পোস্ট শোকেস - সাহিত্যবাসর

তোমার কটিমেখলায় আমি-১ : হেলাল চৌধুরী

Reading time 5 minute
5
(12)
কবিতা সিরিজ : তোমার কটিমেখলায় আমি-১
রচনা : হেলাল চৌধুরী
Artwork: Meghdoot b Ramgopal Vijaivargiya; Source & Credit: theheritagelab.in

কালিদাস চেয়ে

তুমি নগ্নতায় নেমে এসো শীতভোর কুয়াশার আদিম শরীরে
আমি ছুঁয়ে নেব তোমায় মগ্নতায় সূর্যের সবুজ বিধানে
আমরা ছিঁড়ে নেব তবে তার ধোঁয়াশার সব জাল…

আমাদের মাঠে হাড়ে হেসে হেসে বাড়ে কুমারীর বালিজুরি ধান
মৃত্তিকা বুকে ডানা মাখে জোড়া শালিকের হলুদ ঠোঁট
আমরা ছিঁড়ে ফেলি পালকের আঙুলে পৃথিবীর সব জঞ্জাল…

তোমার মেঘদূত এসে বলে গেল, নদীর বৃষ্টির কানে কানে
কালিদাস এখানে এসেছিলেন একদিন এঞ্জিনে সংগোপনে
গভীর আহ্লাদী শরীরে চুষে নেন তিনি জরায়ুজ মনছাল…

তোমার যুগল বাহু শরতের সফেদ মখমল কাশ
আঙুলমালা নওফেল ফিদা
সুদর্শন যুবকের প্রণিধানে কিশোরীর সত্তার তুমুল উৎসর্জন…

যক্ষের প্রিয়া সরায় রাখে তার বক্ষের দিয়া মেঘদূতওড়নায়
মগ্নতার অন্ধকারে ঢাকে নগ্নতা
কালিদাসমেঘ, শরীরিণী চেয়ে যমুনার বুকে চায়… বিসর্জন…

শুধু… পুরোহিত-মেঘ
ঝেড়ে নেয় আবেগ
নেমে যায় শ্বেতবলাকায় মৃত্তিকাশরীরে দেখে নেয় সে শরণ…

আমরা তো তাই কালিদাস চেয়ে রাঙাই ধানশালিকের ঠোঁট।
. . .

নিশীথ

সুন্দরী ঐন্দ্রিলা ইলা
এখনও ঘুমোওনি বুঝি তুমি
জেগে জেগে নিশীথ করো পার, চুপিচুপি নক্ষত্র আঁকা ভূমি
নির্জন আকাশ; চিবুকের কাছে নিবিড় নিধানে কেমন উন্মুখ
কুয়াশার ধূম্রজাল মশারির পেট শত দীর্ঘ আয়ু সাঁতরাতে
থাকে ঘোর, আনমনা রাত্রির বিধানে তোমার সে-ই দুটি চোখ।

বৃক্ষের প্রবিধান
আমি…
ছায়াশরীর ছুঁয়ে নেয় প্রণয়ের দুই সুনিবিড় আহ্লাদ
দুই জন দুই পার নিরাপদ কোলাহল অপার
কখনও নদীসিথান কখনও-বা সমুদ্দুর
এক নীলিমায় গোধূলির রঙে আকাশের রঙ মেখে বুকে তবু
তুমি সুন্দরী ঐন্দ্রিলা ইলা;

শোনো মরু মায়ামরীচিকা… আমি আজও জানি
এখনও তুমি এই ঘনঘোর অন্ধকার আকাশে
নক্ষত্রের নিধানে দীপ্তিময়…
বাতাসে তুমি হিমেল; সমুদ্রের ঢেউয়ে তুমি সমুজ্জ্বল জল।
. . .

চিলেকোঠা ভরা মলে

প্রতিদিন অফিস শেষে চিলেকোঠায় ফিরে দেখি
বারান্দা রোয়াক বেলকনির চিপাতে
অধিকন্তু, বিছানার চাদরে ও বালিশের কাভারে
মগজে অজস্র দুশ্চিন্তার মতন
তেলাপোকা কি আরশোলার অগণিত মল…

লালবাজার পেরোলেই কাষ্টঘর
সেখানে দেখা মেলে অসংখ্য শূকর
সারি সারি মিছিলে
তাদের
কদর্য
পাছার আন্দোলন…

চিলেকোঠার টেবিলে চেয়ারে খাটে ও বাথরুমে
বেসিনে কমোডে
মেজে দরজা জানালা ও বারান্দার গ্রিলে
কাপে ও পিরিচে
অ্যাস্ট্রেতে
দিনশেষে মগজে
কতিপয় মানুষ হাঁটে
তেলাপোকা আরশোলা ও শূকরের ছায়া মেখে…

আমাদের চিলেকোঠা ভরা তাই অজস্র মলে।
. . .

তুমি যেন না, কখনও শিলাজিৎ হয়ো না

অদিতির নদে, ভেজালাম আমি — তোমার কবিতার বুক
তার জলে ধুয়ে নিলাম পিঠাপিঠি জীবনের যত ভুলচুক।

তুমি চেয়েছিলে আকাশে, আষাঢ়ে মেঘ;
আমি ছিটালাম তোমার শরীরে শ্রাবণের বৃষ্টি
ভেজালাম লাঙ্গলে, তোমার শুকনো আল
তবু তোমার জমিনে, তবে নেচে ওঠুক অনবদ্য কৃষ্টি;

দোহাই তোমার তুমি যেন না, কখনও স্ফীত মাঠ হয়ো না…

কতটা পথ হেঁটে গেলে, বলো তুমি…
হে বৃক্ষ, হে ছায়াবতী
ভিজিয়ে নিতে পারি আমি তোমার নৈনিতাল
তোমার সে আকাশে মহালয়া, ভোরের আরাধ্য দৃষ্টি;

আমিও তো চাই — ঘুমাই, কবিতার নির্জন অদিতির বক্ষে
চাই কবিতার নগ্ন নরম পিঠ;
হে বৃক্ষ, হে মায়াবতী
দোহাই তোমার তুমি যেন না, কখনও শিলাজিৎ হয়ো না।
. . .

মনীষার হাতের আগুনের ফল চেয়ে

মনীষার ঘরে ঢুকে দেখি আমি মনীষা নেই আমার বিছানায়…

মনীষা, তুমি বুঝি আমার অন্ধকার বাগানবাড়ি
জানালায় ঘোর কালো শামিয়ানায় নাচে কালো কালো
বেড়ালের চোখ
জোছনা ডুবে গেছে আলোর খরায় মরা নদীর জলে…

একা হয়ে আছি নিজের পায়ে দাঁড়ানো নির্জন সড়ক
গাছের মতো পাহাড়ের মতো
নদীর বুকে হাঁটতে হাঁটতে বলি
শোধন করো নদী
আমাকে, তোমার নাসরিনজলে—

মনীষার অন্ধকারে
বৃষ্টির মতো অগোছালো হয়ে গেছি আমি
আলো থেকে সরে পড়ে … ঢুকে গেছি
অন্ধকারে
গহ্বরে
গুহার ছিদ্রে
গর্তে…

জানালা খুলে দেখি রাত্রিরও নক্ষত্ররাজি
আসমানে খোঁজে মনীষার বাড়ি…

অন্ধকারে আজও আমি বিছানায় ছুঁইনি
মনীষার আইরিনপাণি…

মনীষার হাতে গন্দম ফল
বনিআদমের চোখ অমাবস্যায় অতল
মনীষার হাতে আগুনের ফল
বনিআদমের চোখ অনুজ্জ্বল বেতফল
মনীষার বন আলোকিত জোছনায় প্লাবন
বনিআদমের নগর অন্ধকারের শহর…

অন্ধকারে
কাঁদি
বনিআদম
আমি, মনীষার হাতের আগুনের ফল চেয়ে।
. . .

Abstract: AI Modified Artwork; Source & Credit: Designs Vanguard: Art of Life: Pinterest

তিন সতীন

তোমাকে দিলাম জৈন্তিয়া পাহাড়
আমি নিলাম তবে তোমার নলুয়ার ডাহুকা নদীর বাঁ-হাড়
তোমার হাতে যিশুর ছড়ি
আমার হাতে নূহের লগি;
ছড়ি ভাঙুক পাহাড়িকা পথ, লগি ভাঙুক — জলের পর্বত।

ফুঁসে ওঠো তুমি, এখনও চর্যাকুমারী নারী
ময়ূরপুচ্ছ ছাড়ো, ডাহুকার জলে তুমি এখনও জলপরী
পুচ্ছ ভরে পিন্দ ফুল পাখি ও নদী
শবর ছাড়িয়ো, নগরকন্যা তুমি সুন্দরী শবরী
শোনো শবরী — এই নগরে শবর আজ মবের কালনেমি।

শ্রী…কীর্তন ভরা — নিসর্গ-রাধা-কৃষ্ণ — তারা তিন সতীন
গঞ্জা ফুলে সজ্জিতা তুই শবরী সুন্দরী;
রাধাকে কাঁদায় সুরুজ
রাত্রি তার ঘনঘোর অন্ধকার, কান্দে সুখচান্দে
প্রেম বিরহে রাধিকা লো আমার, ঝিলের জলে
তবু তুই ফিরোজা রঙের আসমান…

হেলাল ভনে, অয়ন যদি ছাড়ে রাধিকা লো
তোরে, তবু জানি তুই ডাহুকার জলে কুমারীঅপ্সরী।
. . .

সংহতি

আমাদের শহরে ফুটপাতে
কাজী হোসেন ভাইয়ের মাল্টা-কমলার দোকান;
আমাদের বাড়ির উঠোনে হাসে
ফেব্রুয়ারি মাসে, রোদেলারঙে কমলার বাগান।

আমাদের বাড়ির বাগানের, কমলার গাছে
ফেব্রুয়ারি মাসে অজস্র কমলা ঝুলে আছে
আমাদের বাড়িতে শুধু অনাহার নাই ঝুলে…

আমাদের শহরের
কাজী হোসেন ভাইয়ের বাড়িতে, প্রতিদিন দেখি
ঢুঁ মারে দিনে ও রাতে নিদারুণ অনাহার; তাই
কাজী হোসেন ভাইয়ের দোকান থেকে, আমি
প্রতিদিন কমলা কিনে তার অনাহার সরাতে যাই।

আমি কমলা কিনলে… জানি
কাজী হোসেন ভাইয়ের অনাহার… দূরে সরে যায়।

কাজী হোসেন ভাইয়ের দোকান থেকে, বলি তাই
তুমিও প্রতিদিন কমলা কিনে নিয়ে… খেয়ো ভাই।

কাজী হোসেন ভাইয়ের দোকানে আমরা
কমলা কিনলে বাড়ি থেকে তার সরে যায় অনাহার।
. . .

পিয়াইন নদীর তীরে

পিয়াইন নদীর তীরে
আমরা বাস করছিলাম
আর সেখানে
আমরা আমাদের প্রভুর গান গাইতে চাইলাম…

দুষ্টরা এসে গান গাইতে নিষেধ করল
তারা আমাদের প্রভুর বিরুদ্ধাচরণ করল;

আমাদের একটা গানের প্রয়োজন
প্রভুর গান
হাতুড়ির গান
বেলচার গান
শাবলের গান
শরীরের গান
ঘামের গান
আমাদের প্রভুর গান
আমাদের প্রভু স্বাধীনের গান;

আমরা কীভাবে প্রভুর গান গাইব…
দুষ্টরা গানের বিরূদ্ধে প্রতিকূলতা সৃষ্টি করল;

তবু আমরা আমাদের প্রভুর গান গাইতে চাইলাম
দুষ্টরা এসে আমাদের বন্দি করে নিয়ে গেল
আমাদের অপরাধ আমরা গান গাইতে চেয়েছিলাম;

আমরা একটা শব্দ শুনলাম
আমাদের প্রভুর কণ্ঠ
আমাদের প্রভুর প্রথম ধ্বনি
প্রথম গান
প্রথম কবিতা
আমাদের প্রভুর নতুন ধ্বনি
নতুন গান
নতুন কবিতা;

দুষ্টরা এসে গান গাইতে নিষেধ করল
তবু আমরা আমাদের প্রভুর গান গাইলাম…

হ্যাঁ, আমরা আমাদের প্রভুর গান গেয়েই যাব।
. . .

তোমার কটিমেখলায় আমি

কটিমেখলায় তুমি, এখনও ককেশাশের নারী
আমি, হিমালয় ছাড়ি হাঁটি তোমারই হাত ধরি…

চায় কাশ্মীর ছুঁয়ে আমৃত্যু পামির হিন্দুকুশ পর্বতমালা
সাঁতরাতে চায় লড়াকু স্তালিনের নদ
আসামের ছাওয়াল
পিয়াইনের সন্তান
বাসিয়ার পুত
সুরমার ছেলে
আমি।

জঠরে কৃষ্ণসাগর পাড়ি দেয় সে
পাড়ি দেয় অন্ধকারে অজস্র গিরিশৃঙ্গ
কেটে যায় দেবদারু বন
সারি সারি বৃক্ষনারী শ্যামলিমায় তুমি
হাতে
চায়, ককেশাশের নারী ইউরোপ নয় এশিয়ার পরী
আসামের ছাওয়াল
পিয়াইনের সন্তান
বাসিয়ার পুত
সুরমার ছেলে
আমি।

অনেক পর্বত হেঁটে অবশেষে এলে তুমি
ককেশাশ পর্বত শিরে সোভিয়েত সন্তান স্তালিনের নদ
বুকে হাঁটে তাই শিরদাঁড়া টানি স্তালিন মেখে
আসামের ছাওয়াল
পিয়াইনের সন্তান
বাসিয়ার পুত
সুরমার ছেলে
আমি।

হোয়াংহু ইয়াংসিকিয়াং কাবেরী গোদাবরী জলে আজ
ভেসে ওঠে জমি ও জিরাত
লাঙ্গল জোয়াল
গড়ে ওঠে মানুষের ঘর গেরস্থালি
মহেঞ্জোদারো হরপ্পা চেয়ে
শস্যচাতালে
নেমে এসেছিল একদিন ইয়াংসিকিয়াং হোয়াংহু ভোর
ধান গম আর যবে।

যমুনার জলে সাঁতরালো স্তালিনের নদ
আসামের ছাওয়াল
পিয়াইনের সন্তান
বাসিয়ার পুত
সুরমার ছেলে
আমি।

দ্রাবিড়েরর হাত চেয়ে মেখে নেয় আর্য, পশুর পালক
এখনও শুয়ে বীর্যে… আর্যের সন্তান অনার্যের জঠরে।
. . .

Prehistoric Rock Paintings: Indus Motifs; Source & Credit: geneticliteracyproject.org

. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ হেলাল চৌধুরীর অন্যান রচনা পাঠের জন্য এখানে চাপুন …

লেখক পরিচয় : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপ দিন

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 12

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *