সেদিন, চুমুকে উষ্ণতা আনা চায়ের মতো চনমনে রোদ ছিল দিনের গায়ে। নদী দেখতে বেরিয়েছি, কাছাকাছি একটা হাসপাতালও। সকাল দশটা মতো হবে।
কমপক্ষে দশ-বারোজন মানুষ লাইন ধরে অপেক্ষা করছিল, বেশিরভাগই নিজের মোবাইল ফোনে ব্যস্ত, এক-আধজন হাঁসের মতো দৃষ্টি ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
কেবল একটা লোক অন্য মানুষগুলোকে কেন্দ্র বানিয়ে তাদের চারদিকে চক্রাকারে ঘোরাঘুরি করছিল। তারপর একসময় ফুটপাত থেকে রাস্তায় নেমে গেল। ডাইনে বাঁয়ে রিকশা, গাড়ি, ট্রাক, সিএনজির বিরামহীন হুলুস্থূলের মাঝখানে বাসের অপেক্ষায় থাকা! বিরক্তিকর বললে কি সবটা বলা হয়?
বাসস্ট্যান্ড আর রাস্তার কোণায় বড়ো বিল্ডিংয়ে একটা নয়নাভিরাম বারান্দা, ছোট্ট কিন্তু খুব সাজানো, কারুকাজময় জানালা গলে ভেতরেও চোখ যায়। এতো সাজানো, রাস্তার পাশে মানাচ্ছে না। আমি মনে মনে গুনগুন করি—হেথায় তুরে মানাইছে না রে…। কিন্তু এ-ফ্ল্যাট অন্য কোনো অভিজাত আবাসিক এলাকায় থাকলে এতো এতো লোকের নজর কাড়ত? সেসব জায়গায় সবকিছুই তো সুন্দর।
গত কয়েকদিনে সবাই এই বাড়ির বাসিন্দাদের চেনে। তারা এখানে থাকে, আবার থাকে না। ঘরের ভেতরের দেয়ালে দূর্ঘটনায় চলে যাওয়া পরিবারের ছবি দোলে। স্বামী-স্ত্রী-পুত্র-কন্যায় সুখী পরিবারের ছবিটি নিয়ে একটি অসুখী বাড়ি ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঘড়ির মায়াবি কাঁটা জড়িয়ে আশ্চর্য বরফকলে আটকে গেছে কতগুলি মানুষের প্রাণস্পন্দন! মসৃণ আগুনে পুড়ে ভোঁতা হয়ে গেছে হীরকখণ্ডের মতো স্মৃতি।
অপেক্ষমান লোকটা ঘুরঘুর করতে করতে সামনে আসে। দেখে আমার মনে হয়—সুন্দর জিনিসের চারপাশে সাধারণ বিষয়ের উপস্থিতি থাকা ভালো। কিন্তু কিছু জিনিস নিজের উপস্থিতি এমন করে জানান দেয়-যে, আশপাশের উপযোগিতা কাজে লাগে না।
রাস্তা দিয়ে বিকট শব্দ তুলে একটা ট্রাক যাচ্ছে, ড্রাইভিং সিটে সিগারেট মুখে ড্রাইভার দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে হর্ন চেপে চলছে। লোকটা আমার চোখে পরিষ্কার চোখ মিলিয়ে হাত দিয়ে সেদিকে দেখালো। এবার আমি ভাল করে দেখলাম একটা লম্বাটে মুখ, গোল গোল চোখ, মাথায় টাক। কথা শুনে মুহূর্তকাল আগের অস্বস্তি কিছুটা কমে গেল। লোকটাকে এতো বিরক্তিকর লাগছে না। সম্ভবত অভিব্যাক্তির কারণে।

—‘আচ্ছা, এখান থেকে হাসপাতাল হেঁটে যাওয়া যায়?’
প্রশ্ন শুনে লোকটা আকর্ণ হাসি দিলো :—‘না না, ওখানে বাসে করে যেতে হবে, এই ওভারব্রিজের ওপর দিয়ে ঐ-যে নদী দেখা যায়, তার ওপারে, ঠিক ওপারে না, ওইদিকে হাসপাতাল। আমিও যাচ্ছি, আপনাকে বলবো নামার সময়।’
জানতে চেয়ে ভুলই করলাম মনে হয়। কী কী যেন বলেই যাচ্ছে। শেষ শুনলাম—‘আমি পৌঁছে দেবো।’
বিরক্তিতে কথা মুখে আসে না আমার। এবার আমিও ব্যাগ থেকে ফোন বের করে অনলাইনের আড়াল তুলে দেই। খামোখাই গুগলে সার্চ করে দেশের হর্তাকর্তা লোকের ইমেজ দেখি। তাদের বাচ্চাকালের ফটো দেখি—এককালের নিস্পাপ কচিপাতার মতো মুখগুলি এখন কেমন শ্বাসরোধী ভোঁতা!
সংবাদেরা প্রবাহমান হয়ে আসতে থাকে। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উপদেষ্টারা শিখিয়ে দিচ্ছেন কী করে ভদ্রস্থ হয়ে জাতিসংঘ পরিষদে কথা বলতে হবে। কোনো এক বক্তৃতায় সে কোরিয়ার কিম’কে উড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে ফেলেছিল। ঘূর্ণিঝড়ের রাতে বাবার হাত থেকে তিন বছরের শিশুকন্যা উড়ে যাচ্ছিল, তাদের কান্নাক্লান্ত মুখের ছবি আরেকটা লিংকে ক্লিক করলে উদ্ভাসিত হয়। একের-পর-এক লিংক, বাক্সে, স্কয়ার কিংবা রম্বসে খুঁচিয়ে যাওয়া কিন্তু কোনোটাতেই মনোযোগ না দেয়াই সম্ভবত অপেক্ষার মানে। এসব অপেক্ষা অর্থবহ হয়ে ওঠে কখন? যখন আরাধ্য কিছুর প্রাপ্তি ঘটে, তখন?
বাস এলে লোকটা আমাকে পথ দেখিয়ে আগে উঠতে দেয় যেন আমি মহামান্য কেউ। যখন বসতে নেব, তখন আমার কাঁধের পেছন থেকে বলে উঠল :—‘এই আপা হাসপাতালে যাবেন। চিনেন না। অসুবিধা নাই, আমি দেখায়ে দিব।’
কার উদ্দেশ্যে বলে? ড্রাইভার, কন্ডাক্টর? তার বলা বাক্য তো না, যেন বিরাট ঘোষণা! বাসশুদ্ধ লোক আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
—‘না না, আমি নদী দেখতে যাচ্ছি’;—এ-কথাটা আর বলা হয় না আমার।
সামনের দিকে একটা সিট খালি। আমার পাশের যাত্রী চর্চিত চেহারা,পারফিউম, বাহারি হাতব্যাগ, ব্র্যান্ডেড সানগ্লাস চোখে বসে আছেন, যেন এই বসে থাকা কোনো অনভিপ্রেত সময়কে মহার্ঘ করার অপেক্ষা। আমিও গুছিয়ে বসে বাইরে দেখি। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস।
একটু পরে পিঠের ওপরে ঝুঁকে এসে পেছনের সিটের এক বয়স্ক লোক জানতে চাইছে,—‘হাসপাতালে কোন বিভাগে যাবো আমি?’
এই ব্যক্তিগত প্রশ্নের জবাব দেবো? তারওপর লোকটির কণ্ঠস্বর কেমন ষড়যন্ত্রকারীর মতো।
আমাকে ইতস্তত দেখে বলে,—‘না মানে, আমাকে বলতে পারেন। আমি ওইখানে চাকরি করি।’
এবার মাথা ঘুরিয়ে তাকালাম। চুল উষ্কখুষ্ক। মুখ থেকে দুর্গন্ধ আসছে। জামাকাপড় ততটা পরিষ্কার নয়। চাকরি করে! কী চাকরি? পিওন, দারোয়ান, নাকি মর্গে লাশকাটার কাজ? গায়ে শিরশির অনুভব ছড়িয়ে পড়ে আমার।
—‘সমস্যা নাই, আমি খুঁজে নিতে পারবো।’
—‘না না অনেক বড়ো হাসপাতাল। ভিতরে ঢুকলে আপনে হারায়া যাবেন।’

কী জবাব দেবো বুঝতে পারছি না। আচ্ছা, বাসের হেল্পার কি সব জানালার পর্দা টেনে দিয়েছে। ভেতরে ছায়াছায়া অন্ধকার। চারপাশের শব্দ ছাপিয়ে কোথাও একটা ঢোলের আওয়াজ। এমন বিষণ্ন ঢোলের আওয়াজ আমি আগে কোনোদিন শুনিনি।
এবার পেছন দিক থেকে এক মোটাসোটা মহিলা এগিয়ে উঠে এলো। শাড়ির ওপরেও গায়ে মাথায় ওড়না জড়ানো। আমার সিটের কাছে স্টিলের হাতল ধরে দাঁড়াল—‘হ্যাঁ হ্যাঁ, এই হাসপাতালে হারানো ওয়ান টু’র ব্যাপার। আমিও হারায়ে গেছিলাম।’
—‘সত্যি কিন্তু, আমিও একবার রাস্তা পার হতে গিয়ে হারিয়ে গেছি’—একটা রিনরিনে বালকের কন্ঠস্বর। কত বয়স, বছর পাঁচ ছয়েক হবে। হঠাৎ খেয়াল করে দেখি বাসে বেশ ভিড়। এর ভেতরে কখন এতো লোক উঠে পড়ল!
বাচ্চা ছেলেটা একেবারে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পেটানো পেশির এক ভদ্রলোকের সঙ্গে সম্ভবত নদীতে মাছ ধরতে যাচ্ছে। লোকটার পিঠে তূণের মতো আধারে মাছ ধরার ছিপ। শখের মৎসশিকারী। ছেলেটির মাথায় সবুজ রংয়ের হেলমেট, গ্ল্যাডিয়েটরের যোদ্ধার শিরস্ত্রাণের মতো খাঁজকাটা।
বাচ্চাটির দিকে হাসি হাসি মুখে ঝুঁকে যাই আমি—‘তারপর তোমাকে কোথায় খুঁজে পেল তোমার বাবা মা?’
—‘আমাকে তারা আর পায়নি। আমি হারিয়ে গেছি।’
—বাচ্চা ছেলেটির বেমানান গম্ভীর মুখ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ওপর তৈরি সিনেমার ইহুদি পরিবারের সদস্য যেন।
সঙ্গের লোকটি ধমক দেয়—‘বেশি কথা বলতেছো বাবু। জানো না, কথা বললে মাছ আসে না। তোমার ক্যাচ কমে যাবে। আজকে যেন কত তোমার টার্গেট?’
—‘মিনিমাম পাঁচটা বাবা।’
—‘তুমি কি চাও এর’চে কম ধরা পড়ুক?’
—‘না, না না। আমি সবসময় রনির’চে বেশি মাছ ধরতে চাই।’
—‘গুড, এই তো চাই। সবসময় মনে রাখবে রনির চেয়ে বেশি। শক্ত করে হ্যান্ডেলটা ধরো বাবু। পড়ে যাবে। দেখো, বাসটা কেমন দুলতেছে।’

হঠাৎ মনে হলো আমি সম্ভবত হাসপাতালে চলে এসেছি। একটা লম্বা করিডোর ধরে সেই মোটাসোটা মহিলা, পরনে একটা স্লিপিং গাউন, নিজের ইন্ট্রাভেনাস স্ট্যান্ড ধরে ধীরে ধীরে হাঁটছে। ক্যানুলা তার হাতের শিরা ভেদ করে ফোঁটা ফোঁটা তরল ঢুকিয়ে দিচ্ছে। মহিলা বিড়বিড় করছে—‘আমি হারিয়ে গেছি। আমি হারিয়ে গেছি, কেউ কি আমার কেবিন খুঁজে দিতে পারো। ওখানের ছোট্ট দেরাজে আমার কালাইডোস্কোপ রাখা আছে, আমার কালাইডোস্কোপ।’
লম্বা করিডোর যেন পিচ বিছানো কালো, মহা সুড়ঙ্গের মতো ওপারের কোনো কালো মহাসাগরের স্রোতে মিশছে। বদ্ধ জায়গায় আমার দম আটকে আসে, ক্লস্ট্রোফোবিয়া আছে। কিন্তু এই নিচু ছাদ-সুড়ঙ্গের মধ্যে তেমন কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। হেঁটে যেতে পারছি। ছাদ ফুঁড়ে আকাশ নেমে আসছে দিব্যি।
বাসযাত্রীরা সবাই একসঙ্গে সমস্বরে আমার দিকে এগিয়ে এসে বলছে—‘কোথায় যাবে বলো? আমরা এই হাসপাতাল ভালো চিনি। অনেকদিন ধরে আসি, যাই। কাজ করি। বলো বলো!’
—‘না না, আসলে হাসপাতাল না, আমি একটু নদীর ধারে, পানির কাছে যেতে চাই’—বিড়বিড় করে বলা কণ্ঠস্বরও সবাই কীভাবে-যে শুনতে পায়! তারপর সবগুলি মুখ কেমন চুপসে যায়। কেউ একজন থমথমে গলায় বলে—‘এখানে নদী কোথায়? দেখছো না কেমন কালো আর কংক্রিট।’
তাহলে আসার পথে বাসে বসে আমি কী দেখতে দেখতে এলাম! জলরাশির ঢেউ রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনে আরো নীল দেখাচ্ছিল, যেন আকাশের সীমানা এসে লাস্যময়ীর মত গা এলিয়ে আছে। চারদিক এমন সাজানো! রঙিন ফুলের ঝাড়, কাঠের পাটাতন দেয়া মঞ্চের ওপরে জাফরিকাটা ছাদ, সূর্যের আলো যেন ঝাঁঝর ভেদ করে পরিশোধিত হয়ে নামে। বসবো, নাকি চারপাশ ডিঙিয়ে সটান পানির ওপরে যাবো, পানির ওপরে হাঁটতে পারবো বলে মনে হচ্ছিল। পায়ের নিচে থকথকে জেলাটিনের মতো স্বচ্ছ নীল পানি, আমি হাঁটবো, গভীর তলদেশ থেকে একটু ওপরে উঠে এসে জলজপ্রাণীরা বিস্ময়ে দেখবে সামান্য ফেটে যাওয়া আমার গোড়ালি! আর ওই-যে কবিতা বললাম নদীর উদ্দেশ্যে?
—‘পাড়ার নদীর নাম মনভুলে মহানন্দা হলে ওর সঙ্গে আত্মীয়তা চাই।’ এমন সরল লাইন কঠিন পাতায় মুড়ে বাজারে আনাই তো যায়, কী দামে বিক্রি হবে, কতদিন তুমুল ঘূর্ণির নিচে ঝড়…
এইসব বুঝে কিংবা না-বুঝেই নদী আর ঢেউদের বারোটা বাজাই।
এবার পেছনের সিটের বয়স্ক লোকটা পারলে আমার কানের কাছে গুঁতো মারে—‘এই, তুমি নদী নদী করছো কেন? ঐ-যে বড়ো বড়ো গাছগুলো দেখছো, ধনী শিশুদের মতো সতেজ, সেগুলো পার হলে বড়ো টেনিস কোর্ট, তারপর পিচের রাস্তা,—ওখানেই হাসপাতাল। নিশ্চয়ই তুমি ওম্যান রিসোর্স-এ যাবে। হুহ, না বললে কী হবে, আমি তোমার পাটভাঙা শাড়ি দেখেই বুঝতে পেরেছি। চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছো!’
কিছু বলে ওঠার আগেই এবার আমার পার্শ্ববর্তিনী হাতে মৃদু চাপ দিয়ে আমাকে থামায়—‘শোনো, এখানে না। তুমি যেখানে যাবে, সেখানে আমিও যাচ্ছি। আজকে তিনজন কাজ শুরু করবে আমার সঙ্গে, তুমি নিশ্চয়ই তাদের একজন।’ কন্ঠস্বর শুনলে মনে হয় মেয়েটির হুকুমদারি করার অভ্যাস আছে।
আমি-যে শিক্ষানবিশীর জন্য এখানে আসিনি সেকথা তাকে বলার সুযোগ পাই না। সানগ্লাস খুললে তার আয়ত গভীর চোখ দেখা যায়, সেখানে কোনো কালো মণি নেই। সাদা বৃত্ত কয়েকবার ঘুরিয়ে সে আবার তার বাহারি রোদচশমা যথাস্থানে রাখে।
—‘আমার ডিপার্টমেন্ট সাইকিয়াট্রি। ঐ-যে লোকগুলিকে দেখছো, ওরা সবাই আমাদের কেস।’
—‘আমিও ইন্টার্ন’—ডানদিকে একজন এসে আমাদের কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। তরুণীটির বিশাল পেট, দেখে মনে হয়—যে-কোনো মুহূর্তে প্রসববেদনা শুরু হবে এবং ওর দীর্ণ শরীর ফুঁড়ে একটি শিশুর আগমন ঘটবে পৃথিবীতে। মেয়েটি ঝুঁকে কথা বলতে নিলে ওর কালো আর বাদামি ঢিলেঢালা কামিজের নিচে বিরাট পেট আমূল ঢেকে দেয় আমার জগৎ।
অন্তঃসত্ত্বা মেয়েদের নিয়ে দ্বৈত অনুভূতি কাজ করে আমার মধ্যে। আমার সত্তা দুটো ভাগ হয়ে যায়। একভাগ ঈর্ষায় বেগুনি রং ধারণ করে। অন্যভাগ গর্ভস্থ শিশুটিকে ছুঁয়ে দেখতে চায়। এজন্য আমি প্রায়ই প্রেগন্যান্ট মহিলাদের পেট স্পর্শ করি। খুব আল্লাদ করে আদর করি। ইচ্ছে করে একটানে ওর পেটের বাচ্চাটা আমার পেটে নিয়ে আসি।

কোনো কোনো দিনে এ-ভাবনাটা আমাকে এমন গ্রাস করে-যে দিনের গনগনে রোদের মধ্যেও শ্লথ তাঁবুর মত অন্ধকার নেমে আসে। মনে হয় চারপাশ মেঘলা আর আমি চাদর জড়িয়ে বুকের কাছে হাঁটু মুড়ে শুয়ে থাকি, শুয়েই থাকি।
কিন্তু এখন এমন অপরিসর জায়গায় অন্তঃস্বত্ত্বা মেয়েটিকে সহ্য হচ্ছে না। দূর্বল হাতে ঠেলতে থাকি, মেয়েটি সরছে না। আচ্ছা, আমার হাতের জোর গেল কোথায়? স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ভারী লৌহগোলক উত্তোলনে একবার প্রাইজ পেয়েছিলাম না আমি?
মনে হলো দিগন্তের কোথাও বিদ্যুৎ তার আলো এবং শব্দসমেত পালিয়ে গেছে। খুঁজতে বেরুলে হয়। পাশের মেয়েটিকে বলবো? মনরোগবিদ্যা বিভাগের? নাহ, থাক। ও হয়তো চশমার ফাঁক দিয়ে খুব ভদ্র অপরিচিত দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে থাকবে। ওর ঠাণ্ডা কণ্ঠস্বর আমাকে আবারো নিশ্চিত করে জানান দেবে-যে সবকিছু ঠিকঠাক নাই। তারপর আমার দিকে সর্বরোগহারী দৃষ্টিতে প্রশ্ন বানিয়ে চেয়ে থাকবে।
—‘হ্যাঁ, আমার মা হতে জটিলতা আছে। তার আগে আমার আরো বড় সমস্যা আছে। আমি আমার প্রথম প্রেমিকের নাম আর চেহারা ভুলে গেছি। সবাই-যে বলে প্রথম প্রেম ভোলা যায় না!’
বৃষ্টির পরে রোদে ধোঁয়া সন্ধ্যাবেলা ছিল। আমি নতুন কেনা শাড়িটা পড়েছিলাম। প্রথম কাজলও দিয়েছিলাম চোখে।
—‘কোথায় পরিচয় হয়েছিল?’ মনোবিদ্যা জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে দিয়েছে।
—‘সে-পর্ব বড়ো ধোঁয়াশা হয়ে গেল। খুব ঘঁষা কাচের মতো।’
ধুম বৃষ্টির সময় ওয়াইপারে গতি বাড়িয়ে ভেতরে এণ্টিভ্যাপারের বোতাম টিপে ভাপ সরিয়ে দেয়ার মতো আমি স্মৃতির পাতা উল্টাই, মুছতে থাকি, যদি ধোঁয়া সরে গিয়ে স্মৃতি স্পষ্ট হয়। কয়েকটা ক্লু-যে মনে পড়ে না, তা না। একটা বলিষ্ঠ কিন্তু নরম হাত। মুখ ভর্তি দাড়িগোঁফের জঙ্গল। সে হাত ধরে রমনা পার্কে দু’এক পাক হাঁটা। আধা দেয়াল ঘেরা কোথাও বসে ফেরিওয়ালার চা খাওয়া। আর সেই স্নাত বিকেলবেলা।
—‘তার আগের কথা মনে পড়ে না?’
—‘আগে পরে কিছু দরকার নেই। কিছুই তো মনে পড়ে না। যা মনে পড়ে তা কেবল বিভ্রান্তি বাড়ায়।’
অন্তঃসত্ত্বা এবার নড়েচড়ে বসে।
—‘আরো বলো শুনি।’
—‘বিভ্রান্তি শুনে কী করবে? আমি জানি ‘অভিতব্য’ বলে কোন বাংলা শব্দ নাই। অথচ গতকাল থেকে কী আশ্চর্য খালি এই শব্দটা মাথায় ঘুরছে! গুগল সার্চও দিয়ে দেখেছি। কোনো মানে হয়? অভিনব, অভিনিবেশ, অভিনেতা, অভিমান সবকিছু বাদ দিয়ে ‘অভিতব্য’ শব্দটা, মনে হচ্ছে কোথাও, সৌরজগতের ভেতরে, বাইরে কোথাও কোনো মানে আছে নিশ্চয়ই। শব্দেরা যেমন আকাশে জমে থাকে, আমি প্রায়ই আকাশে শব্দ পাঠাই। কীভাবে? সন্ধ্যেবেলা বাড়ির পেছনে উঠোনে গিয়ে গলা খুলে চিল্লাই। যেন শব্দটা ভারী হয়ে বেশিদূর উড়তে না পারে। আকাশে নিচের দিকে থাকে। তাহলে ভবিষ্যতে চাইলেই অর্থসহ টুক করে নিচে পেড়ে আনা যাবে।’

এইবার মনোবিদ্যা আর অন্তঃসত্ত্বা দু’জনে একযোগে আমাকে দেখতে থাকে, যেন আমি এক আজব গ্রহের অত্যাশ্চর্য প্রাণী। সহসা করিডোরের কালো রং ফুঁড়ে সূর্যের আলো আর গাছপালা দেখা যায়। একটা চিকন আলোর রেখা পুকুরে ঢিল ছোড়া জলের মত ছড়াতে থাকে। বাস থেমেছে।
বাচ্চুর বাবা তার হারিয়ে যাওয়া ছেলেটিকে নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে। তার পিঠে তূণের ভেতর থেকে মৎসশিকারের সরঞ্জাম উঁকি দিচ্ছে। পানি নীল কাচের মতো স্থির। তার বাবা কি পুত্রসহ পানির ওপর দিয়ে হেঁটে যাবে? আমিও নামতে চেয়েছিলাম কিন্তু এখন ইচ্ছে করছে না। অথবা সহযাত্রীরা আমাকে নামতে দেখলে হৈ হৈ করে উঠবে ভয়ে আমি আর নামি না। বাসের জানলায় মুখ রেখে চুমুকযোগ্য রোদের মধ্যে ওদের চলে যাওয়া দেখি।
আজকাল সন্ধ্যা দেরিতে হয়, কিন্তু ছাতাপড়া রুটির মতো ছ্যাকরা মেঘ থাকে আকাশে। হঠাৎ দিগ্বিদিক কাঁপিয়ে বিজলি চমকায়। আমি কিছুক্ষণ দু’হাতে কান চেপে থাকি। জানি এখনই বজ্রপাত হবে, শব্দ হবে না।
আচমকা বাস খালি করে সব লোক কোথায় কোথায় যেন নেমে যায়। বুকের ভেতর শূন্যতার হাহাকার টের পাই। কোনো নাম নেই এ-হাহাকারের। বিষণ্নতার ভারে দলছুট যে-তারা, তার দিকে তীব্র তিরের মতো এসে বিঁধে যায় এ-হাহাকার, এক শলা বিদ্যুৎ তাকে দু’ফলা করে চিরে দেয়। ইচ্ছে করে কোথাও যাবো না, দু’হাঁটুর ওপরে মুখ চেপে বসে থাকবো, বসেই থাকবো। কিন্তু, তারপরও আমি জানি আমরা আবার বাইরে বের হবো। নিয়ম করে দেখবো রাস্তাঘাট, নদী, এমনকি হাসপাতালও।
. . .

লেখক পরিচয় : নাহার মনিকা : ওপরের ছবি অথবা এখানে চাপুন
. . .

থার্ড লেন স্পেস অবদায়ক নাহার মনিকার অন্যান রচনা পাঠের জন্য এখানে চাপুন
. . .


