কবিতা সিরিজ : নভশ্চিল লাইলাক : পর্ব-২
রচনা : হেলাল চৌধুরী

তোমার হুব্রিস জানি
তোমার হুব্রিস জানি একদিন তোমাকে
দেউলিয়া করে ছেড়ে দেবে
অন্ধকারে ঢেকে নেবে তোমার সম্প্রসারিত আকাশ
ফালি ফালি করে নেবে তোমার বিষেশায়িত আপেলটি…
আপেলের মাংস তোমার হুব্রিস ছুঁয়ে নেবে, পড়ে থাকবে
কেবল টেবিলে তার ফালি ফালি নিথর নৌকো
অপূর্ণ থেকে যাবে তোমার মদের পেয়ালায় ভাঁড়
ও-পাশে শুয়ে থাকবে তবুও তোমার হুব্রিসের পাহাড়টি…
তুমি পাহাড়ে উঠবে
জানি আকাশ চাবে
আপেলের শাঁস খাবে
তারপর আকাশ ছুঁয়ে নিয়ে তুমি সাগরে নামবে
ঢেউ তোমাকে এলোপাতাড়ি করে বিব্রত করবে
তবুও জানি তুমি, একদিন ছুঁবে বেলাভূমি;
বেলাভূমি ছুঁয়ে শেষমেশ জানি হুব্রিস ঝেড়ে তুমি
গন্দম হাতে উপত্যকা বেয়ে হেঁটে যাবে শনশন পাহাড়ে।
. . .
কলাবতী বরাবর খোলা চিঠি
ডিবির হাওর তুমি পতেঙ্গার বেলাভূমি চেয়ে
রেখো ঈগলের প্রখর চোখ
রেখো ডানায় অবিচল পথহাঁটা
কলাবতী চেয়ে সমুদ্র ডিঙানোর অনিঃশেষ বিকেল…
ডানার বেড়ি খুলে নিয়ো পালকের প্রত্যয়ে
তোমার শরীরে খুঁজে নেব আমি বসন্ত আর শীত
পাহাড় আর সাগরে আশ্বিন আর পৌষের ভোর
কুয়াশায় শরীরে ঘুমে তিন কুড়ি চারটি ভাঁজের সঞ্চয়…
পাথর মানি অন্ধ ইডিপাস
সাগর জানি অবমুক্ত তবু বিস্মিত আমি হায় সেলুকাস
পাহাড় জানি বিশুদ্ধ অবকাশ
অবকাশ ছুঁয়ে আমরা তো পাই তোমার বিশুদ্ধ আকাশ
কলাবতী, শোনো
আমরা তো আজ
চাই
তোমার শরীরে বুকে মাখি হাওয়া অ্যাডেনে সিসিফাস।
. . .
দার্জিলিঙের মেঘে ওড়ে সন্ধ্যার হাত
বুঝলেন মশাই একদিন বিকেল হলে দেখবেন
বয়স হয়ে গেছে। ব্যাস! দুপুর গড়াবে তবে জানি সন্ধ্যায়
কিছুদিন আগে দেখা হয়েছিল যে-দেবদারু গাছটার সাথে
কতকাল হয় বৃদ্ধ হয়ে পাথর হয়ে শুয়ে সে নদীর পারে জল ছুঁয়ে…
সদ্য গোঁফ ওঠা লাজুক ছেলেটা মেহগনি ছায়ায় — রোদফুলে
ডান হাতে চেপে রাখে ফিলট্রামে তার জেগে ওঠা যৌবন
বাবার অবর্তমানে হুঁকোর দিকে তাকায় বিস্ময়কর এক কৈশোর
তাকিয়ে থাকে লোভাতুর চোখে টেবিলে একলা চুরুটের বাকসে…
বিছানায় দার্জিলিঙের গ্রিল ধরে তবুও সে আগায়
উড়ে চলে সাজেকের মেঘে প্রসারিত ধবল জলের হাত ধরে
বান্ধবীর আঙুলে লাজুক ছেলেটা চায়
আবারও কমলাকের বিশুদ্ধ পাতাদের ছুঁয়ে নেয়
দেখে কামরায় সিলিং ফ্যানে ঘুরে ঘুরে ওড়ে দুপুর বেলার যৌবন
বাবার চুরুটের বাকসে মুছে ফেলে সে জীবনের সব গ্লানি
আলবোলা জলে শেষমেশ নলে
নড়ে ওঠে তার বিগত কালের ভুলচুক হিসেবের সব লেনদেন।
. . .
নীললোহিতের তিন প্রহরের বিল
অবন্তিকা
আমি তোমাকে সুনীলের
এক’শ আটটি নীলপদ্ম এনে দিতে পারব না
বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে খোঁজা হবে না আমার কোনওদিনও…
অবন্তিকা, এখানে কেউ কথা রাখে না
রাখতে পারে না, নাদের আলী না, বোষ্টুমিও না
জোছনায় এখানে কত চন্দ্রভূক অমাবস্যা চলে যাবে
তবু চৌধুরীদের বাড়ির রাস-উৎসব দেখা হবে না বুঝি আমারও…
লস্কর বাড়ির লাঠি লজেন্স
রয়্যাল গুলি
বরুণার বুকের সুগন্ধি রোমাল
সুবর্ণ কঙ্কণ পরা ফর্সা রমণী
সাপের মাথার মণী
এসবই আজ এখনও সুনীলের আতর কিবা শুধুই মাংসের গন্ধ
অবন্তিকা শুনো, আজ
তোমার-আমার ঝিল চিরকাল নীললোহিতের তিন প্রহরের বিল!
. . .
ক্যামেলিয়া কিশোরী
ক্যামেলিয়া সুন্দরী
চাও বুঝি তুমি আজ বৃষ্টিভেজা সবুজ শাড়ি
হতে চাও বিশাখা হরিতাভ কোনও নারী
ঠোঁট লাল খরায় আকাশে মাগো তুমি চেরাপুঞ্জির বারি…
চুপচুপ দাও ডুব ঘুমকুমারি তুমি ক্যামেলিয়া ঝিলে
পানিকাক জানি, প্রেমজল খুঁজো কলাপাতা নীলে
বৃষ্টির হাড়ে ঘুমে ঘাড়ে গোপন অতল বিলে
চাও মেঘালয়মেঘ হাকালুকি ছুঁই তুমি নলুয়ার কিশোরী…
ছায়াগাছ কায়াহাত
মায়াডালে জোছনাকালে জাগে রাত
ক্যামেলিয়া সুন্দরী যুগযুগ তুমি জানি যক্ষের প্রেয়সী,
মেঘালয়বালক আজ মেঘদূত কিশোর
কষ্টের ঝড়
নষ্টের সিডর
আজও অপেক্ষায় বৃষ্টির জল চায়
বর্ষার হাত ক্যামেলিয়া আজও তুমি কবেকার ষোড়শী।
. . .

ভুবন চিলের দিন
চৈত্রের দুপুরে মাসের শেষ রবিবার
ছুটির দিন
বাসায় আসতেন
নরসুন্দর দাদা বসন্ত কুমার দাস মুড়িয়ে দিয়ে যেতেন চুল;
অলসদুপুরে মদির হাওয়ায়
আমের ছায়ামাখা আঙিনায়
আকাশে শুনতাম সেদিন মধুমাসের
মাধুরিবিন মনভোলানো চিহিতান আমি ভুবন চিলের গান;
গেলদিন চৈত্রদিনের শেষমাঠে বসে
তুমিও বলেছিলে ইলা
হালখাতায় আজ চৈত্রদিনের অবসান
আবারও শুনাবে কবিরে তুমি ভুবন চিলের গান;
কথা দিয়েছিলে জানি
নতুনের ঢালি সাজিয়ে বিচিত্র ও রঙিন
বৈশাখীঝড়ে ধুয়ে নেবে সব পুরাতন আবর্জনা ও ঋণ
এনে দেবে তুমি আবারও আমার সেই ভুবনচিলের দিন।
. . .
ত্রাণকর্তা
[পয়লা বৈশাখ চোদ্দো শ তিরিশ বাংলা।]
আমাদের খোঁয়াড়ের বরাহটিকে নীরিহ মনে করেছিলাম
আসলে সে একটা দেহলুণ্ঠনকারী উলঙ্গ আস্ত একটা শুয়োর
যার গায়ে লোমের ছিটেফোঁটা নেই, আমরা
আসলে নিয়তই করে চলছি ফোয়ারার বুদবুদে রাজনীতি;
বরফের উপর দিয়ে হেঁটে আসবে কালো কালো পতাকা
তারা হাঁটবে সূর্যের দেশ থেকে বরফের শিলা কেটে কেটে
একদল শের তারা ফোয়ারার বুদবুদ চুষে খাবে, যেখানে
শিলার অক্ষর মুছে নিতে চায় পাল পাল দাঁতালো শুয়োর;
আমরা ভালোবাসতে যেয়ে
ভালোবাসি রক্তিম উৎসব শরীরের উল্লাস
ভালোবাসি শুয়োরের উত্তেজনা
আর ভুলে যাই সিংহের গাম্ভীর্য;
আকাশ চেয়ে আমরা তো দলে দলে বিব্রত পথিক
চাই নাজাতের অনাবিলতা সুপথপ্রাপ্ত এক ত্রাণকর্তা
পর্বতের বরফের মতো বুকে যার দৃঢ় অবিচলতা
এমুর সংঘবদ্ধ ডানা অকুতোভয় সংগ্রামে দুঃসাহসী চিতা।
. . .
পথহাঁটা চাই
তুমি চলে যাবার পর
দেবদারু গাছটি আমার
বারান্দায় দাঁড়ানো টবে ফাইকাস মনে হয়
নিমিষেই পাহাড়, সাগর টিলা ও নদী হয়ে যায়…
তুমি চলে যাবার পর
আমার ঝিলের উৎলার জলের
ডানপিটে দিনের বুদবুদ থেমে থেমে বয়
বুকে জলে জ্বলে ওঠা আগুনের শ্বাস নিভে যায়…
টিলা ও নদী
উৎলার হৃদি
চায় বুঝি তবে বৃষ্টির সুখ
হতে চায় সাগরপাহাড় তারা উৎলার গহিন ডহর;
হেঁটে গেলে নিরবধি
পাওয়া যায় জলধি
ছোঁয়া যায় হিমালয় বুক
আমি পথহাঁটা চাই পায়ের গোড়ালি টেনে প্রখর!
. . .
নাওকোর চিঠি
তোরু
আমিও তোমার মতো
নাওকোর চিঠি বারবার পড়ি
মাঝে মাঝে হারুকির নরওয়েজিয়ান উড খুলি…
নাওকো
তোরুর মতো আমারও আছে নাওকো
এক নয়াগাঙ নারী, আমি
মাঝে মাঝে তার খরস্রোতা জলে হাত ধরে চলি…
শোনো, আমার নাওকো
আমি পাহাড় — তুমি নদী, নাই কারও কিজুকি
খরা-জলে শুয়ে তুমি আমার নয়াগাঙ নারী
নস্টালজিয়া রিদম হাড়ে তুমি আমার নাওকো
আমি হোস্টেলে — তোমার আমি
নদীর আমি
নারীর আমি
তোমার হাত ছেড়ে কোথাও আর যাব না-কো।
. . .

রোদফুল
তুমি, মালভূমি চেয়ে ঠোঁট
আঙুলে ছুঁয়ে নিয়ো পাহাড়বৃন্ত
তারপর পড়ে নিয়ো ঊরুর ভাঁজ
পৃষ্ঠা পৃষ্ঠা লিখে নেবে শিলালেখ আলেখ্য…
তোমার সমতলভূমি ছুঁয়ে
উঠোনে মাঝদরিয়া, বাড়ির নিবিড় কূপ
পইঠায় মধুকুপি ঘাসে আলিশান নগর
প্রথমপাঠ পড়ে নেয় পাঠক সুখকর পাঠ্য…
খসে পড়ে নাকফুল তার
এলোমেলো কাশবন
খুলে নেয় চুলের বিনুনি
নাভি মাখে নাভি, ছাড়ে তার হাড়ের নির্যাস
একদা গিরিখাত ছিল যার অন্ধকার আধার
পালক ছোঁয়ালো তার পর্দায় ভোরের পেখমসূর্য;
বাগানে হেসে ওঠে রোদফুল, বোধফুলে
ভিজে যায় শীতের কুয়াশায় জরার নিবাস।
. . .
আজ হাতঘড়ি পরে তোমার
বাতাসে বৃষ্টির ঘ্রাণ
আকাশে মেঘের যন্ত্রণা
চাই, তবু আমি তোমার নিটোল হাত ধরে এগিয়ে যাই
আমাদের তখন মেঘের কুয়াশায় পাহাড়ে স্তব্ধতার হাড়…
একদিন একটা হোমো
পাশ কেটে হেঁটে গেলে সন্ধ্যায়
বাতাসে তখন খাটাশের ঘ্রাণ
আমাদের হাড়ে ও হাড়ে জ্বলে ওঠে আগুনের পাহাড়…
অতনুর তনু
আমাদের পরিত্যক্ত বাগানবাড়ি চেয়ে
পাশ কেটে সরে এসেছি একদিন
বুঝি আমি শুধু বিরক্তিকর মানুষ ভেবে নিয়ে তোমার
অবশেষে জেনেছি
পৃথিবীতে গভীরতর প্রণয়
রাগী মানুষের প্রেমে; আজ হাতঘড়ি পরে তোমার
সমুদ্রে কণ্ঠস্বর শুনে তুমি বেলায় ফিরে এসো পুনর্বার।
. . .
সাব, ঈদ করি কাল আমি ক্যামনে
বলেন তো সাব, ঈদ করি কাল আমি ক্যামনে
মাস শেষে মাইনে গচ্ছা যায় আমার ঋণের বাইনে
বোনাসে আর কি চলে সাব… চারপেটের উন্দাল
মাংস কী খাব, কতদিন হয় তার গন্ধও — পাইনে…
চারপেটের উন্দাল আগুনে — খরার ফাল্গুনে
নতুন জামা চেয়ে দুই মেয়েছাওয়াল
মাথা কুটে হেমন্তের মরার আগুনে
সাব, বলি ঈদ করি কাল আমি ক্যামনে…
ভাড়াটে ঘরে আমি, কাউয়ার সংসার আমার;
যাকাতের কাপড় দিলেন, আজ
অফিসের বড়োসাব সুফিখান
নতুন পাঞ্জাবি একখান…
পাঞ্জাবিটা পরি কাল, বলেন তো সাব আমি ক্যামনে!
বউ বাচ্চারা পুরনো কাপড়ে ঈদ মাড়াবে বিয়ানে…
পাঞ্জাবিটা পরি বলেন তো সাব কাল আমি ক্যামনে
বলেন তো সাব, ঈদ করি কাল আমি ক্যামনে!
. . .
লা-সাকিন
হে মাসজিদ, শোনো
সেই কবে থেকেই দেখছি
ধর্মকে কতক প্রতারক করেছে রাজনীতির আকার
আজ রাস্তায় সেজদায় নামাজেরে করেছে নতুন শিকার…
তোমার ঘরের মুসল্লি উধাও; আজ
ইস্যু নিয়ে রাস্তায় কলুষিত করে পবিত্র জায়নামাজ!
মূর্খরা শুনো, নামাজ জানি আমি — নয় রাজনীতি কোনও
রাস্তায় দাঁড়িয়ে আজ বেনামাজিরাও হাসতেছে নির্বিকার..
হে মাসজিদ, তোমার ভণ্ডের দল
আজ তারা গতরে পরে নিয়েছে ধর্মের রঙিন লেবাস
কুৎসিত, ঘৃণ্য ও জঘন্য…!
দেদার কাঁদছে কাঠের মিম্বর
কাঁদছে তোমার ইটের মিনার
মিনারে দাঁড়িয়ে আজ ডাকেন না — অসহায় মুয়াজ্জিন
এসো, কল্যাণে শান্তি মেখে ভাঙি যত রাগের বীন
আজ মিনারমিম্বর অবাক! মাগরেবে তারা লা-সাকিন।
. . .

পাঠালাপ : ‘লা-সাকিন’
[থার্ড লেন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে সংকলিত]

লা-সাকিন অথবা ‘আরণ্যিক নির্বোধের ভ্রান্ত দুঃস্বপন’
হায়, ক্ষেমংকর,
অজস্র মঙ্গল তব পারিবে কি করিতে সুন্দর
অবরুদ্ধ যৌবনের জীবন্ত মৃত্যুরে?
আজিকে আর্তের কাছে পারিবে কি করিতে প্রমাণ
নও তুমি নামমাত্র;
তুমি সত্য, তুমি ধ্রুব, ন্যায়নিষ্ঠ তুমি ভগবান?
— প্রশ্ন : সুধীন্দ্রনাথ দত্ত

কবিতায় উচ্চারিত কথার মাজেজা ধর্মের পাবন্দি যারা করেন, তারা যদি বুঝতেন, তাহলে দুনিয়ার ছবিটাই পালটে যেত হেলাল ভাই। কত-না শতাব্দী ধরে এই কথাগুলো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে কিছু মানুষ অবিরাম বলে আসছেন, বাকিরা তবু নির্বিকার। তাদের বোধে এসব কথার আবেদন আজো নিষ্ফল!
বুঝেও বুঝতে না-চাওয়া দলের পাল্লা ভারী পৃথিবীতে। মানুষ বিস্ময়করভাবে বুদ্ধিমান প্রাণী, আবার একই মানুষ বিস্ময়করভাবে নির্বোধও বটে! দীনের নামে এর খোলস নিয়ে পড়ে থাকা লোকজন চিরকাল সংখ্যায় বৃহৎ ছিলেন বা এখনো তাই আছেন। যে-কারণে ‘লা-সাকিন’-এ মর্মরিত বার্তা একধরনের মিথের মতো মনে হয়। অক্ষমের সান্ত্বনা লাভের চেষ্টার মতো করুণ আর ব্যর্থ শোনায় তা।
আধ্যাত্মিক প্রশান্তিতে অবগাহনের তুরীয় আনন্দ লাভের জন্য আমরা ধর্মচর্চার কথা বলি। এর অনিবার্যতাকে বারবার সামনে হাজির করি। বাস্তবে বিপরীত ঘটনার বাড়াবাড়ি আধিপত্য দেখি সর্বাধিক। স্পিরিচুয়াল বিউটি, মরমি সংবেদন, আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও পরিতোষ… এসব বচনকে গালভরা বুলির মতো মনে হয়!
ধর্ম যেমন মানুষের তৈরি মিথ, ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতাও একই মানুষের তৈরি মিথ। সুন্দর অতিকল্পনা। শুষ্ক ধর্মাচার ও তাকে কেন্দ্র করে চলতে থাকা রাজনীতির বিচিত্র নকশা থেকে স্বস্তির বন্দর খুঁজে নিতে আমরা স্পিরিচুয়াল বিউটিকে সামনে আনি। সৃষ্টির বিস্ময়কে এমন এক শিহরন-ভরা ঘোরলাগা অনুভবে ধারণ করতে চাই যা অনন্ত, যা প্রহেলিকা হওয়ার কারণে শেষ উত্তর বলে কিছু থাকবে না… কেবল বিস্ময় কেবল সীমাহীনতায় নিজের সম্প্রসারণ! এই অতিকল্পনা অনুপম হলেও কেন জানি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মতোই জানতে মন চায় :
ভগবান, ভগবান, রিক্ত নাম তুমি কি কেবলই?
নেই তুমি যথার্থ কি নেই?
তুমি কি সত্যই
আরণ্যিক নির্বোধের ভ্রান্ত দুঃস্বপন?
‘আরণ্যিক নির্বোধের ভ্রান্ত দুঃস্বপন!’ তাই হয়তো… হয়তো এইটে সত্য… বাকি যা-কিছু তার সবখানি ‘মিথ্যা তুমি দশপিঁপড়া’ ছাড়া অন্য কিছু নয়।
. . .

সংযুক্তি : কবিতার শিরোনাম ও শেষের পঙক্তিতে ব্যবহৃত ‘লা-সাকিন’ শব্দটি নিয়ে প্যাঁচ লাগল মনে। আরবি ‘লা’ মানে তো ‘না বা নেই’। ‘সাকিন’ সচরাচর দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। একটি অর্থে ‘সাকিন’ মানে ঠিকানা বা আবাসস্থল। অন্য অর্থে ‘সাকিন’ হলো নীরবতা, প্রশান্তি ও স্থিরতার উপমা। আপনি কোন অর্থে ব্যবহার করেছেন তা ধরতে পারিনি!
ঠিকানা/বাসস্থান অর্থে যদি ব্যবহার করেন, তাহলে ‘আজ মিনারমিম্বর অবাক! মাগরেবে তারা লা-সাকিন।’-এর একটি অর্থ দাঁড়ায়। অর্থাৎ, মিনারমিম্বর নিজে ঠিকানাবিহীন অনিশ্চিত বা নেই হতে চলেছে। যদি নীরবতা/প্রশান্তির অর্থ বোঝায়, তাহলে ‘লা’ এখানে মিনারম্বির নীরব/প্রশান্ত নয় বোঝাচ্ছে মনে হবে। এটি আবার কবিতার সঙ্গে খাপ খায় না।
এটুকু কনফিউশন বাদ দিলে বাকিটা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। সবই ঠিক আছে, যেমন এসব কথা আমরা ‘ঠিক’ ধরে নিয়ে অবিরত বলে আসছি ও পরিণামে ব্যর্থ হতে দেখছি আজো।
. . .

মিনহাজ, কবিতাটি আমি লিখেছিলাম ২০২৫ সালের এপ্রিলের ১৬ তারিখ। ওই সময় রাস্তায় নামাজরত অবস্থায় ব্যারিকেড দিয়েছিল কিছু ভণ্ড রাজনীতিবিদরা। আমি বুঝাতে চেয়েছি মিনারমিম্বরের মতো আমরাও সচেতন নাগরিক, অনন্যোপায় হয়ে সেদিন একেবারেই নীরব ছিলাম। ওইদিন কারও কিছুই করার ছিল না। তবে উল্লেখ্য ঠিকানা/বাসস্থানও ধরে নেওয়া যায়। আর এখানেই বোধ হয় কবিতাটির শিল্পসফলতা।
. . .

জনতার ওই নীরব থাকা মানে ঘটনায় তাদের সম্মতি রয়েছে। তাদের সঙ্গে ধর্ম নিয়ে রাজনীতির খেলোয়াড়দের কোনো ভিন্নতা নেই। সম্মতি যদি না থাকে, যেহেতু প্রতিবাদ করেনি, তারা ভীত ও পরাজিত। প্রতিরোধের সাহস হারিয়েছে।
এমতাবস্থায় আপনার কবিতায় “সাকিন” শব্দের আগে “লা” শব্দ যে অর্থ তৈরি করছে, সেটি নীরব বা প্রশান্ত থাকার সাথে সাংঘর্ষিক। তারা নীরব নেই বা প্রশান্ত নয়… এইটা হওয়ার কথা ছিল, বাস্তবিক তারা কিন্তু নীরব থেকেছে। যে-কারণে আমি ডিফার করছি। সাকিন শব্দের আগে “লা” সুতরাং ঠিকানার সঙ্গে যতটা নৈকট্য ধরে, বাদবাকি অর্থের সঙ্গে তা রাখে না।
. . .

…“নভশ্চিল লাইলাক” কবিতা সিরিজ আরো পড়তে দেখুন …
নভশ্চিল লাইলাক-১ : হেলাল চৌধুরী
. . .

লেখক পরিচয় : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপ দিন
. . .


