর্কে নিজ গন্তব্যে ফেরত যাওয়ার আগে তাকে তারা ইশারা দিয়ে যায়। ব্যাঙ্কসের মস্তিষ্কে আভাসগুলো স্রোতের মতো তরঙ্গ বহায়। অদূর ভবিষ্যতে পদার্থবিদ ডোনেলির সঙ্গে সে গাঁটছাড়া বাঁধবে। দুজনের কোল আলো করে কন্যাসন্তান জন্ম নেবে, তবে তাকে তারা বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না। দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগে মেয়েটি মারা যাবে। ভবিষ্যতের গর্ভে ঘুমন্ত সত্যগুলো বর্তমানে বিচরণের ক্ষণে তাকে হজম করতে হয়। সন্তান হারানোর দুঃখ ব্যাঙ্কসকে শোকাতুর ও শোকজয়ী হওয়ার সুকঠিন লড়াইয়ে নিক্ষেপ করে। আশু পরিণতির সঙ্গে লড়াইয়ের মানসিক চাপ সামলে অস্তিত্বের নাটকে সে তার দায় মিটায়।

অন্য গ্রহের আগন্তুকরা নিদান হাঁকে, কন্যাসন্তান হারানোর কথা জানা থাকা সত্ত্বেও সত্যটি গোপন করায় ডোনেলির সঙ্গে নিজের বিচ্ছেদ ব্যাঙ্কস চাইলেও ঠেকাতে পারবে না। ডোনেলি যে-পরিতাপ সইবে তার অবসান বিচ্ছেদ ছাড়া সম্ভব নয়। বর্তমানের গর্ভে বসে ভবিষ্যৎ নিয়তির চাপ বহন সত্যি দুরূহ! ইদিপাস পারেনি। ব্যাঙ্কস কতটা কী পারবে তার আগাম অনুমান ছবিতে পরিচালক এড়িয়ে গিয়েছেন।

নিজের ভবিষ্যৎ পরিণাম জেনে যাওয়ায় একে এড়ানোর সুযোগ অবশ্য ড. ব্যাঙ্কসের ছিল। ডোনেলিকে বিয়ে না করলে সব ল্যাঠা চুকে যায়, তথাপি এই পথ সে মাড়ায়নি। কেন মাড়ায়নি তার উত্তরে পরিচালক মৌন থাকায় অনুমানের দায় দর্শকের ঘাড়ে চাপে।

ড. ব্যঙ্কস হয়তো ভাবে, অবচয়-অবক্ষয়ে অস্তিত্বের অন্ত যেহেতু অনিবার্য এখন তার গতিপথ পাল্টে দিয়ে কি লাভ! মানুষের জীবন মহাবিশ্বের শক্তিস্রোতে তলাবে। এই উপলব্ধি নিজের আশু পরিণাম মেনে নিতে তাকে সুস্থির রাখে। ডোনেলির সঙ্গে গাঁটছাড়া বাঁধতে আর দ্বিধা করে না। ভবিষ্যৎ পরিণাম জেনে ফেলার চাপ সামাল দিতে নিয়তিসহিষ্ণু নারীর ভূমিকায় নিজেকে অটল রাখে ব্যাঙ্কস।

অন্য গ্রহ থেকে আগত প্রাণের কল্পবিজ্ঞানে মানুষ এখনো তাকে শত্রু বা প্রতিপক্ষ জ্ঞান করতেই অভ্যস্ত;—অ্যারাইভ্যাল সত্যটি স্মরণ করিয়ে দিতে ভোলেনি। ভিনগ্রহী প্রাণী মিত্র হতে পারে এই ভাবনা কদাচিত মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে।

হলিউড বা অন্য দেশে নির্মিত সিনেভাষার বড়ো অংশে ভিনগ্রহী জীবের সঙ্গে মানবের আন্তঃরসায়নের কাহিনি প্রধানত সংঘাত আর শত্রুতাকে উপজীব্য করে পর্দায় মুক্তি পায়। আত্মানুসন্ধানের তাড়না হয়ত থাকে কিন্তু আত্মসমালোচনার স্থান সেখানে হয় না। ভিনগ্রহীদের সঙ্গে পৃথিবীবাসীর কন্ট্যাক্ট বা সংযোগ যারপরনাই একরৈখিক আরোপণে খতম হয় ও মানুষের চিরন্তন অসূয়া প্রবৃত্তিকে নগ্ন করে। অ্যারাইভ্যালকে যে-কারণে রবার্ট জেমেকিসের কন্ট্যাক্ট-এ সক্রিয় সংকেতের বিস্তারণ বলা যায়।

. . .

থার্ড লেন স্পেস অবদায়ক মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদআহমদ মিনহাজ-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন 
. . . 

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 17

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *