আসুন ভাবি - পোস্ট শোকেস

‘গ্লোবাল ট্রাম্পিজম’ ও উদীয়মান ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ

Reading time 9 minute
5
(15)
William I. Robinson; Sciolohist and Political Analysit; Image Source: Collected; Google Image

সমসাময়িক সমালোচনামূলক সমাজতাত্ত্বিকদের মধ্যে উইলিয়াম আই. রবিনসন এমন এক নাম, বিশ্বকে যিনি কেবল রাষ্ট্রভিত্তিক রাজনীতির দৃষ্টিতে নয়, বরং এক আন্তঃসংযুক্ত পুঁজিবাদী কাঠামোর ভেতর থেকেও বোঝার চেষ্টা করেন। মার্কসবাদী ঐতিহ্যের ভেতরে দাঁড়িয়ে মূলত তাঁকে কাজ করতে দেখি আমরা, তবে কট্টর, স্থির কোনো মতাদর্শ হিসেবে নয়, বরং বিশ্লেষণী কাঠামো রূপে একে দেখে থাকেন রবিনসন। তাঁর দৃষ্টিতে এটি কেবল এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নয়, এটি এখানে বৈশ্বিক সামাজিক সম্পর্কও,—রাষ্ট্র, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি সবকিছুকে যা পুনর্গঠন করছে। এই জায়গা থেকে তিনি Transnational Capitalist Class বা আন্তঃদেশীয় পুঁজিপতি শ্রেণির ধারণাটি সামনে এনেছেন, যেখানে পুঁজির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ আর এক দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ও রাষ্ট্রকে নিজের মতো গড়েপিটে নেয়।

রবিনসনের গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলোর একটি হলো—‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম’ বা বৈশ্বিক পুঁজিবাদকে পূর্ণাঙ্গ তত্ত্ব হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন তিনি। তাঁর মতে, আমরা আর আলাদা আলাদা জাতীয় অর্থনীতির যুগে নেই;—একক বৈশ্বিক অর্থনীতি তৈরি হয়েছে, যেখানে উৎপাদন, বিনিয়োগ, শ্রমের পুরোটাই আন্তঃদেশীয়ভাবে সংগঠিত। এ-কারণে রাষ্ট্র আগের মতো স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, এবং অনেক ক্ষেত্রে পুঁজির সেবায় নিয়োজিত প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিণত হয়েছে। তিনি দেখান, কীভাবে সমসাময়িক পুঁজিবাদের সংকট নতুন ধরনের ফ্যাসিবাদী প্রবণতা তৈরি করছে, যা ডিজিটাল প্রযুক্তি, নজরদারি ও সামরিকীকরণের সঙ্গে জড়িত। তাঁর কাছে ফ্যাসিবাদ কোনো অতীত নয়, বরং বর্তমানের এক পরিবর্তিত রূপ।

রবিনসনের ভাষা সাধারণত সরাসরি ও বিশ্লেষণধর্মী। জটিল ধারণা তিনি ব্যবহার করেন, কিন্তু সেগুলোকে বাস্তব উদাহরণের সাহায্যে উপস্থাপন করায় তা আর জটিল থাকে না সেভাবে। তাঁর কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পুঁজিবাদের সংকটকে তিনি কেবল অর্থনৈতিক সংকট হিসেবে দেখেন না; তাঁর কাছে এটি হলো ‘সামগ্রিক সংকট’, যেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক বৈষম্য, পরিবেশগত বিপর্যয় ও প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণের সবটুকু একত্রে জড়াজড়ি করে রয়েছে। এ-কারণে তিনি দেখাতে পারছেন, কেন যুদ্ধ, দমন-পীড়ন, অভিবাসন সংকট বা নজরদারি রাষ্ট্রের মতো বিষয়গুলোকে আলাদা করে বুঝে ওঠা যায় না।

রবিনসন নিছক একজন সমাজতাত্ত্বিক নন। আমাদের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ চিন্তকও বটে। তাঁর সাম্প্রতিক লেখা The New Capital Complex : Pax Silica and the Embryonic Fascist State বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম, যেমন The Philosophical Salon এবং ZNetwork-এ প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে তিনি সমসাময়িক বিশ্বরাজনীতি, পুঁজির নতুন রূপ ও প্রযুক্তি নির্ভর ক্ষমতার কাঠামোকে বিশ্লেষণ করেছেন।

এই লেখাটি এমন এক সময়কে সামনে আনছে, যখন বিশ্বকে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনাবলীর সমষ্টি রূপে বোঝা যায় না। এখানে যুদ্ধ, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র—সবকিছু যেন এক অদৃশ্য সুতোয় গাঁথা! একটি সংকট আরেকটির ভেতর ঢুকে গিয়ে বৃহত্তর বাস্তবতার জন্ম দিচ্ছে সেখানে। ইরানে হামলা, ইউক্রেনের যুদ্ধ, গাজায় ধ্বংস, অভিবাসী দমন— এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এসব ঘটনা গভীর কাঠামোগত সংকটের বহিঃপ্রকাশ;—পুঁজিবাদ যেখানে নিজস্ব সীমায় এসে আরও সহিংস ও নগ্ন রূপে নিজেকে পুনর্গঠন করছে।

Books, written by William I. Robinson; Image Source: Collected; Google Image; @thirdlanespace.com

এই পুনর্গঠনের কেন্দ্রে রয়েছে ডিজিটাল প্রযুক্তি, আর্থিক পুঁজি ও সামরিক দমনযন্ত্রের মিলিত কাঠামোর মতো নতুন এক শক্তিজোট। শুধু অর্থনীতিকে নয়, এটি এখন রাজনীতি, সমাজ, এমনকি মানুষের কল্পনাকে নিয়ন্ত্রণে নিতে শুরু করেছে। প্রযুক্তি এখন আর কেবল উৎপাদনের হাতিয়ার নয়, তা এখন নজরদারি, যুদ্ধ ও শাসনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর রাষ্ট্র, যা একসময় অন্তত আংশিকভাবে জনস্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করছে বলে দাবি করত, নতুন বাস্তবতায় তা ক্রমশ পুঁজির সরাসরি সম্প্রসারণ যন্ত্রে পরিণত হতে চলেছে।

এই প্রেক্ষাপটেই গ্লোবাল ট্রাম্পিজম ধারণাটি সামনে আসছে। রবিনসনের কাছে গ্লোবাল ট্রাম্পিজম এমন একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রবণতা, যা কেবল একজন ব্যক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্প-এ সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিশ্বজুড়ে একধরনের শাসনধারা ও ক্ষমতার ভাষা রূপে তা ছড়িয়ে পড়েছে। ‘ট্রাম্প’ এখানে কেবল নাম নয়, উলটো এক কাঠামোগত বাস্তবতার প্রতীক। ধারণাটি সমালোচনামূলক চিন্তাবিদদের আলোচনার ভেতর দিয়ে গড়ে উঠেছে, যেখানে ট্রাম্পের রাজনীতি ও ভাষাকে বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রবণতার অংশ হিসেবে দেখছেন তাঁরা।

এই অর্থে গ্লোবাল ট্রাম্পিজম এমন এক রাজনীতি, যেখানে ক্ষমতা আর নিজেকে আড়াল করে না, বরং প্রকাশ্যে আগ্রাসী, কর্তৃত্ববাদী ও প্রায়শ বিশৃঙ্খল রূপ নেয়। এটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ নয় , বিভিন্ন দেশে এর প্রতিফলন ক্রমশ পরিষ্কার প্রতিভাত হচ্ছে। রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করা, ভিন্নমত দমন, এবং জাতীয়তাবাদের আড়ালে ক্ষমতার একচ্ছত্র ব্যবহার হচ্ছে এই প্রবণতার লক্ষণ। ট্রাম্পিজমের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি বাস্তব সমস্যাকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক অস্থিরতা বা বৈশ্বিক সংকটের গভীরে না গিয়ে এগুলোকে সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় বা পরিচয়ের সংকট বলে তুলে ধরে। ফলে মানুষের দৃষ্টি আসল কাঠামোগত সমস্যাগুলো থেকে সরে যায়। তারা বিভক্ত হয়ে পড়ে ‘আমরা’ বনাম ‘ওরা’ টাইপের দ্বন্দ্বে।

রবিনসনের লেখার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ট্রাম্পিজমের সঙ্গে বিগ টেকের সম্পর্ককে তিনি বিশ্লেষণ করেছেন। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো, যারা তথ্য, যোগাযোগ ও নজরদারির বিশাল অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ করে, তারা এখন আর শুধু অর্থনৈতিক শক্তি নয়, সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। অ্যালগরিদম, ডেটা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জনমত তৈরি করতে পারে, তথ্যের প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, এমনকি মানুষের রাজনৈতিক আচরণেও প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে রাষ্ট্র ও পুঁজির মধ্যে যে-দূরত্ব একসময় ছিল, তা ধীরে ধীরে কমে এসে একধরনের সরাসরি জোটে রূপ নিচ্ছে, যেখানে প্রযুক্তি, ক্ষমতা ও শাসন একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ক্রমশ!

এই জোটের ফলে আমরা যে-বৈশ্বিক অস্থিরতা দেখছি, তা আর বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি নয়। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ, প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক দমন মিলিয়ে তা এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। সংঘাত যেখানে নিছক ভূরাজনৈতিক নয়;—অর্থনৈতিক প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বাজার, সম্পদ ও প্রভাব বিস্তারের লড়াই বরং সময়ের পালাবদলে সেখানে তীব্র হয়ে উঠছে।
. . .

সংযুক্তি : উইলিয়াম আই. রবিনসনের The New Capital Complex : Pax Silica and the Embryonic Fascist State অধ্যায়ের লেখক কৃত বাংলা ভাষান্তর পাঠে নিচের পিডিএফ দেখুন। ডেক্সটপ/ ট্যাব ডিভাইস হলে সরাসরি এখানেই পাঠ করতে পারবেন। মোবাইল ডিভাইস হলে পিডিএফটি ডাউনলোড করুন।

. . .

@thirdlanespace.com

পাঠালাপ : “গ্লোবাল ট্রাম্পিজম’ ও উদীয়মান ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র”
[থার্ড লেন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে সংকলিত]

গ্লোবাল ট্রাম্পিজম ও মানব জাতির ভবিষ্যৎ

আপনার ভূমিকা ও ভাষান্তর-সহ উইলিয়াম আই রবিনসনের লেখাটি পুনরায় পড়লাম জাভেদ। রবিনসনের তোলা প্রসঙ্গ নিয়ে থার্ড লেন স্পেস গ্রুপে আলোচনা হয়নি এমন নয়। স্লাভয় জিজেক ও ইয়ান ভারোফাকিসের ‘প্রযুক্তি সামন্তবাদ’; জেরেমি বেন্থাম ও মিশেল ফুকোর ‘প্যানোপটিকন’-র নয়া সম্প্রসারণ ‘ডিজিটাল প্যানোপটিকন’ ও তথ্যের সাহায্যে নজরদারি নিয়ে বিয়ং চুল-হানের সজাগ পর্যবেক্ষণ, এবং আচিল এমবেম্বের ‘ন্যাক্রোপলিটিক্সগ্রুপে ও সাইটে এসব নিয়ে অতীতে আলাপ হয়েছিল কয়েকদফা। থার্ড লেন স্পেস সাইটে সারসংক্ষেপ তোলা হয়েছে ইতোমধ্যে।

বৈশ্বিক পুঁজিবাদ বা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমে নতুন মেরুকরণ ও আন্তঃদেশীয় পুঁজিপতির বিকাশ প্রসঙ্গে ‘গ্লোবাল ট্রাম্পিজম’ ধারণাটি রবিনসন হাজির করেছেন। তাঁর এই তাত্ত্বিক ধারণার সঙ্গে থার্ড লেন স্পেস-র গ্রুপে আলোচিত ধারণাগুলোর দূরত্ব অধিক নয়। লেখাটি পাঠ করে আমার সেরকম মনে হয়েছে। কথা সত্য, ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দিয়ে বিশ্ব-পুঁজিবাদ নতুন মেরুকরণে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। রবিনসন-সহ অন্যান্যদের ব্যাখ্যা যদি আমলে নেই, তাহলে আমরা এই সারাংশ সেখানে পাচ্ছি :

নতুন মেরুকরণ প্রথমত পলিটিক্যাল কারেক্টনেস-র (Political Correctness) তোয়াক্কা করছে না। রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থায় গণতন্ত্র, রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, গণমাধ্যমের ভূমিকা, নাগরিক ও মানবাধিকার… ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে পুঁজিবাদ যে-মিথ তৈরি ও একে লালন-পালন করেছে এতদিন, নতুন যুগ-বাস্তবতায় তারা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। এগুলো দিয়ে পুঁজিবাদী সংস্কৃতিকে বিশ্বে পরিপুষ্ট রাখার ম্যাকানিজম, যাকে আমরা পলিটিক্যাল কারেক্টনেস বলে বুঝে থাকি হরহামেশা, একুশ শতকের পৃথিবীতে এটি নিজের কার্যকারিতা হারাতে যাচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এসে ওই-যে এগুলোকে আগের মতো প্রেইজ করে না, তার পেছনে কারণও আছে যথেষ্ট। পুঁজিস্ফীতি ও এর বিপণনের মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যবস্থার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ও শাসন কায়েম রাখার ছকে এগুলোর কার্যকারিতা অদ্য আর নিখাদ নয়। রবিনসনের লেখায় এই দিকটি উপেক্ষিত দেখে অবাক হয়েছি!

গত শতাব্দীতেও সাম্রাজ্যবাদের ব্যবহৃত উপকরণ রূপে পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের সঙ্গে জুড়ে থাকা উপাদানগুলো সারা বিশ্বে যথেষ্ট কার্যকর থেকেছে। একুশ শতকের বিশ্বব্যবস্থায় তাদের আবেদন আগের মতো নেই। আমেরিকা দেখছে, এগুলো কার্যকর করার পেছনে খর্চা ও ঝামেলা হয় বিস্তর। মেহনত করতে হয় দশকের-পর-দশক। অন্যদিকে, এগুলোকে গুরুতর হতে না দিয়েও চীন, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া, ইরানের মতো দেশ পুঁজি সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও বিপণনের নিজস্ব বাজার অর্থনীতি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। অদূর ভবিষ্যতে এটি যদি শক্তিশালী অক্ষ হয়ে ওঠে, সেক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতন রোধ করা সম্ভব হবে না।

পুঁজিবাদের পরিপূর্ণ বিকাশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোয় ঘটেছিল মূলত। বৈষম্যের কারণে জন-অসন্তোষের মাত্রা যেন চরম না হয়, সেজন্য পলিটিক্যাল কারেক্টনেস খোদ নিজ দেশের ভিতরে তাদেরকে প্রয়োগ করতে হয়েছে। আভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক কাঠামোকে মজবুত করা ছিল এর অন্যতম। বহু জাতি-সংস্কৃতি বা মাল্টি কালচারকে অভিবাসন নীতির মাধ্যমে চর্চা করা সেখানে তাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর ফলে একটি কাঠামো গড়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোয়। মানুষ এই কাঠামোর আওতায় সেখানে বসবাস করে। কাঠামো যেখানে তাদের জীবিকা ও খেয়েপরে স্বচ্ছন্দে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দানে এখনো বাধ্য। প্রয়োজনীয় নাগরিক অধিকারও এভাবে তারা কাঠামো থেকে ভোগ করছে শতভাগ। বিষয়টি খেয়াল করা ও আমলে নেওয়া প্রয়োজন।

দৈহিক ও মানসিক চাহিদায় অবিরত ভোগপ্রবণতা বৃদ্ধির মাত্রা বাড়ানো ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে একে অ্যালাইন করা ছিল পুঁজিবাদের বড়ো সাফল্য। যারপরনাই, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র জোট মিলে বিশ্বব্যবস্থায় কোন দেশের সরকারকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ ও নির্ধারণ করছে, কাকে কীভাবে পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের ফাঁদে ফেলে চাপে রাখছে ও বশ্যতা মেনে নিতে বাধ্য করছে, কার সম্পদ কীভাবে লুণ্ঠন করার মতলবে তৈরি করছে আভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা… এসব নিয়ে নাগরিকদের মাথাব্যথা তীব্র হয়নি কখনো।

Trumpism: Conceptual Photography; Image Source: Collected; Credit: belonging.berkeley.edu

ছকটি এভাবে পুরো বিংশ শতক জুড়ে কাজ করলেও, সময়ের পালাবদলে নিউটনের তৃতীয় সূত্র এখানেও সক্রিয় হয়েছে। পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের ছকে দাস হয়ে থাকা অনেক জাতিরাষ্ট্র এখন আর মানতে রাজি নয়। এটি আবার তাদের আভ্যন্তরীণ কাঠামোয় জন্ম দিচ্ছে সংঘাতের। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে মাল্টি কালচারের উপজাত রূপে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অভিবাসীর একাংশের মধ্যে জন্ম নিয়েছে একে প্রতিহত করার রাজনীতি। এসবের কুছ পাত্তা রবিনসনের লেখায় নেই দেখে আশ্চর্যই লাগল!

সব মিলিয়ে এই-যে ক্যাওস, তা আরো জটিল মোড় নিয়েছে এআই প্রযুক্তির কারণে। ডেটা বা তথ্যের নিয়ন্ত্রণ এখন চাইলেও শতভাগ কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়। বড়ো কথা, রবিনসনের আন্তঃদেশীয় পুঁজি মানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র রাষ্ট্রের জোট শুধু নয়। আন্তঃদেশীয় পুঁজি, এটি কিন্তু এর বাইরে থাকা চীন, রাশিয়া, ভারতের মতো দেশগুলো মিলেও তৈরি হতে পারে সামনে। প্রযুক্তির সম্প্রসারণের কারণে যা এখন আর অকল্পনীয় হয়ে নেই। যে-কারণে এ-বছরের দাভোসে অনুষ্ঠিত বৈশ্বিক বাণিজ্য সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের বলয়ে বিস্তৃত পুঁজিপতিরা নিজের পরিসীমা সংকুচিত হওয়ার শঙ্কা জানিয়েছিলেন। সংকুচিত হওয়া মানে তো কেবল রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অধিপত্য খর্ব হওয়ার ঘটনা নয়, ডলারের বিকল্প বাজারব্যবস্থার সম্প্রসারণ, সেইসঙ্গে আন্তঃদেশীয় পুঁজির মেরুকরণ, যেখানে এখনো বাজারে দাপট ধরে রাখা পশ্চিম গোলার্ধের পুঁজিপতিদের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আগামীতে বাড়বে। সেইসঙ্গে সম্পদেরও ঘটবে স্থানান্তর।

শঙ্কা ঠেকাতে সুতরাং যুক্তরাষ্ট্র পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের ছক মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলেছে। অভিবাসীকে নাগরিকত্বের পরিকাঠামোয় ট্রাম্প প্রশাসন যে-কারণে অবনমিত করছে দ্রুত। যেহেতু, এআই নির্ভর আগামী পৃথিবীতে দক্ষ জনশক্তির বাইরে অভিবাসী আমদানি ও তাকে নাগরিক করার দায় সে নিতে বাধ্য নয়। একুশ শতকে পা দিয়েই রাষ্ট্র দ্রুত বাতিল প্রকল্প হতে চলেছে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, জবাবদিহিতা হয়ে উঠছে সুবাসিত বুলি… শুনতে মনোরম কিন্তু বাস্তবে অকার্যকর।

সামাজিক সুরক্ষা নির্ভর সংস্কৃতির চর্চাকে দক্ষতা বা স্কিল-এ পালটে দেওয়া হচ্ছে একুশ শতকের মূল মন্ত্র। পুঁজিবাদের মরণ নয় এটি; এটি হলো তার নয়া রূপান্তর। যার দক্ষতা বেশি, তার উপার্জনের সুযোগ থাকছে অবারিত। সামাজিক সুরক্ষার তোয়াক্কা তার না করলেও চলছে। যার দক্ষতা কম, তাকে সেক্ষেত্রে মধ্যযুগের দাসশ্রমিকের নিয়তি মেনে নিতে হবে। আইন ও মানবাধিকার আগামীতে পলিটিক্যাল কমিটমেন্ট নয়, তা পুঁজিপতি সামন্তদের সমাবেশে গঠিত বিধান অনুসারে নির্ধারিত হওয়ার দিকে মোড় নিতেও পারে।

সোজা কথায়, পুঁজিবাদ তথ্য-প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে একধরনের মধ্যযুগীয় সামন্ত-কাঠামো গড়ে তুলছে আস্তে-ধীরে। অর্থাৎ, পুঁজিবাদ তার নতুন বিন্যাসে ফেরত যাচ্ছে সামন্তযুগে;—অন্য রূপ ও পরিচয়ে। এখানে রাষ্ট্র মানে ওই কাঠামোর অধীনস্থ জনগোষ্ঠী। সে হয়তো মার্কিনি, হয়তো ভারতীয় বা বাংলাদেশী। তাতে কিছু যাবে আসবে না। কে কোন সামন্ত-কাঠামোর অধীন, তার ওপর নির্ভর করবে তার রুটিরুজি ও বেঁচে থাকার সুবিধা ও বিড়ম্বনা।

কথার কথা, ‘গাজা’কে পুনর্গঠন মানে ইসরায়েল বা আমেরিকার আধিপত্য নয় সেখানে। ইসরায়েল কিংবা আমেরিকার নেপথ্যে সক্রিয় পুঁজিপতিদের একটি সামন্তরাজ্য হবে গাজা। যেখানে, দক্ষরা জায়গা পাবে, অদক্ষদের নিতে হবে নির্বাসন ও বিলুপ্তি। রবিনসন যে-কারণে ‘গ্লোবাল ট্রাম্পিজমকে’ কেন ফ্যাসিস্ট বলছেন তা মাথায় ঢোকেনি। ফ্যাসিজম বলতে যে-ভাবাদর্শকে গভীরে লালন ও বাস্তবায়ন বোঝায়, যেটি আমরা একসময় ইতালি বা জার্মানিতে দেখেছি, কমিউনিস্ট শাসিত দেশগুলোয় দেখেছি, এখন ইরানে বা এরকম দেশে দেখছি… পুঁজিবাদের সেরকম কোনো ভাবাদর্শ কখনোই ছিল না। ভাবাদর্শের প্রতি আনুগত্যহীন বলেই এটি অবিরত নিতে পারে নতুন মোড় ও রূপান্তর।

এখন, তা কারো জন্য আশীবার্দ, আর বাকিদের জন্য সবসময় অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে যুগে-যুগে। তাকে আঘাত দিয়ে দুর্বল করা যায় হয়তো, কিন্তু হাইড্রার মতো দ্রুত মাথা গজায় নতুন করে। মুক্তবাজার অর্থনীতি ছিল আপাত সর্বশেষ, তার প্রাসঙ্গিকতা গৌণ হওয়াকে পুঁজিবাদের মরণ ভাবছেন অনেকে, ন্যাক্রোপলিটিক্স ও প্রযুক্তি সামন্তবাদকে যেমন ধরে নিচ্ছেন অবক্ষয়ের ধাপ হিসেবে… এসব ভাবনার মধ্যে কাজ করছে ওই চিরাচরিত বামপন্থী বিকার! কার্যত এগুলো কিংবা ‘গ্লোবাল ট্রাম্পিজম’ পুঁজিবাদকে আয়ু দিচ্ছে নতুন করে।

‘গ্লোবাল ট্রাম্পিজম’ মূলত এআই নির্ভর প্রযুক্তিক উৎকর্ষ লাভের যত উপাদান রয়েছে, সেগুলোকে অ্যাড্রেস করে বিকশিত হচ্ছে এই মুহূর্তে। পরিণামে এটি যে-ভবিষ্যৎ হাজির করবে সামনে, তা মানব সভ্যতার বিলুপ্তির কারণ হবে অথবা ভিন্নকিছু ঘটবে… এটি অনুমানের সময় এখনো আসেনি। এই অবস্থার জন্য দায়ী কিন্তু ওইসব পলিটিক্যাল কারেক্টনেস, যেগুলো শুনতে ও দেখতে মনোহর, কিন্তু পুঁজিবাদের জিয়নকাঠি রূপে তারাই বরং ভূমিকা রেখে আসছে বরাবর। ধরায় মানব সভ্যতরার আয়ু এমনিতেও ফুরিয়ে আসছে সামগ্রিক কার্যকারণে। তো সেখানে ‘গ্লোবাল ট্রাম্পিজমকে’ ফ্যাসিবাদ বানানোটাও একধরনের ভ্রান্ত বিকার ছাড়া কিছু নয়।

এটি হচ্ছে কেবল একটি অক্ষ, যার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের অবলুপ্তি ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হতে চলেছে। তবে মার্কসের দেখানো পথে তা ঘটছে না। অবলুপ্তির বিকল্প রূপে গড়ে উঠতে পারে অনেকগুলো ছোট-বড়ো-মাঝারি ব্যবসায়িক অক্ষ দিয়ে গড়া কাঠামোর মাধ্যমে, যার অধীনে মানুষ অতিবাহিত করবে জীবন। যেখানে, মার্কিন নির্ভর পুঁজিবাদী ছক যে-অক্ষ গড়ে দিতে চাইছে, তাকে ঠেকানোর বিকল্প অক্ষরা যদি শক্তিশালী হয়, তাতেও বাস্তবতার ইতরবিশেষ ঘটবে না। কেননা, সভ্যতাকে কোনো একভাবে শেষ হতেই হবে এখানে, অথবা তাকে পাড়ি দিতে হবে অন্যত্র। তা হতে পারে চাঁদ, মঙ্গল অথবা অন্য কোনো অজানায়...।
. . .

Is Donald Trum s Facist?; Trumpism with Alan Woods; Source: Revolutionary Communist International YTC

. . .

লেখক পরিচিতি : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 15

No votes so far! Be the first to rate this post.

thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *