পোস্ট শোকেস - বিবিধ ও বিচিত্র

আমাদের ‘খেলাসাহিত্যের’ শূন্য ভাঁড়ার

Reading time 6 minute
5
(16)
Celebrating Football in Bangladesh; Image Source: Collected
Credit: Nirob Chowdhury; en.prothomalo.com

আশ্চর্য বটে, খেলাপাগল বাংলাদেশে কোনো ক্রীড়াসাহিত্য নেই! সাহিত্যের এই ঘরানাটি আজো কারো হাতের ছোঁয়ায় পায়নি সঞ্জীবন! দেশে ক্রীড়া সাংবাদিকতা সময়ের সঙ্গে পরিপুষ্ট হলেও, ক্রীড়াসাহিত্যে গরব করার মতো সৃজনশীল কাজের ভাঁড়ার এখনো শূন্য!

কথা মিথ্যে নয়, ফুটবল ও ক্রিকেটের মতো জনপ্রিয় খেলা নিয়ে বই বাজারে রয়েছে। সুখপাঠ্য ও মূল্যবান বই আছে কিছু। বাংলাদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকতায় পাইওনিয়ারদের অন্যতম মোস্তফা মামুনউৎপল শুভ্র খেলা বিষয়ক প্রতিবেদন ছাড়াও একাধিক বই লিখেছেন। তাঁদের ক্রীড়াগদ্য পাঠক-আগ্রহে জনপ্রিয় থেকেছে সদা। দেবব্রত মুখোপাধ্যায় যেমন সাকিব আল হাসান ও মাশরাফী বিন মোর্ত্তজাকে নিয়ে গুছিয়ে দুটো বই লিখেছেন। মাশরাফির ওপর রচিত বইটি পাঠকের নজর কেড়েছিল দ্রুত। বাংলাদেশের ক্রিকেট আইকনের অন্যতম বর্ণিল এই চরিত্রের ওপর অন্তরঙ্গ অবলোকন তাঁর বইকে পৃথক গুরুত্ব ও স্বাতন্ত্র্য এনে দিয়েছিল। দেবব্রত পরে খেলার ওপর একাধিক বই লিখেছেন। ক্রীড়াসাহিত্যের কাতারেই পড়ছে সেগুলো; তথাপি আমরা যে-জায়গা থেকে ক্রীড়াসাহিত্য নামক বস্তুটিকে বুঝে নিতে আগ্রহী, তিনি ও অন্যদের রচনা সরাসরি সেই গোত্র বা মেজাজের নয়। ওরকম কোনো ভাবনা থেকে বইগুলো তাঁরা লেখেননি বা লেখার কথাও নয়।

সে যাকগে, মোস্তফা মামুন, উৎপল শুভ্র, অঘোর মণ্ডলরা মিলে বাংলাদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকতাকে একটা প্রাণবন্ত অবয়ব দিয়েছেন। ভিতটা অবশ্য দিলু খন্দকার, ফরহাদ টিটো, আর উৎপল শুভ্রর ভাষায় ‘ক্রিকেট দার্শনিকজালাল আহমেদ চৌধুরীর মতো খেলাঅন্তপ্রাণরা তৈরি করে দিয়েছিলেন। সময়ের সঙ্গে তাল দিয়ে বাংলাদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকতা সুতরাং গুণমানে এগিয়েছে অনেকখানি। খেলার ট্যাকনিক্যাল খুঁটিনাটি থেকে শুরু করে বিচিত্র সব দিক নিয়ে সাংবাদিক-গদ্য পাঠের খরা তাতে মিটেছে।

বিশ্বের নামকরা ক্রীড়া বিশ্লেষকরা ইন্টারনেটের কল্যাণে সকলের কাছে এখন উন্মুক্ত। বাংলাদেশে একটা খেলার খুঁটিনাটি সূক্ষ্ম রংগুলো বুঝে ওঠার ঘটনায় এটা অবদান রাখছে। তথ্য, পরিসংখ্যান, ইতিহাসের সূত্ররা সুলভ হওয়ার কারণে খেলার আদিঅন্ত ব্যবচ্ছেদের ধারায় বৈচিত্র্য বেড়েছে। ফুটবলের কথা ধরা যাক, খেলাটির টেকনিক্যাল দিক ও অনুষঙ্গরা এই-যে দুইহাজার ছাব্বিশে এসে আমাদের এখানে চর্চিত হতে দেখছি, এটা বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় খেলাটির দর্শন ও নান্দনিক সব দিক ঠার করতে খেলাপাগল দর্শককে সাহায্য করছে। আবিদ হুসাইন সামি, দেব চৌধুরী বা হাবিবুর রহমানের ফুটবল বিশ্লেষণ যে-কারণে তারা আগ্রহ নিয়ে শুনছেন এখন। স্পোর্টস জার্নালিজম ও অ্যনালিসিসের মান আগের চেয়ে সলিড মনে হচ্ছে দেখেশুনে। এটা আশার দিক। এর মধ্যে যেটা নেই এখনো, সেটা হলো নিখাদ ক্রীড়াসাহিত্য। সাহিত্যরসে নিকানো ভাণ্ডারটি এই দেশে অপূরণ থেকে গেছে! ক্রীড়ালেখকের খরা এতগুলা বছর পরেও ঘোচেনি!

বাংলাদেশের সাহিত্যে খেলাধুলার বর্ণিল রংগুলো যেন অদৃশ্য! অনেক চেষ্টা করে কোনো গল্প, কবিতা, উপন্যাসের নাম স্মরণে ব্যর্থ হলাম! একমাত্র, হ্যাঁ একমাত্র রশীদ করিমের নামখানা ঝিলিক দিয়ে গেল ক্ষণিক। ‘উত্তমপুরুষ’ ও অন্যান্য উপন্যাসেও থাকতে পারে, ক্রিকেট খেলার মনোজ্ঞ স্মৃতিচারণা রেখে গেছেন এই কথাশিল্পী। দেশভাগের সন্ধিক্ষণ তাঁর উপন্যাসের বড়ো বিষয় থেকেছে। ‘উত্তমপুরুষ’ ও ‘মায়ের কাছে যাচ্ছি’ পাঠের স্মৃতি মন থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি দেখছি! রশীদ করিমের উপন্যাসে খেলা কেন্দ্রীয় বিষয় নয়, তবে একটা স্পেস তিনি নিয়েছিলেন মনে পড়ছে। অবিভক্ত ভারতে টেস্ট ক্রিকেটের সংস্কৃতি কলকাতা সূত্রে টেনেছেন উপন্যাসে। ক্রিকেট ম্যাচ, আর হানিফ মোহাম্মদের মতো ক্রিকেট কিংবদন্তিকে স্মৃতিচারণায় ধরেছিল তা। টেস্ট ক্রিকেটের মহাকাব্যিক নান্দনিকতার ভগ্নাংশ এভাবে তাঁর লেখায় উঁকি দিয়েছে ক্ষণিক। ব্যাস এটুকুন! এর বাইরে আর কারো নাম মনে আসছে না, যিনি কোনো একটা খেলা, খেলা কেন্দ্রিক ঘটনা বা খেলোয়াড়কে বিষয়গত করে লিখেছেন মনোজ্ঞ রচনা! মোদ্দা কথা, বাংলাদেশে সাহিত্যের অন্য অনেক ঘরানার মতো ক্রীড়াসাহিত্যটাও অবিকশিত।

Pioneering Sports Writer Mati Nandi’s Book Cover;
Image Source: Collected; Google Image

ক্রীড়াসাহিত্যের দেখা অনেকটা মিলছে ওপারবাংলায় নজর দিলে। ক্রীড়া সাংবাদিক মতি নন্দী কেবল এই একটা ঘরানায় পরপর ফিকশন লিখে স্মৃতিতে অক্ষয় হয়ে আছেন। ‘কোনি’ আমরা পড়েছি দূর ছেলেবেলায়। সাঁতারু এক বাঙালি মেয়ে ও তার কোচের অপরাজেয় হয়ে ওঠার গল্প বুনেছিলেন যত্ন করে। ভারতে ক্রিকেট ধর্মের মতো চর্চিত জনসমাজে। মতি নন্দী নিজে ইট ক্রিকেট ড্রিংক ক্রিকেটের দেশের লোক। ‘ননীদা নট আউট’ তাঁর হাত দিয়ে বেরিয়েছে সুতরাং। বয়ানকুশলতায় উপভোগ্য বইটি। ক্রিকেট এম্নিতেও এমন একটা খেলা, চোখকান আর সুবেদী অনুভব যদি থাকে কারো, খেলাটির প্রতি পরত থেকে সাহিত্যরস নিংড়ে নিতে পারবেন অনায়াসে। মতি নন্দীর এই গুণটা ছিল বিধায় তাঁর বইগুলো একটা সাহিত্যমান গড়ে দিয়েছিল।

যেহেতু বাঙালি, কলকাতার ফুটবল কালচার তিনিও রক্তে বইছেন। ‘স্ট্রাইকার’ ও ‘গোল’ নামের দুখানা ফিকশন রেখে গেছেন বাঙালি পাঠকের জন্য। অনেক আগে পড়া অবশ্য। প্লট ইত্যাদি মন থেকে মুছে গেছে প্রায়। এখন পড়তে বসলে কেমন লাগবে জানি না, তবে মতি নন্দী খেলাসাহিত্যে স্বয়ং একটা মান হয়ে আলো ছড়িয়েছেন। বড্ডো ভালো লিখতেন, তা হোক সাঁতার, ফুটবল অথবা ক্রিকেট। ‘কোনি’ পরে সিনেমাও হয়েছিল। মন্দ নয় এর চলচ্চিত্রায়ন।

শঙ্করীপ্রসাদ বসুর কথাও ইয়াদ হচ্ছে বেশ। বৈষ্ণবরসের ডুবুরি মূলত শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস ও বিবেকানন্দের ওপর গবেষণার জন্য খ্যাতিমান হলেও, ক্রিকেটসাহিত্যে তাঁর দান অতুল। অনলাইনে সুলভ তাঁর ‘রমণীয় ক্রিকেট’ বইটা সম্ভবত আউট অব প্রিন্ট। রসবোধের দিক দিয়ে ক্রিকেট সাহিত্যের চমৎকার নজির এর রচনাশৈলী। শঙ্করীপ্রসাদ ক্রিকেট নিয়ে অনেকগুলো বই লিখেছেন। ‘ইডেনের শীতের দুপুর’-সহ একাধিক। তবে ‘রমণীয় ক্রিকেট’ হচ্ছে লম্বা সময়ের খেলাটির নান্দনিক মাহাত্ম্য নিয়ে রসপরিহাসে মুখর আর্গুমেন্ট লিটারেচারের এক উপভোগ্য দলিল। খেলাসাহিত্যে শঙ্করীপ্রসাদ রসিকসুজন।

আরেক খেলরসিক কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নাম নিতে হয়। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্দরমহল তাঁর সরস বিবরণে ছবির মতো ভাসিয়ে দিতেন পাঠকের চোখের সামনে। ‘কুদরত রঙ্গিবিরঙ্গী’, ‘ম্যাহফিল’, ‘মজলিশ’ পাঠের স্মৃতি মনে এখনো আলো দিয়ে যায়। কুমারপ্রসাদ ক্রিকেটরসিকও ছিলেন যথেষ্ট। হিন্দুস্তানি রাগ সংগীত ও শিল্পীদের গল্প ফাঁদার মাঝখানে ফিলারের মতো ক্রিকেট ঢুকে পড়ত অনায়াস। এবং, বৃক্ষনাথ কমল চক্রবর্তী! ‘মারাদোনা’ লিখেছিলেন ওই সময়টায়, যখন এই ধরায় ফুটবলের আগাপাশতলা বিতর্কিত বর্ণিল চরিত্রটি ধরনীকে রঙিন করে রেখেছেন। কমলের ‘মারাদোনা উপাখ্যান’ বাংলা ভাষায় ক্রীড়াসাহিত্যের শ্রী বৃদ্ধি করেছে তা আর না বললেও চলছে।

নেভিল কার্ডাস যারা পড়েছেন, তারা জানবেন ক্রিকেট সাহিত্য কতটা কাব্যিক ও হৃদয়গ্রাহী হয়ে থাকে। আমাদের স্কুলপাঠ্য বইয়ে ইংরেজি রচনার তালিকায় কার্ডাস ছিলেন একটা সময়। সেই তখন, যখন কিনা ক্রিকেট শহরে সীমিত থেকেছে মূলত। আর আমাদের ছেলেবেলায়, শহরাঞ্চলে যারা ক্রিকেট কমেন্ট্রি শুনতেন রেডিওয়, তারা মূলত ওয়েস্ট ইন্ডিজের দাপুটে যুগটা উপভোগ করছিলেন। তার মাঝখানে খেলাটির নতুন মাইলস্টোন তৈরির ভিত গড়ে তুলছিলেন সুনীল গাভাস্কার, কপিল দেব, ডেনিস লিলি, আর ইমরান খানের মতো লিজেন্ডরা।

ক্যালিপসো-ঝড়ের আঁচ গায়ে নিয়ে আমরা সাবালক হয়েছি। ক্রিকেটের বুনো ঝড়মাতাল সৌন্দর্যের অনেকখানি তখনো বহন করছেন একঝাঁক গতিদানব। ভিভ রিচার্ডস, গর্ডন গ্রিনিজ, ডেসমন্ড হাইন্সের মতো বল্লেবাজরা খেলাটিকে মহার্ঘ করে তুলেছিলেন। ব্যাট হাতে ব্রায়ান লারা, আর বল হাতে কার্টলি অ্যামব্রোস ও কোর্টনি ওয়ালশ ছিলেন সময়ের সঙ্গে অবসন্ন হতে থাকা ক্যালিপসো-ঝড়ের শেষ ঘূর্ণি।

ক্রিকেটে বাংলাদেশের উত্থান ঘটে মধ্য নব্বইয়ে ক্রিকেট বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়ার পর। ভিন্নমত থাকতে পারে নানা মুনির, তবু এটা বলতে হচ্ছে, নব্বই ও পরবর্তী এক-দেড় দশক পরিসীমায় ক্রিকেট খেলিয়ে দেশগুলো থেকে পরপর উঠে আসেন সোনার হরফে বাঁধিয়ে রাখার মতো ক্রিকেটার। ক্যালিপসো-ঝড়ে ভাটা নামার দিনকালে অস্ট্রেলিয়ার দাপুটে উত্থান আমরা নয়নভরে দেখেছি। অজিদের সঙ্গে পাল্লায় ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা পিছিয়ে থাকেনি বেশিদিন। ক্রিকেট রঙিন হয়েছিল নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার সগৌরব অনুপ্রবেশে।

একই ক্রিকেটকে ম্যাচ ফিক্সিং ও ব্যাটিংঝড়ে লণ্ডভণ্ড হতে দেখেছি বটে! হানসি ক্রোনিয়ে ও মোহাম্মাদ আজহারউদ্দীনের মতো ক্রিকেটশিল্পীরা যে-ঝড়ের শিকার হয়েছিলেন মর্মান্তিক। এসব যখন চলছে, স্যার ডন ব্র্যাডম্যান তখনো বেঁচে। নিজের চোখে শচীন টেন্ডুলকারের জাদুকরি উত্থান দেখছিলেন। ব্যাট হাতে যাকে দেখে ব্র্যাডমানের নিজের কথা মনে পড়ে যেত। এবং, দেশি শেন ওয়ার্নকেও দেখছিলেন নয়নসমুখে। লেগ স্পিনের জাদুকরি শিল্প আবদুল কাদিরের পর যাঁর হাতে অনন্য উচ্চতা ছুঁয়েছিল। এবং, ওই সময়টায় উত্থান ঘটেছে মুত্তিয়া মুরালিধরনের মতো অফ স্পিনারের, যাঁর বোলিং অ্যাকশন দুর্বোধ্য থেকেছে বছরের-পর-বছর। রেকর্ডের খেলা ক্রিকেটে ওয়ার্ন ও মুরালির দ্বৈরথ খেলাটিকে দিয়েছিল নতুন মাত্রা।

টেস্ট ও ওয়ানডের সঙ্গে টি-টোয়েন্টি মিলে একটা নতুন যুগারম্ভ রেকর্ডে সয়লাব খেলাটিকে আয়ু দিয়েছে নতুন করে। তিন ফরমেটে মনে রাখার মতো স্মরণীয় ম্যাচের সংখ্যা কম নয়। তর্ক-বিতর্ক ও নাটকীয়তা ছাপিয়ে ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখার মতো ব্যাটেবলের লড়াইয়ে নব্বই ও পরবর্তী সময়রেখায় বিবর্তিত ক্রিকেট ভরভরন্ত তাতে সন্দেহ নেই।

Photo Collage: Nevile Cardus Excellence in Cricket Literature;
Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

টেস্ট ও ওয়ানডে, আর পরে কুড়মুড়ে চানাচুর টি-টোয়েন্টি মিলে দারুণ এই অবর্তনে লুকিয়ে থেকেছে রসের খনি, যার অল্পই সাহিত্যে তুলে আনতে পেরেছেন বাংলার লেখকগণ। সেইসঙ্গে এটাও মিথ্যে নয়, বাংলাদেশে ক্রীড়া সাংবাদকিতায় নতুন বাঁকবদল মূলত ক্রিকেটকে ঘিরে আমাদের চোখের সামনে ঘটতে দেখেছি। একটা লিগ্যাসি উৎপল শুভ্ররা এভাবে গড়ে তুললেন। নতুনরা এখন এটাকে ধারাবাহিক করতে খাটছেন। কলম ঘঁষছেন সংবাদপত্রে। বৈদ্যুতিক গণমাধ্যম ও সমাজমাধ্যমে তথ্য ও পরিসংখ্যানে বোঝাই খেলাটির অন্ধিসন্ধি ব্যবচ্ছেদ করছেন চৌকস ন্যারেটিভ বানিয়ে।

এখানেও আবার এক ভারতীয় ক্রীড়া সাংবাদিকের নাম না নিলেই নয়। গৌতম ভট্টাচার্যকে আমরা একটা সময় ঘরে বসে কলকাতা থেকে আসা খেলার কাগজ কিংবা দেশ ও আনন্দবাজার-এ পড়েছি সমানে। ক্রীড়া সাংবাদিক মূলত, কিন্ত লেখার ছাদে সাহিত্যরসের বাহারে ছিলেন অনন্য। বাংলাদেশে যারা ক্রীড়া সাংবাদিকতায় পরে সাহিত্যরস আনার চেষ্টা করেছেন কমবেশি, গৌতম ভট্টাচার্য সেখানে প্রেরণা থেকেছেন গোড়ায়। উনি এখনো সক্রিয় বলে জানি। অনলাইন পডকাস্টে তাঁকে মাঝেমধ্যে কথা বলতে দেখি, তবে আগের মতো নিবিড় অনুসরণ করা হয়ে ওঠে না।

ক্রীড়া সাংবাদিকতা ও খেলা বিশ্লেষণের ধারা বর্তমানে প্রাণবন্ত তা মানতেই হচ্ছে। খেলাশিল্পের অন্ধিসন্ধির খবর নেওয়া ও ব্যাখ্যায় এসেছে পেশাদার মুন্সিয়ানা। এসব বয়ানে কিন্তু সাহিত্য রচনার অনেকানেক সূত্রও ছড়ানো-ছিটানো থাকে! ব্যবহার করবেন এরকম কবিলেখক মনে হচ্ছে দেশে নেই। ক্রীড়া গবেষণার ভিত সবল না-হলে ক্রীড়াসাহিত্য একটা দেশে কখনো মজবুত হয় না। আমাদের এখানে ফুটবল, ক্রিকেট থেকে আরম্ভ করে অন্য খেলায় যেসব ঘটনা ও চরিত্রদের এ-পর্যন্ত পাচ্ছি, এসব নিয়ে মনে রাখার মতো রচনায় তাই ঘাটতি অনেক। খেলাকে ঘিরে আবর্তিত সমাজ-মনস্তত্ত্ব অনুসন্ধানের তাগিদ গড়ে ওঠেনি। রসেবশে সরস রচনার খামতি যে-কারণে আফসোসের তালিকা দীর্ঘ করে যায়।

এই দেশে রাতারাতি হুয়ান ভিলারো, এদুয়ার্দো গালিয়ানোর মতো লিখিয়ে জন্ম নেবেন, এটা দুরাশা। প্রশ্নই আসছে না আশা করার,—আলবেয়ার কামুর মতো কেউ লিখবেন ফুটবল কেন অস্তিত্বিক উৎস হতে পারে কারো জীবনে। খেলাকে নিয়ে জমাট রোমাঞ্চ সাহিত্য বা আত্মজৈবনিক উপাখ্যান পাওয়ার আশা মুলতবি ধরে নিচ্ছি। তথাপি, একটা ধারা অন্তত এতদিনে গড়ে ওঠা উচিত ছিল মনে হয়।

দুচারখানা সিনেমা বাদ দিলে খেলার অস্তিত্ব কোথাও নেই। কবিতায় নেই। গল্প-উপন্যাসে নেই। চিত্রকলায় নেই। গানে ও নাটকে নেই। আশ্চর্য! বাঙালি খেলাবিমুখ জাতি নয়। ছিল না কোনোকালে। তার জাতীয় ও সামাজিক জীবনে এর একটা বিশেষ স্থান ও আবেদন রয়েছে। নিজেরা পারুক অথবা না-পারুক, অন্যদের খেলা নিয়ে তারা মেতে ওঠে, হয়তো এভাবে নিজের অক্ষমতা ভুলতে চায় সাময়িক।

বাঙালি জনজাতির আবেগ ও মনস্তত্ত্বের নিগূঢ় দিকটি খেলাকে উপজীব্য করে আবিষ্কারের জায়গা কি নেই? অস্তিত্বিক উন্মোচনের সুড়ঙ্গ কি নেই সেখানে? যদি থাকে, তাহলে খেলাসাহিত্যের অন্তত এতদিনে কোমর টান করে দাঁড়ানো উচিত ছিল। অবশ্য, কোনটাই-বা দাঁড়াতে পেরেছে এই দেশে? প্রশ্নটি নিজেকে যদি করি, উত্তর কি আছে সতি?!
. . .

অবদায়ক : আহমদ মিনহাজ : থার্ড লেন স্পেস.কম

আহমদ মিনহাজ-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 16

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *