
পাকিস্তানি সিনেমাকার জামিল দেহলভীকে প্রথম চিনেছিলাম মোহাম্মদ আলী জিন্নাকে নিয়ে তৈরি ‘জিন্নাহ’ ছবিটি দেখার পর। ছবির বিষয়বস্তু ও নির্মাণশৈলী ছিল বুদ্ধিদীপ্ত। দেশভাগের ট্রাজিক হিরোকে সিনেপর্দায় তুলে ধরার ভাবনায় স্বকীয়তার ছাপ রেখেছিলেন জামিল দেহলভী। অস্কারে ঝড় তোলা ‘গান্ধী’ ছবিতে জিন্নাহ-সহ একাধিক ঐতিহাসিক চরিত্রকে একপ্রকার সাইডলাইনে ঠেলে দিয়েছিলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা রিচার্ড অ্যাটেনবরো। সুভাষ চন্দ্র বসুকে তো স্রেফ ‘হাওয়া’ করে দিয়েছিলেন ছবিতে! বিতর্কও কম হয়নি এসব নিয়ে। মানতে হবে, জিন্নাহকে সাইডলাইনে ঠেলে দেওয়া সত্ত্বেও অ্যাটেনবরোর ছবি ভালোভাবেই উতরে যায়। ব্যক্তি গান্ধী ও তাঁর রাজনীতির ব্যাপ্তি বিরাট হওয়ার কারণে জিন্নাহর গৌণ উপস্থিতি গুরুতর হয়ে ওঠে না শেষপর্যন্ত।
জামিল দেহলভীর পক্ষে এরকম কিছু করাটা হতো অবান্তর। জিন্নাহর ব্যাপ্তি অতখানি ব্যাপক নয়-যে, গান্ধী ও নেহেরুর মতো চরিত্রকে গৌণ করে ছবি দাঁড়িয়ে থাকবে সটান। দেহলভীর ছবিতে কাজেই এঁনারা প্রায় সমান্তরাল জায়গা নিয়েছেন। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র জিন্নাহকে প্রশ্নবিদ্ধ করার দিকে ছবিটি যায়নি। মানবিক এক পরিসর থেকে বরং তাঁকে বোঝার চেষ্টা চোখে পড়ে। পাকিস্তান পাওয়ার লড়াই নিয়ে তর্ক-বিতর্ক থাকবেই;—জামিল দেহলভী ছবিতে এটি উপেক্ষা করেছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লড়াইকে জিন্নাহর জীবননাট্যের খাতায় অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেখিয়েছেন তিনি। তাঁর ছবিতে জিন্নাহ সুতরাং ইতিবাচক চরিত্র।
যাইহোক, ছবিটি দেখার পর এই পরিচালকের অন্যান্য ছবির ব্যাপারে কৌতূহল জাগে মনে। নিরাশ হতে হয়নি। জাতিসংঘের নানা প্রজেক্টের হয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণের লোভনীয় চাকরি ছেড়ে ছবি বানানোর কলাকৌশল আরো নিবিড়ভাবে রপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেন জামিল। বিগত শতকে ষাট-সত্তর দশকের সন্ধিক্ষণে মার্কিন দেশে ফিল্ম বানানোর বিদ্যাশিক্ষায় মন দেন তিনি। তাঁর এই শ্রম-যে বৃথা যায়নি তা জিন্নাহ ছবিতে ভালোই টের পায় দর্শক।
শিক্ষানবিশকালে নির্মিত টাওয়ারস অব সাইলেন্স দিয়ে নিজের জাত জামিল গোড়ায় চিনিয়েছিলেন বিশ্বকে। ছবিটির কথা বলতেই মূলত তাঁর নাম নিচ্ছি এখানে। টোরেন্ট দিয়ে নামিয়ে দেখেছি বেশ কয়েক বছর আগে। ইউটিউবে তখনো সুলভ হয়নি। বছর দুই হলো সেখানেও পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর আরেকখানা আলোচিত নির্মাণ দ্য ব্লাড অব হুসেইন ছবিটিও অদ্য ইউটিউবে সুলভ হয়েছে। জিয়া-উল-হকের দানবিক শাসনের আগাম আভাস যে-ছবিটিকে একটা সময় আলোচনার পাদপ্রদীপে নিয়ে এসেছিল।
জামিল দেহলভী শুট শেষ করার একমাসের মাথায় ভুট্টোকে সরিয়ে জিয়া-উল-হক গদি দখল করেন। পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ডন-এর ভাষায় ‘toxic, enduring, and tamper-proof legacy’ চালু করেন এই সমরশাসক। পরের ইতিহাস সেই ছক মেনে এগিয়েছে অনেকটা। পাকিস্তানের বারবার বিঘ্নিত গণতন্ত্রযাত্রাকে আরো একবার পরপারে পাঠিয়ে এজিদের ভূমিকায় অবতীর্ণ জেনারেল জিয়া ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা দ্য ব্লাড অব হুসেইন ছবিটিকে ভালোভাবে নেয়নি। কারবালার ঐতিহাসিক ঘটনাকে পাকিস্তানের বর্তমান যুগবাস্তবতায় রেখে চলচ্চিত্রায়িত এই ছবিকে ল্যান্ডমার্ক হিসেবে যদিও পরে গণ্য করেছেন অনেক সিনেবোদ্ধা। সরকারি ও বিদেশি অনুদানে নির্মিত ছবির ছাড়পত্র পেতেও সমস্যায় পড়েন জামিল। বিপদ তখন তাঁর পিছু নিয়েছিল।
বালুচিস্তান ও বাংলার কসাই টিক্কা খান ক্ষমতার মূলস্রোতের অংশ তখনো। ছবিটি কারবালার ময়দানে সংঘটিত নির্দয় অবিচারের কাহিনিকে উপজীব্য করার বাহানায় পাকিস্তানি জেনারেলদের টার্গেট করেছে, এটুকু ধরতে তার দেরি হয়নি। ছাড়পত্র দেওয়া স্থগিত করে সরকার। জামিলের পাসপোর্ট জব্দ করে তাৎক্ষণিক। দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা নেমে আসে তাঁর ওপর। ছবির কাহিনি বদলানোর চাপ তো ছিলই! জামিল তবু মাথা নত করেননি। ঘুরপথে প্রভাব খাটিয়ে অবশেষে ছবির শুট করা ফুটেজ-সহ আফগানিস্তান সীমান্ত দিয়ে দেশ ছাড়েন। কাবুল ও পরে বিদেশে বসে ছবির বাকি কাজ শেষ হলে বাইরে মুক্তি দিয়েছিলেন।
ঘটনাবহুল ছবিটি তাঁর ব্যাপারে দর্শককে আগ্রহী করে তুলেছিল। দ্য ব্লাড অব হুসেন-র সিনেমাটিক জেশ্চার রাজনৈতিক বার্তায় সরব ছিল তাতে সন্দেহ নেই, তবে প্রথম ছবি টাওয়ারস অব সাইলেন্স-এ সঞ্চারিত পোয়েটিক ফ্লেভার ও অ্যালিগরিক্যাল বিউটির রেশ এখানেও দর্শক পায় কিছু। সেইসঙ্গে অব্যাহত থাকে পাকিস্তানের মতো ধর্মীয় সংঘাতে ছিন্নভিন্ন ভূখণ্ডের জাতি-বৈচিত্র্যে সচল মরমি ভাববীজ ক্যামেরায় তুলে আনার প্রাণান্ত প্রয়াস। জামিলের ছবি দেখা মানে পাকিস্তান কী-কারণে আজো জাদুকরি নরক হয়ে টিকে আছে তা ত্বকের ভিতরে অনুভব করা।
সেনা, আমলা ও ভূস্বামী মিলে একটি চক্রব্যূহ সেখানে জন্মলগ্ন থেকে বিদ্যমান। অন্যদিকে শহর ও গ্রামে ছড়ানো সাধারণ মানুষ, তার মাঝখানে শিয়া-সুন্নির পারস্পরিক সংঘাত, এবং তারও মাঝখানে সমৃদ্ধ ধর্মীয় সংস্কৃতি আর লোকাচারের তরঙ্গ মিলে জটিল এক ক্যানভাসকে জামিল পরবর্তী ছবিগুলোর বয়ানেও খুঁজেছেন নানাভাবে। ইমাকুলেট কনসেপশন (Immaculate Conception), ইনফিনিট জাস্টিস কিংবা গডফোরসেকেন-কে এদিক থেকে টাওয়ারস অব সাইলেন্স ও দ্য ব্লাড অব হুসেইন-র সম্প্রসারণ মনে হবে। প্রতিটি ছবির বয়ানে জামিল তাঁর স্বকীয়তা মেনে থেকেছেন পোয়েটিক অথচ পলিটিক্যাল। তাঁর কোনো ছবি দুর্বোধ্য নয়, আবার অতখানি সুবোধ ও সুবোধ্যও নয়-যে দর্শক বিনোদিত হবেন ব্যাপক। জামিলের নির্মাণশৈলীর মাজেজা যে-কারণে তাঁকে পাকিস্তানি চলচ্চিত্রে গোড়া থেকে পৃথক রেখেছে। ছবির ভাষায় তির্যক না হয়েও কাজের কাজ প্রশ্ন রেখে যান এই নির্মাতা। সংকট ও এর থেকে বেরিয়ে আসার প্রচ্ছন্ন ভাববীজও কি থাকে না সেখানে?
বড়ো কথা, আর্টহাউজ ছবির সঙ্গে সাদৃশ্য রাখলেও জামিল দেহলভী ভারতবর্ষে একদা চর্চিত প্যারালাল সিনেমা মুভমেন্ট দ্বারা বিশেষ প্রভাবিত বলে মনে হয়নি। তাঁকে বরং ফরাসি নবতরঙ্গ ও তারকোভস্কি ঘরানার রসায়ন ভাবা যেতে পারে, যেখানে আবার ছবির ভাষাকে চরম পর্যায়ে ধূসর হতে দেওয়া তাঁর পোষায় না। জামিলের ছবিতে বহমান থাকে এমন এক স্থানিকতা, যা একটি দেশের মানচিত্রজুড়ে ছড়ানো বৈচিত্র্য ও সংঘাতবিন্দুকে ধরতে উন্মুখ। যেখানে, প্রতিরোধের বার্তা পোয়েটিক অ্যালিগরির সাহায্যে বলছেন বটে, শৈল্পিক করেই বলছেন, তবে এই শৈল্পিকতা সেখানে কোনো প্রহিলকায় মনোমুগ্ধকর নয়। তাঁর সিনেভাষা এদিক থেকে মানবিক ও দর্শকের সঙ্গে সংযোগ তৈরিতে আগ্রহী।
জামিল দেহলভীর ছবি মানে পাকিস্তানের জল-মাটি-হাওয়া মিলে তৈরি জলবায়ুতে পরিব্যাপ্ত জীবনের কোলাহল, এবং এর সমন্তরালে রাষ্ট্র ও কর্তৃপক্ষের চাপিয়ে দেওয়া পীড়নকে তুলে ধরতে দ্বিধাহীন। এইটে হচ্ছে মোটা দাগে তাঁর ছবি তৈরির ওস্তাদি। ইরান দেশের অগ্রগণ্য নির্মাতাদের সঙ্গে তাঁর মিলন এদিক থেকে চিন্তা করলে বেশ নিবিড় মানতে হচ্ছে। ব্যতিক্রম যদি বলি তাহলে টাওয়ারস অব সাইলেন্স-র কথা বলতেই হবে। পাকিস্তানে অল্পসংখ্যক জরাথ্রুস্ট ধর্মের অনুসারী আছেন বটে। স্থানীয়রা তাদেরকে পার্সি নামে বুঝে নিয়েছেন। তো সেই আহুর মাজদার উপাসক সম্প্রদায়ের মৃতদেহ সৎকারের নেপথ্যে নিহিত সারার্থকে ছবির বিষয় করেছিলেন জামিল।

পার্সিরা পারতপক্ষে অন্য ধর্মাবলম্বীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে গমন করে না। ছেলেটির অনাথ হওয়ার পেছনে এটি ভূমিকা রাখে। ইসলামি আচার-বিশ্বাসের অনুশীলনে বড়ো হলেও, বালকের মনে পার্সিদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও মৃতদেহ সৎকারের ব্যতিক্রম রীতির প্রতি আবেশ কাজ করে। হতে পারে বালকবয়সে টাওয়ারে মাকে রেখে আসার দৃশ্যটি সে অবলোকন করে, মাথার ওপর পাক খায় চিল-শকুন, আর বালকমনের কল্পনাভূতি দেখে ফেলে মুসলমান বাবা ও পার্সি মায়ের যৌনমিলন। যেটি প্রকারান্তরে তার নিয়তিকে ছবির শুরুতেই নির্ধারণ করে দেয়।
বালক সময়ের সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক হয়। তার ভিতরে প্রেম, যৌনতা ও বিদ্রোহের বীজ দানা বাঁধে। শাখা-প্রশাখা ছড়ায়। ছবির অ্যালিগরি এখানে-যে, জামিল শিশুটির বেড়ে ওঠার মধ্যে তার বাবা-মাকে ধরেন। যে-কারণে দৃশ্যমন্তাজ (ষাট-সত্তরের দশকে এটি প্রবল চর্চিত ঘটনা ছিল) ছবির গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে অনেকখানি। একটি দীর্ঘ কবিতালেখ্য যেন ক্যামেরায় বলে যাচ্ছেন নির্মাতা, যার উদ্দেশ্য জরাথ্রুস্ট বিশ্বাসে মর্মরিত আদি সত্যকে ধারণ করা। কী সেটি? জামিল দেহলভী ছবির সংক্ষিপ্ত সংলাপে তা তুলে এনেছেন পুরোটাই। জেন্দাবেস্তায় মর্মরিত বাণী দর্শককে জানায় :
সৃষ্টির আদিতে শুভ ও অশুভ যমজ ছিল। সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। আহুর মাজদা হলেন শুভচেতনা ও জীবনদায়ী প্রাণশক্তির ধারক-বাহক;—এবং তিনিই ঈশ্বর। আর অশুভ-চেতনা ও মৃত্যুকে বহন করছে আহিরমান। মানুষ এক মুক্তপাখি। তার স্বাধীনতা রয়েছে দুয়ের মধ্যে কোনো একটি বেছে নেওয়ার। জীবনের যাত্রাপথে মানুষকে বুঝে নিতে হবে কে তার জন্য উত্তম। মরণের পর জরাথ্রুস্টরা যে-কারণে মৃতদেহ দাহ বা গোর দেয় না। টাওয়ারের মধ্যে রেখে দেয় শকুন-কাক-চিলের খাদ্য হিসেবে। মাংসভুক পাখিরা হলো পরিশুদ্ধ আত্মার বাহক। রক্তমাংসের দেহকে বিনষ্ট করার মধ্য দিয়ে আত্মাকে মুক্ত হতে ভূমিকা নেভায়। মানুষ তখন মুক্তি পায় সেই খাঁচা থেকে, যেটি এতদিন তাকে শুভ ও অশুভের সংঘাতে উতলা রেখেছিল।
টাওয়ারস অব সাইলেন্স-এ পোয়েটিক অ্যালিগরিতে মোটাদাগে এরকম এক কাহিনি বলার চেষ্টা করেছেন জামিল দেহলভী। নিজের ভিতরে সক্রিয় ইনার ডেমোন বা অশুভের সঙ্গে বোঝাপড়ার জন্য ছবিটি বানিয়েছিলেন;—এরকম কথা পরে বলেছেন বটে! সাগরপারের নিকটে অবস্থিত এই টাওয়ারকে কেন্দ্র করে মূলত ছবির কাহিনি ও চরিত্ররা আবর্তিত হয়। অনাথ বালক রক্তেমাংসে প্রেম ও কামের হেমে সুগন্ধিত করে নিজেকে, এবং এভাবে দ্রোহী হয়ে ওঠে পরে। তার পেছনে লেগে থাকা দুজন পুলিশকে হত্যা করে ছবির অন্তে এসে। পুলিশের মৃতদেহকে শকুন-চিলের খাদ্য করতে টাওয়ারে পৌঁছায় সে। মৃত পুলিশের মতো অবিকল দেখতে আরো দুজন তাকে তাড়া করে। সে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে তখন। সাগরতটের উপলখণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে তার দিকে দুহাত বাড়িয়ে দেওয়া প্রেমিকার বাহুডোরে নিজেকে সমর্পণ করতে আকুল হয়।
ছবিতে প্রাপ্তবয়স্ক বালককে মূলত দ্বৈত চরিত্রের ভূমিকায় দেখে দর্শক। সে একইসঙ্গে জন্মদাতা বালকের পিতা ও বালক স্বয়ং। মায়ের চরিত্রটিও সেখানে দ্বৈত। অন্যদিকে, বালকের মা ও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার দৃশ্যে প্রেমিকা… তারা সেখানে স্বয়ং তার ভিতরে সক্রিয় শুভ-সচেতন ঈশ্বর আহুর মাজদা। পুলিশকে বলা যেতে পারে আহিরমান। যারা তাকে প্রেমিকার বাহুডোরে নিজেকে সমর্পণ করার মুহূর্তে হত্যা করছে! এভাবে যেন তার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা অশুভ আহিরমানকে সে নিহত হতে দেখে। বলাবাহুল্য, পার্সি ও ইসলামের সংঘাতবিন্দুতে বেড়ে ওঠার যাতনাকে এভাবে দৃশ্যে প্রতীকায়িত করেন জামিল।

কবিতার রাসাভাস আগাগোড়া ছবিতে বহমান থাকে। টাওয়ারস অব সাইলেন্স এদিক থেকে সুবোধ ও সুবোধ্য কোনোটাই নয়। তবে, দুর্বোধ্য বলাটা হবে অতিরঞ্জন। কেননা, এর প্রতিটি ফ্রেম রক্তেমাংসে উষ্ণ ও সংযোগপ্রবণ। যেমনটি আমরা তারকোভস্কির ছবিতে তীব্রভাবে দেখি। জামিল দেহলভী অবশ্য তারকোভস্কির মতো অবিশ্বাস্য পর্যায়ের কাব্যিক নন। আধ্যাত্মিক সংবেদনেও পীড়িত নন অতখানি। তাঁর ছবি আতিশয্য থেকে মুক্ত। ওরিয়েন্টাল জীবনবেদে বহমান আধ্যাত্মিক ক্ষুধা ও তার বিপরীতে প্রচণ্ড সক্রিয় রাজনীতিকে কেবল তা ছুঁয়ে যায়। যে-কারণে টাওয়ারের চারদিকে পাক খাওয়া শকুনের পালকেও আশ্চর্য স্বাভাবিক লাগে দেখে। এই শকুনরা জীবননাট্য শেষে ঘুমিয়ে পড়া দেহ ভক্ষণ করবে, যেখানে শুভ ও অশুভ এতদিন ছিল সক্রিয়। এখন, কেবল নীরবতা… কেবল পাখির পাখসাটে অনন্তযাত্রা নশ্বর দেহের। কিছু থাকবে না শেষপর্যন্ত। ধূলোয় মিশে যাবে সব। তবু বাকি থাকবে এই বোধি, যার কথা রবি ঠাকুর বলে গেছিলেন গানের চরণে :
না বাঁচাবে আমায় যদি
মারবে কেন তবে?
কিসের তরে এই আয়োজন
এমন কলরবে?
এই প্রশ্নের অন্তিম উত্তর কেউ কি জানে আজো! জামিলের চোখ দিয়ে পোয়েটিক জার্নির অন্তিম দৃশ্যটি তাই জেন্দাবেস্তায় মর্মরিত স্পিতিমা বা আয়াতকে স্মরণ করতে অনেকটা বাধ্যও করে । সেখানে বলা হচ্ছে :
শুরুতে ভালো ও মন্দ নামে আদিম প্রেরণা ছিল
অবিকল দেখতে প্রেরণারা ছিল নিজ থেকে সক্রিয়
চিন্তার ক্ষেত্রে যেমন, ভাষা ও কর্মের ক্ষেত্রেও
জ্ঞানীকে সঠিকটি বেছে নিতে দাও
ভিত্তি বলে নয়, অধিক উত্তম বলে
[জরথুস্ত্র স্পিতিমা : ভাষান্তর : স্বকৃত]
টাওয়ারস অব সাইলেন্স হয়তো এভাবে কোরান ও জেন্দাবেস্তাকে এক বিন্দুতে অভিন্নও করে। আবেস্তার আয়াতনিচয় যেখানে কোরানকে স্মরণ করিয়ে যায়। জরাথ্রুস্টকে সম্বোধন করে ঘোষিত হচ্ছে ঐশীবাণী :
হে মরণশীল মানুষ, এইসব ঐশী আদেশ স্মরণ করো
বিজ্ঞ স্রষ্টা আদেশগুলি প্রণয়ন করেছেন
সুখ ও যাতনাভোগের জন্য।
মন্দলোকের জন্য রয়েছে দীর্ঘ যাতনাভোগ
আর, সত্য পথের অনুসারী যারা
তাদের জন্য স্বর্গীয় সুখ,
ন্যায়নিষ্ঠের জন্য অনন্ত নাজাত।
[জরথুস্ত্র স্পিতিমা : ভাষান্তর : স্বকৃত]
জামিল কোনো সমাধান খোঁজেননি কে ন্যায়নিষ্ঠ আর কে পাপী! তিনি খুঁজেছেন ধাঁধার উত্তর। এটি কেবল জীবনে নয়, মরণেও ধাঁধাই থেকে যাবে। আর তা হলো, ভালো ও মন্দ উভয়ে যদি অনিঃশেষ হয়, দুঃসহ এই বোঝা থেকে হালকা হতে কি তাহলে নীরবতাই উত্তম আমাদের জন্য!
. . .
. . .


