তোমাদের সন্ধ্যাগুলি অনুভবে
আসে বুঝি বিকেলের লাল ঘোড়াতে চড়ে
তোমাদের সন্ধ্যা শুধুই অনুভবে
আসে বুঝি বিকেলের লাল ঘোড়াতে চড়ে
এমন তাড়া কীসের একলা ক্যাম্পে
কোথায় ফিরবে কোন দৃশ্যের অনুকূলে
ভুলে গেছি কী রকম তোমাদের নগর জীবন
এখানে রয়েছে শুধুই নীল নির্বাসন।
নীল নির্বাসন : কথা ও সুর : হর্ষ দাশগুপ্ত; প্রথম প্রকাশ : ১৯৮৫; অ্যালবাম : আমরা গান গাই যে সুরে; শিল্পী : নগর ফিলোমেল (ইন্দ্রজিৎ সেন, ইন্দ্রনীল সেন, প্রবুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়)

হর্ষ দাশগুপ্তর কথায় এটা ছিল নগর ফিলোমেল’র গান। নগর ফিলোমেল। গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ব্যান্ড। প্রথম যুগের বাংলা ব্যান্ড। মহীনের ঘোড়াগুলির অনুষঙ্গে এই এক ব্যান্ড।
আমার প্রেসিডেন্সি ক্যান্টিন বলতেই এই গানটা মনে পড়ে। কালো ডায়েরিতে যে-গানের খাতাটা, যেটা সত্যিই হারিয়ে গিয়েছে, তাইতে ছিল এ-গান লেখা।
কলেজ জীবন। বলগাহীন অশ্বের মত টগবগে দিনকাল আসলে। ১৯৮৪-৮৭। বি এ। দর্শনের অনার্স। তারপর এম এ। যা আমাকে তৈরি করেছে। ভবিষ্যৎ জীবনপথের অনেকটাই কি প্রেসিডেন্সি কলেজের ওই তিন প্লাস দুই বছরের অবদান না? সেইসময়ে প্রতি মুহূর্তে উত্তেজনা, কিছু নতুন ঘটনা, অঘটন, অনিশ্চিতির চোরাটান।
১৯৮৪ সালে আমার ফার্স্ট ইয়ার। সে-বছরই ইন্দিরা গান্ধির হত্যা। ১৯৮৪ আবার ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডিরও বছর। তখন তো কলেজক্যান্টিনে আমরা টেবিল বাজাই। বাড়িতে বুশ বা ফিলিপের টেপ্রেকর্ডার! ক্যাসেট জড়িয়ে যায় সদ্য তরুণীর পায়ে পায়ে যেমন অনভ্যাসের শাড়ি! পেন্সিল দিয়ে বাঁদিক ডানদিক প্যাঁচ ঘুরিয়ে টাইট দিই। আর অজস্র গান শুনি।
ক্যান্টিনে পাঁচজন চাঁদা তুলে একটা চপ ভাগ করে খাওয়া, দেদার আড্ডা, তা বাদে গানই হত বেশি। কবিতা ত হতই। মিত্র বাবুমশাই থেকে শুরু করে আরো কত লেখা ওখানেই পড়া, শোনা। তবে গানের ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগে। এখনো কিছু কিছু গান শুনে এক একটা সময় মনে পড়ে,—টাটকাভাবে। গন্ধ আর তার পরেই শব্দ। স্মৃতি উদবোধক। ঐ-যে কলেজ স্ট্রিটে ঘোরাফেরার মাত্র তিন বা পাঁচ বছরের সময়টাতে শোনা অগণ্য গান… তার প্রতিটাই কিন্তু আইকন এখন। আর সেইসব গানের সুর দূর থেকে ভেসে এলেও মনে মনে প্রেসি ক্যান্টিনে ফিরে যাই :
ছায়াঘেরা আঁকাবাঁকা পথে
ফেলে এসে ঝাউবন বালিয়াড়ি,
এগিয়ে চলি পায়ে পায়ে
চোখের তারায় নিয়ে অনেক হাসি।
আমি চাই যে যেতে দূরে
ওই যে আকাশ হাতছানি দেয়,
নিত্য নতুন সুরে।
—ছায়াঘেরা আঁকাবাঁকা পথে : মহীনের ঘোড়াগুলি

গান দুধরণের। ইংগ আর বংগ। যেমন ছাত্রেরাও দু ধরণের। ট্যাঁশ আর বং।
অদ্ভুত সব ভাগাভাগি তখন। জীবনটাই তখন ডুয়ালিজম বা দ্বি-তত্ত্বের। উত্তর কলকাতা বনাম দক্ষিণ কলকাতা একটা ভাগ যেমন। আমাদের অনেক উত্তর কলকাতার সহপাঠিনী, বিশেষত যারা আর্টস পড়ত, ফিলজফি বাংলা ইতিহাসের… পটাপট বিয়ে করে নিচ্ছে তারা তাড়াতাড়ি। অধিক রক্ষণশীল পরিবারের তারা। তাদের বিয়ের খাওয়া সাঁটাব বলে দক্ষিণ থেকে উত্তরের অভিমুখে আমরা প্রায়ই ধাবিত হচ্ছি প্রচণ্ডভাবে। বর বউ বা তাদের বাড়ির লোকেরও আগে বিয়েবাড়ির ভেনিউতে পৌঁছে যাচ্ছি। তায় আবার মা-মাসি-পিসির থেকে ধার করা সিল্ক শাড়ি পরে। আর গিয়ে দেখছি ভাড়া করা বিয়েবাড়িতে কেউ নেই ! খিদে পেয়ে গেছে ঘণ্টা তিনেক সাজগোজ করে, এত পথ এসে। তাই কাছের রেস্তোরাঁয় বসে চাইনিজ খাচ্ছি… স্যুপ! তখন জীবনের উন্নততম খাওয়ার সাধ চাইনিজ দিয়েই মিটতে শুরু করেছে। প্রসঙ্গত সকলে এ ওর ঘাড় ভেঙে খাওয়া বলতেও বুঝতাম চিনেপট্টির সস্তা রেস্তোরাঁ ফুক চং-এ গিয়ে চাইনিজ খাওয়াই।
খাওয়া তখন মোক্ষ। ঐসব করেও আবার বিয়েবাড়ি গিয়ে কীভাবে যেন দুটো মাছের ফ্রাইসহ কড়াইশুঁটির কচুরি আলুর দম ও অল্প একটু পোলাও বা বিরিয়ানিও সাঁটাচ্ছি। তারপর সেই বিয়ে হওয়া বান্ধবীরা কলেজে এসে ডিটেইলসে গল্প করছে তাদের ফুলশয্যা ও বাকি যাবতীয়র। খাটের পায়া ভেঙে যাওয়ার ডিটেইলস শুদ্ধু। সব মাথা এক জায়গায় করে সেইসব গল্প শুনছি, হা হা করে হাসছি ও ভুলেও যাচ্ছি পরক্ষণে। শুধু কিছু অসভ্য জোকস হয়ে যাচ্ছে তৈরি—অনন্ত ভাণ্ডার তৈরি হচ্ছে সেইসব জোকস-এর।
স্বাভাবিকভাবেই গ্রুপ গড়ত, ভাঙত। আর, ডারউইনীয় উদ্বর্তনের মতো আমি, আমরা খোলসের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতাম ধীরে ধীরে। সমাজ তৈরি হতো চারিপাশে। বন্ধুদের বলয়। বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা সমেত। কত অনায়াসে তখন অপছন্দের কোনো পুরুষ সহপাঠীকে ‘কাটিয়ে’ দেওয়া হতো, উপেক্ষা করা হতো। আবার কেউ কেউ স্টকও করত। তবু কত অনায়াসে আমরা বন্ধুদের মধ্যে রংদার, স্মার্ট, চমকপ্রদ ও হ্যাঁ ‘সমমনস্ক’দের বেছে নিতাম।
কেউ কেউ আবার লাজুক থাকত চিরকাল। মুখ ফুটে বলতে পারত না প্রেমের কথা,—বছরের পর বছর। ফেসবুক ছিল না বলে লাভ সাইনও-তো ছিল না। তবু ঠিক প্রেমিকরা প্রেমিকারা চলে যেত কলেজের পেছনের জলের ট্যাংকের কাছে যে-জায়গাটাকে আমরা ডাকতাম ডিরোজিওর কবর। আশির দশকে তুঙ্গে উঠেছে ড্রাগ অ্যাবিউজ, এবং কিছু ছেলেপিলেকে ওখানে ড্রাগ নিতেও দেখা যেত। আগে পরে কখনো সেই খবর হয়েছে, যে, পুলিশ পাকড়াও করেছে ওইখান থেকেই কোনো ড্রাগ পেডলারকে।
আমি প্রেম করতাম না যতদিন, প্রচণ্ড আওয়াজ দিয়ে চলতাম যারা প্রেম করে তাদের। এদিকে আমাদের বন্ধুদের সকলের মধ্যে তখন অনিবার্যভাবে গিসগিস করছে প্রেম বা প্রেমের সম্ভাবনা। এক দুজন স্কুল লাইফ থেকে স্টেডি বয়ফ্রেন্ড সম্পন্ন, যাদের আমরা বাকিরা গোপনে ঈর্ষা করি প্রচণ্ড। একটা পয়েন্টে ওরা এগিয়ে থাকা। বাকিরা, বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট, বিভিন্ন ইয়ারের মধ্যে, বন্ধুত্ব ও তৎপরবর্তী এ ওর প্রেমে পড়ে যাওয়া খুব সহজ।
তারই অনুঘটক হিসেবে এসে গেল একটি ফিল্ম ক্লাব। প্রতি শনিবার ত্রুফো, গোদার । তারপর একটা বড়োসড়ো ইভেন্ট,—বার্গম্যান রেট্রোস্পেক্টিভ। অপর্ণা সেন পর্যন্ত দেখতে এসেছিলেন। তাঁকে কে বসাবে তা নিয়ে হুড়োহুড়ি। গোটা ব্যাপারটার আয়োজনেই যারা, তারাই আবার অতিনিকট ব্যক্তি অতিবাম স্টুডেন্টস ইউনিয়নের । স্টুডেন্টস ইউনিয়নের পাণ্ডা যারা তারা থার্ড ইয়ার, আমরা ফার্স্ট ইয়ার, কাজেই দু ব্যাচের তফাত। তাইতে যেন সম্ভাব্য প্রেমিকের তালিকাটা ফনফনিয়ে উঠল আমাদের পক্ষে। এবং আমাদের ইয়ার দোস্ত হয়ে গেল জি-সেক পার্থদা, ভয়ানক হাত পা ছুঁড়ে মুখে ফেনা তুলে গরম রাজনৈতিক বক্তৃতা দেওয়া সুমিতদা, ফিল্ম বাফ অভিজিৎদা, আঁকিয়ে গুপিদারা। তারপর পোস্টার আঁকাকে ঘিরে প্রেম, ফিল্মের টিকিট বিক্রি নিয়ে প্রেম… এই মিটিং ঐ মিটিংয়ের জন্য সন্ধে অব্দি কলেজে আড্ডা, এবং প্রেম।

প্রতি কলেজে তখন বাৎসরিক ফেস্ট হত। হয়ত এখনো হয়। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। সে-সময়ের কলেজের ফেস্টিভালগুলো এক একটা প্রেমের বীজতলা। বীজকুড়ি বীজকুড়ি হয়ে প্রেম গজাচ্ছে আমাদের। পারমুটেশন কম্বিনেশনে প্রেম হচ্ছে, দ্রষ্টব্য পরশুরামের প্রেমচক্রের সেই হারীত-জারীত-লারীত বা লপিতা-শমিতা কেস। অবধারিত প্রেমে পড়া, প্রেম ভাঙা, হৃদয় বিদারণ… একই ছেলের প্রেমে দুজনে পড়া বা একই মেয়ের দুই ছেলেকে ইকুয়ালি নাচানোর ব্যালান্সিং অ্যাক্ট। এই সময়টাই চিরবসন্তের। দ্রিঘাংচু নামে একটা ফেস্টিভাল হয়েছিল। সালটা ১৯৮৪, আমার ফার্স্ট ইয়ারের শেষদিক হবে। আমার ঠাকুর্দা দেহ রাখলেন, তার পর পর, এই কারণে মনে পড়ছে-যে, আমি সেদিনও দ্রিঘাংচুর ফেস্টিভালের শেষ দিনের হৈহৈ থেকে ফিরতে পারছি না বাড়ি। মাংসের ঝোল খাব না, বাড়িতে অশৌচ, এইসব তা না না না করছি। ধানাইপানাই ভুলে কে যেন বলল :
আরে যশো, মাংস খাস না, ঝোল আর আলুটা খেয়ে নে। হেব্বি হয়েছে।
কোকের বোতল ঝাঁকিয়ে শ্যাম্পেনের মত ছিপি খুলে ফেনা ছড়াচ্ছে কেউ। ‘ক্যাওড়ামি’ শব্দটা তখন খুব চলছে। রুবিকে দেখলেই কে যেন হেঁড়ে গলায় গেয়ে উঠছে, মনে পড়ে রুবি রায়! আমি সে-সময়ে যেতাম যে-কোনো অন্য কোনো কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বা ফেস্টে। ‘ক্রিয়েটিভ রাইটিং’ ইভেন্টটা লালমোহনীয় স্টাইলে, ‘ওটা আমার!’ ইংরেজিয়ানা সেখানেও বেশি। তাও বাংলা লিখে আসতাম দু কলম। এ সুযোগ ছাড়ে কে!
মেরুকরণের আরেকটা ছিল ট্যাঁশ ও বং দুই প্রান্ত। অ্যান্ড দ্য টোয়েন শ্যাল নেভার মিট। এই ক্ষেত্রে ইংলিশ মিডিয়ামের ছেলেমেয়েরা ট্যাঁশ। সেন্ট মেরি সেন্ট জেভিয়ার্স লা মার্টস ডন বস্কোরা একদিকে। আর আমরা যারা বাংলা মিডিয়াম,—আমরা বং। বাগবাজার মাল্টিপারপাস আলিপুর মাল্টিপারপাসদের এক সেকেন্ডে ভাব হয়। মধ্যে আছে পাঠভবন আর সাউথ পয়েন্টের অত্যন্ত স্মার্ট ছেলেমেয়ের দল। ওরাই বোধহয় আশি শতাংশ আড্ডার কেন্দ্রীয় চরিত্র।
১৯৮৫ সালে, অবধারিতভাবে ক্যান্টিনের টেবিলে ট্যাঁশেদের টেবিল থেকে ভেসে আসছে জন ডেনভারের গান। আজো, কান্ট্রি রোড শুনলেই আমার কলেজের ক্যান্টিন মনে পড়ে। আর জোন বায়েজের গলায়,—ফরেভার ইয়াং।
বাংলাভাষী টেবিলে তখন ইফফাত আরা খানের পুরাতনি, রবীন্দ্র সংগীত। গাইছে বুবাই, যে-নাকি প্রেসিডেন্সিতে আমাদের পরের ব্যাচে ভর্তি হয়ে আবার বছরখানেকের মধ্যেই ইঞ্জিনিয়ারিং ক্লিয়ার করে আই আই টি চলে যাবে। রেখে যাবে তুমুল সব গানবাজনার স্মৃতি।
কিন্তু মেলালেন তিনি মেলালেন। আমাদেরই প্রজন্ম দেখেছে গৌতম চট্টোপাধ্যায়কে। মহীনের ঘোড়াগুলি। বইমেলার মাঠে গৌতমের নিজের গলায় ‘পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে’ শুনতে পাওয়ার দুর্লভ সৌভাগ্য আছে আমার। আমাদের প্রজন্মের জুটেছে ইংরেজি গানের আবহে বাংলা গান তৈরির প্রথম উদাহরণ।
ক্লাস নাইন টেনে থাকতে অজানা উড়ন্ত বস্তুর ছোট ইপি রেকর্ড এসে গেছে হাতে। আর কলেজে এসেছে অমিত চৌধুরীর মতো ছাত্র, যার বিশিষ্ট পরিচয়, পরমা মুখোপাধ্যায়-ইন্দ্রনীল সেনদের সঙ্গে একসঙ্গে ব্যান্ডের গান গায় সে। বলাইবাহুল্য সাউথ পয়েন্টিয়ান। তাই ইস্ট ওয়েস্টের মিলন ক্ষেত্র। ফলত ক্যান্টিনে হৃদয় ধুয়ে গেছে ওদের টেবিল বাজিয়ে গানে, সেসব লিরিক একটা ছোট্ট কালো ডায়েরিতে লেখা। কলেজি সময়ের কবিতা ও গানের লিরিকের এমন এক একটি খাতা সবার থাকত। সেই গানটা :
এখানে রয়েছে শুধুই নীল নির্বাসন। ভুলে গেছি কীরকম তোমাদের নগরজীবন!
নীল হয়ে আসা সন্ধের মুখে বাসে করে বাড়ি ফিরতে হবে। কিন্তু ফিরছি না। অনেক রাত করে ফিরে বাড়িতে গুল মারছি। বলছি জ্যামে আটকেছিলাম।
. . .
. . .
লেখক পরিচয় : যশোধরা রায়চৌধুরী

যশোধরা রায়চৌধুরী কলকাতার মেয়ে। মধ্য ষাটের দশকে নগর কলকাতায় তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা ও সেখানে যাপন নিরবধি। আলীপুর বহুমুখী বালিকা বিদ্যালয়ে পড়ালেখায় হাতেখড়ি। লেডি ব্র্যাবোন কলেজে উচ্চ-মাধ্যমিক ও প্রেসিডেন্সি কলেজে দর্শনশাস্ত্রের ছাত্রী ছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে এম এ করেন অতঃপর।
কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপদস্থ অধিকারিক এই কবি ও গদ্যকার বাংলাভাষী সাহিত্যমহলে সুপরিচিত। ওপার বাংলার ছোটকাগজে লেখকজীবনের গোড়া থেকে সক্রিয় থেকেছেন। কবি ও গদ্যকার পরিচয়ে পাঠকমহলে অধিক সমাদৃত যশোধরা রায়চৌধুরীর লেখালেখির পরিধি বহুমাত্রিক। গল্প, উপন্যাস এবং অনুবাদেও সমান মেধাদীপ্ত।
নব্বই দশকের মাঝামাঝি পণ্যসংহিতা শিরোনামে গল্পবই ছিল প্রথম প্রকাশনা। পাঠ-সমাদৃত ছোটকাগজ ‘কবিতা পাক্ষিক’ বইটি প্রকাশ করেন তখন। প্রথম প্রকাশনার বছর দুই পর ‘কবিতা পাক্ষিক’ থেকেই বের হয় প্রথম কবিতাবই পিশাচিনীকাব্য। নয়ের দশকে উভয় বঙ্গে বাংলা কবিতা লেখার ভাষা ও প্রকরণে যেসব বাঁকবদল চলছিল, যশোধরার মতে যেগুলো ‘রিস্কি’ সব খাদে পা রাখতে বাধ্য করছিল একজন কবিকে,—তো তিনি একে সাগ্রহে আলিঙ্গন করেছিলেন। কবিতা বিষয়ক এক আলাপে তাই বলছেন :

“…আমি নব্বইতে ভাষা নিয়ে যা-তা করায় বিশ্বাসী ছিলাম। তখন আমার একটা দীর্ঘ কবিতা ছাপা হয় রেডিওবিতান নামে, দেশ পত্রিকায়, সেটা পড়ে একজন পরিচিত রাগি যুবক, কবি নয়, পাঠক, সে বলেছিল, যশোধরা ওটা কী করেছে? বাল ছিঁড়েছে? এখন অবিশ্যি সরল সাদামাটা ভাষায় লিখলে উলটে শুনতে হয়, আপনার অন্য লেখাগুলো ভাল হয় এইসব রচনা রচনা মার্কা লেখা লিখবেন না।
তো, আমার ওইসময়ের ভাষার চয়ন খুব সচেতন। কারণ আমি জেনেবুঝেই ইংরিজি শব্দ বসাচ্ছি কবিতার গায়ে। একটা চোখা, তুখোড় ভাষাভঙ্গির জন্য, হাইলাইটিং করে ধারালো করে তুলতে কবিতাকে। যেমন সেক্রেটারি নামে একটা কবিতায় ছোট স্কার্ট পরা একটি মেয়ের কথা ছিল, সে বলছে, একটা ছেলে আমার দিকে বেশি মন দিচ্ছে, ‘বেশি জেদাজেদি করলে বলে দেব আমার আর ইন্টারেস্ট নেই’।
এই ইন্টারেস্ট শব্দটা ইচ্ছাকৃত। এটা দিয়ে আমি একটা প্রজন্মের মুখের ভাষাকে বোঝাতে চাইছি।… [উৎস : বাক পত্রিকা : যশোধরা রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার]
কবিতা বিষয়ক ভাবনা ও ভাষায় নিজেকে নিরীক্ষাধীন করে রাখা তাঁর ক্ষেত্রে সহজাত। পিশাচিনীকাব্য-এ এর সূত্রপাত পাঠক টের পেলেও, পরে তা অব্যাহত থেকেছে যথাবিহিত। সুনীল গাঙ্গুলীদের হাতে জন্ম নেওয়া ‘কৃত্তিবাস’ তখন তাঁর এই প্রথম প্রকাশনাকে সম্মানিত করেন পুরস্কারে। পিশাচিনীকাব্য-এ চারিয়ে তোলা ভাষা-নিরীক্ষা অব্যাহত থাকে কালক্রমে বেরুতে থাকা সব কবিতা ও কবিতা বিষয়ক গদ্যে। ‘পুনশ্চ পিশাচিনী’ কবিতাগুচ্ছের একটিতে যেমন কবি পরে লিখছেন :
তুই পিশাচিনী, তুই রাস্তা চলতে কোথায় পৌঁছাস
দুদিকে অন্তিম গান, হাহাকার, শহর-পোড়ানো
কালো, মন্দ ধোঁয়া, তুই মাঝখানে হাঁটিস, অধোমুখ—
তোরও তবে কোনওখানে যাবার রয়েছে? কষ্ট? হ্যাঁ কষ্টও রয়েছে অনেক
গাঢ় ভূত কষ্টগুলি সেসময়ে ঝুলে থাকত অন্তরে বাহিরে
খাটের ছপ্পরে থাকত নরমুণ্ড, কচি কচি অন্ধকার রাত
রাত্রিও ঝোলানো থাকত পাক হয়ে শুয়ে থাকা দীর্ঘ মনখারাপের পাশে,
কোলবালিশের কাছে শুয়ে থাকত ভারি মনস্তাপ
—পুনশ্চ পিশাচিনী : কবিতাগুচ্ছ; পরবাস-৫৩, ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

উদ্ধৃত কবিতায় যশোধরার ভাষা-প্রকৌশল তাঁর নিজভাষায় ‘সরল সাদামাটা’ হয়ে উঠেছে হয়তো, তবে নগরযাপন থেকে আহরিত অভিজ্ঞতা যেসব মনোবিভ্রম অনিবার্য করে,—এর প্রতিধ্বনি পিশাচিনীকাব্য-এ মুদ্রিত ভাষার মতো সমান জাগরুক এখানেও। যে-ভাষা ও বয়ানে কবি পিশাচিনীর সঙ্গে অতীত দশকসীমায় বাক্যালাপ করেছিলেন, পুনশ্চ পিশাচিনী তার থেকে দূরবর্তী হলেও দূরাতীতত নয় কোনোভাবে । পিশাচিনীকাব্য-এ পাঠক তখন পাঠ করেছেন এরকম কবিতা :
সে তার মাদুর পেতে শুয়েছিল। অচ্ছুৎ মাদুর
না আমি শোব না এত অচ্ছুৎ মাদুরে, এত কালো
ও ছেঁড়া, ও দীর্ঘস্থায়ী, ও নিঃসঙ্গতাজাত
তাপবিকিরণকারী দুর্বল মাদুরে।
আমার মাদুর হবে সাদা সাদা সাদা , তৃপ্তিময়ী।
এই নাও, হাড়ের মতন সাদা মাদুর তোমার।
এই নাও, পঙ্খের মতন শুদ্ধ মাদুর তোমার।
এই নাও, চতুর্ভুজের মত চারদিক সমান, সোজা, অকলঙ্ক মাদুর তোমার
এবার খুশি তো? কল্প? নাকি ফের ঘোর রাতে জেতে
‘কোথায় সাদা মাদুর?’ চিৎকারে জাগাবে শোয়া ঘর?
পিশাচিনী মহাসুখে তার চির অন্ধকার মাদুরে ঘুমাবে, শান্তিমত।
—পিশাচিনীকাব্য-৩
যশোধরা রায়চৌধুরীর কবিতাভাষা নগরযাপনকে অপ্রাকৃত যে-বাস্তবতায় নিক্ষেপ করে ও সেখান থেককে পুনরুদ্ধার করে একপ্রকার, এখন এই ভাষাশৈলীতে হয়তো প্রচ্ছন্নভাবে জেগে আছে পঞ্চাশ থেকে আশির দশকসীমায় বিবর্তিত বাংলা কবিতার কতিপয় দিকচিহ্ন। সুনীল-শক্তি পরবর্তী দশকসীমায় জয় গোস্বামী, রণজিৎ দাশ, মৃদুল দাশগুপ্তরা প্রাক নব্বইয়ে পা রাখার লগ্নে যে-কবিতাবয়ন ক্রমশ মূর্ত করছিলেন, যশোধরা একে প্রলম্বিত করেছেন নব্বই পরবর্তী দশকসীমায়।
কবিতা, গল্প, গদ্য মিলে পরপর ধারাবাহিক প্রকাশনাকে গড় করলে ভাষার ওপর নিজের দখলিসত্ব ধরে রাখা সময়সচেতন লেখককে পাঠক আবিষ্কার করে ও পাঠ করে বা তাঁকে পাঠ করে মুগ্ধতায়। নব্বই দশকের অন্তে প্রকাশিত চিরন্তন গল্প মালা ও রেডিওবিতান-এ নতুন পাঠ-আস্বাদ নিয়ে আসা যশোধরা রায়চৌধুরী যথারীতি নতুন ও সাবলীল থাকছেন নব্বই পরবর্তী দুই দশকের ধারাবাহিক প্রকাশনা আবার প্রথম থেকে পড়ো, মেয়েদের প্রজাতন্ত্র, কুরুক্ষেত্র অনলাইন, ভার্চুয়াল নবীন কিশোর, মাতৃভূমি বাম্পার, নিঝুম গ্রন্থ, জ্বর পরবর্তী, সিগ্রেট কিংবা করোনাদিনে প্রকাশিত পিরাসামুহা, বার্নিক-এর মতো বইয়ে।
গদ্য, কবিতা, ভাষান্তর মিলিয়ে তাঁর রচনাসংখ্যা অনেক। তার মধ্যে আলাদা করে অনুবাদের কথা তুলতে হয়। ফরাসি ভাষা থেকে সরাসরি অনুবাদ করেছেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, রোগ ও তার প্রতিকার এবং বস্কেট ববিন বুরিন এর কবিতার মতো ব্যতিক্রম সৃষ্টিসমূহ।

যশোধরা রায়চৌধুরীর গদ্যের রয়েছে নিজস্ব আমেজ তৈরির সক্ষমতা। এই গদ্য সহজ স্রোতের মতো পাঠচেতনায় দখল নেয়। হ্রস্ব বাক্যজালে তিনি সেই ভাষা লেখায় চারিয়ে তোলার চেষ্টা করেন যা পড়তে সাবলীল এবং সময়-যাপনের মানচিত্রকে হৃদয়ে রাখে জাগরুক। পাঠককে চেষ্টাকৃত ভাবিয়ে তোলার জন্য লেখেন না যশোধরা; কিন্তু তাঁর গদ্যে প্রবাহিত ব্যঞ্জনা ভাবায় ঠিকই।
বক্ষ্যমাণ স্মৃতিচারণায় যেমন অনায়াস এক কালপর্বকে যাপনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। নগর কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিসীমা আশির দশকসীমায় যেমন ছিল, এর প্রতিবিম্ব যেন সহজচালে লেখা গদ্যে ধরেছেন যশোধরা।
গদ্যটির জন্য গ্রন্থী সম্পাদক কবি শামীম শাহানের ঋণ স্বীকার করছে থার্ড লেন স্পেস। গান বিষয়ক সংখ্যার জন্য লেখাটি যশোধরা তাঁকে পাঠিয়েছিলেন বটে। দুর্ঘটনাবশত সংখ্যাটি আর বেরোয়নি, হয়তো বেরুবে কোনো একদিন। আপাতত তিন পর্বে থার্ড লেন স্পেস-এর অনলাইন পরিসরে ধরা থাকছে যশোধরার বয়ানে গানযাপনের স্মৃতিকাতর এক কালপর্বের খুটিনাটি।
. . .


