
আর্ট ফর ‘অ্যাকশন’ ও এক শিল্পীর নিষ্ফল লড়াই

হ্যারল্ড রোজেনবার্গের ‘অ্যাকশন আর্ট’ নিয়ে থার্ড লেন গ্রুপে জাভেদের সঙ্গে তর্কালাপ হয়েছিল মাস চারেক আগে। রোজেনবার্গকে নিয়ে জাভেদের লেখা ও তর্কালাপ সাইটে ধারাবাহিক তুলছি এখন। আজ এর দ্বিতীয় পর্যায় তুলতে গিয়ে রাজা রবি বর্মাকে নিয়ে রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক লেখায় চোখ আটকে গেল।
পাশ্চাত্য রীতিতে ভারতীয় পৌরাণিক কাহিনি ও চরিত্রদের ক্যানভ্যাসে তুলে আনবার ঘটনায় রবি বর্মা পথিকৃৎ পুরুষ ছিলেন। বেঙ্গল আর্ট স্কুল ঘরানায় অবন ঠাকুররা তখন ভারতীয় ও জাপানি রীতির সংমিশ্রণে ছবি আঁকছেন। পশ্চিমের অঙ্কনরীতির ওপর অগাধ দখল থাকলেও অবন ঠাকুর ও পরবর্তীরা সেদিকপানে গমনে বিমুখ থেকেছেন। ভারতীয় জাতীয়তা ও প্রাচ্যবাদকে তাঁরা তখন ক্যানভাসে প্রাধান্য দিচ্ছিলেন। একটি যুগারম্ভ ছিল তা। রবি বর্মাও অন্যদিকে পুরাণকে ক্যানভাসে জায়গা দিচ্ছিলেন সযত্নে, এবং তা পাশ্চাত্য অঙ্কনরীতির ভারতীয়করণের মধ্য দিয়ে।
রবি বর্মার এই অঙ্করীতি ও পেছনে নিহিত জীবনাদর্শ আবার একটি নতুন যুগের প্রারম্ভ ছিল। অতি মাত্রায় উত্থান-পতনের ঝড়ো হাওয়ায় পূর্ণ ছিল শিল্পীর জীবন। ভারতীয় পুরাণশাস্ত্র ও ধর্মাচারকে অশ্লীলতা দিয়ে ভরিয়ে তুলছেন… এই অভিযোগ তো ছিলই তাঁর বিরুদ্ধে, একটা পর্যায়ে জনরোষের সম্মুখীন হয়েছিলেন। রবি বর্মা তথাপি ছবি আঁকা ও সহজলভ্য উপায়ে সাধারণের কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার লড়াইয়ে হার মানার পাত্র ছিলেন না। এর জন্য তাঁকে সেইসময় নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়েছিল।
বলিউডডের অগ্রগণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একজন কেতন মেহতা ‘রং রসিয়া’ ছবিতে রাজা রবি বর্মার ঝড়ো জীবনের এসব দিক ছুঁয়ে গিয়েছেন। নগ্ন নারী মডেলকে বসিয়ে ছবি আঁকার মহড়া তিনি ওই সময়পর্বে দিচ্ছেন, মডেলের মুখাবয়ব ও দেহে ভারতীয় মিথরঞ্জিত পৌরাণিক নারী চরিত্রের আদল ভাসিয়ে তুলছেন… যার সবটাই ছিল বৈপ্লবিক ও বিস্ফোরক।
তো সেই রবি বর্মার ‘যশোদা ও কৃষ্ণ’-র মূল তৈলচিত্রটি এই এপ্রিলে ১৬৭ কোটি টাকায় নিলামে কিনে নিয়েছেন এক ভারতীয় ধনকুবের। রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বরাতে তথ্যটি জানতে পেরে হকচকিয়ে যেতে হলো! এ-কারণে নয়-যে, তাঁর ছবি অবিশ্বাস্য অঙ্কে নিলামে কিনেছেন আর্টলাভার ধনকুবের। এজন্য-যে, রবি বর্মা তাঁর জীবদ্দশায় কখনো চাইতেন না, তাঁর ছবি বিত্তবানদের পরিতোষ দিতে চড়া মূল্যে বিক্রি হতে থাকুক। উলটো এই সংগ্রামে নেমেছিলেন, প্রতিটি ছবি যেন প্রিন্টের মাধ্যমে সুলভ মূল্যে আমজনতার ঘরে-ঘরে পৌঁছায়। নিজে প্রিন্টিং প্রেস দিয়েছিলেন মূলত সেজন্য। এতে করে তাঁর ছবি বাজারে ওইসময় সুলভ ও সহজলভ্য হলেও, বিপদ ডেকে এনেছিল তাৎক্ষণিক। হিন্দু সমাজে রক্ষণশীল অংশটি তাঁকে অভিযুক্ত করছিলেন। ব্লাসফেমির দায় মাথায় চাপানো হচ্ছিল। সেইসঙ্গে ছিল অবিরত লড়াই করে দেনার দায়ে ফতুর হওয়ার দশাও।
রোজেনবার্গের সংজ্ঞায় রবি বর্মার এই ‘অ্যাকশন’ কীভাবে নিরূপিত হতো কে জানে! তবে, চিত্রাঙ্কনের মতো ব্যয়বহুল মাধ্যমে শিল্পের গতিপথ মর্জিমাফিক ধরে রাখা শিল্পীর জন্য আসলেও কঠিন। জনতার শিল্পরুচি ও শিল্পজ্ঞান পাকা না হলে, একধরনের ওরিয়েন্টেশনের ভিতর শিল্পসচেতন করা না গেলে, উলটো হিতে বিপরীত ঘটে হামেশা। রবি বর্মার ক্ষেত্রে যেমনটি ঘটেছিল তখন। অন্যদিকে, শিল্পের কেবল কতিপয় রুচিবান-বিদগ্ধ কিংবা অর্থবান সমাজের হাতে বন্দি থাকাটাও বরদাস্ত করা কঠিন হয়। এতে যেন এর প্রাণ মরে যায়। সহজ বিকাশ মাথাকুটে মরে রুচি-বিদগ্ধের কারাগারে। এই উভয় সংকট মনে হয় শিল্পীকে ‘আর্ট ফর অ্যাকশনে’র রোজেনবার্গ নির্ধারিত পথে গমনে বিড়ম্বনার কারণ হয়। হয়তো…!
. . .

রোজেনবার্গের ‘আর্ট ফর অ্যাকশন’-এ রাজা রবি বর্মা
মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
সংযুক্তি : থার্ড লেন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের তর্কালাপ থেকে সংকলিত পাঠ-প্রতিক্রিয়া পাঠের জন্য নিচের পিডিএফ দেখুন। ডেক্সটপ/ট্যাব ডিভাইস হলে সরাসরি এখানে পাঠ করতে পারবেন। মোবাইল ডিভাইস হলে সংযুক্ত পিডিএফ লিংক চাপুন অথবা সরাসরি ডাউনলোড করে পাঠ করুন।
. . .

অ্যাকশন আর্ট ও রাজা রবি বর্মা
রাজা রবি বর্মার শিল্পকর্মকে হ্যারল্ড রোজেনবার্গের ‘অ্যাকশন আর্ট’-র জায়গা থেকে বিবেচনার প্রশ্নটি নিয়ে সুন্দর ভেবেছেন জাভেদ। বিশেষ করে রোজেনবার্গ বেঁচে থাকলে রবি বর্মার শিল্পকর্ম সৃজনে অনুসৃত পদ্ধতি ও এর সমাজ-প্রভাবকে কোন চোখে দেখতেন, এই বিষয়ে আপনার অনুমান বেশ মানিয়ে গেছে এখানে। ‘অ্যাকশন আর্ট’ নিয়ে এই শিল্প-সমালোচক ও ভাবুক যা বলে গেছেন, সেগুলো বিবেচনায় নিলে অনুমানকে আন্দাজি ভাবার সুযোগ থাকে না।
‘অ্যাকশন আর্ট’-এ নিহিত সারার্থের আলোকে শিল্প ও শিল্পীর প্রকৃত বৈশিষ্ট্য আবারো পরিষ্কার বুঝতে সাহায্য করছে আপনার এই বক্তব্য। একে আমি রোজেনবোর্গের শিল্প বিষয়ক ভাবনা অনুসরণের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ বলেই মেনে নিচ্ছি। ‘অ্যাকশন আর্ট’ নিয়ে আপনার ব্যাখ্যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে,—শিল্পী ও শিল্পকর্ম বিচিত্র শিল্প-ঐতিহ্য ও শিল্প-ঘরানার দ্বারা প্রভাবিত অথবা নতুন রূপে এর বিবর্তন কোনো স্থির বিষয় নয়। সমাজে শিল্পীর অবস্থান, টিকে থাকার লড়াই, বাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার ধাত ও স্কুলিংও মুখ্য নয় সেখানে।
শিল্পীর কাজ করার পদ্ধতি (আপাতত অঙ্কনরীতি ধরছি এখানে) কোনো বৃত্তে আটকে গেছে কি, যা তাকে দিয়ে পুনরাবৃত্তি করাচ্ছে পরে?—প্রশ্নটিকে রোজেনবার্গ গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়েছিলেন। বৃত্তবন্দি হওয়া মানে শিল্পী ও তার শিল্পকর্ম অ্যাকশন আর্টের শক্তি হারাচ্ছে বলে তিনি ধরে নিয়েছেন।
পাশাপাশি, শিল্পীর কাজ সমাজে কীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে ও তার সামগ্রিক ফলাফলকে পাখির চোখ করেছেন রোজেনবার্গ। মার্কসবাদে আস্থা গভীর থাকায় শিল্পকর্মের ‘গণভিত্তি’কে তাঁর মতো লোকের পক্ষে উপেক্ষা করা সম্ভবও ছিল না। সামাজিক বিবর্তন ও অগ্রগতির সহায়শক্তি রূপে শিল্পের ভূমিকা ও অবদানকে সুতরাং ফিরে-ফিরে বিবেচনা করেছেন তিনি।
অন্যদিকে, ‘গণভিত্তি’ যখন রাজনৈতিক ও অন্যান্য এজেন্ট দ্বারা আরোপিত-নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে, তা আবার সইতে পারেননি। এরকম প্রাচীর ভেঙে বেরিয়ে আসা ও শিল্পীর নিজেকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলার সাহসকে ‘অ্যাকশন আর্ট’-র অন্যতম নিয়ামক শক্তি বলে বুঝে নিয়েছিলেন এই ভাবুক। শিল্পীর কাজে যদি এই ছাপ না থাকে, তাহলে তা যতই নান্দনিক গুণাগুণে মহান হয়ে উঠুক, খ্যাতি অথবা কুখ্যাতি বয়ে আনুক,—রোজেনবার্গের বিবেচনা অনুসারে একে আমরা অ্যাকশন আর্টের পরিপন্থী ভাবতে বাধ্য বটে!
আপনার লেখার প্রথম পাঠে এই দিকটি পেলাম মনে হচ্ছে। অন্যদিক, যেটি পেয়েছি বলে আমি অন্তত কনভিন্সড, তা হলো,—বাজার ও প্রাতিষ্ঠানিক বলয়ে আটকে যাওয়ার সমস্যাটি। একে এখন শিল্পী কীভাবে অতিক্রম করছেন তা রোজেনবার্গ আমলে নিয়েছেন। যে-কারণে শিল্পের অনবরত বিকল্প (আপনার ভাষায় ‘কাউন্টার হিস্ট্রি’) তৈরির সক্ষমতাকে ‘অ্যাকশন আর্ট’-র অন্যতম নিয়ামক রূপে তিনি গোনায় নিয়েছেন।
রবি বর্মার শিল্প-তৎপরতাকে বুঝে ওঠা ও এর অবস্থান নির্ণয়ে প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ। এবং, এখানে এসে রোজেনবার্গ একে কীভাবে দেখতেন, তার একটি প্রাণবন্ত রূপরেখা আপনি তুলে ধরেছেন। পাঠ-উপভোগ্য তাতে সন্দেহ নেই। তবে, আপনার ব্যাখ্যায় উঠে আসা রূপরেখাকে একইসঙ্গে উজ্জ্বল ও স্ববিরোধী মনে হয়েছে। কেন তা বলার চেষ্টা থাকবে এখানে।
তার আগে বলে রাখা প্রয়োজন, স্ববিরোধিতা ঘটেছে স্বয়ং রোজেনবার্গের কারণে। দেখুন জাভেদ, পোস্ট-মডার্ন বা উত্তর-আধুনিক পন্থা হচ্ছে শাঁখের করাত। এদিক দিয়ে গেলেও কাটে, উলটো দিকে গমন করলেও কাটে। এর সাহায্যে কোনো একটি বিষয়কে দেখার অশেষ উপকারিতা অবশ্যই রয়েছে। অন্যদিকে, নির্দিষ্ট উপসংহারে পৌঁছাতে না পারায় প্রায়শ ক্ষতিকর মাত্রায় স্ববিরোধিতার জন্ম দিয়ে বসে।

রোজেনবার্গকে নিয়ে বালকেনের করা মন্তব্য আপনি নিজে টেনেছেন লেখায়। বালকেন যেখানে রোজেনবার্গের প্রাসঙ্গিকতা স্বীকার করে বলছেন, ‘অ্যাকশন আর্ট’ তথা শিল্প-বিশ্লেষণের পরিষ্কার কোনো কাঠামোয় তিনি স্থির থাকেননি। শিল্পের প্রাসঙ্গিকতা ব্যাখ্যায় নির্দিষ্ট কাঠামোয় অনড় থাকা সমস্যা ও বিপত্তির কারণ হয় হামেশা। একইভাবে, কাঠামো যদি অনবরত নাজুক ও অস্থির হতে থাকে, সেক্ষেত্রে স্ববিরোধী ভ্রান্তি এড়ানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই জায়গা থেকে আমি প্রাসঙ্গিক কিছু কথা যোগ করার চেষ্টা করছি। আশা করি আপনি বিবেচনায় নেবেন তা।
রোজেনবার্গের ‘অ্যাকশন আর্ট’ এসব কার্যকারণে বহুভাবে প্রাসঙ্গিক ও সামনে আরো প্রাসঙ্গিক হওয়ার সম্ভাবনা রাখা সত্ত্বেও এর সাহায্যে শিল্পের কার্যকারিতা বোঝা জটিল থেকে যাবে বলে আমি ধারণা করছি। জটিলতার ছাপ রবি বর্মাকে নিয়ে আপনার করা ব্যাখ্যায় আমরা কিন্তু পাচ্ছি। রোজেনবার্গের চোখে রবি বর্মাকে দেখতে যেয়ে ‘এভাবেও দেখতেন, আবার ওভাবেও দেখতেন’ এই ডায়ালেকটিক্সের (Dialectics) আশ্রয় নিতে আপনিও বাধ্য হয়েছেন। এটি হলো পোস্ট-মডার্ন চিন্তা-পদ্ধতিতে কোনোকিছুকে দেখা ও ব্যাখ্যা করে ওঠার সুখ ও নরক… দুটোই! রোজেনবার্গের এই ‘দ্বৈততা’ আমার মতে এখানে এসে বিপজ্জনক ভুল বোঝাবুঝির জায়গা রেখে যায়। কেন তা এবার ধাপে-ধাপে বলে ফেলটাই ভালো মনে করি :
ক. আপনি লিখেছেন :
রোজেনবার্গ সত্যিকার অর্থে কোনো ‘পথ’ দেননি। তিনি কোনো মধ্যপন্থা নির্ধারণ করেননি;—না জনতার, না অভিজাতের। তিনি শুধু একটি প্রশ্ন রেখে গেছেন : শিল্পসৃষ্টির ক্ষেত্রে শিল্পী কি সত্যিই ঝুঁকি নিচ্ছেন, নাকি শুধু পুনরাবৃত্তি করছেন? এই প্রশ্নটি কেবল ক্যানভাসের ক্ষেত্রেই নয়, বরং চিন্তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
তো, এখান থেকে যদি রবি বর্মার শিল্পকর্ম সৃজনের দিকে নজর ফিরাই, তাঁর কাজের পদ্ধতি কেবল ঝুঁকিপূর্ণ ছিল তা নয়, জীবনের অন্ত পর্যন্ত যেসব ছবি এঁকেছেন এই শিল্পী, একে রিপিটেশন বলে দাগানোর অবকাশ সেখানে কিন্তু সীমিতই থাকছে।
প্রথমত, তিনি ভারতীয় অঙ্কনরীতির পরিবর্তে ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও ধ্রুপদি যুগে ছবি আঁকার ঘরানাকে দ্বিধাহীন গ্রহণ করেছিলেন। যেখানে, বেঙ্গল আর্ট স্কুলের প্রবক্তাদের ন্যায় প্রাচ্যরীতিকে অনায়াসে বেছে নিতে পারতেন। সেখানেও বৈপ্লবিক কাজ হচ্ছিল তখন। রবি বর্মা সেদিকপানে গমন না-করে ভারতীয় পৌরাণিক কাহিনি ও চরিত্রগুলোকে পাশ্চাত্য রীতিতে ক্যানভাসে অবমুক্তি দিয়েছেন। ভারতীয় জলবায়ু ও এর হাজারবর্ষী সাংস্কৃতিক পটভূমিতে তাঁর আঁকা চরিত্ররা বিচরণ করছে, কিন্তু তাদের ওপর আরোপিত স্বর্গীয় আবেশ তথা ডিভাইনিটিকে তা ভেঙেও দিয়েছিল। সময় ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এটি বৈপ্লবিক ঘটনা হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত।
বৈদিক যুগে মানব-দানব-দেবতার যে-প্রবল সম্মিলনের আভাস আমরা ভারতীয় ধর্মশাস্ত্র ও পুরাণকথায় পাচ্ছি, শুভ-অশুভের মানবিক দ্যোতনার অপার বিস্ফার দেখছি, সর্বপ্রাণবাদের অবারিত জাগরণ ও বন্দনা টের পাচ্ছি, আবার জন্ম, কর্ম, নিয়তি ও পরিণামের রহসঘন আধ্যাত্মিক ব্যঞ্জনা পাচ্ছি সমানে… এর অনেকখানি রবি বর্মা তাঁর ক্যানভাসে ফেরত এনেছিলেন।
বেঙ্গল আর্ট স্কুলের অনুসারী ও উত্তরসূরিদের অনেকে ছবি এঁকেছেন প্রাচ্য রীতি মেনে, তবে সেখানেও ছবির চরিত্র ও বিষয়ে মর্মরিত থেকেছে যুগ-বাস্তবতার আভাস। নন্দলাল বসুর রাধা-কৃষ্ণকে নিয়ে আঁকা ছবিটি ‘এভাবে কি জীবন যাবে’ নামে একখানা গানালেখ্য গ্রুপে দেওয়ার সময় সংযুক্ত করেছিলাম ক’দিন আগে। আপনার জন্য তা আবার সংযুক্ত করছি এখানে। ভালো করে যদি ছবিটি খেয়াল করেন, তাহলে চমকে যেতে হবে এ-কথা ভেবে-যে, নন্দলাল বসু অজন্তা গুহাচিত্রে মর্মরিত ভারতীয় ধ্রুপদি অঙ্কনরীতি অনুসারেই আঁকছেন ছবিখানা, তথাপি রাধা-কৃষ্ণকে ভারতীয় পৌরাণিক আবহে ধরে রাখতে পারছে না ছবিটি! তাদের অবয়ব ও অভিব্যক্তির মধ্যে মর্মরিত হচ্ছে যুগ-বিবর্তন ও যুগ-সংকট।

রবি বর্মাও একই কাজ করেছেন উলটো পথে। তিনি তৈলচিত্র আঁকছেন পাশ্চাত্য রীতিকে সার মেনে। যেখানে, দেহের সৌন্দর্য থেকে আরম্ভ করে প্রণয় ও যৌনতার বিস্ফার সবটাই বৈদিক যুগারম্ভের মতো খোলামেলা বা অবমুক্ত থাকছে। কামসূত্রের নির্যাস যদি অজন্তা-ইলোরার গুহাচিত্রে বিস্ফারিত হয়ে থাকে একদা, এখন গুহাচিত্র বা পাথরে খোদাই ভাস্কর্যে উচ্চকিত স্বর্গীয় কিন্তু ইহলৌকিক আবেশকে রবি বর্মা তাঁর ক্যানভাসে ধরেছেন।
গুহাচিত্রে ফিগারগুলো লক্ষ করুন, বিচিত্র রতিআসনে এই-যে প্রণয়-শিহরন ও যৌনমিলনকে শিল্পীরা ভাষা দিলেন, সেখানে চরিত্রদের অভিব্যক্তি মনে হবে স্বর্গীয় ছটায় মহিমান্বিত, কিন্তু তারা আদতে কামার্ত নর-নারী। যৌনমিলন তো আসলেও স্বর্গীয় পরিতৃপ্তির স্মারক, যখন রাগমোচন ও বীর্যস্খলনকে আমরা ভাবব ‘প্লেজার’।
পৌরাণিক চরিত্রগুলোর ওপর ধর্মীয় মহিমা ও ডিভাইনিটি চাপানোর মচ্ছবে এদিক থেকে লোকের নজর সরে গিয়েছিল। বলা ভালো, পরিণত আর্য সভ্যতায় পৌঁছে বর্ণাশ্রম কবলিত ব্রাহ্মণ্যবাদ সচেতনভাবে তা সরিয়ে দিচ্ছিল ক্রমশ। রবি বর্মা সেই এসেন্স ফিরিয়ে আনলেন ক্যানভাসে। এর ফলে তাঁর আঁকা রামায়ণ ও মহাভারতের চরিত্রগুলোকে যখন ক্যানভাসে দেখছি, রাধা-কৃষ্ণকে দেখছি, আরো সব পুরাণমথিত কাহিনির রেশ দেখছি, সেখানে এর সবটাই ডিভাইন প্লেজারকে ভেঙে দিয়ে একটি মানবিক পরিসর জন্ম দিচ্ছে।
ভারতবর্ষের আমজনতা এখন এর সারার্থ কতটা বুঝতে পেরেছিল, তা পৃথক প্রশ্ন। এদিক থেকে যদি ভেবে দেখি, রবি বর্মার পাশ্চাত্য রীতি মেনে আঁকা ভারতীয় চিত্রকলা আগাগোড়া একটি অঙ্কনরীতিতে স্থির থাকলেও অথবা একে যদি ‘পুনরাবৃত্তি’ ভাবি, তাতে কিছু যায় আসে না। যেহেতু, ‘পুনরাবৃত্তি’ এখানে বিষয়গত ব্যঞ্জনায় চিরকালীন। সুতরাং, ‘পুনরাবৃত্তিকে’ও ‘অ্যাকশন আর্টের’ জায়গা থেকে নতুন করে ফিরে ভাবার সুযোগ থাকছে। রোজনবার্গকে বিষয়টি কতটা ভাবিয়েছিল, তা আমার অবশ্য জানা নেই।
ইউরোপীয় রেনেসাঁ যুগে যেসব শিল্পী বাইবেলের কাহিনি ও চরিত্রদের ক্যানভাসে এঁকেছেন, সেখানে অনেকেই চার্চ যেভাবে আঁকতে বলেছিল, তার থোড়াই কেয়ার করেছেন। যিশুর জীবনজার্নির পুরোটাই তাঁরা নিজের মতো করে দেখার চেষ্টা করতেন। ম্যাডোনা সেখানে স্বর্গীয় মহিমায় নজরকাড়া ঠিক আছে, কিন্তু তাঁর ভিতর থেকে উঁকি দিয়েছে সময়-সমকালে দেখা দেওয়া বিচিত্র যুগসংকট। সময়ের সঙ্গে যা আরো গতিশীল সব ঘরানা জন্ম দিয়েছিল ইউরোপে।
চটজলদি উদাহরণ হিসেবে সপ্তদশ শতকের ইতালীয় চিত্রকর কারাভাজ্জোর নাম নিতে পারি আমরা। যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক চিত্রী ছিলেন। বাইবেলের চরিত্র ও কাহিনি একান্ত নিজের জীবন-অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে এঁকেছেন সেইসময়। জগৎ তাঁকে ক্যানভাসে আলো-ছায়ার মায়াবি ধাঁধা সৃষ্টির অপূর্ব কারিগর বলে আজো বন্দনা করে। পরবর্তী অসংখ্য ভুবনবিখ্যাত শিল্পীকে চমকিত ও প্রভাবিত করেছেন অবলীলায়। নিজেও তাঁর সময়ে ছিলেন মুনমেন্টাল পেইন্টার। সব ছাপিয়ে যাচ্ছে, যখন তার আঁকা চরিত্রগুলোর ভিতর থেকে আমরা উঁকি দিতে দেখছি গভীরভাবে অস্বস্তিকর অনৈতিক সত্য। এই অস্বস্তি ও অনৈতিকতার সবটুকুন কারাভাজ্জোর তিক্ত-বিষাক্ত ব্যক্তিজীবন থেকে সরাসরি ক্যানভাসে জায়গা খুঁজে নিয়েছিল।
চার্চ ও অভিজাত শিল্পীরসিকদের নির্দেশ মেনে ছবি এঁকেছেন বটে, যেহেতু খেয়েপরে বাঁচার সম্বল ছিল তা, কিন্তু আঁকতে গিয়ে নিজের ব্যক্তিসত্তায় সক্রিয় উন্মূল, ভবঘুরে, ছন্নছাড়া, পাপী ও বেপোরোয়া সত্তাকে অবলীলায় বের হতে দিয়েছেন ক্যানভাসে। বাইবেলের চরিত্র বা কাহিনির মধ্যে আরাপিত হয়েছে ব্যক্তি কারাভাজ্জোর মাত্রাছাড়া পাগলাটে অনৈতিক জীবন। এর ফলে ডিভাইনিটি মোড় নিয়েছিল পাপ-পুণ্য, শুভ-অশুভে বোঝাই ও মানবিক দ্বিধাদ্বন্দ্বে বিস্ফারিত ঘটনায়।
রবি বর্মা এখানে কারাভাজ্জোর মতা ডেসপারেট বা উন্মাদতুল্য নন বটে, টেনিস কোর্টে খেলতে নেমে প্রতিপক্ষের সঙ্গে বন্য বিবাদে জড়ানো তাঁকে দিয়ে হওয়ার ছিল না। না তিনি ওই টেনিস কোর্টে বিবাদে লিপ্ত প্রতিপক্ষকে বুনো আক্রোশে খুন করে চম্পট দিচ্ছেন অন্যত্র। এই গভীর উন্মূল অস্থিরতার পেছনে যুগের ভূমিকা তীব্র থেকেছে। খ্রিস্টান চার্চের প্রভাব তখনো অস্তমিত নয় পুরোটা। একটি যুগসন্ধিক্ষণ অনিবার্য হচ্ছিল সমাজে। সমাজজীবন অনৈতিক কারাগারে যেন অন্তরীণ হচ্ছিল ক্রমশ। কারাভাজ্জো এর শিকার ছিলেন জন্মলগ্ন থেকে।
কারাভাজ্জোর আঁকা সবগুলো ছবিই অ্যামেজিং! কোনটা রেখে কোনটার কথা বলবে দর্শক তার কিনারা করা মুশকিল হয়ে ওঠে। কথার কথা, তাঁর অতি বিখ্যাত The Incredulity of Saint Thomas ছবিটিই না-হয় ফিরে দেখি আরেকবার :

শূলে চড়ার পর যিশুর পুনরায় ফিরে আসার ঘটনা নিয়ে সাহাবিদের মধ্যে যে-বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের দোলাচল তৈরি হয়েছিল, ইস্টার সানডের ছলে যার বিবরণ আমরা বাইবেলে পাচ্ছি, এখন এটি কারাভাজ্জো বাইবেলের সূত্র মেনে এঁকেছেন, কিন্তু এমনভাবে এঁকেছেন… ছবিটি তাঁর (এমনকি আমাদেরও) সময়-ক্ষতকে মুহূর্তে ভাসিয়ে তোলে। সংশয়ে আতুর সাহাবি থমাস তখন বলেছিলেন,—যিশু আবার আমাদের মাঝে ফেরত এসেছেন তা বিশ্বাস করতে আমার কষ্ট হচ্ছে। আমি বিশ্বাস করতে পারি যদি তাঁর হাতে যেসব পেরেক ওরা গেঁথেছিল, সেগুলোর দাগ খুঁজে পাই, এবং পাঁজরের ওই জায়গাটি, যেখানে পেরেক ঢুকে গিয়েছিল।
এটিই এঁকেছেন কারাভাজ্জো তাঁর আলো-ছায়ার অপূর্ব সম্মোহন বিস্তারের খেলা দিয়ে। কিন্তু থমাসের ওই যিশুর পাঁজরের গভীর আঙুল ঢোকানোর মুহূর্ত মনে প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে,—শুভচেতনার আবির্ভাব কি সত্যি সম্ভব এখন? নাকি সবটাই মিথ্যে প্রতারণা। কারাভাজ্জো এর দ্বারা তাড়িত থেকেছেন আজীবন। শয়তানের খেলাকে সারসত্য জেনে এঁকেছেন বাইবেল-কাহিনি।
রবি বর্মা আমাদের এখানকার যুগসংকটের বলি ছিলেন না তা বলি ক্যামনে! সুতরাং, তিনি তাঁর মতো করে ‘টাবু’ ভাঙতে তুলি টেনেছেন। একই ছাদে এঁকে গেছেন বছরের-পর-বছর। প্রিন্ট করে ছড়িয়ে দিয়েছেন সাধারণের মাঝে, যারা আবার শিল্পরসে দীক্ষিত হওয়া দূরে থাক্, মোটের ওপর ধর্মান্ধ ও সংস্কারগ্রস্ত ছিল তখন। তাদের মধ্যে নিজের ছবিকে সুলভ করার ঝুঁকি রবি বর্মা নিয়েছেন। যেহেতু, তাঁর পক্ষে অন্য পথে এই জনতাকে ঝাঁকুনি দেওয়ার রাস্তা খোলা থাকেনি।
তাঁর ছবি এক্ষেত্রে হাতুড়ি, যেটি দিয়ে তিনি লোকগুলোর মগজে আঘাত হানছেন বারবার। এখন, এর ভালোমন্দ ও পুনরাবৃত্তি ছাপিয়ে বড়ো হয়ে উঠছে এই সত্য,—এটি একইসঙ্গে শিল্পকে মহিমান্বিত করার প্রথাকে তোয়াক্কা করেনি। এর পাশাপাশি অন্ধকার বৃত্তে বন্দি সমাজের ঘরে-ঘরে বিকল্প ইতিহাস নিয়ে ঢুকতে মরিয়া ছিল। রোজেনবার্গের ‘অ্যাকশন আর্ট’র পরিসর যদি শিল্পীর ব্যক্তিসত্তা ও অস্তিত্বকে কেবল বিচারে নেয়, তাহলে তা পুনরাবৃত্তিতে নিঃস্ব মনে হবে। সেক্ষেত্রে আপনার ভাষায় ‘সাংস্কৃতিক অ্যাকশন’কে এটি সঠিকভাবে মিজার করতে আসলে পারবে না কখনো।
রোজেনবার্গ, আপনার ভাষ্যমতে একদিকে ‘অ্যাকশন আর্ট’কে শিল্পীর ব্যক্তিসত্তার গভীরে সক্রিয় অস্তিত্বগত রূপান্তর ও ঝুঁকি নেওয়ার জায়গা থেকে বুঝে উঠতে আকুল ছিলেন। অন্যদিকে, রবি বর্মার মতো যাঁরা বাজারে ছবি ছড়িয়ে দিচ্ছেন সুলভে, একে জনপ্রিয় করে তুলছেন, করে তুলছেন বিতর্কিত,—এখন তা মানুষের মনোজগতে বৈপ্লবিক রূপান্তর আনলে একে ‘অ্যাকশন আর্ট’ বলে মানছেন;—না আনতে পারলে পুনরাবৃত্তি ও বাজারের কাছে শিল্পীসত্তা বিকিয়ে দেওয়া ধরে নিয়ে বিমুখ থাকছেন…! সত্যি কথা বলতে এই উত্তর-আধুনিক বিবেচনাকে আমার কাছে প্রচণ্ড সমস্যার মনে হয়।
প্রশ্ন দাঁড়ায় এখানে, সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত ও রূপান্তরিত করার প্রশ্নে শিল্প স্বয়ং রাজনৈতিক হয়ে ওঠে কি? নাকি এই সক্ষমতা সে রাখে বা রেখেছে কোনোকালে? আমার কাছে এর উত্তর এরকম :—সামাজিক ও রাজনৈতিক যেসব অনুঘটক সময়ের সঙ্গে সমাজে জন্ম নেয়, সেগুলোর পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ায় শিল্পী হয়ে ওঠেন রাজনৈতিক।
রুশ বিপ্লবের কথা ধরুন। লেলিনের নেতৃত্বে একটি পরিস্থিতি জন্ম নিয়েছিল তখন। পরিস্থিতিটি সেখানে রুশ চলচ্চিত্রে নয়া বাঁক নিয়ে এসেছিল। আইজেনস্টাইন, পুদোভকিনের মতো নির্মাতাদের সম্ভব করেছিল রুশ বিপ্লবের ঝড়ো হাওয়া। বিমূর্ত চিত্রকলায় যেমন ক্যান্ডিনস্কিকে আমরা পাচ্ছি তখন। তাঁর Moscow: Red Square ছবির প্রসঙ্গ ‘একটি খুনের গল্প’ শিরোনামে লেখা গল্পে টেনেছিলাম মনে পড়ে। এই ফাঁকে তা ইয়াদ করছি এখানে।
রুশ বিপ্লব ছিল একইসঙ্গে কেন্দ্রের ভাঙন ও এর বিপরীতে নতুন করে কেন্দ্রের আবিভূর্ত হওয়ার মতো কুখ্যাত ঘটনা। ক্যান্ডিনস্কি যে-কারণে রেড স্কয়ারকে ক্যানভাসে ফিগারেটিভ রাখেননি! ফিগারকে ভেঙে দিয়ে একধরনের উদ্দেশ্যহীন শূন্যতায় যেন-বা রেড স্কয়ারের বিস্তারকে ধরছেন ক্যানভ্যাসে! আমার কাছে এটি মারাত্মক অ্যাকশন আর্ট! অন্যদিকে, বিপ্লবের প্রাসঙ্গিকতা তৈরিতে লেলিন কিন্তু ব্যবহার করেছেন জার আমলে সৃষ্ট রুশ সাহিত্য ও নানামুখী সাংস্কৃতিক উপকরণ। কেননা, এগুলোর মধ্যে বৈষম্য ও আরোপণের নানা রসদ তিনি পরিষ্কার পড়তে পারছিলেন।

জার আমলে সৃষ্ট শিল্পধারা রুশ বিপ্লবকে গতি এনে দিয়েছিল। পুশকিন, গোগোল, দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, তুর্গেনেভের মতো লেখকরা ছিলেন সারবীজ। সাংস্কৃতিক বিপ্লব তাঁরা ওইসময় ঘটাতে পারেননি বা তাঁদেরকে দিয়ে তা হওয়ার কথাও নয়, কিন্তু সময়ের পটপরিবর্তনে রাজনৈতিক অনুঘটক তৈরি হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে তাঁরা হয়ে উঠলেন প্রয়োজনীয়। রুশ বিপ্লবে যেখানে লেলিন তাঁদেরকে শক্তিশালী উপকরণ রূপে পরে কাজে লাগিয়েছেন।
সুতরাং, শিল্পীর দায় নেই সাংস্কৃতিক বিপ্লব বা সমাজের নতুন নবীকরণ ঘটানোর বা সমাজকে শিক্ষিত করতেও সে নয় বাধ্য। তার কাজ হলো সময়রেখায় যেসব অনুঘটকের সঙ্গে তার সহমত ও দ্বিমত রয়েছে, সেগুলোকে নিজের কাজে মূর্ত করা। রবি বর্মা যেমন দ্বিমতের জায়গা থেকে পুরাণকে পাশ্চাত্য রীতিতে নতুন করে এঁকেছেন।
আবার, জনগণ এসব ছাই বুঝবে জেনেও বাজারমুখী করার সাহস করেছেন। নিজের ওপর বিপদ বেড়েছিল তাতে। প্রশ্ন হলো, তাতে করে কি সমাজ বদলে গিয়েছিল পরে? না যায়নি, সমাজ যেখানে ছিল, সেখানেই থেকেছে। মাঝখান থেকে পুরাণচরিত্রের দেবমাহাত্ম্য বিনষ্ট করার দায়ে বেচারা মরতে বসেছিলেন।
পরে এই-যে তাঁকে প্রাসঙ্গিক করা গেল না, তাঁর অঙ্কনরীতি থেকে নতুন বিবর্তন ঘটল না ভারতে, এর পেছনে শক্ত রাজনৈতিক পাটাতন ও সমাজমুখী সংস্কারের ঘাটতি হচ্ছে বড়ো কারণ। যদি তা না থাকত, রবি বর্মা আপনা থেকে নতুনভাবে পঠিত ও প্রাসঙ্গিক হতেন। তাঁর বাজারে সস্তায় ছড়িয়ে দেওয়া ছবি একধরনের অভ্যস্ততা তৈরির ঝুঁকি সত্ত্বেও, সেখানে আসত নয়া আবর্তন। রাষ্ট্র ও রাজনীতির আবর্তে শিল্পীর অবস্থান ও বিচরণের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে ও তাকে পৃথক ব্যক্তিসত্তা রূপে দেখতে গিয়ে রোজেনবার্গ নিজের চিন্তায় নিজে জট পাকাচ্ছেন কি-না, এই প্রশ্নটি সুতরাং উঠবেই।
ব্যক্তিসত্তা যে-কোনো অবস্থায় নিজের ভিতরকার পরম নৈতিকতায় দাঁড়িয়ে নিজেকে শিল্পে পালটাবে ও নয়া আবর্তন আনবে ফিরে-ফিরে, তাহলে সে অ্যাকশন আর্টিস্ট, অন্যথায় পুনরাবৃত্তিতে নিঃম্ব, এবং বাজারি ও আপসকামী;—রোজেনবার্গের এই ভাবনাটি যে-কারণে ভীষণ ডিস্টার্বিং। কেননা, এতে করে ব্যক্তিসত্তা ও সামাজিক-সত্তাকে তিনি পৃথক করে ফেলছেন বারবার। শিল্পীর কাছে চাইছেন অবিরত ঝুঁকি নেওয়ার মতো বৈপ্লবিক শর্ত মেনে চলার বাধ্যবাধকতা।

শিল্পী সবসময় তা পারে না। পারবেও না কোনোদিন। কেননা, নিজের ব্যক্তিসত্তার কাছে যতই জবাবদিহি করুক-না-কেন, সে নির্মমভাবে অ্যারিস্টোটলের সংজ্ঞা মেনে সামাজিক পশু। তার ব্যক্তিসত্তাও আদতে গড়ে ওঠে প্রকৃতি ও সমাজের প্রভাবক রসায়নে। এরাই ক্যাটালিস্ট বা প্রভাবক সেখানে। সমাজে একজন শিল্পী কারাভাজ্জোর মতো উদ্ভট কিন্তু অসীমভাবে বেপোরোয়া হয়ে উঠতে পারে। আবার নির্মমভাবে অপসকামি হতেও পারে। ঘটনা যেভাবেই ঘটুক-না-কেন, উভয় ক্ষেত্রে সে কতখানি অ্যাকশন আর্টিস্ট হয়ে উঠতে পারবে অথবা পারবে না, এটি পরিমাপ করা সম্ভব নয়। সবটাই নির্ভর করছে প্রভাবকের ওপর।
যে-সমাজ রাজনৈতিক ও সামাজিক অন্যান্য অনুঘটকে এগিয়ে থাকছে, সেখানে অ্যাকশন আর্টের পরিধি বাড়বে। অনুঘটকরা অন্যপথ ধরলে অ্যাকশন আর্টের স্বরূপ রোজেনবার্গের ভাবনা অনুসারে বিকল্প ইতিহাস জন্ম দেবে কম। এমনকি জন্ম দিলেও তা কার্যকর হবে না সমাজে। আমাদের এখানে যেমন বাঙালির নবজাগরণ, বেঙ্গল আর্ট স্কুল, গণনাট্য আন্দোলন… এরকম বিচিত্র সম্ভাবনা শেষপর্যন্ত মরুসাহারায় পথ হারিয়েছে। এর পরিবর্তে সমাজ ফেরত গিয়েছে প্রতিবিপ্লবী বিকল্প ইতিহাসে। এই ইতিহাস সনাতন, যেখানে আছে ধর্মান্ধতা, সাম্প্রতায়িকতা ও পশ্চাদপদ নানা উপকরণ। এগুলো থেকে জন্ম নিচ্ছে একালের শিল্প। এটিও আবার একধরনের অ্যাকশন আর্ট। কাউন্টার অ্যাকশন আর্ট। একে এখন ঠেকাবেন কী দিয়ে? যেখানে, সম্মুখগামী রাজনৈতিক ও সামাজিক পালাবদলের সকল সম্ভাবনা আপাতত বালিতে মুখ গুঁজেছে!
তবে হ্যাঁ, এই মুখ গুঁজে থাকা সম্ভাবনাকে ফেরত আনতে রবি বর্মার মতো আর্টিস্টকে নিয়ে যে-শিল্পী এখন হয়তো ভাবছে ও ছবি আঁকছে নতুন করে, তার ভিতরে জন্ম নিচ্ছে ভবিষ্যৎ পালাবদল বা বিকল্প ইতিহাস তৈরির সারবীজ। উপযুক্ত রাজনীতি দরকার একে কাজে লাগানোর জন্য। কাজটি শিল্পীর নয়, অন্যদের।
. . .

… হ্যারল্ড রোজেনবার্গ ও আর্ট ফর ‘অ্যাকশন’ সংক্রান্ত পাঠের জন্য আরো দেখুন…
নেটালাপ : আর্ট ফর ‘অ্যাকশন’-১ : থার্ড লেন স্পেস.কম
আর্ট ফর ‘অ্যাকশন’ ও হ্যারল্ড রোজেনবার্গ সমাচার : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ : থার্ড লেন স্পেস.কম
. . .

নেটালাপ অবদায়ক : আহমদ মিনহাজ ও মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন . . .


