
অসময়ের দিনলিপি-১
অসময়ে পাখি হয়ে এলে তুমি,
যদিও ভীষণ তাড়া এখন।
চারদিকে কেবলই
সান্ধ্য-বাতি জ্বালাবার প্রস্তুতি।
কিচিরমিচির শব্দের সঙ্গে
খুব বেশি অভ্যস্ত নই আমি।
নিরালায় প্রহর গুনি—
এই অসময়েই তুমি এলে!
তুমি কি জানতে,
সময় আর অসময়ের
একটা তফাত থাকে জীবনে?
. . .
অসময়ের দিনলিপি-২
কাকগুলোও উড়ে যায় অবশেষে,
দিন শেষে ফিরে আসে না আর।
ডাকতে ডাকতে মিশে যায় শূন্যে।
কার ডাকে কে-ই-বা সাড়া দিতে আসে?
কারই-বা এত দায় ঠেকেছে মানবজীবনে?
কা-কা শব্দে জেগে জেগে
কে-ই বা কেড়ে নেয় গভীর ঘুমের আরাম?
আমিও একদিন কাক হব—
ডাকতে ডাকতে মিশে যাব শূন্য আকাশে।
. . .
অসময়ের দিনলিপি-৩
তোমার দিকেই ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছি।
মঞ্জিল খুব দূরে নয় জেনেও প্রতিদিন
ভীষণ ক্লান্তিতে ডুবে থাকি।
পথিকেরও পথের শেষ হয় একদিন।
একদিন সে-ও খুঁজে পায় আপন ঠিকানা।
তখন হয়তো ডুবে যায় চাঁদ,
ডুবে যায় মিটিমিটি জ্বলে থাকা রাতের তারারাও।
মঞ্জিল আর কত দূর, বলো?
আমি তো আকণ্ঠ ডুবে আছি ক্লান্তির আঁধারে।
. . .
অসময়ের দিনলিপি-৪
মাঝে মাঝে ভাবি
মাঝে মাঝে গভীর নিদ্রায় মগ্ন হই
মাঝে মাঝে তোমার সঙ্গে হেঁটে যাই আধেক জীবন
সূর্যের আলোগুলো নিভে গেলে
শেষ হয় বিকেলের খেলা
তবু আমি খেলে যাই।
অকারণে যদিও কেটে গেছে সোনালি দুপুর
রাতের প্রহরগুলো ঢেকে যদি যায় যাক তবে
অমাবস্যার আঁধারে
যদি ফুরিয়ে যায় জীবনের লেনদেন,
ভেবে নেবো এ-ই অমোঘরীতি
মাঝে মাঝে হারানোর ভয় হয়—
মাঝে মাঝে ডুবে থাকি স্মৃতির আলোয়।
. . .
অসময়ের দিনলিপি-৫
সময় ফুরিয়ে গেলে হা-হুতাশ বাড়ে
নিকষ আঁধার নামে
আয়ুরেখা মুছে যায়,
মুছে যায় স্বপ্ন ও স্বাদ
কোথায় গিয়েছে সব জীবনের লেনাদেনা
আমি শুধু বেছে বেছে কিনেছি আঁধার।
সূর্যের লালিমা নিভেছে কখন?
নিজের ভিতরে এখনও আন্ধা আছি।
কিছু স্মৃতি ফিরে আসে বার বার—
কিছু স্মৃতি আয়ু হয়ে ঝরে যায় অকারণ।
. . .

অসময়ের দিনলিপি-৬
যতটুকু হেঁটে গেছি,
ততটুকু পথ হেঁটে পাব না তোমায়
তবু বেহুদাই ভাবি, এইসব হেঁটে-যাওয়ার কথা।
মাঝপথে থেমে গেলে অঙ্কের ক্ষতি হয়।
মাঝপথে জমে থাকে অকারণ কোলাহল।
তারপর হেঁটে গেলে ক্ষতিটাই বাড়ে শুধু,
তারপর হেঁটে গেলে থাকে শুধু হা-হুতাশ।
কতটুকু পথ হেঁটে পাব যে তোমায়?
আর কত দূরে মিলনবাসর?
. . .
অসময়ের দিনলিপি-৭
অযথাই দাবি নিয়ে দুয়ারে দাঁড়িয়েছি।
অযথাই তবে এইসব আকুতি,
অযথাই মিনতি—
তোমাকে পাওয়ার বাসনা।
বয়সের ধারাপাত জপে জপে
দাবিগুলো ফিকে হয়ে যায়।
চাহিদার নামতা যত দীর্ঘ হয়,
কণ্ঠের জোর ততই ক্ষয়ে যায়।
দাবির খাতায় জমে ধুলোর পাহাড়।
অযথাই তবে কাটিয়েছি সময়?
অযথাই যাবে তবে আমার রোদন?
. . .
অসময়ের দিনলিপি-৮
তাড়ানোর দায়টা আপাতত আমারই।
তবু শূন্য ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়েছে যারা,
আপাতত তারাই না-হয় আমার স্বজন।
সূর্যটা হেলান দিয়ে ঘুমায় আপাতত।
আপাতত ক্ষুধায় কাতর শিশুরাও ঘুমায়।
জন্মে জন্মান্তরে কাতর মানুষজন
আপাতত পালাচ্ছে ভিটেমাটি ছেড়ে।
ক্ষুধা আর নিদ্রাহীনতার দায় থেকে
আপাতত মুক্তি নেই আমার।
এই বিরানভূমির দায় থেকেও আপাতত মুক্তি নেই।
. . .
অসময়ের দিনলিপি-৯
পাটাতনে রেখেছি আস্ত শরীর।
এবার না-হয় খুলে নাও হৃদয়ের আধেক;
বাকিটুকু সযতনে রেখে দিয়ো—
খুলে খাবে পরের জীবন।
যন্ত্রণায় যেটুকু কেটেছে সময়,
বাকিটুকু কাটুক তোমাকে পাওয়ার আশায়।
দেখে নিয়ো সযতনে,
আশার তরিতে যেন না লাগে ঢেউ।
পুনর্জন্মের আশা নেই;
তবু আমি ভাসিয়েছি আশার তরি।
এইটুকু পেলেই
মিটে যাবে না-পাওয়ার ক্ষুধা।
এইটুকু দিয়ো—
যতটুকু বাকি ছিল মায়াময় আশা।
. . .
অসময়ের দিনলিপি-১০
সাক্ষীরা চলে গেছে যে-যার পথে।
বাকি শুধু রয়ে গেছে মিলনের বাসনা।
তবু
তারে আর হলো না পাওয়া একান্ত নিরালায়।
দুদিকে ভাগ হয়ে চলে যায় পথের রেখা।
ভাগ হয় হাড়গোড়,
বাকি থাকে লেনা আর দেনা।
তবু আমি
অকারণে ধরে থাকি স্মৃতির দুয়ার—
পথ ভুলে যদি ফিরে আসো আপন আলয়ে।
অভিযোগ নেই,
তবু
না-পাওয়ার ব্যথায়
ভেঙে যায় বুকের পাঁজর।
. . .
লেখক পরিচয় : নাজমুল হক নাজু : উপরে ছবি অথবা এখানে চাপুন
. . .
… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …
বিরানভূমে অবিরাম জীবনের গান : সুমন বনিক
. . .

নাজমুল হক নাজু-র অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন



