প্রাককথন : শিল্পীর দায়, বুদ্ধিজীবীতা ও হ্যারল্ড রোজেনবার্গের ‘অ্যাকশন’

বিংশ শতাব্দীর প্রভাববিস্তারী মার্কিন লেখক ও চিত্র–সমালোচক হ্যারল্ড রোজেনবার্গ একটা সময় পরে বিস্মৃত প্রায় নাম হয়ে উঠেছিলেন। একুশ শতকে দেখা দেওয়া যুগ-বাস্তবতা তাঁকে পুনরায় পাদপ্রদীপে নিয়ে এসেছে। তাঁর শিল্পভাবনায় নিহিত দার্শনিকতার চর্চায় মন দিয়েছেন শিল্পবোদ্ধারা। যার আভাস আমরা পাচ্ছি রোজেনবার্গের ‘দ্য আমেরিকান পেইন্টারস’ নিয়ে ইতিহাসবিদ ও অনুবাদক ব্ল্যাক স্মিথ রচিত নিবন্ধ ‘Art Must Act’ পাঠে।
রোজেনবার্গের চিন্তাকাঠামো ও বৌদ্ধিক যাত্রাপথকে তীক্ষ্ণ গভীর দৃষ্টিতে নিরিখ করেছেন স্মিথ। একজন শিল্প–সমালোচক হিসেবে শুধু নয়, বরং সময়সচেতন চিন্তক রূপে তাঁকে আবিষ্কার করে উঠতে চেয়েছেন লেখায়। ব্ল্যাক স্মিথের নাতিদীর্ঘ গদ্যে আমরা এমন এক মননের দেখা পাই, যিনি নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক বিভ্রান্তি ও নৈতিক সংকটের ভিতর দিয়ে সামগ্রিক সমাজব্যবস্থা, রাষ্ট্রকাঠামো ও আধুনিক পুঁজিবাদী সভ্যতার গভীর সংকট উপলব্ধিতে নিবেদিত ছিলেন। স্মিথ আমাদের দেখাচ্ছেন,—বিংশ শতাব্দীর প্রভাবশালী এই মননের একান্ত বৌদ্ধিক অস্থিরতা কীভাবে ধীরে-ধীরে বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণে রূপ নিয়েছিল তখন।
আমাদের এখানে শিল্পচর্চা ও বুদ্ধিজীবীতার পটভূমি যদি বিবেচনা করি, তাহলে রোজনেবার্গ এখনো চরম প্রাসঙ্গিক। তাঁর শিল্প-সমালোচনার ধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি শুধু নয়, সমাজে একজন শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীর দায়বদ্ধতা কেমন হওয়া প্রয়োজন, এই বিষয়ে নতুন করে ভাবতে প্ররোচিত করেন হানা আরেন্টের কাছের বন্ধুজন স্বীকৃত এই মেধামনস্ক চিন্তক। বলাবাহুল্য, হানা আরেন্টের ভাবুকতাও তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল ব্যাপক।
হ্যারল্ড রোজেনবার্গের চিন্তার অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, রেডিমেড কোনো মতাদর্শিক কাঠামোয় নিজেকে আটক ও নিরাপদ রাখেননি তিনি। তাঁর চিন্তা-ভাবনা ও বিচার-পদ্ধতি সময়ের সঙ্গে একের-পর-এক মতাদর্শিক ফ্রেম ভেঙে সামনে আগ্রসর হয়েছে। কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, পপুলার ফ্রন্টকে ঘিরে তৈরি হওয়া আশাবাদী বাতাবরণ, শিল্প ও রাজনীতির যৌথ মুক্তির স্বপ্ন… বিংশ শতাব্দীর প্রথম পাঁচ দশকের মধ্যে দেখা দেওয়া এসব তৎপরতার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল; অন্যদিকে এসব তৎপরতার ফলাফল বিবেচনা করা ও এগুলো থেকে সচেতনভাবে সরে আসার ভাবনাও তিনি ভেবেছেন।

সরে আসা বা বিচ্ছেদের নেপথ্যে ছিল দীর্ঘ বাস্তব অভিজ্ঞতা। রোজেনবার্গ দেখেছেন,—মতাদর্শগুলো প্রেরণাদায়ী হয়ে ওঠার পথেই একসময় আবদ্ধ ও ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। স্বাধীন চিন্তার পথে তারা প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়, এবং অচিরে প্রতিক্রিয়াশীলতায় মোড় নিয়ে নেয়। মতাদর্শের এসব সংকট ও ভাঙনের ভেতর দিয়ে মুক্তচিন্তার পরিসরকে খুঁজেছেন তিনি, আর আমাদের জন্য রেখে গেছেন ভাবিয়ে তোলার মতো দূরবিস্তারী সব রচনা। তাঁর রচনা শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করে, এর প্রাসঙ্গিকতা আজো অমলিন। রোজেনবার্গ পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন,—কোনো মতাদর্শ বা দল অথবা গোষ্ঠীর মুখপত্র হয়ে ওঠা শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীর কাজ নয়। নিজের সুবিধাজনক অবস্থানকে ঝুঁকির মুখে নিক্ষেপ করে হলেও, প্রশ্ন ও প্রত্যাখ্যানের সাহস তার ‘অ্যাকশন’কে সমাজে বৈধ করে তোলে।
বৌদ্ধিক যাত্রাপথে হানা আরেন্টের সঙ্গে রোজেনবার্গের গভীর বন্ধুত্ব ছিল মনে রাখার মতো ঘটনা। প্রায় তিন দশক ধরে গড়ে ওঠা সম্পর্কটি নিছক ব্যক্তিগত সখ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি মোড় নিয়েছিল সময়ের দুই প্রভাবশালী চিন্তকের মধ্যে চলমান বৌদ্ধিক সংলাপে, যেখানে তাঁরা একে অন্যের চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছিলেন তখন। পরস্পরকে গভীরতা দানের পাশাপাশি নতুন দিগন্তও খুলে দিয়ে গেছেন আমাদের জন্য। হানা আরেন্টের রাজনৈতিক দর্শন এবং রোজেনবার্গের নান্দনিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণ… এ-দুটি ধারা মিলিত হয়ে ‘অ্যাকশন’ ও ‘বিচারবোধ’-এর একটি স্বতন্ত্র ধারণা আমরা পেয়েছি। শিল্প, রাজনীতি ও দৈনন্দিন জীবনে কার্যকর সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে যা আমাদেরকে পথ দেখানোর ক্ষমতা রাখে।

রোজেনবার্গের ‘অ্যাকশন’ ও হানা আরেন্টের ‘বিচারবোধ’ আমাদের দেখায়, মানুষ কেবল চিন্তাশীল সত্তা নয়, বরং প্রকাশের মধ্য দিয়ে নিজেকে দৃশ্যমান করে তোলার অপরিহার্য মানবিক তাড়না সে বহন করছে। রোজেনবার্গের চিন্তার মৌলিক দিক হচ্ছে এই ‘অ্যাকশন’ নামক ধারণাটি। ‘অ্যাকশন’ এখানে শুধু শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক অথবা সেরকম তাত্ত্বিক অবস্থান মাত্র নয়। লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীর জন্য নৈতিক ও অস্তিত্বগত প্রশ্ন হিসেবেও একে বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। যে-কারণে পশ্চিমের বিদ্যাজীবী মহলে আকস্মিক বিস্মৃতির খাতায় চলে যাওয়া রোজেনবার্গ ফেরত এসেছেন পুনরায়।
রোজেনবার্গের কাছে ‘অ্যাকশন’ মানে ছিল প্রস্তুত বা রেডিমেড ভাষা, নিরাপদ ভূমিকা ও সামাজিক স্বীকৃতির বাইরে নিজেকে নিয়ে যাওয়া, যার প্রতিফলন ঘটবে ব্যক্তির কর্মে। এমন কিছু করা, যা তার জীবন ও যাপনকে প্রশ্নের সম্মুখে দাঁড় করাবে ফিরে-ফিরে। ‘শিল্পের জন্য শিল্প’;—এই ধারণায় রোজেনবার্গ বিশ্বাস করতেন না। শিল্পকে তিনি প্রতিরোধী এক শক্তি ও সময়ের অসঙ্গতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ভেবেছেন। শিল্পী ও লেখকের দায়বোধ যে-কারণে তাঁর ভাবনায় বিস্তৃত ও গভীর হয়ে উঠেছিল।
নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে রোজেনবার্গ লক্ষ্য করলেন সাধারণ মানুষ যৌক্তিক কারণে রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক বা শিক্ষাবিদের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে! বিশ্বাসভঙ্গের ফলে যে-প্রবণতা তৈরি হচ্ছিল সমাজে, এটি তাঁকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তোলে। কেননা, মানুষ ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছিল উদাসীনতা ও নিরাসক্তির দিকে;—এক মানসিক শূন্যতায় নিজেকে নিক্ষেপ করছিল তারা, যেখানে কোনোকিছুই আর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে নেই তাদের কাছে। রোজেনবার্গ এই অবস্থাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বিবেচনা করতেন। কারণ, মানুষ যখন কোনোকিছুতে বিশ্বাস করতে পারে না, তখন তারা শুধু ক্ষমতার প্রতারণা থেকে দূরে থাকে তা নয়,—নিজের কর্মক্ষমতা থেকেও সরে যেতে থাকে।

রোজেনবার্গ তাই জোর দিয়ে বলেছিলেন : আগের যে-কোনো সময়ের তুলনায় লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীর দায়িত্ব এখন আরও গভীর ও কঠিন। তাঁর মতে, বুদ্ধিজীবীর কাজ হলো বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের দাবি একপাশে সরিয়ে রেখে নিজের চোখে দেখা বাস্তবতার প্রতি ব্যক্তিগত ও স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া জানানো। এখানে শীতল দূরত্ব বজায় রাখা, বিশ্লেষণ অথবা নিরপেক্ষতার ভান কার্যকর নয়। প্রয়োজন সৎ ঘৃণা জানানো ও ক্ষোভ বা অস্বস্তিকে আড়াল না করার সাহস। ‘বিশেষজ্ঞ’র মুখোশ পরে নিজেকে নিরপেক্ষ তথ্যের ওস্তাদ হিসেবে উপস্থাপন করা আজকের পৃথিবীতে বিশ্বাসযোগ্য নয়, কারণ জনগণ এই ভূমিকার ওপর আস্থা হারিয়েছে।
রোজেনবার্গ অর্ধশতাব্দী আগে সতর্ক করেছিলেন,—যে-যুগ সত্যে বিশ্বাস রাখে না, সেই যুগে বুদ্ধিজীবী যদি পুরোনো গাম্ভীর্য ও দূরত্ব আঁকড়ে ধরে বসে থাকেন, তাহলে নিজ থেকে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বেন। এই সময়ের যে-কোনো শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীকে জনমুখী চরিত্র হয়ে উঠতে হবে। জনগণের কাছে পৌঁছাতে হলে ভিন্নরকম মানুষ হওয়ার ভাবনায় গমন করতে হবে তাকে। হয়ে উঠতে হবে সহজ ভাষায় কথা বলতে জানে এমন তীক্ষ্ণ ও উজ্জ্বল ব্যক্তির অনুরূপ কিছু, যে কি-না পারিবারিক আড্ডায় সাবলীল কোনো মানুষের মতো প্রাঞ্জল ও আকর্ষণীয়। তাঁর আলোচনার বিষয় হতে হবে সেইসব অভিজ্ঞতা, যা আমরা সবাই দেখি ও অনুভব করি, কিন্তু নিজে ভাষা দিতে পারি না।
রোজেনবার্গের সমালোচনার কেন্দ্রে ছিল একটিই প্রশ্ন : একজন লেখক কিংবা শিল্পী কি সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতর থেকে নিজের পুরোনো পরিচয়ের সীমা ভেঙে আরও বিস্তৃত, স্বাধীন আত্মপরিচয় নির্মাণ করতে পারছেন? দশকের-পর-দশক শিল্প নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি এই মানদণ্ডে অটল থেকেছেন : শিল্পীকে বিচার করতে হবে তিনি ‘কর্ম’ (Action) করতে পেরেছেন কি-না। অর্থাৎ, তিনি কি রুটিন, ক্লিশে আনুগত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারছেন? আত্মপ্রবঞ্চনা ও কল্পনার ভ্রান্ত রাস্তা ধরে পালানো থেকে নিজেকে সরিয়ে আনতে পারছেন? এই দুটি বিপদ, অর্থাৎ ক্লিশে ও আত্মপ্রবঞ্চনামূলক কল্পনা রোজেনবার্গের মতে পুঁজিবাদী সমাজের প্রকৃতি থেকে জন্ম নিয়ে থাকে। নিজের এই দাবি থেকে তিনি কখনও সরে আসেননি।

বিশেষ এই দিকটি বিবেচনায় রেখে ব্ল্যাক স্মিথের গুরুত্বপূর্ণ গদ্যটির বাংলা ভাষান্তর এখানে সংযুক্ত করেছি। পিডিএফ ফরমেটে সংযুক্ত ভাষান্তরটি আগ্রহী পাঠক মোবাইল থেকে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন। আর, ডেস্কটপ/ ল্যাপটপ/ ট্যাব ডিভাইস থেকে থার্ড লেন স্পেস-এর সাইটে ঢুকলে সরাসরি সাইটে পাঠ করতে পারবেন তা।
রোজেনবার্গ নিয়ে থার্ড লেন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কয়েকদফায় বিস্তারিত তর্কালাপ হয়েছিল। থার্ড লেন স্পেস সাইটের ‘নেটালাপ’ বিভাগে তা সামনে সংকলিত হবে। আর, তর্কালাপের আপাত উপসংহারে আমার নিজস্ব বক্তব্য সাইটের ‘আসুন ভাবি’ বিভাগে প্রকাশিত হবে অচিরে। আগ্রহী পাঠক আশা করি সঙ্গে থাকবেন।
—মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ

ব্ল্যাক স্মিথ রচিত ‘Art must act’-এর বাংলা ভাষান্তর পড়তে নিচের সংযুক্তি দেখুন। মোবাইল ডিভাইস হলে ডাইনলোড করুন।
. . .

লেখক পরিচিতি : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন
. . .



