বৈশ্বিক সংকট, ঐতিহ্যের টানাপোড়ন, আধুনিকতার প্রভাব, প্রযুক্তির আধিপত্য, এবং নৈরাশ্য ও মনোবৈকল্যের একালে সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে কবিতা পড়া যেখানে বাহুল্য মনে হয়, সেখানে কবিবন্ধু হেলাল চৌধুরীর চার দশকের নিরবচ্ছিন্ন কাব্যযাত্রা আমাদের যেমন বিস্মিত করে, তেমনি করে আশান্বিত।
হাওরবাওর বাউলের দেশ সিলেট-সুনামগঞ্জের মাটি-জল-হাওয়ায় পুষ্ট কবি হেলাল চৌধুরীর ইতোমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে ১১টি কাব্যগ্রন্থ। স্নিগ্ধ কোমল বর্ণে-গন্ধে-ছন্দে কবিতার ভাষ্য নির্মাণ তার কবিতাকে করেছে ঋজু, সংবেদী আর শক্তিমান। দারুণ মুন্সিয়ানায় পুরাণ, দর্শন, ইতিহাস ও ভূগোলের নির্মম বাস্তবতা আর পৌরাণিক চরিত্রের সাবলীল উপস্থাপন আমাদের মুগ্ধ ও অবাক করে!
প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মিথোলজি আর দর্শনের যুতসই ব্যবহার, পুরাণপ্রেমের সঙ্গে সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনদর্শন তাঁর কবিতাকে করেছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। ব্যাপক পঠনপাঠন, চিরায়ত সাহিত্যের প্রতি গভীর টান ও মৌলিক ভাবনায় কবি হেলাল চৌধুরী ঋদ্ধ।
শিল্পভাষ্য তৈরিতে মিথ-যে কত শক্তিশালী হতে পারে তা আমরা কবি হেলাল চৌধুরীর কবিতা পাঠে বুঝতে পারি। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘জোনসের দাঁড়কাক’, ‘নোহ কা লিকাইয়ের রক্ত’, ‘দাইদালুসের বিলাপ’, ‘হিচককের কাকেরা নামো’, ‘আইভি বৃক্ষের পাতারা’, ‘প্যাপিরাসের নৌকা’, ‘আসপাশিয়ার পানপাত্র’ নামগুলো দেখলেই বোঝা যায় কবির প্রবল মিথপ্রেম। প্রায় প্রতিটি কবিতায় অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে এসেছে মিথ।
এথেন্সের বিমূর্ত আপেলটি
তোমার হাতে দেওয়ার জন্য
আমি কতকাল ধরে প্রতিক্ষমাণ ছিলাম
সক্রেটিস যেমন একটি আপেল হাতে
ভিখিরির মতো দাঁড়িয়ে কড়া নাড়িয়েছিলেন
কুমারী জানথিপির দরজায় একদিন…
—এথেন্সের বিমূর্ত আপেলটি, নোহ কা লিকাইয়ের রক্ত

কী অপূর্ব সৃষ্টি! মিথ ব্যবহারের পারঙ্গমতায় মাঝেমাঝে কবি হেলাল চৌধুরীকেই মিথ মনে হয়। তাঁর প্রতিটি কবিতায় যমক-অনুপ্রাস-রূপক-চিত্রকল্পের যথার্থ প্রয়োগ ও ব্যবহারে প্রতিটি শব্দ হয়ে উঠেছে অবিকল্প। প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘ইলার শিসে ভাঙে ঘুম’ থেকে সর্বশেষ প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘আসপাশিয়ার পানপাত্র’ গ্রন্থে প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি ও সমসাময়িক বিশ্বের নানান সমস্যা ও সম্ভাবনা নবতর শব্দে-ছন্দে কাব্যিক ভাষ্যে রূপায়িত হয়েছে। যাপিত জীবনে অনুভবের গভীরতা মেধাবী কবি হেলাল চৌধুরীর কাব্যযাত্রাকে দিয়েছে অনন্য মাত্রা।
কবির মানসপ্রতিমা ইলা, ইলাকে নিয়ে বিরহ-মিলনের ঐন্দ্রজালিক নস্টালজিয়ায় হেলাল নিমজ্জিত। ইলাকে নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক কবিতা। ইলা কে? অজন্তা-ইলোরার গুহাচিত্রের দেবী? কোনো ধ্রুপদী নায়িকা, নাকি কবির মানসপ্রতিমা? এ-প্রশ্নে পাঠক মনে তৈরি হয় বিভ্রম। ইলার সাথেই কবির যাবতীয় কথোপকথন, মানঅভিমান। কবির মনোজগতে ইলা আফিম সদৃশ। ইলার সাথে কবির সম্পর্ক কখনো প্রেমের, কখনো বিরহের নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত। মিথের বহুমাত্রিক ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত কবির মানসপ্রতিমা ইলা আশা-নিরাশায়, সংকট-সম্ভাবনায় কখনো মেঘ, কখনো রোদ্দুর, কখনো বৃষ্টি, কখনো গ্রীষ্মের তীব্র তাপদাহ।
কবির প্রথম ও শেষ কাব্যগ্রন্থের দুটি কবিতার কয়েকটি পঙক্তি এরকম :
আজ এভাবেই কেটে যাচ্ছে ইলা
হেঁটে হেঁটে পায়ে পায়ে দুজনে দুজনার অনুসন্ধান
তোমার-আমার পাঁচ কোটি আলোকবর্ষ বিরহের হিসাব
—চলো চলো আরোহনে চলো, ইলার শিসে ভাঙে ঘুম
গাঙচিল ডানায় লেগে আছে এখনো ভোরের হলুদ রোদ্দুর
ভুলভাল দুপুর শ্রমিকের ঘাম, তাহাদের প্রেম সুফলা
খেতখামার পুঁইয়ের মাচা, একজোড়া নিশ্চুপ মাছরাঙা ঠোঁট।
—মনচিলে মনদীপ, আসপাশিয়ার পানপাত্র
কবি হেলাল চৌধুরীকে যাপনকালের অনুভবকে বিমূর্ত শিল্পভাবনায় রূপায়িত করার যাত্রায় আলেকজান্দ্রিয়ান স্যালুট।
. . .

সংযুক্তি : ‘আলেকছিটা’ ও অন্যান্য
[মিথরঞ্জিত কবি হেলাল চৌধুরীর একগুচ্ছ ‘অন্য রসের’ কবিতা]
গৃহস্পতি
টার্মিনালে আজ দেখলাম একদার গৃহস্পতি-এক
ঘুরছেন, থুত্থুড়ে বৃদ্ধ যেন প্রাচীন বৃক্ষ আমাদের চেনা সেই
বনস্পতি, ডান ডালে তার ভিক্ষের থলি; কতকাল না-চাঁছা
গোঁফ-দাড়ি, তারা ঢেকে নিয়েছে আজ তার হাসির বাড়ি…
বছর তিনেক হলো স্টেশনই না-কি তার বসতবাড়ি
রাস্তার পাশে কল চেপে জুড়ান তেষ্টা, বাবনা হোটেলে
যেয়ে কুড়ান তিনবেলা উচ্ছিষ্ট; এই তো চলছে পিঁপড়ের
সংসার দৈনিক পাঠ, বললেন তিনি বুলিয়ে গাল ও দাড়ি…
কচকচে মোটামুটি মূল্যমানের এক দামি-নোট
খসখসে হাতে ধরে দিলে, খুশিতে
হাসলেন তিনি কতগুলো ফোকলা দাঁত বের করে
ঝুলিতে রাখলেন তারে সাদরে, তারপর হাঁটলেন বাটে
বারবার ফিরে চান পেছনে সেই বনস্পতি
একদিন সংসার উঠোনে ছিলেন যিনি যেন বৃহস্পতি;
তারপর পাতাহীন নিডালি ডানাহীন সেই বৃক্ষ, ধীরে
ধীরে জনমানুষের ভীড়ে ফিরলেন তার দৈনিক পাঠে।
. . .
আমার যত দুঃখ, বুঝি তুমি
আমার যত দুঃখ, বুঝি নদী
খরায় জরার জল, ঘাটে চিতশোয়া ডিঙি
মাছেদের ভুলে যাওয়া বেমালুম সাঁতার
কাঁখে ঘড়া গাঁয়ের বধূ ঘাটের মায়া হিজল বৃক্ষ, নিশ্চুপ…
আমার যত দুঃখ, বুঝি বৃক্ষ
জরায় মরা পাতায় ঝরা খরার শরীর
খড়কুটো ঠোঁটে দোকলা দোয়েলের অনিশ্চিত নীড়
দুঃখসুখ কান্নাহাসি চারপংক্তি ওষ্ঠাধরে কবিতা অনুষ্টুপ…
আমার যত দুঃখ, বুঝি তুমি
কষ্টকরচ যক্ষনারী, বৃষ্টি চেয়ে খরার নদী
চায় বৃষ্টিবৃক্ষ, তার লতা এবং সবুজ পাতা
দেহ ও ক্ষীরে বেসাতি চায়, তার চিকনঋজু দীর্ঘকায়;
তবুও নদী আজ অবধি যৌবন চেয়ে পক্ষকাল শত
চায় বৃক্ষপুরুষ, অন্ধকারে অবিরত
জলে ও মূলে বৃষ্টি ও বৃক্ষ মিলে মনের সহবাসে
চায় দুঃখ দুইজীবন, পাতা আর জলে কুল্লা হাওয়ায়।
. . .
আলেকছিটা
তুমি আমারই ভিটায় লুকিয়ে — কাল থেকে কাল
অথচ পাই না তো দেখা তোমার, আমি বহুকাল
বাহিরে আমি তোমাকেই শুধু খুঁজিয়া বেড়াই
তাই, তোমার সঙ্গে আমার বিরহে কাটে চিরকাল…
ডাহুকা তোমার দেহ, তার ঠোঁটের নদী — চোখের ভিটায় পর্বত সচল; অলকের চুম্বন, চিবুকের তিল হিজলের ফুল, খোঁপার বন্ধন ডালিয়াস্তন, নাকে হলুদ মাংসের পিরামিড।
তোমারে দেখি না তো আমি কোনওদিনও। তবু তুমি ঘুমাও আমার ডাহুকা নদীর দেশে।
তােমার গতরে বয়ে যায় হেমন্তের হাওয়া, শসা আর বাখরের ঘ্রাণ ধানের হলুদ রঙ; সোনার ঠোঁটে শালিকের গান —ঠোঁটের কলতান পর্বতের অবিরল স্তব।
তুমি সেই কুয়াশার ধবল বক। ছুঁয়েছিল যে-জোছনায় একদিন ধোঁয়াশার অন্ধকার; ছেলেবেলার হলুদ নদীর জলের কলতান সেখানে নেমে আসে বুঝি আজ ঘনঘোর মারির চিল।
তুমি তাই ফিরে এসো সন্ধ্যার বক হয়ে গোধূলিমাখা এই নির্জন মাঠ ছুঁয়ে। ফিরে এসো রাত্রির ভোর কুয়াশায় গোপাটে; আঁধারে জোছনায় ভাসুক আমাদের দুজনের খাড়ুবিল হাড়জল।
জলেই জন্ম — জলেই তোমার মৃত্যু; সাগরবেলায় তুমি সেই লবণ এক বিন্দু; আসমান তোমার ডাহুকা নদীর পইঠা। সেখানে রেখে যাব আমি একফোঁটা শ্বেতবর্ণ মৃত্যু — তোমার আলেকছিটা।
. . .

জুয়েলারি
দেশ ছিল, একদা আমার এক দেশ ছিল
সবুজ রোয়ায় সে বেশ ছিল
কখনও তাতে সোনালি রোদের রেশ ছিল
বুকে, হীরা আর সোনা ভরা
দোকানদারি ছাড়া
গহনার জুয়েলারি আমার এক দেশ ছিল…
পাহাড়ি মেয়ে — বন্যার ওড়নায়
মখা আর দাঁড়কিনার
পুঁটি আর ট্যাংরার
পাল ছিল, ফাল ছিল — বর্ষায় কুতুব চাচার বিলটায়;
শিং মাগুর আর কই ও খইয়ার
ছিল অবাধ ছোটাছুটি
আর ছিল তাদের খুনসুটি গুঁতাগুঁতি
কাদামাটি ঘ্রাণে আমার ‘তবেকার’ ময়নার ঝিলটায়।
মাষকলাইয়ের খেত ছিল
ছিল, ডোবা ভরা ভেটফুল
আমার হাড় — নরসিংদার উঠোনে
বুলবুলি টেকোইয়ের নাচ ছিল
ডুপি আর দইয়লের গান ছিল
দোল ছিল, কাকাতুয়ার ঝোঁটনে।
পাল পাল হাঁসের, বুকে বুকে
জলে ও পুকুরে হাঁটা ছিল
ছিল, দলে দলে বর্ষার কালে
দুপুরে নদীর মুকুরে সারাবেলা আমার সাঁতরানো;
গামছায় মাছধরা
গাছে চড়া আমপাড়া
ডানপিটে দিন ছিল
আর মিটমিট আলো দেখে
পাঠ ছেড়ে জোনাকির পিছে পিছে
ছিল, ঘন অন্ধকারে সায়াহ্নে আমার হাতড়ানো।
বর্ষায় ছোটো ছোটো উঁকি মারা
ঢেউ তোলা নদীর জলে স্তন ছিল
ছিল, মায়াভরা হিঙাইর চোরকাঁটায় নিবিড় জলাশয়
টিলার ভাঁজে ভাঁজে সুনসান উপত্যকা
মেদহীন তার মালভূমি বস্তি শীতলক্ষ্যা
ছিল তার গুহাঘর ইলোরার প্রাসাদচিত্রে বৈচিত্র্যময়!
তার ঝিনুকের বুক ছিল
তাতে চেরাপুঞ্জির সুখ ছিল
বেশ ছিল বেশ ছিল
কবেকার আমার ‘তবেকার’ দেশটা
মাঠ ভরা ধান ছিল, ছিল আরও
সরিষার ফুলে ফুলে রোদে রাঙা হলুদের রেশটা
ছিল, জুয়েলারি ‘আপণ’
চোখ ধাঁধানো
মন মাতানো
হাড় কাঁপানো
ধনুক-বুক, চিকন
কোমরছোঁয়া কেশ দেবদারুতনু ইলারূপী দেশটা।
. . .

নিষিদ্ধ শহর
এইখানে এক শহর ছিল। শহরের গায়ে খোলা খোলা যত জানলা ছিল। জানলার ফ্রেমে হীরের কাচে তার অজস্র সূর্য ছিল
সূর্যদের বুকে হলুদনীল আলোভরা ঝলমল নাচুনি ঝুমকাের মালা ছিল। আলোদের গায়ে অজস্র, অজস্র রোদে ভরা দিন ছিল
রোদেদের চোখে লালনীল দীপাবলি — শহরভানুর মখমল বুক ছিল
সেই শহরের দীপাবলিরা আজ ধপ করে নিভে গেল। তাদের গায়ে দেখি আজ কালো কালো আলখাল্লা। কালো কালো রঙের উদ্ভট রেশমিকাসবিতা;
দেখি সেই বীভৎস
সবিতাদের গায়, আজ কালো কালো কুৎসিত শহর হেঁটে যায়।
অথচ তোমার শহরে একদিন এক ভরা নদী ছিল। সেই নদীর গায়ে মাঝে মাঝে পোনা মাছের ঝাঁক সাঁতরিয়ে বেড়াতো। তারা নদীকে সময়ে অসময়ে বড়ো বেশি জ্বালাতন করত। তোমার সেই ভরা নদী আজ দেখি মরা। এই নদীর জলে নামে না তো আজ তোমার সোনা সোনা মাছের ঝাঁক… ভাবের পোনা।
তোমার শহরে ছিল একদিন সুরমা। চান্নিঘাট। গৈগেরাম। মেঠোপথ। মেটোপথ। গোপাট। ফুটপাত। বটের ছায়া। হিজলের মায়া। করচের কায়া। মাদারের ফুল-পাতা-ডাল। ছিল পুঁইয়ের গোটা রক্তলাল…
হাওর বাওর। কুড়ুল্লা হাওয়া। বতোরের দিন। বৃষ্টির গান। ফসলের গীত।
সেই শহরে তােমার, ছিল দুদ্দুর গলি। ক্ষ্যাপুপাড়া। পাঞ্জু দিঘি। ভোলাইর ঝিল। শীতলহাট্টা। মনিরুদ্দি লেন। মতিজান চত্বর।
ছিল ছিমছাম মায়াঘেরা শনের ঘর
টুল্লিতে যার চড়ুইয়ের সমাজের কিচিমিচির গান
আমের শাখে কোকিলের কুহুতান
বাড়ির সিথানে ধানখেতের আল, সেখানে জলপরীদের কলতান…
আজ তোমার সেই শহরে দেখি অলিগলি লেন
পাকাদালান ইট সুড়কি সিমেন্টে — কঠিন ভণ্ডতর প্রণয় ও ফ্যান
তোমার শহরের সড়ক থেকে সরে গেছে
বুঝি, মখমল মাটি ও তার সোঁদা ঘ্রাণ…
আজ
তোমার শহরে বসে হামেশা ভণ্ডরা টানছে গাঁজার কল্কে
তোমার লেবাস গায়ে, হাঁটছে তারা আজ ঠমকে ঠমকে
তোমার সেই শহরে
আবার ফিরে এসেছে — বুঝি উজল শাহ ও তার দলবল…
অথচ
তোমার শহরের আয়না মহলে
দেখে নিয়েছিলেন
লেনিনও একদিন
নিজেকে…
দেখেছেন
মানুষের
সাম্য
ও
মুক্তির সরল মখমল সড়কের নরম উজ্জ্বল আব…
জাত ধর্ম বর্ণ কুল লিঙ্গ — তুড়ি মেরে সরিয়ে দিয়ে তুমি একদিন ছড়িয়ে
দিয়ে গেছিলে আমাদেরে এক অনাদি অনন্ত শহর
সেই শহরে
বাতাসে ও বাতাসে
ছিল মাটির সোঁদা ঘ্রাণ। হলুদ রঙের নদী। সোনালি ধানখেত
বুকে নিয়ে জলের পাহাড় গাথক সাগর, স্নাতক নাগর।
তোমার শহর জানিয়ে দিয়ে গেছে
মানুষই পরম সত্য
মানুষই পরম নিত্য
মানুষই পরম গুরু
মানুষই পরম অন্বিষ্ট
মানুষই পরম ঈশ্বর…
আমি আজও খুঁজি তোমার শহরের মতো ঈশ্বর অনাদি
মনের মানুষ
অচিন পাখি
সোনার মানুষ
ভাবের নদী
অধর মানুষ
আরশি নগর
পড়শি স্বজন
আপন ঘর
আয়না মহল
আল্লার স্বরূপ…
তোমার শহর ছিল না সনাতন। ছিল না তো মুসলিম
ছিল না বাহাই, ইহুদি কি খ্রিস্টান
আকাশ ছিল না — শহরগুলো তোমার; ছিল মৃন্ময়ী নারী ও মাটির তনু; ঈশ্বর ছিলে না তুমি। ছিলে অসামান্য মানুষ — ফসলি ভূমি।
আমি আজও মানি, ছিলে আগুনের মতো এক শহর তুমি
আগুনের পর্বত চিরন্তন সক্রিয় এখনও তুমি সাকুরাজিমা
এক অনাদ্যন্ত দর্শন আগুনের শহর তুমি ফুজিয়ামা
সেইখানে ভরা… চিরবিস্ময়… উৎলার বুকের অজস্র বুদবুদ!
আজ তুমি একবার এসে দেখে যাও
হে অনন্ত চিরসবুজ শহর
দেখে যাও আজ তোমার শহরের অলিগলি ঘুপচি ও লেন;
তোমার সেই শহরে
পাকাদালান ইট সুড়কি সিমেন্টে — কঠিন ভণ্ডতর প্রণয় ও ফ্যান
টানিতেছে নিশিদিন অহিফেন;
অকালে জরাজীর্ণ… আজ তারা অজস্র বৃদ্ধ শহর বুঝি তোমার।
তোমার শহরের মঞ্চে নাচে আজ অজস্র উজল শাহ
তার সঙ্গে নাচে কত কল্কে ও বিষ
অথচ, তুমি বলে গেছ
শুয়ে আছে যুগযুগ ধরে মানুষেরই শহরে সোনার ঈশ…
একবার এসে
তুমি দেখে যাও শহর। তোমার শহর আজ এক নিষিদ্ধ শহর সে।
. . .

লেখক পরিচয় : পলাশ মুৎসুদ্দী
চাটগাঁর রাউজানে জন্ম ও বেড়ে ওঠা পলাশ মুৎসুদ্দী রাঙামাটি কর্ণফুলি সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঙলা সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন। ছাত্রত্ব শেষে অধ্যাপনাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। কলেজে পাঠদানের পাশাপাশি কবিতা ও গদ্য লিখেন নিয়মিত। প্রচারবিমুখ এই নিভৃতচারী নয়ের দশক থেকে লেখালেখিতে সক্রিয়। চাটগাঁ ও দেশের অন্যান্য শহর থেকে প্রকাশিত ছোটকাগজে নিয়মিত লিখছেন। এখনো। কবিতা ও কথাসাহিত্য পাঠে তাঁর সজাগ পাঠমনন ধরা পড়ে আলোচনায়। কোনো বই বের হয়নি, তবে বেরেুনোর অপেক্ষায় রয়েছে।
. . .

লেখক পরিচয় : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপ দিন
. . .


