গৌড়চন্দ্রিকা : জলকাহন-এ সিদল শুঁটকি সমাচার
সিদলখোর সিলটিদের নিয়ে একটি ফেসবুক পোস্টে নিজের মমতাভরা অনুভূতি জানিয়ে কিছু কথা লিখেছেন দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়ানো তারেক অণু। তাঁর ‘পায়ের তলায় সর্ষে’। সেই টানে দেশ-ভিনদেশে ঘুরে বেড়ান। ভ্রমণবিদের চোখে অবলোকন করেন জনজীবন ও প্রকৃতির রং-রূপ-রসের সবখানি! মমতা জড়িয়ে থাকে সেই দেখা এবং দেখানোয়।
ফেসবুকে তাঁর লেখালেখি ও ট্রাভেল ব্লগিং অন্য অনেকের মতো আমিও সময় পেলে সাগ্রহে দেখার চেষ্টা করি। যেমন, ভালো লেগেছিল, ভাটিবাংলার ছেলে সেজুল হোসেনের ইউটিউব চ্যানেলে তাঁকে অকপটে কথা বলতে দেখে। বাংলাদেশে যাঁরা ট্রাভেল ব্লগিংটা করেন, তাঁদের মধ্যে তারেক অণু সংবেদী একজন। সাহিত-শিল্প পড়ুয়া মন তাঁর বলা কথা ও ভিডিওতে উঁকি দিয়ে যায়। এ-কারণে তাঁকে শুনতে ভালো লাগে।
যাইহোক, তারেক অণু তাঁর ফেসবুক পোস্টে সুপরিচিত আখ্যানশিল্পী ও গবেষক পরিমল ভট্টাচার্যের পুরস্কৃত, প্রশংসিত ঐতিহাসিক আখ্যান ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’ নিয়ে দু-কথা লিখেছেন। ইতিহাস ও কল্পনার সঙ্গে জাদুবাস্তবতার সুতো দিয়ে সেলাই করা উপন্যাসে পরিমল ভট্টাচার্য ভাটিবাংলার জলপ্রকৃতি ও সেখানকার মানুষজনের সিদল প্রীতির বিবরণ দিয়েছেন খানিকটা। বিবরণটি তারেক অণুর মনে ধরায় আখ্যানের বিশেষ অংশটি তিনি ফেসবুকে দিয়েছেন। সিলেটের জলীয় জনপ্রকৃতিকে বোঝার উৎস হয়ে এটি তাঁর কাছে ধরা দিয়েছে হয়তো।
সবই ঠিক আছে। আমারও পড়তে লেগেছে ভালো পরিমল ভট্টাচার্যের মায়াজড়ানো এই বিবরণ। জলের গন্ধ নিবিড় সেখানে। তবু, দু-কথা না লিখে পারছি না। লিখতে বসে সজল কান্তি সরকারের মুখখানা আবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে বারবার! ভাটির এই ছাওয়ালকে দীর্ঘদিন থেকে চিনি। হাওরের জল-জীবন-প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর নাড়ির যোগ নিজ চোখে দেখেছি একটা সময়, এবং একই শহরে থাকার কারণে দেখে চলেছি এখনো। সজলদা শহরে থাকেন বটে, তবে তাঁকে বিমনা রাখে হাওরের লিলুয়া বাতাস। পায়ের তলায় এই লোক টের পায় মাছের নাড়ান। মওকা পেলে ছোটেন হাতের তালুর মতো চেনা হাওর-বাওর-গাঙে। আমাকেও বগলদাবা করেন সাথে।
তারেক অণুর ফেসবুকে পেশ করা পরিমল ভট্টাচার্যের মায়াজড়ানো বিবরণ পড়তে যেয়ে সজলদার মুখ তাই চোখের সামনে ভাসছিল। মনে হচ্ছিল, ঋতুভেদে হাওরের জলপ্রকৃতি ও জনজীবনের রংবদল, মাছের স্বভাব, আর সিদল শুঁটকির নেপথ্যে ঘটতে থাকা কাহিনিগুলো মানুষের কাছে তুলে ধরতে তাঁর এখন কোমরবেঁধে কাজে নামা প্রয়োজন। জানি, হাওর নিয়েই আরো দশটা কাজে তিনি আছেন ব্যস্ত। থার্ড লেন স্পেস-এ ‘হাওরপুরাণ’ নামে চালু বিভাগ-এ কিছু নমুনা আমরা পাচ্ছি। সামনে আরো পেতে চলেছি বলে শুনেছিও। তারপরেও, সিদল প্রসঙ্গটি নিয়ে তাঁর কাজ করা উচিত মনে হচ্ছে আমার কাছে।
ভাটিবাংলার জলজীবনকে পাখির চোখ করে দেখার আবাল্য অভ্যাস সজলদা ছাড়তে পারেননি। হাওর তল্লাট তাঁর সঙ্গে চরকির মতো পাক খাওয়ার সুযোগ এই উসিলায় আমারও কম হয়নি। যে-কারণে তারেক অণুর ফেসবুক পোস্টে দেওয়া পরিমল ভট্টাচার্যের বিবরণকে ভ্রান্ত ভাবতে বাধ্য হচ্ছি! কেন তা সংক্ষেপে বলার তাড়না থেকে এই লেখার অবতারণা এখানে। বাকিটুকু এ-বিষয়ে আরো যারা মুরব্বিয়ান রয়েছেন, তাঁরা বিচার করবেন। ভুল কিছু যদি থাকে আমার কথায়, আশা করি তাঁরা তা শুধরে দেবেন।
. . .

শুঁটকির ইতিহাস বা বিশেষত সিদল শুঁটকির ইতিহাস নিয়েও কাজ করার আছে। অন্ধের হাতি দেখার মতো নানাজনে নানান কথা বলতেসে দেখতেছি। পরিমল ভট্টাচার্য ওনার ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’ উপন্যাসে মমতা দিয়ে অনেক কিছু লিখেছেন সে ঠিক আছে, কিন্তু তার মধ্যে যদি দু-একটা মনগড়া অর্ধসত্য কথা থাকে, তাহলে তো সমস্যা!
১. ‘সিদল এর খুব নিজস্ব একটা সোয়াদ আছে যেটা শিখতে হয়’;—এটা খুব ভালো কথা বলেছেন। মাস্টারশেফ প্রতিযোগিতার কোনো এক ভিনদেশি বিচারক একদিন হুট করে কোনো এক প্রতিযোগীর বানানো সিদল ভর্তা খেয়ে নিঃসন্দেহে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাবেন, তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলে অবাক হওয়ার কিছু নাই! কিন্তু তাই বলে সিলেটি লোকের কাছে সিদলের আবেদন একচুল কমবে না। যাইহোক, সিদল খাওয়া শিখতে হয়। একদিন দুদিন খেতে খেতে সিদলের প্রেমে মজে যেতে হয়!
২. ‘বর্ষাকালে ঠিক যেন একটা অনন্ত জলের মশারি বঙ্গোপসাগর থেকে উড়ে এসে পুরো উপত্যকাটা ঢেকে দেয় তিন-তিনটে মাস। তখন চারদিক সবুজ ভেলভেটের মতো, এমনকি বাতাসেও সবজেটে গন্ধ। আর তখনই সবকটা জলাশয় ভরে ওঠে রাশি রাশি মাছে।’
অদ্ভুত! হাওরকে সুধীজনরা বা টেবিল ওয়ার্কাররা রূপকথার মিথ বানিয়ে ছাড়বেন দেখতেছি! বর্ষাকালে নাকি হাওর মাছে মাছে ভরে যায়! তাহলে হেমন্তকালে মাছেরা কোথায় উধাও হয়ে যায়? আর বর্ষাকালে সবুজ আসবে কোথা থেকে? চারিদিকে তো শুধু রুপালি রংয়ের পানি আর পানি! বরং হেমন্তকালে হাওর সবুজ চাদরে ঢেকে যায়।
৩. ‘শীতে যখন নদীনালা শুকিয়ে আসে, টাটকা মাছের আকাল হয়, তখন ওই শুঁটকি দিয়েই দিন গুজরান হয়।’
হায় রাম! সামান্য পর্যবেক্ষণ-জ্ঞান যদি মানুষের থাকে, তার বুঝতে পারার কথা-যে,—বর্ষাকাল জেলেদের জন্য অলসকাল, আর মাছেদের জন্য উজাই আনন্দ তথা প্রজননের সময়! কারণ, বিশাল জলরাশিতে তারা জেলের জাল বাঁচিয়ে অবাধে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ায়। আর, শীতকালে যখন হাওর শুকিয়ে আসে, মাছেরা অবাধে ধরা পড়ে।
সজলদার সাথে থাকতে-থাকতে, হাওরে ঘুরতে-ঘুরতে শুঁটকির উৎপত্তি সম্পর্কে আমি যা বুঝেছি তা হলো,—শীত বা হেমন্তকালে এই অধিকহারে ধরা পড়া মাছ প্রযুক্তির অভাবে বরফের অভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে শহরে চালান দেওয়া সম্ভব হতো না,—ধীবররা খলা বানিয়ে এই মাছ তখন শুকাতে দিতো। পরে ঘোড়ায় চড়ে পাইকাররা এসে মাছের শুঁটকি কিনে নিয়ে যেত। সজলদা’র প্রকাশিতব্য ‘বীরজাল্লুয়া’ উপন্যাসে এমন একটি আভাস পাওয়া যাবে।
৪. ‘রাশি রাশি কুচো চ্যাপা মাছ মেটে হাঁড়িতে ভরে কলাপাতায় মুখ বেঁধে মাটির নিচে পুঁতে দেয়।’
সিলেট অঞ্চলে সিদল শুঁটকি জানি পুঁটি মাছ দিয়ে, পুঁটি মাছের তেল মাখিয়ে তৈরি হয়! এখন পড়তেছি অন্যকথা! আমি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে যতটুকু জানি বললাম, বিজ্ঞজনরা আরো বলবেন, প্লিজ!
. . .

পাঠ-সংযুক্তি
[থার্ড লেন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে সংকলিত]
“সিলেটের ঐতিহ্যবাহী সিদল শুঁটকি নিয়ে কোন সিলেটের মানুষও এত মমতা দিয়ে লিখেন নি যা লিখেছেন পরিমল ভট্টাচার্য ওনার ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’ উপন্যাসে। Parimal Bhattacharya

” ‘কাঁচা সিদল মিন্ট চকোলেট নয়, বাপ্পাসোনা। এর খুব নিজস্ব একটা সোয়াদ আছে যেটা তোমায় শিখতে হবে।”
ভাতের থালার সামনে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে বাপ্পাকে কোলে বসিয়ে মিষ্টি স্বরে বলছিল চিনি, ধোঁয়া-ওঠা ভাতে সিদলভর্তা মাখতে মাখতে, যে ভর্তাটা সদ্য কড়া থেকে নামিয়ে শিলে বেটেছে বাপ্পার মোমবুচান। পাকা সিলেটি রাঁধুনি সে, বাসায় পা রেখেই শিউলিকে উৎখাত করে রান্নাঘরের দখল নিয়েছে। অক্লান্ত খুন্তি নেড়ে, স্লিভলেস বাহুতে চর্বির পরতে পালতোলা জাহাজের মতো হিল্লোল তুলে নাগা মরিচ দিয়ে কষে রেঁধে চলেছে বিবিধ দুর্লভ পদ।
‘তবে সহজ হতো যদি তুই সিলেটে জন্মাতিস!’ এরপর চিনি বলতে শুরু করত ওদের ছেড়ে-আসা দেশটার কথা, যে দেশটা হিমালয় পাহাড় থেকে নামা নদীনালায় কাটাকুটি সবুজ আর অনন্ত বিলে ছাওয়া, যেখানে শীতকালে উত্তরের দেশ থেকে কমলালেবু রঙের হাঁসেরা উড়ে আসে, আর চেরি-ব্লসম জুতোর কালির রঙের পানকৌড়ির দল সারাদিন মাছ ধরে খায়। রাতে বাড়ির লাগোয়া বাগানে ঘুমোতে আসে ওরা, ওদের বিষ্ঠার চুনে গাছের পাতাগুলো রুপোলি রাংতার মতো হয়ে যায়। তারপরে যখন বর্ষা আসে চিনিকাকা বলে যেত—ঠিক যেন একটা অনন্ত জলের মশারি বঙ্গোপসাগর থেকে উড়ে এসে পুরো উপত্যকাটা ঢেকে দেয় তিন-তিনটে মাস। তখন চারদিক সবুজ ভেলভেটের মতো, এমনকি বাতাসেও সবজেটে গন্ধ। আর তখনই সবকটা জলাশয় ভরে ওঠে রাশি রাশি মাছে।
‘এত্ত মাছ, বুঝলি বাপ্পা, এত্ত মাছ, তোর মা যদি তখন একবার ওখানকার নদীতে নেমে ডুব দেয়, তোর মায়ের ওই ঘন কোঁকড়ানো চুলের গোছে এত কুচো মাছ জড়িয়ে যাবে-যে একটা আস্ত পরিবারের একবেলার ভাত উঠে যাবে!’ এই বলে চিনি শিউলির দিকে এমন করে অপাঙ্গে তাকাতো-যে সকলে হো হো করে হেসে উঠত। শিউলি আরক্তিম মুখে ঠোঁট কামড়ে অস্ফুটে বলত ‘কচু পোড়া!’
‘সত্যিই অত মাছ!’ দীর্ঘশ্বাস ফেলত চিনি। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় লোকেরা সেই মাছ নুন মাখিয়ে রোদে শুকিয়ে নেয়। শীতে যখন নদীনালা শুকিয়ে আসে, টাটকা মাছের আকাল হয়, তখন ওই শুঁটকি দিয়েই দিন গুজরান হয়। কিন্তু ওই পুবের দিগরে, যেখানে বাপ্পার বাবা-কাকাদের দেশ, মাটি তখনও ভিজে। বাতাসে তখনও জোলো ভাপ। ওখানে তাই লোকেরা রাশি রাশি কুচো চ্যাপা মাছ মেটে হাঁড়িতে ভরে কলাপাতায় মুখ বেঁধে মাটির নিচে পুঁতে দেয়। মাসের পর মাস কাঁঠাল গাছের ছায়ায় ঘেরা ঠান্ডা অন্ধকারে সঞ্চিত থাকে সেগুলো। ওদিকে আকাশ ফের নীল হয়, পাখিরা ফিরে আসে বাগানে, আর মাটির ভাঁড়ারে মজে-ওঠ গুপ্তধন শুষে নিতে থাকে এই সবকিছু পাতার ফাঁক দিয়ে আসা চাঁদের আলো, শিউলি ফুলের গন্ধ, শীতপাখির ডাক।
‘আর তুই যদি এখন পরিষ্কার মন নিয়ে এই গরাসটা মুখে তুলিস,’ ভাতের দলাটা বাপ্পার ঠোঁটের কাছে এনে চিনি বলত ‘তাহলে তুইও সেই চাঁদের আলো আর শিউলির গন্ধ টের পাবি।”
. . .

সিদল-নারী ব্রত আছে। এ-নিয়ে ভাগ্য পরীক্ষার ব্যাপার-স্যাপারও আছে। এই ব্রতে সিদলের ভাগ্য সবার হয় না।
. . .

পরিমল ভট্টাচার্যকে ফিল্ডওয়ার্ক করা মানুষ বলেই মনে হয়েছে ফয়েজ ভাই। তাঁর পুরস্কৃত ও প্রশংসিত আখ্যানটি পাঠের সুযোগ এখনো হয়নি। এমতাবস্থায় বাড়তি কিছু বলা ঠিক হবে না। অনলাইনে উপন্যাসটির ব্যাপারে যেটুকু তথ্য জানতে পেরেছি, তাতে মনে হলো, মানবজাতির স্থানান্তরের চিরাচরিত ইতিহাসকে উপজীব্য করেছেন সেখানে। ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’ মূলত একটি পরিবারের নয় প্রজন্ম ধরে বিবর্তিত হওয়ার ইতিহাসকে অনুসরণ করে রচিত। পশ্চিমবঙ্গের হুগলী ও সরস্বতী নদীর মাঝখানে জেগে ওঠা ভূখণ্ডে এই সাতগাঁ বন্দর একদিন গড়ে উঠেছিল।
ভাগ্যটানে এই অঞ্চলে চলে আসা এক পরিবারের প্রজন্ম পরম্পরায় বহতা জীবনকে পরিমল ভট্টাচার্য তাঁর আখ্যানে ভাষা দিয়েছেন। যেখানে, আখ্যানের স্তরভেদে ইতিহাসের ছোট-বড়ো নানান অনুষঙ্গ ছাড়াও কল্পনা ও জাদুবাস্তবতায় মাখামাখি এক ভাষার বাহার রয়েছে। সিলেট অঞ্চলে ভাটিবাংলার জলীয় প্রকৃতি, মাছের অঢেল সমাহার, আর সিদল/ সিধল/ হিদল নিয়ে যোগ করা তথ্যসূত্র (যতদূর বুঝতে পারলাম) এই আখ্যানের মূল নিয়ন্ত্রক নয়। এটি আরো অনেকানেক প্রসঙ্গের মাঝে অন্যতম, তবে মুখ্য নয়। তথ্যটিকে এখানে (হয়তো আখ্যানের স্বার্থে) ফ্যান্টাসাইজড করেছেন লেখক। জাদুবাস্তবতা-ঘন আখ্যান রচনায় তা কোনো অপরাধ গণ্য হতে পারে না। আখ্যানটি কতখানি গবেষণালব্ধ ঐতিহাসিকতার ওপর দাঁড়িয়ে লিখেছেন তিনি, আর কতখানি তথ্যকে উপন্যাসের অনুষঙ্গ মাত্র ভেবে ব্যবহার করেছেন,—এর কিনারা করতে উপন্যাসটি আগে পড়ে ওঠা প্রয়োজন। এছাড়া ক্যামনে কী তার হদিশ বুঝে ওঠা সম্ভব নয়!
তারেক অণু এখানে যে-ভুলটি করেছেন বলে আমার মনে হয়েছে তা হলো,—ভাটিবাংলার জলপ্রকৃতি ও সিদল নিয়ে লেখকের ভাষা-বিবরণকে তিনি অভ্রান্ত ধরে নিয়েছেন! তাঁর মনে হয়েছে,—এরকম মমতাভরা ভাষায় ভাটির জলপ্রকৃতি ও জলজীবনকে কেই-বা চেনায় এখন! আখ্যানের ভাষা মনোরম, এই ব্যাপারে সন্দেহ নেই। তবে, সংযুক্ত তথ্যকে অথেনটিক ধরে নিয়ে তারেক অণুর ফেসবুকে এইটা পোস্টানো ঠিক হয়নি। লেখার আগে একবার হলেও ভাবা উচিত ছিল,—আখ্যান হলো স্বাধীন এক পরিসর; তথ্য এখানে অনুষঙ্গ মাত্র, যার অথেনটিসিটি নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও থাকতে পারে।
তথ্যকে ছাপিয়ে যাবে এরকম সৃষ্টিশীল কল্পনাশক্তি কেবল একটি ইতিহাসনির্ভর আখ্যানকে অনন্য মাত্রিক করার ক্ষমতা রাখে। যে-কারণে, বঙ্কিমের ঐতিহাসিক উপন্যাসে তথ্যের ভুলভ্রান্তিকে আমি ব্যক্তিগতভাবে গোনায় ধরি না। পাঠ-আগ্রহ এখানে বরং নিবেদিত থাকে তাঁর বয়ানকুশল ভাষাশৈলী ও চরিত্র চিত্রনের খুঁটিনাটির দিকে। এই দুটি জায়গায় বঙ্কিমকে আজো সমীহ জাগিয়ে তোলা ওস্তাদ বলে মনে হয় আমার! পাবলিক অবশ্য এরকম করে ভাবে না। মুসলমান পাঠকরা তাঁকে হিন্দু সাম্প্রদায়িক ভেবে পাঠ করে ও গালিগালাজের তুবড়ি ছোটায়। হিন্দু পাঠকরা হয়তো তাঁকে সনাতন ভারতের পারাকাষ্ঠা ভেবে পালটা আঘাত হানেন মুসলমান পাঠককে লক্ষ করে। আমাদের এখানে এইটা কমন কালচার সাহিত্য বোঝার।
বঙ্কিম জাতীয়তাবাদী ছিলেন না এ-কথা বলব না। তাঁর ভারতকেন্দ্রিক পুনর্জাগরণের ভাবনায় একরৈখিক উপাদানের বাহুল্য আছে বৈকি। হিন্দু পুনর্জাগরণে ঝোঁক সুতরাং তাঁর মধ্যে ছিল না, এরকম-করে বলাটা সত্যের অপলাপ হবে। যুগের হাওয়া এদিকে তাঁকে টেনেছে তখন। মুসলমান পুনর্জাগরণের ঝোঁক যেমন পরে আমরা ইকবাল ও ফররুখ আহমদের বোধ-ভাবনায় লেলিহান হতে দেখেছি। যুগ-বাস্তবতায় সক্রিয় জলবায়ু তাঁদেরকে ওভাবে গড়ে নিয়েছে তখন। এঁনাদের সাহিত্যিক তৎপরতায় সঞ্চারিত দার্শনিক সারবত্তাকে নিয়ে কাজেই প্রশ্ন ও তর্ক অসংগত নয়। তাঁদের রচনার মূল্য তাতে খাটো হয়ে যায় না।
বড়ো কথা, কবিলেখকের রচনায় ব্যবহৃত এসব ঐতিহাসিক ঘোর প্রসূত বকুনি মারাত্মক পর্যায়ের ভ্রান্ত ও মতলবি না হলে একে গোনায় না-ধরা ভালো। সেরকম কিছু ঘটে থাকলে প্রত্যাখ্যান ও খণ্ডন আপনা থেকে বাকিদের ঘাড়ে চাপবে, এবং তারা তা করতে বাধ্য তখন। এটুকু ব্যতিক্রম বাদ দিলে এ-কথাটি বরং স্মরণ রাখা ভালো,—একজন আ্যখ্যানকার সবসময় ইতিহাসের শর্ত মেনে নিখাদ থাকতে একদম বাধ্য নন।
যেমন ধরেন, পরিমল ভট্টাচার্যের উপন্যাসে চিহ্নিত সাঁতগা বন্দর নিয়ে গোল আছে ইতিহাসবিদের মধ্যে। ইবনে বতুতা ভারতবর্ষে তাঁর ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা নিয়ে যেসব কথা লিখে গেছেন, সেখানে তাঁর ভ্রমণরুটে সাতগাঁর উল্লেখ পাওয়া যায়। ওই সময়টায় মালদ্বীপ হয়ে চাঁটগা ও সেখান থেকে ঘুরপথে সিলেট ও পরে আসাম সংলগ্ন সিলটি অঞ্চল পরিভ্রমণ করেছিলেন বতুতা। ইতিহাসবিদরা তথাপি নিশ্চিত নন, তাঁর ভ্রমণরুটে উল্লেখিত সাতগাঁ হুগলী তীরবর্তী, নাকি চাটগাঁয় এই নামধারী বন্দর ছিল তখন!
হাওর নিয়ে লেখক ও ছোটকাগজ সম্পাদক স্বপন নাথের চাপে একটি লেখা লিখতে হয়েছিল তিন-চার বছর আগে। হাওরের জলজীবন ও জলপ্রকৃতি কোনোভাবেই আমার কাজের এলাকা নয়। এসব ব্যাপারে যৎসামান্য ও ভাসাভাসা জানি মাত্র! স্বপনদাকে তবু পাশ কাটাতে ব্যর্থ হয়ে হাওরের জলজীবনের বিবর্তন ইতিহাস ও বর্তমান যুগবাস্তবতায় তার বিপর্যয় মিলিয়ে-ঝুলিয়ে একখানা গদ্য ফেঁদেছিলাম। বইপত্র ও নানাজনের অভিজ্ঞতার ওপর ঠেকনা দিয়ে লেখা সেই গদ্যে সাতগাঁর প্রসঙ্গ টেনেছিলাম মনে পড়ে। পুরোটাই উদ্ধৃত করছি বোঝানোর জন্য-যে, ঐতিহাসিক তথ্য নানাবিধ কারণে ঘোলাটে হয় অনেকসময় :
স্থায়ী ও অস্থায়ী বিলবেষ্টিত জলসায়রে নিজের দাগ রেখে বিদায় নিলেও হাওরকে সাগর ভাবার ভ্রম আজো অমলিন। যেমন তা অমলিন ছিল ইবনে বতুতা যবে এই অঞ্চলে কদম রাখেন। নিজের সফরনামায় বাংলার বিবরণ সংক্ষেপে সেরেছেন বতুতা। বিবরণটি মূলত বাবা হযরত শাহজালাল আউলিয়ায় কেন্দ্রীভূত থেকেছে। সাগরপথ পাড়ি দিয়ে বাংলায় পা রাখেন বতুতা। সাগরতীরে অবস্থিত সাদকাওয়ান নগরী হয়ে বাংলায় প্রবেশ ঘটে এই আরব পর্যটকের। সদা কর্মব্যস্ত নগরে ঘুরেফিরে কাটে কিছুদিন। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র নগরটি বাংলার কোন অঞ্চলে অবস্থিত তার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা শতভাগ নিশ্চিত হতে পারেননি।
ইংরেজি তরজমায় রেভারেন্ড স্যামুয়েল লি-ও উপসংহারে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছেন। বাংলা ভাষান্তরে মোহাম্মদ নাসির আলী নগরটিকে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি নদীতীরে অবস্থিত সাতগাঁও বলে চিহ্নিত করেছেন। রাঢ়বঙ্গে লীন হুগলী ও সাতগাঁও সেকালে সমৃদ্ধ নৌবন্দর ছিল। আইন-ই-আকবরিতে সুবাহ বাংলায় বিদ্রোহ দমন ও জায়গির দানসূত্রে নামটি ফিরে-ফিরে এসেছে। মোগল আমলে ভারতবর্ষের যেসব এলাকা থেকে হাতির চালান আগ্রায় পৌঁছাত, তার মধ্যে সাতগাঁও ছিল অন্যতম। মোগল শাসন অত্র অঞ্চলে শিথিল ও বিঘ্নিত হওয়ার কারণে বন্দর দুটি আরব বণিক আর পতুর্গিজ নাবিকদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়।
বতুতার বাংলা ভাষান্তরে মোহাম্মদ নাসির আলী ইতিহাসবিদ ইউলের অভিমত সংযুক্ত করেছেন। তাঁর মতে আরব পর্যটক সাদকাওয়ান বলতে আসলে চাটগাঁকে বুঝিয়েছিলেন। চাঁটগা সুলতান ফখরুদ্দিনের করায়ত্ত ছিল কি? বাংলা তরজমায় প্রশ্নটি নাসির আলী তুলেছেন, যার উত্তর আবার ইউলের ব্যাখ্যায় স্পষ্ট নয়।
ষোড়শ শতকে পর্তুগিজ যাজক ডুয়ার্তে বারবোসার ভারতসফর বৃত্তান্তের টীকাভাষ্যে গ্রন্থটির অনুবাদক বতুতাকে স্মরণ করার ছলে ইউলকে পুনরায় প্রাসঙ্গিক করেছেন। তাঁর মতে, ইবনে বতুতা চাটগাঁ হয়ে সিলেটে প্রবেশ করেন। বতুতা থেকে বারবোসা অবধি দীর্ঘ সময় জলপথে চাঁটগা থেকে মেঘনা অববাহিকায় গমন, উক্ত জলপথ ধরে সোনারগাঁ, অতঃপর উজানপথে গঙ্গা পাড়ি দিয়ে গৌড় রাজ্যে প্রবেশের এটাই সহজ পথ ছিল সেই যুগে।
ইতিহাস জানায়, মুসলমান শাসনামলে চাটগাঁর ওপর সুবাহ বাংলার কর্তৃত্ব প্রবল ছিল না। আরাকান রাজ্যের আওতায় থাকতে স্বচ্ছন্দ অঞ্চলটিতে আরব বণিকরা ব্যাপক হারে যাতায়াত করত। পতুর্গিজরাও তাই। চাটগাঁ ও সাতগাঁওয়ে বাণিজ্যতরী ভিড়ানো তাদের জন্য নিয়মিত ঘটনা ছিল। সিলেট সফরের রুট হিসেবে পর্তুগিজ আমলের সমৃদ্ধ বন্দর সাদকাওয়ান বা সাতগাঁওকে বেছে নেওয়ার বিবরণ ইবনে বতুতা নিজমুখে দিয়েছেন, কাজেই সেখান থেকে চাটগাঁ হয়ে মেঘনা অববাহিকার জলপথ ধরাটা তাঁর ক্ষেত্রে আশ্চর্যের নয়।
উদ্ধৃতি দীর্ঘ হয়ে গেল! এটি তবু এখানে সংযুক্ত করছি এজন্য-যে,—ইতিহাসের শর্ত মেনে কল্পআখ্যান রচনা সম্ভব নয়। পরিমল ভট্টাচার্যও তাঁর মতো করে স্বাধীনতা নিয়েছেন লেখায়। তবে, ভাটিবাংলার জলপ্রকৃতি ও সিদল বিষয়ে নিছক রেফারেন্সে ভর না দিয়ে যাচাই করলে ভালো করতেন। অনলাইনের যুগে যৎসামান্য গুগলিং অথবা এআইকে দিয়ে তথ্য যাচাই আমরা কমবেশি করি। একে নির্ভরযোগ্য বলাটা আমার উদ্দেশ্য নয়। তবে, মনে সন্দেহ জাগিয়ে তুলতে ও প্রাসঙ্গিক তথ্যের খোঁজে নামতে বেশ কাজের। পরিমল ভট্টাচার্য যেমন গুগলিং করলে তাঁর মনে খটকা জেগে উঠত তাৎক্ষণিক। তিনি দেখতে পেতেন, সিদল সম্পর্কে গুগলের দেওয়া তথ্য তাঁর সঙ্গে খাপে খাপ মিলছে না। যেমন, গুগল জানাচ্ছেন :
সিলেটে সিদল তৈরির প্রধান উপাদান হলো পুঁটি মাছ (বিশেষ করে জাত পুঁটি)। মাঝে-মাঝে অবশ্য ফাইস্যা মাছ দিয়েও চ্যাপা বা সিদল সদৃশ শুঁটকি তৈরি হয়। সিলেট, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে পুঁটি মাছের এই আধা-গাঁজনকৃত শুঁটকিকে সিদল বা হিদল বলা হয়। কিশোরগঞ্জ ও ঢাকা অঞ্চলে এটি সাধারণত চ্যাপা শুঁটকি নামে পরিচিত।
সিলেট/ময়মনসিংহে সিদল আস্ত পুঁটি শুঁটকিকে মটকায় ভরে পচিয়ে বা গেঁজিয়ে (fermentation) তৈরি করা হয়। আর, উত্তরবঙ্গের সিদল মূলত ছোট মাছের শুঁটকি গুঁড়া করে তার সাথে মানকচুর ডাঁটা বা কচু পাতা মিশিয়ে গোল বা চ্যাপ্টা মণ্ড আকারে রোদে শুকিয়ে তৈরি করা হয়।
এটুুকু তথ্যে তাঁর মনে খটকা এনে দিতে যথেষ্ট ছিল হয়তো। গুগল কি গাঁজাখুরি তথ্য দিচ্ছে ভেবে যাচাই করতে নামতেন তখন। তার থেকে প্রকৃত তথ্যে নিজেই পৌঁছে যেতেন। যাইহোক, তথাপি পরিমল ভট্টাচার্যের কাজবাজের মধ্যে ভিন্ন স্বাদ, এবং মাত্রা ও গভীরতা আছে বোঝা যায়। তাঁর আখ্যানটি সুতরাং পাঠের আগ্রহ থাকছে। সময়-সুযোগ বুঝে তাঁকে পাঠ করার খিদে তিনি জাগাতে পেরেছেন।
. . .

লেখক পরিচয় : ফয়েজ আহমদ
সিলেটি জলবায়ুতে পরিপুষ্ট ফয়েজ আহমদ ব্যক্তিগত আলস্যদোষে লেখালেখিতে নিয়মিত নন, তবে তাঁর আগ্রহ নানাদিকে ছড়ানো সবসময়। বিদ্যালয় ও কলেজের পালা চুকিয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি শাস্ত্রে পাঠ শেষ করেন। বর্তমানে সরকারি বীমা কোম্পানিতে কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। সাংসারিক। সংসার ও কর্মজীবনে ব্যস্ততার মাঝেও সাহিত্য ও শিল্পানুরাগে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন।
সজল কান্তি সরকারের সঙ্গে মিলে হাওর-প্রকৃতি ও জলজীবনকে পাখির চোখ করে দেখে চলেছেন অদ্যাবধি। ভবিষ্যতে এই অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। ভালোবাসেন গান, কবিতা ও চলচ্চিত্র। শহরে সাংস্কৃতিক তৎপরতার অবনতি তাঁর অন্যতম উদ্বেগের বিষয়। ছাত্রজীবন থেকেই নানাভাবে জড়িয়ে থেকেছেন সম্মুখগামী সব সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক তৎপরতায়। ভালোবাসেন পাঠ ও অবসরে গানে বিশেষভাবে পাতেন কান। কালেভদ্রে এসব নিয়ে যখন লেখেন, সেখানে ধরা পড়ে বোধিমনস্বতা। নিজের মতো করে নিভৃতচারী, তবে সময়-সমকাল ও পরিপার্শ্বের প্রতি সজাগ ফয়েজ আহমদ কলমপেশায় অনিয়মিত হওয়ার কারণে এখনো কোনো প্রকাশনা বেরোয়নি।
. . .



