পোস্ট শোকেস - সাহিত্যবাসর

কবিতার কথা : সৈয়দ আফসার

Reading time 9 minute
5
(15)
Conceptual Artwork, in collaboration with Gemini; @thirdlanespace.com

আমার ধারণা, কথা-বিবরণ-তাৎপর্য এই তিনের সফল স্থাপনই হচ্ছে কবিতা! কবিতা, তিনটি ধ্বনির সমষ্টি একটি শব্দ মাত্র, যার ভেতর আছে ভাবনা ও সাধনা। কখনো কখনো এও ভাবি,—যা দেখিনি, ভাবিনি, দোলা দেয়নি কিন্তু মনেপ্রাণে অনুভব করি ‘মানুষের সঙ্গে থাকা, সময়ের সঙ্গে থাকা, প্রয়োজনে জনমানুষের ডাকে সাড়া দেয়া।’ মানুষ আর সময় আমার কাছে শ্রেষ্ঠ কবিতা। এখন ভাবতে মন চায় সঙ্গ দিতে গিয়ে সব সঙ্গই কি মনে দোলা দেয়? আমার কি সব কথা মনে থাকে? মনে মনে অনেক কথা ভাবি, যতক্ষণ জেগে থাকি ততক্ষণ মনের সাথে কথা বলি,—সব কথা কি মনে রাখি? কথা বলে ফেলা আর ধরে রাখার ভেতর যে-আনন্দ থাকে, না-বলার ভেতরও ভিন্ন অনুভব জাগে। কথা বলে ফেলার পর তাকে আর তুলে নেয়া যায় না, কথার মর্মকথা আর একার থাকে না। পাঠক সে-কথাকে তার নিজের চেতনায় লালন করেন, নিজের মতো জাগিয়ে তোলেন। যেমন এই-যে আমি হাঁটছি, পা ফেলছি, গন্তব্যে ফেরার তাড়না আনন্দ দিচ্ছে,—আনন্দও আমার ভেতর কথা বলছে অবচেতনে। আমি ফেরার তাড়নার ভেতর শ্বাস টানছি, নিরুদ্বেগ চিন্তা-কল্পনা আমাকে জাগিয়ে তুলছে, জিজ্ঞাসা করছে…

অবলীলায় অনেক কথা বলা যায়, অনেক কটুকথাও চারিয়ে নেয়া যায়। চারানোর দরকারও পড়ে। একসময় বাউণ্ডুলে ঘুরতে ভালো লাগত। উচ্চসুরে গান শুনতাম। বাঁশি বাজানোর বেশি শখ ছিল আমার। বাঁশি আর গানের সুর;—আজও সেই আশা বুকে পুষি…। কিন্তু কবিতা কেন লিখি? তা ভাবার আগে ভাবতে মন চায়, কবিতা না লিখলে কি হতাম! ভাবলাম অনেক… সব ভাবনার খারাপ-ভালো দুটি দিক আছে, আছে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াও, কিন্তু কবিতা আমাকে হেমন্তে-শীতে তার ঈর্ষা ও প্রলোভন রাবারের মতো লম্বা হতে হতে ভাবানুভূতির চূড়ান্ত মুহূর্তগুলোয় বিস্মিত রাখে!

কবিতা ভালোবাসি বলেই স্বজনরা আমাকে ‘পরজন’ ভাবে। কবিতা লিখলে বা পড়লে কারো ক্ষতি হয় না। কবিতা কোনো শব্দ করে না। কবিতা সঙ্গী চায়;—সঙ্গ দেয় না। কবিতা লেখার জন্য টাকাপয়সা খরচ করতে হয় না। কোথাও যাবার প্রয়োজন পড়ে না। কবিতা কাউকে জ্বালায় না, পোড়ায় না। অক্ষরজ্ঞান হলেই কবিতা লেখা যায়। কবিতার জন্য একাডেমিক শিক্ষার প্রয়োজন পড়ে না। কবিতা লেখার জন্য কোনো আয়োজনও লাগে না। ঘরের কোণে বনে-বাদাড়ে যখনই মন চায় কবিতা লিখে ফেলা যায়। কবিতার ভেতর আমি আমাকেই খুঁজি। আমাকেই মনের আয়নায় দেখি;—খুঁজি বেড়ে ওঠা আমার শৈশব-কৈশোরের দিনগুলি…

কবিতা কি শুধু শব্দের ঝংকার? কবিতা কি শব্দবদ্ধতার সমষ্টি? কবিতা কি মুহূর্তকে ধরে রাখার আকুতি? কবিতা কী…? কবিতার সংজ্ঞা আমি জানি না। কারণ, কবিতা কীভাবে লেখা হয়, কবিতার বিষয়বস্তু শেষপর্যন্ত কোথায় শেষ হবে তা আগে থেকে ভাবা যায় না। তবে সচেতনভাবে খেয়াল রাখতে হয় শব্দ, ছন্দ কিংবা বাক্য বুননের দিকটা। কবি তাঁর কবিতায় এমন শব্দ-গাঁথুনি দিয়ে কবিতাকে জাগিয়ে তুলতে চান বা চাচ্ছেন,—পাঠকের পড়তে ভালো লাগছে, কিন্তু শেষপর্যন্ত কবিতাটির কোনো অর্থবহ উপস্থাপনা তার ভেতর জেগে ওঠেনি, পাঠকের অনুভব-অনুভূতিতে দাগ কাটেনি কিংবা তিনি তা জাগিয়ে তুলতে পারেননি।

পাঠক যে-শব্দজট খুলতে পারেননি সেখানে ব্যর্থতা পাঠকের নয়,—কবির ব্যর্থতা। এ-দায় কবিকেই নিতে হবে। পাঠককে সেই শব্দ-বাক্যের ভেতর ঢোকার ছন্দ দিতে হবে। তবে একথাও ঠিক,—সব কবিতা সব পাঠকের ভালো নাও লাগতে পারে। একজন কবি কবিতা লেখেন নিজের জন্য, কবিতার প্রথম পাঠক কবি নিজে;—কখন কোথায় কীভাবে কোন পরিস্থিতিতে তাকে লিখতে হয় তা কিন্তু তিনি জানেন না। হয়তো আমি বলছি :

এই-যে তুমি ফুটপাত ছাড়া পিচ রাস্তায় হেঁটে গেলে ভরদুপুরে,—অজানার ভেতর পায়ের ছাপ না-দাঁড়ালে কোথায় খুঁজবো তোমাকে। হাঁটার আগে গোপনে আমাকে কি ছায়া বানানো গেল না? তবে এই নাও দেওয়াল; নাও খোলো গোপন টান, যদি নীরবে কিছু ঘটে জেনো সুনসান… আড়ালে আমাকে বলো না শীততীব্ৰকাহন। দৃষ্টির আবরণ খুললেই শেখো পরিমাপ, টলে যাওয়া ঘুমে সহজে চেয়েছো পরিত্রাণ; আমিও বনের রাজা হলে ধরে রাখবো পুরনোদিন।

আমি যখন জীবনানন্দের কবিতা পাঠ করি তখন প্রতিটি লাইন পড়ে আমাকে থামতে হয়। কেন থামতে হয়? কারণ লাইনটি আমাকে থামাতে বাধ্য করেছে। দৃশ্য (দৃশ্যকল্প) আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আমার চোখ গুলিয়ে খেলছে ‘হাওয়ার রাত, লেবুপাতার ঘ্রাণ, মদের গ্লাস, পাখির পালক, নদী, পাখি, শাদা বক, দূর্বাঘাস’…

কবিতা যখন পড়ি বা দুই লাইন লিখতে মন চায় তখন কিন্তু আমার সামনে কেউ নেই; অথচ আমার চোখের সামনে এমন মানুষের স্মৃতি;—অপরিচিত মানুষের অবয়ব; অচেনা সময়;—এসব দৃশ্য চোখের পরত জুড়ে হাসে। পরিচিত অবয়ব আমাকে লিখতে অনুপ্রাণিত করে। কেননা, লিখতে-লিখতে যে-কলমের কালি ফুরিয়ে গেল, কলমটির প্রয়োজনীয়তা শেষ হলো, কিন্তু সেই কলমের-তো কিছু স্মৃতি আছে, যা আমাকে ভাবায়! এই কলম দিয়ে লাইনের পর লাইন লিখেছি আবার কেটেছি; কলমটিকে বালিশের পাশে নিয়ে ঘুমিয়েছিও;—সেও-তো আমার স্মৃতির অংশ। কবিতা যদি হয় শূন্য করতলে জেগে ওঠা রেখার সজীবতা, কবিতা যদি হয় জলের আঁচলে বাঁধা চিহ্ন কিংবা রেখা, কবিতা যদি হয় হাজার শ্বাসের ভেতর না-ফোটা পুরো দশ আঙুলের ম্যারপ্যাঁচ,—অবলুপ্ত দ্বিধা… কবিতা যদি হয় জিজ্ঞাসা, একান্ত প্ররোচনা…

দৃষ্টি খুলেই অনায়াসে ব্যথা পাই; ব্যথার ভেতর লোভনীয় হলেও ভরসা পাই। দীর্ঘ ভরসায় শ্বাস টেনে নীরব চোখ বুজে থাকি। পুলকিত হই। আমাকে তাড়া করে সম্পর্ক। আমাকে তাড়ায় স্পর্শ। আমাকে তাড়া করে বদচোখের ইশারা ও আঘাত। দৃষ্টি ফেরালেই দেখি তার এলোকেশী চুলের ঘ্রাণ হাত ধরাধরি করে হাঁটছে বাতাসে। আর আমি তাকাচ্ছি…। বন্ধ চোখ তাকাচ্ছে মনোযোগ, বিভ্রান্তি। কাঁধ চেপে ধরে অবাক করে দেয়া ব্যক্তি-জিজ্ঞাসা।

নিজের ভেতর যে-উন্মাদনা খেলা করে, মৌনাকাঙ্ক্ষাও সুখে-দুঃখে আপন করে তোলে;—আমার জিজ্ঞাসা, আমার জীবনযাত্রা কোনো দর্শন নয়, দর্শন আমার কাছে স্রেফ বেঁচে থাকা। কীভাবে বেঁচে আছি আমি, কীভাবে বেঁচে আছে সরলতা, পাড়া-পড়শির ছায়া ও কায়া। ঘোর অন্ধকারে আমার চোখে ভাসে জল, দৃষ্টিও খুলে রাখে গোপনস্পৃহা… বুকপাঁজরেও জাগে ব্যথা। সহজ-সরল কথার পাশাপাশি থাকে স্মৃতিসম্পর্ক-ব্যস্ততা-বাস্তবতা। কিন্তু পরিস্থিতি আমাকে হতাশাব্যঞ্জক অবস্থায় ঠেলে দিয়ে অবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। বিকল্প আশাও-যে জাগে না তা নয়। স্পর্শ-উৎকণ্ঠা এমনি হতে পারে যেমন কখনো কখনো দূর্বাজলের সচেতনস্পর্শও নির্যাসভারে স্বপ্নভঙ্গ করে;—লক্ষ্য স্থির করে রাখার বদলে পথ হওয়ার আর্তনাদ জাগায়।

নিমেষেই চিনে রাখে সময়, অসমদূরত্ব… অপরিচিত মুখের দিকে তাকালেই চোখের বোবা ভাষা অহেতুক খুঁজে পাথর আর অচেনা পথ… প্রায়শ একাকী দাঁড়াই;—নিজের ছায়ার মাঝে নিজের নিরাপত্তা চাই; রোদে শরীর পোড়াই; শীতে ওম খুঁজি… হাতে হাত ঘঁষে কখনো-সখনো উষ্ণতা মিলে। জানি হাঁটারও একাগ্রতা আছে। তারপর ভাবছি যতগুলো মুখ দৃষ্টির জালে ওঠে, ততগুলো কবিতায় না জাগালে ক্ষতি নেই! চোখের পাশে দাঁড়ানো আর নিজের ভেতর নিজেকে তাড়ানো কখনো একই আবর্তে আসে না;—যদি না স্পর্শ থেকে তৃপ্তি আসে…

মূল কথায় ফিরি। ‘আমার ধারণা, কথা-বিবরণ-তাৎপর্য এই তিনের সফল স্থাপনই হচ্ছে কবিতা।’ তাহলে প্রথমে ভাবা দরকার কোন ‘কথা’গুলো কবিতার জন্য মানানসই, কোন ‘কথা’গুলো কবিতার জন্য নয়। প্রাণী মাত্রই মরণশীল, আর সব প্রাণীই তার ভাষায় কথা বলে। আমার মতে অনেক প্রাণী আমাদের ভাষা বুঝে বা পুষে। আমরা হয়তো কিছু বুঝি কিন্তু পুষি না। সবাই কথা বলি, মনের ভাব প্রকাশ করি, যারা বোবা তারাও আকারে-ইঙ্গিতে কথা বলেন;—কেউ অঙ্গের ইশারায়, কেউ স্বপ্নেও…। কথার আবার প্রকারভেদ আছে;—কেউ কথা বলেন হাসির ছলে, কেউ গোমড়া মুখে, কেউ দাঁত বের করে, কেউ তোতলায়, কেউ জোরে, কেউ আস্তে, কেউ আড়ালে, কেউ সারাক্ষণ মুঠোফোনে, কেউ গোপনে, কেউ কারণে-অকারণে, কেউ সত্য বলে, কেউ মিথ্যা বলে, কেউ আবার সত্য-মিথ্যা একত্রে গুলিয়ে কথা বলে। এসব যদি কবিতার কথা নয়, তবে কোনটি কবিতার কথা?—সেখানেই আমার জিজ্ঞাসা।

অনেকে মনে করেন চোখে চোখে যে-কথা হয় তা অলৌকিক রসাস্বাদন…। আর এই অলৌকিক রসাস্বাদনই কবিতার শ্রেষ্ঠকথা। তাদের মতে সে-কথাটির ভেতর অনেক আনন্দ থাকে, আর আনন্দের ভেতর যে-রসাস্বাদনের কিছু রকমসকম থাকে… তা যাপিত জীবনকে চেখে দেখার কিংবা নিজের অসহায়ত্বের কারণগুলো খুঁজে দেখার সামান্যক্ষণই। অনেককে আমি জিজ্ঞাসা করেছি—আপনার মতে কবিতার কথা কী? তারা জীবনবাবুর মতো বলে নিজের দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন :

ঝাপসা উত্তর দেবার আগে এরকম বলা যায়, ‘কবিতা অনেক রকম’। কবিতা মনের কথা, যা কখনো বলে বোঝানো যায় না। লিখতে ইচ্ছা করে, কিন্তু লিখতে বসলে অপূর্ণতা থেকে যাওয়া;—সারারাত ভেবে একটি লাইন লেখা হয় না! কবিতা একটি ফুল। কবিতা ফুলের কলি। কবিতা সবুজ পাপড়ি। কবিতা মরা ডাল। কবিতা সতেজ ডালের ছায়া। কবিতা একটি…

এখন আমাদের একটু খুঁজে দেখা দরকার কথার অনেকে রকমসকম রেখে কেন অনেকেই মনে করেন ‘চোখের ভাষাই কবিতা’! কারণ হিসেবে আমার মনে হয়-যে, কোনো চারটি চোখ যখন এক জায়গায় লক্ষ্য স্থির করে তার মাঝামাঝিতে যে-অনুভূতি-অনুভব তৈরি করে, তাই হলো কবিতার কথা। আবার এদিক থেকে ভেবে দেখা যায়,—চোখ বন্ধ করে যখন আমরা কিছু চিন্তা করি, তখন আমরা যা ভাবছি তার পুরো অবয়ব আমার স্মৃতিদর্পণে দাঁড়িয়ে আমাকে পুলকিত করে;—কথাই মনের চোখ, আর স্মৃতি রোমন্থন হলো কবিতা। চোখ বন্ধ হলেই সারাদিনের ব্যস্ততা আমার সামনে দাঁড়ায়। সেখান থেকেই কবিতারা প্রাণ পায়;—একবছর আগের কোনো স্মৃতিও কবিতায় জড়ায়…

আবার কথারও খারাপ-ভালো দুটো দিক আছে। কিছু কথা আছে যা বারবার শুনতে মন চায়। কিছু কথা আছে জীবন বদলায়। কিছু কথা আছে আজো স্মরণ হলে গা শিউরে ওঠে। কিছু কথা আছে জন্মাবধি তাতাবে। কিছু কথার ব্যথাও আছে, যা আমাকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। বাস্তবতাও আবেগী করে তোলে। কিছু স্থূলকথা আছে, যা কখনো মনে না রাখলেও চলে; কেননা মানুষ যতক্ষণ জেগে থাকে ততক্ষণ কথা বলে, চিন্তা করে, কিন্তু কথা হলো,—মানুষ যা ভাবে, চিন্তা করে, উপলব্ধি করে… সে কি তার পুরোটা বলে? বলে না।

কবিও তো মানুষ! তাই কবির সঙ্গে কবিতার কথা, কবির সঙ্গে কবিতার গোপনকথা, ‘প্রতিটি মুহূর্তে তুমি কবি’ কবিকেই ভাবতে হয়। কবিকেই মনের আকাঙ্ক্ষা অনুভব স্পন্দনের বীজ সম্প্রসারণ করে কবিতা লিখতে হয়। কবিতার কথা-বিবরণ-তাৎপর্য কবির চিন্তা-ভাবনার ভেতর বেড়ে ওঠে। কেননা ‘সব কবির পদ্ধতি এক নয়, হওয়াটা সম্ভব নয়।’ কবি তাঁর নিজের মতো করে ভাবেন :—‘তুমি, সম্ভবত একটি পাতা। শেষপর্যন্ত তুমি একটি পাতাই।’
. . .

পাঠ-সংযুক্তি : কবির মনোবীজে কবিতাকথা

কবি সৈয়দ আফসার রচিত ‘কবিতাকথা’ তাঁর নতুন লেখা নয়। পনেরো বছর আগে কবি নাজমুল হক নাজু সম্পাদিত ছোটকাগজ ‘ঘাস’ লেখাটি ছেপেছিলেন। পনেরো বছর পর লেখাটির দিকে ফিরে তাকানো এজন্য-যে, কবিতামগ্ন ভাষায় বলা কথাগুলো নিজের আবেদন ধরে রেখেছে।

কবিতায় যাপন করতে ভালোবাসেন এমন একজন কথাগুলো লিখেছিলেন ওই সময়ে বসে। কথার জাহাজ প্রমাণ করার উদ্দেশ্য থেকে লিখেননি। এই লেখায় বিদ্যার ছটা নেই, কিন্তু অনুভবের গাঢ়তা আছে। কথার জটিল মারপ্যাঁচে কবিতার ‘সংজ্ঞা’ ও কবির ‘মতামত’ প্রতিষ্ঠার তোড়জোর চোখে পড়ছে না, তবে ‘সংজ্ঞা ও মতামত’ রচয়িতা রেখে গেছেন সহজ কথার টানে। লেখার শুরুতেই পাঠক পাচ্ছে সেটা। কলমের টানে সৈয়দ আফসার লিখছেন :

কথা-বিবরণ-তাৎপর্য এই তিনের সফল স্থাপনই হচ্ছে কবিতা!

কবিতার ‘সংজ্ঞা’ তাঁর জানা নেই;—কখাটি লেখায় তিনি পরে বলছেন, কিন্তু উপরে যে-সূচনাবাক্য মাত্র কোট করেছি, লেখার পরিশেষে তা ফেরত এনেছেন। ফেরত আনায় বার্তাটা পাঠক পেয়ে যায়,—কবিতা নিয়ে শতমুখী প্রশ্নের মীমাংসায় এটা হলো কবি সৈয়দ আফসারের পক্ষ থেকে ‘উত্তর’। উত্তর দিতে বসে ভাবিয়ে তোলার মতো জটিল, গুরুগম্ভীর, পাণ্ডিত্যঠাসা সড়ক ধরে তিনি হাঁটেননি, বরং নিজের পানে তাকিয়েছেন। জরুরি প্রশ্ন করেছেন নিজেকে :

তাঁর কাছে কবিতা কী, আর কেনই-বা তিনি লিখতে ভালোবাসছেন কবিতা?

প্রশ্নটা কাজেই অনুকূল স্রোতে নাও বাইতে থাকা মাঝির স্বস্তি তাঁকে দিয়েছে। সৈয়দ আফসার তরতর করে নাওটা বেয়েছেন এই ছোট্ট রচনায়। গদ্যভাষার চালে একটা কবিতাই মূলত লিখেছেন। গদ্য করে বলার ছলে কবিতা-মনোরম সৈকত থেকে নুড়ি কুড়িয়ে নিতে সংকোচ করেননি। মনে জমাট কথারা যে-কারণে আপনবেগে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। ওই বেগটা যদি না থাকত, এ-রচনার দিকে পনেরো বছর পর ফিরে তাকানোর দরকার পড়ত না।

কবিতার অন্ধিসন্ধি নিয়ে সাহিত্য আলোচক, কোনো প্রাবন্ধিক কিংবা গবেষক যেমন করে সচরাচর লিখবেন, সৈয়দ আফসারের জন্য সেভাবে লেখাটা কঠিন। ওরকম কিছু করতে গেলে স্বাচ্ছন্দ্যটা হয়তো থাকত না এমন। এই স্বাচ্ছন্দ্য আবার তাঁকে দিয়ে মনে রাখার মতো ভেবে দেখার মতো কথা লিখিয়ে নিয়েছে। যেমন, ‘কথা’ কী-করে কবিতার রসদ হয়ে ওঠে তা বলতে যেয়ে এক জায়গায় লিখেছেন :

আমার মতে অনেক প্রাণী আমাদের ভাষা বুঝে বা পুষে। আমরা হয়তো কিছু বুঝি কিন্তু পুষি না।

Books and Little Magazine: Written and Edited by Syed Afsar; Collage; Source & Credit: Author

বিশুদ্ধ অনুভব থেকে কথাটি লিখেছেন সৈয়দ আফসার। লেখার সময় তাঁর হয়তো মনেও আসেনি,—কবিতার মতো ভাষামাধ্যমের জন্য দারুণ মূল্যবান একটা কথা তিনি লিখছেন অনায়াসে! মানুষের ব্যবহৃত ও বোধগম্য ভাষায় কবিতা লেখা হয়। তা-সত্ত্বেও সৃষ্টিলগ্নে কবি অনেক শব্দ ও অর্থ তৈরি করেন, যেগুলো ভাষার দিগন্তকে নতুন করে বিস্তারিত করে। সেখানে মানুষ বাদে অন্য প্রাণীর ভাষাধ্বনি কবি অন্য অনেকের মতো কিছুটা বোঝেন, বাকিটা অবোধ্যই থেকে যায়!

যেটুকু বোঝেন, তা কি কোনো কবি পোষেন নিজের ভিতরে? প্রশ্নটা কবিতার পরিসরকে কেবল বড়োই করছে না এখানে, এটাও বুঝিয়ে দিচ্ছে,—কবির বিচরণ মানব-পরিসরে হতে পারে, কিন্তু তার যোগ সমগ্র জগতের সঙ্গে। যোগটি যত ভালোভাবে ভিতরে ঢুকবে, কবিতার চেনা ভাষায় অচেনা সংযোগ আনবে নতুন মাত্রা কোনো। কবি আদতে ভাষা-উৎপাদক যন্ত্র। বিচিত্র এই ভুবনকে নিজের ভিতরে ধারণ ও পোষার সক্ষমতা তার জন্য জরুরি। এটা কেবল চিন্তা ও অনুভবের বিষয় নয়, বরং চিন্তা ও অনুভবের গাঢ় রসায়ন থেকে জন্ম নেয় নতুন কবিতা।

সেই নতুন কবিতা যাপন অথবা লেখার প্রশ্নে ভাষা কবিকে কতটা সাহায্য করে? সৈয়দ আফসার প্রশ্নটা তুলেছেন : ‘কিন্তু কথা হলো,—মানুষ যা ভাবে, চিন্তা করে, উপলব্ধি করে… সে কি তার পুরোটা বলে?’ নিজেই উত্তর দিয়েছেন, ‘না, বলে না।’ এই ‘না বলতে পরা’র পেছনে কত-না কারণ লুকিয়ে থাকে। সৈয়দ আফসার সেসব কারণ ব্যাখ্যা না করলেও, এটা নির্দয় সত্য কবির জীবনে,—ভাষা তাকে যতটা লেখায়, না-বলা ভাষা বা বলে উঠতে না-পারা ভাষা তাকে ততটাই মৌন রাখে। কবিতা পড়তে যেয়ে পাঠক অনেকসময় বোঝা না বোঝার জটিলতায় পড়ে, দুর্বোধ্যতার দায় চাপায় কবির ঘাড়ে, যেখানে এই বলতে না পারার দায় কিন্তু কম নয়! সৈয়দ আফসারের কথাস্রোত এই জায়গায় স্ববিরোধী লেগেছে দেখে। লেখার শুরুতে তিনি বলেছেন :

পাঠক যে-শব্দজট খুলতে পারেননি সেখানে ব্যর্থতা পাঠকের নয়,—কবির ব্যর্থতা। এ-দায় কবিকেই নিতে হবে। পাঠককে সেই শব্দ-বাক্যের ভেতর ঢোকার ছন্দ দিতে হবে।

কবি কী করে দেবে, যখন তার ভিতরে ভাষাসংকট চলছে! যা পুষে রেখেছে মনে, তার কিছুটা ভাষায় বোধগম্য, বাকিটা বোধগম্য করানোর ভাষা কবির নিজের অজানা! ভাষা যেমন তার মারণাস্ত্র, ওটাই আবার পালটা তাকে মেরে রাখে। কোনো কবি কি সচেতনভাবে পাঠক বুঝবে না এই মতলবে লেখে কবিতা? নাকি তার ভিতরে চলতে থাকা ভাষাসৃজন প্রক্রিয়া যেসব জটিল চড়াই-উৎরাই পার হচ্ছে, সেখানে সবটা নয় দিনের আলোর মতো স্বচ্ছ! সৈয়দ আফসার এই প্রশ্নটাকে লেখায় হেলা করেছেন মনে হয়েছে। একটা স্ববিরোধ যে-কারণে তাঁর লেখায় নেই তা বলা যাবে না।

লেখাটি যেহেতু একজন কবি তার অন্তর্গত মনে জমে থাকা অনুভব দিয়ে লিখেছেন, এবং লেখার পর দেখা যাচ্ছে ভাবিয়ে তোলার মতো ছোট-ছোট প্রসঙ্গরা সেখানে দিব্যি রয়েছে, এটা আর নিছক ‘কেন কবিতা, কেন কবিতা লিখি’ টাইপের গৎবাঁধা প্রশ্নে দাঁড়িয়ে থাকেনি। একটা সৎ আন্তর-অনুভব এই রচনায় ঠিকরে পড়ায়, পনরো বছর পরেও তাকে মলিন মনে হচ্ছে না। পড়তে ও অন্যকে পড়ানোর ইচ্ছেটা পাঠকের জেগে থাকছে।

‘ঘাস’ সম্পদককে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে থার্ড লেন স্পেস-এ সংরক্ষণের তালিকায় সংযুক্ত হলো এখন।

—আহমদ মিনহাজ : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস

. . .

…লেখক পরিচয় : সৈয়দ আফসার…

সৈয়দ আফসার সুনামগঞ্জের সন্তান। জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুর গ্রামে জন্ম ও বেড়ে উঠেছেন সেখানে। বর্তমানে যুক্তরাজ্য প্রবাসী কবি দুই দশকের অধিক সময় ধরে কবিতাচর্চায় নিবেদিত। কবিতার পাশাপাশি গদ্যও লেখেন অনিয়মিত। শূন্য দশকের গোড়া থেকে ছোটকাগজ ‘অর্কিড’ সম্পাদনা করে আসছেন। কবিতানিষ্ঠ ‘অর্কিড’-এর ৮টি সংখ্যা মান ও সম্পাদনায় ছোটকাগজের পাঠকমহলে সমাদৃত শুরু থেকে।

গদ্য ও কবিতা মিলিয়ে ৭টি বই বেরিয়েছে। কবিতাবই ‘নিঃসঙ্গী নিহিতার্থে’, ‘যথা কথকতা’, ‘জলের করাত’, ‘উড়াল হাওয়া’, ‘সেলাই গাছের কারখানা’, ‘মুহূর্তমন্দিরা’, আর ব্লগে লেখা গদ্যবই ‘ব্লগাবলী’ তাঁর স্বকীয়যাত্রাকে চিনিয়েছে। সৈয়দ আফসার এছাড়াও ভালোবাসেন বাউল ও বন্ধুসঙ্গ। প্রবাসী হওয়ার আগে দেশে তাঁর সম্পাদিত ছোটকাগজ ‘অকির্ড’কে কেন্দ্র করে কবি-লেখকদের প্রাণবন্ত আড্ডা গড়ে উঠেছিল সিলেট শহরে।

. . .

সৈয়দ আফসার : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস.কম

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 15

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *