
সূচনা এমনটাই ছিল হয়তো-বা! তরুলতা পরিবেষ্টিত বনভূমিতে বিচরণের সময় কফিবর্ণ আগন্তুক ক্ষণিক আবেশে দাঁড়িয়ে পড়লে পাখি ও পতঙ্গরা গুঞ্জন থামিয়ে নীরবতায় গুম হতে থাকে। নগ্নগাত্র আগন্তুক সেখানে বিস্ময়! নিজের সুঠাম নগ্নতায় যে কিনা ভ্রূক্ষেপহীন। বনভূমির অনুরূপ ঋজু সরলরেখা মনে হচ্ছে তাকে;—যার কফিবর্ণ উরুদেশ মসৃণ প্রস্তরখণ্ড। পেলব ও স্বাস্থ্যকর। যেমন এই বনভূমি;—ঊষার উদয় ও মধ্যাহ্নের আগমন থেকে দূরগামী দূরত্বে যে-স্থিত।
সূর্যের উগ্র কিরণ থেকে মুক্ত নরোম আলোকরস্মি লতাগুল্ম ও বিটপী পরিবেষ্টিত বনভূমিকে সদয় রেখেছে;—আগন্তুকের নগ্ন দেহগাত্রও অনুরূপ এখানে। কোথাও কোনো কমতি পরিলক্ষিত হয় না। বাড়াবাড়ি বাহুল্য যেন থেকেও নেই! পিঠের প্রান্তভাগে যে-বাঁক নিম্নগামী হওয়ার সময় স্ফিতকায় শ্রোণীদেশে মোড় নিলো… তা এখন বড়ো মনোরোম দেখতে!
আগন্তুকের শ্রোণীদেশ দ্বি-খণ্ডিত খরমুজ। পরস্পর সংলগ্ন থাকায় দেহের পরিধিজুড়ে কামঘন লম্বাটে রেখার আভাস জাগিয়ে তুলেছে। কোমরভাগের সূচনাবিন্দু থেকে শ্রোণিদেশের প্রান্তরেখা ধরে বিস্তৃত এই খরমুজ লতা ও বৃক্ষ-ছাওয়া নীরবতায় গুম বনভূমিকে দ্রষ্টব্য করে তুলেছে। এখন একে সন্দেহ করাটাও যেন পাপ! আবছায়া-মাখা নয়, আবার চোখ ঝলসে দেওয়া সুতীব্র নয়… এরকম এক আলোয় বনভূমি পরিপূর্ণ। আলোর ছটা আগন্তুকের লম্বাটে শ্রোণীদেশ, নিতম্ব নামে বিদিত ওই ডিম্বাকার মাংসপিণ্ডকে মখমলের মতো কোমলতা দান করেছে। বনভূমির সঙ্গে মিশে থাকায় বড়ো দ্যুতিময় বন্য এই মখমল!
খরমুজ যেখান থেকে ঋজু বৃক্ষকাণ্ডের ন্যায় উরুদেশ রচনা করে নিচে নেমে গেছে, এবং আপাত অদৃশ্য পদযুগলের পাতায় বিরাম নিচ্ছে মনে হবে, যার ওপর ভর করে আগন্তুক ভূমিতে দাঁড়িয়ে,—পরিপুষ্ট সেই উরুদেশের ফোকর গলে সবুজ বনভূমি মনোরম দেখা যায়। দুই উরুর মধ্যবর্তী দূরত্ব পাখির চোখ করে বনভূমিকে অবলোকন ও ধারণ করছে। যেন-বা বনভূমি নিশ্চিত নয়, আগন্তুক প্রকৃত অর্থে কে অথবা কী তার পরিচয়! বৃক্ষশাখা হতে আনত ঘনসবুজ পত্রালী পরস্পর-অবিচ্ছেদ্য পেলব খরমুজকে আলতো আলিঙ্গনে ধরেছে। মাংসে পরিপুষ্ট খরমুজ ও লাবণ্যপ্রাণ পত্র-পল্লবের ওপর ঠিকরে পড়া নরোম আলো যে-দৃশ্যটি রচনা করেছে তা স্বর্গীয়। বনভূমিটি সুতরাং স্বর্গোদ্যান হতেও পারে।

আগন্তুকের নাম-পরিচয় অজ্ঞাত, যদিও-বা তার উপস্থিতি আলোকদীপ্ত বনভূমির ঘনসবুজ পাতাদের নিকট প্রীতিকর বোধ হচ্ছে। ঋজু পেলব মাংসপিণ্ডকে আলিঙ্গনে বেঁধে রাখতে তাদের বিলক্ষণ মতি এই ইশারার স্মারক এখানে;—আগন্তুক ও বনভূমি পরস্পর অভিন্ন ও কারণবশত উভয়ে তারা প্রকৃতি। ঘনীভূত সবুজ পাতার গায়ে শায়িত সদ্য ফোটা পদ্ম-ভীরু কোমল রৌদ্র আর কফিঘন নগ্নদেহ আগন্তুক মিলে বনভূমির ওপর মায়া রচিত হয়েছে বলাই যায়। এহেন মায়া কেবল স্বপ্নে সম্ভব। যেখানে, নীরবতা বাঙ্ময় হওয়ার কারণে অস্তিত্বকে মায়াবি বিভ্রম বলে মনে হয়।
বড়ো সত্য এই প্রগাঢ় নীরবতা! বনভূমি এতখানি নীরব, বৃক্ষশাখা হতে ভূমিতে পাতাঝরার শব্দ কানে আসে। প্রকৃত বনভূমি এরকমই হয় বটে! পরিকল্পনা হয়তো ছিল,—আগন্তুক বনভূমির নীরবতায় বিচরণ করবে, আর বৃক্ষশাখার আনত চিরল পাতার সারি তার পাথুরে পেলব নিতম্বে আলগোছে পড়ে থাকবে! পরিকল্পনায় ছিল কি, আগন্তুক কমলারঙিন পরাগরেণুতে নিজের হাত করবে রঞ্জিত? শ্রোণীদেশের পশ্চাতে পরাগরঞ্জিত হাত অবোধ্য মায়া রচনা করবে, তা উদ্যানের রচয়িতা নিজে ভাবেনি হয়তো!
বনভূমি তবেই বনভূমি হয়ে ওঠে, যখন পুষ্পকোমল আলোয় পরাগরঞ্জিত কফিবর্ণ আগন্তুকের চকিত আবির্ভাব এর নির্জনতাকে হিরন্ময় করে তোলে। বীটপি ঘেরা বনভূমির একটি পথ থেকে অন্য পথে বিচরণের মুহূর্তে পরাগরেণুতে হাত রঞ্জিত করে আগন্তুক। দূরাতীত স্মৃতির স্মারক তার এই বিচরণ বনে অথবা স্বর্গীয় উদ্যানে!
লতাগুল্মে আচ্ছাদিত বনভূমি ঘনসবুজ পত্রপল্লবে সবে বিকশিত হচ্ছিল, আর আগন্তুক স্বয়ং বনভূমির সঙ্গে জন্ম নিয়েছিল সেখানে। তার পরাগরঞ্জিত হাত ও পাথুরে-পেলব নিতম্বে না-আবছায়া না-তীব্র রেশম নরোম রৌদ্রের বিস্তারটি মনোহর! সে তখন অপ্রাকৃত বনভূমিতে চকিত আবেশে স্থির হয়ে নিজের গন্তব্য ভাবছিল! উদ্যানের রচয়িতা দূর থেকে তাকে অবলোকনের মুহূর্তে বিড়িবিড় করছিলেন : ‘আগন্তুক! তাকে অপরিচিত লাগছে কেন! সে কে হয়? কী পরিচয়? কোথা থেকে উদয় এখানে! সে কি আদম অথবা হাওয়া? নাকি, অজানা বিস্ময় বনভূমির মতোই সুরেলা কুহক!’
. . .

সংযুক্তি
যেসব আলোকচিত্রী স্থিরচিত্রে অবোধ্য মায়াবি জগৎ রচনায় ক্যামেরা হাতে তুলে নেন, সান্নে ভ্যান রোজেনডাল সেই ধরায় পড়েন বটে। রচনায় ব্যবহৃত আলোকচিত্র শিল্পীর ‘Cross Polination’ ফটো-স্টোরির আওতায় তোলা ছবি থেকে নেওয়া। ‘For the Green Gallery’-র জন্য নিবেদিত ছবিটি নবীন এই আলোকচিত্রীর কুশলতা চিনিয়ে যায়। ক্যামেরায় ছবি তোলার সময় কাব্যিক কূটাভাস তৈরির ঝোঁক এই সময়ের আলোকচিত্র শিল্পে তাঁকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। বক্ষ্যমাণ রচনায় সংযুক্ত স্থিরচিত্রকে এরকম এক দ্যুতি-ইশারায় ভাস্বর ধরা যেতেই পারে।
স্মরণ রাখা প্রয়োজন, সান্নে ভ্যান রোজেনডাল তাঁর ক্যামেরায় সচেতনভাবে উদ্দেশ্যমূলক থাকেন। নান্দনিক সৌন্দর্যকে ক্যামেরায় ধারণের প্রশ্নে যেখানে তিনি জৈব ও ইরোটিক। মডেল ফটোগ্রাফি-সহ অন্যান্য স্থিরচিত্রে নিজের এই উদ্দেশ্যমূলক আরোপনের খেলাটি প্রয়োগ করতে ত্রুটি করেন না। আলো ও রংয়ের কুশলতা যেমন ‘Cross Polination’-এ ধারণকৃত এই নগ্নতাকে কামঘন স্বাস্থ্য ও আদিমতা দান করেছে।
’ছবির অন্তরালে’ শায়িত কাহিনিরেখা কল্পনা করে নিতে রোজেনডালের স্থিরচিত্রটি বেশ প্রেরণাদায়ী। রচয়িতাকে সৃষ্টির সূচনালগ্নে ফিরে যেতে তা প্রণোদিত করে। ক্যামেরায় তোলা এই পরিকল্পিত অথচ অনাড়ম্বর দৃশ্যটি সৃষ্টির আদিম মুহূর্তের স্মারক! সৃষ্টি সেদিন স্বাস্থ্য ও লাবণ্যে পরিপুষ্ট বনভূমির মতো বিকশিত হচ্ছিল মিলনের প্রয়োজনে। মানতেই হচ্ছে,—রোজেনডালের অ্যরেঞ্জড ফটোগ্রাফি উসকানি জাগিয়ে তোলার ঘটনায় বেশ সফল। লেখকের সুতরাং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকাই উচিত।
. . .

. . .


