কবিতা সিরিজ : ফানা-৪
আহমেদ বেলাল

ফানা-৬০
বন্ধু বলে, কবিতার নাম করে কেন শুধু তার কথা বলো?
তার সকল সফলতা কী করে জানো? দুঃখের রাত্রির গান সেই কি লিখে দেয়?
ধু ধু বালুচরে তার নামেই ফুটো? তার নাম জপে জপে রক্তকে পানি হতে দাও?
সে কি এখানে এসেছিল সত্যি কোনোদিন?
এই-যে, মাটিতে পা রেখে আকাশের পথে পথে অনায়াসেই
হেঁটে হেঁটে যাও — তা কি সম্ভব শুধু ফানার মৃদুহাসির ঝলকে? বলো না গহীন রাতে, কোন যাদুতে
ঘুমের ঘোরেও শুধু তারই নাম থাকে তোমার ঠোঁটে?
সত্যিই কি এই নামের কাউকে পৃথিবীর কেউ দেখেছিল কোনোদিন?
নাকি তোমার উন্মাদ আত্মায় জন্ম তার — সেখানেই বিলীন….?
. . .
ফানা-৬১
শুধু একবার বলেছিলাম ‘তুমি নেই”। সেই থেকে কী অবাক দৃষ্টি, কান্নায় গড়াগড়ি, আগুনে সকল আলো পুড়িয়ে ফেলার মতো অভিমান…
ছায়াপথ, গ্যালাক্সি সব আছড়ে ফেলে তাকালে নিষ্পলক—
তোমার চোখে চোখ রাখতেই মনে হলো সকল সত্য মৃত্যুর মতো উদ্ভাসিত।
তুমিই সবচেয়ে ভালো জানো আমি কেন
সেই থেকে অলীক আলোর মায়ায় মগ্ন—
কেন ঝিরিঝিরি বাতাসের মতো বলি : ‘তুমি আছো, তুমি আছো’…
. . .
ফানা-৬৩
ফানা বাড়িতে নেই। ঈশ্বরহীনতার মতো এটা জানি। তবুও গহীন রাতে দরোজায় অবিরাম করাঘাত করে যাই — টকটকাটক টক।
কেন অন্য কোথাও নয়? এতো বাড়ি, গাড়ি, নারী, নদী চারপাশে…
এতো অধিক মধুমাখা বিষ ঢেলেছি উদরে, হাত দুটো প্রসারিত করেছি হিংসুকের অট্টহাসির মতো দিগ্বিদিক, চোখ জ্বলেছে অনেক আগেই — পরমাত্মীয়দের রেখে যাওয়া প্রার্থনার আভায়।
তবুও কি ঘুম ভাঙবে না ফানা?
সবকিছু বলা হয়ে গেছে, কেউ না কেউ পড়ে ফেলেছে প্রথম থেকে শেষ অবধি লেখা সব ইতিহাস। আর কোনো গল্প নেই, নতুনত্ব মানে নতুন পুনরাবৃত্তি মাত্র। তারপরও এতো রাতে, হাজার বছর পথে পথে হেঁটে কেন তোমার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ফানা?
আমি কি বোকা? ভূতগ্রস্ত? নির্বোধের আশা, মৃত্যু ভয়ে বিহ্বল গভীর চিন্তকের হতাশা? সবকিছু গ্রাস করতে ব্যর্থ কোনো উন্মাদ?
কোনো উত্তর নয়, শুধু বলো তুমি বাড়িতে আছো।
এটা কি সত্যি তোমার বাড়ি?
নাকি আমি আমার কপালেই করাঘাত করে যাচ্ছি শেষ রাত্রির অমাবস্যার মতো?
খেলা শেষের ফাঁকা মাঠ দেখলে অবাক লাগে — সত্যিই কি লক্ষ লক্ষ মানুষ এখানে ছিল একটু আগে? আবারো তারা আসবে? খেলাই তবে সব?
কেউ খেলবে আর আমরা আসবো, দেখবো, হাসবো, কাঁদবো—
এই-ই চলছে এখানে ও ঐ আলোকবর্ষ দূরের অগণিত গ্রহে?
ফানা, সিসিলির পাশেই ভূমধ্যসাগরে প্রথম ডুবেই আমি আমার জন্মমৃত্যুর কান্নাহাসি রেখে এসেছি — এইজন্য এতো চুপচাপ, কাফকা ও জীবনানন্দের সমস্ত অভিশাপ হাতের মুঠোয় নিয়ে নির্ভয়ে, সকল চাওয়া-পাওয়াকে ডিঙিয়ে তোমার কাছে এসেছি—
ফানা,তুমি নেই — (অথবা হয়তো আছো) এটা সমস্যা নয়, অনিঃশেষ ও ভয়ংকর সমস্যা হলো ‘আমি’ আছি।
আমাকে সাড়া দাও…
. . .

ফানা-৬৪
কেন এসেছি ফানা এই কালো চাদরের শহরে—
নিজের আত্মাকে নিয়ে?
হজরে আসওয়াদ তো তোমার ঠোঁটেই ছিল—
সাফা-মারওয়াও কিছুতেই পবিত্র নয় তোমার বুকের তিলের চেয়ে।
সুখের জন্য যতবার বুকে
চুমু দিয়েছি দুঃখী হয়েছি ততবার—
মনে হয়েছে তোমায় ছিঁড়েখুঁড়ে খোঁজ করি আমাদের আত্মার
আমি দেহের যত অভ্যাস ভুলে গেছি ফানা তোমায় প্রথম দেখেই
আমাদের মিলন থেকে আমিই যেন জন্মাই — এইটুকু দাবি শুধু তোমার জরায়ুকে ঘিরে…
মূলত এসেছি সফরে—
যেন জীবনকে রেখে যেতে পারি
নাভি থেকে সামান্য দূরে
তোমার সত্তার সাগরে…
. . .
ফানা-৬৫
তুমিই সকল নগর জঙ্গলের দেবী
সিংহ যখন ঝাপটে ধরে হরিণ — দুই দিকেই থাকে তোমার দাবী
তারেকের পিছনে খলিল
খলিলের পিছনে ট্রাম্প
জমজমাট খেলা চালিয়ে দিয়েছ ফানা
হাসিনা-মোদি কিংকর্তব্যবিমূঢ়, চুপচাপ।
তুমি হাসলেই গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যাবে কেউ — কাঁদলে শুরু হবে যুদ্ধ।
জীবনানন্দ নানা নামে তোমাকেই খুঁজে ছিলেন — মাহমুদ শুধু সোনালী কাবিনেই মুগ্ধ।
চে গাভেরা কি শুধু বিপ্লবই চেয়েছিল?
নাকি তার আগেপিছে ছিলে তুমি?
যারা সর্বগ্রাসী মুক্তির জন্য উন্মদ হয়ে যায়—
তুমি তাদের মনোভূমি।
মেসি, জিদান, দিনহোর পায়ে ফুঁ দিয়েছিলে শৈশবে—
তারা সে-কথা ভুলেনি কখনো
প্রশংসা করে
নৈশ আড্ডায় ডুবে।
যে-গৃহ ত্যগ করেছিলেন বুদ্ধ
আর ধ্যানে পেয়েছিলেন যার খোঁজ
তার সবই পেয়ে যাই আমি ফানা — তোমার বুকে মুখ রাখি যখন রোজ…
. . .
ফানা-৬৬
আজ থেকে নয়, ‘ই’ অথবা ‘এ’ থেকেও নয় — লক্ষ বছরের আগে থেকেই আমরা নিভু নিভু করে জ্বলছি। কেউ বহুদূর থেকে ফুহ্ দিচ্ছে বলেই কি আমাদেরকে নিভু নিভু দেখায় ফানা?
নতুন পুরাতন এইসব বোমারু সময়—
দূরের নিহত নক্ষত্রদেরই ছায়া।
জ্বলেপুড়ে অঙ্গার হয়ে যাচ্ছে কল্পস্বর্গের মতো অপরূপ সব অক্ষর।
তারপরও কেন আমরা খুঁজে ফিরি প্রথম জন্মের মতো পবিত্র আলো!
অথচ আদমের স্বর্গযাত্রাও জানত—
কী করে ক্রমশ ঘিরে ধরছে আমাদের সকল সফলতাকে গহীন অন্ধকার কবর…
. . .

. . .
লেখক পরিচয় : আহমেদ বেলাল

বর্তমানে ইতালি প্রবাসী আহমেদ বেলাল মৌলভীবাজার জেলার সন্তান। শৈশব ও তারুণ্যের অনেকটা সময় ছায়া সুনিবিড় গ্রামের সান্নিধ্যে কেটেছে। একসময় পাঠ নিয়েছেন মাদ্রাসায়। মন টেকেনি বদ্ধ অচলায়তনে। আহমেদ বেলাল ততদিনে জীবনকে ঘিরে যাপিত শত বিলাপ ও কল্লোলে কান পাততে শুরু করেছেন। গ্রামে নিজ চেষ্টায় গড়ে তোলেন পাঠাগার। শহর ও গ্রামে নিত্য যাওয়া-অসার মধ্যে খুঁজে বেড়ান নিজেকে। মধ্যবর্তী কালপর্ব কেটে যায় মরুর দেশে প্রবাসে। সেখান থেকে ইতালি গমন করেন পরে। দেশ থেকে ভিনদেশে নীড় পাতলেও আহমেদ বেলালের জিজ্ঞাসু মন আজো সমানভাবে উৎকর্ণ যাপনের দিকে। ভালোবাসেন দেশ। প্রিয় জ্ঞানে আঁকড় ধরেন কবিতা-সহ আরো অনেককিছু। ব্যস্ত প্রবাসজীবনে এভাবে লিখে ফেলেন ‘ফানা’… যা তাঁর কাছে ‘মায়াবী মৌনতা’। এখনো কোনো বই বের হয়নি কবির। তবে ‘ফানা’ হয়তো বই-আকারে বেরুবে শীঘ্রই।
. . .


