পোস্ট শোকেস - হাওরপুরাণ

ভাটপুরাণ : সজল কান্তি সরকার

Reading time 8 minute
5
(20)

হাওর কাহন : একটি ভাট কবিতা

Book written by Sajal Kanti Sarker; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

প্রথমে গুরুর নামটি, (২) জানি খাঁটি, অন্তরে আমার,
মাতা-পিতার চরণবন্দী আমি গুনাহগার\

জেলা সুনামগঞ্জেতে,(২) আছে তাতে, নগদাপাড়া গ্রাম,
সেই গ্রামেতে বসত করি দীনবন্ধু নাম\

আমার মনের আশা,(২) ভালোবাসা, খাল-বিল-হাওর,
লিখি তাই মনের কথা কবিতার ভিতর\

নই পদকর্তা,(২) লিখতে বার্তা, মনের পিয়াস,
লিখলাম শুধু মনোবাঞ্ছা কবিতার দাস\

বলি বিনয় করি,(২) মান্য ধরি, শোনেন দিয়া মন,
কালিদহ সাগর ছিল এই হাওর যখন\

আছে গারোপাহাড়,(২) উত্তর কিনার, আরও হিমালয়,
ভৈশালে কালিদহ হাওর-বাঁওড় হয়\

তার পরের-কথা,(২) ভিন্ন বার্তা, কী বলিব আর,
পলি জমে ভরে উঠে হাওরের পাড়\

গড়ে বসত বাড়ি,(২) কেমন করি, আদিবাসীগণ,
বাঘ-শিয়ালের ভয় ছিল হাওরে তখন\

খাইত জংলার বাঘে,(২) হিজল বাগে, দিনের দুপুর,
মা-বাপে নাহি জানে কী হইল পুত্রুর\

শিন্নি মানত্ করে,(২) খোদার ঘরে, পুত্রুরের আশায়,
অভাগা’রে বাঘে খায় কে তারে খণ্ডায়\

আছে পরের কথা,(২) ভদ্র শ্রোতা, শোনেন দিয়া মন,
আল্যুয়া-জাল্যুয়ার কথকতা করি গো বর্ণন\

জাল্যুয়া মাছ ধরে,(২) কেমন করে, হাওর-নদী-বিলে,
সাপ-বিচ্ছুর ভয় ছিল নলখাগড়ার তলে\

বুকে সাহস নিয়া,(২) কোঁচ দিয়া, মাছে দিত ঘা,
বড়ো মাছের ছোটো পোনা তারা খাইত না\

খাইত মাছের পেডি,(২) রান’ত বেডি, ভাজাও রসায়,
মাছের তেলে মাছ ভাজি মনে যাহা চায়\

খাইত মহাশোল,(২) স্বাদে অতুল, ভোজনে বিলাস,
পাথরকাটা গভীর স্রোতে ডুয়ারেতে বাস\

ছিল গহীন ডুয়ার,(২) জলের আঁধার, মাছের বসতি,
জাল যার জলা তার এই ছিল রীতি\

আইল ইজারাদার,(২) কৈবর্ত সার, জলা হইল বিকি,
মাছগুলি বেঁচে তারা খায় ধরে পাখি\

ধরে কুড়া পাখি,(২) খাঁচায় রাখি, আউস করে পোষে,
স্বাদুমাছ তেমন নাই ইজারার দোষে\
বিলে সেচ দেয়,(২) ধরিয়া নেয়, মাছের বংশ সব,
এই বিলে আর হয় না মাছের জলরব\

বিলে মাছের আকাল,(২) নিদান কাল, কী হবে এখন,
জাল্যুয়ানিরে লইয়া জাল্যুয়া বৈদেশে গমন\

বলি আল্যুয়ার কথা,(২) আমার পিতা, জমি করে চাষ,
শাইল-বোরো ফলাইয়া খায় বারোমাস\

যখন বর্ষা আসে,(২) জলে ভাসে, কাম-কাজ নাই,
নাইওরির আনাগোনা নতুন জামাই\

যখন হেমন্ত মাস,(২) কী সর্বনাশ, ফসলের তরে,
মায়ে-ঝি’য়ে ব্রত করে ধানের গুছি ধরে\

ধানে গোলা ভরে,(২) চাল কাড়ে, চাল-কাড়ানির মা,
দিন যায় বছর যায় চাল ফুরায় না\

খায় দুধে-ভাতে,(২) একসাথে, নাতি-পুতি লইয়া,
ধানখেতে বর্গী আসে অংশীদার হইয়া\

তারপর কি হইল,(২) পেশা গেল, রীতিনীতি নাই,
শাইল জমি ধ্বংস করে করিছে কামাই\

আইল ইরি ধান,(২) কলের গান, মাটির সুর নাই,
জমিনেতে সার লাগে হয় না বুট-কালাই\

হয় না হস্-কৃশ্যি,(২) তিল তিশি, ঠিক আগের মতো,
কীটনাশক ধ্বংস করল মাটির গুণ যত\

কত গুণীজন,(২) জন্ম গ্রহণ, হইল হাওর পাড়ে,
হাসন রাজা আবদুল করিম বিশ্ব-চরাচরে\

ছিল গানের আসর,(২) বাউলা অন্তর, সকলে মিলিয়া,
পদ্মপুরাণ গাইত বধু ঊষারাতে বইয়া\

নাই ভাটিয়ালি,(২) বৈঠা খালি, নদী গেছে মরে,
বেড়িবাঁধে হাওর খাইছে তিল তিল করে\

নেই জলারণ্য,(২) বৃক্ষশূন্য, নলখাগড়ার ঝোপ,
কান্দাজুড়ে হিজল-করচ নেই আগের রূপ\

নেই চারণভূমি,(২) চাষের জমি, হইতেছে ভরাট,
গোয়ালঘরে নাই গরু নাই খেলার মাঠ\

মাঠে ইটভাটা,(২) কৃষক বেটা, দিছে বড়ো করি,
কুঁড়ের ঘরে ইট লাগাইছে জরিনা সুন্দরী\

ঘরে ঝিল্মিল্ বাতি,(২) পসর অতি, দরজা দিয়া খিল,
কারো সাথে কয়-না কথা বড়ো হইছে দিল\

চালায় কলের গাড়ি,(২) মল্লের বাড়ি, নাম হইছে তার,
পাড়া-পড়শি দেখলে ভাবে কাঁটা মান্দার\

চলে কলের নাউ,(২) ভাটির গাঁও, জলে দিয়া ঢেউ,
জলজ উদ্ভিদ ধ্বংস হয় কয়-না কথা কেউ\

মরে শাপলা-শালুক,(২) জলের তালুক, হইতেছে লোপাট,
আগের মত নাই ঢেউ নাই জলের ঘাট\

হাওরে নিদান কাল,(২) পাকনা কাঁঠাল, রাক্ষসের মেল,
গিলিয়া খায় রঙ্গিলা গোঁফে দিয়া তেল\

হইবে মরুভূমি,(২) ধানের জমি, আমার মনে হয়,
খেলছে খেলা রঙ্গিলা সারা হাওরময়\

জাগো আইলাম্বর,(২) ঘরে-ঘর, চাষাভুষা যত,
ঘুমপাড়ানি আমার-মা রসুন দিবে কত\

হাওর অমূল্য ধন,(২) মানিক-কাঞ্চন, জুড়ি মেলা ভার,
মিঠাপানি রসের খনি নেই কোথাও আর\

একখান কথা আছে,(২) বলি পিছে, বিনয় করিয়া,
ঠুলিমুচি খেলিও না এই হাওর লইয়া\

. . .

Book written by Sajal Kanti Sarker; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

ভাটপুরাণ রচনার ইতিবৃত্ত ও আমার কিছু কথা

ভাটি অঞ্চল প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি লোকায়ত জ্ঞানের ভাণ্ডার। কৃষি-প্রাণ বৈচিত্র্যের পাশাপাশি লোকমহাজনের উর্বর মেদিনী। এখানে স্বশিক্ষিত সাধক ও ভাবুক জন্মায়। বর্ষার জলের মত টইটুম্বুর থাকে তাঁদের জ্ঞানের ভাঁড়ার। নিরলে বসে দন্ততালে মুখেমুখে বান্ধে রসের মুখপদ ও পদ-পুরাণ। তাঁদের গলা ভরা গান। দেহ ভরা তাল। তারা ভাবের তালে-দরদে গায় কাব্যের শান-মান।

প্রাচীন ও মধ্যযুগে সাহিত্য রচনা হত কাব্যাকারে। বাংলা সাহিত্যে চর্যাপদ প্রাচীন কাব্য। নেপাল রাজ দরবারের গ্রন্থশালা থেকে ১৯০৭ সালে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এই চর্যাপদকাব্যের একটির (চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়) প্রতিলিপি সংগ্রহ করেন। বাংলা ভাষার সাহিত্যিক বিকাশের আদি উৎস রূপে চর্যাপদকে গণ্য করা হয়। চর্যাপদ আবিষ্কারের পর ১৯০৯ সালে বসন্ত রঞ্জন রায় পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার কাঁকিল্যা গ্রামের দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের গোয়ালঘর থেকে শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন নামে আরেকটি পুথি সংগ্রহ করেন। চামড়া বা পুস্ত-র উপরে লেখা হতো বলে প্রাচীন সাহিত্যে একে পুস্তক বলা হতো।

সংস্কৃত শব্দ পুস্তক থেকে পুথি শব্দটি এসেছে। পুথি স্ত্রীলিঙ্গ বিশেষ্য শব্দ। যার অর্থ বই। প্রাচীন পুথিগুলো সাধারণত ভূজ্যছাল, কেরেটপাতা, তালপাতা ও কাপড়ের পটে লিখা হত। বেশিরভাগ কবির হাতেই লেখা হতো মূল রচনা। তাছাড়া লিপিকারের অনুলিপিতেও হতো। বাংলা পুথিকাব্যে পয়ার-ত্রিপদী ছন্দের প্রাধান্য বেশি। অলঙ্কার ছাড়া দিশা বর্জিত সরল ভাষায় রচিত পুথি সাধারণত প্রণয়, যুদ্ধ, জীবনী, লৌকিক পাঁচালি, ইতিহাস, রাজনীতি, ধর্ম, শাস্ত্র ও সমকালের ঘটনাশ্রীত কাব্য। সুদীর্ঘ রচনা। তাই আয়োজন করে বাড়ির উঠোনে আসর সাজিয়ে পাঠক সুরে সুরে পুথি গায়। শ্রোতাগণ আত্মমগ্ন হয়ে শ্রবণ করে।

লোকমহাজন রচিত এসব পুথিকে মহাজনী পুথিও বলা হয়। আরবি, ফারসি, উর্দু ও হিন্দি ভাষার মিশ্রণে রচিত বিশেষ শ্রেণির বাংলা সাহিত্য প্রাচীন পুথিই আদি। সোনাভান, সত্যপীরের পুথি, জঙ্গনামা, আমীর হামজা, জৈগুনের পুথি, হাতেম তাই, কাসাসুল আম্বিয়া, মোহাব্বতনামা, মারুতির পুথি, সয়ফুলমুলুক-বদিউজ্জামান, গুলে বকাওলী, বেনজীর-বদরে মুনীর, তাজকিরাতুল আউলিয়া, সোহরাব-রুস্তম, শাহনামা, আলিফ লায়লা, বনবিবির জহুরনামা, গাজী-কালু-চম্পাবতী, লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদ, ইউসুফ-জোলেখা, সতীময়না ও লোরচন্দ্রানী, আর্যভটের পুথি, মনসাবিজয়, রায়মঙ্গল, অন্নদামঙ্গল, মঙ্গলকাব্য, চন্ডীদাসকাব্য, রামায়ণ, মহাভারত, পুথি নূর নছিয়ত, পুথি নূর নাজাত, ছহি শেখ ভানুর পুথি, পুথি শরিয়তনামা, পুথি আজব কাহিনি, পুথি তরিকতে হাক্বানী, পুথি এশকে মৌলা, পুথি ছাত্তারনামা, পুথি সিলেটি বিবির বয়ান ইত্যাদি প্রাচীন।

ঊনিশ শতকের পর বাংলা ভাষায় মহাজনী পুথি যখন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তৎপরবর্তীকালে সমকালীন বা নিকটাতীত ঘটনা নিয়ে সংক্ষিপ্ত পদ্যাকারে লেজুর ভিত্তিক পয়ার ছন্দেই হাতে লিখে ভাটির দেশে একধরণের কবিতা জনপ্রিয়তা পায় যা ‘ভাট কবিতা’ বা ‘ভাটপুথি’ নামে পরিচিত। ভাট কবিতায় বন্দনা শুরুতে সংযুক্ত থাকে। ভণিতায় থাকে লেখকের নাম। ভাট কবিতা দুই লাইনে অন্ত্যমিল রেখে বিষয়ের মীমাংসা বা অর্থ প্রকাশ পায়। তাহলে প্রশ্ন আসে এটা কি পয়ার ছন্দ? উত্তর না। কেননা ভাট কবিতার প্রথম বাক্যটি তিন অংশে বিভক্ত থাকে এবং প্রথম দুই অংশের ছন্দমিল থাকে। তৃতীয় অংশের সাথে শেষ বা দ্বিতীয় বাক্যের অন্ত্যমিল থাকে। যেখানে প্রথম বাক্যের প্রথম অংশটি (পদটি) দুবার গাওয়া হয়। তাই লেখ্যরূপে প্রথম অংশের পাশে ‘২’ লেখার প্রচলন আছে। যেমন :

Puthi Recitation: HatunNabi by Mushi Sadek Ali; Recited by Khokon Fakir; Source: Khukon Fokir YTC

ওহে দয়াময়,(২) সদাশয়, তুমি কর্ণধার,
তুমি তো অনাথের বন্ধু পরোয়ারদিগার\

তোমায় ভক্তি করি,(২) প্রণাম করি, নোয়াইয়া শির,
দ্বিতীয় বন্দনা করি আখেরি নবীর\

বন্দি পিতা-মাতা,(২) ভদ্রশ্রোতা, শিক্ষাগুরু আর,
তৃতীয়ে নন্দনা করি জগৎ ফাতেমার\

তিনি বরকত মাতা,(২) লিখি হেতা, নবীর নন্দিনী,
যাহার হাতে দিছে আল্লাহ বেহেশতের নিশানী\

(ভাট কবিতা : আজব লীলা কলির খেলা)

পুথি, পুরাণ বা পাঁচালিতে ভাট কবিতার মতো ছন্দের বৈচিত্র্য থাকে না। সাধারণত পুথি, পুরাণ বা পাঁচালিতে পয়ারছন্দে প্রথম লাইনের সাথে দ্বিতীয় লাইনের অন্ত্যমিল দিয়েই বিষয়ের মীমাংসা হয়। যেমন :

আসরে বসিয়াছো যত হিন্দু মুসলমান
সবাকার তরে আল্লাহ হও মেঘাবান\’
(পুথি : ইউসুফ জুলেখা)

তোহ্মা জথ সখি আছে নৌয়ালী জৌবন।
তা সব পাঠাই দেঅ জাউ বৃন্দাবন\

ইছুফকে বোলহ জাউক নিধুবনে
তুলিয়া আনৌক পুষ্প তোহ্মার কারণে\

আমাত্য কুমারি জথ রূপে কামাতুর।
লাস বাস করি জাউ বৃন্দাবন পুর\

জথেক নাগরিপনা কামাকুল রূপে।
ইছুফ ভোলাউ গিয়া যুরুতি আলাপে\
(পুথি : ইউসুফ জুলেখা)

Puthi Recitation: Dripadi and Tripadi Chanda; Recited by Khokon Fakir; Source: Likhon Sarker Himel YTC

আবার মহাজনী পুথি, পুরাণ ও পাঁচালি ত্রিপদি লাচারি ছন্দেও বিষয়, ছন্দ ও সুরের ভিন্নতা আনতেও লেখা হয়। বিশেষ করে দীর্ঘ পুথি-পাঁচালিতে ত্রিপদি লাচারির ব্যবহার হয়ে থাকে। প্রত্যেকটি ত্রিপদির প্রথম দুই পদে ছন্দমিল থাকে এবং দুইটি ত্রিপদি মিলে অর্থাৎ তিন-ছয়পদে অন্ত্যমিল থাকে এবং বিষয়ের মীমাংসা হয়। যেমন :

যথা পূর্বাপর মতো পাঁচালিতে পরিণত
করিলাম হরিষ অন্তরে।

দ্বিজ বিশ্বনাথ কয় কোথা দেবে দয়াময়
অন্তিমে চরণে স্থান দিয় অভাগারে\

মহাজনী পুথিতে বন্দনা আলাদা গাওয়ার রেওয়াজ আছে। মহাজনী পুথি ভাটছন্দে রচিত হয় না। শুধু পয়ার বা ত্রিপদী ছন্দেই বেশি রচিত হয়। তাই বলা যায় মহাজনী পুথিগুলো ভাট কবিতা নয়। বলা যেতে পারে উপন্যাস এবং গল্প যেমন এক নয়। পুথি-পুরাণ চারপদী লাচারিতেও রচিত হয়ে থাকে। যেখানে তিনপদের ছন্দমিল থাকে এবং দুইটি চারপদী মিলে অর্থাৎ চার-আটপদে অন্ত্যমিল থাকে এবং বিষয়ের মীমাংসা হয়। যেমন :

গুণধর নারী সঙ্গে করে, আপন ভাবিয়াছে তারে
মজিয়া তার রূপের তরে, চেয়ে রইলে সারাবেলা।

মায়াজালে সবাই বান্ধা, চোখে লেগেছে আন্ধা
চেয়ে দেখ হলো সন্ধ্যা, ডুবে গেল আয়ু বেলা\

ভট্ট কবিতা বা ভট্ট সংগীত এবং ভাট কবিতা এক নয়। ভট্ট কবিতায় ভাট কবিতার মত প্রথম বাক্যের তিন অংশের দুই অংশে ছন্দমিল বা দুইবাক্যে অন্তমিল থাকে না।যদিও ভট্ট কবিতাকে ভাট কবিতা বলে অনেক গবেষকগণ লিখিত মত প্রকাশ করেছেন। নিচে গৌরাঙ্গ চন্দ্র ভট্টের একটি কবিতার অংশ বিশেষ উল্লেখ করা হলো :

ব্রহ্ম সারাৎসার ব্রহ্ম নিরাকার
নির্বিকার নিরঞ্জন।

সে পরমেশ্বর ব্রহ্ম পরাৎপর
ব্র্রহ্ম জ্ঞানী জ্ঞানাঞ্জন\

ব্রহ্মাণ্ড অনন্ত নাহি তার অন্ত
ক্ষুদ্র বৃহৎ প্রভৃতি।

সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডে প্রতি অণ্ডে অণ্ডে
এক ব্রহ্মের বিভূতি\

Sajal Kanti Sarker about his Bhat Poetry Haor-Kahon; Source: Haor Kothachitra YTC

ভাটির পদকর্তা সুরে-সুরে বান্ধে ভাট কবিতা। ভাট কবিতাকে অঞ্চলভেদে হাটুরে কবিতাও বলা হয়। প্রবীণদের ভাষ্যমতে ভাটির কবিদের রচিত বলে ‘ভাট কবিতা’ কিংবা হাট থেকে কিনে আনা বলে ‘হাটুরে কবিতা’ নামকরণ হয়। সমকালীন বিষয় নিয়ে রচিত কাহিনী নির্ভর কবিতা ভাটি ময়ালে বা লোকসাহিত্যে ভাট কবিতা হিসেবেই সমাদৃত।

গ্রামীণ জীবনের অনন্ত জিজ্ঞাসা, প্রেম-ভালোবাসা, প্রণয় আখ্যান, পরকীয়া, বিরহ, ঘটে যাওয়া ঘটনা, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, বিরোধ, মহামারি, স্বামী-স্ত্রীর কলহ, নারীর কর্তব্য, দেশপ্রেম, ইতিহাস, জীবনী, রাজনীতি, ধর্ম, শাস্ত্র কিংবা সামাজিক সচেতনতাসহ নানা প্রসঙ্গে গ্রামের পদকর্তাগণ এই কবিতা সাদা ৪/৮ পৃষ্ঠা কাগজে নিজ হাতে লিখে গ্রাম্য হাট-বাজারে, স্কুল-কলেজের সামনে, বিভিন্ন মেলায় কিংবা উৎসব-পার্বণে নিজেরাই সুরে সুরে গেয়ে শোনাতেন এবং বিক্রি করতেন। বর্তমানে ঐতিহাসিক ভাট কবিতার রচনা নাই বললেই চলে।

১৯৮১ সালে কথা। আমি তখন হাইস্কুলের ছাত্র। লজিং থাকি। একদিন স্কুল থেকে লজিংয়ে ফেরার পথে ধর্মপাশা বাজারের ‘পুল’-এর উপর দাঁড়িয়ে বয়স্ক একজনকে সুরে সুরে গেয়ে ভাট কবিতা বিক্রয় করতে দেখি। কবিতার নাম ছিল ‘আছিয়ার প্রেম কাহিনী’। এক টাকা দিয়ে আমি কিনে আনি। কী আনন্দ! কী উচ্ছ্বাস ছিল সেদিন।

বাড়ি ফিরে সহপাঠীদের নিয়ে বিকেলবেলা খেলার মাঠে গিয়ে সবাই মিলে কবিতা পড়ি। সুরে-সুরে কবিতা পড়া’র মহড়ায়, গাইতে পারা-না পারার সফলতা-ব্যর্থতায় সেদিন আছিয়ার প্রেমের রসদে এবং বিরহ-বিচ্ছেদে মিশে গদগদ হয়ে আমাদেরকে অন্যরকম অনুভুতি এনে দিয়েছিল! গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্দা, ফুটবল কিংবা কাবাডি খেলার দুরন্ত বিকেল কেটেছে সেদিন কবিতার আসরে। ভাট কবির জন্য বাহবার অন্ত ছিল না। মনে হয়েছিল কবি রুক্সিনী দাস হয়ে মরতে পারলেও যেন এ-জীবন স্বার্থক।

পলো বাওয়া যাইতায়নি (Let’s Fishing) by Sajal Kanti Sarker; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

এই কবিতা পকেটে নিয়ে রাতে ঘুমিয়েও একধরণের স্বার্থকতা অনুভব করেছি। পালাক্রমে আমাদের চলছে কবিতার সাথে নিশিপালন। যাদের জামার পকেট ছিল না তাদের কি আফসোস! না পাওয়ার বেদনায় বুক ভারী করে সবচেয়ে বেশি দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে আমাদের বান্ধবীরা। কেননা মেয়েদের প্রেমের কবিতা পড়া তখন দোষের। তারপরও এক বান্ধবী একদিনের জন্য পড়তে নিয়েছিল। ফেরত দিতে গিয়েই ঘটল যত বিপত্তি। প্রতিবেশী একজন দেখে ফেললো কবিতা দেওয়া-নেওয়ার দৃশ্যটি। মুহূর্তে জানাজানি হয়ে গেল আমাদের প্রেমপত্র আদান প্রদানের ভুল বার্তা। একি কাণ্ড! সেদিন অভিবাকদের সামাল দিতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল।

যাইহোক, একপর্যায়ে ভাট কবিতার বিষয়টি গাঁয়ে জানাজানি হলে ভাট কবিতা বড়োদের হাতে চলে যায়। হাতবদল হয়ে পড়তে-পড়তে কবিতার কাগজ যখন ছিঁড়ে যায়, তখন ক্ষান্ত হয় আছিয়ার প্রেমের বার্তাবাহক ভাট কবিতা পাঠ। কবিতার কাগজ ছিঁড়ে যায় কিন্তু ময়ালে মুখে-মুখে, গলায়-গলায়, সুরে-সুরে থেকে যায় ভাট কবিতা। নিচে ‘আছিয়ার প্রেম কাহিনী’ ভাট কবিতার কিছু অংশ তুলে ধরা হলো :

ভাটির কন্যা,(২) কাঁচা সোনা, গুণে নাহি কম,
আদর করে নাম রাখিল আছিয়া বেগম\

বয়স ষোল বৎসর,(২) বলছি খবর, হইল আছিয়া,
পড়াশোনা বন্ধ তার প্রেমের লাগিয়া\

তাহার পরের কথা,(২) ভদ্রশ্রোতা, কী বলিব আর,
বাপে মায়ে যুক্তি করে বিয়া দিব তার\

বাপে পাত্র দেখে,(২) একে একে, ডজনে ডজন,
কবুল বলে না কন্যা প্রেমেরি কারণ\

মূলত সেইদিন থেকেই ভাট কবিতার ধরণ, বিষয়-আশয়, ছন্দ, সুর আমার মগজে জমা হয়। এছাড়াও আরও অনেক ভাট কবিতা আমি কিনেছি, পড়েছি। সর্বশেষ কিনে পড়েছি ‘এরশাদ শিকদারের কাহিনী’।

দীর্ঘ সময়ান্তে ২০২৪ সালে গ্রামের বাড়িতে একটি পালাগানের আসরে গান শুনে আমার ভাট কবিতার পুরোনো প্রেম পরকীয়ায় রূপ নেয়। কবিতার ছন্দ, সুর, তাল, লয় আমাকে আঁকড়ে ধরে। আমি তখন শূন্য পকেটে অধরা কবিতার সাথে নিশিযাপন শুরু করি। পেয়ে যাই তাকে আমার বালিশের কাছে। তারপর ‘আছিয়ার প্রেম কাহিনী’ ‘এরশাদ সিকদারের কাহিনী’-র স্মৃতি হাতরে ‘হাওর-কাহন’ নামে শুরুতে সংযুক্ত ভাট কবিতাটি রচনা করি। সুরের ধরণ মগজে ছিল বিধায় কাজটি সহজ হয়। হাওর-কাহন ভাট কবিতার বিষয়বস্তু নামের মধ্যেই প্রকাশিত। আমার জানাশোনা ও দেখা-অদেখা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাষাচিত্রও বলা যায় একে। কবিতাটি তুলানামূলক আকারে ছোট করে লিখেছিলাম। যেখানে চেষ্টা ছিল ভাট কবিতার ব্যঞ্জনারস ফুটিয়ে তোলার।

পাঠকের সুবিধার্থে পরিশেষে আবারো বলে রাছি, অন্য ভাট কবিতার মতো আমার রচিত কবিতায় ‘২’ মানে হলো পুর্ববর্তী লাইনটুকু দুবার গাইতে হবে তার আগের চরণের সাথে তাল-লয় ঠিক রেখে। গাইতে গিয়ে সুর অনেকটা পুথি-পাঠের মত হলেও, ভাট কবিতার সুরে আলাদা একটি গরিমা আছে। আশা করি যারা কবিতাটি পড়বেন ও শুনবেন তারা তা টের পাবেন।
. . .

Bhat Poetry: Haor-Kahon by Sajal Kanti Sarker; Video Source: Haor Kothachitra; @thirdlanespace.com

. . .

হাওপুরাণ বিভাগের লেখাপত্র পড়তে এখানে চাপুন

. . .

লেখক পরিচয় : ছবি অথবা এই লিংক চাপুন

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 20

No votes so far! Be the first to rate this post.

Contributor@thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *