পোস্ট শোকেস - সাহিত্যবাসর

কথালাপ : ভাবনার ভাস্কর্যে কেতকী কুশারী ডাইসন : কামাল রাহমান ও মারুফ রায়হান

Reading time 26 minute
5
(21)

কেতকী কুশারী ডাইসনের জন্ম ১৯৪০ সনের কলকাতায়। কলকাতা ও অক্সফোর্ডে পাঠ নিয়েছেন। বিলেতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন ১৯৬৪ সন থেকে। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় সক্রিয় এই গুণী। কবিতা, উপন্যাস, নাটক, সমালোচনা, অনুবাদ মিলিয়ে সাহিত্যের সকল শাখায় রয়েছে অবাধ বিচরণ। উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে জল ফুঁড়ে আগুন, তিসিডোর, রাতের রোদ, কথা বলতে দাও, জাদুকর প্রেম, জাদুকর মৃত্যু, চলন্ত নির্মাণ, ভাবনার ভাস্কর্য, শিকড় বাকড়, রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে ও রঙের রবীন্দ্রনাথ তাঁকে দিয়েছে বিশিষ্টতা। কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ আনন্দ পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৮৬ ও ১৯৯৭ সন মিলে দুবার ।

আমাদের সঙ্গে আলাপে বিদগ্ধ এই কবি ডায়াস্পোরা সাহিত্য, নিজের অতীত, বাংলাদেশের সাহিত্য ও তাঁর বিশ্বমনন নিয়ে বলেছেন অনেক কথাই। সেখানে ধরা পড়েছে স্থানিকতা ও বৈশ্বিকতায় সমানভাবে স্বচ্ছন্দবিহারী এক মেধাবী মনন। ২০১২ সনের সেপ্টেম্বরে লন্ডনের সংহতি পরিষদ একটি কবিতা উৎসবের আয়োজন করেন। বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রিত কবি হিসেবে মারুফ রায়হান যোগ দিয়েছিলেন উৎসবে। তাঁর উদ্যোগে কেতকীর সঙ্গে আমাদের এই আড্ডালাপ। কথার পিঠে কথা গেঁথে তাঁর কাজের ব্যাপ্তি ও যাপনকে জানার চেষ্টায় সমৃদ্ধ হয়েছি নিজে। আশা করি পাঠকদের ভালো লাগবে। আমাদের এই আলাপ প্রথম আলো পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে ২০১২ সনে প্রকাশিত হয় তাৎক্ষণিক। এখন তা থার্ড লেন স্পেস ও সাবস্টেকেও পাঠকের জন্য রইল উন্মুক্ত।
. . .

Ketaki Kushari Dyson; Image Source: Collected; Credit: A Scrapbook of Memories and Reflections; parabaas.com

কামাল : বাংলা ও ইংরেজি, দু’ভাষাতেই কাজ করেন আপনি, বাংলায় আপনার যে-অসাধারণ দক্ষতা, ইংরেজিতে এর কতটুকু ব্যবহার করতে পেরেছেন বলে মনে করেন?

কেতকী : ইংরেজিতে কীসের… কী ব্যবহার বলছেন? দুটো ভাষাই ব্যবহার করি আমি। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী ছিলাম, ভালো ছাত্রী বলতে পারেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রেকর্ড মার্ক পেয়েছি তখন। আটান্ন সালে গ্র্যাজুয়েট হই। উনিশ বছর বয়সে চোখে সমস্যা দেখা দিলো। স্কলারশিপ পেয়ে অক্সফোর্ডে চলে আসি ষাট সনে। ৬৩ সালে আবার গ্র্যাজুয়েশন করি এখানে। কলকাতায় ফেরত যাই তারপর, সেখানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর পড়িয়েছিলাম। ১৯৬৪ সনে আমার বিয়ে হলো কলকাতায়। ইংল্যান্ডে ফেরত গেলাম তখন। ফেরত আসার এই পর্বে ব্রাইটনে ছিলাম। তার মধ্যে আবার বছর দেড়েক ক্যানাডায় থেকেছি। ১৯৬৮-র শেষের দিকে ইংল্যান্ডে চলে আসি। ১৯৬৯-এর শেষ দিকটায় অক্সফোর্ডে স্নাতকোত্তোর পড়াশোনা আরম্ভ করি। পাঁচ-ছ’বছর গবেষণায় কেটে গেল। ১৯৭৫-এ ডি.ফিল অর্থাৎ ডক্টরেট পেলাম। বিএ ক্লাসে আমি কিন্তু প্রথম ভারতীয় নারী হিসেবে ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম শ্রেণি পেয়েছিলাম। ইংরেজিতে কিছুটা দক্ষতা ও দখল আমার আছে আশা করি।

কামাল : দক্ষতা নিশ্চয় আছে, আমি বোঝাতে চেয়েছি ব্যবহারের বিষয়টা। আমরা, যারা মূলত বাংলায় পড়াশোনা করি তাদের সবাই তো আপনার ইংরেজি লেখালেখির সঙ্গে ওভাবে পরিচিত নই।

কেতকী : কোনটা ব্যবহার, অনেক লিখি আমি, ইংরেজিতে অনেক লেখা আছে আমার, দুটো ভাষাই পাশাপাশি ব্যবহার করেছি, মাতৃভাষার মতো। বাংলা থেকে অনুবাদ করা ইংরেজি নাটক আছে দুটো, কবিতা আছে, অনুবাদ আছে, গবেষণা আছে। রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদ আছে আমার। উপন্যাস বাংলাতেই লিখি, সামাজিক জীবনকে দেখাতে হলে কোনো একটা সংস্কৃতির মধ্যে নোঙর ফেলতে হয়, উপন্যাসকে একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখি, সবটাই ভাষানির্ভর না এখানে। কবিতার জন্য যেটি হয়তো জরুরি নয়। কবিতার ক্ষেত্রে শব্দগুলো মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। উপন্যাসের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, চরিত্র নির্মাণে যে-দৃষ্টিভঙ্গি, এসব যদি বিবেচনা করেন, তাহলে বাংলাতেই ওটা আসে আমার।

কামাল : দুটো মাতৃভাষার কথা বলছিলেন…

কেতকী : হ্যাঁ, এদের অনেকে এটা বিশ্বাস করতে চায় না। ওরা বলে বাইলিঙ্গুয়্যাল কেউ হতে পারে না, অনেক ভাষা জানতে পারো তুমি, মাতৃভাষা একটাই। এটা ওদের বোঝানো যাবে না। যে-পর্যন্ত ইংরেজি ডোমিন্যান্ট ল্যাঙ্গুয়েজ থাকবে, বিষয়টাই ওদের অনেকে বোঝে না, সন্দেহ করে, ওরা ধরতে পারে না, ফেনোমেননটা, এই স্পেশিয়ালিটি ধরতে পারে না।

কামাল : এটা বিশ্বাস করা কষ্টকর-যে, ইংরেজির অবস্থানে অন্য কোনো ভাষা আর যেতে পারবে কখনো। ভারতবর্ষে হিন্দি তো অন্যান্য অনেক ভাষাভাষীরই মাতৃভাষাসম, বাইলিঙ্গুয়্যাল এই বিষয়টা আমিও ঠিক বুঝি না, ঐ পরিপ্রেক্ষিত অথবা বাস্তবতাটি আমার নেই। যাহোক, কতটা স্বতঃস্ফূর্ত আপনি লেখালেখিতে, প্রেরণা বা তাড়না আসে কোথা থেকে? বিলেতে বসে সাহিত্যচর্চা কোনোভাবে আপনার অনুকূলে কাজ করেছে কি? বাড়তি কোনো সুবিধা?

কেতকী : বিষয়টি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, মার্কিনিদের জন্য ইংরেজি এখন অনেক বেশি করে ডোমিন্যাট করছে, ভবিষ্যতে অন্য কেউ করবে কিনা এখনো জানি না। আমি যে-রকম লিখি, একটা সৌন্দর্য সৃষ্টি করার চেষ্টা করি আমি। কুড়ি বছর বয়সে দেশ থেকে চলে আসি, তবে বাংলার সাংস্কৃতিক বুনিয়াদ সঙ্গে নিয়ে এসেছি। দুটো ভাষাই জানি বলে কবিতাটাও সঙ্গে আছে, ইংরেজিতে উপন্যাস লেখার তাগিদ অনুভব করিনি। তবে বাংলায় কিছু লেখা হয়ে গেলে আবার অনুবাদটা করা যায়। আমার ‘রাতের রোদ’ ও ‘মোৎসার্ট চকোলেট’ নাটক দুটোর অনুবাদ করেছি আমি। কবিতায় দ্বিভাষিক হওয়ায় কোনো সমস্যা নেই, দুটো ভাষায়ই করা যায়… সহজে করা যায় কবিতায়। নাটকে কিছুটা চেষ্টা করেছি। দুটো ভাষার মধ্যে যাতায়াত করি আমি, বলতে পারেন সমান সমান। দুটোই মাতৃভাষার মতো আমার কাছে। আমার অনেক ইংরেজি অনুবাদ আছে। জীবনে তিনটে নাটক লিখেছি আমি। তিনটি নাটকেরই মূল ভাষা বাংলা। তাদের মধ্যে দুটির ইংরেজি অনুবাদ করেছি। সে-দুটি ইংরেজিতে অভিনীতও হয়েছে।

কামাল : কোথায় মঞ্চস্থ হয়েছে?

কেতকী : এখানেই।

কামাল : পাশ্চাত্য দর্শনে তো অকারণে কিছু নেই, সবকিছুতেই ভোক্তা ও উৎপাদক, ঐ বিবেচনায়, আপনার লেখালেখির সময় সম্ভাব্য পাঠকের কথা কি মনে থাকে?

Memories: When East meet West; Hoilday in Wlaes, 1962; Image Source: Collected; Credit: A Scrapbook of Memories and Reflections; parabaas.com

কেতকী : লেখালেখির রসায়ন তো প্রত্যেকের ভিন্ন। লন্ডনের এস্টাবলিস্টমেন্টের জন্য তো লিখতে পারব না আমি, ওদের কিছু দাবি আছে, আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে সেটা ধরা দেয় না। ইংরেজিতে লিখে যারা বুকার পেয়েছে, রুশদি, অরুন্ধতী এরা বা এ-বছর বুকারে নাম উঠেছে জিৎ থাইল, ভারতের একটু খারাপ দিকটা, দারিদ্র্যের দিকটা, ঝামেলার দিকটাই উঠে আসে ওদের লেখায়, বোম্বের ড্রাগ ওয়ার্ল্ডের বিষয়ে জিতের নাকি সরাসরি, একেবারে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে, ওরকম না লিখলে তো এদের তালিকায় আসা যাবে না। কিন্তু আমার পক্ষে তো ওই ধরনের লেখা সম্ভব না, অন্য একটা অবস্থান থেকে লিখি আমি। ইংরেজিতে যদি এটা করতে চাই, ইন্টারটেক্সটচুয়্যালিটি আসবে না। ভারতীয় ইংরেজিটা আমার আসে না, ওটা তৈরি হওয়ার আগেই দেশ ছেড়ে চলে এসেছি আমি, আমার ইংরেজিটা ব্রিটিশ। কিন্তু ওরকম না লিখলে এখানের তালিকায় ওঠা যাবে না।

কামাল : আপনার বেড়ে ওঠা থেকে পূর্ণতা লাভের পর্যায়ে দেখি, পারিবারিক দিকে, পৈতৃক অবস্থান থেকে যেমন বিশ্বমনস্কতা, অথবা আরো স্পষ্ট করে বললে বিশ্ব নাগরিক দৃষ্টিভঙ্গি পেয়েছেন, তেমনি বৈবাহিক সূত্রেও এটা পেয়েছেন, বাঙালি হিসেবে আমাদের ঐতিহাসিক আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে এসে আপনার এই জীবনবীক্ষণ সাহিত্যকর্মে নিয়ে এসেছেন কি?

কেতকী : বিশ্বমনস্কতা… খুবই সত্যি কথা, আঞ্চলিকতা যদি বলেন, ওখানে আমারও খুব আগ্রহ রয়েছে, আমাদের গ্রামীণ গানে, পালায়, সুফী, সহজিয়া, মরমীয়া, লৌকিক বিষয়গুলো তো আমার কাছেও আছে, এর বিশ্বমুখীনতাটাই হয়তো আমার ভেতরে প্রধান। লালনের গানগুলো আমার কাছে আছে, এই সহজিয়া ভাবধারায় সব ধর্মেরই মিলন হয়েছিল, নিজস্ব একটা তৃণমূল মানবধর্ম আছে এখানে। এটা সহজাত, বৈষ্ণব, শাক্ত, এসব তত্ত্বগুলো যদি ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারতাম, তাহলে হয়তো অনেকদূর যেতে পারতাম আমরা, তারপর তো অনেক কিছু বদলে গেল। ফান্ডামেন্টালিজমে বিগড়ে গেছে অনেক কিছু, আমাদের নিজস্ব মানবতন্ত্র একটা ছিল, এখন তো নেই।

কামাল : হ্যাঁ, যে-সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গি বাংলায় ছিল বা ভারতবর্ষে ছিল, তা এখন ভারতবর্ষেরই আর কোথাও নেই, শুধু বাংলাই ব্যতিক্রম না। এই দৃষ্টিভঙ্গিটা তো বরং সাতচল্লিশ পরবর্তী সময়ে আরো ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ফান্ডামেন্টালিজমের শেকড়টা কোথায়?

কেতকী : সেকুলার আবহাওয়ায় বড়ো হয়েছি, আমার লেখাগুলো প্রকাশিতও হয়েছে ঐ-আবহে, এটা না থাকলে আমার লেখা প্রকাশিত হতো না, ‘জিজ্ঞাসা’ পত্রিকার নিয়মিত লেখক ছিলাম পঁচিশ বছর, ওরা তো ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন।

কামাল : আপনার প্রথম দিকের উপন্যাস নোটন নোটন পায়রাগুলোয় দেখি বিলেতের বাঙালিদের জীবনচিত্র, একেবারে বিপরীতমুখী দুটো সমাজের ভেতর যে-ক্রিয়া-বিক্রিয়া ঘটেছে, সেগুলো কীভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন? এসবের প্রতিফলন আপনার লেখালেখিতে কতটুকু এসেছে?

কেতকী : ঐ-বিপরীতমুখীটাই বিশ্বাস করি না আমি। একজন বাঙালি মেয়ের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেছি আমি। আলজেরিয়ান, উত্তর আ্রইরিশ, দক্ষিণ আইরিশ, ক্যারিবিয়ান চরিত্র আছে ওখানে, একটা বাঙালি পরিবার আছে, মেয়েদের জবানবন্দি তৈরি করতে চেয়েছি আমি। চারপাশের যেসব বিদেশি মেয়েদের দেখেছি তাদেরকে বাঙালি পাঠকের কাছে আনতে চেয়েছি, অনেক মেয়েদের চরিত্র আছে, তখন আমাদের কাছে নারীত্বটাই প্রধান ছিল, ওখান থেকে মুক্ত একটা কিছু করতে চেয়েছি, হতে চেয়েছি। ফতিমা যে-চরিত্রটা আছে, সে মেয়েটির ইন্টারভিউ করেছি, সে ফরাসিতে ডায়েরি লিখেছে। এখানে বিশ্বমানবতার বিষয় তো আছেই। সিলেটের মিয়া নামে যে চরিত্রটি আছে সেটি ষাটের দশকের একটা স্মৃতি আমার। অক্সফোর্ডের ছাত্রী ছিলাম, ঐ-সময়ের লেখা। তারপর ২০০৩-এ বেরোনো ‘জল ফুঁড়ে আগুন’ বলে একটা উপন্যাস আছে আমার, সেখানে অসবর্ণ বিবাহের, বাঙালি ও ইংরেজের বিষয় আছে। আন্তর্জাতিকতা যদি খোঁজেন আমার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’ খুলে দেখুন, সেফার্দিক ইহুদি চরিত্র আছে ওখানে, সেফার্দিক গানের অনুবাদ আছে… পাঁচ-ছ’ বছর তো রবীন্দ্রনাথের বর্ণ-দৃষ্টি নিয়েই কাজ করলাম। এটা তো অনেক বড়ো কাজ মনে হয়, পশ্চিমবঙ্গের চক্ষু বিশেষজ্ঞরা এটার মূল্যায়ন করেছে।

মারুফ : এটার ইন্টারপ্রিটেশান বোধহয় বদলেছে, আপনার ঐ-বইটা অনেকের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে।

কেতকী : ওর ভেতর রবীন্দ্রনাথের বর্ণের দৃষ্টিভঙ্গিটা তো ফুটে উঠেছে, কী করে বর্ণদৃষ্টিটা ফুটে উঠেছে দেখুন, অধ্যাপক নন্দিনীকে বলছে ‘তা আমাকে ওর একটি ফুল দাও, শুধু ক্ষণকালের দান, ওর রঙের তত্ত্বটি বুঝবার চেষ্টা করি’। এখানে বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণদৃষ্টির সমস্যাটা। এত বড়ো কাজ বাংলায় না করলে তো হবে না। টেক্সটা বাংলায়, মেটাটেক্সটা বাংলায়ই হতে হবে। এইসব করেছি, জীবনানন্দের উপন্যাস নিয়ে কাজ করেছি।

Some among many literary works that define Ketakis’ diverse brilliance; Image Source: Collected Collage; Google Image

মারুফ : কোনটা, মাল্যবান?

কেতকী : না, সফলতা-নিস্ফলতা, যদিও মাল্যবানও এসেছে কিছুটা পরে।

কামাল : আমার পড়া আপনার শেষ বই তিসিডোর-এ দেখি বাংলা সাহিত্যের দুই মহারথীকে যেমন এনেছেন, তেমনি এসেছে ইতালির বিখ্যাত ইগনাসিও সিলোনের বিষয়। সত্যিই চমৎকৃত হয়েছি আপনার এ-বইটি পড়ে। আব্রুজ্জো ট্রিলজি ও মহাভারতের মহারণ্যে হয়তো আমার পড়াই হতো না আপনার এই অসামান্য বইটি না পড়লে। আপনার কি মনে হয়েছে এ-কাজগুলো আরো অন্তত কুড়ি বছর আগে শুরু করলে, বাংলাসাহিত্যই নয় শুধু, বিশ্বসাহিত্যও আরো কিছু পেতে পারত?

কেতকী : কুড়ি বছর আগে তো অন্যান্য অনেক কাজও করেছি, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো নিয়ে দুটো বই আছে আমার, ১৯৮৫ সালে আর্জেন্টিনা গিয়েছি, গবেষণা করেছি, ‘ইন ইয়োর ব্লোসোমিং ফ্লাওয়ার-গার্ডেন : রবীন্দ্রনাথ টেগোর অ্যান্ড ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো’ বইটি প্রচুর ল্যাটিন আমেরিকান পাঠক পেয়েছে, স্প্যানিশে এটার অনুবাদ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। প্রচুর লিখছি তো আমি, সারাক্ষণ লিখছি, লেখার শেষ নেই আমার, কাজের শেষ নেই। অনুবাদ করছি, দু’দিকে, বাংলা থেকে ইংরেজি, ইংরেজি থেকে বাংলা, স্প্যানিশ থেকেও কিছু অনুবাদ করেছি। এখন আমার কবিতার সংগ্রহ তৈরির জন্য কাজ করছি, কোলকাতার বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন থেকে লেখালেখির জন্য নিয়মিত চাপ আছে।

কামাল : আপনার ভেতর রয়েছে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দুটো সংস্কৃতির গভীর মিশ্রণ, বাংলার মাটি ও জলহাওয়াকে যেমন বুঝতে পারেন, তেমনি বিলেতের বিখ্যাত আবহাওয়া ও তুষারের হিম উপলব্ধি করতে পারেন। দুটো সংস্কৃতির মিশ্রণে তৃতীয় একটি ধারা সৃষ্টি করার অনেক সুযোগ ছিল আপনার, যেমন নাইপল এটাকে কাজে লাগিয়েছেন, কী মনে হয় আপনার, বিষয়টিকে কতটুকু কাজে লাগিয়েছেন আপনি?

কেতকী : সেটা তো আমি করেছি। আমার লেখাতে একটা প্রয়াস, এই নিসর্গ, এই ঋতুচক্র, এই একটা নতুন বিষয়… কীভাবে বাংলায় নেব, বাংলায় পরিচিত করাব, সম্প্রসারণ করব আমাদের অন্তরজগৎ, আমার টেক্সট বিশ্লেষণ করলে দেখবেন গভীরভাবে আমি যথাসাধ্য করেছি এটা বাংলায় নিয়ে আসতে, উল্টোটা অল্প অল্প চেষ্টা করেছি, দেশের অনুষঙ্গগুলো নিয়ে আসতে। বিশেষ করে আমার ইংরেজি কবিতার বই ‘স্পেইসেস আই ইনহ্যাবিট’-এ এটা আছে। গভীরভাবে চেষ্টা চালিয়েছি এখানকার ঋতুচক্রকে ধরতে, নিসর্গকে ধরতে। ইংরেজিতে উপন্যাস লিখিনি বলে হয়তো মনে হচ্ছে আপনার-যে, সংস্কৃতির মিশ্রণটা ব্যবহার করিনি। আমি তো মূলত কবি। নাইপলের ধরনের বিবর্তন কখনোই হবে না আমার। উনি তো ছিন্নমূল, ক্যারিবিয়ান কী আছে এখন তাঁর মধ্যে। তিনি গদ্য লেখক, তাঁর তো কবিতা নেই। ভাষাটা হচ্ছে প্ররোচক, আমি দুটো ভাষার মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজটা করি। সংস্কৃতির আদান-প্রদান ও মিশ্রণের জন্যই আমার সমাদর হয়েছে, ভাষার মধ্যে যদি শেকড় না থাকে তাহলে কবিতা লেখা হয় না, নিজেকে শেকড়বদ্ধ লেখক বলে মনে করি আমি।

কামাল : বোঝাতে চেয়েছি দুটো ভাষায় মাতৃভাষায় দক্ষতা থাকার মতো এডভেন্টেইজ রয়েছে আপনার, দুটো সংস্কৃতির আদান প্রদানের বিষয়টা, বাঙালির সংস্কৃতিটা ইংরেজির মাধ্যমে অন্য ভাষাভাষীর কাছে কতটা পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয়েছে?

কেতকী : বাঙালি সংস্কৃতিকে অন্য ভাষাভাষীদের কাছে পৌঁছে দেয়া আমার লেখক জীবনের উদ্দেশ্য নয়, আমি চাচ্ছি বিশ্বকে বাংলায় ধরতে, অনুবাদের মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতিকে পরিচিত করিয়েছি। আমার অনুবাদের মাধ্যমে সমালোচকরা রবীন্দ্রনাথকে একজন আধুনিক হিসেবেও চিনেছেন, শুধু রোমান্টিক হিসেবেই না। আমি তো চল্লিশ বছর ধরে লিখছি। আমি তো চেষ্টা করেছি, আমার অনেক লেখায় আছে এসব। তবে নাইপলদের মতো তো আমি না, নাইপলের লেখা তো খুব ক্লেভার।

কামাল : রুশদি তো আরো ক্লেভার।

কেতকী : ভীষণ, ভীষণ, রুশদির মধ্যে আমি মানবতা পাই না। শিশুদের, নারীদের ছবি পাই না।

কামাল : বরং হিংস্রতা আছে ওর লেখায়।

কেতকী : খুব আছে।

Memories: Phd days; Ketaki with Robert, Leslie Holden, and Andrew Deacon; Brighton,1964; Image Source: Collected; Credit: A Scrapbook of Memories and Reflections; parabaas.com

কামাল : বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের লেখা পড়ার সুযোগ কতটা হয়?

কেতকী : পড়ি, ইলিয়াস পড়েছি, আরো আছে, সৈয়দ হক, শওকত আলী… বাংলাদেশের শামসুর রাহমানের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল, সৈয়দ হকের সঙ্গে আছে…

কামাল : হাসান আজিজুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, সেলিনা হোসেন…

কেতকী : নির্মলেন্দু গুণ পড়েছি, রফিক আজাদ, মহাদেব সাহা, সেলিনা হোসেন, হাসান আজিজুল হক, গোলাম মুরশিদ, দিলারা হাসেম, বদরুদ্দিন ওমর, বেলাল চৌধুরী, তসলিমা নাসরীন, আরও অনেক… বাংলাদেশ ও ভারতের অনেকের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে, তাঁরাও করেন। আমেরিকা, কানাডায় অনেক যোগাযোগ আছে, বঙ্গ সম্মেলনে নিয়ে গেছে ওরা আমাকে, আমেরিকার বাঙালিরা অনেক কিছু করে।

রাফি : আমেরিকার বাঙালিরা অনেক বেশি উৎসাহী।

কেতকী : হ্যাঁ।

কামাল : অজস্র রচনা করেছেন এ-পর্যন্ত, নিজের সাহিত্যকর্মকে কীভাবে দেখতে পছন্দ করবেন, কেন এসব?

কেতকী : সাহিত্যকর্ম… তিন চার বছর থেকেই কবিতা লিখি, কেন-টেন নেই, লেখক হিসেবেই জন্ম নিয়েছি আমি, আমাকে লিখতেই হবে। ওটাই আমার কাজ, ওটাই আমার জীবন, জীবনবিচ্ছিন্ন কিছু না।

কামাল : বর্তমান সময়টাকে কীভাবে দেখেন, আরো বেশি মানুষ নিঃসঙ্গ হয়ে যেতে বসেছে কি?

কেতকী : বর্তমান সময় জটিল, মানুষ লোভী হচ্ছে আরো, হিংসা, প্রতিযোগিতাকে বেশি মূল্য দিচ্ছে, সহযোগিতাকে তুচ্ছ করছে, পৃথিবী ধ্বংস হচ্ছে, আমার প্রথম নাটক রাতের রোদ যে-বছর লিখেছিলাম, বার্লিন ওয়াল ভাঙার বছর, হয়তো ওটা প্রথম সাহিত্যকর্ম যেখানে পরিবেশ দূষণের কথা বলেছি, গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কথা, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণের কথা বলেছি তখন, আর্কটিকের বরফ গলে যাচ্ছে, ব্রিটেনে এত বন্যা আগে তো হতো না।

রাফি : পঞ্চাশ বছর আগেও শুনতাম এটা কলিকাল, এখনো শুনি কলিকাল, পৃথিবী ধ্বংসের সময় এসে গেছে!

কেতকী : এটার উল্লেখ তো সব গ্রন্থেই আছে। আমাদের লোভ, মেটেরিয়্যাল লোভ বেড়ে গেছে।

কামাল : লোভ তো সহজাত, কয়েক পুরুষ আগে আমাদের লোভ ছিল মাটির প্রতি, যাযাবরদের লোভ ছিল পশুপালের প্রতি, এখন এই পুঁজিবাদী সময়ে, ব্যাংক ব্যালেন্সের প্রতি।

কেতকী : লোভ তো খাওয়া যায় না, কম্পিউটার খাওয়া যায় না, জমি থেকে ফসল পাওয়া যেত, পশু থেকে দুধ মাংস পাওয়া যেত। সমুদ্রের জল যদি ডাঙ্গায় ওঠে তাহলে কোথায় যাবে মানুষ?

মারুফ : সুনামির কথা বলছেন, জল তো ওঠবেই।

কেতকী : বলতে চেয়েছি, সমুদ্রপৃষ্ঠের জলের উচ্চতা বাড়ছে, দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরের জল যদি ওঠে কোলকাতাও ডুবে যাবে, এটা নিয়ে আমার অনেক কবিতা আছে।

কামাল : ডোরিস লেসিং-এর প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা রেখেই বলি, বাংলাসাহিত্যে ঐ-মানের লেখক কি নেই অথবা কাছাকাছি মানের?

কেতকী : নিশ্চয় আছে।

কামাল : গত একশো বছরে আর একটা নোবেল পুরস্কারও কেন বাংলাসাহিত্যের জন্য এল না?

কেতকী : নোবেল তো ভারতের আর কোনো ভাষাতেই আসেনি।

রাফি : নোবেল দিয়েই তো সব বিচার হয় না, ওটা একমাত্র মানদণ্ড না।

Ketaki Kushari Dyson; Image Source: Collected; Google Image

কামাল : তা বলছি না। কিন্তু এটা তো একটা বড় স্বীকৃতি, হয়তো একইসঙ্গে আরো দশজনের প্রতি অস্বীকৃতিও। ধরা যাক, যে দশবারো জনের নাম প্রতি বছর নোবেল তালিকায় আসে তাদের প্রায় সবাই মানের দিক থেকে উনিশ-বিশ, হয়তো অধিকাংশই বিশ। দেখা গেল-যে, একজন উনিশই পুরস্কারটা পেয়ে গেছে, তখন বিশ্বে তোলপাড় শুরু হয় তাঁকে নিয়ে। বাকিরা থেকে যায় অনেকটা আড়ালে, কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে। এভাবে হাজার হাজার নোবেল মানের সাহিত্যিক আড়ালে রয়ে গেছেন, আঞ্চলিকতার নিগড়ে বাঁধা পড়ে আছেন। এটার বিকল্প তো কিছু নেই, এমনটাই তো হয়ে এসেছে। এই নোবেল পুরস্কার দিয়েই অনেককে চিনি আমরা। আমার তো মনে হয় রবিঠাকুরকেও মানুষ চিনেছে ঐ পুরস্কারটা পাওয়ার পরই।

কেতকী : সেটা তো সংস্কৃতির রাজনীতি, রাজনীতির সঙ্গে আমরা তো কমপিট করতে পারছি না, লড়তে পারছি না।

কামাল : কেন পারছিনা? দশ-পাঁচটা না হোক, কম করে হলে দু-তিনটে তো আসতে পারত আমাদের ঘরে! বুদ্ধদেব, জীবনানন্দ, তিন বন্দোপাধ্যায়ের অন্তত একজন, মহাশ্বেতা দেবী, অমিয়ভূষণ মজুমদার…

রাফি : আমাদের উপযুক্ত সাহিত্যিকদের নাম কি নোবেল কমিটি পর্যন্ত পৌঁছায়?

কেতকী : কারা পাঠাবে? বাংলাসাহিত্যের জন্য কোনো নামই পাঠানো হয় না, কিছু জানে না ওরা।

কামাল : কে কাকে প্রপোজ করবে? যদ্দূর জানি নোবেল কমিটি নাম চেয়ে বিভিন্ন দেশে চিঠি পাঠায়। বাংলাদেশের কেউ তো সেসব তথ্য প্রকাশ করে না।

রাফি : নোবেল কমিটি প্রতি বছর সেপ্টেম্বরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি পাঠায়।

কেতকী : আমরা কি জানি নোবেল কমিটিতে কোনো বছর কাউকে প্রপোজ করা হয়েছে কিনা?

কামাল : না, জানি না। কারণ, কাদের প্রপোজ করা হয়েছে, বা আদৌ কিছু করা হয়েছে কিনা তাই জানি না। যাহোক, বাংলায় এত অসাধারণ কাজ হচ্ছে, দুই বাংলায়ই হচ্ছে। বাংলাদেশে এত কিছু হচ্ছে… শওকত আলী, সৈয়দ হক, হাসান আজিজুল হক, এঁরা… সুনীল, সমরেশ, দেবেশ রায়, ওঁরা করছেন কলকাতায়…

কেতকী : বাংলাদেশে এরকম কোনো কমিটি আছে?

রাফি : যদ্দুর জানি, অনেক দেশেই আছে।

কেতকী : পুরস্কার বিষয়ে ভারতের কথা বলতে পারি, সাহিত্য অকাদেমি আমাকে পুরস্কার দেয়নি, যেহেতু ভারতীয় নাগরিক আর নই আমি। আমার অনেক প্রবন্ধে এসব আলোচনা আছে, চলন্ত নির্মাণে আছে, ভাবনার ভাস্কর্যে আছে, প্রবন্ধ সংকলনে আছে আমার বক্তব্য। রবীন্দ্রনাথ তো ব্রিটিশ পাসপোর্ট নিয়ে সারা দুনিয়া ঘুরেছেন। আমি আর কি দোষ করেছি। একবার উনার পাসপোর্ট হারিয়ে গিয়েছিল। নাগরিকত্বটা মূল বিষয় না, আমি মানুষের কাজে বিশ্বাস করি। ইংরেজি ডোমিন্যান্ট, এদের বিষয়টা ধরুন, সবচেয়ে ভালো হতো যদি এরা এত পাওয়ারফুল না হতো, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আমলেও ব্রিটিশরা এত দাপটে ছিল না, মার্কিন সাম্রাজ্যে ওরা যত দাপট দেখাচ্ছে, যখন সাম্রাজ্যটা নিজের থাকে তখন কিছু দায়িত্ব থাকে, বিভিন্ন কাজ করেছে তখন, সেই আমলে বড়ো বড়ো পণ্ডিত তৈরি হয়েছে, হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্মের ওপর কাজ করেছে।

কামাল : সবই তো ওদের শাসন-শোষণের স্বার্থে, আমাদেরকে ভালোবেসে তো নয়। ওদের সময় ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি করেছে, ভাষাগুলো তৈরি করেছে। প্রেস নিয়ে গেছে ওরা, ওটা না নিয়ে গেলে এখনো সম্ভবত মক্তব আর টোলের ভেতর খাবি খেতাম আমরা। কে জানে, হয়তো এটাই সত্যি। ডিরোজিও না হলে বোধহয় মুক্তবুদ্ধির উদয় হতে আরো সময় লাগত। কিন্তু আমাদের ভালো চিন্তাটা মাথায় রেখে এসব করেছে কি ওরা?

কেতকী : শকুন্তলার অনুবাদক উইলিয়ম জোনস ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষীর অস্তিত্ব প্রথম উপস্থাপন করলেন। শুধু সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বিষয়টি পুরো সত্যি নয়, একটি বৌদ্ধিক জিজ্ঞাসাও ওদের ছিল, তাদের বৌদ্ধিক বৃদ্ধির জন্য এটা করেছিল, জ্ঞানের জন্য; বিরাট জাতি যখন ছিল তখন ঔদার্য ছিল, সাম্রাজ্য চলে গেলেও মানটা ধরে রেখেছে।

কামাল : হ্যাঁ, মোগল পাঠান সাম্রাজ্য অবসানের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুই শেষ হয়ে গেছে ওদের, কিন্তু সাম্রাজ্যের অবসান হলেও ব্রিটিশেরা বহাল তবিয়তেই আছে। কিন্তু ঐ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে আমাদের জন্য কী ছিল?

কেতকী : ওটা ঠিক প্রাসঙ্গিক নয়, ওটাই প্রশ্ন নয়, ওরা সতিদাহ বন্ধ করেছে, ঠগী বন্ধ করেছে, জয় মা কালী বলে ফাঁসি দিত, এসব বন্ধ করেছে। সংস্কৃতিতে যোগাযোগ না হলে অনেক কিছু হয় না। সাম্রাজ্যটা হয়তো ওদের জন্যই ছিল, মোগলরা চলে যাওয়ার পর ভারতবর্ষকে একটা বিধ্বস্ত সভ্যতা হিসেবে পেয়েছিল, এবং ওদের একটা আকাঙক্ষা ছিল এই বিধ্বস্ত সভ্যতাকে পুনর্জীবিত করা, একটা উৎসাহ ছিল।

কামাল : এটার সঙ্গে আমার ভিন্নমত। যাহোক, বিশ্বসাহিত্যের অবস্থানের সঙ্গে বাংলাসাহিত্যকে কোথায় রাখবেন আপনি?

কেতকী : ওভাবে বিচার করতে চাই না, প্রত্যেকটা সংস্কৃতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে, সমকক্ষদের সঙ্গে কাজ করতে চাই, ডোমিন্যান্টদের ভেট দেয়ার জন্য লিখতে চাই না, রুশদিরা যা করছে তা করতে পারব না আমি

মারুফ : বিশ্বসাহিত্য বলতে কোনটা বোঝাচ্ছেন, বাংলাসাহিত্যকে বাইরে রেখে?

কামাল : না, বাংলাসাহিত্য বিশ্বসাহিত্যেরই অংশ, বাইরে থাকবে কেন, ভেতরে রেখেই। সামগ্রিকের সঙ্গে অংশের তুলনা বলতে পারেন, বিপুল ঐ অংশটা কতটুকু উজ্জ্বল এখন। একসময় তো বিদ্যুচ্চমকের মতো ঝলকে উঠেছিল।

কেতকী : বাংলাসাহিত্য বৈশ্বিক হয়েছে তাত্ত্বিক বিচারে। বিশ্বসাহিত্য বলতে ভালো সবকিছুই এর আওতায় পড়ে। আমি ডোমিন্যান্ট কালচারটার বিপক্ষে প্রতিবাদ করতে চাই, এটা কীভাবে হয় যে, সবসময় ওদের লেখাই আমরা পড়ব, ওরা আমাদের লেখা পড়বে না। যারা ইংরেজিতে লেখেন, ডোমিন্যান্ট হিসেবে আছেন, আমি সমকক্ষদের সঙ্গে কাজ করতে চাই। রুশদিরা যা করেছে, ওদের ভেট দিয়ে, ওদের মতো চাই না।

কামাল : বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে অথবা বিশ্বসাহিত্যের তুলনায় বাংলাসাহিত্যের অবস্থান বিবেচনা করলে আপনার কী মনে হয় বাংলাসাহিত্য স্বর্ণযুগ অতিক্রম করে এসেছে? এর ভবিষ্যত কী?

রাফি : স্বর্ণযুগ পেরিয়ে প্লাটিনাম যুগে পৌঁছে গেছে।

কেতকী : আমি তো চেষ্টা করছি আমার কাজটুকু করতে, মানটা ধরে রাখতে, অনেকেই তো মন দিয়ে লিখছে।

কামাল : বিশ্বায়নের যুগে এখন আঞ্চলিক সাহিত্য বলে খুব স্পষ্ট করে কিছু থাকছে কি? ইউরোপের ভালো যে-কোনো সাহিত্যকর্ম এখন একসঙ্গে কয়েকটা ভাষায় প্রকাশিত হচ্ছে। ইংল্যান্ড আমেরিকা অথবা কানাডা অস্ট্রেলিয়ার সাহিত্য খুব আলাদাভাবে সবসময় চিহ্নিত করা একটু কষ্টকর। আফ্রিকান ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের সাহিত্য অথবা ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্য অনুবাদের মাধ্যমে যেভাবে বিশ্বসাহিত্যে অবস্থান করে নিচ্ছে, বাংলাসাহিত্য তার ধারেকাছেও যেতে পারছে না, এটার কারণ কী মনে হয় আপনার?

কেতকী : সব থেকে বেশি অনুবাদ হয় ইংরেজি থেকে অন্য ভাষায়, অন্য ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনেক কম অনুবাদ হয়। ইটালিয়ানেও অনেক অনুবাদ হয়। স্প্যানিশ থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করার জন্য অনেকে আছে, কিন্তু বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করার জন্য দক্ষ কেউ নেই। ঐ দক্ষতা না থাকায় কিছু হচ্ছে না। ক্যারিবিয়ানরা ইংরেজিতেই লিখে, অনেক আফ্রিকানও ইংরেজিতেই লিখছে। আমি কেন মন খারাপ করব, আমার চলন্ত নির্মাণে আছে ওসব বিষয়, প্রবন্ধ সংকলনগুলোয় আছে আমার বক্তব্য, সত্যি সত্যি আমরা অবহেলিত, কী করে বুঝব, লন্ডনের ওদের কোনো কৌতুহল নেই, ওরা বলে মাল্টিকালচারালাইজেশান, কথা হচ্ছে, তাহলে কাজ কোথায়, আমার প্রকাশক ব্লাডেক্সকে বলেছি রবীন্দ্রনাথ করেছো, এবার বুদ্ধদেব করো, তখন ওরা বলেছে ওদের অনেক কাজ, ওদের সময় নেই, ফান্ড নেই, তখন কাজটা লন্ডন থেকে দিল্লিতে নিয়ে গেছি। এখানকার নাগরিক হওয়ায় ভারতীয় পাসপোর্ট ফেরত দিতে হয়েছে, খুব কষ্ট হয়েছিল, কী করব। ইংরেজিও তো আঞ্চলিক সাহিত্য, প্রত্যেকটা ভৌগোলিক এলাকার ঐতিহাসিক পৌরাণিক বিশেষত্ব রয়েছে, এগুলোকে আমাদের আরো মডেস্টলি অ্যাপ্রোচ করা উচিত, ইউরোপের সাহিত্যও ওরা বলে ইংরেজি দিয়ে শাসিত হয়ে যাচ্ছে, ডাচ ডেনিশ ফরাসিরাও বলে ইংরেজি ডোমিনেট করছে।

কামাল : ইংরেজি সাহিত্য বলতে এখন, আটলান্টিকের এপার ওপার, অথবা পঞ্চাশ ষাট বছরে ক্যারিবিয়ান সাহিত্য যে-পর্যায়ে এসেছে, আফ্রিকান সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের পর্যায়ে এসেছে, বোঝাতে চেয়েছি বাংলাসাহিত্য সেভাবে কতটুকু এগিয়েছে?

কেতকী : কথাটা এগিয়ে যাওয়ার না, আফ্রিকান সাহিত্য ইংরেজিতে লিখছে বলেই এগিয়ে আসছে মনে হয়, তাদের বিষয় শুনছি এখন। একসময় বাংলাসাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের পাশাপাশি অবস্থান করত, এখন তো অনেকে জন-গণ-মনোবন্দনার জন্য লিখছেন। নেগেটিভ থিঙ্কিং-এ যেতে চাই না, সবসময় উঁচু তারে বাঁধা রাখি নিজেকে, আমার পক্ষে কী করা সম্ভব, তার সবটুকুই চেষ্টা করেছি।

কামাল : অরুন্ধতী ও মনিকা প্রায় কাকবন্ধ্যা হয়ে রয়েছেন। বিক্রম শেঠ, অমিতাভ ঘোষ, রোহিন্তন মিস্ত্রি, ঝুম্পা লাহিড়ি, এঁদের প্রাথমিক সাফল্যের পর আর বেশি দূর এগোতে পারছেন না, কী মনে হয় আপনার?

রাফি : যে-কোনো লেখকের পরের বইগুলোর বিষয়ে বলা যেতে পারে অনেকেরই প্রথম বইটা আসে ফ্রম ইনসাইড… ইন্সপাইরেশান ফ্রম উইদিন, পরেরগুলো চর্চা ও সম্প্রসারণ।

কেতকী : হ্যাঁ। মনিকার একটা বই পড়েছি।

রাফি : ব্রিকলেন?

কেতকী : হ্যাঁ, মনিকার বইটা, মনিকা যেখানে বোনের চিঠির রূপ দিচ্ছে সেটা ব্যাকরণ-বহির্ভূত ভুল ইংরেজিতে লিখছে, এই আঙ্গিকটা ভালো লাগেনি আমার, ভাষা সম্পর্কে একটা ভুল ধারণা সৃষ্টি করে এটা, যে ঐ ভাষাটা একটা ভাঙাচোরা কিছু, এটা ব্যাকরণ-সম্মত না। মনিকা যখন বাংলাতে কথা বলছে, তখন ভুল বাংলায় ভুল বাক্যে লিখছে, এটা একদম ঠিক না। ইংরেজিতে লিখেছে বলেই হয়তো বুঝতে পারেনি কি করে দেখাবে-যে চিঠিটা বাংলায় ওরকমভাবে লেখা। আমি যেসব বিদেশি চরিত্র সৃষ্টি করেছি তাদেরকে শুদ্ধ ভাষায়ই কথা বলিয়েছি, মনিকা ঠিক তার বিপরীতটাই করেছে। আমার মনে হয় এতে ঐ ভাষাভাষীদের উপহাস করা হচ্ছে।

কামাল : সে যে চরিত্রগুলো সৃষ্টি করেছে ওরা হয়তো ভালো বাংলাটা জানেই না।

রাফি : ব্রিকলেন সিনেমাটা ভালোই লাগে।

Brick Lane by Monica Ali; Image Source: Collected; Google Image

কেতকী : মনিকার বইটা নিয়ে ভেবেছি, এবং লিখেছিও। অরুন্ধতীকেও পড়েছি যত্ন নিয়ে, ওর পলিটিক্সটাই চলে, লেখেও ভালো ওটা।

কামাল : বলেও ভালো।

কেতকী : হ্যাঁ, বলেও ভালো। তবে ওর ঐ-উপন্যাসটা খুব একটা কিছু কিন্তু না। ওটা অনেক বানিয়ে বানিয়ে লেখা, যাদের অবলম্বন করে বইটা লিখেছে ওরা ওরকম না।

কামাল : বানিয়েই তো লেখে সবাই, অরুন্ধতী তো খুব পরিশ্রমী, প্রচুর গবেষণা করে, খাটাখাটনির তো অন্ত নেই ওর, ফাঁকটা কোথায়? ভালো পাঠকও তো পেয়েছে।

কেতকী : আমি জীবন অবলম্বন করেই লিখি, আমার গবেষণার কাজগুলো উপন্যাসে থাকে নেপথ্যে, আবার গবেষণার বইতে ওসব প্রত্যক্ষ। অরুন্ধতী নিজের দেশকে এক্সোটিকভাবে পরিবেশন করেছে, ইংরেজ লেখকরা বলে, বিলেত তো আমার দেশ, নিজের দেশকে কীভাবে বাইরের লোকদের জন্য এক্সোটিক করে দেখাব! আমারও তাই মনে হয়, সমানে সমান থেকে কাজ করতে চাই আমি, আমি আমার লেভেলটা দেখাতে চাই, ওভাবে নাম করতে চাই না আমি।

রাফি : অরুন্ধতী অনেক প্যাশোন্যাট, ঝুম্পা একেবারে ডাল্। সে-তুলনায় রুশদি এলোমেলো, জটিল।

কেতকী : হ্যাঁ, রুশদিকে পড়তে পারি না আমি।

কামাল : রুশদি আমিও পারি না, খুব কষ্ট করে যদিও পড়ে ফেলি।

কেতকী : ছেড়ে ছেড়ে পড়ি আমি।

কামাল : সবারই-যে ভালো লাগবে এমন অবশ্য না, অনেকে তো আবার খুব প্রশংসা করে। প্রশংসা জিনিসটা আবার অনেকটা ছোঁয়াচেও।

রাফি : ঝুম্পার নেইমসেইক বইটা ভালো লেগেছে আমার।

কামাল : ওটা ভালোই মনে হয়। কিছু গল্প আছে ওর, সামগ্রিকভাবে আমার তেমন কিছু মনে হয় না ওকে।

কেতকী : ঝুম্পার অনেক ভালো গল্প আছে। একটা টেকনিক আছে ওর, ছোট পরিসরে গুছিয়ে লিখতে পারে সে। অমিতাভের হাংরি টাইড বইটা ভালো।

কামাল : হ্যাঁ, আমার একটু অবাক লেগেছে ওটার বাংলা নামটা পড়তে যেয়ে, ভাটির দেশ! ওটার শুরুতে কিছু কিছু অসঙ্গতি আছে মনে হয়, একজন সচেতন লেখকের ওসব থাকা উচিত না।

কেতকী : সুইটেবল বয় কুড়ি পাতার পর পড়তে পারিনি।

কামাল : আমি পড়েছি পাখির চোখে। বড়ো বইয়ের মধ্যে ওয়ার এন্ড পিস, লা মিজারেবল-এর মতো কয়েকটা বই পড়েছিলাম ধ্যানস্থ হয়ে।

কেতকী : কোলকাতার এক বিয়েবাড়ির বর্ণনা দিয়েছে, একেবারে আনরিয়্যালিস্টিক, কালচারে পার্টিসিপেট না করলে হয় না। বিস্বাদ বর্ণনা। কোলকাতার ষাটের দশকের বর্ণনা, ওখানে রিয়্যালিস্টিক কিছু নেই, কোলকাতার ভাষাটা না জানলে কোলকাতার সংস্কৃতিকে ছোঁয়া যায় না, কালচার ইজ ডিপলি রুটেড ইন দ্য ল্যাঙ্গুয়্যাজ।

কামাল : উপরচালাকি তো কিছুটা করতে হয় লেখকদের।

কেতকী : উপরচালাকিতে খুব একটা বিশ্বাস করি না আমি, অথেন্টিসিটিতে বিশ্বাস করেছি সবসময়, খাঁটি হওয়ার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি।

কামাল : বিশ্বসাহিত্যে স্থান পাওয়ার জন্য সাহিত্যের বিষয় একইসঙ্গে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক হওয়া দরকার মনে হয়, এ -বিষয়টা কীভাবে দেখবেন?

কেতকী : একেক সময় বেশ ক’জন, দশজন কুড়িজন ভালো সাহিত্যিক এসে যান। বিশ্বসাহিত্যের কথা বলতে হলে এসব বলতে হয়, সব ভাষায়ই ভালো লেখক আছে। থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশেও অনেক উৎকৃষ্ট লেখক লিখে যাচ্ছেন, তাদের কথা শুনি না, জানতে পারি না। সব ভাষাতেই আছে, আমরা জানতে পারি না তো। দুঃখ ভোগ থেকে লেখা আসে, হিন্দি, মারাঠি অনেক ভাষাতেই ভালো লেখক আছে, মালয়ালমে আছে, এদেরকে অনুবাদ করে ইংরেজিতে প্রকাশ করা খুব কঠিন কাজ, কারণ প্রকাশক ফি দিতে চায় না। আমার ভেতরের বইগুলো বের করতে চাই। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে আমার প্রচুর পাঠক আছে, ওরা আমার ফ্রিডম অব স্পিচে হাত দেয়নি, এজন্য আমি খুব থ্যাঙ্কফুল।

কামাল : একজন লেখকের জন্য বড়ো প্রাপ্তি এটা।

কেতকী : এমন একটা যুগে শুরু করেছি, একটা অন্যরকম বিষয় আমাদের ছিল, এখনকার বিষয়গুলোকে ফাঁকি মনে হয়, অন্য একটা যুগে তৈরি হয়েছি, ঐ-যুগের একটা হাওয়া ছিল, পঞ্চাশের দশকে বড়ো হয়েছি, যাদবপুরে তুলনামূলক সাহিত্যচর্চা হতে দেখেছি। আমাদের একটা অহঙ্কার ছিল তখন।

কামাল : অন্তর্গত অহঙ্কার।

কেতকী : হ্যাঁ।

কামাল : অনূদিত হয়ে আসার পর মূল ভাষার ক্যারিশমা তো আর থাকেই না প্রায়, তাহলে অবশিষ্ট থাকে শুধু বিষয়, এমনকি আঙ্গিকও অনেকটা গৌণ হয়ে পড়ে না? ধরা যাক অনুবাদের অনুবাদ হিসেবে যখন রুশ সাহিত্য পড়ি আমরা, রুশি ভাষার সৌকর্য অথবা আঙ্গিকের কারুকাজ কি অনূদিত হয়ে আসে? যতটুকুই আসে তাতে রুশ সাহিত্য চিনে নিতে কোনো অসুবিধে হয় কি আমাদের? রহস্যটা কোথায়?

কেতকী : না, তা নয়। এটা নিয়ে অনেক কথা বলা যায়, আলোচনা করা যায়। চেখভের নাটক ইংরেজিতে দেখেছি, রাশানরা বলেছে ওটা ঠিক ওরকম না। আক্ষরিক অনুবাদ তো সাহিত্যকর্ম না, অনুবাদের মাধ্যমে আপনাকে রিক্রিয়েট করতে হবে। আমার করা রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ ইংরেজদের ভালো লেগেছে এ-কারণে যে, এটা ঐ ভাষার মধ্যে সৌন্দর্য নিয়ে আসতে পেরেছে। বিশ্বভারতী রবীন্দ্রনাথের যথেষ্ট ক্ষতি করেছে, ম্যাকমিলানকৃত রবীন্দ্রনাথের অনুবাদটাকে দীর্ঘদিন ধরে রেখেছে রয়্যালটির জন্য, এটার অনুবাদের মানের জন্য রবীন্দ্রনাথের খ্যাতির খুব ক্ষতি হয়েছে। রাদিচের এবং আমার অনুবাদের মাধ্যমে নতুন পর্ব শুরু হয়েছে। ম্যাকমিলানের অনুবাদে রবীন্দ্রনাথের অনুবাদকের কোনো নাম ছিল না। এগুলো-যে আদৌ অনুবাদ তাও ছিল অজানা, অস্পষ্ট। অনেকের ভুল ধারণাও ছিল এ-সম্পর্কে। অনুবাদকের কাজই হচ্ছে মূলের সৌন্দর্য ও ধর্ম অন্য ভাষায় সঞ্চারিত করা। ভারতে অবস্থান করে ইউরোপের সৌন্দর্য সম্বন্ধে ধারণা করা খুব কঠিন, এখানের সৌন্দর্যের মূল ভাবটা না বুঝলে, এটার উৎস সম্পর্কে ধারণা না থাকলে এদের জন্য অনুবাদ করবে কীভাবে, মূলের সৌন্দর্য অন্য ভাষায় সঞ্চারিত করতে হয়।

কামাল : সঞ্চারণটা কোথায় করছেন তা তো জানা থাকতে হবে, ওটার বাস্তবতা তো ভিন্ন। যাহোক, আঙ্গিকটা কী আসে?

Writing plays in Bengali in the Diaspora: My Experiences – By Ketaki Kushari Dyson; Source: Brick Lane Circle YTC

কেতকী : ওটাই তো আর্ট, বিশেষ করে কবিতার ক্ষেত্রে আঙ্গিকটাকে আনাটাই আর্ট, আমার লেখায় যদি টীকা না দেই লোকে জানবে কী করে! টীকা ছাড়া অনুবাদ হয় না, আমি ভীষণভাবে ডিটেলের পক্ষপাতি, আলনার যদি টীকা না দেই লোকে জানবে কি করে আলনা কী? অনুবাদকের স্কলার হতে হবে, ইংরেজি জানলেই অনুবাদ করা যায় না, সাহিত্যমান-সম্পন্ন খুব ভালো ইংরেজি জানতে হবে, এবং লেখাটাও জানতে হবে, অনেক কিছু হয়তো অভিধানেও ঠিক ঠিক ওভাবেই নেই, ওটার অর্থ কীভাবে প্রকাশ করবে।

রাফি : আবার ওটার অর্থ হয়তো অভিধানে আছে, বেদে নেই।

কেতকী : হ্যাঁ, ‘বেদে নেই’ কথাটা পরিহাস করে সত্যেন বোস বলতেন।

কামাল : রুশ সাহিত্য অনুবাদের অনুবাদে পাচ্ছি আমরা, রুশ ভাষার বাইরের ও ভেতরের সৌন্দর্যটা কী পাচ্ছি?

কেতকী : আমি ইংরেজিতে পড়েছি, তর্ক-বিতর্ক আছে, অনুবাদ তো নিজস্ব একটা ধারা। রুশিরা ওদের অনুবাদ দেখে বলেছে এটা অন্য জিনিস। শুধু বিষয় না, আঙ্গিকও চলে আসে, যে-ভাষাতে অনুবাদ করবেন, সে-ভাষাটাও খুব ভালো জানতে হয়, ভাষার অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যটা ট্রান্সফার করতে হয়।

কামাল : এই সৌন্দর্যটা কী ট্রান্সফার করা যায়, এটা তো মূল ভাষার নিজস্ব সম্পদ। প্রত্যেক ভাষারই একটা নিজস্ব সম্পদ রয়েছে।

কেতকী : যে-ভাষাতে অনুবাদ করতে চান, সেটা জানা জরুরি,ইংরেজিতে কী করে কবিতা লিখতে হয় জানতে হবে, যদি ইংরেজিতে কবিতা অনুবাদ করার ইচ্ছা করেন।

রাফি : ওমর খৈয়াম তো অনুবাদের পরই পৃথিবী জয় করেছে।

কামাল : হ্যাঁ ফিটজেরাল্ড ওটার পুনর্জন্ম দিয়েছেন। আমি বলেছি জলের গভীরের স্রোতধারার কথা, যা হয়তো সাদা চোখে ধরা পড়ে না। ভেতরের সৌন্দর্যের কথা, ইনার বিউটি কী ট্রান্সফার করা যায়, ওটা তো উপলব্ধির বিষয়।

কেতকী : যতটা যায় ততটাই লাভ, যদি ফান্ডামেন্টালিস্ট হয়ে যান, ভাবেন-যে, কিছুই পরিবর্তিত হতে পারবে না, তাহলে তো ভিন্ন কথা।

কামাল : বৈশ্বিক মানদণ্ডে সৈয়দ শামসুল হক, শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ এদের লেখা কোন পর্যায়ের মনে হয়? এদের লেখার শক্তির দিক অথবা দুর্বলতার দিকগুলো কী বলে মনে হয় আপনার?

কেতকী : আমার কাছে ভালো লেখক মাত্রই বিশ্বসাহিত্যের অন্তর্গত, যে-ভাষাতেই লিখেন তিনি।

কামাল : অনুবাদ করা হলে এঁদের লেখা বিশ্বসাহিত্যের পাঠকেরা কী নেবে? যদি না নেয়, তাহলে কী নেই এঁদের লেখায়?

কেতকী : যদি ভালো অনুবাদ করেন তা হলে তো না নেয়ার কারণ দেখি না। দক্ষ অনুবাদক না থাকা একটা বড় সমস্যা, প্রকাশকরা অনুবাদককে পারিশ্রমিক দিতে চায় না, এবং লেখকের এস্টেটকে কোনো ফি দিতে চায় না।

কামাল : তাহলে কারা করবে এই অনুবাদ?

কেতকী : নিজের মাতৃভাষার মতো যারা ইংরেজিটা বোঝে এবং লিখে, দেবেশ রায় অনূদিত হয়ে আসার পর পাঠক নেবে ঐরকম অনুবাদ হলে। বাংলাদেশের লেখকদের সেরকমভাবে অনুবাদ করে নিয়ে এলে পাঠকেরা নিশ্চয় নেবে। দেবেশ রায়কে ভারতে নিয়েছে। প্রকাশকরা লাভ করতে চায়, মাল্টিন্যাশনাল প্রকাশকের উদ্দেশ্য তো প্রফিট ম্যাক্সিমাইজেশান।

কামাল : ওটা সবারই উদ্দেশ্য।

কেতকী : হ্যাঁ।

কামাল : দীর্ঘদিন থেকে তো অনুবাদও করছেন আপনি, মৌলিক কাজের পাশাপাশি, উত্তরসূরি তৈরি করতে না পারাকে কী এক ধরনের ব্যর্থতা বলা যেতে পারে? আমরা কী পরের প্রজন্ম তৈরি করেছি?

কেতকী : আমরা তো হিউম্যানিটিজে মন দিচ্ছি না, আইটি করছি, অনুবাদ কারা করবে? এ-প্রজন্মে কোনো ভালো অনুবাদক উঠে আসছে? না তৈরি হচ্ছে? দক্ষতা তৈরি হচ্ছে না, এটা তো আমার ব্যর্থতা না, ব্যর্থতাটা এখানে-যে আমরা কাউকে উৎসাহিত করতে পারছি না, বিদেশিদের বাংলাটা শিখে অনুবাদ করতে হবে, সে-ব্যবস্থা করতে পারছি না আমরা।

কামাল : বাংলা একাডেমি বৃত্তি দিয়ে বিদেশিদের বাংলা অনুবাদ করা শেখাতে পারত, যেমন এক সময় রুশিরা বাংলাদেশ থেকে অনুবাদক নিয়ে রুশ থেকে বাংলায় অনেক অনুবাদ করিয়েছে। কিন্তু এটা কেন করবে আমাদের একাডেমি, ওদের অনেক জরুরি কাজ আছে। আপনি এ-প্রজন্মের কথা বললেন, মনে হয় কোনো প্রজন্মেই বাংলা থেকে ইংরেজি অনুবাদক তৈরি হয়নি, রাদিচে ও আপনাকে ছাড়া আর কাউকে তো সেভাবে দেখছি না। যাহোক, এই-যে হচ্ছে না, এটার কারণ আপনার কী মনে হয়?

কেতকী : অনেক জটিল, কারণটা গভীরে। আমার ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে চেকোশ্লোভাকিয়ান, শ্লোভেনিয়ান, হাঙেরিয়ান, জার্মান, বুলগেরিয়ান, ফ্রেন্স, ফিনিস, এসব ইউরোপীয় ভাষায় বাংলা ভাষার কাজটা পৌঁছেছে। ভারতীয় অনুবাদ হলে হয়তো এটা হতো না। জার্মান ভাষার এক কবির কথা বলি, ওয়ার্কশপ করতে এসেছে, এমনকি কিছু আরবি আছে নিজেদের নিয়ে কাজ করছে, একজন বাঙালিও দেখি না। ধরুন মনিকা আলী, বাংলাটাই তো ভালোভাবে জানে না সে। ওর পক্ষে বাঙালিদের নিয়ে কত আর কাজ করা সম্ভব?

কামাল : সে তো চেষ্টা করেছে, হোক না ইংরেজিতে, বাঙালি কমিউনিটিটাকে কিছুটা প্রকাশ করতে পেরেছে, ভালো বাংলা না জেনেও।

কেতকী : আমি বাঙালি চরিত্র নিয়ে ইংরেজিতে উপন্যাস লিখব কেন? একজন অভিবাসী বাঙালির দৃষ্টিতে জগৎটাকে দেখি আমি, এর মাধ্যমে অন্যান্য ভাষাভাষীরাও এটা পাচ্ছে।

কামাল : আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কায়েস আহমেদ, মাহমুদুল হক, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, মামুন হুসাইন, শহীদুল জহির… এদের লেখা কী পড়েছেন?

কেতকী : ইলিয়াসের পড়েছি, মাহমুদুল হক, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, এঁদের পড়েছি।

কামাল : বাংলাদেশের তরুণদের লেখা কি পড়েন?

কেতকী : ওদের কারো সঙ্গে তো দেখা হয় না, আমার বই সংগ্রহের বিষয়টা সীমিত।

Memories: 1960 on Magdalen Bridge, Oxford; Image Source: Collected; Credit: A Scrapbook of Memories and Reflections; parabaas.com

কামাল : বাঙালি ডায়স্পোরা নিয়ে আপনার আগ্রহ ও কাজ সম্পর্কে কিছু বলবেন? অভিবাসী বাঙালিরা নতুন কোনো আশার আলো দেখাতে পারছে কি?

কেতকী : আমরাই তো বাঙালি ডায়াস্পোরা, এ ধারণাটা প্রথমে আমিই উঠিয়েছি। অভিবাসী বাঙালিদের পরিচিত করানোর দায়িত্বটা কার? এ-প্রজন্মের জ্ঞানতৃষ্ণা সেভাবে নেই।

কামাল : হয়তো হিউম্যানিটিজে ওভাবে নেই, সায়েন্স এন্ড টেকনোলোজি নিয়ে ওরা এগিয়ে আসছে তো।

কেতকী : ওটা আমারও প্রশংসার দিক। জ্ঞানতৃষ্ণাটা যদি বজায় থাকে, পাশ্চাত্যে বেড়ে ওঠা তরুণ প্রজন্ম একদিন নিজেদের তৈরি করে নেবে, বিদেশি ভাষাগুলো শিখে নেবে। যেমন হয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের সময়। গীতা, শকুন্তলা, এসবের অনুবাদ ওরাই করেছিল। আপনি কি জিজ্ঞেস করেছেন ডায়াস্পোরার উত্থান… সম্ভব কিনা? ডায়াস্পোরা লেখকদের মধ্যে দিলারা হাশেম ভালো গল্প ও উপন্যাস লিখে, ঊর্মি রহমান লিখে। অন্য অনেকের হয়তো আরো কিছু আছে। পোস্টমডার্ন, পোস্ট কলোনিয়াল এসব কী কী করছে তো ওরা, একাডেমিক বিষয়।

কামাল : নিজেরা কি কোনো তত্ত্ব আনতে পেরেছে?

কেতকী : হাংরি ইত্যাদি… কিছু কিছু এসেছে না।

কামাল : আমি ডায়াস্পোরার কথা বলছিলাম।

কেতকী : অমিতাভেরই সাধ্য নেই বাংলার কোনো সাহিত্যকর্ম ইংরেজিতে অনুবাদ করা।

কামাল : কিন্তু সে তো বাংলায়ও লিখেছে, ভ্রমি বিস্ময়ে বইটা তো ওর।

কেতকী : ওটা ওর কিনা জানি না।

কামাল : বাঙালি নতুন প্রজন্মের একটা বড় অংশ কী না ঘরকা না ঘাটকা?

কেতকী : সে আমি জানি না।

কামাল : বুদ্ধদেব বসুর পর বাংলাসাহিত্যে বিশ্বমনস্ক আর কাউকে দেখতে পান সেভাবে?

কেতকী : বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি বুদ্ধদেবের ছিল, অমিয় চক্রবর্তীর লেখায় ভীষণভাবে ছিল, ঐ-জেনারেশনে বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রর ছিল। তারপরেই তো দেশভাগ হলো, পশ্চিমবঙ্গের অনেক সময় লেগেছে এটা অ্যাবজোর্ভ করতে, বাংলাদেশ থেকে ব্রেইন ড্রেইন হলো, আমরা কানাগলির ভেতর ঢুকে গেলাম, যখন আবার জেগে ওঠা শুরু হলো, বিশ্ব বদলে গেছে। পঞ্চাশ-ষাটের দশকেই তৈরি হয়েছি আমি। ম্যাসমিডিয়া হওয়ার ফলে এখন অনেক বেশি এস্টাবলিশমেন্টের জন্য কাজ করতে হচ্ছে অন্যদের, ওদের চাহিদাটা মেটাতে হচ্ছে। আমার বিষয়টা ভিন্ন।

কামাল : আপনার তিসিডোর গ্রন্থটাকে আমার বহুমুখী ও বহুতল-বিশিষ্ট একটা অসাধারণ কাজ মনে হয়, ওখানে বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে প্রতিভা বসুর বিষয়ও এসেছে, যে অসম-সাহসিকতা নিয়ে প্রতিভা বসু মহাভারতের মহারণ্যে লিখেছেন, এবং এর কোনো বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়নি, এতে কী মনে হয়-যে, সনাতন ধর্ম বা হিন্দু ধর্মটা অনেক বেশি সহনশীল? কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন এটা?

কেতকী : আর্য অনার্যের সমাঝোতাটা দেখানোর চেষ্টা করেছেন তিনি ঐ বইটাতে। ওটার বিরূপ প্রতিক্রিয়া না হওয়া প্রমাণ করে, সেকুলারিজমটা পশ্চিমবঙ্গে আছে।

কামাল : আর্য অনার্যের সমঝোতা না সংঘাত? আপনার কি মনে হয় অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা তাদের ধর্মগ্রন্থের বিশ্লেষণ এভাবে করতে দেবে? বিশ্লেষণ করলে তো প্রায় প্রত্যেক ধর্মের গোঁজামিলই বেরিয়ে পড়বে, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপরিচালনাকারীরা, ধর্মজীবীরা অথবা সার্বিক সুবিধাভোগী গোষ্ঠী এটা হতে দেবে?

কেতকী : দাঙ্গা লেগে যাবে।

কামাল : এমন একটা সময় কি আসবে যখন মানুষ ধর্মের অসারতা বুঝতে পারবে?

কেতকী : কে জানে!

কামাল : ধর্ম ও বিজ্ঞান একসঙ্গে টিকে আছে কীভাবে? একটার তো অন্যটাকে বাতিল করে দেয়ার কথা, একটা হচ্ছে অন্ধ বিশ্বাস, অন্যটা প্রমাণ নির্ভর, এ-দুটো জটিল রসায়ন কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?

কেতকী : যিশুকে নিয়ে আমার একটা লেখা ছিল, তিনি একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন, আমার অনেক লেখায় এসেছে এসব। এসবের প্রতিক্রিয়া হয়েছিল কিছুটা ভারত থেকে।

কামাল : অন্য কোথাও থেকে না!

কেতকী : না তো।

কামাল : পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিকদের সম্পর্কে কেমন ধারণা পোষণ করেন আপনি?

কেতকী : অনেকেই তো খুব ভালো লিখছে, খুব পরিশ্রমী ও মেধাবী।

কামাল : বাংলাদেশের অনেকের ভেতর পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ সাহিত্যিকদের প্রতি একটা ক্ষোভ বা বেদনাবোধ রয়েছে-যে, বাংলাদেশের সাহিত্য বিষয়ে এদের প্রায় কোনো আগ্রহই নেই, যেটুকু আছে তা নিজেদের লেখার বাজার সৃষ্টি করার পাঁয়তারা, কিছু বলবেন এ বিষয়ে?

কেতকী : এটা হয়তো একটা কমপ্লেক্স। অনেকে খুব যত্ন নিয়ে বাংলাদেশের সাহিত্য পড়ে ও চর্চা করে। একুশে মেলায় যায়, বইয়ের এক্সচেঞ্জ হয়, গত কয়েক বছর ধরে কোলকাতার বইমেলায় বাংলাদেশের স্টল হয়েছে, কোলকাতা শহরেও স্টল আছে। এরকম ক্ষোভ তো আমাদেরও অনেকের আছে।

Artistry; Book Cover and Detail of the Bishnupur sari tear-drop; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

কামাল : বাংলাদেশের কোনো তরুণ ও প্রতিভাবান লেখকের বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের লেখক-পাঠকদের কোনো উৎসাহ দেখা যায় না, অথচ এখানের কয়েকজন বাজারি লেখকের প্রতি ওদের আকর্ষণ রয়েছে, এটার কারণ কি পুরোটাই বানিজ্যিক, না মানসিকতার কিছু বিষয়ও রয়েছে?

কেতকী :এটাও একই কমপ্লেক্সের অন্তর্গত। পশ্চিমবঙ্গের আমরাও বলতে পারি-যে, আমাদের নিয়ে ওখানে তেমন কাজ হচ্ছে না, উৎসাহ নেই।

কামাল : আপনার ডি ফিল থিসিসটা বাংলায় অনুবাদ করার ইচ্ছে হয়নি? এত অসাধারণ একটা বিষয়, অনন্য! অন্য কেউ তো এরকম কাজ করেননি মনে হয়, এটা তো বাংলাসাহিত্যেরও একটা সম্পদ হতে পারত!

কেতকী : আমার সময় হবে না ওটার অনুবাদ করা। যাদের উৎসাহ আছে ইংরেজিতে পড়ে নেবে, এটার তৃতীয় মুদ্রণ হয়েছে। অনেকেই বলেছেন ওখানে দুটো সংস্কৃতির মিশ্রণ রয়েছে। ওখানে ব্রিটিশেরা ভারতে গিয়ে বর্ণনা দিচ্ছে, ওরা বই তৈরি করছে, ওখান থেকে শিখেছি কীভাবে এখানের দৃষ্টিভঙ্গি ফুটিয়ে তোলা যায়।

কামাল : বাংলায় হলে বাংলাভাষার প্রচুর পাঠকের কাছে যেত।

কেতকী : আমাকে দিয়ে ওটা হবে না।

কামাল : আমাকে শেষ করতে হবে, ডোরিস লেসিং, জুলিয়াস বার্নস, অথবা হিলারি ম্যান্টেল… এদের কেমন লাগে আপনার?

কেতকী : ভালো লাগার বিষয়টা ভিন্ন ভিন্ন রকম, ঠিক ওভাবে বলা মুস্কিল তো…

কামাল : আপনার কবিতা বিষয়ে কিছু বলবেন? সিদ্ধার্থ আনান্দ, কেলি রাসেল, পিটার কনার্স… এঁদের কবিতা অথবা কন্টেম্পরারি ইংরেজ কবিদের কবিতা কেমন লাগে?

কেতকী : কত ভালো লাগা কবি, বর্তমান সময়ের… স্টিভানসন, কিম ট্যাপলিন, ডি এম টমাস, কন্সটান্টাইন, এরকম অনেকে আছেন।

কামাল : সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ওঠা সত্যিই দুষ্কর, অনেক কিছু বাদ রয়ে গেল। কবিতা নিয়ে আর একটা প্রশ্ন, এক মিনিট…

মারুফ : কবিতার দিকটায় আমি থাকছি।

কামাল : ঠিক আছে মারুফ, সেই ভালো। অনেক ধন্যবাদ কেতকীদি, অনেক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা।

কেতকী : আপনাকেও ধন্যবাদ।

Poetry Recitation: Churi by Ketaki Kushari Dyson; Source: Apurba Bangla YTC

মারুফ : যিনি কবি তিনি সাহিত্যের একাধিক শাখায় কাজ করলে তাঁর কবি-পরিচয়টি নিষ্প্রভ হয়ে পড়তে পারে, সমালোচকদের মূল্যায়নেও ঘাটতি থাকতে পারে। আপনার ক্ষেত্রে এরকম হয়েছে বলে কি মনে হয়? আপনার কবিসত্তাটি কি পাঠকের পূর্ণ মনোযোগ লাভ করেছে?

কেতকী : কবিসত্তাই হলো আমার সকল লেখার মূল চালিকাশক্তি। আমি উপন্যাস বা নাটক লিখি না কেন কিংবা গবেষণায় নিয়োজিত থাকি না কেন, সব সময়েই আমার কবিসত্তা কাজ করে যায়। পাঠকের মনোযোগ পাওয়ার বিষয়টি অন্যরকম। আমি দেশের বাইরে থাকি। কোলকাতা বা ঢাকার বইমেলায় আমার খুব কমই যাওয়া পড়ে। পাঠক আমাকে হঠাৎ দেখতে পান, তখন হয়তো মনে পড়ে আমাকে। পরে ভুলে যান। ঢাকার কথা বলি। আমি এসেছি জেনে এক পাঠক আজিজ মার্কেটে দৌড়ে গিয়ে আমার তিসিডোর বইটি কিনে নিয়ে এলেন। সই নিলেন সাগ্রহে। আর কী চাই?

মারুফ : সেটা ঠিক আছে। কবিতার বিচারের প্রসঙ্গে জানতে চাইছিলাম। দেশ থেকে দূরে থাকার কারণে কবি হিসেবে আপনার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় না বলে কি আপনার মনে হয়েছে?

কেতকী : হ্যাঁ, এটা ঠিক। কবিতাবিচারের ক্ষেত্রে পলিটিক্স আছে। কর্তৃত্বের ব্যাপার আছে। আউট অব সাইট আউট অব মাইন্ড—আমার ক্ষেত্রে এটাও সত্য। অন্য কবিদের ওপর দু’পাতা লিখলেন, আমার বেলায় হয়তো ৫ লাইন। ঠিকই বলেছেন, আমার কবিতার তেমন মূল্যায়ন হয়নি। তাছাড়া আমাদের সমালোচনা সাহিত্য পুরুষদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যেহেতু আমি নারী সেহেতু আমার লেখার গভীর ও ব্যাপক বিশ্লেষণ করার সময় নেই তাঁদের। বরং আমার সমসাময়িক বা বয়োকনিষ্ঠ বা বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষ কবিদের লেখার ওপর তাঁরা বিশেষ গুরুত্ব দেন।

মারুফ : আপনার কি মনে হয় সাহিত্যে নারী-পুরুষ এই বিভাজন করে সমালোচকরা নারীদের জন্য পৃথক সমালোচনার ধারা তৈরি করেছেন?

কেতকী : সেটাও যদি তাঁরা করতেন! সত্যি বলতে কী, সাহিত্যে মেল বায়াসটা খুব আছে। ঢাকায় কতটা আছে বলতে পারব না, তবে কলকাতায় নিশ্চিতভাবেই আছে।

মারুফ : লেখক নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে একটা ভাষার ভেতর বেড়ে ওঠেন। আপনি তরুণ বয়সে চলে আসেন ইংল্যান্ডে। পরে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতে লেখা শুরু করেন। অন্য ভাষায় এবং অন্য পরিবেশে থেকে আপনার কি মনে হয়েছে নিজের ভেতর বাংলা ভাষার সেই কবিকে আপনি মিস করছেন?

কেতকী : আমি ক্রমাগত লিখে চলেছি। আর আমার ভেতরে একটা চ্যালেঞ্জ হলো নতুন অভিজ্ঞতাকে বাংলায় কীভাবে ধরাবো। সেই চ্যালেঞ্জেই আমি মগ্ন থেকেছি। আমার লেখা যদি কেউ মন দিয়ে পড়েন, বল্কল, সবীজ পৃথিবী, জলের করিডর ধরে—কবিতাগুলিতে ভিন্ন ভূচিত্র ও ঋতুচক্রের বর্ণনার জন্যে নতুন ভাষা তৈরি করেছি নিষ্ঠার সঙ্গে। সমালোচকরা এটা খেয়াল করেননি।শীতের শরৎ কবিতার ভেতরে রয়েছে শীতের মধ্যে শরৎ খুঁজে পাওয়ার বিষয়টি। ব্রাইটনে গ্রীষ্মশেষ কবিতাটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, রবীন্দ্রনাথ কেন এমন হেমন্তের বর্ণনা দিয়ে যাননি। তখন তো আমরা পরিষ্কারভাবে বুঝিনি-যে, রবীন্দ্রনাথ লাল-গেরুয়ার রঙটা দেখতে পেতেন না বলেই তাঁর লেখায় হেমন্তের পাতা ঝরার কথা তেমন নেই। আমার কবিতাটা বেরিয়েছিল ১৯৬৪ সালে দেশ পত্রিকায়। তখন পর্যন্ত কোলকাতার মানুষদের বিশ্বমনস্কতা ছিল। কিন্তু এখন শিল্পের সেই নিপুণ দিকটার আলোচনা তেমন দেখি না।

মারুফ : এখন বাংলায় কবিতা লিখছেন হাজার হাজার কবি। এই বিপুল কবিতা থেকে প্রকৃত কবিতাকে শনাক্ত করার কাজটি বেশ জটিল।

কেতকী : প্রকৃত কবিতা শনাক্ত করতে হলে বৌদ্ধিক দিকের প্রয়োজন। আমাদের সমস্যাটা সেখানেই। এখন পঠন-পাঠন এবং বিশ্লেষণে ঘাটতি হচ্ছে। আমাদের সময়ে কবিতার ডিটেইল ক্রিটিসিজম হতো। এখন সেটা অনুপস্থিত। পোস্ট কলোনিয়ালিজম আর পোস্ট মর্ডানিজম হয়ে ভাষার দিকটা উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।

Memories: Manipuri Shaal; Tear-drops on one of my shawls; Image Source: Collected; Credit: A Scrapbook of Memories and Reflections; parabaas.com

মারুফ : বাংলাদেশের কবিতা সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?

কেতকী : আপনাদের কবিতায় আবেগের পরিমাণ বেশি। রাজনৈতিক প্রভাবও বেশি। বঙ্গবন্ধু বিষয়ে প্রচুর চর্চা হয়েছে। দেশপ্রেমের প্রাবল্য রয়েছে। এটাকে আমার কিছুটা বিপজ্জনকই মনে হয়। এটা নিজের দেশকে সেরা বলার একটা প্রয়াস।

মারুফ : শেখ মুজিবকে নিয়ে কবিতা লেখার বিষয়টি বেশি-বেশি আসতে শুরু করেছে সত্তরের শেষার্ধ থেকে। তার অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশের কবিতা একটা স্বতন্ত্র অবয়ব নিয়েছিল। আপনার কথায় আমাদের কবিতার বিষয়বস্তুর দিকটি উঠে এলো। আঙ্গিক, প্রকরণ, ছন্দ সব মিলিয়ে আপনার দৃষ্টিতে আমাদের কবিতার অবস্থান কী?

কেতকী : আমার সামনে একটা বই না থাকলে সেটার বিচার করি না। ভাসা ভাসা ধারণা থেকে কিছু বলা ঠিক নয়। ভীষণ কংক্রিট আমার মন।

মারুফ : সামনে কি অনুবাদ করার পরিকল্পনা রয়েছে?

কেতকী : অনুবাদ তো করতে চাই। চোখের জন্য বহু কিছুই পেরে উঠি না। কথা হচ্ছে প্রকাশক কোথায়? তাঁরা আসুন, বলুন-যে এটার অনুবাদ আমরা চাই। অনুবাদ ভীষণ পরিশ্রমসাপেক্ষ কাজ। আমাদের সাহিত্যে অনেক বড়ো বড়ো লেখক আছেন যাঁদের লেখার অনুবাদ করা দরকার।

মারুফ : কবিতার পাঠক সবসময়েই কম। আপনার কি মনে হয় পাঠকের সংখ্যা বিশ্বব্যাপী এখন আরো কমে যাচ্ছে?

কেতকী : সিরিয়াসলি কবিতা পড়ার বিষয়টি নিশ্চয়ই কমে যাচ্ছে।

মারুফ : কেন কমে যাচ্ছে?

কেতকী : মানুষ কবিতা পড়ে না। সবাই মোবাইলে টেক্সট করছে। এটার প্রভাব পড়ছে। মানুষ গদ্য বেশি পড়ছে তথ্য জানার জন্য। কবিতায় তথ্যগুলোকে জন্মান্তরের ভেতর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সে-পর্যন্ত পাঠকের ধৈর্য নেই। আধুনিক সভ্যতার উপহার ইন্টারনেট যেমন আমাদের কাছে এনেছে, তেমনি দূরেও সরিয়ে দিচ্ছে। মানববিদ্যার চর্চা আমরা করছি না। বড়ো নাটক, বড়ো উপন্যাস কিংবা কবিতা পড়ার লোক আজ কোথায়? ইংরেজিতে অনার্স পড়া না থাকলে শেক্সপিয়রের নাটকও শতকরা ১০ ভাগের বেশি বোঝা সম্ভব নয়। কারণ চারশ’ পাঁচশ’ বছরে ভাষাটা বদলে গেছে। দর্শন, ইতিহাস না জানা থাকলে কবিতার রসাস্বাদন কীভাবে সম্ভব?

মারুফ : ইংল্যান্ডের কবিদের সঙ্গে কি আপনার সাহিত্যিক-সম্পর্ক হয়েছে?

কেতকী : ইংরেজ কবিদের কবিতা প্রচুর অনুবাদ করেছি। ব্রিটিশ কবিদের মধ্যে ডেভিড কনসেনটাইন, ডি এন টমাস, কিম ট্যাপলিন, এবং আর্জেন্টিনায় গিয়ে বই এনে রাফায়েল ফেলিপে ওতেরিনিয়ো সহ বেশ ক’জন কবির কবিতা অনুবাদ করেছি। পোয়েট্রি ওয়ার্কশপ বা কবিতার কর্মশালাও করেছি অনেক। এই ঘরেই হয়েছে অনেক। এসব কর্মশালায় আলোচনা-সমালোচনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে কবিতার আরো পরিমার্জিত হওয়ার সুযোগ থাকে। স্ক্যান্ডেনেভিয়ায় পোয়েট্রি ওয়ার্কশপে নানান দেশের কবি ছিলেন। ১০ দিন নানা দেশের কবিদের সঙ্গে থেকে পরস্পরের কবিতা সম্পর্কে বুঝে নিয়ে, আলাপ করে, আলোচনা করে কবিতা অনুবাদ করেছি। আমার খুব প্রিয় একজন কবি হচ্ছেন সুইডিশ কবি এডিট সোডারগ্রান।

মারুফ : বলা হয়-যে কবিতা অনুবাদ করতে গেলে যা হারিয়ে যায় সেটাই কবিতা। আপনি এটা স্বীকার করেন?

কেতকী : এটা নিরাশবাদী কথা। আমি এটা বিশ্বাস করি না। অনুবাদের মাধ্যমে এক দেশের সাহিত্য অপর দেশের সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তবে অনুবাদে নিষ্ঠা ও বৌদ্ধিকতা থাকতে হবে। এটা এক ধরনের সমঝোতা।

মারুফ : যিনি কবিতা অনুবাদ করবেন তাঁকে কি কবি হতে হবে?

কেতকী : অবশ্যই। যে-ভাষাতে তিনি অনুবাদ করছেন সে-ভাষারই কবি হতে হবে।

মারুফ : অনেক ধন্যবাদ কেতকীদি, অনেক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা।

কেতকী : ধন্যবাদ।
. . .

Dissipation by Ketaki Kushari Dyson; Image Source: Collected; Credit: A Scrapbook of Memories and Reflections; parabaas.com

. . .

থার্ড লেন স্পেস-এ পড়ুন আলাপচারিতা

রবির বিশ্বযোগ : উইলিয়ম রাদিচের সঙ্গে কথালাপ-১ : কামাল রাহমান

রবির বিশ্বযোগ : উইলিয়ম রাদিচের সঙ্গে কথালাপ-২ : কামাল রাহমান

. . .

লেখক পরিচয় : কামাল রাহমান : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন

লেখক পরিচয় : মারুফ রায়হান

কবি ও সংবাদকর্মী মারুফ রায়হানের জন্ম বিংশ শতকের উত্তাল ষাটের দশকে, পাকিস্তানের করাচি শহরে। জন্ম করাচিতে হলেও খুলনা ছিল মূল সাকিন। জন্মের নয় বছরের মাথায় বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের উদয় ঘটে। মারুফ রায়হানও বেড়ে উঠতে থাকেন বাংলার জল-মাটি-হাওয়ার নাগরিক পরিসরে। ইংরেজি সহিত্যের ছাত্র ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। মধ্য আশিতে যুক্ত হন সাংবাদকিতায়। সাংবাদিকতা ও সাহিত্য সম্পাদনায় তাঁর সক্রিয়তা পার করেছে তিন দশক। নয়ের দশকে মারুফ রায়হানের সম্পাদনায় সাহিত্যের কাগজ ‘মাটি’ পাঠকমহলের নজর কাড়ে। স্বল্পায়ু হলেও ‘মাটি’র সাহিত্যরুচি ছিল প্রশংসিত।

Literary Works: Maruf Raihan Collage; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

অনলাইন সাহিত্য মুখপত্র ‘বাংলামাটি’ প্রতিষ্ঠা করেন পরে, এবং এখানে তিনিই পথিকৃৎ। মূলত কবিতা মারুফ রায়হানের বিচরণভূমি। ১৮টি বই বেরিয়েছে কবিতার। প্রথম কবিতাবই ‘স্বপ্নভস্মের চারুকর্ম’। তারপর একে-একে বেরিয়েছে বাকিগুলো। লিখেছেন উপন্যাস ‘রানী ও কেরানি’। প্রকাশের অপেক্ষায় আছে আরেকটি আখ্যান ‘সোহাগপুর’। ‘প্রথম আলো’-সহ দেশের শীর্ষ সংবাদপত্রে কাজ করার পাশাপাশি সম্পাদনা করেছেন একাধিক। টেলিভিশনে উপস্থাপনাও করেন, বিশেষত একুশে বইমেলায় প্রকাশিত বই নিয়ে। বিগত দেড় দশক ধরে একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে মেলায় প্রকাশিত বাছাই বই নিয়ে একুশের সংকলন প্রকাশ করে আসছেন নিয়মিত।

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 21

No votes so far! Be the first to rate this post.

Contributor@thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *