ক বি তা সি রি জ
কবিতা ‘অন্তর্গত ভাষা’-২
ফজলুররহমান বাবুল

১১.
কবিতা কোনও তীর নয়—
তবু তার গভীরে
ডুবে আছে অসংখ্য অদেখা উপকূল।
কবিতা—
ভাষার সমুদ্রতলে
ডুবে যাওয়া কোনও নক্ষত্রের আলো…
সে জানে—
প্রথম যে নদীটি
নিজের নাম ভুলে
সমুদ্রের কাছে এসেছিল,
তার জলে কতখানি দ্বিধা ছিল।
কখনও কবিতা
জোয়ারের নিশ্বাস—
চাঁদের অদৃশ্য ইশারায়
উঠে আসে
মানুষের পুরাতন আকাঙ্ক্ষা।
কখনও
ভাটার নীরবতা;
যেখানে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে
লুকানো পাথর,
ভুলে যাওয়া পদচিহ্ন,
ডুবে যাওয়া দিনের কঙ্কাল।
আমরা ভাবি,
সমুদ্র কেবলই জল…
কবিতা দেখে—
তার ঢেউয়ের নিচে
ঘুমিয়ে আছে হারানো নৌযাত্রা,
পথহারা নাবিক
আর
অর্ধ-লেখা জীবন।
কখনও সে
শঙ্খের ভিতরে লুকিয়ে রাখে
একবিন্দু অনন্তের শব্দ।
কখনও
ঝড়ের কপালে
এঁকে দেয় কালো বিস্ময়চিহ্ন।
. . .
১২.
কবিতা কোনও বৃক্ষ নয়—
তবু তার অদৃশ্য শিকড়ের চারপাশে
জমে থাকে অসংখ্য ঋতুর গোপন কথা;
ঝরে যাওয়া পাতার ইতিহাস,
বৃষ্টির প্রথম স্পর্শে জেগে ওঠা স্মৃতি,
আর বহুকাল আগে হারিয়ে যাওয়া
যাযাবর পাখিদের গল্প।
সে জানে—
একটি বীজ
কীভাবে অন্ধকার মাটির ভিতর
নিঃসঙ্গতা ভেঙে
আলোর দিকে যাত্রা শুরু করে।
কখনও কবিতা
পাতার ওপর ঘুমিয়ে থাকা
সকালের শিশির,
কখনও
ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা
একাকী অশ্বত্থ—
যার ডালে ডালে
বাজে প্রতিরোধের শব্দ।
আমরা ভাবি,
বৃক্ষ শুধু দাঁড়িয়ে থাকে…
কবিতা দেখে—
সে মাটির গভীরে
নদীর সঙ্গে কথা বলে,
বাতাসের সঙ্গে বিনিময় করে
দূর-আকাশের সংবাদ।
কখনও সে
ফুল হয়ে ফোটে,
কখনও-বা ফল হয়ে ঝরে পড়ে,
কখনও শুকনো পাতার বেশে
ফিরে যায় মাটির কাছে।
কবিতা জানে—
বৃক্ষ কেবলই কোনও উদ্ভিদ নয়।
সে এক ঊর্ধ্বমুখী স্মৃতি;
যেখানে শিকড় খোঁজে অতীত,
আর
ডালপালা স্পর্শ করতে চায় অজানা ভবিষ্যৎ।
. . .
১৩.
কবিতা কোনও ডানা নয়—
তবু তার ভিতর দিয়ে
এক নক্ষত্রলোক থেকে আরও-এক নক্ষত্রলোকে
উড়ে যায় অচেনা আকাশ,
অসমাপ্ত স্বপ্ন
কিংবা ভাষাহীন বিস্ময়…
কবিতা
মহাশূন্যের অদৃশ্য পরিযাণপথে নক্ষত্রের ধুলো,
পাখির পালক,
কিংবা
মানুষের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষায় নির্মিত
এক অন্তহীন আকাশলিপি।
সে জানে—
একটি ডিম
কীভাবে নীরবতার ভিতরে
নিজেকে ভেঙে
প্রথম শব্দহীন চিৎকারে জন্ম নেয়।
কখনও কবিতা
ভোরের আলোয় ভেসে চলা
একটি ময়ূরের ডাক,
কখনও-বা
দূর-পাহাড়ের গায়ে হারিয়ে যাওয়া
একটি সারসের হাহাকার।
আমরা ভাবি,
পাখিরা উড়ে চলে…
কবিতা দেখে—
তার উড়ানের ভিতর
লুকিয়ে আছে পথের খোঁজে পথচলা
আর
দিগন্তের সঙ্গে অসমাপ্ত সংলাপ।
কখনও সে
ডানার ভাঁজে লুকিয়ে আনে হারানো মৌসুম,
কখনও
শূন্য আকাশে আঁকে নীরবতার রেখাচিত্র।
কবিতা জানে—
একটি পাখি কেবল কোনও প্রাণী নয়।
সে এক চলমান প্রতীক;
যেখানে আকাশ নিজেকে খুঁজে ফেরে
নিজেরই ডানার ভিতরে।
. . .
১৪.
কবিতা কোনও সুর নয়—
তবু তার অক্ষরের ভিতরে নীরবে বেজে ওঠে
অসংখ্য ভাঙা বীণার তার;
যেন নারদের দীর্ঘ যাত্রাপথে ছিঁড়ে যাওয়া রাগিণীগুলো
শব্দের আশ্রমে ফিরে এসে
আবার খুঁজে পায় তাদের প্রাচীন স্বরলিপি।
কবিতা জানে—
একটি কণ্ঠ কীভাবে নীরবতা ভেঙে
প্রথমবার নিজের দুঃখকে সুরে রূপ দেয়।
কখনও কবিতা
রাত্রির ঘরে জ্বলে থাকা একটি প্রাচীন বেতারকেন্দ্র;
যেখানে হারানো সময় ফিরে আসে বিকৃত সুরে।
কখনও
মাঠের পথে ভেসে যাওয়া
বাউলের একাকী কণ্ঠ,
যেখানে পথ নিজেই গান হয়ে যায়।
আমরা ভাবি,
গান শুধু শোনা যায়…
কবিতা দেখে—
শ্রোতার বুকের ভিতরে
অদৃশ্য এক সুর নিজেকে লিখে চলেছে।
কখনও সে
প্রেমের নাম ধরে ডাকে,
কখনও
বিদায়ের শরীরে মাখিয়ে দেয় মৃদু-করুণ রাগ।
. . .
১৫.
কবিতা কোনও শব্দ নয়—
তবু তার ভিতরে সব শব্দই একদিন থেমে যায়…
শব্দের ছায়ায় কোনও নিস্তব্ধ প্রহরে
নীরবতার ধূসর-ধূসর নিশ্বাস
শূন্য কাগজের ওপর
অলিখিত বিষণ্নতার চাদর বিছিয়ে রাখে
আর
একটি কবিতা জন্ম নেয়
কোনও কোনও বেদনার দীর্ঘ-দীর্ঘ ছায়া থেকে।
তার শরীরজুড়ে
হারিয়ে যাওয়া মুখের স্মৃতি,
অপূর্ণ ভালোবাসার ক্ষীণ-ক্ষীণ দাগ,
আর সময়ের নোনা অশ্রুর ইতিহাস।
কোনও অভিযোগ নেই তার,
কোনও বিচারও চায় না;
শুধু গভীর অন্ধকারের ভিতরে
একবিন্দু ম্লান-মৃদু আলো হয়ে জেগে থাকে।
কারণ কবিতা জানে—
সব বেদনা উচ্চারণ করা যায় না,
সব কান্না চোখে দেখা যায় না।
কিছু দুঃখ শব্দ হয়ে ওঠে
আর
কিছু শব্দ ধীরে ধীরে কবিতা হয়ে যায়।
. . .

১৬.
কবিতা কোনও ধর্মগ্রন্থ নয়—
তবু তার পাতায় পাতায়
ঘুরে বেড়ায় অগণিত প্রশ্নের ছায়া।
সে জানে—
মানুষ প্রথম কবে
আকাশের দিকে তাকিয়ে
নিজের নিঃসঙ্গতার জন্য
একটি পরিচয় খুঁজেছিল।
কখনও কবিতা
প্রার্থনারত দুটি হাতের মাঝে
জেগে থাকা উষ্ণতা,
কখনও
কোনও পরিত্যক্ত প্রার্থনালয়ের সিঁড়িতে
বসে থাকা এক টুকরো সন্ধ্যা।
ভাবতে পার,
ঈশ্বরকে খুঁজছে কবিতা…
কবিতা দেখে—
মানুষই যুগে যুগে
নিজের গভীরতম বিস্ময়কে
খুঁজে ফিরছে।
কখনও সে
আজানের ধ্বনির সঙ্গে ভেসে যায়,
কখনও
ঘণ্টাধ্বনির প্রতিধ্বনিতে,
কখনও
নির্জন অরণ্যে
কোনও ঋষির নীরব ধ্যানে।
তবু সে
কোনও-এক নামেই থামে না|
কবিতা জানে—
ঈশ্বর কোনও উত্তর নয়।
তিনি হয়তো সেই প্রশ্ন—
যা মানুষের হৃদয়ে জ্বলে থাকে
নক্ষত্রের মতো—
দূরে,
অস্পর্শ,
তবু পথ দেখায়।
. . .
১৭.
কবিতা কোনও ভূচিত্র নয়—
তবু তার শরীরজুড়ে বয়ে চলে
অগণিত পথের নিশ্বাস,
অগণিত মোড়ের দ্বিধা,
অগণিত যাত্রার ধুলোমাখা প্রতিধ্বনি।
সে জানে—
একটি শহর কীভাবে নিজের পরিচয় ভুলে যায়,
কীভাবে অট্টালিকার কাচে জমা হতে থাকে
অচেনা মুখের ক্ষণস্থায়ী প্রতিবিম্ব
কীভাবে ভিড়ের পর ভিড় অতিক্রম করে
মানুষ একা হয়ে পড়ে নিজেরই ছায়ার কাছে।
কখনও কবিতা
নিয়ন আলোয় কুয়াশা-ভেজা রাত—
যেখানে মানুষের মুখ
নিজের ছায়াকেও চিনতে পারে না,
কখনও
ভোরের বাসস্টপে দাঁড়িয়ে থাকা
একটি ক্লান্ত অপেক্ষা।
আমরা ভাবি,
শহর মানে গন্তব্য…
কবিতা দেখে—
শহর আসলে
নিরন্তর হারিয়ে যাওয়ার
এক দীর্ঘ অনুশীলন।
কখনও সে
উঁচু ইমারতের জানালায়
আটকে থাকা নিশ্বাস,
কখনও
ফুটপাতের কোণে জমে থাকা
অলিখিত জীবনী।
কবিতা জানে—
শহর ইট-পাথরের স্থিরচিত্র নয়।
সে এক চলমান জনপদ;
যেখানে প্রতিটি মানুষ
নিজের ভিতরে
এক-একটি অদৃশ্য-শহর বহন করে।
. . .
১৮.
কবিতা কি কোনও প্রেমপত্র—
যার ভাঁজে ভাঁজে শুকিয়ে যায় স্পর্শের গন্ধ?
কবিরা নিশ্চয় জানে—
প্রথম কবিতা লেখার আগে
বিস্ময়ের ভিতরে কীভাবে কেঁপে ওঠে হাওয়া
আর কীভাবে একটি অচেনা শব্দ
হঠাৎ আত্মীয় হয়ে দাঁড়ায় ভাষার দরজায়।
কখনও কবিতা
অনুভবের দেউড়িতে জ্বলে-ওঠা প্রদীপ,
কখনও সে এক নিভে যাওয়া অঙ্গার—
যার উষ্ণতা টের পাওয়া যায় বহুদিন পর।
কখনও আমরা ভাবি,
প্রেমের কথা লিখছে কবিতা…
কবিতা দেখে—
একটি হৃদয় আরেকটি হৃদয়ের দিকে যেতে যেতে
নিজেকেই আবিষ্কার করছে।
কবিতা জানে—
প্রেম কোনও প্রাপ্তির দেউড়ি নয়।
বরং সেই শিখা—
যেখানে পুড়তে পুড়তে
কবি নিজেই আলো হতে শেখে।
. . .
১৯.
কবিতা কোনও কাচ নয়—
তবু তার অক্ষরঘেরা গোপন উপত্যকায়,
সময়-স্পর্শিত স্মৃতিরেখা হয়ে
বেদনা-আলোকিত চোখের ভাষায়
অবিরাম ফিরে আসে
অজস্র মুখের অনুবাদ।
সে জানে—
মানুষ যখন প্রথম নিজের দিকে তাকায়,
তখন সে আসলে
কাকে খুঁজে পায়—
নিজেকে
নাকি নিজের ভিতরের অচেনা কাউকে।
কখনও কবিতা
আলোর সামনে ধরা পড়া এক ভাঙা প্রতিচ্ছবি।
কখনও
পুরনো আয়নায় জমে থাকা ধুলো-ঢাকা সময়।
আমরা ভাবি,
আয়না সতত সত্য বলে…
কবিতা দেখে—
আয়না শুধু সত্য নয়,
সত্যের সম্ভাবনাও দেখায়।
কখনও সে
মুখকে বদলে দেয় না,
কেবল মুখের ভিতর
আরেকটি মুখের দরজা খুলে দেয়।
কখনও
নিজের দিকে তাকিয়ে
নিজেকেই চেনা যায়—
তবু সেই অচেনা-ই
ধীরে ধীরে পরিচয় হয়ে ওঠে।
কবিতা জানে—
আয়না কোনও বস্তু নয়।
সে এমন নীরব সাক্ষী—
যেখানে মানুষ
নিজেরই বহু-জন্মের ছায়া
একসঙ্গে দেখে ফেলে।
. . .
২০.
কবিতা কোনও বন্দর নয়—
যেখানে এসে সব জলযানের যাত্রা শেষ হয়;
বরং সে এমন-এক জোয়ারভাটার নদী—
যার গোপন স্রোতের সঙ্গে
অগণিত ক্লান্তি, প্রেম, বিদ্রোহ ও জয়-পরাজয়
অবিরাম ভেসে চলে
সময়ের এক তীর থেকে আরও-এক তীরে।
কবিতা জানে—
একটি থেমে থাকা প্রশ্ন থেকে
একটি পথ কীভাবে জন্ম নেয়,
আর ধীরে ধীরে
মানুষের পায়ে-পায়ে
নিজেকে দীর্ঘ করে তোলে।
কখনও কবিতা
ধুলো-ঢাকা গ্রামছাড়া ওই রাঙামাটির পথ—
যার এক-একটি বাঁক
এক-একটি পুরনো গল্পের মতো
হঠাৎ থেমে যায়।
কখনও
শহরের ভিড় ঠেলে যাওয়া একাকী এক ফুটপাত।
আমরা ভাবি,
পথ আমাদের টেনে নিয়ে যায়…
কবিতা দেখে—
আমরাই আসলে
পথের মধ্যে নিজেদের বদলে ফেলি।
কখনও সে
হাঁটতে হাঁটতে
নিজেকেই ভুলে যায়,
কখনও
ফিরে এসে দেখে
তারই পায়ের নিচে
অন্য-কোনও জীবন
শুরু হয়েছে আবার।
কবিতা জানে—
পথ কোনও রেখা নয়।
সে এক সম্ভাবনা;
যেখানে এক-একটি পদক্ষেপ
নতুন অর্থের জন্ম দেয়।
. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ আগের পর্ব পাঠের জন্য দেখুন …
কবিতা ‘অন্তর্গত ভাষা’-১ : ফজলুররহমান বাবুল
. . .
লেখক পরিচয় : ফজলুররহমান বাবুল : উপরের ছবি অথবা এখানে চাপুন
. . .

অবদায়ক ফজলুররহমান বাবুল : থার্ড লেন স্পেস.কম
ফজলুররহমান বাবুল-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন



