নেটালাপ - পোস্ট শোকেস

নেটালাপ : ফুটবল মেরুকরণে ‘আফ্রিকা’ ও ‘লাতিন’

Reading time 8 minute
5
(5)
@thirdlanespace.com

. . .

হোয়াট অ্যা ম্যাচ! দুইহাজার ছাব্বিশ বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে টাফ ব্যাটলের সাক্ষী হলেন ফুটবল দর্শক। কেপ ভার্দে (কাবো ভার্দে) যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে গ্রুপ পর্বে দ্বিতীয় হয়ে ৩২-এ উঠেছিল। ওটা-যে অঘটন ছিলা না, তা নকআউট পর্বের উত্তেজনা ও রোমাঞ্চঠাসা ম্যাচ শেষে প্রমাণিত। যোগ্যতার প্রমাণ রেখে ৩২ থেকে বিদায় নিলো অফ্রিকার দলটি।

১২০ মিনিটের স্নায়ুধ্বংসী ম্যাচে আর্জেন্টিনা কি জিতেছে? ম্যাচের ফলাফল তাই বলবে। কিন্তু না;—ম্যাচে না আর্জেন্টিনা জিতেছে, না হেরেছে কেপ ভার্দের লড়াকু সেনারা। স্মরণীয় এই ম্যাচে জয়ী হয়েছে ফুটবল। জিতেছেন হুয়ান ভিলারোরগোলক-ঈশ্বর’।

কেপ ভার্দের সঙ্গে আর্জেন্টিনার ব্যাটল কেন সহজ হবে না তার আগাম আভাস ফুটবল বিশ্লেষকরা দিয়েছিলেন আগেভাগে। এবারের বিশ্বকাপে কেপ ভার্দে বা ডি আর কঙ্গোর মতো দলগুলোর মূল শক্তি থেকেছে অতি রক্ষণাত্মক লো ব্লক ফুটবলের জালে প্রতিপক্ষকে বেঁধে রাখা। কেপ ভার্দে মোট চারটি ম্যাচ খেলেছে। চারটি ম্যাচেই তাদের ডিফেন্স লাইন ছিল নিখুঁত ও কার্যকর। ম্যান মার্কিং থেকে শুরু করে ডি-বক্সে যেভাবে প্রাচীর তুলেছে দলটি প্রতিবার,—একে এখন এরিয়াল বা মাথার ওপর দিয়ে নেওয়া শট ছাড়া ভাঙা কঠিন থেকেছে সবার জন্য।

স্পেন-যে গ্রুপ পর্বে ড্র করতে বাধ্য হলো কেপ ভার্দের সঙ্গে, সেখানে দলটির এই কৌশলগত প্রতিরক্ষা শতভাগ কাজে দিয়েছিল। লামিন ইয়ামাল ওই ম্যাচটি খেলেনি। তবে ইয়ামাল থাকলেও এরকম প্রাচীর তুলে দেওয়া রক্ষণদুর্গ ও প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে পালটা আঘাত হানা দলটির বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর থাকত, তা নিয়ে সন্দেহ থাকছেই। স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের সঙ্গে তিনটি ম্যাচ তারা এই কৌশলে খেলে ড্র করল। এমনকি বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের পরিচয় তুলে ধরতে যতগুলো ম্যাচ খেলে এসেছে, দেখা যাচ্ছে তার মেজরিটি তারা ড্র করে-করে এসেছিল। হেরেছে কম, বরং জিতেছে একাধিক ম্যাচ। এরকম একটা দলকে মাঠে খেলাটা মূলত লো ব্লকে খেলে অনভ্যস্ত দলের জন্য কঠিন হওয়ারই কথা। স্পেন ও আর্জেন্টিনার মতো হাই প্রোফাইল দল তা হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছে এবার।

আর্জেন্টিনার সঙ্গে ম্যাচটি কেপ ভার্দের মতো ফুটবল খেলিয়ে দলের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে অনেকদিন। ১২০ মিনিটের স্নায়ুচাপে অস্থির ম্যাচে তারা কেবল প্রতিপক্ষের আক্রমণকে ভোঁতা করেছে তা নয়, নিজেরাও ত্বরিত পালটা আক্রমণে গিয়েছে। তিন নাম্বার গোল করার পর কেপ ভার্দের সুযোগ এসেছিল ড্র করার। মার্টিনেজ ত্রাতা হয়ে না ঠেকালে খেলাটি ট্রাইব্রেকারে গড়াত নিশ্চিত, এবং সেখানে গরমজনিত ক্লান্তি ও স্নায়ুচাপ মিলে বেশ বিধ্বস্ত আর্জেন্টিনার হারতেও পারত। স্নায়ু ধরে রেখে পেনাল্টি কিক নেওয়াটা একলা ওই ভজিনহোর অতিমানবীয় গোলকিপিংয়ের কারণে কঠিন হতো আলবিসেলেস্তেদের জন্য। চার ম্যাচে গোলবার সামলানোয় তাঁর কীর্তি এককথায় অবিশ্বাস্য থেকেছে! আর্জেন্টাইন শিবিরে কাজেই জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের মতো পেনাল্টি মিসের মহড়া দর্শকের দেখার সম্ভাবনা প্রবল হতো বলে মনে হয়েছে ম্যাচটি দেখে।

Tactical Brilliance of Cape Verde’s Low Block Football against mighty Spain; Source & Credit: Collected; nytimes.com.

মেসিবাহিনির শরীরী ভাষায় ক্লান্তি ও ‘কী হচ্ছে’ বিস্ময়টা ভালোই ধরা পড়ছিল আগাগোড়া। মেসিকে দেখে মনে হচ্ছিল কেপ ভার্দের সঙ্গে টক্কর নেওয়ার ধকল নিজের ওপর তাঁকে অসন্তুষ্ট ও বিরক্ত করছে যথেষ্ট। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি যে-বের করে আনতে পেরেছে সেখানে দৈবের কৃপার সঙ্গে স্কালোনির অবদান নেই তা বলা যাবে না। বিশ্বকাপের আগে আর্জেন্টিনা কেপ ভার্দের মতো লো ব্লক ও উজ্জীবিত ফুটবল খেলে, এরকম পাঁচ-ছয়টি দলের সঙ্গে খেলেছিল, এবং তার বেশিরভাগ মেসিকে ছাড়া। কানের পাশ দিয়ে গুলি বেরোনোর অভিজ্ঞতা দিয়ে গেলেও, অবশেষে ওটা কাজে দিয়েছে।

আর্জেন্টিনা কি কেপ ভার্দেকে হালকাভাবে নিয়েছিল। আমার তা মনে হয়নি ম্যাচ দেখে। এই দলটি অতীতে, মানে মারাদোনা-জামানায় আফ্রিকার ওই ক্যামেরুন, নাইজেরিয়ার সঙ্গে ম্যাচ হেরেছে বিশ্বকাপে। গতবার সৌদি আরবের সঙ্গেও মেসি বাহিনি পয়লা ম্যাচ হারার পর ঘুরে দাঁড়িয়ে কাপ জিতেছিল। কেপ ভার্দের সঙ্গে ম্যাচকে স্কালোনি ও মেসিবাহিনির সহজে নেওয়ার কথা নয়। ম্যাচে বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর পরীক্ষাটি তাদেরকে দিতে হলো। এটা সামনের ম্যাচে দলটিকে মাইলেজ দেবে বলেই মনে হচ্ছে। সঙ্গে থাকবে ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ।

সালেহর মিশরের সঙ্গে আর্জেন্টিনার টক্কর সহজ হওয়ার কথা নয়। মিশর যথেষ্ট ভালো দল, আর কন্ডিশনের সঙ্গে ভালোই মানানসই মরুসেনারা। সুবিধা বলতে, মিশরের সঙ্গে আলট্রা ডিফেন্স খেলার চাপ নিতে হবে না অতটা। সালেহসেনারা ওই আর্জেন্টিনার মতো আক্রমণ, পালটা আক্রমণে খেলবে।

অফ্রিকার দলগুলো, মরক্কো ও মিশর বাদ দিলে, একে-একে বিদায় নিলো এবারের বিশ্বকাপ থেকে। বিদায় নিয়েছে, কিন্তু লড়াকু ফুটবলে মহাদেশটির এগিয়ে যাওয়ার নমুনা জানান দিয়ে তবেই মাঠ ছেড়েছে তারা। ইউরোপের লিগে এই মহাদেশ থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়দের সংখ্যাও হৃষ্টপুষ্ট। নিজ দেশের হয়ে খেলার সময় অভিজ্ঞতাটি ভালো কাজে দিচ্ছে। নব্বই দশকেও ‘কমন’ ফিজিক্যাল ও গতি নির্ভর ট্যাকলিং থেকে সরে আসা আফ্রিকানরা বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও দ্রুত গতিতে প্রতিপক্ষ-দুর্গে আঘাত হানার সক্ষমতায় দক্ষ হয়ে উঠেছে। এটা এই মহাদেশে একটা ফুটবল বিপ্লবের আভাস দিচ্ছে বলে আমরা ধরে নিতে পারি।

সমস্যা আছে অনেক। দারিদ্র্য, অবকাঠামোর অভাব, দুর্নীতি ইত্যাদি আফ্রিকান ফুটবলকে ভোগাচ্ছে। বিশ্বমানের গোলকিপার ও মাঝমাঠে কার্যকর প্লেমেকার বের করে আনার ঘাটতি আছে অনেক। তবে লড়াকু মানসিকতা দিয়ে ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চোখে পড়ার মতো ঘটনা এই বিশ্বকাপে। বড়ো প্রতিপক্ষকে নির্ভয়ে খেলার সাহস পুঁজি করে খেলেছে তারা গ্রুপ পর্বে। নকআউটেও তা ধরে রেখেছে প্রতিটা দল। যার সুফল মরক্কো ও মিশর পেয়েছে। সেরা ষোলোয় জায়গা নেওয়া কঠিন থাকেনি দল দুটির জন্য।

অন্যদিকে, লাতিন ফুটবল ছাব্বিশ বিশ্বকাপে বেশ ইম্প্রেসিভ প্রমাণ করছে নিজেকে। উরুগুয়ে ছাড়া বাকিরা ভালো করছে। উরুগুয়ের সর্বনাশের পেছনে কোচ মার্সেলো বিয়েলসাকে দায় নিতেই হবে। আধুনিক ফুটবলের এই খ্যাপাটে দার্শনিককে পেপ গার্দিওয়ালা তো বটেই, হাই প্রোফাইল কোচদের অনেকেও ‘কোচেদের কোচ’ গণ্য করে থাকেন। বিয়েলসার ফুটবল মস্তিষ্ক ক্ষুরধার হতে পারে, তবে নিজের কোচিং দর্শনকে মাঠে কার্যকর প্রমাণে তাঁকে ব্যর্থ মানতে হচ্ছে।

ক্লাব ও জাতীয় দলে ডাট করে বলার মতো বড়ো কোনো সাফল্য বিয়েলসার নেই। উরুগুয়েকে নিয়ে সখাত সলিলে ডুবে মরার পর এই আর্জেন্টাইন কোচের ক্যারিয়ার খতম হতে যাচ্ছে মনে হয়। যদিও, তাঁরই শিষ্য আর্জেন্টাইন স্কালোনী, বেকেসাস, পচেনেত্তিরা খারাপ করেছেন বা করছেন তা বলা যাচ্ছে না। বিশ্বকাপে ছয়জন আর্জেন্টাইন কোচের মধ্যে বিয়েলসাই বরং তাঁর অতিরিক্ত হাই প্রেসিং ফুটবল খেলানোর ঘোরে প্লেয়ারদের জান অতিষ্ঠ করে ডুবলেন সায়রে।

Matias Manna: the man behind the Argentain success alongside Enzo Fernández; Source & Credit: @mannamatias/Instagram

ইউরোপ ও লাতিন ফুটবলের রসয়ানকে মেলানোর চেষ্টা লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয় চলছে অনেক বছর ধরে। ছাব্বিশের বিশ্বকাপে এসে সংমিশ্রণটা কার্যকর হওয়ার আভাস দিচ্ছে বলা যায়। এর পেছনে ডেটা অ্যানালিস্টরা যুগান্তকরী ভূমিকা রাখছেন। ইউরোপের দলগুলোকে এখানেও সংগ্রাম করতে দেখা যাচ্ছে। তাদের হাতে আর্জেন্টাইন মাতিয়াস মান্নার মতো কম্পিউটার অ্যানালিস্টের খামতি আছে বোঝা যায়।

ফ্রান্স, স্পেন ও নরওয়ে ব্যতিক্রম তাতে সন্দেহ নেই, তবে ইংল্যান্ড ও পর্তুগালের মতো ব্যালান্স দল এই দৌড়ে এখনো নিজেকে যেন খুঁজে ফিরছে! তারা হয়তো সামনে ঘুরে দাঁড়াবে। সেমি অথবা ফাইনালেও যেতে পারে, তবে তাদের গতি ও অ্যাথলেটিক স্কিল নির্ভর প্রেসিং ফুটবলে সৃজনশীলতার ঘাটতি চোখে পড়ছে। একটা যান্ত্রিক রোবোটিক ফুটবলের মহড়া খেলাটির বিউটিকে ম্রিয়মাণ করছে ভালোই।

বিলিয়ন-বিলিয়ন ডলারি ক্লাব ফুটবলের একঘেয়ে গতির মহড়া বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে কেন জানি খাপছাড়া দেখায়। ইউরোপিয়ান লিগে মাঠ কাঁপানো অনেক খেলোয়াড়কে যে-কারণে বিশ্বমঞ্চে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টায় আমরা মরিয়া দেখছি। কদাচিত দেখা মিলছে জিদানের মতো কুশলী শিল্পীর। প্লেমেকারের খরা ইউরোপজুড়ে চলছে, এই বাস্তবতা যে-কোনো কারণে হোক আলোচনায় উঠে আসছে কম। বুড়ো লুকা মদ্রিচ কিংবা হ্যারি ক্যান মনে হচ্ছে খেলাটির শেষ প্রজন্ম, যারা তাদের স্কিলকে নান্দনিক করেছেন মাঠে।

এমবাপ্পে বা ওসমান দেম্বেলেরা এখন এই ভার কতদিন টানতে পারবেন কে জানে! সে-তুলনায় লাতিন ও আফ্রিকান ফুটবলের একটা নতুন মেরুকরণে পা দেওয়ার আভাস বিশ্বকাপ দিয়ে রাখছে। কোয়ালিটির সঙ্গে এসথেটিক বিউটির সংমিশ্রণ দুই মহাদেশ থেকে আসা দলগুলোর খেলায় বরং তুলনামূলক অধিক চোখে পড়ছে। আফ্রিকানরা শারীরিক সক্ষমতার চাপ সামলে বল পায়ে নৈপুণ্য দেখাচ্ছে। কলম্বিয়ার মতো দল শারীরিক ফুটবল খেলে অভ্যস্ত ঠিক আছে,—সেটা কোপা কাপে। বিশ্বকাপের মঞ্চে লাতিন ছন্দের সঙ্গে গতির একটা ভালো রিদম যেন দেখলাম ঘানার সঙ্গে ম্যাচে। ভালদেরামাদের সময়কে এটা মনে করাচ্ছে বেশ।

নতুন এই মেরুকরণ কতটা কার্যকর থাকবে, তা হয়তো স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোয় আয়োজিত আগামী বিশ্বকাপের মঞ্চে পরিষ্কার হবে অনেকটা। সে-পর্যন্ত হ্যাটস অফ কেপ ভার্দে। জয় হোক লড়াকু ফুটবলের। প্রতিপক্ষ, সে যত বড়ো জায়ান্ট হোক-না-কেন, তাকে নির্ভয়ে যে-মোকাবিলা করে, সে হলো বীর। কুর্নিশ তারেই সাজে। কুর্নিশ কেপ ভার্দে। স্যালুট।
. . .

চরম নাটকীয় এক ফুটবল ম্যাচের সাক্ষী হলাম আমরা। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা জয় পেয়েছে, কিন্তু হৃদয় জিতে নিয়েছে কেপ ভার্দে। ম্যাচটি-যে সহজ হবে না, সেই আভাস আগেই পাওয়া যাচ্ছিল। কারণ লো ব্লক ডিফেন্স, দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক এবং সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতায় কেপ ভার্দে কতটা কঠিন প্রতিপক্ষ, তার প্রমাণ তারা গ্রুপ পর্বেই স্পেন ও উরুগুয়ের বিপক্ষে দিয়েছে।

ম্যাচের প্রথম হাইড্রেশন ব্রেকের পর আর্জেন্টিনা ফরমেশনে পরিবর্তন আনে এবং দ্রুতই তার সুফল পায়। সেই সময় উইং ও মিডফিল্ড ব্যবহার করে বেশ কয়েকটি কার্যকর ক্রস ও ভ‌লি দিয়েছে তারা। যদিও নতুন ফরমেশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে কেপ ভার্দের কিছুটা সময় লেগেছিল, তবে তারা খুব দ্রুত নিজেদের গুছিয়ে নেয়। এরপর একের-পর-এক দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের রক্ষণভাগকে বারবার চাপে ফেলেছে।

দ্বিতীয়ার্ধে এককথায় কেপ ভার্দে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছে। দুর্ভাগ্যই বলতে হবে, তারা ফলাফল নিজের পক্ষে আনতে পারেনি। কৌশলগত কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য শেষপর্যন্ত ব্যবধান গড়ে দিয়েছে। তবে এই ম্যাচ আবারও প্রমাণ করেছে, আধুনিক ফুটবলে ছোট দল বলে আর কিছু নেই। সঠিক পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাস থাকলে যে-কোনো দল পরাশক্তিকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলতে পারে।

একইসঙ্গে এই ম্যাচ আর্জেন্টিনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা রেখে গেছে। বর্তমান রক্ষণভাগ ও উইং নিয়ে টাইটেল ডি‌ফেন্ড করা সহজ হবে না। বিশেষ করে প্রতিপক্ষের চাপের মুখে ডিফেন্সের ফাঁকা জায়গাগুলো কাভার করতে দলটি ব্যর্থ ছিল। লিওনেল স্কালোনিকে এটা চাপে ফেলতে পারে সামনে। নকআউট পর্বে এমন ভুলের মূল্য দিতে দেশে ফেরার টি‌কেট আগেভাগে হাতে ধরিয়ে দিতে পারে যে-কোনো দল।
. . .

রালফ রাংনিকের গেগেনপ্রেস বা প্রেসিং ফুটবল খেলা অস্ট্রিয়ার সঙ্গে ম্যাচটিকে বিশ্লেষকরা আর্জেন্টিনার জন্য এসিড টেস্ট ভেবেছিলেন। অস্ট্রিয়া সেই পরীক্ষা নিয়েছিলও, তবে কেপ ভার্দের সঙ্গে ম্যাচটি সব ছাপিয়ে গিয়েছে! এরকম ম্যাচ কেবল রাত জেগে খেলা দেখাটাকে সার্থক করে তোলে।

এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত এটা সেরা ম্যাচ। সামনে হয়তো আরো টাফ ব্যাটল আমরা দেখব, তবে বিশ্বকাপে প্রথম খেলতে আসা দলটি মন থেকে মুছবে না কখনো। বিশেষ করে গোলকিপার ভজিনহো যেন সেই নব্বই দশকে ক্যামেরুনের হয়ে দর্শককে বিনোদিত করা রজার মিলার প্রতিচ্ছবি! এতটা বয়সে এরকম গোল কিপিং… এককথায় লা জবাব! যারা কেপ ভার্দেকে তাচ্ছিল্য করছিলেন, তাদের স্মরণ রাখা ভালো, বিশ্বকাপের মঞ্চে কোনো দল ছোট নয়। নিজের দিনে বড়ো দলের কলিজা খেয়ে দিতে পারে।

হ্যাঁ, এটা ঠিক হাসান। আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে এভাবে স্পেস রেখে খেলতে দেখে আশ্চর্য হয়েছি। বড়ো দলগুলো সচরাচর তা করে না। কাউন্টার অ্যাটাকের সময় ডি-বক্সের সীমানা ক্লোজ করে দ্রুত। কোচের ছকটা এক্ষেত্রে মাথায় ঢুকল না! সেইম প্রব্লেম ডি আর কঙ্গোর সঙ্গে ইংল্যান্ডের ম্যাচে দেখা গেছে। রক্ষণভাগে যথেষ্ট স্পেস রেখে হ্যারি ক্যানের দল কেন খেলছিল জানি না। মেক্সিকোর সঙ্গে এটা করলে সোজা বাড়ির টিকিট ধরিয়ে দেবে ইংলিশদের হাতে। হ্যারি ক্যানের এটা শেষ বিশ্বকাপ। অ্যাট লিস্ট সেমি ফাইনাল খেলা উচিত তাদের।

আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষকে রক্ষণভাগে টানে ও তা ঠেকানোর পরপরই দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে যায়, এখন এটা ব্রাজিল বা এরকম দলের সঙ্গে হয়তো কার্যকর, কিন্তু কেপ ভার্দের সঙ্গে নয়। এমনকি ফ্রান্সের সঙ্গেও না। গত বিশ্বকাপে এমবাপ্পেকে ছকে আটকে রাখা ও সত্তর মিনিট খেলা কন্ট্রোলে রাখার পর দুটো গোল কিন্তু এই ফাঁকে হয়েছিল।

স্কালোনি যথেষ্ট ধীশক্তি রাখেন। তাঁকে সিচুয়েশেন ম্যানেজার বলাই হয় এ-কারণে। ম্যাচের হাওয়া বুঝে খেলার কৌশলে বদল আনেন তাৎক্ষণিক। মনে হচ্ছে সামনে শুধরে নেবেন ভুল। কেপ ভার্দের সঙ্গেও মেসি কিন্তু মেসিই থেকেছে। চাপের মধ্যে তাঁর খেলার ধারভারে কমতি চোখে পড়েনি। সাচ অ্যা গ্রেট প্লেয়ার!

নেক্সট ম্যাচ আবার মিশরের সঙ্গে। তীব্র গরমে খেলতে হবে দুই দলকে। তাপমাত্রা সম্ভবত চল্লিশ ডিগ্রির কাছাকাছি থাকার প্রেডিকশন দিচ্ছে। এটা ভোগাতে পারে দুটো দলকেই। যাইহোক, বিশ্বকাপে এই প্রথম একটা মনে রাখার মতো ম্যাচ দেখলাম। আমাদের আনন্দ সেখানে। এই ম্যাচটি ইয়াদ থাকবে বহুদিন।
. . .

কেপ ভার্দে : সমরে ডরে না ‘বীর’

. . .

আফ্রিকার দেশগুলো এবারের বিশ্বকাপকে রঙিন করেছে সুমনদা। ফুটবল অবকাঠামোয় হাজারটা সমস্যা মোকাবিলা করে তারা বিশ্বকাপটা খেলছে। কেপ ভার্দের গোলকিপার ভজিনহোর স্বপ্ন ছিল মাকে আমেরিকায় এনে খেলা দেখানোর। টাকার অভাব ও ভিসাজনিত জটিলতায় তা হয়ে ওঠেনি। ঘানা ওদিকে মাত্র একগোল হজম করে বিদায় নিলো এবারের বিশ্বকাপ থেকে। দলটাকে একসময় আফ্রিকার ব্রাজিল বলা হতো। ব্রাজিলের ওই জোগো বনিতো (Jogo Bonito) বা নান্দনিক ফুটবলটা তারা অনুকরণের চেষ্টা করেছে তখন, যেটা আবার আফ্রিকান পাওয়ার ফুটবলে ব্যতিক্রম ঘটনা ছিল। সময়ের সঙ্গে ঘানার খেলার ধরন পালটেছে, তবে এখনো লড়াকু ফুটবলটাই খেলে দলটি। ঘানার মতো দল এবারের বিশ্বকাপে এসেছে আর্থিক অনটনের চাপ সামলে। দেশের জন্য কমিটেড হয়ে খেলেছে তবু।

আফ্রিকার ফুটবল আর্থিক সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারলে, অবকাঠোমো গড়ে নিতে পারলে, ভবিষ্যতে আরো উপরে উঠবে। মরক্কো যেমন গতবার এবং এবারও সেই প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছে। মরক্কোর সুলতান একটা প্রজেক্ট হিসেবে ফুটবলকে নিয়েছেন। এর সুফল হাকিমিরা মাঠে দেখাচ্ছে। আধুনিক ফুটবল এখন অর্থ ও পরিকল্পনা নির্ভর হওয়ার কারণে প্রচুর ফ্যাসিলিটি ছাড়া বেশিদূর আগানো যায় না। কেপ ভার্দে জানি না কতটা ধরে রাখতে পারবে এই সাফল্য। নাকি ক্যামেরুনের মতো ঝরে যাবে পরে। তবে, ইউরোপের লিগে আফ্রিকানদের একসেস বাড়ায়, একটা ভালো ভবিষ্যৎ হয়তো তারা গড়ে নিতেও পারে।
. . .

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ উপলক্ষ্যে থার্ড লেন স্পেস-এ প্রকাশিত অন্যান্য রচনা 

কেপ ভার্দে : সমরে ডরে না ‘বীর’ : সুমন বনিক 

আমাদের ‘খেলাসাহিত্যের’ শূন্য ভাঁড়ার 

‘ও ক্যাপ্টেন! মাই ক্যাপ্টেন!’ : মেসি-রোনালদো সমাচার 

‘গড ইজ রাউন্ড’ : খেলা ও গানে ফিফা বিশ্বকাপ 
. . . 

নেটালাপ অবদায়ক : আহমদ মিনহাজ; আবুল হাসনাত; সুমন বনিক
থার্ড লেন স্পেস.কম

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 5

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *