আসুন ভাবি - পোস্ট শোকেস

‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ ও রামনাথ ঝা-এর ‘ব্রহ্মব্যাখ্যা’ : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ

Reading time 14 minute
5
(11)
The Absolute: Pythagoreans Circled Dot; Image Source & Credit: Wikipedia

বেদজ্ঞ রামনাথ ঝা-এর কোনো ভিডিও পডকাস্ট আমি এই প্রথম শুনলাম। পডকাস্টের সূত্রটি ধরিয়ে দেওয়ার জন্য মিনহাজ ভাইকে ধন্যবাদ। ভারতীয় বৈদিক দর্শনে গুঞ্জরিত ব্রহ্ম-ভাবনাকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, তা চিত্তাকর্ষক লেগেছে শুনে। পডকাস্টটি শোনার পর থেকে তাঁর ব্যাপারে বিস্তারিত জানাবোঝার আগ্রহ বোধ করছিলাম। অনলাইন ঘেঁটে যেটুকু ধারণা হলো, এখানে তার সারসংক্ষেপ তুলে ধরছি। আমার জানাবোঝায় ভুল অথবা আরো কিছু যোগ করা যেত মনে হলে মিনহাজ ভাই আশা করি ধরিয়ে দেবেন।

অদ্বৈত বেদান্তের প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করি প্রথমে। অদ্বৈত বেদান্তকে ভারতীয় দর্শনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নির্ভর পরম্পরার চূড়ান্ত রূপ হিসেবে ব্যাখ্যার ঝোঁক রামনাথ ঝা-এ প্রবল মনে হয়েছে। পডকাস্টের শুরুতে একটা কাঠামো এভাবে তিনি দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর মতে, ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন ধারা,—চার্বাক, ন্যায়-বৈশেষিক, সাংখ্য, যোগ, বেদান্ত পরস্পর বিরোধী মতবাদ নয়, এগুলো হচ্ছে একই বাস্তবতাকে ভিন্ন স্তর থেকে দেখার দার্শনিক পদ্ধতি মাত্র। যেখানে, কেউ ইন্দ্রিয়ের স্তরে এসে বিরাম নিয়েছেন। পরমাণুর স্তরে এসে থেমেছেন অনেকে। কেউ আবার শক্তি ও প্রকৃতির স্তর অবধি যাওয়ার পর আর অগ্রসর হননি। উপনিষদের ঋষিরা অন্যদিকে চৈতন্য পর্যন্ত গমন করেছিলেন। এরকম একটা শ্রেণিকরণের ভিতর দিয়ে অদ্বৈতকে ‘সকল দর্শনের সারনির্যাস’ ও ‘সর্বশেষ অভিজ্ঞতা’ রূপে ব্যাখ্যা করেছেন রামনাথ ঝা। পরিষ্কার করেই বলেছেন তিনি :

অদ্বৈত হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোনো দার্শনিকতা নয়। আদি শঙ্করাচার্যও সরাসরি এর জনক নন। বেদ ও উপনিষদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রাচীন ভারতে অদ্বৈত ভাবনার সারবীজ সবসময় বিদ্যমান ও চর্চিত ছিল। আদি শঙ্কারাচার্যের যুগে এসে তা কেবল দার্শনিক যুক্তিতর্ক ও মীমাংসায় উৎকর্ষের শিখর স্পর্শ করে।

‘মায়া’, ‘মিথ্যা’, ‘ব্যক্তিচেতনা ও পরমচেতনার ঐক্য’-র মতো ধারণাগুলোকে বেদের ভেতর থেকে রামনাথ ঝা কুড়িয়ে নিতে চাইছেন;—পডকাস্টে রাখা বক্তব্য শুনে আমার তাই ধারণা হয়েছে। আদি শঙ্করাচার্যের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ অনেকে করেন,—বৌদ্ধ শূন্যবাদকে তিনি নাকি ব্রহ্মভাষায় পুনর্গঠন করেছিলেন;—রামনাথ ঝা এই অভিযোগটি বাতিল করছেন এখানে।

বিজ্ঞানের যুগে বসে বৈদান্তিক বাণীর সারনির্যাস ব্যাখ্যায় রামনাথ ঝা জোর দিয়েছেন ‘অভিজ্ঞতা’র উপর। পাশ্চাত্য দর্শন তাঁর মতে যুক্তি নির্ভর। ভারতীয় দর্শনকে সেখানে প্রধানত অভিজ্ঞতা নির্ভর বলে মত দিচ্ছেন তিনি। নিজের এই ‘ধারণা’কে পডকাস্টে বারবার টেনেছেন তিনি। তাঁর মতে,—‘ঋষি’ কথাটার মানে হলো ‘যিনি দেখেছেন’। ভারতীয় বৈদিক দর্শনে যে-কারণে শাস্ত্র শেষ কথা বা সত্য নয়, ওটা হলো সহায়ক মাধ্যম;—কেবল ‘অভিজ্ঞতা’ই মানুষকে প্রকৃত সত্যের কাছে নিয়ে যেতে পারে।

তাঁর অদ্বৈত ব্যাখ্যায় ‘জগৎকে মিথ্যা’ ভাবা মানে ‘অবাস্তব’ কিছু নয়। পরিবর্তনশীল হওয়ার কারণে অদ্বৈত একে মিথ্যা বলে সংজ্ঞায়িত করছে। আদি শঙ্করাচার্যকে পডকাস্টে এভাবে ডিফেন্ড করেছেন রামনাথ ঝা। সচেতনভাবে বলছেনও,—জগৎ যদি অবাস্তব হতো, তাহলে শঙ্করাচার্য সারাজীবন সমাজসংস্কার, তীর্থসংস্কার ও তর্ক-বিতর্কে নিজেকে জড়াতেন না। তাঁর কথায় ‘মিথ্যা’ হলো মানুষের জন্য এমন এক অভিজ্ঞতা যা অনবরত স্বরূপ পালটায়। পক্ষান্তরে ‘সত্য’ থাকে অপরিবর্তনশীল।

জগৎকে অস্বীকার নয়, বরং এর পরিবর্তনশীল প্রকৃতি উপলব্ধি করা ও এর গভীরে নিহিত ‘একত্বকে’ বুঝে ওঠা হলো অদ্বৈতর মূল লক্ষ্য। সাংখ্যের সঙ্গে অদ্বৈতর পার্থক্যও আলোচনায় টেনেছেন। সাংখ্য পুরুষ ও প্রকৃতিকে পৃথক দুটি বাস্তবতা বলে ভাবে। রামনাথ ঝা বলছেন,—উপনিষদের ঋষিরা আরও গভীরে গিয়ে দেখতে পেলেন শক্তি ও চৈতন্য শেষপর্যন্ত এক;—সেখানে বহুত্ব আছে, তবে ওই বহুত্বের গভীরে অভিন্ন চেতনার অনুভবটাই হলো সারবস্তু বা সাবস্ট্যান্স।

আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অদ্বৈতকে কোনো জাতবিমুখ বা নিষ্ক্রিয় দর্শন হিসেবে ভাবার বিপক্ষে মত দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে আত্মজ্ঞ ব্যক্তি জগতের ভেতরে থাকে, কাজ করে, কিন্তু ‘কর্তৃত্ববোধ’ তার মধ্যে বজায় থাকে না। ‘জীবমুক্তি’র ধারণাকে এভাবে সামনে এনেছেন এই বেদ বিশারদ;—যেখানে মানুষ জগৎকে পরিত্যাগ করছে না, বরং জগতে সক্রিয় থেকে ‘এক বা এককত্ব’-র মহিমাকে সে উপলব্ধি করে।

সমগ্র আলোচনার ভেতরে ধারাবাহিক যোগসূত্র রয়েছে। ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন ধারা-উপধারা ধীরে ধীরে গভীরতর বাস্তবতায় অগ্রসর হয়েছে, আর অদ্বৈতকে সেই যাত্রার শেষবিন্দু বা ওই বিন্দুতে এসে সকল ধারণা কীভাবে পূর্ণ ও অভিন্ন হয়ে ওঠে, রামনাথ ঝা তা প্রতিষ্ঠায় ফাঁক রাখেননি। তাঁর কাছে অদ্বৈত হলো এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে ‘বহুর’ ভিতরে ‘এক’, পরিবর্তনের মধ্যে অপরিবর্তনশীলকে অনুভব করা যায়;—এবং জগৎকে অস্বীকার না করেও এর গভীরে নিহিত চৈতন্যকে আমরা তখন উপলব্ধি করি।

তাঁর ব্যাখ্যা অদ্বৈতকে ভারতীয় দর্শনের ‘চূড়ান্ত পরিণতি’ হিসেবে তুলে ধরছে। চার্বাক থেকে ন্যায়, ন্যায় থেকে সাংখ্য, সাংখ্য থেকে যোগ, এবং শেষপর্যন্ত ঔপনিষদিক অদ্বৈত… এই ক্রমবিন্যাসের ভিতর দিয়ে সকল দর্শন ধীরে-ধীরে সর্বজনীন চৈতন্যের দিকে অগ্রসর ও মিলিত হচ্ছে। ক্রমবিন্যাসের মধ্যে অদ্বৈতকে তিনি শুধু একটা দর্শন নয়, বরং ‘সকল দর্শনের সমন্বিত উচ্চতম স্তর’ রূপে ব্যাখ্যা করেছেন।

Near-Earth asteroid tracking by NASA JPL; Image Source & Credit: Collected; CNN News

অদ্বৈতর সবচেয়ে বড়ো শক্তি সম্ভবত তার ‘একত্ব’-র ধারণায় নিহিত। ‘বহুর’ মধ্যে ‘এক’-কে দেখার প্রবণতা ভারতীয় দর্শনে মজ্জাগত। মানুষকে তা কেবল ব্যক্তি নয়, বরং বৃহত্তর অস্তিত্বের অংশ রূপে ভাবার দিকে চালিত করে। ‘আমি’ ও ‘অন্য’র বিভাজনকে আপেক্ষিক ভাবার ফলে অদ্বৈতর মধ্যে নৈতিক ও অস্তিত্বগত প্রসারণ আছে। এখান থেকে মূলত ‘অন্যের মাঝে নিজেকে দেখতে পাওয়া’, ‘সকল জীবের মধ্যে একই চেতনা রয়েছে বলে অনুভব করা’, অথবা ‘জাতের গভীরে আত্মার সম্পর্ক আছে’র মতো ধারণা জন্ম নিয়েছে। মানুষ, প্রকৃতি ও জীবনের পারস্পরিক সংযোগ নিয়ে আধুনিক চিন্তা-ভাবনা ও দার্শনিকতার সঙ্গে এই জায়গায় অদ্বৈতর আকর্ষণীয় সাদৃশ্য পাওয়া যায়।

জ্ঞানতত্বের জায়গা থেকেও অদ্বৈত গুরুত্বপূর্ণ। পাশ্চাত্যের বহু দর্শন জ্ঞানকে মূলত যুক্তি, ভাষা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে চায়, অদ্বৈত সেখানে অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্রে নিয়ে আসে। ‘চৈতন্যকে’ বস্তুজগতের ফল নয়, বরং মৌল বাস্তবতা ভাবার প্রবণতা আজকের চেতনা বিষয়ক গবেষণা, অভিজ্ঞতা কেন্দ্রিক দর্শন, এমনকি কোয়ান্টাম তত্ত্বের অনেক ব্যাখ্যার সঙ্গে এর একটা সংযোগসেতু তৈরি করেছে। সংযোগটিকে অতিরঞ্জিত করে দেখানো যদিও ঝুঁকিপূর্ণ, তবু অদ্বৈত-ভাবনার বড়ো শক্তি হলো মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে এটা জ্ঞানের কেন্দ্রে স্থান দিয়েছে।

কিছু বিষয় তবু চোখ এড়িয়ে যাওয়ার নয়। রামনাথ ঝা-এর আলোচনায় অদ্বৈতকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন অন্য সকল দর্শন ‘আংশিক’ বা ‘নিম্নস্তরের’ সত্য। এর ফলে ভারতীয় দর্শনের প্রকৃত গভীরতা আড়ালে থেকে যায়। সাংখ্য, বৌদ্ধ, জৈন, ন্যায়, মীমাংসায় নিহিত ভাবনা ও মতামত শুধুই ‘অসম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা’ নয়,—বাস্তবতা, জ্ঞান, ব্যক্তি, নৈতিকতা ও সমাজ সম্পর্কে এগুলোর নিজস্ব ব্যাখ্যা ও অবস্থান অত্যন্ত গভীর। উদাহরণ স্বরূপ বৌদ্ধ শূন্যবাদকে যদি কেবল ‘অদ্বৈতর পূর্ববর্তী স্তর’ হিসেবে ভাবা হয়, তাহলে বৌদ্ধধর্মের নিজস্ব দার্শনিক শক্তি ও স্বাতন্ত্র্যের অনেকখানি আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়।

বৌদ্ধধর্ম বাস্তবতাকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করে, যা অদ্বৈতর সঙ্গে কতকক্ষেত্রে সাদৃশ্য রাখলেও, শেষপর্যন্ত এটা ভিন্ন পথে গমন করেছে। বৌদ্ধধর্মে ‘অনিত্যতা’র ধারণা আমাদেরকে জানায়,—জগতে কোনোকিছু স্থির নয়, এবং সে-কারণে সবকিছুই পরিবর্তনশীল। ‘অনাত্মা’র ধারণা আরও একধাপ এগিয়ে জানাচ্ছে,—মানুষের ভেতরে এমন কোনো চিরস্থায়ী আত্মা নেই, যাকে অপরিবর্তনশীল সত্তা ভাবা যেতে পারে। ‘সম্পর্ক নির্ভর অস্তিত্ব’র ধারণা অনুসারে কোনোকিছু একা বা স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল নয়, সবকিছু পারস্পরিক সম্পর্কের ভেতর দিয়ে বিবর্তনশীল। বৌদ্ধ শূন্যবাদ যে-কারণে বাস্তবতার গভীরে ‘চিরন্তন ব্রহ্ম’ বা ‘একক চেতনা’র ধরণাকে স্বীকার করে না। সে বরং দেখায় :

আমরা যেসব স্থির পরিচয় বা চূড়ান্ত সত্তাকে কল্পনা করছি, সেগুলো আসলে সম্পর্ক, পরিবর্তন ও নির্ভরতার ভেতরে গঠিত হতে থাকে।

বৌদ্ধধর্মকে সুতরাং ‘অদ্বৈতর দিকে যাওয়ার ধাপ’ গণ্য করার মানে হলো এর গভীরে নিহিত মৌলিক অন্তর্দৃষ্টিকে হত্যা করা। একইভাবে সাংখ্যের পুরুষ-প্রকৃতি দ্বৈততাকে যদি অদ্বৈতর দিকে অগ্রসর কোনো ধাপ বলে গণ্য করি, তাহলে সাংখ্যের নিজস্ব দার্শনিক শক্তি, বিশেষত চেতনা ও জড়প্রকৃতির পার্থক্য নিয়ে এর গভীর বিশ্লেষণকে উপলব্ধির সুযোগ থাকে না। ভারতীয় দর্শনের ইতিহাস সুতরাং একক কোনো ‘চূড়ান্ত সত্য’কে প্রতিষ্ঠা দানের ইতিহাস নয়, এটা হলো দীর্ঘ বহুস্বরিক বিতর্ক, মতভেদ ও পারস্পরিক সমালোচনার ইতিহাস।

অদ্বৈতর ‘সবই এক’ ধারণা নিঃসন্দেহে গভীর ও শক্তিশালী। ‘বহুর ভেতরে একত্ব’কে খোঁজার প্রবণতা মানুষকে বিচ্ছিন্নতার বদলে আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে ভাবতে শেখায়। কিন্তু দর্শনের ইতিহাসে সবাই এই পথে হাঁটেননি। ‘পার্থক্য’, ‘বিচ্ছিন্নতা’ কিংবা ‘অন্যতা’কে অনেক দার্শনিক বাস্তবতার মৌল বৈশিষ্ট্য হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। যেমন, মার্টিন হাইডেগারের কাছে অস্তিত্ব কোনো স্থির সত্য নয়, এটা হলো একধরনের রহস্যময় উম্মোচন, যা কখনো পুরোপুরি ধরা পড়ে না। ইমানুয়েল লেভিনাস আরও এক ধাপ এগিয়ে বলছেন :

অন্য মানুষকে কখনো আমার ভেতরে মিলিয়ে ফেলা যায় না। অন্যের প্রতি দায়বোধ থেকে নৈতিকতা জন্ম নেয়।

অর্থাৎ, তিনি একত্বের চেয়ে পার্থক্যকে গুরুত্বপূর্ণ ভেবেছেন। জাক দেরিদা আবার দেখাচ্ছেন,—মানুষ সবসময় একটি চূড়ান্ত কেন্দ্র বা স্থির অর্থ খুঁজতে চায়, কিন্তু ভাষা ও অর্থের জগতে এসে সেই স্থিরতা বারবার ভেঙে যায়। কোনো ধারণা পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়ে উঠতে পারে না। এর ফলে ‘সর্বশেষ সত্য’ বা ‘চূড়ান্ত ঐক্য’র মতো ধারণাকে দেরিদা প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন। নিটশে যেমন এটা ভেবেছেন,—মানুষের জীবন মূলত প্রবাহ, সংঘাত ও শক্তির খেলা। সেখানে কোনো স্থির metaphysical সত্যকে চূড়ান্ত ধরে বসে থাকা জীবনকে সংকুচিত করে। আলবেয়ার কামুও মানুষের অস্তিত্বের মধ্যে একধরনের অমীমাংসিত অসংগতি দেখতে পেয়েছিলেন। অর্থাৎ, সবকিছু এক চূড়ান্ত সামঞ্জস্যে মিশে যায়;—এই ধারণা তাঁদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না।

চীনা তাওবাদে বাস্তবতাকে কোনো একক চেতনার মধ্যে আবদ্ধ ভাবা হয় না। ‘তাও’ সেখানে নিজে এক প্রবাহমান প্রক্রিয়া, যেখানে পরিবর্তন, ভারসাম্য ও স্বতঃস্ফূর্ততা হলো মূলকথা। বৌদ্ধ মধ্যমক দর্শনও বলছে,—কোনোকিছুর নিজস্ব, স্থির, চিরন্তন সত্তা নেই। সবকিছুই সম্পর্ক নির্ভর, পরস্পর নির্ভর ও পরিবর্তনশীল। ‘শূন্যতা’ এখানে ‘শূন্য মানে কিছু নেই’ এমন নয়, বরং কোনোকিছুর স্থির, স্বাধীন সত্তা নেই থাকাটাকে তুলে ধরছে। এই জায়গাগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানবচিন্তার ইতিহাস শুধু ‘একত্ব’কে খুঁজে বেড়ানোর ইতিহাস নয়,—‘পার্থক্য’, ‘সম্পর্ক’, ‘অস্থিরতা’, ‘অপূর্ণতা’ এবং ‘অন্যতা’ বোঝার ইতিহাসও সেখানে সমান গুরুত্ব রাখে। অদ্বৈত নিঃসন্দেহে মানবচিন্তার একটি বিশাল ও শক্তিশালী ধারা, কিন্তু তাকে একমাত্র সম্ভাব্য চূড়ান্ত সত্য বলে ভাবা কঠিন। এটা হলো বাস্তবতাকে দেখার অনেকগুলো গভীর পথের অন্যতম।

Omm: Advaita Vedanta; Image Source & Credit: Collected; Google Image

রামনাথ ঝা-এর বহ্মব্যাখ্যায় মাঝেমধ্যেই প্রবণতাটি চোখে পড়বে, তাঁর কথা শুনে মনে হবে,—আধুনিক বিজ্ঞান, উপনিষদ ও অদ্বৈত একপথ ধরেই আগাচ্ছে। বিশেষ করে কোয়ান্টাম মেকানিক্স, কনশাসনেস স্টাডিজ কিংবা ফিল্ড থিওরির মতো ধারণাগুলোকে অদ্বৈতর সঙ্গে মিলিয়ে দেখাতে তিনি অধীর থাকেন। বিষয়টি আকর্ষণীয় হয়তো, তবে স্মরণ রাখা ভলো,—আধুনিক বিজ্ঞান বস্তুজগতের গভীরে গিয়ে আগের অনেক স্থির ধারণাকে এখনো প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। সতর্ক থাকা যে-কারনে জরুরি।

কোয়ান্টাম মেকানিক্স বা কনশাসনেস স্টাডিজ এখনো চেতনার প্রকৃতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। বিজ্ঞান অনুসন্ধানে স্থির রয়েছে,—কোনো মীমাংসায় নয়। ‘বিজ্ঞান এখন অদ্বৈতর দিকে যাচ্ছে’ অথবা ‘আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান উপনিষদকে প্রমাণ করছেন’… এই ধরনের বক্তব্যে যুক্তির চেয়ে বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠা দানের প্রবণতা অধিক। বিজ্ঞান ও দর্শন আসলে একই নিয়মে কাজ করে না। বিজ্ঞান মূলত পরীক্ষণ, পর্যবেক্ষণ ও প্রমাণের মাধ্যমে বাস্তবতাকে বোঝার চেষ্টা করে। আর, দর্শন বা আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান মানুষের অভিজ্ঞতা, চেতনা ও অস্তিত্ব নিয়ে ভাবে। এখানে, একটিকে অন্যটির ভিত্তি ও সরাসরি প্রমাণ রূপে দাঁড় করানো ঠিক নয়।

রামনাথ ঝা ভারতীয় দর্শনকে এক দীর্ঘ বৌদ্ধিক ও অভিজ্ঞতামূলক ঐতিহ্য হিসেবে দেখাতে চাইছেন। তাঁর অদ্বৈতপাঠের ভেতরে সমন্বয় স্থাপনের চেষ্টা অবশ্যই রয়েছে। বিজ্ঞান, দর্শন, আত্ম-অভিজ্ঞতা, নৈতিকতা ও মানবিকতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিতে তিনি আগ্রহী তা না বোঝার কিছু নয়। তাঁর এই আগ্রহে যদিও অদ্বৈতকে ‘সর্বোচ্চ সত্য’ দেখানোর প্রবণতা অন্য ধারাগুলোর স্বাতন্ত্র্যকে আড়াল করে ফেলছে। তা-সত্ত্বেও রামনাথ ঝা-এর মনোজ্ঞ ব্যাখ্যা ভারতীয় দর্শনের গভীরতা ও বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্যকে নতুন করে খতিয়ে দেখার সুযোগ এনে দিয়েছে। এখানে এসে আমার মাথায় আবার প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে :

আধুনিক হিন্দু সম্প্রদায় কিংবা হিন্দু রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো আসলে এই দর্শনকে কতখান ধারণ করছে? এই পরস্পরাকে কি তারা বহন করছে আদৌ? তাদের এই নিজেকে বৈদিক উত্তরাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করার ঘটনা দর্শনচিন্তার জায়গা থেকে কতটা প্রাসঙ্গিক? নাকি, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের জায়গা থেকে দাবিটি তুলছে আজকাল?

যেহেতু, রামনাথ ঝা-এর ব্যাখ্যায় যে-বৈদিক দার্শনিকতার দেখা আমরা পাচ্ছি, সেখানে এর কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে ‘আত্ম-অনুসন্ধান’, ‘চেতনার একত্ব’, ‘বহুর মধ্যে সম্পর্ক’, এবং ‘অভিজ্ঞতার গভীরতা’। ‘অন্য’কে বাদ দেওয়ার প্রবণতা তাঁর ভাবনায় প্রকট নয়, বরং সকল ‘ভেদ’ অতিক্রম করে একটি ধারণায় স্থির হওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। আধুনিক রাজনৈতিক পরিচয় কি এখানে তাঁর মতো করে ভাবে সবটা? প্রায়শ তাঁর ‘একত্ব’র বিপরীতে চলে ওটা। ‘আমরা’ আর ‘ওরা’, ‘ভেতর ও বাহির’, ‘সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু’র বিভাজনকে যেখানে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা হয়। প্রশ্ন জাগে,—আধুনিক হিন্দু রাজনীতিকে কি সেক্ষেত্রে বৈদিক দর্শনের ধারাবাহিকতা ভাবা সম্ভব? নাকি, প্রতীক ও স্মৃতিকে ব্যবহার করে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক বিনির্মাণ ছাড়া ওটা আর অন্য কিছু নয়!

বাস্তবে আমরা দেখি, আধুনিক হিন্দু রাজনীতি বৈদিক দর্শনের কিছু প্রতীক, শব্দ ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি ব্যবহার করছে, কিন্তু তার চরিত্র মূলত আধুনিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ধারায় ঘুরপাক খাচ্ছে মূলত! আধুনিক ভারত একটি জাতিরাষ্ট্র, ফলে তার সিদ্ধান্ত গড়ে ওঠে অর্থনীতি, নিরাপত্তা, কূটনীতি, নির্বাচনী বাস্তবতা ও ক্ষমতা-রাজনীতির ভিতর দিয়ে। রাষ্ট্রের নীতি পুরোপুরি অদ্বৈতবাদী চিন্তা থেকে পরিচালিত হচ্ছে;—এরকম ভাবার কোনো অবকাশ সেখানে নেই।

রামনাথ ঝা অবশ্য করোনা অতিমারির সময় ভারতের টীকা সহায়তাকে কেবল কূটনৈতিক পদক্ষেপ নয়,—অদ্বৈতচিন্তার সাংস্কৃতিক প্রকাশ রূপে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর যুক্তি হলো,—যদি ‘অন্যের মধ্যেও নিজের অস্তিত্ব’ অনুভব করা যায়, তাহলে অন্যের কল্যাণ সাধন নিজের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। এই জায়গা থেকে সহমর্মিতা বা সাহায্যকে গভীর আন্তঃসম্পর্কের প্রকাশ হিসেবে তিনি বিবেচনা করছেন। বাস্তবতা কিন্তু অনেক জটিল সেখানে! অনেকে এই টীকা বিতরণকে ‘ভ্যাকসিন কূটনীতি’ ও ‘আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধির কৌশল’ ভেবেছেন সেইসময়। যার ফলে পুরো বিষয়টিকে আধ্যাত্মিক মানবতাবাদ দিয়ে ব্যাখ্যা করা হলে, রাষ্ট্রনীতির বাস্তব দিকগুলো আমরা এড়িয়ে যাচ্ছি মনে হবে।

রামনাথ ঝা-এর বক্তব্য তথাপি পুরোপুরি অমূলক নয়। কারণ, আধুনিক ভারত আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেকে প্রায়শ যোগ, ধ্যান, অহিংসা, বিশ্বমানবতা ও আধ্যাত্মিকতার ধারক ‘সভ্যতা’ হিসেবে তুলে ধরতে চায়। এই সাংস্কৃতিক ভাষার ভেতরে উপনিষদীয় বিশ্বদৃষ্টির প্রভাব রয়েছে। একইসাথে আরেকটি বাস্তবতাও সেখানে আছে। একদিকে ‘বিশ্ব পরিবার’-এর ভাষা, অন্যদিকে ধর্মীয় মেরুকরণ, পরিচয়-রাজনীতি ও সংখ্যাগুরুবাদ। এতেই বোঝা যায়,—আধুনিক ভারত একরৈখিক নয়, তার ভেতরে পরস্পরবিরোধী নানা প্রবণতা একসঙ্গে কাজ করছে। রামনাথ ঝা হয়তো বলতে চাইছেন না, ভারত রাষ্ট্র সরাসরি ‘অদ্বৈত দ্বারা পরিচালিত’। তিনি হয়তো এটা বোঝাতে ,—ভারতীয় সাংস্কৃতিক কল্পনার ভেতরে এখনো এমন কিছু ধারণা সক্রিয় আছে, যেখানে ‘অন্যের কল্যাণ’ পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি। অর্থাৎ, অদ্বৈত এখানে সরাসরি রাষ্ট্রনীতি নয়, বরং এক ধরনের সাংস্কৃতিক ও নৈতিক পটভূমি।

Adi Shankaracharya’s life journey; Artist: Sasi Edavarada; Image Source & Credit: hinduismtoday

রামনাথ ঝা-এর চিন্তাকে বোঝার জন্য তাঁর Understanding Einstein’s Philosophy through the Prism of Vedanta প্রবন্ধটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এটি উপস্থাপন করেছিলেন Nineteenth International Congress of Vedanta-31-এ। আইনস্টাইনের দর্শনকে বেদান্তের আলোকে বোঝার চেষ্টা করেছেন সেখানে। তাঁর মতে, আইনস্টাইন শুধু একজন পদার্থবিদ ছিলেন না,—বাস্তবতা, ঈশ্বর, নৈতিকতা, স্বাধীন ইচ্ছা ও মানুষের অবস্থান নিয়ে গভীরভাবে ভেবেছেন। আর, তাঁর এসব ভাবনার সঙ্গে উপনিষদীয় বেদান্তের বেশকিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। রামনাথ ঝা শুরুতে বলছেন :

বেদ মানে শুধু ধর্মীয় অস্ত্র নয়, এটা একটি স্থান পরস্পরা, যার গভীরতম অংশ হলো উপনিষদ। আর উপনিষদের মূল অনুসন্ধান বাহ্যিক আচার নয়, বরং চেতনা, আত্মা ও চূড়ান্ত বাস্তবতা।

আইনস্টাইনের impersonal God ধারণাকে সুতরাং উপনিষদের ‘অন্তর্যামী ব্রহ্ম’-র সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন তিনি। আইনস্টাইনের কাছে ঈশ্বর এমন কোনো সত্তা নন, যিনি ব্যক্তিগতভাবে মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করেন, বরং তিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অন্তর্নিহিত নিয়ম, সুষমা ও রহস্যে উপস্থিত। রামনাথ ঝা-এর মতে, উপনিষদও ঠিক এমন এক চেতনার কথা বলে, যা জগতের বাইরে নয়, বরং জগতের গভীরে কাজ করছে।

আইনস্টাইনের ধর্মবোধ নিয়েও তিনি আলোচনা করেছেন। আইনস্টাইনের কাছে ধর্ম মানে ছিল মহাবিশ্বের গভীরে থাকা অজ্ঞেয় বিস্ময়ের অনুভব। রামনাথ ঝা মনে করেন, উপনিষদের ঋষিরা অনুরূপ অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন;—চূড়ান্ত সত্যকে ভাষায় পুরোপুরি ধরা যায় না, কিন্তু তাকে অনুভব করা যায়।

স্বাধীন ইচ্ছার প্রশ্নেও তিনি মিল খোঁজেন। আইনস্টাইন মনে করতেন,—মানুষ পুরোপুরি স্বাধীন নয়, মানুষের চিন্তা ও আচরণ প্রকৃতির বৃহত্তর নিয়মের অংশ। রামনাথ ঝা একে বেদান্তের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছেন;—মানুষকে যেখানে বিচ্ছিন্ন সত্তা নয়, বরং বৃহত্তর চেতনার প্রকাশ হিসেবে ভাবা হয়েছে। নৈতিকতার জায়গাতেও তিনি সম্পর্ক দেখতে পাচ্ছেন। আইনস্টাইনের ‘নিজের জন্য কম, অনোর জন্য বেশি’-র ভাবনাকে তিনি ঈশ উপনিষদে ব্যক্ত বোধের সঙ্গে মিল করে দেখছেন, যেখানে ভোগের মধ্যে অনাসক্ত থাকার কথা বলা হয়েছে।

প্রবন্ধজুড়ে রামনাথ ঝা-এর মূল চেষ্টা ছিল আধুনিক বিজ্ঞান ও বেদান্তকে পরস্পর বিরোধী নয়, বরং অভিন্ন বাস্তবতাকে দুটি ভিন্ন পথ ধরে অনুসন্ধানের ধারা রূপে প্রতিপন্ন করা। বিজ্ঞান পরীক্ষার মাধ্যমে জগতকে বোঝে, আর বেদান্ত চেতনা ও অভিজ্ঞতার গভীরে গিয়ে বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে আগ্রহী। এ-কারণে তিনি আপেক্ষিকতাবাদ, ঐক্যবদ্ধ ক্ষেত্রতত্ত্ব কিংবা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মতো ধারণাগুলোকে বাস্তবতার গভীর একত্ব-র ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যায় উন্মুখ থাকেন। তবে এখানেও তাঁর একটি স্পষ্ট প্রবণতা চোখে পড়ছে,—অদ্বৈত বেদান্তকে এমন এক দার্শনিক কাঠামো হিসেবে হাজির করা, যা আধুনিক বিজ্ঞানকেও ধারণ করতে সক্ষম।

Dr. Ram Nath Jha; Image Source & Credit: Collected; Google Image

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রামনাথ ঝা আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষা ব্যবহার করে অদ্বৈতবাদের বৌদ্ধিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে চাইছেন। তাঁর কাছে বেদান্ত কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং এমন এক অস্তিত্ব বিষয়ক চিন্তন-কাঠামো, যার ভেতর কোয়ান্টাম মেকানিক্স, আপেক্ষিকতাবাদ বা ঐক্যবদ্ধ ক্ষেত্রতন্ত্রের মতো আধুনিক ধারণাকে নতুনভাবে ভাবা সম্ভব। প্রবণতাটি তাঁর ব্যাখ্যায় বারবার ফিরে আসে। অদ্বৈতকে ভারতীয় দর্শনের ‘সমন্বয়বাদী’ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তিনি দেখছেন;—বাস্তবতার বিভিন্ন স্তর যেখানে গভীর একত্বকে ইঙ্গিত করে।

বিজ্ঞানকে অবশ্য সরাসরি বেদান্তের ‘প্রমাণ’ হিসেবে তিনি কখনো ব্যবহার করেন না। তাঁর কথা হলো,—বিজ্ঞান যত গভীরে যাচ্ছে, এমন কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি তাকে হতে হচ্ছে, যেগুলো উপনিষদে আগে থেকে বিদ্যমান। বেদান্ত এ-কারণে তাঁর কাছে নিছক ধর্মীয় কুসংস্কার নয়, এটা বরং এমন এক জীবন্ত দর্শন-কাঠামো, যার মাধ্যমে বিজ্ঞান, চেতনা ও বাস্তবতার সম্পর্ককে নতুন করে ভাবার অবকাশ থাকছে।

রামনাথ ঝা-কে একশব্দে চিহ্নিত করা কঠিন। তিনি সংস্কৃত পণ্ডিত, ব্যাখ্যাকার, ঐতিহ্যের রক্ষক ও আধুনিক পুনর্ব্যাখ্যাকার। তাঁকে আধুনিক হিন্দুত্ববাদের রাজনৈতিক তাত্ত্বিক বলাটা সরলীকরণ হয়ে যাবে। নিরপেক্ষ ঐতিহ্য বিশারদ ভাবলে আবার অবস্থানটি সঠিক ধরা পড়বে না। তিনি মূলত এমন এক বৌদ্ধিক পরিসরের প্রতিনিধি, যেখানে বৈদিক ও ঔপনিষদিক চিন্তাকে আধুনিক যুগে নতুনভাবে মর্যাদা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

রামনাথ ঝা-এর শক্তি হলো ভারতীয় দর্শনকে শুধু বিশ্বাস বিবেচনা না করে অভিজ্ঞতা ভিত্তিক জ্ঞানতত্ত্ব রূপে মানুষের কাছে তুলে ধরতে চাইছেন। ভারতীয় ‘দর্শন’ আর পাশ্চাত্যের ‘ফিলোসফি’ এক জিনিস নয়;—এটা তাঁর ব্যাখ্যায় বারবার ফেরত আসে। পশ্চিমা দর্শন যেখানে যুক্তি ও বিশ্লেষণের উপর দাঁড়িয়ে থাকে, সেখানে ভারতীয় দর্শন তাঁর কাছে আত্ম-অনুসন্ধান, অভিজ্ঞতা ও চেতনার উপলব্ধি নির্ভর জগৎ হয়ে ধরা দেয়। এখানে পা দিয়ে তিনি নিছক ভাষ্যকার থাকেন না, তাঁকে আমরা ভারতীয় জ্ঞানতত্ত্বের সক্রিয় ব্যাখ্যাকার রূপে পাই।

হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পৃষ্ঠপোষক ও তাত্ত্বিক,—অভিধাটি তাঁর বেলায় পুরোপুরি খাপ খাবে না। রামনাথ ঝা-এর আলোচনায় রাষ্ট্র, জাতি, মুসলমান, বিদেশ কিংবা রাজনৈতিক সংগঠন অনুপস্থিত থাকে। তাঁর ভাষা ও বয়ান মূলত অস্তিত্ব, চেতনা ও বাস্তবতাকে ঘিরে আবর্তিত। তথাপি, একথা মিথ্যে নয়,—তাঁর মতো চিন্তকদের ব্যাখ্যা আধুনিক হিন্দু আত্মপরিচয় নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কারণ, তিনি বারবার দেখাতে চাইছেন :

ভারতীয় জ্ঞানপদ্ধতি গভীর ও স্বতন্ত্র।

আধুনিক বিজ্ঞান আসার বহু আগে বাস্তবতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছিল বেদান্ত

ভারতীয় ঋষিরা চেতনার এমন জ্বর নিয়ে ভেবেছিলেন, যা আধুনিক বিজ্ঞান এখনও পুরোপুরি ধরতে পারেনি।

ভারতীয় সভ্যতার ভেতরে একটি শক্তিশালী আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য রয়েছে;—এই বোধ একধরনের সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস তৈরি করে, যা পরে ‘সভ্যতাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ’-র জমি গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখলেও রাখতে পারে। রামনাথ ঝা সরাসরি রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করেন না, তাঁর চিন্তা এমন এক সাংস্কৃতিক কাঠামো তৈরি করে, যার উপর দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা গড়ে তোলা কঠিন নয়। সেইসঙ্গে এটা গুরুত্বপূর্ণ,—তাঁর অদ্বৈতবাদী অবস্থান আধুনিক হিন্দুত্ববাদের অনেক প্রবণতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, সত্যি যদি সবকিছুর ভেতর একই চেতনা থাকে, তাহলে ধর্মীয় বিদ্বেষ, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব বা সংখ্যাগুরুবাদকে চূড়ান্ত সত্য রূপে দাঁড় করানো কঠিন হয়ে পড়ে।

রামনাথ ঝা-এর প্রকৃত অবস্থান সম্ভবত এখানে পাচ্ছি আমরা;—তিনি আধুনিক রাজনৈতিক হিন্দুত্বের সরাসরি মুখপত্র নন, আবার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ বিদ্যাজীবী ভাবাটাও সম্ভব নয় তাঁকে। ভারতীয় বৈদিক অদ্বৈত ঐতিহ্যের একজন আধুনিক পুনর্ব্যাখ্যাকার ভাবাটাই বরং স্বস্তিকর। শঙ্করাচার্যকে যিনি সমকালীন দার্শনিক গ্রহণযোগ্যতা দানে ভূমিকা রাখছেন, এবং ভারতীয় জ্ঞানতত্বকে বিশ্বদর্শনের আলোচনায় নতুন করে প্রাসঙ্গিক রাখতে নিরলস কাজ করে চলেছেন।
. . .

পা ঠ অ নু ভ ব
থার্ড লেন স্পেস হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে সংকলিত

অহং ব্রহ্মাস্মি

Aham Brahmasmi: Conceptual Artwork; Image Source & Credit: Pinterest

ধন্যবাদ জাভেদ। বেদজ্ঞ রামনাথ ঝা সম্পর্কে আপনার অনুসন্ধানী ব্যাখ্যা ও মতামত পাঠ করে ভালো লাগল। তাঁর বক্তব্যকে আপনি যেভাবে এক্সপ্লোর করেছেন, এখন এর সঙ্গে সহমত থাকছে। বৈদিক দর্শনের বিকাশ পরম্পরা নিয়ে আমার ধারণা অতিব সামান্য। তথাপি, এর নিরিখেও যদি দেখি, সেক্ষেত্রে রামনাথ ঝা-এর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ দুরূহ মানতে হয়।

বেদান্ত দর্শনে অদ্বৈতবাদ কেন মৌল সুর তার জন্য আমরা শঙ্কারাচার্য, মাধবাচার্য, রামানুজ ও নিম্বার্কাচার্যের ব্যাখ্যাকে আমলে নিতে পারি। মতের ভিন্নতা রয়েছে আচার্যদের মধ্যে। তা-সত্ত্বেও মৌলসুরের প্রশ্নে চারজনই অদ্বৈতবাদকে জাস্টিফাই করে গেছেন। পার্থক্য বলতে একটাই প্রসঙ্গকে চারটি ভিন্ন পথ ঘুরে তাঁরা ব্যাখ্যা করেছিলেন :

ব্রহ্ম সত্য;—এই ব্যাপারে অদ্বৈতবাদ, দ্বৈতবাদ, দ্বৈতাদ্বৈতবাদ ও বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ-এ গোলযোগ নেই। গোল বাঁধছে ব্রহ্ম-র সঙ্গে সৃষ্টজগতের সম্পর্ক নিয়ে। শঙ্কারাচার্য বলছেন,—ব্রহ্ম নির্গুণ এবং জীব-জগৎ ও ব্রহ্ম পরস্পর অভিন্ন। সগুণ জীব ‘মায়া/ অবভাস/ অধ্যাস’-এর দখলে থাকায় নিজের ভিতরে নির্গুণ ব্রহ্মের বিদ্যমানতা বুঝতে পারে না। সে টের পায় না,—জীবজগতের কারণ হচ্ছে নির্গুণ ব্রহ্ম, যাকে বাদ দিলে জগৎ বলে কিছুর অস্তিত্ব থাকে না। জগৎ যে-কারণে ব্রহ্মাবৃত বা সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম

বিশিষ্টদ্বৈতাবাদ-এ রামানুচার্জ শঙ্করাচার্যের মত অস্বীকার করছেন বিষয়টি এরকম নয়। তাঁর কথা হচ্ছে,—ব্রহ্মকে নির্গুণ ভাবলে জীব-জগতের কোনো অর্থ থাকে না! একালে পদার্থবিদরা এই প্রশ্নটি করেন প্রায়শ :

কেন কিছু না-থাকার পরিবর্তে আছে?

রামানুচার্যের মীমাংসা অনেকটা সেরকম। ব্রহ্মের নির্গুণ সত্তাকে তিনি সগুণাত্মক গণ্য করেছেন। সগুণকে এখানে আমরা ব্রহ্মের ঈশ্বর রূপ ভেবে নিতে পারি। শঙ্কারাচার্যে এই রূপের আভাস প্রকট নয়। ব্রহ্মর ‘বডিলি-ফর্ম’ (Bodily Form) কেমন হতে পারে সেই আলাপে তিনি সরাসরি ঢোকেননি। যেহেতু নির্গুণ, তার পক্ষে দেহ ধারণ কী করে সম্ভব! দেহ যখন নেই,—তার অস্ত্বিত্ব বুঝব কীভাবে? মীমাংসায় শঙ্করাচার্য সোজা বলে দিচ্ছেন,—যা-কিছু প্রকাশিত, ব্রহ্ম তার মধ্যে প্রচ্ছন্ন।

ছান্দোগ্য উপনিষদেই সম্ভবত রয়েছে, উদ্দালক ও শ্বেতকেতুর মধ্যকার স্মরণীয় সংলাপ স্মরণ করুন। জলের মধ্যে তিনি শ্বেতকেতুকে লবণ মিশাতে বলেছিলেন। মেশানোর পর জলের স্বাদ লবণাক্ত হলো। লবণ তো নেই, কিন্তু তাকে নেই বলা যাচ্ছে না। কারণ, জলে তা প্রচ্ছন্ন থাকছে। ব্রহ্মও সেরকম। প্রকাশিত যা-কিছু তার মধ্যে তিনি মৌল কারণ রূপে অটল ও প্রচ্ছন্ন হয়ে আছেন। ফান্ডামেন্টাল এলিমেন্ট হওয়ার কারণে দৃশ্যমান জগৎ তাকে বুঝে উঠতে পারে না। যেহেতু, দৃশ্যমান এই জগৎ যেভাবে গঠিত ও পুনর্গঠিত হচ্ছে, সেখানে কোনোকিছু নিত্য নয়। তারা অনিত্য ও পরিবর্তনশীল। মৌল কারণ যদিও সদা নিত্য ও অপরিবর্তনীয় থাকছে ওই লবণাক্ত স্বাদের মতো। রামনাথ ঝা যে-কারণে ‘অনুভব’-র উপর একটা জোর দিয়েছেন। কেননা, এটা ‘অনুভব’-র বিষয়, পরীক্ষণের নয়।

বিজ্ঞানীরা মূলত এখান থেকে ঈশ্বরকণা বা হিগস-বোসন পার্টিকেল নামে এর অবিভাজ্যতা পরীক্ষায় ব্যস্ত আছেন। যেখান থেকে স্ট্রিং থিয়োরি জন্ম নিচ্ছে বা একে খারিজ করে শক্তির ভূতুড়ে অদৃশ্য প্রবাহকে পদার্থবিদরা কল্পনায় নিচ্ছেন ও সমীকরণে বুঝতে চাইছেন।

এরকম একখান ব্রহ্মকে দিয়ে জগতের কী কাজ? তাকে অনুভব করলে ব্রহ্মজ্ঞান হলো ঠিক আছে। না করলেও কিছু যাবে আসবে না কারো! যে-কারণে বেদান্তে কথাখান আছে,—ব্রহ্মকে পুজো করা যায় না। তাকে মানা বা না মানায় কিছু যায় আসে না। যার যেমন মন চায় তাকে ভাবতে পারে। কেননা, সে আসলে নিজেকে ভাবছে, যেহেতু মৌল রূপে তিনি তার মধ্যেই বিদ্যমান।

ধাঁধা সমতুল ব্রহ্মফাঁড়া কাটাতে রামানুচার্য ব্রহ্মের নির্গুণ রূপকে সগুণ ভাবলেন। জগৎকে ব্রহ্মের দেহ বা শরীর নাম দিলেন। বিষ্ণু/ নারায়ণ ইত্যাদি রূপে নিজের দেহকে তিনি প্রকাশ করছেন। পুরাণগুলো এখান থেকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব এরকম সব ভগবানের ধারণায় পৌঁছাবে পরে। যেটি আবার নৃতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, অধুনা জিনবিজ্ঞান হাতে নিলে অনার্য নরজাতির সমাজে তৈরি হওয়া ঈশ্বর ধারণাকে আর্যীকরণ করছে বা বলতে পারেন ভাববাদের নতুন স্বরূপ তৈরি হচ্ছে সেখানে।

নিম্বার্কাচার্যের দ্বৈতাদ্বৈতবাদ এখানে শঙ্কারাচার্য ও রামানুচার্যের মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর মানসে প্রস্তাবিত হয়েছিল। তিনি রামানুচার্যের মতে সায় দিয়ে বললেন,—নির্গুণ ব্রহ্ম সগুণ হচ্ছেন জগতের মধ্য দিয়ে। বিষ্ণু বা নারায়ণের মতো কেবল গুণের আধার নন, বরং দেহধারী অবতার রূপে জগৎকে ব্রহ্ম শিক্ষা ও বিবিধ বিষয়ে জ্ঞান দান করছেন তিনি। এখান থেকে বিষ্ণুর দশমাবতারের ধারণাটি এলো মনে হয়। যার পরিপূর্ণ ও শেষ রূপ হলেন কৃষ্ণ। মহাভারতে গীতা আওরানোর ছলে অর্জুনকে কৃষ্ণ ব্রহ্মের বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন, আশা করি তা মনে আছে আপনার।

মাধবাচার্যের দ্বৈতবাদ আবার কোরানের আল্লার মতো ব্রহ্মকে দিয়েছে আলাদা করে। তাঁর মতে, ঈশ্বর পূর্ণ ও স্বতন্ত্র। জীব ও জগত তাঁর ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু তারা তার থেকে আলাদা।

এই ক্রেনোলজি যদি দেখি, তাহলে দেখব ছান্দোগ্য উপনিষদের তত্ত্বমসি বা তুমিই সে বা তুমিই ব্রহ্ম এই ধারণায় পৌঁছানোর পথে চার মনীষার অনুভব ভিন্ন ভিন্ন মোড় নিয়েছে। অদ্বৈতবাদ এখানে বাকিদের থেকে এগিয়ে থাকছে এ-কারণে-যে, এটি সারাংশটি আগেভাগে বলে দিয়েছে। সোজা কথায়, তুমি নিজেকে যেভাবে দেখো বা অনুভব করো-না-কেন বাছা, মনে রেখো তুমি হচ্ছো সেই সারাংশের অংশ, যাকে বাদ দিলে তুমি বলে কিছু নেই। কিছু নেই মানে তুমি তখন সারাংশ বা ব্রহ্ম স্বয়ং।

এটা হলো অস্তিত্বের এমন এক গুণাত্মক অবস্থা, যেখান থেকে সৃষ্টি, যৌগ, ক্ষয়, রূপান্তর ও পরিশেষে সারাংশে সমর্পণ ঘটছে। এই অর্থে ব্রহ্ম হচ্ছে এমন এক বিমূর্ত, যাকে অনুভব করলে পরে ঈশ্বর ও জীবজগৎকে আর পৃথক ভাবার প্রয়োজন থাকে না। না থাকে পাপ-পুণ্য, কর্মফল, নীতি-নৈতিকতার বালাই। এসবই সৃষ্ট জীব তার প্রয়োজনে তৈরি করে, যার সঙ্গে সারাংশের যোগ নেই। ইবনে সিনা এখান থেকে ওয়াজিব-আল-ওজুদ বা ইমারজেন্ট প্রোপ্রার্টির কথা বলেছিলেন। ইনিই সৃষ্টি নামক বিকারের কারণ, তবে সৃষ্টিতে তার ভূমিকা মৌন। তিনি সারাংশ রূপে চির বিদ্যমান অপিরবর্তনীয়।

রামনাথ ঝা যেহেতু একালের মানুষ, তাঁকে সবকটা মতের মধ্যে অ্যাডজাস্টমেন্ট ঘটাতে হচ্ছে। যে-কারণে হয়তো অনুভবের কথা জোর দিয়ে বলেছেন। যেন আমরা বুঝি,—ভেদ যতক্ষণ থাকছে, ততক্ষণ ফান্ডামেন্টালে গমন সম্ভব নয়। ভেদ উঠে গেলে মানুষ সচ্চিদানন্দ। সে তখন অহং ব্রহ্মাস্মি বা আমিই ব্রহ্ম এই বোধে মাতোয়ারা! কারো কাছে তার কিছু চাওয়ার নেই, না তার কাছে কেউ কিছু চাইলে পাবে। সে তো বুঝে বসে আছে,—দেহটা খোলস মাত্র। জলে যেমন ঢেউ। একটু পরপর উঠে ও জলে মিশে যায়।
. . .

Dr. Ram Nath Jha on Advaita Vedanta; Source: Hyper Quest YTC

. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক অন্যান রচনা পাঠের জন্য দেখুন …

গড প্রব্লেম : যুক্তির জয়-পরাজয়

সময়-ফাঁদের সাতকাহন

কবি ও ঈশ্বর : অলোকরঞ্জন ও আরোনোফস্কি

বিশ্বাসের উৎস – পাঠ-সংযোজন

. . .

লেখক পরিচিতি : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন

. . .

অবদায়ক : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ ও আহমদ মিনহাজ : থার্ড লেন স্পেস.কম

মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ-এর অন্যান রচনা ও
প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 11

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *