
বর্ষার ভরা মৌসুমে পুবালি বাতাসে ইরভাঙা ঢেউ হাওরের দেহ ক্ষতবিক্ষত করে আছড়ে পড়ছে ভাটিগাঁয়ের ঘর-দুয়ারের মাটির ভিটায়। চাল্লিয়াবনের বাঁধে ইরের উড়াবাঁশের খুঁটি তাই ভেঙে গেছে। কচুরিপানা, বন কেওড়ালি, শাপলা-শালুক ও ঝাউলতার ছিঁড়াফাড়া দেহ জটলা বেঁধে যদিও উত্তাল ঢেউয়ের আঘাত কিছুটা থামিয়ে দিচ্ছে, তবু খসে পড়ছে ভিটের মাটি। ঢেউয়ে-ঢেউয়ে দানবের তাণ্ডব। হাওরের আকাশ, বাতাস, ভিটেমাটি সব ঝড়-তুফানের দখলে। থামছে না আফাল। জলহস্তি নামছে আকাশ থেকে হাওরের বুকে। বান-তুফানে আকাশ কম্পিত। টানা সাত দিন হলো পাখিরা উড়ে না। উঠোনে পড়ে না কুত্-কুত্ খেলার দাগ। গরুগুলো গোছালায় আসে না। গোয়ালেই খায়-ঘুমায়। বাদলের ঢল ঘরের চাল বেয়ে উঠোন ডুবিয়ে হাওরে মিলায়। ক্ষয়ে-ক্ষয়ে যায় ভিটেমাটির অস্তিত্ব অতল তলে।
পুরুষ মানুষগুলো ঘরের ভিতর অসহায়বৃত্ত হয়ে ঝড়ের নৃত্য দেখে। বধূর ভেজা শাড়ি শুকায় না। চুলো জ্বালে হিসেব করে। লাকড়িভেজা আগুনে রান্নাবান্নার কষ্টে তারা ক্লান্ত। তারওপর তেল, লবণও ফুরিয়েছে। হাটে যাওয়ার পথ ঝড়-তুফানে অবরুদ্ধ। গাঁয়ের ধনী-গরিব সবারই নিত্যপণ্যের টানাপোড়েন চলছে। ভরা বাদলে জুঙ্গুর পিঠে নূপুর ডুবিয়ে বধূ মাগে নুন। এ-বাড়ির তেল, ও-বাড়ির লবণ, কারো বাড়ির মরিচ, কারো বাড়ির হলুদ বিনিময় হয়েও আর দিন চলছে না। হাটে যাওয়া জরুরি। পাঁচ মাইল ঢেউ-তাণ্ডবের হাওর পেরিয়ে তবেই হাট। নৌকা ছাড়া কোন ব্যবস্থা নেই। ভাটিগাঁয়ের বীর পুরুষরাও ঝড়-তুফানে গৃহবন্দি। ভাতের থালায় নুন নেই, সন্ধ্যা বেলায় জ্বলে না প্রদীপ। তুলসীতলায় উলুধ্বনি নেই। ঝড়-তুফানের দেবতাও অঞ্জলি নিতে ভুলে গেছে।
দশদিন পর এক বিকেলে সামান্য নীলবরণ লাজুক আকাশ দেখা দিয়েছে। সুর্যের আলোটাও উঁকি দিয়ে ফিরে গেল। গাঁয়ের সকলে ভাঙা ‘ইরে’ অর্থাৎ ভিটেমাটির গায়ে বনদল গুঁজে দিতে ব্যস্ত। ছেলে-মেয়েদের ছুটোছুটি। উঠোনের গায়ে পায়ে পায়ে কাদা থই থই! হাওর, আকাশ-বাতাস সকলই শান্ত হয়েছে। রাত পোহালে গৃহকর্তারা হাটে যাবেন। খুঁথিতে রাখা সিকি-আধুলি হিসেব করে তেল-নুন ও গেরানের সাবান সহ বাজারের ‘জায়’ রাতেই সমঝিয়েছে বধূ। গাঁয়ের সবচেয়ে বড় পাতাম-নাও প্রস্তুত।
মেঘকাটা রোদে সুন্দর সকাল। টাকার খুঁথি, ছিক্কায় আটকানো কউরা তেল ও কেরাইচ তেলের শিশি, বাজারের কাইট্টা ও ব্যাগ, কাঁধে পিরাণ এবং হাতে-হাতে বৈঠা নিয়ে সকলেই নৌকায় উঠল। বাজারে যেতে হলে যে-কেউ বৈঠা ছাড়া নৌকায় ওঠার বিধান নেই। এ-সময় সকলেই বাইয়া ও নাইয়া। বৈঠার তালে-তালে নৌকা চলে জারি-সারি গাইয়া। আক্কেল আলী তাড়াহুড়ো করে নৌকায় উঠতে গিয়ে বৈঠা নিতে ভুলে গেছে। লগির পারা তুলে গলুইয়ে সালাম করে নৌকা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে হাটের পথে। পাতাম নৌকার বাতার পাশে গোড়ায় গোড়ায় বসে দু-সারি হয়ে সকলে বৈঠা বাইছে। হাওরের ছোট-ছোট ঢেউভাঙা কলকল রবে চলছে নৌকা।
বৈঠাহীন আক্কেল আলী মাঝগোড়ায় বসে অসহায়। কর্ম নেই। যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্র ছাড়া সেনাপতি। তাই মাঝেমাঝে এর-তার বৈঠা চাইছে, কিন্তু কেউ দিচ্ছে না। এখানে কর্মই ধর্ম। তাই কেউ বৈঠা ছাড়তে রাজি নয়। সবাই বলছে ‘যে-আক্কলে বৈইডা আনছচ্ না, হেই আক্কলে বৈয়া থাক।’
এ-কেমন বিচার! এ-কেমন শাস্তি! আক্কেল আলী নিজেকে খুব অপরাধী মনে করছে। মাঝেমাঝে তাই নৌকার পানি সেচ দিচ্ছে। তাতেও শান্তি পাচ্ছে না, কারণ নৌকায় তেমন পানিও উঠছে না। হাওরের ছোট ছোট ঢেউয়ে বৈঠা চালানোর জোর যতটা বাড়ছে, আক্কেল আলীর অপরাধবোধ বাড়ছে তারচেয়ে দ্বিগুণ হারে। দলচ্যুত হওয়ার বেদনা বা কর্মহীনতার শাস্তি কত-যে ভয়ঙ্কর তা মর্মে-মর্মে উপলব্ধি করছে আক্কেল আলী। তাই সে অপেক্ষায় আছে যদি কেউ ক্লান্ত হয়, তবে তার বৈঠাই ধরবে। কিন্তু না এখানেও যেন গুরুসদয় দত্তের সেই সংকল্প ‘বাংলা মা’র দুর্নিবার আমরা তরুণ দল; শ্রান্তিহীন ক্লান্তিহীন সংকটে অটল।’
অবশেষে পাতাম নৌকার গলুই ভিড়ল হাটের চকে। হাওরের দ্বীপসদৃশ হাটের চারপাশ ঘিরে নৌকার মেলা। পেটে-পেটে জটলা বাঁধা নৌকা মাড়িয়ে সবাই ডাঙায় উঠল, কিন্তু আক্কেল আলী উঠল না। আক্কেল আলীর টাকার কুতি কিংবা তেলের শিশি নিয়ে ভাবনা নেই। চোখ পড়ল তার পাশের নৌকায় রাখা অন্যের বৈঠার প্রতি। সুযোগ পেলেই বৈঠাটা নিয়ে আসার খেয়াল তার। তাই সে লোকচক্ষুর আড়াল খুঁজছে। নৌকায় নৌকায় মানুয়ের আনাগোনা। এতটুকু সুযোগ নেই বৈঠা চুরির। এদিকে কেনাকাটার সময় বয়ে যাচ্ছে। হয়ত-বা এক্ষুনি সওদা করে নৌকায় ফিরবে অনেকেই। আক্কেল আলীর তর সইছে না। তাই কাকের মত মাথা লুকিয়ে বৈঠাটা চুরি করে সামলানোর আগেই ধরা পড়ে গেল মালিকের হাতে। হইচই পরে গেল। যাইহোক, চালাকি করে উত্তম-মধ্যমের হাত থেকে রেহাই পেলেও বিষয়টা জানাজানি হয়ে গেল অনেকের মাঝে। এ-নিয়ে আক্কেল আলীর ভাবনা নেই। ভাবনা শুধু একটাই বাড়ি ফেরার পথে :
নৌকায় যখন সকলেই হবে বাইয়া,
আমি তখন কেমনে থাকব বইয়া।

তাই বৈঠা তার চাই-ই চাই। অবশেষে বাজারের ‘জায়’ এর সকল সদায়পাতি ভুলে খুঁথির সিকি-আধুলির বিনিময়ে নতুন বৈঠা কিনল হাট থেকে। বৈঠা হাতে নিয়ে জুইত দেখতে গিয়ে ডাঙায় দাঁড়িয়ে হাওয়ায় মারল টান। দলে ফেরার আহবান। আহ! বাড়ি ফেরার পথ, বুক ভরা হিম্মত। সওদাপাতি নিয়ে সকলেই নৌকায় ফিরল, আর আক্কেল আলী ফিরল বৈঠা হাতে। সময়ের তাড়াহুড়ো আর নৌকা ভর্তি সওদাপাতির ভিড়ে আক্কেল আলীর সওদার খবর কেউ জানল না। আক্কেল আলীর হাতে নতুন বৈঠা দেখে সকলে খুশি। নৌকা চলল বাড়ির উদ্দেশে। আক্কেল আলী সামনের গোড়ায় বসে প্রস্তুত বৈঠার টান সুদে-আসলে ফিরিয়ে দিতে।
নৌকা চলল ঢেউয়ের উজান,
আক্কেল আলী বৈঠা দিল টান।
চান-সুরুজ সাক্ষী রইল
টানে টানে দিল প্রতিদান।
সূর্য ডোবার আগেই নৌকা গাঁয়ে ভিড়ল। সকলে সওদাপাতি নিয়ে ঘরে ফিরছে। ছেলেমেয়েরা ছোটাছুটি করে আসছে ‘লেবেনচুস’-এর আশায়। বধূরা সওদাপাতির প্রতীক্ষায় ঘোমটা টেনে হাসিমুখে তাকিয়ে আছে দেওরির ফাঁক দিয়ে। আক্কেল আলী বৈঠা নিয়ে ঘরে ফিরছে। উঠোনে পা রাখতেই বধূ বলল :
—বাজার (সওদা) কই?
—বাজার গাঙ্গে দিয়া ভাসাইয়া দিছি। বৈডা দিছলে; বাজার আইত্য? জানছ না বাজার-অ গেলে বৈডা লাগে, না-অইলে শাস্তি অয়? নে, বাজার থাইকা বৈডা আনছি, বৈডা খা।
এই বলে আক্কেল আলী তার বধূর হাতে বৈঠা ধরিয়ে দিল। বধূ বৈঠা নিয়ে নীরবে ঘরে ফিরল। মা-বাবার এ-আচরণ দেখে একমাত্র ছেলে চকলেট বিস্কুট চাওয়ার সাহস পেল না।
ঘরে ফিরে আক্কেল আলীর ভাবনা ভিন্ন। শাস্তিও ভিন্ন। সওদাপাতি ছাড়া ঘরে ফেরার অপরাধ এখন তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। নুন-তেলের সংসার তো আর আদর্শে চলে না। আক্কেল আলীর ব্যথার চোখে জল নেই, হৃদয়ে রক্তক্ষরণ। মুখের ভাষায় নয়, মনের ভাষায় নিজের অপরাধের বিশ্লেষণপদ্য লিখছে সে।
এদিকে বধূ ভাবছে, ‘লোকটি ঐ হাত-সয়ালে দুইডা খালি পান্তা মুখে দিয়া বাজারে গেছিল, এখন পর্যন্ত পেডে দানাপানি নাই।’ তাই এক ঝিনাই নুন, এক আঙুল তেল আনতে বধূটি পাশের বাড়ি গেল। বিনিময়ে দায় নিয়ে এলো খাতিরের ‘চিড়াকুডা’। আক্কেল আলী জানে এই সপ্তাহে সংসার চালাতে ‘বউটার এক আঙুল তেলের লাগি সাত আঙুল রক্ত যাইব।’ মানুষ যখন অসহায় হয়, তখন তার দয়ালের কাছে ফরিয়াদ জানায়। এটাই তাদের শেষ ভরসা। আক্কেল আলীও নিরলে মাথা গুঁজে গুনগুন করে মনের বীণায় সুর তুলে গাইছে ফরিয়াদি গান :
আমি বৈঠা ছাড়া মাঝি দয়াল
নাও ধইরাছি ঈশান কোণে,
আমি ঘাটে ঘাটে অপরাধী ভুলের-ই কারণে।
সংসার কাজে হাটে গিয়া,
দায় ঠেকিলাম সওদা লইয়া,
সমাজরে বুঝাইতে গিয়া,
ফিরলাম ঘরে শূন্য হইয়া,
বউ পোলাপান হইল বেজার স্বার্থের-ই কারণে।।
দয়াল তুমি হাল ধইর না’র এই মিনতি চরণে,
হাতের বৈঠা ঘাটে থইয়া, পাড়ি দেব কেমনে।।
গানে আত্মমগ্ন আক্কেল আলীর পিঠে বধূর মমতার হাতটা সে টের পায়নি। বধূ ধাক্কা দিয়ে বলল :

—কই? উডঅ। উট্টিআ দুইডা খাও।
—কিতা খাইয়াম?
—আনছি;
—করজঅ করছও।
—অ।
—কীয়ের বদলা? মেন্নত? চিড়াকুডা, না ধানকুডা?
—চিড়াকুডা।
—অইতনা, তেল নুন ফিরত দেও।
—খাইবা কিতা?
—না খাইয়া থাকমু, তেও এক ঝিনাই নুনের লাইগ্গা পরের বাড়িত রাইতভরা চিড়াকুটতে দিতাম না। দরকার অইলে কাইল হাতারহিট্টিআ বাজারঅ যাইআম।
আক্কেল আলী ভুল করে ভেঙে ছিল সমাজের নিয়ম, কিন্তু তার খেসারত দিয়েছে অনেককিছুর বিনিময়ে। ভুল করা অপরাধ নয়, অপরাধ হলো ভুল বুঝতে না পারা। যাইহোক এদিকে বাজারে আক্কেল আলীর বৈঠা চুরির বিষয়টি পাড়া-প্রতিবেশী কিংবা সমাজে জানাজানি হয়ে গেল। জনাজনি হলো নতুন বৈঠা কেনার কথাও। তাই বৈঠা চুরির বিষয়টিকে সমাজের রীতি-নীতির প্রতি দায় বা শ্রদ্ধার অনন্য নিদর্শন বলে সমাজ স্বীকৃতি দিল। গাঁয়ের সবাই তাকে সওদাপাতি দিয়ে সাহায্য করল।
আর, আক্কেল আলী বুঝিয়ে দিল সমাজের অনুশাসন আমরা কতটুকু কীভাবে মেনে চলবো, এবং তার হিসেব নিজে থেকে মিলিয়ে না নিলে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তার ফল মেলানো যায় না। একসময় হাওরাঞ্চলের মানুষগুলো এভাবে বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সমাজে বাস করত।
আজ কেমন আছে সেই হাওরাঞ্চল? কেমন আছে তার সমাজব্যবস্থা? এর উত্তর বোধকরি দয়ালেরও জানা নেই। এ-অঞ্চল যেন দয়ালের অন্দেখা। মানুষের জন্য তাই মানুষকে এগিয়ে আসতে হয়;—হবে। কারণ ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তার উপরে নাই।’
. . .
লেখক পরিচয় : সজল কান্তি সরকার : ওপরের ছবি অথবা এই লিংক চাপুন
. . .

অবদায়ক : সজল কান্তি সরকার : থার্ড লেন স্পেস.কম
সজল কান্তি সরকার-এর অন্যান্য ও প্রাসঙ্গিক রচনা পাঠের জন্য এখানে চাপুন



