আসুন ভাবি - পোস্ট শোকেস

মন-মিররে কিছু প্রলাপ ও ঈগলটনের সাহিত্য : সন্তর্পণ ভৌমিক

Reading time 28 minute
5
(28)

আগে একটু প্রলাপ বকে নিই :

—নাম কী?
: খ (য়) বর
—পিতার নাম?
: খচ্‌চর (কয়সর!)
—চাঁড়াল না চণ্ডাল?
: জ্বে জাউল্যা
—বার্থের নাম শুনেছিস?
: বাত তো ছার (স্যার!) ১৪ পুরুষের…
সারিবাদ্য বলারিস্ট ২ বেলা…
—আর গ্রামসি?
: গ্রামে করি বাস, দুঃখ বারোমাস
—ফ্যামিলি প্ল্যানিং?
: করছি। তবুও বছরে বছরে…
—তোদের জন্যই দেরিদা বলেছিলেন…
…খগেনদা, নৃপেনদা দুই ভাই নাকি বুটে (ভোটে!) দাঁড়াবে (আহা, বুট চাই বুটারের)

Conceptual Artwork I: Death of the Author, in collaboration with Gemini; @thirdlanespace.com

আমরা সব সমাজবিজ্ঞানী। সমাজের অনুলোমে লুলু (lulu) নামক আদুরে কুকুরকে খুঁজে বেড়াই। কুকুরের ঘেউ কিংবা বেড়ালের ম্যাওকে ফাউ সব মানুষের মুখে বসিয়ে থিসিস লিখছি ২০০০ পাতা। নব্য আধুনিকাদের প্রতীক্ষায় স্টাডি করি সাব-অল্টার্ন (Subaltern)। এবং সদা সচেতন;—Contradictory Consciousness বলে কথা। সকাল থেকে বিছানা অবধি ঘাম ফেলা কর্মমোহ, বউমোহ, কামমোহ—পাশাপাশি পণ্যমোহের (মার্কস!) হাতছানি। বিজ্ঞাপনে শ্লীল-অশ্লীল বলে কথা নেই। পর্নো নায়িকার পাশাপাশি হাল আমলের সবচেয়ে মূল্যবান কবির কবিতা। ধরা পড়লে কবিতা পড়ছি। বউপ্রিয় মানুষের এই তো বাঁচোয়া। তারও আঁকাবুকিতে, ফাঁকা গহ্বরে উঁকি মারে মায়াদর্পণের Practical Consciousness (গ্রামসি!)। সাব-অল্টার্ন বিজ্ঞরা বাবুরাম সাপুড়েকে ধরে এনে লড়াই ও বিদ্রোহ, শোষক ও শোষিতের সমাজবিন্যাস বিশ্লেষণ করেন। তোদের সবচে’ বড়ো Problem কি জানিস!—তোদের নিজস্ব কোনো ভাষা নেই। ভাষাবোধ, ব্যাকরণ, উচ্চারণভঙ্গি—সবকিছু নকল। প্রভুর ভাষা অনুকরণ করতে গিয়ে বাবুরামের যেটুকু স্বকীয় সত্তা ছিল, সেটুকুও অচিরেই হারিয়ে যায়। মোদ্দা কথা লাভ হলো কি? প্রভুর ভাষার বিকৃতি। উত্তম ইংলিশের পরিবর্তে বা(ং)লিশের Pre-mature অনুকরণ।

তো, নিম্নবর্গের মানুষের দর্শন উপরতলার বুড়োদের (জ্ঞানবৃদ্ধ!) দ্বারা প্রভাবিত। এ- সীমাবদ্ধতা অনিবার্যভাবেই ভাষাগত। ভাষা যেহেতু Obscure, চিন্তার দোলাচল থেকে মুক্তি তো নেই-ই। অবশ্য মুক্তির এই দায় নিচ্ছেন সাব-অল্টার্ন সমাজবিজ্ঞানীরা। আর, এইসব সমাজবিজ্ঞানের নিরন্তর হামাগুঁড়িতে the author is dead. একটি লেখার প্রাণস্থলে লেখকের বিভিন্ন সত্তার নিরবয়ব উপস্থিতি;—বেচারা এ্যালান পো, ব্রাহ্মণ বার্থের ব্যবচ্ছেদে এ-কথা আজ সর্বজনবিদিত। অবশ্য ফুকো বলেন ‘অনন্ত’ শব্দটাই বাজে। অতশত সত্তা নিলে ন্যুব্জ মানুষের ডাল-মরিচের হিসাবে ঘাটতি হতে পারে;—এ-ভেবে ভাবলেন অভিন্ন ধ্যান-ধারণার ভিন্ন ভিন্ন Expression (ডিসকোর্স!)। আমি তুমি নিমিত্ত মাত্র। হায়াত-মউত আল্লার হাতে।

সকলের প্রশ্নোত্তরে গামছা-লুঙ্গির সাব-অল্টার্ন অবিরাম ভুল বকে। Irregular হাসি হেসে পাগলও তার নিজের এতোটুকু অনবরত খোয়ায়। কখনো চুপচাপ, মনে মনে সংকল্পবদ্ধ, নিটশে আর কৃষ্ণদ্বৈপায়নকে একসাথে দেখে ভাবে—একদিন আমিও…। তাহলে নিটশেকে প্রণাম। নিটশেই—সবকিছু। কেননা সর্বভুক। উভচর বৃত্তান্ত। পদ্মের মূলখানি, মাছের পাঁতিখনি, সভ্যসভ্যতার হাগুমুতু সব। অযথা আমাদের আদি বেদে-বেদেনি, কৈর্বত কিংবা আউল-বাউল-কবিয়ালরা নিটশে, বার্থ কিংবা দেরিদা—এঁদের সাথে মিশতে না পেরে ছেঁকে ধরে কৃষ্ণদ্বৈপায়নের ৬০ হাজার শ্লোক। অন্তত এগুলো আমাদের ইতিহাসের উজ্জ্বল/অনুজ্জ্বল সম-সমাচার।

কুরুক্ষেত্রে কেবল আর্য সাহেবরা ছিলেন না, মরা বা আধমরা সৈন্য হিসেবে আমাদের ভাই-বেরাদ্দরও ছিল। সেই সাহসে কিংবা ‘মায়ামূর্তি’ ভালোবেসে, কাহিনি-আখ্যানে সংগত হয়ে যেই-না দু-একটা শ্লোক Create বা Impinge করতে চেয়েছি,—অমনি পারিভাষিক এলিটরা আঙুল তুলিয়া কহিলেন,—সাধু সাবধান। উপরে অগণন স্যাটেলাইট। বঙ্কিম, কলিম, বুদ্ধদেব, নৃসিংহ—কে নেই সেখানে! কাহিনির সহিত বে-মিল (Distorted!) অথবা ‘ব্যাসের ছন্দের সহিত মিলিতেছে না’, সুতরাং ওগুলো প্রক্ষিপ্ত। কে লিখেছে এইসব জগাখিচুড়ি। ব্যাটারে ধরিয়া আনগাদেখি… আর চ্যাংদোলা-ভয়ে the author is dead. সব কৃষ্ণদ্বৈপায়নের নামে।

ওদিকে সাব-অল্টার্ন Homeless. একটু-আধটু ‘কামমোহ্যপুরাণ’ লিখেছিলুম;—দেবতার কামরহস্য, শৃঙ্গারের ইতিহাস (History of Sexuality! Foucault)। স(স্ব)রস ভালোবাসা, ভাববিনিময় পরকীয়া,—তাতেই পর্নো-পুরাণের লেখক/কাহিনিকার মাত্রেই ওয়াক থুঃ। Irresistable অবক্ষয়। ব্রহ্মবৈর্বত-বরাহ-কূর্ম পড়িলে নাকি তাহাদের দেবতা বলিতে বাঁধে। অথচ এইসময়ে হাল আমলের বড়ো বড়ো মুর্দাগুলো সমানে পর্নো-উপন্যাস, পর্নো-গল্প সাহিত্যের তকমায় ‘পণ্যায়নেমশগুল। এরা Creative / Constructive / De-constructive / Symbolic… কত কী!

তো এই সাব-অল্টার্ন শব্দটি গ্রামসির Prison Notebooks থেকে প্রথম আমরা পাই। যে- শব্দটি তত্ত্বগতভাবে বহুরৈখিক এবং ব্যবচ্ছেদপ্রিয় বটে। গ্রামসি ‘এই শব্দটি’ ধনতান্ত্রিক বুর্জোয়া সমাজের অর্থনৈতিক আধিপত্যের প্রায়োগিক আদলে বলিলে,—নিম্নবর্গ ও উচ্চবর্গ বিশিষ্ট দুটো চিন্তা-চেতনা জন্ম লয়। কেননা ‘আধিপত্য’ মানেই দুই চেতনার দ্বন্দ্ব কিংবা সংশ্লিষ্টতা। তো Hegemony কাকে বলে? যে-‘আধিপত্য’ ভাবাদর্শগত কারণে সাব-অল্টার্ন, নিজের অলক্ষেই প্রভুকে প্রভু বলে স্বীকার করে নেয়। আর ডমিন্যান্স (Dominance) তাই, যেখানে প্রভুত্বের সম্পর্ক প্রকাশ্য ও সরাসরি। যেখান থেকে রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক ও/অথবা সাংস্কৃতিক দেখভাল সমাজের ক্ষমতা (Domination) এবং শোষণের (Exploitation) সহবাস গড়ে তোলে।

গ্রামসির এই গ্রাম্য মানুষের থিয়োরি নিয়ে বিপদ দেখা দেয় আরও। আধিপত্য, প্রভুত্ব, কর্তৃত্ব—আরে বাপ, বোঝা কঠিন আদৌ কোনো পার্থক্য থাকছে কি-না! নাকি ‘আধিপত্যের’ বালবাচ্চা এইসব প্রভুত্ব কর্তৃত্ব অথবা ক্ষমতার স্বয়ংচালিত নিরঙ্কুশ সম্ভাবনা (ফুকো!)। ভাষা ও প্রকাশ্যে অস্পষ্টতাহেতু বহুদিন লেগেছে গ্রামসির এই আধিপত্যের ধরন ‘প্রোলেতারিয়েত’ শব্দের ‘প্রতিশব্দ’ ভাবতে। Histories from below—আজ ৬০, ৭০, ৮০, ৯০ পেরিয়ে এ-শব্দের বহুবিধ ব্যাখ্যার পাকচক্র সামাজিক ইতিহাসের ভাষিক অভিব্যক্তি হলেও, ঠেকানো যাচ্ছে না উচ্চবর্গের ruling culture. ভাষাগত আগ্রাসন তো আরও মজার ব্যাপার। ইংরাজির দৌলতে…

১লা বৈশাখে রমনার বটমূলে শুধু রবীন্দ্র সঙ্গীত? Why? Rap Pop হবে না কেন? ওগুলো আমাদের Culture-এ নেই, ওসব বাজে কথা। Pure Culture, off course, different. মালমশলা বিভিন্ন Cultural Activities থেকে accept করবে। এতে এতো embarrassed হওয়ার কিছু নেই। বিভিন্ন Intellectual Point থেকে আমরা ১লা বৈশাখ উদযাপন করব। এটা যেমন logical তেমনি quite natural.

হায়রে পান্তাভাত, কাটাচামচে তো উঠেই না!

অতঃপর ডিসকোর্স;—ডিসকোর্সের Canibalism. একেকটি ভূতের মতো ভর করে অন্যরা’র উপর। গ্রস্তদের Genetic Code বদলে যায় সহসা। আশৈশব পিতৃমাতৃআকারচৈতন্যসম । যৌবনে নব্যধর্মধারী—Hybrid. অতএব সারাবছর অনিচ্ছে সত্ত্বেও গুচ্ছগুচ্ছ প্রসব…। ক্যাপিটাল লেবারকে পাত্তা দিল, অমনি লেবারও লেজ-পা-হাত তুলে, বোল পালটে ক্যাপিটালের ভাষায় কথা বলা শুরু করল। অথবা ক্যাপিটাল, প্রি-ক্যাপিটাল রিলেশন। অর্থাৎ ক্যাপিটাল যাকেই Pump মারছে, অমনি সেও ক্যাপিটালের হয়ে/মতো কথা বলে। মোদ্দা ভাষা ‘ক্যাপিটালের’। এ এক শৃঙ্খলা, নীরব আধিপত্যবাদ। সিরিয়াস সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন ‘সাম্যের হত্যাকাণ্ড’।

আমাদেরও ‘সাম্যধর্মী’ ইতিহাস আছে। আদি ভারতবর্ষের সমাজতত্ত্ব। কিন্তু যেই না Modern হওয়ার হাওয়া এসে গায়ে লাগল, ভারতবর্ষের আবহমান Tradition-টা ভেঙেচুরে দুমড়ে-মুচড়ে পঙ্গু হয়ে গেল। চারদিকে Modernism-এর ভূত-প্রেত। Modern—এলিট; Modern—আমলা; Modern—পোশাক-আশাক; এমনকি Modern—সাব-অল্টার্ন। তো, যে-গোদার আমেরিকাকে ব্যঙ্গ করে হাস্য-কৌতুকের যোগান দিতেন, চায়ের কাপে চুমুক,—সেই ফ্রান্স দ্রুত এই ৭০, ৮০, ৯০-তে এসে American Colony হয়ে গেল। দেরিদা, ফুকো, লাঁকা—as a guest professor of অমুক American University. ফরাসি তত্ত্বকথায় রমরমা এইসব বিশ্ববিদ্যালয় অচিরেই গ্রাস করে নিলো ‘অমুক’ যুদ্ধের জন্য ফরাসি তত্ত্ব/তাত্ত্বিকের স্বীকৃতি। দু’একজন লম্ফঝম্ফ করলে Indiana University Press থেকে অমুক বই প্রকাশিত…। বেস্ট সেলার। দর্শনের বই বেস্ট সেলার—ভাবা যায়! আমেরিকানরা উন্নত জাতি/প্রজাতি…। সেই দেশেই তো এইসব অঘটন ঘটা সম্ভব। হাহা…হিহি…।

মূলত একখান শব্দের সহিত আমরা সহ-পরিচিত। দ্বন্দ্ব। মারামারি, কাটাকাটি। কথায় কথায় ইয়া ঢিসা ঢিসা। রবীন্দ্রনাথের নিত্য নিষ্ঠুর দ্বন্দ্ব। পাপ-পুণ্যের সাথে, জন্ম-মৃত্যু, সুখ-দুঃখ…। মেঘ দেখে ভাই করিসনে ভয়…। আড়ালের সূর্য উঁকি মেরে মেঘকে পরাজিত করার স্পর্ধা জানায়। মেঘ ও বৃষ্টি—একে অপরকে নির্মাণ ও নির্ধারণ করে। Overdetermine (মাও!) করে। ‘ক’ ‘খ’-কে, ‘খ’ ‘ক’-কে অবিরাম বৈপরীত্যের ঐক্য থেকে পারস্পরিক নির্ধারণ ও নির্মাণের খেলাখেলি চলে। A unity and struggle of opposities.

অথচ এসব দ্বন্দ্বের কোনো Rules বা Regulation নেই। বরঞ্চ হাজার প্রকারের ফাঁকিবুকি। ‘ক’ ‘খ’-এর আদ্দেক চারিত্র্য নিয়ে ‘গ’-কে নির্মাণ করতে পারে, আবার ‘গ’ ‘খ’-এর সাথে ‘ঘ’-কে। অসংখ্য অর্থের সাযুজ্য। Infinity. কারো displacement কারো কারো condensation তোমার-আমার পারস্পরিকতা নির্ধারণ করে। একেক সময় একেক অর্থের ব্যাকুলতা। নির্দিষ্ট অর্থ বলতে কিছু নেই। কিছু হয়তো বলছি, অথবা বলছি না। যা বলছি বলার অর্থ হয়তো তারচে’ বেশি। এই না বলাটা অব্যক্ত। Lack বা Gap। এই অব্যক্তরও আবার একাধিক অর্থ আছে, থাকে। ‘ক’ ‘খ’-এর ঘাত-প্রতিঘাতে যে-অর্থের তৈরি হয় তাও অসম্পূর্ণ। অন্য অতিরিক্ত শব্দের ইঙ্গিত? সম্পূর্ণ ও অসম্পূর্ণের ভিতর সীমাহীন অন্ধকার, Lack / A structure with a lack signifying excess. (লাকাঁ)

অন্ধকার, চারপাশটা লাকাঁর অন্ধকার ক্রমশ গ্রাস করে নেয়। ধুয়েমুছে যায় Imaginary Conception, কেননা সেই অন্ধকারকে আমরা কেউ কি জেনেছি, জানি? আলো? অন্ধকার আলোকে জানে অথচ আলো অন্ধকারকে খুন করে আলোকিত করে। চিনতে পারে না;—জানতেও না। মানুষ তো ছাড়। হাঁটি হাঁটি পা পা করা শিশুটি যেদিন প্রথম আয়নার মুখোমুখি হয়, সেদিন কী দেখে? মানুষ না জানোয়ার? মানুষই দেখে;—নিজেকে দেখে আঁতকে ওঠে বারবার। শুরু হয় মুখ দেখাদেখি। আয়নায়, সহস্ৰজাত দর্পণের পরকলায়। বাবা, মা, ভাই, বোন… সমাজ, সংসার…। এতগুলো আয়নার প্রতিবিম্বে ভেঙেচুরে একাকার নিজের ওই ছোট্ট হাসিটুকু। আয়নার পিছন থেকে উঁকি মারে অন্ধকার। তাকে ধরতে গেলে ধরা যায় না। মুঠিবদ্ধ খালি শূন্য আর শূন্যতা। ঘেমে ঘেমে একসা।

শৈশব পেরিয়ে বাল্যে শুরু হলো প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া। বাবা-মা, বড়ো ভাই-বড়ো বোন, আত্মীয়স্বজন এমনকি পুরো দেশসুদ্ধ শুরু হয় বাকবিতণ্ডা। ছেলে কীসে পড়বে? English Medium নাকি Bangla Medium? যে-যুগ পড়েছে বাবা, তাতে English Medium ছাড়া কি চলে? English is our foreign language: why? First language নয় কেন? বলো তো খোকা Intellectual শব্দের অর্থ কি? হাজার হাজার Vocabulary, গাদা গাদা British American বই। রাতদিন পড়াশুনার অখণ্ডনীয় চাপ। স্কুলে শিক্ষক, বাড়িতেও গণ্ডাখানেক… তারপর বিমর্ষ ও হতবিহ্বল ছাত্রটি একদিন প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মানুসারে অকৃতকার্য হয়ে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। হারিয়ে যায় নিরন্তর অন্ধকারের শত-সহস্র বলিরেখায়। আর English Medium স্কুলের খরচ যোগাতে মধ্যবিত্ত মা-বাবাদের হা হাপিত্যেশ…। তবুও ছেলেটা মানুষ হলো না! একদিন সেই শিশু, মাদকের অর্থের জন্য সারাটা ঘর ভাঙচুর করে ফিল্মি কায়দায়। ওদিকে English Medium স্কুলের দস্যি কর্তৃপক্ষ ছাত্রছাত্রীর বেতন বাড়াচ্ছেন ৫০০০ থেকে ৭০০০ টাকা।

বদলে গেছে সামাজিকতার রকমফের। প্রত্যেকটা বিয়েবাড়ি এখন Highly Sophisticated. টেবিলে টেবিলে Menu card। হিজিবিজি লেখা। নির্বাচন করুন, Bone China-র ডিশে তাই তাই পড়বে। অথচ আমাদেরই বাপ-ঠাকুর্দা মাটির গেলাস থেকে পানি নিয়ে হাত ধুয়ে তবে কলাপাতায়, নিদেনপক্ষে মাটির হাড়িতে খেতে বসেছেন। আর আজ, হাত ধোয়াধুয়ি নেই। হাত দিয়ে খাওয়া-খাওয়ি-ও নেই। বড়ো বড়ো Martensitic Stainless Steel-এর কাটাচামচ দিয়ে যে-যত দ্রুত হাত চালাতে পারেন, তিনিই এই বিবাহবাসরের সবচে’ Smart এবং Modern. কোটি কোটি টাকা মুহূর্তে বিলীন। কে বলবে তোর দেশে এখনো উলঙ্গ উন্মাদ যুবতী রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, মঙ্গাতাড়িত মানুষের হাহাকার…. বন্যায় না খেয়ে খেয়ে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ত্রিকালদর্শী বুড়ো বুড়ো মানুষগুলো। কেউ দেখে না, অন্ধকার এসে চেপে বসে। গূঢ়তর। অভেদ্য।

পাড়ার যে-উঠতি বাঙালি Intellectual, ওই দেখুন, তন্বী আধুনিকা স্ত্রী নিয়ে বেরোলেন কোনো এক Cultural Show attend করার জন্য। খানিকটা ঘুমে ঢুলুঢুলু। উভয়েরই। কেননা সারারাত জেগে স্যাটেলাইটে বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতা দেখেছেন। ভেনিজুয়েলার সুন্দরীর পক্ষে তিনি, পত্নী ইন্ডিয়ার। দুজনের বেজায় তর্ক-বিতর্ক। কার কটিদেশ কত তীক্ষ্ণ, কে কতটা Slim—এইসব। ইন্ডিয়ার সুন্দরী বিশ্বসুন্দরী হলে বাঙালি জনাবের সেকি আক্ষেপ! India আমাদের neighbourhood country অথচ তাদেরকে দেখে আমাদের দেশটা কিছুই শিখল না। তারপর কালেভদ্রে গ্রামের বাড়িতে গেলে মেঠো ঘরবাড়ি রাস্তাঘাট নিয়ে বিস্তর বিরক্তির বহিঃপ্রকাশ…। মা-বোনদের রান্নাবান্না অস্বাস্থ্যকর, জোলো…। ছোলাসিদ্ধ এভাবে করে নাকি কেউ, রেসিপি দেখতে পারিস না। মলিন বস্ত্রের খুদে বোনটা তরতর করে কাঁপে আধুনিকতার অপ্রতিরোধ্য ঠ্যালায়। হতভম্ব মা, দেউড়িতে দাঁড়িয়ে কাঁপেন আধুনিকা পুত্রবধূর আগমনী সম্ভাবনায়। এবং এইসব বাঙালি Intellectual-রা পত্রপত্রিকায়, হাটে-বাজারে, পোস্টারে ক্যানভাসে নারী-পুরুষের সমঅধিকারের কথা রাজনৈতিক দুবৃত্তদের মতো ব্যক্ত করিয়া চলিয়াছেন। অথচ wife-এর সহিত একটুখানি বাকবিতণ্ডা হইলেই, রণমূর্তি ধারণ করিয়া চিৎকারপূর্বক আবহমানকালের জলদগম্ভীর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন, ‘তোর বাপের কাছে এখনো ৫৭ হাজার ২ শত ৩৫ টাকা ৭৫ পয়সা পাই। কবে দিব ক।’

টের পাচ্ছেন অন্ধকার? অন্ধকার। লাকাঁর নয়,—চেতনার।

Terry Eagleton; Image Source & Credit: Collected; Google Image

আমি তত্ত্বকথা বলি কারে
তত্ত্ব বোঝে কয়জনে….. (সবজনে?)

Literary Theory : An Introduction টেরি ঈগলটনের এক মহাগ্রন্থ। গ্রন্থে সাহিত্য কী, এই পরিভাষার সাথে-সাথে ভাষা কী… এরও সার্থক সমন্বয় নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। সোজা কথায় সাহিত্য-যে ভাষারই অনুপুঙ্খ বাছবিচার ও প্রয়োগের সার্থকতার উপর ন্যস্ত, এ আবশ্যিক শর্ত অস্বীকার করা যায় না। সাহিত্য কখনোই এমন নয় যা Imagination কিংবা Fiction-এর ব্যবহারের অনুগত। কারণ, ব্যবহৃত যে-কোনো তত্ত্বই ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের অতীত নয়, বরং এমন এক সৃষ্টিশীল সত্তা যা প্রতিনিয়ত সংজ্ঞায়নের বাইরে। এবং যা স্বমহিম দৃষ্টিভঙ্গির অন্তর্গত, যা কেবলমাত্র ভাষার ব্যতিক্রম ও Creative Expression-এর উপর ভরসা রাখে। যার ফলে সাহিত্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে ভাষার নির্বিকল্প প্রকাশ মাত্র। ঈগলটন ভাবছেন সাধারণ ভাষার সংঘটিত ও ঘনীভূত রূপই সাহিত্য, যা অবধারিতভাবে মৌখিক ভাষার বিপরীত কিংবা পৃথক।

ওপারেতে বৃষ্টি হয়, ঝাপসা গাছপালা;—রবীন্দ্রনাথের এই অনুভূতির উচ্চারণ মাত্র পাঠককে ভাবতে হচ্ছে নতুন বাক্য-প্রকরণ, শব্দ-শুদ্ধতা কিংবা কাব্যআবহ। পঙক্তি মাত্র আমাদের বুঝতে অসুবিধে হয় না, এই গীতময়তার সাথে বৃষ্টির ঘনত্বও কতটা সংশ্লিষ্ট। এতই ঘন, তাতে গাছপালা ইত্যাকার পরিদৃশ্যমান বস্তুগুলো সার্বিকভাবে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। অর্থাৎ এই-যে ব্যঞ্জনা, এই-যে অব্যক্ত ভাবপ্রকাশ, যা মানুষের অবচেতন মনকে নতুনভাবে জাগিয়ে তোলে, তা যদি প্রচলিত কথ্যরূপে ‘খুব জোরে বৃষ্টি হচ্ছে’ এমনভাবে বলা হয়, তাহলে সেই অনুভূতির ব্যঞ্জনা এখানে থাকে না। অপ্রকাশিত সত্যের আহরণও এখানে নিষ্প্রয়োজন। অন্যভাবে বলতে গেলে ‘খুব জোরে বৃষ্টি হচ্ছে’ এই মৌখিক ভাষার-ই একটা ভাঙচুর রূপ ওপারেতে বৃষ্টি হয়, ঝাপসা গাছপালা।

মৌখিক ভাষা অনেকটা স্বাধীন, যেহেতু তা প্রাত্যহিকে জড়িত। কিন্তু তারই রূপান্তর যেরকম ভাষাতাত্ত্বিক আবহ সৃষ্টি করে তা আমাদের মননশীলতার একটি স্থায়ী রূপ। ভিন্ন জগতের আস্বাদন। সুতরাং বলা যায়, ভাষার যোগ-বিয়োগ কিংবা ভাষার নড়েচড়ে বসাই মূলত ‘সাহিত্য’। অর্থাৎ ভাষাই সাহিত্যের অনুঘটক। অথচ কখনো কখনো এই ভাষাই সম্পূর্ণ লেখকসত্তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। যা লিখছি তার সাথে হয়তো স্বতঃস্ফূর্ত কোনো সংযোগ নেই অথবা পুরো ঘটনাটাই আকস্মিক। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁর ‘বাতাসী’ কবিতার স্মৃতিচারণে ‘কবিতার দিকে’ প্রবন্ধে অনুরূপ বক্তব্যকেই সমর্থন করেছেন। সংক্ষেপে স্বগতোক্তিটুকু এরকম :

(একদিন) বাসের দোতলায়, ডানদিকে, জানালার ধারে বসেছিলুম। সেই সময় একটা ব্যাপার ঘটে। জানালা থেকেই দেখতে পাই যে, বাবরি চুল মিশকালো ষণ্ডা মতন একটি লোক অকস্মাৎ একটি বস্তিবাড়ি থেকে ‘বাতাসী বাতাসী’ বলে চিৎকার করতে করতে ছুটে বেরিয়ে এল, এবং রাস্তার উপরে একমুহূর্ত বিভ্রান্ত দাঁড়িয়ে থেকেই আবার ছুটতে ছুটতে পাশের আর-একটা বস্তিবাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ল। …। মনে আছে, সেই রাত্রে বাড়ি ফিরেই আমি ‘বাতাসী’ কবিতাটি লিখে ফেলি।… সেখানে আমি জানাচ্ছি ‘ধাবিত ট্রেনের থেকে এই দৃশ্য চকিতে দেখলুম’। ইচ্ছে করে, জ্ঞাতসারে, বাসকে ট্রেন বানাইনি, আমার অজ্ঞাতসারে সত্যের অপলাপ ঘটিয়ে বাস ট্রেন হয়ে গেছে।

অর্থাৎ এ-থেকে সুস্পষ্ট, স্বতঃস্ফূর্ত ভাষার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। যদি নিয়ন্ত্রণ থাকত তাহলে বাস বাস-ই থাকত, তাকে ট্রেনের আদলে অন্য স্বরমাধুর্য বা প্রকৃত সত্য থেকে দূরে ঠেলে দেয়ার কোনো প্রয়োজন হতো না। এমনকি এর ব্যক্ত সত্তায় বদলে গেছে কবিতার কেন্দ্রীয় আবহের Ideology, সুতরাং যা ‘ভাবনার আধার’ তাকে চিরপরিচিত অভ্যেস থেকে খাতা-কলমে নামিয়ে আনা যাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কেননা ভাষাই পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করবে প্রকাশের তাৎক্ষণিক প্রতিনিধিকেও।

ঈগলটন তাই সাহিত্য তথা ভাষার স্বরূপ উপলব্ধিতে শুরু করেছেন গত শতকের একেবারে গোড়ার দিককার Formalist বা আঙ্গিকবাদীদের সাহিত্যচিন্তা থেকে। Formalist-রা মূলত ‘সমালোচনা সাহিত্যের’ প্রবক্তা। যাঁরা তাঁদের পূর্ববর্তী অর্ধেক অধ্যাত্মবাদী Symbolist-দের বিরোধী, এবং বিশ্বাস করেন প্রত্যেকটি টেক্সটের একটি ‘বস্তুগত অস্তিত্ব’ বর্তমান। তাঁরা মনে করেন সমালোচনা এমন এক উচ্চতর স্তর যা সাহিত্য ও ভাষাকে বহুদূর থেকে চিহ্নিত করতে সক্ষম। এবং উপলব্ধি এমন হবে যাতে ‘শিল্প ও শিল্পরহস্য’ এদের পার্থক্য নিরূপণে উচ্চতর ওয়াকিবহাল। এবং স্মর্তব্য, টেক্সট কোনো ধর্ম, রাষ্ট্র কিংবা মনস্তত্ত্ব অথবা সমাজতত্ত্বের বর্ম বা অন্তর্লীন প্রকাশ নয়, যার অনেকার্থ বিশ্লেষণের জন্য আবহমানকালের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সংশ্লিষ্ট হতে হবে অথবা সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে একক সর্বব্যাপী স্বাধীনচেতা স্রষ্টার পূর্বাপর কার্যপ্রণালীতেও। তারচে’ স্রেফ বলা যায়, টেক্সট ভাষার একটি সবিশেষ সংশ্লেষণ। তার ‘বস্তুগত সত্য’ এবং তার ‘ক্রিয়া কৌশল’ এমনভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব, যা একটি মেশিনের কর্মপদ্ধতিগত বিশ্লেষণের সমান। এখানে বস্তু-অনুভূতির পারম্পর্য নেই, নেই কোনো সহানুভূতি। অবচেতন মনের সত্যপ্রকাশ বিভ্রম মাত্র। এমনকি একজন লেখকের ‘মানসিক বিস্তার’ এই টেক্সেটের আরেক অন্তর্গত উপাদান, তাও সত্যভ্রম ছাড়া আর কিছু নয়।

রুশ আঙ্গিকবাদ তাই ‘ভাষাবিজ্ঞানের’ যথার্থতা নিয়ে সাহিত্যের পাঠকৃতি নতুনভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে। মৌখিক ভাষাকেও সাহিত্যের অন্তঃপ্রাণ করে তোলা সম্ভব;—এ-ধারণা যৌক্তিক নয়, বরং তারই ভাঙচুরের অভিব্যক্তি সাহিত্যের গৃহীত গুহ্যে থাকবে, তবেই তা সাহিত্যের নমস্য। Formalist-রা সেহেতু ‘আধার নাকি আধেয়’—এই বিতর্কে জড়িয়ে পড়লেন। আধেয়—যেখানে প্রাসঙ্গিকভাবেই মনোবিজ্ঞান/সমাজতত্ত্বের প্রভাব থাকে। সাহিত্যের শুদ্ধচেতনা যদি সাহিত্যে অনতি প্রচ্ছন্নও থাকে, তবু আধারের উদ্ভাসন ঠেকানো সম্ভব। কিন্তু আধেয় কেবল Form-এর Motivation মাত্র। সোজা কথায়, আধেয় আধারের অনিবার্য প্রকাশক। আধার যেরূপ বস্তুসত্য, আধেয়র অর্জিত অভিব্যক্তিও সেরকম। অর্থাৎ, উপন্যাস (আধার!) লিখছি, সুতরাং ভাষাপ্রয়োগ (আধেয়!) ‘কাব্যের মতো’ হবে না। অথবা তদনুরূপ গীতময় না হলেও চলবে। আবার কাব্যের ক্ষেত্রেও অনুরূপ—তা উপন্যাসের চারিত্র্য মূল্যায়নের বিপরীত। মোদ্দা কথা, কী লিখছি তার উপর সামূহিক ভাবপ্রকাশ ন্যস্ত। আবার আধেয়কে লিপিবদ্ধ করলে আধারের ঠিক-ঠিকানা খুঁজে পাওয়া সহজ। কাব্যের রসবোধ কাব্যগ্রন্থকেই সমর্থন করে, গল্প বা উপন্যাসকে নয়। বাহুল্য না হলে বলি, আধার ও আধেয় নারী পুরুষের মতো সম্পর্কিত। একজন আরেকজনকে ছাড়া নিজস্ব রূপক-এ ছন্দ পায় না। বেঁচে থাকা নিরর্থক হয়ে পড়ে। একে অন্যের ‘গ্রাহ্য’ সম্পূরক। এ-নিয়ে কূটতর্ক বালখিল্যতা।

ঈগলটনের মতে আঙ্গিকবাদীদের এই বাড়াবাড়িই তাদের ‘তত্ত্ব নির্ভর সত্যতা’কে অনেকটা স্থূল করে দেয়। তিনি আরও লক্ষ করলেন, আঙ্গিকবাদীরা সাহিত্যকর্মকে সাহিত্যের কৌশলগত অবতারণা বলে ধরে নিচ্ছেন, যার একটি নির্দিষ্ট textual system থাকবে, যেখানে শব্দপ্রকরণ, তাল-লয়-ছন্দ, বর্ণনা-কৌশল অর্থাৎ Form-এর অন্তর্গত উপাদানসমূহ থাকছে। যেহেতু মৌখিক ভাষা এর নির্দিষ্ট ‘গ্রামার’ মানছে না, সেহেতু সমালোচকদের এ-নিয়ে কিছু ভাবনার নেই, বরং ভাবতে হবে বাচনপ্রণালী থেকে পৃথক এবং সাধারণ ভাব-ভাষাকে যা নানাবিধ উপায়ে deformed করে, তার বস্তুসত্যের প্রস্তাবনা নিয়ে। এই deformation-ই ভাষাকে রীতিমতো defamiliarize বা অচেনা করে তোলে, যার ফলে পালটে যেতে বাধ্য এতদিনকার চিরপরিচিত পারিপার্শ্বিকও।

Major Theorists of Russian Formalism; Collage; Image Source & Credit: Collected; thirdlanespace.com

Formalism-এর কথকতা :

আঙ্গিকবাদীদের প্রাথমিক চিন্তা-চেতনার মোটমাট শুরুর কাল, বলা যায়, ১৯১৭-এর কিছু পূর্বে। স্থায়িত্বকাল ১২-১৫ বছর। একটি সাহিত্যসত্তা কিংবা সাহিত্য-নিবেদিত দার্শনিক বিশ্লেষণের জন্য এই সময়টা অত্যল্প, ক্ষীণ। যেখানে দুএক জনম পার করেও সাহিত্যের সংজ্ঞা কিংবা স্বাতন্ত্র্য উপলব্ধি করা কঠিন, সেখানে দুএকজন অনতিতরুণ সাহিত্যের বহুত্বময়তা নিয়ে হাঁকডাক করছেন, আদৌ জীবনবীক্ষার গভীরতম দিক থেকে নাকি উপরতলার রাজহাঁস,—তাও বিবেচ্য। রুশ প্রতীকবাদের বিরুদ্ধে এই ক্রুসেড পরিচালনা দীর্ঘতর হয়নি সম্ভবত অন্তর্দ্বন্দ্ব সাহিত্যে শেষ বলে কিছু নেই,—এর সত্যতা, তত্ত্ব নিয়ে কাড়াকাড়ি/বাড়াবাড়ি, অধিক মাত্রায় থিয়োরির জটিল বয়নে জীবনের সংশ্লিষ্টতা গৌণ হয়ে পড়ে… ইত্যাদি ইত্যাদি কারণে।

কিন্তু হায় যে-প্রশ্নগুলো সেইসব তথাকথিত সাহিত্য ও ভাষাতাত্ত্বিকেরা বয়ান করেছিলেন, যেমন শক্লভস্কির কালজয়ী প্রশ্ন : কবিতা ও কবিত্ব কী? কীসে কবিতার কবিত্ব? পদ্যের সহিত কবিতার পার্থক্য কোথায়? অপরদিকে রোমান য়াকোবসনের ‘গঠনবাদী সমালোচনা’ কী? সাহিত্য সমালোচনার চিন্তাসূত্র কী হতে পারে? সাহিত্য ও সাহিত্যগুণের সংজ্ঞা? সেগুলোর আজও কোনো সমাধান হয়নি। বরং তর্ক বেড়েছে আরও, প্রশ্ন থেকে তৈরি হচ্ছে আরও প্রশ্ন (উত্তর!), বিশেষত সাহিত্য সমালোচনার অন্তর্গত কূটরহস্য নিয়ে।

যাঁরা এই আন্দোলন/চেতনার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন তাঁদের মধ্যে বিশিষ্টজনরা এমন, যথা ভিক্টর শক্লভস্কি (Viktor Shklovsky), রোমান য়াকোবসন (Roman Jakobson), অসিপ ব্রিক (Osip Brik), য়ুরি তাইনিয়ানভ (Yury Tynyanov), বরিস টোমাশেভস্কি (Boris Tomashevsky), বরিস আইকেনবাম (Boris Eichenbaum) প্রমুখ। এইসব পণ্ডিতজনের মধ্যে একতাবোধ বড়োই অল্প ছিল। যদিও পরীক্ষামূলক সাহিত্য ও শিল্পের গঠন ও সৃষ্টি তাঁদের একমাত্র শিকার, তবুও এইসব ভিন্ন মতাবলম্বী জেগে ওঠেন রাশিয়ার উল্লেখযোগ্য দুই শহরে দুরকম প্রসূত চিন্তা-চেতনা নিয়ে। সেন্ট পিটার্সবুর্গ শহরে ভিক্টর শক্লভস্কির নেতৃত্বে একদল, অপরদিকে মস্কো কেন্দ্রিক রোমান য়াকোবসন। শক্লভস্কি ১৯১৭ সালে ‘কৌশলরূপে কলা’ নামক প্রবন্ধ লেখেন, যাকে বলা হয় ‘আঙ্গিকবাদের ইশতেহার’। যেখানে রুশ সিম্বলিস্টদের পুরোধা গোটেবনআয়ারের প্রতীক সম্পর্কিত মতবাদকে খণ্ড-খণ্ড করেই এ-প্রবন্ধের বেড়ে ওঠা। উনিশ ও বিশ শতকের ইউরোপীয় রোমান্টিক আবহের প্রতি এই লেখনী ছিল কুঠারাঘাত স্বরূপ। অবিরাম যুক্তির বর্শা অত্যন্ত চমৎকারভাবে প্রতীকবাদকে ছিন্নভিন্ন করেছিল। বিজ্ঞানভিত্তিক এই রূপ গাঠনিক যুক্তি ‘সাহিত্যের আধার’কে পূর্ণ বিশ্লেষণের প্রয়াস দিলেও ‘বক্তব্য’ কিংবা ‘আধেয়’কে তেমন একটা আমলে নেয়নি।

রোমান য়াকোবসন অন্যদিকে রুশ ভবিষ্যৎবাদী কবিদের এবং বিজ্ঞানমনস্ক সমালোচনার একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। ১৯২০ সালে তিনি মস্কো ছেড়ে প্রাহা (চেকোস্লাভাকিয়া)-তে চলে যান। সেখান থেকে দাপটের সাথে স্থাপন করেন ভাষাতাত্ত্বিক আবহ। বিশেষ ‘সাহিত্যগুণের’ গঠনবাদী সমালোচনা। যদি সাহিত্যগুণকে সংজ্ঞায়িত করা যায়, তাহলে সাহিত্যের ব্যাখ্যা ও আখ্যাকেও নির্ধারিত করা সম্ভব। এবং এই সাহিত্যগুণ কোনোক্রমেই সাহিত্যের বিষয়বস্তু কর্তৃক নির্দিষ্ট নয়, বরং ভাবতে হবে সাহিত্যের উপস্থাপনার ভঙ্গি। প্রতীকবাদীরা যেখানে বলছেন, কবিত্ব হলো কল্পনা ও আবেগের মন্দ্রিত রূপ, সেখানে আঙ্গিকবাদীরা ভাবছেন কবিতার কবিত্বের মূল প্রধানত শব্দচয়নে। যেহেতু, ছন্দের একান্ত আসবাব ওই শব্দ রাশি রাশি, সেহেতু ছন্দই কবিতার প্রথম ও একমাত্র নির্ধারক। এই ছন্দের সহধর্মী হিসেবে পদবিন্যাস, স্বরক্ষেপণ প্রভৃতির একান্ত সহবাস ঘটিয়ে অসিপ ব্রিক, য়ুরি তাইনিয়ানভ কিংবা ওপায়াজ গোষ্ঠীর অন্যতম প্রবক্তা বরিস আইজেনবাম আরও নতুন নতুন উপাত্তের যোগান দিলেন। তৈরি হলো স্বতন্ত্র, অপরিচিত, যুক্তিকেন্দ্রিক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী। হিটলারের অত্যাচার বাড়লে য়াকোবসন প্রাহা ছেড়ে আমেরিকা চলে যান এবং আমরণ সেখানেই একপ্রকার নির্বাসিত জীবনযাপন করেন।

আঙ্গিকবাদীদের যে-ধারণা সমর্থনযোগ্য তা হলো, মৌখিক ভাষায় বিশ্বস্ত আমাদের প্রাত্যাহিক গূঢ় অভিব্যক্তি কিংবা বাস্তববোধ ক্রমশ যান্ত্রিক হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে সাহিত্যভাষা আমাদেরকে dramatically সজীব করে তোলে। যা অবধারিত শ্রম-অর্জিত ফসল, এবং এ-হচ্ছে মানুষের ঐকান্তিক পৃথিবীকে পালটে দেয়ার মনোবৃত্তি, যা থেকে নতুন এক মাননির্ভর ভাষাশৈলী তৈরি হয়, যা চিরপুরাতন প্রপঞ্চকেও অভিনব সৃষ্টিশীল চেতনায় ঋদ্ধ করতে পারে, বোধহয় এ-এক ভিন্ন জগতের ঘনীভূত অস্তিত্ব। ফলত এই Literary Discourse সাধারণ ভাষাকে আরও বস্তুময় করে তুলছে একাধারে defamiliarize এবং alienation-এর মাধ্যমে।

কিন্তু ফলাফল এমন, আমরা আমাদের নিয়ত অভিজ্ঞতা এবং প্রচলিত ভাষারীতির উপর প্রভুত্ব বিস্তার করছি নিজের জ্ঞাতসারে,—যেহেতু সাহিত্যভাষা সৃষ্টি হচ্ছে বাস্তবিক ভাষার বিবিধ বিচ্ছিন্নায়নে। ঈগলটন তাই ভাষাকে তুলনা করেছেন বাতাসের সাথে। অর্থাৎ আমরা ভাষার মধ্যে ভাসমান। কিন্তু এও বিবেচ্য, এই বাতাস যদি দূষিত হয়ে পড়ে এবং আমাদের শারীরিক অবস্থানে প্রবল প্রভাব বিস্তার করে, তাহলে শারীরবৃত্তীয় সচেতনতা থেকে ভাববো কীভাবে এর বিরূপ আক্রমণ এড়ানো যায়। তাহলে দেখা দিচ্ছে বাতাস দূষিত হওয়ার পরেই আত্মসচেতনার সৃষ্টি। এক্ষেত্রে বাতাসকে সামনে রেখে আমরা সুস্থতার কথা ভাবছি। তেমনি সাহিত্যও কোনো কিছুকে সামনে রেখে আমাদের চেতনায় লব্ধ হবে; যেমন বন্ধুর চিঠি আমরা দ্রুত পড়ে ফেলি কোনো তাল-ছন্দের বাছবিচার ছাড়াই। বর্ণনাশৈলী কতটা সংঘবদ্ধ, তার কোনো অপেক্ষা এখানে বিচার্য নয়। কিন্তু যখন একটি গল্প বা প্রবন্ধ পড়ব তখন সাহিত্যের বিবেচনাও এখানে প্রাগ্রসর। দেখতে হবে ভাষার বর্ণনারীতি এবং গাঁথুনি। আঙ্গিকের সার্থক গ্রন্থনা তখন আমাদের মন ও চেতনার অনিবার্য খোরাক। এবং আমরা দেখতে পাই গল্পটি ক্রমান্বয়ে উত্থান-পতনের সিঁড়ি পেরিয়ে আগুয়ান। অসংখ্য রহসময়তা ও সংহত ভাববিস্তারে গল্পের বিস্তৃতি তখন পাঠ-সুখকর হয়ে দাঁড়ায়। এতে আমরা এই গঠনশৈলীর প্রতি ঘনীভূত হই, মনোযোগ বাড়ে অসংখ্য দৃশ্যপটের এক আশ্চর্যরকম সংগ্রন্থনা দেখে।

আঙ্গিকবাদীরা মনে করেন গল্পের এই Impeding/Retarding (প্রতিবন্ধকতা)-মনোবৃত্তিই এক্ষেত্রে পাঠক-গল্পের সম্পর্কছল। ভাষা, যে এই কৌশল ব্যবহার করছে, তাতে আমাদের মনোযোগ আরও ঋজু ও সূচালো হয়। অবশ্য এও দেখতে হবে, মাত্রাতিরিক্ত প্রতিবন্ধকতার দরুন যদি মূল গল্পই আরম্ভ হতে না পারে, সেক্ষেত্রে তা সাহিত্যের পক্ষে harmful. বোধকরি এ-ভাবনা থেকেই লেখক যা ভাবছেন লেখার সময় তার ভাবনার কিয়দংশই ছাপানো টেক্সটে আসতে পারে। যেহেতু পাঠকের আকর্ষণ ধরে রাখার জন্য পর্যায়ক্রমিক Clymax-এর অন্তরালে মূল ভাবনা ঢাকা পড়ে যায়। অবশ্য স্বাধীন ও স্বতন্ত্র ক্ষেত্রে তা ভিন্ন।

(?) এবং (!), যদি আমার নিজস্ব চিন্তার চেতনা এবং প্রকাশভঙ্গি আমার নিজস্ব লেখ্যভাষার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে এমন কী উপায়, যাকে আমার মুগ্ধতা ও চেতনার পূর্ণ অথবা একক Expression বলা সম্ভব? সক্রেটিস-প্লেটো-লেভিস্ত্রাউস সকলে তাই লেখ্যরীতির প্রতি সীমাহীন বীতশ্রদ্ধ। বিষোদ্গারও তদ্রূপ। ‘লেখাকে’ বলছেন পরিশুদ্ধ জাতিব্যক্তির অসংগত, অসম্পূর্ণ এবং ‘নাবালক’ রূপ মাত্র। তাঁরা তাই ‘সজীব’ কণ্ঠস্বরের প্রতি অধিক আস্থাশীল। কেননা, লেখা সরাসরি ভাবপ্রকাশে অসমর্থ। বিবর্ণ রূপ। যা বলতে চাইছি তার কিয়দংশ ভাষার স্বেচ্ছাচারিতার অধীন, অধিকাংশ দুর্বল চেতনার লব্ধিতে মশগুল, আর যা সংশ্লেষিত হওয়ার অপেক্ষায়, সেও শব্দের পরম্পরাগত শৃঙ্খলের উপর নির্ভরশীল। যেজন্য সক্রেটিসকে হাঁটে-বাজারে দরাজ গলায় বলতে হয়েছে দর্শন ও প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার প্রয়োজনকৃত ভাবভঙ্গি। এবং ভেবেছেন, সমকালীন মানুষের সচেতনতার ভিতর দিয়েই ‘আগামী কল্যাণের’ পথ প্রশস্ত হবে।

জনজাগরণ, প্রলোভন থেকে উদ্ধার, মোহমুক্তি, এবং তজ্জন্য পরবর্তী অবক্ষয়কে রুখতে হবে লেখালেখির প্রকারান্তরে,—সক্রেটিসের এমন বিশ্বাস একেবারেই ছিল না। ধারণা ছিল, সমসাময়িক চেতনার বিস্তৃতি অসীম সেই বিশুদ্ধ চেতনা প্রসঙ্গত ভঙ্গিতে সামনের পানে এগিয়ে যাবে দ্ব্যর্থহীন। ঈগলটন কিন্তু তা মানতে চাইছেন না। তাঁর ধারণা,—নিজস্ব (সজীব!) কণ্ঠস্বরও লিখিত ভাষার মতো materialistic. কারণ, পাথরের বিলাস-ব্যসন আনুপূর্বিক বস্তুনির্ভর। এবং যা লিখিত ভাষার মতো নির্ধারিত Sign-এর difference ও বিশ্লেষণের প্রতি উন্মুখ। অর্থাৎ, মৌখিক সিস্টেমও এক সুনির্দিষ্ট ধারা এবং প্রকাশভঙ্গির উপর ন্যস্ত। অতএব লেখা যেমন বাচনের দ্বিতীয় স্বরূপ, বিপরীতে বাচনকেও সেভাবে ব্যক্ত করা সম্ভব।

স্মর্তব্য, ‘এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ কত তো মুক্তিযুদ্ধের উপর গান, লেখালেখি, বুদ্ধিবৃত্তিক উপাচার! কিন্তু সেই মৌখিক বাচনের tremendous influence লেখ্যরীতির পক্ষে পৌঁছানো সম্ভব? আঙ্গিকবাদীরা মূলত সাহিত্যভাষাকে মূল আদর্শ (মৌখিক ভাষা! ব্যবহারিক বলে!) থেকে বিচ্যুত বলেই মনে করেন। ধারণা এই, সাহিত্যভাষা এমনই যা মৌখিক ভাষার পুরো বিপরীত। মৌখিকতাকে অগ্রাহ্য করেই তার শিল্পিত অবস্থান। যে-Form-এর কথা বলছি তা মৌখিক ভাষার একেবারেই নেই। কেননা এ-ভাষা কোনোপ্রকার Grammar কিংবা নির্দিষ্ট Form-এর অপেক্ষায় নেই। আগাগোড়া কেমন ছাঁচাছোলা। কিন্তু এই মৌখিক ভাষাই দৈনন্দিন জীবনের একমাত্র উপাদান; যদি তাকে আদর্শ বলে ধরে নিই, তাহলে ভাষাগত জোর চাপড় সাহিত্যভাষাকে করে তুলছে নমনীয়, ইচ্ছেকৃত।

এ-তত্ত্ব সহজেই গ্রহণীয়, কিন্তু সমস্যা হলো পণ্ডিতজনের ব্যবহৃত ভাষা এবং সাধারণ শ্রমিকের ব্যবহৃত ভাষা এক হতে পারে না;—একেকজনের ভাষার স্বাতন্ত্র্য ‘এক একরকম’। পরস্পরের তুলনায় নৈর্ব্যক্তিকও ঠেকতে পারে। সব শ্রেণির মধ্যে একই ব্যবহৃত ভাষা থাকবে;—একে বিভ্রম ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। নিজস্ব ভাষাগত বাচনভঙ্গি নির্ভর করে প্রকৃত জাতিসত্তার উপর। ঈগলটনের অনুমানে তা শ্রেণি, অঞ্চল, ধর্ম, বর্ণ প্রভৃতির অনুষঙ্গে আলোড়িত। Homogeneous ভাষা বলতে কোনো তত্ত্ব সহজে দাঁড় করানো অসম্ভব। আপনি যে-অঞ্চলের ভাষায় লিখতে প্রলুব্ধ, অন্য অঞ্চল তাকে বিচ্যুতি বলেই ধরে নেবে। কেননা দ্বিভাষিক সম্প্রদায়ের পরম্পরাগত অনুষঙ্গে বিস্তর ফারাক। আবার আমার স্বকীয় ভাষাশৈলী আপনার নিকট সাহিত্যের খোরাকও হতে পারে, কিন্তু তা আপনার ব্যবহৃত ভাষার সাপেক্ষে ‘বিচ্যুতি’-ই।

মধ্যযুগীয় কোনো গদ্য রচনা এখন মনে হতে পারে কাব্যিকতার অনুরণন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের গদ্যশৈলী তখনকার দিনে আধুনিক ভাষার পরিচায়ক। কিন্তু বর্তমানের সাপেক্ষে তা তৎসম শব্দের আধিক্যে মশগুল। মনে হতে পারে,—উপমাকেন্দ্রিক এক নির্মোহ গীতিময়তা। অথবা হঠাৎ করে পাওয়া মায়া সভ্যতা কিংবা নাজকা’র শিলালিপি থেকে এমন ভাবা কঠিন-যে, ওই ভাষা গদ্যের নাকি পদ্যের। আর এরকম দুর্বোধ্য ভাষার প্রয়োজনেই ‘হায়ারোগ্লিফিক্স’ শব্দের উৎপত্তি। অর্থাৎ, বোঝা যাচ্ছে না... কেননা তখনকার Literary Discourse বা ব্যবহৃত ভাষা সম্বন্ধে আমরা যথেষ্ট ওয়াকিবহাল নই। সুতরাং একক সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন-যে, ওই ‘শিলালিপি’ ব্যবহৃত ভাষার দৌলতে ‘আদর্শ’ নাকি সাহিত্যভাষার ‘বিচ্যুতি’।

Signifier & Signified; This is not a pipe by René Magritte; Image Source & Credit: Wikipedia;

এরকম ভাষিক চক্রব্যূহও আঙ্গিকবাদীদের অনেক ভাবিয়েছে। তাঁরা বিশ্বাস করতেন ‘আদর্শ’ ও ‘বিচ্যুতি’ একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। একটি সুস্থ সমাজ বলতে যেমন অনেকানেক সুস্থ মানুষের পাশাপাশি কতিপয় অসুস্থ মানুষও থাকবে, তেমনি সার্থক ভাষাতাত্ত্বিক প্রয়োগে ‘আদর্শ’ ও ‘বিচ্যুতি’র অবস্থান সুদৃঢ়। কিন্তু এরা সামাজিক ও কালের নিয়মে পরিবর্তনশীল। আর, এই পরিবর্তন ‘আদর্শ’ ও ‘বিচ্যুতি’র আধিক্যের উপর। সেহেতু, এখন যা Estranged ভাষা হিসেবে বিবেচিত, অতীতে তা এরকম নাও থাকতে পারে। সুতরাং, আবহমানকাল ধরে এমন নির্দিষ্ট কোনো ভাষাশৈলী নেই যা অপরিবর্তিত। কোনো কাব্যিক ভাষাও সাধারণ হতে বাধ্য, যদি সে-ভাষা সাধারণ্যে হরদম ব্যবহৃত হতে থাকে। তখন ভাষাতাত্ত্বিকেরা আর Signified এবং Signifier-এর পার্থক্য খুঁজে বেড়াবেন না, কারণ সে-ভাষা তার কাব্যিক চারিত্র্য হারিয়েছে।

সুতরাং Literariness-কে চিরন্তন সত্য বলে ধরে নেয়ার কোনো কারণ নেই; বরং এই ধারণা কোনো নির্দিষ্ট textual system কিংবা text-এর বাইরে পাওয়া যাবে, এমন মত আঙ্গিকবাদীদের। যদিও তারা মনে করছেন,—‘আশ্চর্যকরণ’ (making strange) সাহিত্যের সারসংক্ষেপ। ভাষার বিবিধ ব্যবহার-যে বিভিন্ন বাকভঙ্গির বৈষম্যে নিহিত, ঈগলটন তা মানছেন না। ঈগলটন বলছেন,—একটি মানুষ স্বভাবতই তার কোনো পঠিত উপন্যাস থেকে সাধারণ উদ্ধৃতি দিতে পারে, তাই বলে তাকে সাহিত্যভাষা হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই। যেহেতু সে যে-গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিচ্ছে তার Context যদি বলেও দেয়-যে এটি একটি সাহিত্যভাষা, আর যদি সেই উদ্ধৃতি একেবারেই সাদাসিধে (!) হয়ে থাকে, তাহলে তাকে অন্য Literary Discourse থেকে পৃথক করা মুশকিল। সেক্ষেত্রে যে-কেউ কোনো তদানুরূপ উদ্ধৃতি দিলে তাকে সাহিত্যিক ভাবার কোনো কারণ নেই। কারণ, ভাষার সার্থক প্রয়োগই ভাববে কোনটি Literary Discourse কিংবা নয়।

আরও প্রাসঙ্গিক বিষয় এই-যে, আঙ্গিকবাদীরা যখন পুরো সাহিত্যকেই ‘আশ্চর্যকরণ’-এ নিয়ে যাচ্ছেন, তখন তাদের সমালোচনা প্রবৃত্তিতে ঠাঁই পাচ্ছে কেবল কবিতাই। কবিতার রহস্যময় কৌশলগুলোই যেন আলোচনার প্রতিপাদ্য। তাহলে কেবল কবিতা নিয়েই সাহিত্যের সংসার? যদি তাই হয়, তাহলে Naturalistic বা Realistic রচনাসমূহের কী উপায়! বলাবাহুল্য আঙ্গিকবাদীদের তথ্যমূলক তৎপরতা থেকে এর মর্মার্থ বোঝা যায় না। তাছাড়া যে-কোনো সাহিত্যই making strange-এর আদলে গড়ে ওঠে না। অনেকটা এই কৃতিত্ব নির্ভর করে পাঠকের নিজস্ব পাঠকৃতির উপর। পাঠক তার পাঠ্যকে আক্ষরিক অর্থে পড়ছে, নাকি তার অন্তর্লীন অনুভূতিকেও পাঠের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে ধরে নিচ্ছে, সেটাও সাহিত্য-বিশ্লেষণে বিবেচ্য। অপিচ, পাঠকের সম্ভাব্য ভাবনার গভীরতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। কেউ হয়তো সুনির্দিষ্ট টেক্সটকে হালকাভাবে নিচ্ছেন, অন্যরা ভাবছেন ভিন্ন এক ব্যতিক্রমী সত্তার আদলে। সেক্ষেত্রে দু’জনের নির্ণীত ভাবভঙ্গি সম্পূর্ণ আলাদা। এমনকি বারবার পাঠেও টেক্সটের বিবিধ অর্থ উৎপাদন সম্ভব। কেননা :

no two readings can be said to be exactly the same, just as no critic can claim to have seized absolutely the authors meaning. (William Ray).

আবার আত্মসুখ কিংবা আত্মদ্বন্দ্ব… এই উভচারিতা একই মানসপটে সংগ্রন্থিত হওয়ার সম্ভাবনা যোগায়। সুতরাং, ভাব-সময়-প্রশ্ন ইত্যকার উপসর্গের সাথেও আমাদের পাঠ-প্রতিক্রিয়া জড়িত। ঈগলটন দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি রাস্তার নোটিশ বিভিন্ন প্রকার পাঠকের কাছে বিভিন্ন। আমরা আমাদের বিবেচনায় যদি ধরি, যেমন, সাদা লাঠি অন্ধত্বের প্রতীক। এরকম স্লোগান আমাদের দেশে জনপদের মোড়ে মোড়ে দেখা সম্ভব। তার মানে কী সাদা লাঠিই অন্ধ, নাকি তার বহনকারী! মধ্যরাতে মদ্যপ্রিয় কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব অনেকানেক অর্থপূর্ণ অর্থের সাথে অর্থহীন বিশ্লেষণের সাযুজ্য ঘটানো। অথবা কোনো বৃদ্ধ এরকম লাঠি ব্যবহার করলে তাকে অন্ধ ভাবার কোনো কারণ নেই। আবার কোনো কবি বা সাহিত্যিক তার অন্ধত্ব বিষয়ক সাহিত্য-ব্যঞ্জনার আকর পেতে পারেন নিজস্ব মুগ্ধ কাব্যকৌশলে। অর্থাৎ, ছোটখাটো বিষয়ে যাকে আপাতদৃষ্টিতে দ্ব্যর্থহীন বলা সম্ভব, তারই দ্ব্যর্থবোধকতা এখানে লক্ষণীয়।

প্রত্যেক ক্ষেত্রেই এই দ্বিবিধ অর্থপূর্ণ ব্যঞ্জনার সচল পাঠক্রিয়া হিসেবে কাজ করছে পাঠকের নিজস্ব আরোপিত পাঠরীতি;—টোটাল শব্দের অন্তর্লীন গভীরে নিজস্ব পাঠকৃতির বিস্তার। অর্থের আধিক্য পরিবর্তিত হচ্ছে বারবার। আবার একদম নিশ্চেতন পথচারীর ক্ষেত্রে উক্ত সিম্বলের কোনো অর্থ নাই। তার প্রতিদিনকার চলাচলার পথে এর আবেদন হয়তো গৌণ অথবা একে নিয়ে ভাববার অবকাশ নেই;—সেক্ষেত্রে এর সাধারণীকরণটাও বিবেচ্য। অর্থাৎ, এই পাঠকৌশলের অবলম্বন যেখানে নেই,—সদর্থক বাক্য নিরর্থক, উদাসিন। কবিতার ক্ষেত্রে এই ব্যাখ্যাপট আরও জটিল। কবিতার বিশ্লেষণ আসম্ভব (?)। রবীন্দ্রনাথ কবিতা বলতে বোঝেন ‘ভাষার মধ্যে ভাষাতীত’কে প্রতিষ্ঠা করা। আর, লালন ফকির একধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেন :

মনের ভাব প্রকাশিতে
ভাষার উদয় এ জগতে
মনাতীত অধর চিনতে
ভাষাবাক্য নাহি পাবে।

এ এমন এক সমাধিযোগের আত্মস্বীকৃতি যেখানে ‘মনাতীত’ সম্ভাবনার উপস্থাপনা একমাত্র মানুষের অনুভূতিপ্রবণ হৃৎসত্তায় আলোড়ন তুলতে পারে, মৌখিক কিংবা লেখ্য-বিশ্লেষণের দূরবর্তী হয়ে। তবু, আঙ্গিকবাদীরা এই দুঃসাধ্যকে সাধ্যে আনার যারপরনাই চেষ্টা করেছেন। সমালোচনা কিংবা বিশ্লেষণের আধিক্যে যাতে ‘গদ্যভাষিকক্রিয়া’ দুর্বল হয়ে না যায়, সেক্ষেত্রে তাঁরা সদাসচেতন ছিলেন। কিন্তু সমস্যা এলো এই making strange-এর তত্ত্বের আকৃতিতে, যেখানে অর্থের বহুলাংশ প্রকারভেদ সম্ভব, সেখানে এরকম একরৈখিক তকমা আঁটার কোনো মানে নেই;—অন্তত ঈগলটন তাই মনে করছেন।

জীবনানন্দ দাশ যখন লেখেন ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা’, তখন পাঠকমানের অনুচিন্তনে কী উপলব্ধি দাঁড়ায়? অবশ্যই নয়, বিকৃত অন্ধকারের বীভৎসতা-স্বরূপ তাঁর মানস-নায়িকার উদ্ভট ওই চুল। নাকি রাত্রির মতো থমথমে, কালো, দীঘল! অথবা এও দৃশ্যমান,—ওরকম ব্যাপৃত চুলের অধিকারিণী নারীর মহিমা। মূলত এই সমস্ত অজস্র বিচ্ছুরণের প্রত্যালোকে এক প্রেমসর্বস্ব হৃদয়ের অতি নিকট কথোপকথন সংক্ষেপে অথচ ভীষণ রহস্যময় আদলে তীক্ষ্ণ হতে পারে। অর্থাৎ, কী বলা হচ্ছে তা নয়, বরং কাব্যের অভিপ্রেত পঙক্তি বলার রকমফেরেই অনেকার্থ অর্থের দ্যোতনা এখানে মহিমান্বিত। বলার ধরনের ভাবভঙ্গি মানুষের আকরসিদ্ধ চেতনার অনুরণনকে ছুঁয়ে যেতে সক্ষম। এই প্রকাশের ধারণাই সাহিত্যকে self-referential করে তোলে। এমতোকল্পে কবি যা লিখছেন,—প্রকাশের ভাষাভঙ্গি, ভাষার স্নিগ্ধ গাঁথুনি সবকিছুই আত্ম-সম্পর্কের উৎকর্ষ যোগানদাতা। অবশ্য পাঠক সেটাকে কবি যে-ভাবনায় লিখছেন, এর সাপেক্ষে পাঠ করবে,—তা দুরাশা। কবিতার রকমসকম যেরকমই হোক, নাটক-নভেলেও এর প্রভাব, বিস্তৃতি বিবেচ্য।

পূর্বেই বলা হয়েছে, টেক্সটের সামূহিক অবস্থা নির্ভর করে পাঠকের স্বকীয় পাঠকৃতির উপর। পাঠক ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ পড়তে পারেন মেঘনাদ তথা রাবণ/লঙ্কার কী হলো তা উপেক্ষা করেই। বস্তুত তাই হয়; বরং আমরা মধুসূদনের কাব্যকৌশলের প্রাখর্যে বেশ মুগ্ধ হই। তাঁর লেখনী ‘আমাদের বড্ডো লেগেছে মাইরি’…। ভাবায়। আবার সাহিত্য-অভিধা ছাড়াও দর্শন কিংবা ইতিহাসও এর ভাগিদার। দর্শনকে কাব্যভাবে পড়া সম্ভব। হেগেল কিংবা মার্কসের দর্শনচর্চা আমাদেরকে অনুরূপ ভাবায়,—কাব্যিক সংশ্লিষ্টতাও এনে দেয়। অথবা চার্চিলের ২য় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস;—তিনি কিন্তু পাচ্ছেন সাহিত্যে নোবেল! সাহিত্যভাষার এমন দুর্মর আকর্ষণ এখানে, একে সাহিত্য সমতুল্যে পড়া খুব একটা কঠিন নয়। অন্যান্য পাঠক বইটিকে তথ্যমূলক পাঠক্রিয়া হিসেবেও ভাবতে পারেন। চার্চিলের ওই ২য় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস আবার শ’দুয়েক বছর পরে স্রেফ প্রত্নতাত্ত্বিক ডকুমেন্ট! মোদ্দা কথা,—এদের ‘জন্ম’ যেভাবে হোক-না-কেন, ‘সহিত’ পদবী নিঃসন্দেহে সেখানে আরোপিত (!)।

হতে পারে, টেক্সট লিখিত হয়েছিল সাহিত্য হিসেবে, কিন্তু মর্যাদা তার ইতিহাস কিংবা দর্শনের। অর্থাৎ, গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি যা লিখছেন তা পাঠক কীভাবে গ্রহণ করছে,—সেটাই বিবেচ্য। লেখক তো প্রত্যেক লেখাকেই সার্থক বিবেচনা করে লেখেন, কিন্তু তার স্বীকৃতি তো লেখকের ইচ্ছের উপর নির্ভরশীল নয়। পাঠকের সূক্ষ্ম মনের জিজ্ঞাসাকে পরিতপ্ত বা উসকে দিতে পারলেই তবে-না তা সাহিত্য। তাহলে ‘সাহিত্য নির্ধারক’ কারা (?)—পাঠক! এভাবে বলা সম্ভব, ঈশ্বর গুপ্ত থেকে হাল আমলের যে-কোনো কবির কাব্য-ঋদ্ধতার পাশাপাশি এও স্মর্তব্য, পাঠকরা এইসব সাহিত্যকর্মে নিজেকে যথাতিরিক্ত সম্পৃক্ত করেছেন। পাঠকের এই ‘সংলগ্নকরণ’ বহু বিচিত্র। ফলে একেক লেখকের সাহিত্যমূল্য অন্যদের ছাড়িয়ে যাওয়ার যে-দ্যোতনা, তারও প্রেক্ষাপট এই ঘনত্বের উপর। এবং তাঁরা সুচিন্তিত নির্ধারণ;—ঈশ্বর গুপ্ত কিংবা অন্যান্যদের সাথে সাম্প্রতিক জয় গোস্বামী বা মৃদুল দাশগুপ্তের কোনো মননশৈলীগত Similarity নেই। অর্থাৎ, যাঁরা মোটমাট সার্থক হিসেবে সাহিত্যে জ্যোতিষ্কমান, তাঁদের স্বাতন্ত্র্য এমনই, তাঁরা অন্যদের চেয়ে সতত পৃথক;—এই তাঁদের এতদিনকার স্বীকৃতি। বলা যায়,—এইসব সাহিত্যের তেমন কোনো একক নেই যা সাধারণ হিসেবে সাহিত্যের বৈশিষ্ট্যের প্রতি dedicated, সাধারণ বৈশিষ্ট্যের অনুপস্থিতিতেও ঈগলটন বলছেন,—সাহিত্যের essence বলতে কিছু নেই। যে-কোনো লেখাকে যেমন non-pramatic discourse হিসেবে পড়া সম্ভব, কাব্যিকভাবেও তার পঠন-পাঠন স্বীকৃত। দর্শন কিংবা ইতিহাস এই অর্থে সাহিত্যের অভিধাযুক্ত হতে বাধ্য।

Kamal Kumar Majumdar; Image Source & Credit: Collected; Google Images

সাহিত্যের সত্তা অস্থির, কেননা এর মূল্যায়ন হরহামেশা পরিবর্তনশীল। যাকে আমরা Fine Art বলছি, অন্যদের কাছে হয়তো বরাবরই গুরুত্বহীন। হেগেল, ডারউইন তাত্ত্বিক মানুষের উপাদেয় হলেও জনসাধারণে এর অবস্থা ততোধিক ঘোলাটে। Teen age-এর নিকট তো অপাঠ্য। অতএব, শ্রেণিভেদেও সাহিত্যের মূল্যভেদ প্রখর। লেখকের অমুক সাহিত্য ‘উত্তম’ নাকি ‘উত্তমের মতো’, এ-নিয়েও সংশয় থাকতে পারে। সুতরাং, উত্তম-অধম, ফিকশনাল, নন-ফিকশনাল, কুশলী-অতিকুশলী—এরকম অসংখ্য চেইনের ভিতর সাহিত্যের প্রাত্যহিক পাঠ। ঠিক যা আপনার বিবেচনায় ‘অতিকুশলী’, সেখানে অন্যদের চাহিদায় তা ‘কুশলী’ই। অতএব, এসবের কোনো সুনির্ধারিত অস্তিত্ব আছে বলে মানে হয় না।

ভাষার রকমফেরও আবার একজনকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিতে পারে। কমলকুমার মজুমদার কিংবা জীবনানন্দ দাশ ভাষাগতভাবেও আবহমান বাংলা সাহিত্যের পৃথক সত্তা। ভাষার কুশল ও সংযমী পরিণয়েই এমতাবস্থা! অথচ সাধারণ্যে তাঁরা হয়তো মূল্যহীন। এক্ষেত্রে দু-মেরুতে সাহিত্যিক মূল্যায়ন দ্বিবিধ। তারওপর সময়ের ছোবল তো আছেই। বিমূর্ত সময়ে যথারীতি আমাদের আকল্প প্রত্যয়, নির্মাণ, সৃষ্টি তথা বাস্তবে আঘাত হানে। এর কোনো পরিসর নেই এমন সম্ভাবনায় কৃষ্ণগহ্বরে বিস্মৃত স্মৃতির মতো সময়ের যে-তীক্ষ্ণ অনুধাবন, তারও স্বরক্ষেপণ ওই সাহিত্যের নিস্পৃহ কিংবা অবচেতনের ভাষা। সময়ের ইশারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; বিচিত্র ইন্দ্রজালের স্বতঃসিদ্ধতায় সে প্রামাণ্যে প্রক্রিয়াজাত,—যে-কোনো নিরন্তর সৃষ্টির উন্মুখ সংজ্ঞায়নে।

কাকে ফেলে দিতে হবে কিংবা কার সম্ভ্যাব্য জাগরণ ওই ভবিষ্যতের দৃষ্টিভঙ্গিতে তাৎপর্যবহ, এমন অন্তর্নিহিত সত্তার সমূহতা সময়ের নিরবয়ব সংকেতে প্রোথিত। জীবনানন্দ উঠে আসছেন অথচ সময়ের সমসাময়িকতায় তিনি মোটমাট অবহেলিতই ছিলেন। অন্যদের ধসও সময়ের রুচি পরিবর্তনের প্রতীক। সময়ের নিজস্বতার প্রকৌশলে এই নিরবচ্ছিন্ন প্রবহমানতা এমনসব ইতিহাসের পূর্বাপর সাক্ষী, যাকে অতিক্রম করা দুঃসাধ্য। এমনকি সময়ের তীক্ষ্ণ অনুভব কেমন তিতকুটে, তাও বিচিত্ৰ জ্ঞানলব্ধ মানুষ ছাড়া অন্যদের পক্ষে বোঝা মুশকিল।

ঈগলটন এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে নিশ্চিত হচ্ছেন-যে,—শেক্সপিয়রের রচনা ইদানীং শুধু Graffiti হিসেবে হয়তো বিবেচিত হবে, অর্থাৎ সময়ের নীরন্ধ্র স্রোত তার আধুনিকতা ও আকরণবাদের যথার্থতা হারিয়ে সমকালীন শেক্সপিয়র ও হাল আমলের শেক্সপিয়রের মধ্যে বিস্তীর্ণ ফারাক গড়ে তুলবে। অর্থাৎ Historical Time Period তার নিজস্ব প্রয়োজন ও সময়ের নিবিড়তম ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে তৈরি করবে নিজস্ব হোমার কিংবা শেক্সপিয়র, যা পরবর্তী বৈজ্ঞানিক কিংবা আরও সৃষ্টিশীল উন্মাদনার তাড়নায় হয়তো নিষ্প্রয়োজন, এবং ভাষাতাত্ত্বিকতায় তাদের দৌর্বল্যের পরিসর হয়তো আরও নিরর্থক করে দেবে যুগোপযোগী ভাষার স্নিগ্ধ অস্তিত্বের মহাবিস্ফোরণ।

রবীন্দ্র পরবর্তী ৩০ সময়ের কবিদেরও বিভিন্ন চেতনাস্পৃহায় এই বটবৃক্ষ অতিক্রমের তীক্ষ্ণ ইঙ্গিত রয়েছে। সময়ের আধুনিকতার সংক্রমণ এমনই, তা বাধাবন্ধনহীন;—সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর। শব্দের নিজস্ব বিকিরণলব্ধ বিহ্বলতা থেকে ভাষার নতুন অব্যয় এবং পর্যায়ক্রমিকে এর আবহমানতা এমন, যা সাহিত্যের উপটানকেও আমূল বদলে দিতে পারে। বুদ্ধদেব বসু তাঁর আত্মজীবনীতে এমন সময়ের নিরবচ্ছিন্ন মহাপরিসরে কীভাবে তার আত্মিক-ভাষা-বদলের প্রেক্ষাপট তৈরি হলো এর বিবরণে লিখছেন :

আমার আদর্শ ছিল এজরা পাউণ্ডের ইমেজিস্ট ম্যানিফেস্টো—আধুনিক যুগে পদ্য কীভাবে লিখতে হবে তার কয়েকটা নিয়ম বেঁধে দিতেও আমি দ্বিধা করিনি। ‘সনে’, ‘ছিনু’, ‘মম’, ‘তব’, প্রভৃতি ‘কাব্যিক’ শব্দ ছেঁটে ফেলতে হবে, আকাশকে ‘গগন’ বা সূর্যকে ‘তপন’ বলা কখনোই চলবে না, ‘সাধুভাষা’র ক্রিয়াপদগুলিকে উপড়ে ফেলা চাই…।

অর্থাৎ রবীন্দ্র-সময়ের ভাষার গ্রাহ্যতা এখন অতীত, Linguistic ভাবধারা এখন নতুন উৎপ্রেক্ষার অপেক্ষায়। বদলে যাচ্ছে সময়ের পরিধি তথা অভ্রান্ত সময়ের পরিগণক। এহেন শব্দ ছাঁটা মাত্রই তৈরি হচ্ছে নতুন ভাবগম্ভীর অথচ মৌখিক ভাষার কাছাকাছি শব্দ থেকে নতুন অভিধাযুক্ত সাহিত্যের অবয়ব, যাতে মননশীল পাঠকের নির্বিঘ্ন মনোযোগ এখানে নিরন্তর, অথচ অনির্দেশ্য। সময়ের নিজস্ব স্থাপনার অস্থির ও অনিবার্য প্রকাশভঙ্গিমায় সাহিত্য তথা ভাষারীতি বদলেছে হরদম। অভিজিৎ সেনের ‘রহু চণ্ডালের হাড়’ কিংবা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ আঞ্চলিক/মৌখিক ভাষাকে এমন সাহিত্যরূপ দিয়েছে, যা শব্দের নিজস্ব প্রকাশভঙ্গিমায় অবশ্যই পরম ক্রিয়াত্মক এবং সার্থক। অর্থাৎ, সময়ের প্রচ্ছন্ন বহুবাচনিকতাই অন্যতম নির্ধারক, সে সাহিত্য অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যতের সীমানা ডিঙিয়ে এই মুহূর্তেও সচল কিনা, নাকি মৃত্যুর চিহ্নায়নে বিলুপ্তির আশঙ্কা। হায়!

Behold the times when trembling on their stems
The flowers evaporate like thuribles;
The sounds and scents turn in the evening cool; Sad waltz, languid intoxication!

Evening Harmony, Baudlaire

অসংখ্যতার বিশ্লেষণী প্রতিপত্তিও জন্ম নিতে পারে অন্তত ব্যাখ্যেয় হিসেবে, মিথ্যের বেসাতিও খানিকটা আসে যদি সে অসতর্ক ভাবভঙ্গির সহায়ক হয়। তবে অনুভব সম্ভূত মূল্যায়ন যথেষ্ট তীক্ষ্ণ ও মেধাবী;—এই প্রেক্ষাপটে সত্যের অপলাপ হওয়ার আশঙ্কা কম। ধরুন আমি বললাম, অমুক কবির জন্ম ১৯৬৯ সনে, যা নির্দিষ্ট এবং সত্য। কিন্তু যখন তাঁকে কোনো দশকের কবি বলে অনুসৃত করি, তখন কৃতিসত্তার আবহে কোনো কিছুকেই সুনির্দিষ্ট ভাবা যাচ্ছে না। অর্থাৎ, সত্যের মূলয়ান এখানে অস্পষ্ট, পরোক্ষ। কেউ দশকের ভিতর থেকে তাঁর সাহিত্যকৃতির বিশ্লেষণ করতে পারেন, আবার অন্য কেউ যদি বলেন,—আমি তাঁর সাহিত্যমেধা ব্যাখ্যা করি ‘দশকের গণ্ডির বাইরে এসে’, এবং তাঁর লেখনীয় সৃষ্টিকৌশলের চেতনায়,—তবে সেটাও মূল্যায়ন;—যদ্দুর ফারাক, তা এই মূল্যায়নের প্রতিভেদ।

ঈগলটন বলছেন, পানশালার (pub, jack Staggered red-nosed out of the pub) কথোপকথন আদান-প্রদানমূলক;—ভাষাতাত্ত্বিকের মতে যোগাযোগ সংস্থাপন। আরও প্রকাশ্য ভাষায়, আমি সাহিত্য নিয়ে অন্য কারো সাথে আলোচনায় এমন আগ্রহী যিনি সাহিত্যের প্রতি অনুরক্ত অথবা আমি আগ্রহী, তিনিও ওই বিষয়ে দুর্বল হলে আমাকে জাহির করার পরিস্থিতি আরও সুদৃঢ় হয়। এমনও হতে পারে আমার সার্বিক চেতনা প্রোপ্রাগান্ডার স্বরূপকৃত, যেখানে অনর্থক বাকবিতণ্ডা আমার স্বভাবলব্ধ। অর্থাৎ, একটি যোগাযোগ সংস্থাপনের প্রকৃত উদ্দেশ্য বহুবিধ, এবং আমাদের প্রচণ্ড আগ্রহ একেকটা সত্যের,—যদ্দুর সম্ভব নিজের মতো করে বাড়িয়ে বলা। তবে ‘সত্য বিকৃতি’ সম্পর্কিত অনুধ্যানে যথেষ্ট সচেতন না হলে সে-মূল্যায়ন ভিত্তিহীন, সময়ের বিচারে ধোপে টিকবে না;—এটাই সত্যের শাস্তি।

একথা ঠিক, বিশ্বায়নের যুগে সাহিত্যও এখন পণ্যায়নের সহোদর। কোমল পানীয়, সাবান-তেলের সাহিত্যকৃতিও বিজ্ঞাপিত। লাখলাখ কপি তথাকথিত বাজারচলতি বুড়োহাবড়া লেখকদের একমাত্র স্বপ্ন। সাহিত্যরুচির সংগতি-অসংগতির প্রতি কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। যে-কোনো মানুষের একদম শৈশব থেকে মধ্যবয়স পর্যন্ত সারাৎসার কাহিনিগুলোকে বিজ্ঞাপন ও সেক্সের মালমশলা বেঁধে দিয়ে বাজারে ছেড়ে দেয়া;—এতে আত্মবিস্মৃতির প্রবঞ্চনায় গৃহীত ইদানীংকালের তীব্র রুচিবোধের মানসিকতাও। এমনকি ইঁদুরদৌড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন আত্মস্থিত সৌন্দর্যের নিরন্তর অন্বেষক, সাহিত্যের উৎকর্ষ বিচারকরাও। কিচ্ছু করার নেই;—ভাষা ও সাহিত্য তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।

পাঠরুচি সুতরাং নির্ভর করছে সমসাময়িক উন্মাদনার মাঝেও। এমনকি, আমার পাঠরুচি নির্ভর করে আমার পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গির অভিজ্ঞতাসমূহের উপর। আছে এমন কিছু বিশ্বাস ও প্রবণতা, যেখানে আমি আশৈশব বন্দি বা সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোর তৎসংলগ্নতা হয়তো আমাদের কাছে নমস্য। জৈবিক ক্রিয়া-প্রক্রিয়া তো আছেই। এতোসবের নিহিত ‘মূল্যায়নরীতি’র সংলগ্নে বেড়ে ওঠে সাহিত্যপাঠের Factual Expression. কখনো কখনো পাঠরুচির মূল্যায়ন এমন অমোঘ, যা আমাদের প্রাত্যহিক ও আবহমান জীবনের সাথে একান্নবর্তী। জীবনের স্বাভাবিকতার ধরন তদ্রূপ;—যা চিরবহমান, এমনসব ধ্রুব রীতিকে পুনর্মূল্যায়িত করতে হলে সমাজজীবনকেও পরিবর্তিত হতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রাত্যহিক দর্শন এবং ‘সাহিত্যরুচি’-র পক্ষপাত সংঘর্ষে নেমে যেতে বাধ্য। অতঃপর পাঠককে একখান শিরোপা :

Literary texts do not exist on bookshelves: they are processes of signification materialized only in the practice of reading. For literature to happen, the reader is quite as vital as the author.

সাধারণত লেখকের লেখাগুলো শূন্যগর্ভবিশেষ। ইয়া মোটা জলপিপি, কানাকড়ি দু-একটা। এহেন লেখকের স্বেচ্ছায়—‘শূন্যগর্ভ’ প্রচুর। লেখক জানাবেন না সম্ভাব্য ব্যক্ত ও অব্যক্তর মধ্যকার সেতুটি। কম্পিত লেখায় অত্যন্ত সুগভীর এক অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশের ব্যক্তচূর্ণ হাপিত্যেশ। যেহেতু তিনি রিপোর্টার নন, সেহেতু যা দেখছি, দেখি,—একই আন্তর্চোখে যা দেখছি না, দেখি না তারও খেলা,—খেলোয়াড় কিন্তু তথাপি থাকে। অতএব পাঠকের পাঠক্রিয়া হতে হবে আরও চেতনাগর্ভ, অনুসন্ধিৎসু। কেননা সেই শূন্য কিংবা অন্ধকারের পাদপূরক তো তিনিই। দৈব-উদ্‌ঘাটন, অলৌকিকের লৌকিক ব্যাখ্যা, অনুমান, বিচার ও শান্তি—সব, সবকিছুর একক হর্তাকর্তা পাঠক;—যে-কারণে the reader is quite as vital as the author.

টেরি ঈগলটনের বিশ্লেষণ বিষয়ক Ideology-র সংজ্ঞাও পৃথক। যা বিশুদ্ধ, চিরায়ত এবং পরিপক্ত জীবনায়নের প্রতীক, সেই আদর্শকে তিনি বিবেচনায় আনছেন না। কারণ, এই ক্ষুধার্ত পৃথিবীর সাপেক্ষে আদর্শ ‘Ideology’ অনিবার্য বেমানান। তাঁর ধারণা, প্রত্যেক Factual Discourse-এর কিছু অন্তর্নিহিত এমন মূল্যায়ন থাকে, যাকে প্রকাশ্যে আনা লেখক-সমালোচকের আয়ত্তের বাইরে। সমালোচকের পক্ষে তাঁর সমকালীন লেখকের পাঠ-বিশ্লেষণ এককথায় দুরূহ। প্রতিক্রিয়ার একটা নিশ্চিত ভয় থাকেই। একে অগ্রাহ্য করে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হওয়া অনেকের কাছে অসম্ভব, কখনো বাহুল্যও ঠেকে। ভাবেন মেধার অপচয়। শেষতক তাঁরা পূর্বজদের, বিশেষ করে মৃতদের অধিক মূল্যায়ন কিংবা ভবিষ্যকহনের উপর বিশ্লেষণ ছড়িয়ে দিলে বরং অনেক নিশ্চিন্তি;—এ-উদ্দেশ্যটা প্রমাণিত। এ-দায় বড়ো অপ্রতিরোধ্য। সেহেতু প্রস্তাব,—আমরা মোটমাট উৎপল বসুর কবিতার পঙক্তি আওরে যেতে পারি :

এখন সময় নয়। এত আগে কেউ কি এসেছে?

সত্যিই এখন সময় নয়। সে-বিচারের দায়ভার ভবিষ্যৎ পাঠের উপর। নতুবা কাউকে দোষী বা নির্গুণ করার দায়ে পাপবিদ্ধ হওয়া;—এ বড়ো ঝুঁকির প্রত্যক্ষণ। পাঠক কিংবা সমালোচক এই Subjective মতামতকে বিপদ ভেবে এড়িয়ে যান। এ-যেন অমোঘ রীতিনীতি। অর্থাৎ ইহারা তাঁহাদের প্রকৃত আদর্শ হইতে বিচ্যুত হইয়াছেন। ঈগলটনের Ideology এমন, যা কোনো-না-কোনোভাবে Power Structure-এর সাথে সম্পর্কিত। আর, এই আন্তঃসম্পর্ক এমন, যা আমাদের অনেকানেক সিদ্ধ বিচারবুদ্ধি ও শ্রেণিকরণকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়।

জন্মসূত্রে যেটুকু বিশ্বাস করি-যে, আমরা ভবিষ্যতের পথে আগুয়ান; তেমনি সময়ে এমন তত্ত্ব খাড়া করা সম্ভব,—পিছন দিক থেকেও ভবিষ্যতের দিকে আগানো যায়। বলাবাহুল্য, এই ধারণাটা তখনই সার্থক, যদি তা সেই সামাজিকীকরণের ভবিষ্যৎ-কৌশল সমাজের ক্ষমতার কাঠামো বা Power Structureএর সাথে সংবিধিবদ্ধ থাকে। অর্থাৎ ঈগলটনের Ideology-র অনুভব, মূল্যায়ন ও Truth-value বিবিধ আন্তঃপরিস্থিতিতে সমাজের Power Structure-এর লালন ও পুনর্জন্মের সাথে সম্পর্কিত। উদাহরণের মাধ্যমে তিনি এই স্থিতিশীল প্রবণতাকে আরও পরিষ্কার করেছেন :

ক্যামব্রিজের সমালোচক আই.এ. রিচার্ডস তাঁর অধীনস্থ কিছু undergraduate ছাত্রদের কতিপয় কবিতা দিয়েছিলেন তার মূল্য নির্ধারণের জন্য। এবং পরীক্ষাপর্ব শেষ হলে দেখা গেল এক বিচিত্র ভয়াবহতা, যেখানে ত্রিকালদর্শী কবিদের কালোত্তীর্ণ কবিতাগুলো পেয়েছিল সবচে’ কম নাম্বার। মোটকথা পরিসংখ্যানে নিম্নগামী।

ঈগলটন অবশ্য তা দেখছেন ধনাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। তাঁর মতে কবিতা সম্পর্কিত এইসব তরুণদের আপ্ত ধারণা যেমন জানা গেল, তেমনি এও জানা হলো কবিতা হতে এদের পাওনা কতটুকু। এবং তিনি নির্দিষ্ট করে দিচ্ছেন সেইসব তথাকথিত ছাত্ররা নিশ্চয়ই উচ্চ বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত, বর্ণবাদী, প্রাইভেট পড়ুয়া এবং ২০ শতকের ইংরেজ তরুণ-তরুণী। সে-কারণে এদের সামাজিকতা এতটা রুচিসমৃদ্ধ নয়, যেখানে কবিতার ইতিবাচক value-judgement সম্ভব। সমাজিক ক্ষমতার দুর্বৃত্তায়ন ও অবক্ষয়জাত প্রতিশব্দে এরা এমনভাবে নিমজ্জমান, এবং এর প্রভাব-যে কতটুকু নেতিবাচক তা তাদের মূল্যায়নের বাধোচ্ছাচারে বিবৃত। এটুকু ধারণা করা সংগত, এই উচ্চ বা মধ্যবিত্তের হাতেই সাহিত্যের পণ্যায়নের কুহক নির্মিত। স্থূলবুদ্ধির ইত্যকার রুচিবোধ এই সামাজিক পরিস্থিতিকে সুশৃঙ্খল বা সুশীল করতে দেয়ার প্রধান অন্তরায়। চারদিকে অতএব আদর্শের ১২টা বেজে যাচ্ছে।

ঈগলটনের পরামর্শ তাই,—সাহিত্যের মূল্যায়ন হোক একেবারে নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। এবং আমরা যাকে স্বেচ্ছাচারবশত সাহিত্য বলছি, সেরূপ প্রবণতার অবসান হোক। কারণ, ভাষা ও সাহিত্যের তাত্ত্বিক মূল্যায়নে প্রত্যক্ষণ ও পরীক্ষণের পাশাপাশি ‘স্বেচ্ছাচারিতা’ এই শব্দটি বড্ডো বেমানান। এমনকি আবহমানকাল ধরে সাহিত্যের তথা ভাষার উপর যে-সকল মৌলিক বা স্বীকৃত বয়ান প্রচলিত আছে কিংবা বংশপরম্পরাগত বিশ্বাস—সে যতই সুদৃঢ় হোক, তাকেও নতুন মূল্যায়নের সাপেক্ষে প্রশ্নের সম্মুখীন করতে হবে। পশু যে-অর্থে পশু, সাহিত্য সে-অর্থে সাহিত্য নয়, কেননা সাহিত্যের value judgement আবশ্যিকভাবে social ideology-র সাথেও সুসম্পৃক্ত। এবং subjective assumption ছেড়ে objective ভিত্তি ধারণার সাপেক্ষেই ভাষা ও সাহিত্যের যথার্থ বাছ-বিচার হোক।
. . .

Book Cover: Terry Eagleton; Image Source & Credit: Amazon;

অ ব ল ম্ব ন

১. কথায় কথায় ইংরাজি না বলিলে কি আর আধুনিক হওয়া যায়! অতএব…। একদা এই বাঙ্গালার অভিজাত মুসলমানেরা বাঙ্গালার পরিবর্তে উর্দুতে কথা কহিতেন, কেননা সে-ভাষার লালন-পালন নাকি অভিজাততন্ত্রের সুলক্ষণ ছিল। অতঃপর ৫২-র ভাষা আন্দোলন অমন অভিজাততন্ত্রের মুখে লাথি মারিয়া স্ববংশে বিতাড়িত করিয়াছে। কিন্তু এই, এক্ষণে ইংরাজির মুখে ঝাঁটা মারিবে এমন আন্দোলন কই? ইংরাজি কি কালক্রমে উর্দুর মতো রাষ্ট্রভাষা হইবে?

২. Terrry Eagleton: Literary Theory, an Introduction, Basil Blockwell, London, 1983 প্রবন্ধের ২য় ভাগ মূলত উক্ত গ্রন্থের ‘সাহিত্য কী?’ এমন পরিভাষার ভূমিকাংশের আলোকে লিখিত। ঈগলটনের এই পুস্তক একখানি মহাগ্রন্থ। পুরোটার উপর কোনো ভাব-ব্যাখ্যা লিখতে হলে ধারাবাহিক আলোচনার প্রয়োজন।

৩. রাশেদ মিনহাজ ও খোন্দকার আশরাফ হোসেন কৃত Terry Eagleton: Literary Theory Boroduction-এর একবিংশ-এ প্রকাশিত ধারাবাহিক অনুবাদ। এই সার্থক অনুবাদের জন্য লেখকদের ও একবিংশ পত্রিকাকে সাধুবাদ। 

৪. সুমন ঘোষ : ফর্মালিজম : ধ্রুবপদ, সম্পাদক : সুধীর চক্রবর্তী, বার্ষিক সংকলন ২০০০ 

৫. আমি একটা বই লিখ(-এ)ছি : অজিত চৌধুরী, অনুষ্টুপ, ১৯৯৪ 

৬. সংস্কৃতির কুশল সংবাদ : দীপেন্দু চক্রবর্তী, অনুষ্টুপ, ১৯৯৪ 

৭. নিজের জীবন, বীজের জীবন : সম্পাদনা: গৌতম ঘোষদস্তিদার, রক্তমাংস, জানুয়ারি ২০০৯ 

৮. কেরুয়াক, বারোজ, গিন্সবার্গ, গ্রাফিত্তি, জানুয়ারি ১৯৯৮

. . .

পাঠ-সংযুক্তি : মন-মিররে পুরাতন ও নতুন

কবি-গদ্যকার সন্তর্পণ ভৌমিক-এর দীর্ঘ রচনাটি একুশ বছর আগে আহমদ সায়েম তাঁর সম্পাদিত ছোটকাগজ সূনৃত-এর চতুর্থ সংখ্যায় প্রথম ছেপেছিলেন। রচনাটি পরে অনলাইন, অফলাইন মুখপত্র বা কোনো বইয়ে স্থান পেয়েছে বলে আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি। ছোটকাগজের পাঠকমহলে নির্দিষ্ট কারণফেরে আলোচিত-সমালোচিত ও একইসঙ্গে পাঠ-সমাদৃত সূনৃত-র উক্ত সংখ্যায় ছাপা লেখাটি ফিরে পড়তে গিয়ে মনে হয়নি,—কুড়ি বছর পার করে আসা কোনো রচনা পড়ছি! তাও আবার এমন একটা বিষয়ের উপর, গত কুড়ি বছর ধরে অতিচর্চিত শুধু নয়, দুইহাজার চব্বিশ পরবর্তী সময়ে দাঁড়িয়ে এর বুদ্ধিবৃত্তিক অভিলক্ষ্য বিতর্কিত এবং প্রশ্নবিদ্ধও বটে!

একুশ বছরে অনেক জল গড়িয়েছে ধরায়। অগ্রজ কবি পাঁশু প্রাপণ-এর (বিনেন্দু ভৌমিক) মতো অনুজ সন্তর্পণ ভৌমিকও কবিতায় নিবেদিত থেকেছেন। দুজনের কবিতা লেখার ধাত অবশ্য শুরু থেকে পৃথক পথে এগিয়েছে। বিজ্ঞানগন্ধী শব্দ ও বিষয় কবিতায় একীভূত করে লিখতেন পাঁশু প্রাপণ। তাঁর হস্তাক্ষরটা যেখানে দ্রষ্টব্য হয়ে দাঁড়াত। আমরা বেশ অবাক হয়ে দেখতাম, পাঁশু প্রাপণ কাগজ-কলম হাতে নিছক একটা কবিতা লিখছেন না, কবিতায় ব্যবহৃত শব্দগুলোকে হাতের কারুটানে নান্দনি কু করছেন!

পাঁশু প্রাপণের কবিতা পড়া সুতরাং দুরকম অর্থ তৈরি করত ওইসময়। একটা হচ্ছে, কবিতার আভ্যন্তরীণ পরিসর, যেখানে বিজ্ঞানের পরিভাষার সঙ্গে তৎসম শব্দরা মিলে একটা আবহ ও অনুভূতিকে কবি কাগজে জন্ম দিচ্ছেন। অর্থ ও সারার্থ দুর্বোধ্য এমন নয়, তবে শীতরাত্রির কুয়াশার মতো অস্পষ্ট। কাছে থেকেও যেন দেখা যাচ্ছে নার কাছের জিনিস। ধরা দিয়েও দিচ্ছে না… এরকম মনে হতো পড়ার সময়। কবি তা পুষিয়ে দিতেন প্রতিটা কবিতার ভিতরে রেখে যাওয়া সাংগীতিক ব্যঞ্জনা দিয়ে।

সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মতো পাঁশু প্রাপণের কবিতাও বহন করেছে আন্তঃসাংগীতিক লয়, এবং কবিতার অর্থ-ভাবার্থ-সারার্থর চেয়ে ওটাই বরং পাঠকের কানে পৌঁছানোর উৎকণ্ঠা থেকে হয়তো লিখতেন কবিতা। অগ্রজের থেকে অনুজ সন্তর্পণ এখানে ভিন্নগামীই থেকেছেন। পাঁশু হয়তো কবিতার আলো-আঁধিয়ারে যেসব গুরুতর বিষয় গুহ্য রাখাকে সমীচীন মনে করতেন, ঢাকা দিতে চাইতেন আপাত অবোধ্য পরিভাষিক শব্দ ও বাক্যে, সন্তর্পণকে সেখান বার্তাটা দিতে বেশ উদগ্রীব মনে হতো। কবিতার শরীরে এবং কবিতায় সম্ভব না হলে গদ্যে তাঁর কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য বা অভিলাষ যে-কারণে একটা সংযোগ তৈয়ার করতে চাইছে বলেই পাঠক ধরে নিতেন।

Poet Pashu Prapon; Image Source & Credit: Collected; Poet’s FB Page

মেডিকেল শিক্ষার্থী পাঁশু প্রাপণ কবিতা ও গানে স্ববশ থাকার দিনকালে ছোটকাগজ ও অন্যত্র গদ্য বড়ো একটা লিখেছেন বলে মনে পড়ছে না। হয়তো লিখেছেন মাঝেমধ্যে, তবে আমাদের চোখে তা অনাবৃষ্কিত থেকেছে। অন্যদিকে, প্রকৌশলবিদ্যায় বয়েত নেওয়া সন্তর্পণ ভৌমিক কবিতায় কলম চালানোর সঙ্গে গদ্যটাও লিখতেন। সংখ্যায় কম হতে পারে, কিন্তু লিখতেন কবি ও প্রাবন্ধিকের কেমিস্ট্রি দিয়ে মিলানো এক ভাষায়। এআই শাসিত ভাষা-দুনিয়ার পা রাখার পর সন্তর্পণের এই বিশেষ ছাদের ভাষাটা সামনে নজর কাড়বে পাঠকের।

দার্শনিক চিন্তন ও নানামুখী তত্ত্বঝড় নিয়ে তাঁর পাঠ-অনুসন্ধিৎসা গদ্যগুলোয় মিলত বৈকি। এখান থেকে দেখলে, সূনৃত চতুর্থ সংখ্যায় ছাপা রচনাটি সন্তর্পণের জন্য ব্যতিক্রম ছিল না। বিশেষ কোনো মতলব নিয়ে লিখেছিলেন, তাও নয়। রচনাটি পাঠ-প্রাসঙ্গিক এর অন্তর্নিহিত প্রসাদগুণের কারণে। একটা সন্ধিক্ষণকে সূনৃত-র ওই সংখ্যাটি এর সম্পাদকীয় ও লেখাগুলোয় তখন ধারণ করেছিল। ভালোমন্দ, অম্লমধুর প্রতিক্রিয়াও মিলেছিল হাতেনাতে। সন্তর্পণের গদ্যটাকে তখনকার পাঠক ট্রেন্ড ভেবে মনে হচ্ছে এড়িয়ে গেছিলেন! যেহেতু, এসব নিয়ে লেখালেখি ও আলাপে বাজার সরগরগম ছিল ওই সময়টায়। পোস্টমর্ডানিজম, উত্তরআধুনিকতা, নিম্নবর্গ ও ধ্রুপদি থেকে নব্য মার্কসবাদের তাত্ত্বিক পরিসর, আর এসবের একটা জারণ-বিজারণ থেকে বেরিয়ে আসা ভাবান্দোলনে নিজেকে সড়গড় রাখতে দুই বঙ্গের অনেকানেক কবি, ছোটকাগজকর্মী ও বিদ্যাজীবীকে উতলা দেখাত। সন্তর্পণের লেখাটিকে সেরকম চলতি হাওয়ার পন্থী কিছু ভেবে কি উপেক্ষা করেছিলেন পাঠক? লেখাটি যদিও এর কোমলে-কঠিনে গুলানো ভাষার রস-পরিহাসে এখনো পাঠ-সুখকর ও পাঠ-প্রাসঙ্গিক বলেই মনে হচ্ছে আমাদের।

পশ্চিম থেকে বেনোজলের মতো ভেসে আসা নতুন চিন্তা ও তাত্ত্বিকতায় বাংলাদেশের সাহিত্যমহলের প্লাবিত হওয়ার ক্ষণটাকে সন্তর্পণ ধরেছেন তাঁর গদ্যে। আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির জায়গাজমি ও চাষাবাদকে এসবে ফেলে যাচাই করছিলেন বোদ্ধাজন। লোকসাহিত্য, লোকসংস্কৃতি, আধুনিক বাংলা সাহিত্যকে একটা আমব্রেলার নিচে ঝাড়াই-বাছাই ও নতুন কিছু করার প্রাবল্য টের পাওয়া যাচ্ছিল নব্বইয়ের বিচিত্র অভিমুখে যেতে চাওয়া কবিতাকর্মে। যদিও, ওসব কবিতায় জীবনের তাপ-উত্তাপ, আগে দশকের শাহরিকতা ও গ্রামীণতার মধ্যে বসে রচিত কবিতার ডিকশন থেকে স্বেচ্ছায় বিচ্যুতি নিয়েছিল। নিয়েছিল, তবে পড়তে যেয়ে মনে হচ্ছিল কোথায় জানি অনুভূতির তন্ত্রীগুলো বেজে উঠছে না! ইম্পালসটা থেকেও নেই। তার মধ্যে ঘটছিল বিশ্বায়ন, পণ্যায়ন, স্নায়ুযুদ্ধ উত্তর বাণিজ্য ও এক অনিবার্য নতুন উগ্রতার চাষাবাদে বলীয়ান রাজনীতির ভিতর দিয়ে নতুন মনোজাগতিক উপনিবেশ রচনার শতমুখী তৎপরতা।

সন্তর্পণ ওরকম এক সন্ধিক্ষণে বসে লেখাটা লিখেছেন। এর শুরুটা রঙ্গ-পরিহাস দিয়ে ঘটছে, এবং অ্যাট দ্য মিডল পয়েন্ট, টেরি ঈগলটনে পৌঁছে মোড় নিয়েছে সেমি-একাডেমিক আলোচনায়। বলাবাহুল্য, বিংশ শতাব্দীর শেষ দশক ও মিলেনিয়ার প্রথম দশক মিলে যে-কুড়ি বছর, তার চলমান অভিঘাত যদি এখন স্মরণ করি একবার, সন্তর্পণ ভৌমিকের গদ্যটাকে সেখানে দালিলিক মনে হবে। সায়েবকুলের রেখে যাওয়া কলোনিজমকে বুঝতে হলো নিজের কোনো অভিজ্ঞান দিয়ে নয়, ওই সায়েবকুলের জগৎ থেকে স্রোতের মতো আসতে থাকা বিচিত্র ন্যারেটিভকে ব্যবহার করেই।

Poet Santarpan Bhowmick; Image Source & Credit: Collected; Poet’s FB Page

একদিকে নিজের বলে বুঝে নেওয়া ট্রাডিশন বা ঐতিহ্যে গুঞ্জরিত ভদ্র ও অভদ্রজনের রকমারি সাংস্কৃতিক ছাপ, অন্যদিকে উপনিবেশে স্নাতকমনের বনেদে নিজেকে ডিফাইন করানোর প্রাণান্ত কসরত ও এখন একে নিয়ে প্রশ্ন তোলা মিলে বেশ একটা কমিক ফিল দিচ্ছিল তখন। তার মধ্যে বসে যেহেতু লেখাটা লিখছেন এক তরুণ কবি, সুতরাং এই রচনায় তাঁকে দিশেহারা দেখছি, এমনকে পুনরায় পাঠ করার সময়েও। যেন এসব নিয়ে ঠিক কী করবেন তিনি কিংবা বাকিরা, কোনটা রাখবেন আর ফেলে দিবেন কোনটা, নিজের কোনটার সঙ্গে এসবের কোনটার কী সহবত… এসব নিয়ে দ্বিধাঝড় ও রঙ্গের কিনারা মিলছে না! সন্তর্পণের গদ্যচাল এই আভাসটা পরিষ্কার দিয়ে যাচ্ছে এখানে।

ফরাসি সৌরভের মতোই মশহুর ফরাসি তাত্ত্বিকতা, তার মাঝখানে ব্যর্থ বিপ্লবে অনিকেত মার্কসবাদে নতুন সব তরঙ্গ, এবং তার মধ্যেই নব্য-মার্কিন পণ্যায়নের বিশ্বায়ন মিলে বাঙালি, বাংলাদেশী পরিচয়বাহী কবি কিংবা লেখক কোথায় দাঁড়িয়ে ছিলেন তখন? আর, একুশ বছর পেরিয়ে এখনই-বা কোথায় দাঁড়িয়ে আমরা?

জীবনতরঙ্গে সাব-অল্টার্ন, ফুকোর ক্ষমতা রাজনীতি, দেরিদার গ্রামাটোলজি, লাকাঁর মনোজগতে হানা দেওয়া চেতনাস্তর, সাঈদের প্রাচ্যবাদ… এরকম ঝুড়ি-ঝুড়ি পোস্ট-মডার্ন, পোস্ট পোস্ট মডার্ন ক্যাচালে লালন, রবীন্দ্রনাথ কিংবা আধুনিকতাবাদে নিমিজ্জিত ত্রিশের কবিতা, এবং এরকম হাজারে-বিজারে দেশি-ভিনদেশি চিহ্নস্রোতে গা ডোবানো ও গা ভাসানো শেষে নীড় মিলেছে কি? কিছু কি দেখা যাচ্ছে সঠিক? নাকি, নব্বইয়ের ওই পণ্যায়ন পরবর্তী ঘূর্ণির মধ্যে আচমকা তড়িৎস্পৃষ্ট হাবার মতো দাঁড়িয়ে বাংলার জলমাটির রসে ভেজার রোমান্টিক ‘বাই’-এর সঙ্গে তফাত করা যাচ্ছে না, এমনকি আজকের এই দাঁড়িয়ে থাকাটাকেও?

কিছু কি পালটেছে বাংলা সাহিত্যের? তার লোকসাহিত্য ও শিক্ষিতজনের সাহিত্যে কি দূতিয়ালি ঘটাতে বড়ো ভূমিকা রাখল এসব তত্ত্বঝড়? নাকি, সবটাই বোঝা-না-বোঝা, গিলতে পারা ও না পারা, গেলানোর চেষ্টা ও গলদঘর্ম হওয়া, এবং পরিশেষে হাসি পেয়েও হাসি আসছে না, ভয় পেলেও ভয়ে গা শিরশিরি করছে না… এরকম কাকতাড়ুয়া হয়ে ঝুলছি ধানখেতে কিংবা ট্রাফিক ল্যাম্পপোস্টের নিচে!

এসব প্রশ্ন সন্তর্পণ ভৌমিকের তারুণ্যখচিত বয়সকালে লেখা গদ্যটায় পাঠকের পাওয়ার কথা। যেখানে, এই গদ্য নিজেকে দুভাগ করে নিয়েছিল তখন। রস-পরিহাস থেকে সিরিয়াস হওয়ার চেষ্টায় একটা কিছু করে ওঠার করুণ কসরত লেখাটাকে আর্দ্র রেখেছে। কুড়ি-বাইশ বছর আগে এরকম সন্তর্পণরা বড়ো জীবন্ত হতে চেয়েছিলেন বাংলার সাহিত্য ও ভাষায়। আর, জীবন্ত হতে চাওয়া ও না হতে পারার দ্বিধাঝড় নিয়েই ওটা হানা দিচ্ছে দুইহাজার ছাব্বিশে। যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিজের চেয়েও শক্তিশালী বলে জানছে এর স্রষ্টা মানুষ। যেন সে ঘুমঘোরে একটা নতুন প্রজাতি প্রসব করছে, তার ইতিহাস হয়ে ওঠার বয়ান লিখছে নিজহাতে, যেখানে রচয়িতাকে স্বয়ং ঝাপসা দেখায়…!

যেখানে, কেবল লেখক হতে চাওয়া নয়, লেখা বস্তুটাকেই মৃত ভাবছে মন। যা লিখছি, মনে হবে এআই লিখে দিচ্ছে। লেখকের মরণ, পাঠকের মরণ, মানুষেরও মরণ কি তবে সন্তর্পণ লেখাটা লেখার দিনকালে বীজের মতো বপন করেছিলেন টেরি ঈগলটনের সাহিত্য-ভাবনার ধাত বোঝাতে নেমে? প্রশ্নটা এইবেলা একুশ বছর আগে রচিত লেখাটা উসকে দিয়ে গেল মনে হচ্ছে।

পাঁশু প্রাপণের গোটা-গোটা সাজানো হস্তাক্ষরে লেখা কবিতার মতো একটা সন্ধিক্ষণ এখনো চলছে। হস্তাক্ষরটা সেখানে স্পষ্ট ও নান্দনিক, তবে এর অর্থবোধকতা আধো বোঝা ও না-বোঝার প্রহেলিকায় ঘনীভূত। কেবল একটা সুরেলা টান, মানুষকে কুহকিটানে ঘুরিয়ে মারবে আঘাটায়… এরকম টান যেন সময়ের কাগজে ফুটে উঠছে। সন্তর্পণ ও পাঁশু প্রাপণ… সময়টানে প্রবীণ হতে চলা অগ্রজ ও অনুজ কি এর কোনো ঝাপটা টের পাচ্ছেন ভিতরে? জানতে সাধ জাগছে বটে!

—আহমদ মিনহাজ : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস


. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …

মনোকালচার ও পলিকালচার : গণ-উদ্‌যাপন থেকে খণ্ড-উদ্‌যাপন

আমাদের বুদ্ধিজীবীতা : প্রভাববলয়, মুগ্ধতা ও সংশয় : হাসনাত চৌধুরী

অন্যভাবে থাকা ও ‘কেন্দ্রহীনতার দর্শন’ : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ

‘থামতে জানা’ যখন জরুরি : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ

‘ইনফোক্রেসি’র যুগে ‘সত্য’ : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ

আর্ট ফর ‘অ্যাকশন’ ও হ্যারল্ড রোজেনবার্গ সমাচার : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ

অশুভ যখন হয়ে ওঠে মামুলি : প্রসঙ্গ হানা আরেন্ট

বুদ্ধিজীবী কী দিয়া মাপব?-২

. . .

লেখক পরিচয় : সন্তর্পণ ভৌমিক

সন্তর্পণ ভৌমিক-এর জন্ম ও বেড়ে ওঠা মনু নদী পরিবেষ্টিত মৌলভীবাজার শহরে। মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে স্কুলজীবন কেটেছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন, পরে কানাডার উইন্ডসর বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমান ও সেখানেই নিবাস এখন। ২০ ও ২১ শতকের সন্ধিস্থলে লেখালেখির সূত্রপাত। কবিতা মূলমাধ্যম হলেও, গদ্যও লেখেন মর্জি হলে। এক যুগের কাছাকাছি লেখামাধ্যমে সক্রিয় সন্তর্পণ ভৌমিকের কোনো বই এখনো আলোর মুখ দেখেনি। ছোটকাগজ ও অনলাইন মুখপত্রে স্বচ্ছন্দ খুঁজে নিয়েছেন। কালিমাটি, রাশপ্রিন্ট-সহ একাধিক অনলাইন মুখপত্রে লিখছেন কবিতা ও মাঝেমধ্যে গদ্য। সন্তর্পণের কবিতা এক অন্তর্গত আলোয় নিভৃত সংলাপ করে নিজের সঙ্গে। নব্বই দশক ও পরবর্তী তটরেখায় দাঁড়িয়ে লিখে চলেছেন মৌনঘন ইশারামাখা ভাষায় কীটভার্যার মতো সময়নিবিড় তন্নিষ্ট কবিতা :

তুমি রক্তপদ্মে কীট হয়ে থাকে৷
দু’পেয়ে, দুহাত, একাহারি মস্তকের প্রতিবিম্ব
তুমি জলে শোনো হাড়মড়মড়ি
পাঁজরআঁধারে শোনো নাতিদীর্ঘশ্বাস
তুমি চিন্তিত, মন্দ্রিত, স্থিরচিত্র আঁকো
কতখানি দীর্ঘ হবে তপ্ত উরুখানি,
স্পর্শ হবে কতখানি দাহ্য অনুপাত
রাতভর বৃষ্টি হবে, ভিন্ন প্ৰহসনি!

এ কীট নিষাদ কালে, এবং প্লাবনে
হৃদয়ের তুলনীয় কাছাকাছি থাকে
আমি তার রূপভোগি, দেহসহবাসী
এ আমার একান্ত মোকাম নিবাসী।

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 28

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *