
মনোকালচার নিয়ে সিনেপাঠক দেবজ্যোতির পডকাস্ট এমন সময়ে নজরে এলো, যখন আমেরিকান লোকসংগীতের অন্যতম আইকন ডলি পার্টন সদ্য প্রয়াত হয়েছেন। আর্জেন্টিনার জাতীয় দলকে ওদিকে ‘বিদায়’ জানালেন লিওনেল মেসি। দুটো ঘটনা জনপরিসরে চর্চিত হচ্ছে, এবং নতুন ঘটনার ভিড়ে চাপা পড়বে কিছুদিন পরে। প্রশ্ন দানা বাঁধছে মনে,—নিত্যনুতন ঘটনা নিয়ে কথা বলার চাপে মানুষ কি বিস্মৃত হতে থাকবে এই দুজনকেও? উত্তর ‘না’ হওয়ার সম্ভাবনাই অধিক অবশ্য। এটা নিশ্চিত বলা যায়,—ডলি পার্টনের সুমিষ্ট গান শ্রোতারা দূর ভবিষ্যতেও শুনবেন। দর্শকভরতি কন্সার্টে অন্য শিল্পীরা তাঁর গান নতুন করে গাইবে নিয়মিত। নিজেকে উদ্যাপিত হতে দেখার দৃশ্যগুলো দেখার জন্য ডলি পার্টন যদিও সেখানে থাকছেন না। ফুটবল মাঠে বল দখল ও জালে পাঠানোর রোমাঞ্চকর লড়াই যথারীতি চলবে, কিন্তু লিওনেল মেসি নামের জাদুকরকে বল পায়ে মাঠে নামতে দেখবে না দর্শক!
গানের মঞ্চে ডলি পার্টন ও ফুটবল ময়দানে লিওনেল মেসির অনুপস্থিতির ফলে তৈরি হওয়া শূন্যতা কি ভরাট করা যাবে বাকিদের দিয়ে? ইনফ্যাক্ট, তাঁদের কীর্তি গণ-উদ্যাপনের বিষয় ছিল এতদিন। আর, ওটা তখন হয়, যখন কোনো কীর্তি গড় সীমানা ছাড়িয়ে ‘বিশেষ কিছু’ হয়ে ওঠে। ‘বিশেষ কিছু’র অনুপস্থিতি ‘সামথিং ইজ মিসিং’-এর অনুভূতি মানুষকে দিয়ে যাবে মনে হচ্ছে। সামনে এরকম ‘কিছু’ যদি পুনরায় জন্ম না নেয়, মনোকালচারের প্রভাব কি থাকবে আগের মতো? প্রশ্নটি তলিয়ে দেখার সময় হয়েছে।
মূল প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে লিওনেল মেসিকে নিয়ে বহু চর্চিত কিছু কথা পুনরায় স্মরণ করতে চাই। দিয়েগো মারাদোনার পর আরো এক আর্জেন্টাইনকে মানুষ অতিচর্চিত হতে দেখেছে লম্বা সময় ধরে। তাঁর অবসরে যাওয়ার ঘোষণা যে-কারণে ‘বিয়োগব্যথা’র অনুভব দিচ্ছে খেলাপ্রেমী মানুষকে। এই তো কিছুদিন আগে মেসির বাবা হর্হে হোরাসিও মেসি (Jorge Horacio Messi) চলে গেছেন তাঁকে ছেড়ে। স্ত্রীকে প্রায়ই বলতেন,—‘ও যেদিন বুটজোড়া তুলে রাখবে, মাঠে খেলবে না, সেদিন আমি কী করব?’ মেসি যেন শুধু মাঠের খেলায় মনোযোগী থাকতে পারেন, তা নিশ্চিত করা ছিল হর্হে মেসির জীবনের ব্রত।
ফুটবল এজেন্টের পূর্ব অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না। দায় তবু কাঁধে নিয়েছিলেন ছেলের কথা ভেবে, এবং আমৃত্যু তা পালন করে গেছেন ঘড়ির কাঁটার মতো নির্ভুল ছন্দে। মেসি যেমন জানাচ্ছেন,—অনেক বিষয়ে তাদের নাকি মতের মিল হতো না, পরে দেখা যেত হর্হেই সঠিক ছিলেন। লিওনেল মেসিকে তাতিয়ে তোলার মূল কাণ্ডারি ছিলেন তার বাবা এবং বড়ো ভাই। লিওর ফুটবলসত্তা যেন পূর্ণতা পায়, কানায়-কানায় ভরে ওঠে অমৃতসুধায়, তা নিশ্চিত করতে দুজনের নিবেদনে কোনো ঘাটতি ছিল না।
ছাব্বিশের বিশ্বকাপটা লিওনেল মেসি মূলত খেলেছেন আর্জেন্টিনা ও রোগশয্যায় থাকা বাবাকে আরো একবার বিশ্বকাপ হাতে নেওয়ার সুখ দিতে। হর্হে তাকে বলেছিলেন,—‘সবকটা ম্যাচ স্টেডিয়ামে বসে আমি দেখব!’ একটা ম্যাচও দেখার ভাগ্য হয়নি এবার। বরাবরের মতো ম্যাচ শেষে মেসির কাছে আসেনি কোনো খুদে বার্তা,—‘ভালো খেলেছো লিও, তবে দুইটা গোল-যে মিস করে গেলে! ঠিক হয়নি!’ লিওনের মেসি কুড়ি বছর মাঠে দৌড়েছেন তিনটা কারণে :
এক, অধরা বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে এই অভিযোগ চিরতরে মিটিয়ে ফেলা,—দেখো দ্য গ্রেট দিয়েগো মারাদোনা দাপটের সঙ্গে কাপটা জিতে নিয়েছিল। তুমি, লিও, কেন তা পেরেও পারছো না বলো তো! বারো বছরে চারটা বিশ্বকাপের মধ্যে তিনটায় দলকে ফাইনালে তোলা লিওনেল মেসি কাপটা অবশেষে জিতলেন দুইহাজার বাইশ কাতার বিশ্বকাপে। অপ্রাপ্তি বলে কিছু বাকি থাকেনি আর।
কোপা দেল রো, একের-এক লিগ শিরোপা, একগাদা ব্যালন ডি’অর থেকে শুরু করে গোল, অ্যাসিস্ট, ড্রিবলিং, প্লে-মেকিং, এবং দলকে উজ্জীবিত করা ও প্রয়োজনে একা টেনে নিয়ে যাওয়ার দারুণ সব ম্যাজিক মোমেন্ট… ফুটবল অভিধানে একটা ল্যান্ডমার্কও বোধহয় অবশিষ্ট নেই,—মেসি যা পেরিয়ে যাননি। খুদে জাদুকরের অর্জনকে একক কোনো ফুটবলশিল্পীর পক্ষে অনাগত ভবিষ্যতে পেরিয়ে যাবার সম্ভাবনা শূন্য ধরা যেতে পারে।
দুই, বাবা হর্হে মেসি। নিজের ফুটবলার হতে না পারার ক্ষুধা ছেলেকে দিয়ে শতভাগ মিটিয়ে নিয়েছিলেন তিনি।
তিন, অবশ্যই ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। মেসির সঙ্গে টক্কর দিতে অমানুষিক গোলমেশিনে নিজেকে রূপান্তরিত করেন সিআর সেভেন। কথা মিথ্যে নয়, রোনালদোর জয়ী হওয়ার অদম্য ক্ষুধা মেসিকে মাঠে অবিশ্বাস্য কীর্তি করে দেখানোর জন্য তাতিয়ে তুলেছে বারবার। রোনালদো যদি না থাকতেন, মেসির মধ্যে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার তাড়না কি এতটা প্রবল হতো? মনে হয় না।
দুজনের লড়াই জমে ওঠার মাঝপথে ক্লাব ফুটবলে লিওনেল মেসির অর্জন অনেক দিকপালকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। অদম্য লড়াকু রোনালদো সেখানে বাগাড়া দিয়েছেন নিয়মিত। মেসি যেন অনেকটা বাধ্য ছিলেন বল পায়ে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার কবিতা ফিরে-ফিরে লিখে যেতে। দুই তারকার দশকি লড়াই ফুটবলে এমন এক মাহাকাব্য উপহার দিয়েছে, দূর ভবিষ্যতে এটা নিয়ে মানুষ কথা বলবে।
শ্রোতাদের জন্য তিন হাজার গান রেখে যাওয়া ডলি পার্টন, ফুটবলের সবুজ ময়দানে স্মরণীয় কীর্তি গড়ে দর্শককে রঙিন করে রাখা মেসি-রোনালদো, এবং আরো অনেক শাখা-প্রশাখার বরণীয় কীর্তিমানরা কি তাহলে পরিশেষ? বিপুল সংখ্যক মানুষ মিলে এক-একজন কীর্তিমানকে চর্চা ও উদ্যাপনের মনোকালচার ডলি পার্টনের বিদায় ও লিওনেল মেসির অবসরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে অস্ত যাওয়ার আভাস দিচ্ছে?
মনোকালচারের পরিসমাপ্তি ঘটার সম্ভাবনা নিয়ে দেবজ্যোতির পডকাস্টে বলা কথাগুলো এখানটায় এসে মূলবান হয়ে উঠছে। মনোকালচার জিনিসটা কী বা এর আদিঅন্ত ইন অ্যা নাটশেল তিনি গুছিয়ে বলেছেন পডকাস্টে। যারা তা শুনবেন, তারা এম্নিতেও বুঝে যাবেন,—কী-কারণে দেবজ্যোতি একবিংশ শতকে বিশ্বজুড়ে মনোকালচারের ম্রিয়মাণ হয়ে পড়া ও পলিকালচারে মোড় নেওয়ার পেছনে যুক্তি খাড়া করছেন। সংক্ষেপে তবু মনোকালচারটা বুঝে নিতে পারি আরেকবার। ধরতে সুবিধা হবে তাহলে,—ডলি পার্টন ও লিওনেল মেসিকে দিয়ে হঠাৎ কেন এই বকুনির সূত্রপাত করেছি আজ।

মনোকালচার হচ্ছেে কোনো ব্যক্তির গড়া এমনসব কীর্তি,—মানবসমাজের বৃহৎ অংশ যেগুলো একসাথে উদ্যাপন ও চর্চা করে। এই যেমন, সদ্য প্রয়াত ডলি পার্টনের গান দুনিয়াজুড়ে ইংরেজি গানের শ্রোতাদের বড়ো একটা অংশ শুনেছেন। উলটো দৃশ্যটাও এখানে বিবেচনায় আসবে। শ্রোতা-সমাজের আরেকটি বড়ো অংশ দেখা যাবে তাঁর গান কখনো শুনেইনি! ডলি পার্টন নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো স্মৃতি ও ধারণা জমা নেই। সুতরাং, স্মৃতিকাতরতায় ভোগার প্রশ্ন তাদের বেলায় থাকছে না। এরকম মানুষ গণ্ডা-গণ্ডায় মিলবে ধরায়,—গান ও খেলার স্থান তাদের জীবনে নেই। গানের শিল্পী বা কোনো খেলোয়াড়কে ঘিরে মানুষের উচ্ছাস ও পাগলামি দেখে তারা বরং বিরক্ত হয় মনে-মনে। আগ্রহ বা কৌতূহল হিমাঙ্কের নিচে থাকে সর্বদা।
বিধির লিখন বলতে হবে, খোঁজ নিলে দেখা যাবে,—বিরসবদন মানুষগুলোর অনেকে কী-করে জানি ডলি পার্টনের নাম শুনে ফেলেছে! ফুটবল খেলা দেখতে মাঠে বা টিভি সেটের সামনে বসার বাতিকে ভোগে না, অথচ মেসি, পেলে, মারাদোনা তাদের জীবনে এলিয়েন নয়। নামগুলো শুনতে-শুনতে কানে তালা লাগার যন্ত্রণা তবু সহ্য করে যাচ্ছে নীরবে।
মানবসমাজের বৃহৎ অংশ ডলি পার্টনের গান বা এরচেয়ে বৃহৎ অংশ লিওনেল মেসিকে নিয়ে চর্চা করায় অনাগ্রহীদের চোখ-কান-মগজে ডলি ও মেসি সহজেই ঢুকে পড়েছেন এতদিন। সমাজে বিপুল সংখ্যক মানুষ যখন কিছু একটা উদ্যাপন ও চর্চা করে, অন্য অংশ সেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শরিক হয়ে যায়। একে আমরা গণমুগ্ধতা বা গণসম্মোহন ভাবতে পারি। সমাজের মুগ্ধ বা সম্মোহিত নয় যে-অংশ, তাকেও রেয়াত করে না। অনিচ্ছায় তেতো গেলার মতো গণসম্মোহন ও গণ-উদ্যাপনকে তারা গিলতে থাকে।
দেবজ্যোতি এটাকে ‘সবাই মিলে একটা কিছু দেখা, শোনা, পাঠ ও তা-নিয়ে কথা বলা বা সোজা কথায় গণ-উদ্যাপন’ নামে চেনানোর চেষ্টা করেছেন। ফসলের চাষাবাদে ব্যাপক ব্যবহৃত এই পরিভাষা ‘মনোকালচার’ সমাজবিজ্ঞানেও শ্রেণিকৃত ও বিশ্লেষিত হয়ে আসছে। আশা করি বোঝানো গেল মনোকালচারটা কী বস্তু। মোটামুটি একশো বছর ধরে বিশ্বজুড়ে এই সংস্কৃতির দাপট চলছে বলে অনেকে মত দিয়ে থাকেন। দেবজ্যোতি যেমন চার্লি চ্যাপলিনকে স্মরণ করেছেন পডকাস্টে। মনোকালচারের সূত্রপাত নাকি তাঁর মধ্য দিয়ে গতি লাভ করেছিল প্রথম। এমনকি, ওই সময়টায় বিজ্ঞানের মতো গুরুতর বিষয়ে অতুল মেধাবী আলবার্ট আইনস্টাইন মনোকালচারের সাবজেক্টে পরিণত হয়েছিলেন। পরে যেমন স্টিফেন হকিংকে আমরা তা হতে দেখেছি।
এঁনাদের কাজের ধারা ও গভীরতা মানুষ কতটা কী ধরতে পেরেছে সেটা পৃথক গবেষণার বিষয়;—তবে তাঁদের কাজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য এতদূর গভীর ছিল, সমাজের জ্ঞানীগুণীরা কথা বলেছেন নিজের তাগিদে। গণমাধ্যম এই সুযোগে একে পুঁজি করায় বিশ্বজুড়ে হাইপ জন্ম নিয়েছিল। ব্যাস, বিজ্ঞানের ধীমান মনীষারা মহাতারকার ভার বহন করেছেন বাধ্য হয়ে। তাঁদের কাজটাই এমন, ওসব তারকা হওয়ার ঘটনা সেখানে অবান্তর থাকছে, তবে মাঝেমধ্যে এটা ঘটে যায় মানবসমাজে যুগান্তকারী পালাবদল আসার কারণফেরে। গ্যালিলিও, ডারউইন, আইনস্টাইন, নিউটনের মতো মনীষাকে মনোকালচার এভাবে শিকার করে দ্রুত।
বাংলা ভাষায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় আইনস্টাইনের মতো মহা জটিল মনীষার জনপরিসরে তারকাখ্যাতির ধরন নিয়ে ‘আইনস্টাইন ও ইন্দুবালা’ নামে চমৎকার গল্প ফেঁদেছিলেন। মনোকালচারের ইন্টারক্ল্যাশ বোঝার পক্ষে বড়োই খাসা হাস্যরসে বাঁধাই গল্পটি। বিজ্ঞানের অলিগলিতে বিচরণে স্বচ্ছন্দ আলবার্ট আইনস্টাইন অবশ্য বাস্তবে সুরসিক মানুষ ছিলেন। সংগীতরুচি প্রখর ছিল। এই বিষয়ে তাঁর জানাশোনা ও ভাবনার গভীরতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে আলাপচারিতায় ধরা পড়ে। নিজে দারুণ বেহালা বাজাতেন আইনস্টাইন;—এবং চার্লি চ্যাপলিনের ভক্ত দর্শকের একজন ছিলেন। চ্যাপলিনের ছবি উপভোগ করতেন বিজ্ঞানের অন্যতম দিকপাল। উপভোগ্য ও ভাবিয়ে তোলার শিল্পমেধায় চ্যাপলিন তুলানাহীন। অভিনয়শিল্পের মহান কুশীলব যে-কারণে মনোকালচারের শক্তিশালী প্রতীক রূপে বিশ্বে আজো চর্চিত নাম।
কীর্তিমান লোকজন কোনো একটা দেশ অথবা অঞ্চলসীমায় উদ্যাপিত ও চর্চিত হতে পারেন, যেমন রাজেশ খান্না, উত্তম কুমার ও রজনীকান্তের মতো সিনেমা আর্টিস্টের নাম নেওয়া যেতে পারে তাৎক্ষণিক। আসাম থেকে উঠে আসা জুবিন গর্গ তো সেদিনকার ঘটনা! তাঁর আকস্মিক প্রস্থানের সংবাদে জনস্রোত ও জন-হাহাকার দেখেছে বিশ্ব। মনোকালচারের অংশ কোনো কীর্তিমানের এই মাত্রায় উদ্যাপিত হওয়ার নজির ধরায় বেশি নেই। উম্মে কুলসুম, ফেলা কুটি ও মাইকেল জ্যাকসন মারা যাওয়ার পর বিরল দৃশ্যটি ঘটতে দেখেছে মানুষ। জুবিন গর্গের ক্ষেত্রে তা পুনরায় দেখা গেল! বাংলাদেশে ঢাকাই সিনেমায় রাজ্জাক, মান্না, সালমান শাহ, হুমায়ূন ফরীদি ও বর্তমানে শাকিব খানকে মনোকালচারের রসদ ভাবা যায়। দেশের সামাজিক পরিসরে তাঁরা উদ্যাপিত ও চর্চিত অনেকদিন ধরে।
মনোকালচার এই জায়গায় এসে দুটি তরঙ্গে ভাগ হয়। একটি তরঙ্গে দেশ অথবা নির্দিষ্ট অঞ্চলে কোনো কীর্তিমানকে সেখানকার সমাজ উদ্যাপন করতে থাকে, এবং অন্য তরঙ্গে সকল সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়া কীর্তিমান বিশ্বপরিসরকে নিজের করে নেন। মূল কথা একটাই, দেশের সীমানায় হোক অথবা বিশ্বসীমানায়, মানবসমাজের বৃহৎ অংশ যখন কোনো ব্যক্তিকে জীবনচর্চায় সম্পৃক্ত করে ফেলে, তখন এর ইমপ্যাক্ট অবশিষ্ট অংশকে প্রভাবিত না-করে যায় না। প্রভাবের ভালোমন্দ ও উচিত-অনুচিত নিয়ে চর্চা হয় তখন। পপুলার কালচার, পপ কালচার, মাস অ্যাপিল ইত্যাদি যেসব পরিভাষা আমরা ব্যবহার করি, সেগুলোর বিকাশে মনোকালচারের ভূমিকা তাই বিশাল।
যেটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত লিওনেল মেসির ধাপে-ধাপে ফুটবল থেকে বিদায় নেওয়ার লগ্নে প্রশ্নটা জোরেশোরে উঠতে শুরু করেছে, দেবজ্যোতি তাঁর পডকাস্টেও তা তুলেছেন,—ইন্টারনেট সংস্কৃতির যুগে অনেকে মিলে একসাথে কিছু উদ্যাপন ও চর্চার দিন কি সত্যি শেষ হতে চলেছে? ভারতবর্ষের সিনেমায় যেমন,—অমিতাভ, শাহরুখ, আমির, সালমানের মতো তারকরা কি মনোকালচারের সর্বশেষ সফল আইকন হতে যাচ্ছেন? ভবিষ্যতে কেউ কি আসবে না, যাকে বিপুল সংখ্যক মানুষ একসাথে উদ্যাপন ও চর্চায় মেতে উঠবে?
জমাট ক্রিকেট ম্যাচে দূর ভবিষ্যতের শচীন টেন্ডুলকার যদি খেলতে নামেন, তার খেলা দেখার জন্য কি রাস্তাঘাট দ্রুত ফাঁকা হতে থাকবে? আরো বড়ো স্কেলে যদি ভাবি,—মেসি-রোনালদোর মতো কেউ নামে মাঠে, তাকে নিয়ে বিরাট সংখ্যক মানুষ অবিশ্বাস্য উদ্যাপনে মেতে উঠবে কি? উদ্যাপনের ঠেলায় এমনকি বিরস লোকটাও বিরক্ত হয়ে শুনতে বাধ্য হবে,—মেসি মাঠে কীসব অতিমানবীয় কাণ্ডটাণ্ড করে GOAT হয়ে গেছে! সেখানে আবার পেলে, মারাদোনাকে ছাপিয়ে GOAT, নাকি তাঁদের অন্যতম, এ-নিয়ে তর্কাতর্কি বেচারাকে গিলতে হচ্ছে বাধ্য হয়ে!
পরিস্থিতি এমন, এর থেকে নিস্তার পাওয়ার উপায় নেই! পত্রিকা হাতে নিলে দেখে তারা এটা নিয়ে খবর ছেপেছে। চায়ের দোকান ও রেস্তোরাঁয় লোকজন টেবিল চাপড়ে তর্ক করছে তো করছেই। অনলাইন আরো খতরনাক! কোত্থেকে এসব নিয়ে হাউকাউ ভেসে আসে আল্লা জানে! ঘরে কি শান্তি মিলছে? বউ থেকে আরম্ভ করে বাচ্চা-কাচ্চারা আজব এই GOAT বিতর্কে কোমরবেঁধে লড়ে! মনোকালচারের এই বাড়াবাড়ি চর্চা, যেটা শত বছর বয়স পার করেছে, তা কি সামনে থাকবে অবিকল? দেবজ্যোতি মূলত মনোকালচার নিয়ে স্মৃতিকাতর আবেগ জানিয়ে প্রশ্নটি তুলেছেন পুনরায়।
এমনকি সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্পকলার মতো গুরুতর বিষয়ে যারা কাজ করেন, তাদের মধ্যে এমনধারা ঘটনা ও ব্যক্তি নিয়ে গণচর্চা বিরল নয়। মানব দঙ্গলের বড়োসড়ো অংশ মিলে চর্চা ও উদ্যাপনের নজির সেখান থেকেও তুলে আনা যাবে অনায়াসে। দ্য ভিঞ্চি, পিকাসো বা দালির ছবি কতজন আর দেখেছে? বোঝে কতজন? রবি ঠাকুর বা নজরুলকে নিবিড় জানে কত সংখ্যক মানুষ? হুমায়ূন আহমেদও দেখা যাবে সমাজের বেশ বড়োসড়ো অংশে অপঠিত ও অজানা। তথাপি, আরেকটি বৃহৎ অংশে ঢুকে পড়ার কারণে অজানা অংশে থাকা অনেকে রবি-নজরুল-হুমায়ূনকে চিনতে বাধ্য হয়! একটা মিথিক্যাল ইভেন্ট যেন ঘটে চলে কীর্তিমানদের নিয়ে! সোজা কথায় মানুষ এঁনাদেরকে মিথ না করা পর্যন্ত শান্ত থাকতে পারে না।
মনোকালচারের ভালোমন্দ ছাপিয়ে অতএব বড়ো হয়ে দাঁড়ায় এর সামাজিক অভিঘাত। এমন এক সম্মিলন এখানে ঘটছে, মানবস্মৃতিতে কোনো ব্যক্তি ও ঘটনাকে তা অবিনশ্বর করে তোলে! সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের আবেগ, ভাবাবেগ, উত্তেজনা, ভক্তি, এমনকি অপছন্দ ও ঘৃণার মতো ইম্পালসিভ সাইকোলজি। যা প্রমাণ করে, মানবসমাজ আবুল হাসানের ভাষায় ‘মাথামোটা মানুষের হুলুস্থূল মিলিত প্রবাহ’ হওয়া সত্ত্বেও এটা প্রাণবন্ত। এখানে ভালোবাসা ও ঘৃণা সমানভাবে একটা ঘটনা ও ব্যক্তিকে মানবিক সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া প্রতীকে পরিণত করে। অর্থাৎ, সেই মানুষটি আর রক্তমাংসে মানুষ থাকে না। রক্তমাংসের মানুষটির গড়া কীর্তি নিয়ে চর্চা ও উদ্যাপন তাকে ক্রমশ ঐশ্বরিক প্রতিমায় ডেমিগড করে তোলে।

মনোকালচার থেকে সৃষ্ট ডেমিগডের যুতসই উদাহরণ হতে পারেন দিয়েগো মারাদোনা। ইতালির ফুটবল ক্লাব নাপোলির শতবর্ষ পূর্তি নিয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশের ক্রীড়া সাংবাদিক দেবব্রত একটা ভিডিও পডকাস্ট ছেড়েছেন ইউটিউবে। মারাদোনার ডেমিগড হওয়ার গল্পটা সুন্দর করে বলেছেন সেখানে। আগ্রহীরা শুনতে পারেন, এবং শোনা উচিত মনে করি দেবব্রতর এই বয়ান। আমি তাঁর পডকাস্টের সারসংক্ষেপটা তবু তুলে ধরছি মনোকালচারের মাহাত্ম্য বোঝানোর খাতিরে :
প্রথম কথা, ইতালির নাপোলি শহরে মারাদোনা সোজাসাপটা দ্বিতীয় যিশু রূপে গণ্য বা চর্চিত হয়ে আসছেন। নাপোলি ফুটবল ক্লাবে মারাদোনা খেলেছিলেন কয়েক সিজন। ইতালির ফুটবল লিগের ইতিহাসে দলটিকে কেউ গোনায় নিতো না। নাপোলি শহর ইতালির অন্য শহরগুলোর মতো শানদার নয় অতটা। জেলে ও শ্রমিক শ্রেণির মানুষে বোঝাই হয়ে আছে সাগরঘেরা শহরটি। ধনেজনে, শিল্প-সংস্কৃতি ও স্থাপত্যকলায় ইতালির মনুমেন্টাল শহরগুলোর চেয়ে বেশ পিছিয়ে। অপরাধের আখড়া বলে বদনাম রয়েছে ব্যাপক। মাফিয়াদের স্বর্গরাজ্য হওয়ার কারণে অপরাধের মাত্রা সেখানে বেশ উচ্চ। এমন একটা শহরে শিরোপা খরায় ধুঁকতে থাকা ফুটবল ক্লাবে মারাদোনার খেলতে আসা ছিল শহরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়ো ঘটনা।
নাপোলিবাসীর জাতে ওঠার চেষ্টা বলতে সম্বল ওই ফুটবল। সবাই মিলে চাঁদা তুলে নাপোলি ক্লাবটি তারা খুলেছিল অনেকদিন আগে। এটা প্রমাণের আশায়,—একটা কিছু করে দেখানোর হিম্মত তারাও রাখে। মাঝেমধ্যে তা দেখায়নি এমন নয়, তবে ধারাবাহিকতা ছিল না সেখানে। গরিবের ক্লাবের কী-বা দাম থাকে জগতে! ইতালির ফুটবল লিগে নাপোলি খেলতে নামলে প্রতিপক্ষ সমর্থকরা টিটকারি জুড়ে দিতো,—‘এদের গায়ে মাছের গন্ধ আসছে মাগো! গোসলটাও করে আসেনি ঠিকমতো!’ অপমানে উপহাসে জর্জরিত নাপোলি চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে অবশেষে ত্রাতার দেখা পায়!
কে সে? দিয়েগো মারাদোনা। আর্জেন্টিনাকে মোটামুটি একলা বিশ্বকাপ জিতিয়ে বার্সেলোনায় খেলছেন তখন। নাপোলির লোকজন ঠিক করল ত্রাতাকে তারা নিজের ক্লাবে আনবেই এবার। বার্সেলোনা কি আর মাগনা ছাড়বে সোনার রাজহাঁস! চড়া মূল্য ধরে দিলো। চাঁদা তোলার পরে দেখা গেল টাকায় কুলোবে না। মাফিয়াদের শরণাপন্ন হলো সবাই মিলে। সব শুনেটুনে মাফিয়ারা বলে দিলো,—এ-তো দেখছি ইজ্জতের ওপর হাত দিয়ে বসেছে! ডরিয়ে মাত। টাকা যা-লাগে তা আমরা দেবো। জাদুকরকে উড়িয়ে আনো;—অপমানের বদলা সে নিতে পারে কিনা দেখি।
মারাদোনা এলেন, এবং আলেকজান্ডারের মতো এলাম-দেখলাম-জয় করলাম সুখে ভাসালেন নাপোলিকে। টানা দুবছর লিগ জিতল দলটি। এলিট দলগুলোকে হারিয়ে ইতালি কাপ, এবং অতি মহার্ঘ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিটাও তাদের শোকেসে এনে দিলেন মারাদোনা। নাপোলির হয়ে একা খেলে দিলেন সবটা। বলা হয়ে থাকে,—নাপোলির ছোট-বড়ো এমন কোনো মাঠ নেই, যেখানে ফুটবলঈশ্বর বল পায়ে জাদু দেখাননি। কাদাভরতি মাঠ থেকে সবুজে সবুজ মাঠে খেলেছেন স্ট্যাটাসের পরোয়া না করে। ব্যাস, ফুটবলশিল্পী মারাদোনা তারপর থেকে হয়ে গেলেন দ্বিতীয় যিশু। আর্জেন্টিনায় যেমন তাঁর নামে চার্চ আছে, ফুটবলইশ্বরকে সেখানে আজো উপাসনা করে ভক্তরা, নাপোলিতে তা নেই, তবে শহরটির অলিগলিতে তিনি রাজত্ব করেন স্বমহিমায়।
মাদককাণ্ড ও কর ফাঁকির ঝামেলায় জড়িয়ে বখাটে বলে নাম কেনা মারাদোনা ইতালি ছাড়তে বাধ্য হলেন অতঃপর। তিনি চলে যাওয়ার পর নাপোলি টানা ছত্রিশ বছর কিছু জিততে পারেনি! নাপোলিবাসীর কাছে এটা ছিল,—ইতালি থেকে যিশুকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করার মাশুল। ত্রাতা কষ্ট পেয়েছেন, এবং সেই অভিশাপে নাপোলি নেমে গেছে তলানিতে! যাইহোক, লিওনেল মেসি যে-বছর বিশ্বকাপটা হতে নিয়ে মারাদোনার সঙ্গী হলেন, কাকতালীয় হলেও সত্য,—নাপোলি ওই বছর ইতালি লিগ জিতল পুনরায়! নাপোলির মানুষের হিসাব এখানেও পরিষ্কার,—ত্রাতা অবশেষে সদয় হয়েছেন বলেই-না আর্জেন্টিনা ও নাপোলি একসঙ্গে কাপ জিতেছে। বাস্তবতা যাই থাকুক, শহরটির ফুটবলখোর মানুষগুলো আজো বিশ্বাস করে,—যিশু ফেরত আসায় এটা ঘটেছিল।
তারা বিশ্বাস করে,—মারাদোনা একজন নাপোলিয়ান। আর্জেন্টিনায় জন্ম নিয়ে কিছুদিন খেলেছেন সেখানে, কিন্তু তাঁর আদি জন্মভূমি নাপোলি। মারাদোনা নাপোলির যিশু! এটা হলো সেই মনোকালচার, যার প্রতি পরতে একটা শহরের মর্যাদা লাভ ও জাতে ওঠার অদম্য সামাজিক আকাঙ্ক্ষা কাজ করছিল। ছিল, অপমানের বদলা নেওয়ার চোয়ালচাপ সংকল্প।
নাপোলি শহরে যারা ঘুরতে যায়, তাদের জন্য দ্রষ্টব্য বা দেখার জিনিস হয়ে ওঠেন যিশু মারাদোনা। শহরের অলিগলিতে ডেমিগড রাজত্ব করে বেড়ান। নাপোলি এ-বছর শতবর্ষ উদ্যাপন করছে সাড়ম্বরে। আর্জেন্টিনায় মারাদোনাকে নিয়ে আয়োজন রেখেছিল তারা। তাদের কাছে ওটা দ্বিতীয় তীর্থ, যেহেতু মারাদোনা কিছুদিন খেলেছেন সেখানে। প্রথম তীর্থ নাপোলিতে বছরজুড়ে চলবে মারাদোনা বন্দনা। বন্দনার বাহার দেখলে মানুষের মিথ তৈরির সৃজনশীল সক্ষমতায় তাজ্জব হতে হয়! মারাদোনা, উইদাউট অ্যানি কোয়েশ্চন,—মিথ হওয়ার যোগ্য চরিত্র! নিজে মিথ হয় ওঠা লিওনেল মেসি পর্যন্ত বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচ শেষে মারাদোনার প্রসঙ্গ উঠতেই বলেছিলেন,—‘দিয়েগো বিশেষ, আমি তাঁর সঙ্গে কখনো নিজের তুলনা করি না।’

মনোকালচার এভাবে অফুরন্ত যেসব স্মৃতি তৈরি করল এতদিন, একুশ শতকে নতুন পালাবদলের সম্মুখীন বিশ্বে সেগুলো আর আগের মতো থাকছে না। লিওনেল মেসি বা এরকম দু-একজন আছেন এখনো ভিন্ন-ভিন্ন মহলায়, তাঁদেরকে দিয়ে গণ-উদ্যাপন সংস্কৃতির সমাপ্তি ঘটার লক্ষণ প্রকট হচ্ছে ক্রমশ। দেবজ্যোতি মূলত এরকম এক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন, এবং তাঁর কথায় যুক্তিও আছে যথেষ্ট।
তাঁর মতে, ইন্টারনেট সংস্কৃতির প্রভাবে বদলে যাওয়া বিশ্ব কখনো একটা মেসির দেখা পাবে না। ডন ব্র্যাডম্যান, সুনীল গাভাস্কার, ভিভিয়ান রিচার্ডস, শচীন টেন্ডুলকার, ব্রায়ান লারা, এমএস ধোনি, ইমরান খান, ওয়াসিম আকরাম, মুরালিধরন, শেন ওয়ার্ন, রিকি পন্টিং কিংবা ক্রিস্টোফার নোলান থেকে আরম্ভ করে শাহরুখ খান, উত্তম কুমার, কিশোর কুমারের মতো দুর্দান্ত ‘মিথ-মেকিং’ চরিত্রগুলো আর আসবে না ধরায়। এমন নয় প্রতিভার আকাল ঘটতে যাচ্ছে সামনে। মানুষের গণ-উদ্যাপনের ছবি ইন্টারনেট সংস্কৃতির হাতিয়ার সমাজমাধ্যমের কারণে দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বিরাট সংখ্যক মানুষ মিলে একসাথে কোনো কীর্তি ও কীর্তিমানকে চর্চার ইতিহাস ধরে রাখার উপায় আগের মতো নেই। সুতরাং, শত তোড়জোর করলেও, কারো পক্ষে অতীতদিনে স্বাভাবিক হাইপটাকে ফেরত আনা সম্ভব নয়।
গান, খেলা, সিনেমা থেকে শুরু করে সিরিয়াস বিষয়বস্তু, যার যেটা ভালো লাগছে,—সে সেখানে মাথা গুঁজে পড়ে আছে। একজন গানের শিল্পীর দেখা গেল মিলিয়ন-মিলিয়ন ফলোয়ার সমাজমাধ্যমে;—অনুসারীর কাছে তিনি বিগ ইভেন্ট রূপে চর্চিত ও উদ্যাপিত হচ্ছেন, অন্যরা কিন্তু তার ব্যাপারে জানতে পারছে না আগের মতো। মাস অ্যাপিল ও ক্রেজ মাইকেল জ্যাকসনের সময় যেমনটা দেখেছে বিশ্ব, বর্তমান ও আগত দিনগুলোয় তা কল্পনাতীত হয়ে দাঁড়াবে। মনোকালচার সুতরাং হারাচ্ছে প্রাসঙ্গিকতা।
দেবজ্যোতি ভালো বলেছেন,—সমাজে নানামুখী বিষয় নিয়ে চর্চার পরিধি অতিরিক্ত ব্যাপক হওয়ার ফলে কোনো একটা সিঙ্গেল ইভেন্টকে বিপুল সংখ্যক মানুষ মিলে উদ্যাপনের সময়, পরিসর ও আগ্রহ আগের মতো প্রাণবন্ত নেই। এমনকি ফুটবল, ক্রিকেটের মতো খেলা কিছুদিন পর গণ-উদ্যাপনের জলুস হারাতে থাকবে। খেলা যারা দেখতে ভালোবাসে, তারা একটা কমিউনিটি বা সম্প্রদায় রূপে এটা নিয়ে চর্চা ও উদ্যাপনে মেতে থাকবে। নতুন কোনো মেসি নামে কেউ হয়তো বন্দিত হবেন সেখানে, কিন্তু আজকের লিওনেল মেসির মতো ভাগ্য তার হবে না। বিশ্বজুড়ে শত কোটি মানুষকে সে আর কখনোই পাবে না সঙ্গে।
বিচিত্র বিষয়কে নিয়ে চর্চার কারণে অগণিত সেগমেন্টে ভাগ হয়ে যাচ্ছে মানুষের আগ্রহ। কারো একার পক্ষে সবগুলোর খবর রাখা অসম্ভব ঘটনা। সামনে এটা আরো পরিষ্কার প্রতিভাত হতে থাকবে। একটা মানুষের ইচ্ছে থাকলেও সবগুলো কাভার করতে সে পারবে না। একক কারো পক্ষে নিজের কীর্তি দিয়ে সকলের নজর কেড়ে নেওয়া ও সুপারহিরো হয়ে ওঠা কঠিন হতে থাকবে।
দেবজ্যোতি একে পলিকালচার বলেছেন। ইন্টারেস্টিং। অনলাইনে যে-যার সাবজেক্ট বেছে নিয়ে নিজেকে আলাদা করে নিচ্ছে। একটা আন্ডারগ্রাউন্ড কালচার এভাবে জন্ম নিতে চলেছে সমাজে। এটা আবার অতীতে জন্ম নেওয়া আন্ডারগ্রাউন্ড কালচারের মতো নয়। জনপ্রিয়তার সংস্কৃতিকে অনেক ক্ষেত্রে সস্তা জ্ঞান করে বিকল্প সংস্কৃতি যাপনের তাড়না থেকে ওটা তখন জন্ম নিয়েছিল। আজকের আন্ডারগ্রাউন্ড কালচার মানে জনপ্রিয় কিছুর অসংখ্য খণ্ড বা সেগমেন্টে ভাগ হতে থাকা। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স ও ইউটিউবে বিচিত্র বিষয় নিয়ে যে-কারণে অসংখ্য আন্ডারগ্রাউন্ড সেলেব দেখতে পাওয়া যায়। এর একটায় যে-ঢুকে বসে আছে, অন্যগুলোয় সংযুক্ত হওয়ার আগ্রহ সে বোধ করে না।
এরকম অগণিত মাইক্রো সেগমেন্টে ভাগ হওয়া কি ইতিবাচক কিছু ঘটাতে যাচ্ছে সামনে? জনপ্রিয়তার নতুন সংজ্ঞা কোনো কীর্তিমানের কাজকে কি আরো গভীরতা দিতে যাচ্ছে ভবিষ্যতে? চর্চা ও উদ্যাপনের ধারা গোত্র সংস্কৃতির আদল নিলে তা কি সুখকর? মানবসমাজের সামগ্রিক উৎকর্ষ কি আগের মতো সৃষ্টিশীল থাকছে সেখানে? মাসকালচার, পপকালচার নামে যে-অতিকায় বৃক্ষের নিচে মানুষ সামাজিক থেকেছে এতদিন,—এখন তা উবে যাওয়ার পরিণাম কেমন দাঁড়াবে? মানুষ কি গোত্র বুঝে পরস্পরকে সংযোগ করবে? নাকি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো নিজেকে নিয়ে পড়ে থাকবে একা? কেমন হতে যাচ্ছে মানুষের ভবিষ্যৎ সামাজিক জীবন? ফ্রানজ কাফকা যে-রূপান্তর ও বিবিক্তিকে তুলে ধরেছিলেন, আসন্ন রূপান্তর কি সেরকম কিছু? ঠিক কেমন হতে যাচ্ছে তার চেহারা?
প্রশ্ন থাকছে,—আগামীতে মাস পিপল বলতে আমরা কাকে বুঝব? পপ কালচার বলতে কী বুঝে নেবো? আমাদের জানশোনার পরিধি, তথ্যের পরিধি, জ্ঞানের পরিধি, সৃষ্টিশীলতার পরিধি, এবং আবেগ, ভাবাবেগ, সংবেদন, পছন্দ-অপছন্দ-ঘৃণা মিলে গড়ে ওঠা মিথ সৃজনের ইম্পালসকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন বিজ্ঞজন? আমরাই-বা কোন চোখে দেখবে একে?
একটা কমিউনিটিতে ভবিষ্যতের ডলি পার্টনের গান নিয়ে চর্চা করছে তার অনুসারীরা। তুলনা চলছে তার সঙ্গে অন্য কোনো শিল্পীর। আরেকটায়, নতুন যুগের পেলে-মেসি-মারাদোনা নিয়ে ফুটবল ভক্তরা ফাটিয়ে কথা বলে যাচ্ছে। দুটোই চলছে পাশাপাশি, কিন্তু একে অন্যের ব্যাপারে বেমালুম অজ্ঞ ও উদাসিন থেকে! মিথ সৃষ্টি হচ্ছে;—খণ্ডিত মিথ। প্রশ্ন জাগছে মনে,—খণ্ডিত তথ্য, খণ্ডিত জ্ঞান, খণ্ড-খণ্ড অভিজ্ঞতা, সেইসঙ্গে খণ্ডিত আবেগ দিয়ে কি আমরা দেখব নতুন দুনিয়া?
. . .
. . .
… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …
‘জোলিন’, কেড়ে নিয়ো না : স্মরণে ডলি পার্টন
‘ইনফোক্রেসি’র যুগে ‘সত্য’ : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
প্রযুক্তিক স্বচ্ছতায় আমাদের ভবিতব্য
মানব স্বভাবী চন্দ্রগ্রস্ত গায়ক
. . .

অবদায়ক : আহমদ মিনহাজ : থার্ড লেন স্পেস.কম
আহমদ মিনহাজ-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন


