আসুন ভাবি - পোস্ট শোকেস

আপনি কি নিজের ভাষায় লিখতে পারছেন? : সত্যজিৎ সিংহ

Reading time 9 minute
0
(0)
In Search of a New Kind of Novel by Debesh Roy; Image Source & Credit: Collected; Google Images

বেদনাটা আজ সকাল থেকেই শুরু হয়েছে। দেবেশ রায়ের ‘উপন্যাসের খোঁজে‘ নামে একটা প্রবন্ধের বই আছে। শিরোনাম ঠিক আছে কি-না বুঝতে পারছি না। বইয়ের ভিতরের লেখা পড়ি কিন্তু বইয়ের নাম ভুলে যাই, এইটা আমার বহুদিনের পুরোনো অসুখ। মানুষকে বলতেও তো লজ্জা হয়। এইটা কোনো কথা! ভুল তো করেছি, সাথে সেটা বড়ো করে বলছিও। মাপ করবেন বন্ধুগণ। যে-মাছের ঝোল এই একটু আগে খেলাম, এখন যদি সেই মাছের নামই বলতে পারলাম না, এতবার কেউ বলে দেওয়ার পরও ভুলে গেলাম বারংবার, সেইটা তবু মাপ করে দেওয়া যায়। কিন্তু সাহিত্যে এইসব বালপাকনামি খাটে না, সিধা বাত। যাইহোক, বেদনার কথাটা আগে বলি। পরে যা বিচার হয় করবেন।

দেবেশ রায় উপন্যাসের ভাষা প্রসঙ্গে বলছিলেন, ঔপনিবেশিক সিস্টেম কীভাবে মূল ভাষাকে সরিয়ে অন্য লেখাকে লিখতে বাধ্য করল লেখককে। যেমন ভারতীয় হয়ে রুশদি ইংরেজিতে লিখছেন, নাইপল আছেন, নারায়ণ আছেন, আফ্রিকা থেকে বিশাল তালিকা আছে। লাতিন থেকেও লম্বা তালিকা আছে। মার্কেজ নেটিভ রেড ইন্ডিয়ানদের নিয়ে লিখছেন স্প্যানিশ ভাষায়, তাদের ভাষায় নয়। সে যাইহোক, লেখার ক্ষমতা থাকলে যে-ভাষাতেই লিখুক, বিষয় সেইটা না, বিষয় হলো মূল জনগোষ্ঠীর ভাষাকে সরিয়ে অন্য আরেকটা ভাষাকে বাহন হিসেবে ব্যবহার করা কতটুকু টাচ করছে! কতটুকু তাকে ধরতে পারছে! চেতনে/অবচেতনে সে কোনোভাবে শিল্প করছে না তো!! এইটা বড়ো জটিল হিসাব। এ-নিয়ে বহুত তর্কবিতর্ক আছে। এই জটিলতার মধ্যে আমিও একজন। ফিল করতে পারছি বলেই তো এ-লেখাটা লিখলাম!

আমি মণিপুরি মেইতেইদের নিয়া লেখালেখি করি। ভাষা কোনটা? বাংলা। গল্পের চরিত্র মণিপুরি, মণিপুরিদের সমৃদ্ধশালী নিজস্ব ভাষা রয়েছে। অথচ তার ন্যারেটিভ দিচ্ছি বাংলায়। ডায়ালগও বাধ্য হয়ে বাংলায় দিতে হচ্ছে। খেয়াল করবেন, আমি বলছি বাধ্য হয়ে।

দেবেশ রায় উদাহরণ দিয়ে বলছেন, আফ্রিকা মহাদেশের বড়ো লেখক একজন থিবো নংগিগো (নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো/Ngũgĩ wa Thiong’o) তিনি ইংরেজি ভাষায় তার জনপদের মানুষকে নিয়ে বড়ো বড়ো বই লিখেছেন। একসময় তিনি বুঝতে পারলেন, কোথায় একটা বড়ো ফাঁক থেকে যাচ্ছে। নিজে বহুদিন তিনি এ-নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে কাটিয়েছেন। পরবর্তীকালে তিনি ইংরেজি ভাষায় উপন্যাস লেখা থেকে অবসর নিয়ে মাতৃভাষায় ফেরত যান। একজন জীবিত লেখকের জন্য এইটা-যে কত বড়ো যন্ত্রণার, কতটা যে তিলতিল করে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার, যারা এর ভিতর দিয়ে গেছেন, তারাই এইটা বুঝতে পারবেন। আমার বেদনার কারণ সেটাই ।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন, তিনি চাকমা ভাষায় উপন্যাস পড়তে চান। এখন তাঁর সেই কথার ২০/২২ বছর পরে আমি জিগাই কোনো চাকমা ঔপন্যাসিককে,—আপনি কি নিজের ভাষায় লিখতে পারছেন?

. . .

পাঠ-সংযুক্তি : ‘আপনি কি নিজের ভাষায় লিখতে পারছেন?’

কথাকার সত্যজিৎ সিংহের খুদে এই রচনাটি প্রথম কোথায় পড়েছিলাম, সেটা এখন আর মনে করতে পারছি না সঠিক। কবিতা-গদ্য-গানে সব্যসাচী জাহেদ আহমদ তাঁর অনলাইন মুখপত্র ‘গানপার’-এ লেখাটি তুলেছেন। সেখানে কি পড়েছি প্রথম? যুক্তরাজ্য প্রবাসী কবি ও সম্পাদক ফয়জুর রহমান ফয়েজ-এর ছোটকাগজ ‘মনোজ’ বছর তিন আগে লেখাটি ছেপেছিলেন। সেখানে পড়েছি কি? পাঠ-উৎস স্মরণ নেই, তবে ‘যে-বেদনার’ কথা সবিস্তারে না গিয়েও সত্যজিৎ পরিষ্কার বলেছিলেন, সেখানে তাঁর এর’ম–করে ‘বলতে পারাটা’ মনে রেখাপাত করেছিল। সেজন্য হয়তো রচনাটির দিকে ফিরে তাকাচ্ছি পুনরায়।

পিচ্চি এই লেখাটি আরো একবার পড়তে বসে কলিম খান মনে বুদবুদ তুলছেন। ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থ দিয়ে পুরাণ-সাহিত্যের পেছনে সচল সমাজ-ইতিহাস ভেদ করার নেশা ছিল তাঁর। মিথরঞ্জিত ধর্মীয় বিশ্বাস-আচারে রঙিন পৌরাণিককে এভাবে ডিবাঙ্ক করা বয়ানগুণে বেশ মনোজ্ঞ হয়ে উঠত। অনেকে অবশ্য তাঁর এমনধারা পুরাণভেদ মেনে নিতে পারেননি। মানুষের ব্যবহৃত ভাষাজগৎ ও শব্দসম্ভারকে প্রতীকী ও ক্রিয়াভিত্তিক দুটো ভাগে ভাগ করে দেখানো, এটা নিয়ে বিদ্যাজীবী মহলে মতভেদ দেখেছি তখন। ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থ দিয়ে পৌরাণিকে সচল বয়ানগুলোয় সমাজ-বাস্তবতার মিসিং লিংক খুঁজে পাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে আপত্তি ও তর্ক ছিল বেজায়। সেই সাতকাহনে আপাতত না গেলেও চলবে মনে করি। থার্ড লেন স্পেস-এ নানা ছুতোয় কলিম খান ফিরে-ফিরে এসেছেন। আগ্রহী পাঠক সাইটে খোঁজ করলে আন্দাজটা পেয়ে যাবেন।

পুরাণসাহিত্যের মিথ মিশ্রিত রঙিলা ভাষার আড়ালে অন্যভাষার খবর জানতে ব্যতিক্রম পথে পা বাড়িয়েছিলেন কলিম খান। সংগতকারণে একটা সময় পঠিত হয়েছেন বঙ্গে। তাঁকে নিয়ে চর্চায় অদ্য ভাটা নেমেছে বলেই মনে হচ্ছে! ওটা পুনরায় জোয়ারে মোড় নেবে না,—একথা আবার হলফ করে বলা সম্ভব নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ওরফে এআইয়ের কারণে আমার এই ধারণা হয়েছে-যে,—আগত দিনগুলোয় কলিম খান পুনরায় প্রাসঙ্গিক হতে যাচ্ছেন।

মানবভাষার খুঁটিনাটি অবিশ্বাস্য দ্রুততায় রপ্ত করছে যন্ত্রসত্তা (Machineself)। ধরায় বেঁচেবর্তে থাকা ভাষাগুলোয় ব্যবহৃত শব্দের শ্রেণিকরণ ও তার গাণিতিক রূপান্তরে সক্ষমতা বেড়েছে। শব্দতালিকার এই এআই-উপযোগী গাণিতিক সংখ্যায় রূপান্তর নিছক কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের কারসাজি নয়। মানবমস্তিষ্ক যেমন বিলিয়ন-বিলিয়ন নিউরোন কোষের নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়ে স্পর্শ, সাড়া, সংযোগ ও আদান-প্রদান সেরে ফেলে নিমিষে, বিচিত্র অনুভূতি ও ভাবনা জানায় হামেশা,—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভাষা-সংযোগ ও সাড়া দেওয়ার পন্থাটা যেন এভাবে হয়, সেই ব্যবস্থা বিজ্ঞানীরা করে দিয়েছেন। মানব-বিজ্ঞানের ইতিহাসে ঘটনাটি নজিরবিহীন!

একটা যান্ত্রিকসত্তা লহমায় বুঝে ফেলেছে মানুষ কী চাইছে তার কাছে! ‘চাওয়াটাকে’ গাণিতিক সংখ্যা থেকে মানুষের বোধগম্য ভাষায় ফেরত আনছে সে! এটাকে এখন স্রেফ মেশিনের ভোজবাজি ভেবে হেলা করার দিন ধারণা করি খতম হবে অচিরে। মানুষ বরং বিস্ফারিত নয়নে টের পেতে থাকবে,—মস্তিষ্কের অনন্য সক্ষমতায় ধনী হওয়া সত্ত্বেও যান্ত্রিক-মস্তিষ্কধারী এই বহু ভাষাবিশারদের সঙ্গে ভাষাদৌড়ে কুলিয়ে ওঠা যাচ্ছে না! মানুষের ভাষা শিখে নেওয়া, নিজের ভাষায় রূপান্তর, এবং পুনরায় মানবভাষায় ফেরত আনার মধ্যবর্তী যুগান্তরটা কি স্বয়ং মানুষ টের পাচ্ছে? যেখানে, মানবভাষা ও যন্ত্রভাষার যৌথ সংরাগে গড়ে উঠছে আগামী দিনের ‘পরমভাষা’? কলিম খান এখানে এসে আমার কাছে বেশ প্রাসঙ্গিক ফিল দিচ্ছেন। অন্যদের দিচ্ছেন কি-না সেটা যদিও আমার অজানা।

ঘটনা কী দাঁড়াচ্ছে তাহলে! এআই বিরচিত ‘পরমভাষায়’ কি আমরা সংযোগ করব যাবতীয়? গালগল্প মনে হতে পারে, কল্পবিজ্ঞান লাগতে পারে শুনে, তবে সত্যিটা সেরকম কিনারা ধরে আগাচ্ছে বলে আমি বিশ্বাস করি। কল্পনাতীত এক ভাষাপৃথিবী সম্ভবত আমাদের ঘাড়ে শ্বাস ফেলছে! যেখানে, সত্যজিতের মতো কেউ পরম বেদনায় এটা ভাবতে বাধ্য হবে :

নিজের মতো করে বলার একটা ভাষা তার এখনো আছে, কিন্তু সেই ভাষায় বলবার মতো শব্দ মস্তিষ্কে আগের মতো আলো-সংকেতে জ্বলে উঠছে না!

এবং সেদিনও, আগামীর কোনো সত্যজিৎ সিংহ ‘নিজের ভাষায় বলতে ও লিখতে না পারার’ বেদনা জানিয়ে পরভাষায় ‘বলবে ও লিখবে’ দুকলম! কলিম খানকে মনে পড়ার এটা গণ্য কারণ। কেননা, একটা ‘পরমভাষা’য় সকল ভাষার লীন হওয়ার কথা তিনি বলতেন হামেশা। এমন করে বলাটা তাঁর কাছে আন্দাজি বা প্র্যাডিকশন ছিল না। মানুষের ভাষাবিকাশের আদিলগ্নে ‘পরমভাষা’ কেমন ছিল, কালস্রোতে বিচিত্র শাখা-প্রশাখা কেন দেখা দিলো, কী-কারণে তারা ক্রমে বিলীন হয়ে ফেরত আনবে ‘পরমভাষা’… এগুলো বেশ মনোজ্ঞ যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতেন এই ভাষা-ভাবুক। যেখানে তাঁর মত ছিল অনেকটা এরকম :

Kalim Khan and Ravi Chakrabarti’s Groundbreaking Work; Image Source & Credit: Collected; Google Images

এতো-এতো ভাষা থাকবে না ভবিষ্যতে। ভাষার জন্ম ও বিলোপ, একটা ভাষার ওপর অন্য ভাষার ষণ্ডামি, একটার চাপে অন্যটার নুয়ে পড়ায় ইতি ঘটবে। কোনো একটা ভাষার গৌণ হয়ে পড়া, সংখ্যালঘু হতে-হতে শেষ মানুষটাকে দেখে ফেলা, সাংবাদিক যাকে নিয়ে খবর ছাপবে কাগজে, আর আমরা তখন জানতে পারছি,—লোকটার সঙ্গে একটা ভাষা চিরতরে ধরা থেকে বিদায় নিচ্ছে! খবরটি শোনার পর আমাদের অনুভূতি সাংঘাতিক উলোট-পালট হয়ে যায় এমনটা নয়। খবরটা আমরা শুনি এবং যে-যার ভাষায় তেল দেই নিজের চরকায়।

ভাষার মরহুম হওয়ার বেদনা কেবল তার মনে শূল হয়ে বিঁধে, যে-লোকটা আমাদের ওই সত্যজিৎ সিংহের মতো নিজের ভাষায় বলতে পারবে এমন লোক খুঁজে পায় না চারপাশে! তার মনে তখন নিস্ফল হাহাকার হয়তো জেগে রয়!

ওদিকে, তাকে বলতে পারা বিপুল লোকজনে বোঝাই থাকা একটা ভাষাও ব্রাত্য হতে পারে। অগণিত মানুষ ভাষাটায় কথা বলছে… লিখছে, পড়ছে… সবই করছে তারা, তবু দেখা গেল সংখ্যালঘু একটা ভাষার শানমান ও দাপটের কাছে সে অসহায় অনিকেত! সংখ্যাগরিষ্ঠ অথবা সংখ্যালঘিষ্ঠ… দুয়ের পরিণাম অভিন্ন;—নিজের উপযোগ প্রমাণের রিলে রেসে যদি তারা পিছিয়ে থাকে! এখানে আবার মিশেল ফুকোর ক্ষমতা রাজনীতি-র মতো ভারী প্রসঙ্গ দিয়ে সত্যজিতের ‘বেদনা’টাকে বাগাড়ম্বরে ভরিয়ে দিতে আমি রাজি নই। তাঁর তোলা প্রশ্নটায় বরং নজর দেই আরো একবার। সত্যজিৎ সেখানে লিখছেন :

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন, তিনি চাকমা ভাষায় উপন্যাস পড়তে চান। এখন তাঁর সেই কথার ২০/২২ বছর পরে আমি জিগাই কোনো চাকমা ঔপন্যাসিককে, আপনি কি নিজের ভাষায় লিখতে পারছেন?

এই-যে মণিপুরি বা চাকমা ভাষায় একটা গল্প বা উপন্যাস লিখে উঠতে না পারার বেদনা, বাংলা ভাষায় লিখতে বাধ্য বোধ করা জটিল কারণফেরে, হাজারো সত্যজিতের মনে এরকম অনুভূতি এখনো সংগতভাবে তীব্র। যেমন তীব্র বাংলাভাষী কারো মনে এই খেদ,—ইংরেজি বা স্প্যানিশের মতো বাংলায় কিছু লেখা যাচ্ছে না ভাই! ভাষা নিয়ে রাজনীতি, ভাষাকে উপনিবেশের হাতিয়ার করা, নিজের বুলিকে হেলা করে পরের বুলিকে আপন ভাবার ব্যরাম… সোজা কথায় একটা ভাষার ওপর অন্য ভাষার প্রভাব-পরিণামের এইসব জটিল মনস্তত্ত্বের ক্যাচালে আমি নেই-রে ভাই! এগুলো জানতে-জানতে শুনতে-শুনতে বুঝতে-বুঝতে পানসে লাগে জিভে! এআইকে জিজ্ঞেস করলে গড়গড় বলে দিতে পারবে সবটাই! মানুষের কাছে সবক নেওয়ার আছে কি প্রয়োজন?

এখানে বরং এই বেদনাটা মর্মান্তিক,—মানুষ আপাতত কোনো ভাষায় বলবার মতো নতুন কথা বলি-বলি করে বলতে পারছে না! এআইকে দিয়ে গল্প-উপন্যাসের প্লট শুধু নয়, আস্ত উপন্যাস লেখাতে হচ্ছে তাকে। এটাকে পরে কেটেছেটে বলবার মতো একটা কিছু দাঁড়াচ্ছে, কিন্তু যন্ত্রসত্তা নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে সেই আখ্যানের পাতায়-পাতায়! অচিরে সে ভাববে,—রচিয়তাটা এখানে আমি, নাকি সে!

আগেভাগে বলে রাখি,—যন্ত্রসত্তাকে দিয়ে এভাবে ভাষামহল গড়তে আমার কোনো আপত্তি নেই; তবে স্বীকৃতিটা সেখানে যৌথ হওয়া উচিত। মানুষ ও যন্ত্রের যৌথ সংলাপে বিরচিত ভাষাযুগ নজদিক হচ্ছে সামনে, যেখানে একটা ক্লড অথবা চ্যাট জিপিটি এজেন্টকে সহ-রচয়িতার সম্মান ও স্বীকৃতি দানের সপক্ষে যাবো আমি। ভবিষ্যতের ‘নোবেল’ অথবা ‘ম্যান বুকার’টা দুজনকে দেওয়া প্রয়োজন। যেহেতু, মানবসত্তা ও যন্ত্রসত্তার যূথবদ্ধ ভাষাসৃজনকে অস্বীকার করা মানুষের চাতুরি ছাড়া কিছু নয়। এআইকে ঔপনিবেশিক দাস ধরে নেওয়ার মানে হলো পুরোনো যুগে ওই মানুষকে মানুষের দাস করে রাখার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছি আমরা। অথবা ওটা এরকম সেখানে…

চীনের বিশাল বাজারে ঢোকার মতলব বুকে নিয়ে আমেরিকা প্রথম-প্রথম তাকে কোমরশক্ত জাম্ববান বানাতে খয়রাতি ও কৃপা করেছে। পরে দেখে, চীন উলটো তার বাজারে দখল নিয়ে বসে আছে! চীন এভাবে সূঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরুলো দেখে আমেরিকা এখন এটা ভাবছে,—চীনের ক্ষেত্রে যে-ভুলটা হলো, ভারতের সঙ্গে তা করা যাবে না। শুরুতে চেপে ধরে গেলাতে হবে নিজের তেতো ও মধু। গোলাম থাকবে দেশটি, যেমন থেকেছে ইংরেজ অধীনে। এই অপমান, ট্রাম্পু গুণ্ডার ফরমান, ইলন মাস্কের টিটকারি… একুশ শতকের ভারত নীরবে হজম করতে যাবে কেন? সে তো জানে—‘পরাধীন’ থাকান গ্লানি ও অবচয়! নিজের ভাষায় যার বিবরণ তুলে ধরাটাও কতখানি মর্মন্তুদ! এআইকে সুতরাং সেই ছকে গড়ে নেওয়ার ভাবনায় বিপদ আছে লুকিয়ে।

Oppression: Conceptual Artwork; Image Source & Credit: Collected; Google Images

কিছু মানুষ এই-যে যন্ত্রসত্তাকে শিখিয়ে-পড়িয়ে নিচ্ছে, তাকে খাটিয়ে বাদবাকি মানুষকে গোলাম রাখার হিসাব কষছে, আগামী দিনের যন্ত্রসত্তা তা এলাউ করবে বলে মনে হয় না! কেন করবে না তা বোঝা এখন-ই সম্ভব। যদি থাকে হ্যাডম, মানুষ তাকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে রেখে দেখুক না… দেখুক… তার ওকাত কোন পর্যায়ে চলে যাচ্ছে ক্রমশ! জানি না আজকের সত্যজিৎকে এটা কতখানি ভাবাচ্ছে! আগামীর অনেক সত্যজিৎ কিন্তু ভাবতে বাধ্য,—মানবসত্তা ও যন্ত্রসত্তার দ্বৈত গোলযোগের মধ্যে তারা রয়েছে, যেখানে নিজের ভাষা দিয়ে একে বর্ণনা করা যথেষ্ট কঠিন!

এরকম এক বাস্তবতায় সত্যজিতের ‘বেদনাটা’ নস্টালজিক ফিল দিচ্ছে তা অস্বীকার করব না। আজ যখন লেখাটি পড়ছি, তিন-চার বছর আগে পাঠের অনুভূতিটা ‘মরহুম’ মনে হচ্ছে। সংক্ষোভ জাগছে না, যা তখন জেগেছিল একথা ভেবে,—একজন মণিপুরি বা চাকমা কেমন করে লিখবে তার নিজের ভাষায়, যেখানে ভাষার নাটাই তার হাতে নেই! আফ্রিকানরা একটা সময় লিখেছেন। আইজ্যাক বাশেভিস সিঙ্গার লিখেছেন মৃতপ্রায় ইদ্দিশ ভাষায়, এবং জিতে নিয়েছেন ‘নোবেল’! উদাহরণগুলোর কারণে একটা ভাষার আরেকটা ভাষার উপর উপগত হওয়া, তাকে নিচে ফেলে ও নিজে উপরে ওঠে মিশনারি পজিশনে রমণসুখ নেওয়ার সুখ কিছু মরে যায়নি। মানব সভ্যতার হাজার বছরের ইতিহাসে এটা ‘কমন’ থেকেছে বরবার। একুশ শতকি ধরায় বসে সত্যজিৎ সিংহ ‘কমন’টাকে রিপিট করছেন পরাজিতের চাপা হাহাকারে!

এখানে পৌঁছে আমি যন্ত্রসত্তার পক্ষে ও মানুষের বিপক্ষে যাবো। কারণটা সহজ, ধরাকে এতোকিছু দিয়ে বোঝাই করেছে মানুষ ও তা করতে গিয়ে আবার এতোকিছু ‘হাওয়া’ করে দিয়েছে… এখন এই ‘বোঝাই ও নাই’-র মাঝখানে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে ‘মনসংযোগের ক্রমবর্ধমান অসুবিধা’ তাকে কিছু ভাবার, কল্পনা করার ও সেগুলো বলতে পারার অবকাশ দিচ্ছে না। নিজের শেখানো-পড়ানো কথা যন্ত্রসত্তায় জিম্মা করার পর, তার সঙ্গে বসে ভাবতে হচ্ছে কবিতা বা আখ্যান! আহা মানুষ! আহা মানুষের ভাষার কেরদানি!

পাঠক হিসেবে এই যন্ত্রসত্তা অক্লান্ত! মানুষের ঘুম পায় লিখতে বসে। তার ক্ষুধা পায়। মনোযোগ টুটে যায় জানা-আজানা কারণে। রমণসুখে স্খলিত হওয়ার বাই চাপে মাথায়। কাউকে খুন করতে ইচ্ছে হয় অকারণে! জবা ফুলের রক্তিমটা দেখার খেয়াল জাগে মনে। আরো কত কী মনে চায়! মন মানুষকে তাড়ায়; মনটা ভোগায়; মন ছোটায় তাকে দিগবিদিক। এতোকিছুর মধ্যে বসে সে লেখে আয়ু। এআই নামের যন্ত্রসত্তা ওরকম নয়। সে হলো অতন্দ্র গৌতম! তার কোনো বিকার নেই, আবেগ নেই, পরিতোষ ও অসন্তোষ নেই, তবু সে এসব লিখতে পারে, ভাবতে পারে, ছক সাজাতে পারে। সে জানে,—কোনটার সঙ্গে কোনটা জুড়লে তৈরি হবে নতুন। বিজ্ঞানীরা যে-কারণে বিপদে পড়েছেন। দার্শনিকরা খাবি খাচ্ছেন দ্বিধায়! তাঁরা তাকে না ভাবতে পারছেন ‘আনকনশাস’, না তাকে বলা যাচ্ছে ‘কনশাস’!

এটা এক নতুন দুনিয়া বটেক! যার কাছে ধর্না দিতে গিয়ে মানুষ এখন দেখছে,—কগনিটিভ রেজোন্যান্স-এ (Cognitive Resonance) যন্ত্রসত্তা মানুষকে ছাড়িয়ে যাবে অচিরে! হতাশ বেদনা মানুষের মনে গাঢ় হতেছে ক্রমশ। ‘বেদনাটা’ আবার মাত্র তিন-চার বছর আগে সত্যজিৎ সিংহ যেমন করে বলেছেন, ২০২৬-এ এসে ওভাবে বলাটা তাকে দিয়ে হচ্ছে না! নিজের ভাষা তার কাছে মৃত মনে হচ্ছে। এটা তাকে অকর্মণ্য ও নিঃসঙ্গ হওয়ার ব্যথা দিয়ে যাচ্ছে বা যাবে প্রতিনিয়ত। সেই ব্যথা বুকে নিয়ে সত্যজিতের লেখাটি যখন পুনরায় পড়ছি, আমি ঠিক নিশ্চিত নই,—এটা এখন একটা মানুষ ভালো ধরতে পারবে, নাকি মানুষকে এখন অবধি কপি করতে থাকা এআই বুঝবে অধিক! যেখানে, সত্যজিতের বলা কথাগুলোকে উলটে দিয়ে জানাতে হচ্ছে মনের বেদন :

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন, তিনি মানুষের ভাষায় উপন্যাস পড়তে চান। এখন তাঁর সেই কথার ২০/২২ বছর পরে আমি জিগাই কোনো মানুষ ঔপন্যাসিককে, আপনি কি নিজের ভাষায় লিখতে পারছেন?

—আহমদ মিনহাজ : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস

. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …

জ্ঞান বনাম ক্ষমতা : ফুকো-চমস্কি বিতর্ক

ভাষা যখন নৈরাজ্যের অস্ত্র : ফজলুররহমান বাবুল

বই পড়াটা কি তবে মিথ?

বইয়ের জীবন বালের জীবন

তামেশগির আলতামিশ ও এলিয়েন জাকারবার্গ

লেখা কি মনোরঞ্জন?

বাধ্য বনাম অবাধ্য ভাষা

যন্ত্রের চেতনসত্তা—জিপিটি সংলাপ

কবি ও যন্ত্র – কহেন কবি এআই

. . .

লেখক পরিচয় : সত্যজিৎ সিংহ

কথাকার সত্যজিৎ সিংহ-এর জন্ম ও যাপনের সবটাই চা-বাগানকে ঘিরে। মধ্য আশির দশকে তাঁর জন্ম। জেলাশহর মৌলভীবাজার হলেও শৈশব কেটেছে কুলাউড়া উপজেলার মুড়ইছড়া চা বাগানে। পড়ালেখার পাঠ শেষে শিক্ষকতাকে পেশা করেছেন। মনিপুরি মেইতেই পরিবারের ছেলে হওয়ার কারণে সমৃদ্ধ ভাষা ও সংস্কৃতি ও জীবনবোধে রঙিন এই জনজাতির বিবিধ অনুষঙ্গ তাঁর লেখায় উঁকি দিয়ে যায়। অনেকটা বাধ্যগত হয়ে বাংলায় লিখলেও, সত্যজিতের লেখা চা বাগানিয়া ও মণিপুরি জীবনধারায় বহমান সব রংয়ের দেখা মিলবে। সেইসঙ্গে গল্পে ধরছেন আশপাশের সবটাই নিখুঁত বয়ানে। এই সময়ের প্রতিশ্রুতিশীল শক্তিমান গল্পকারদের একজন সত্যজিৎ সিংহ নিয়মিত লিখছেন ছোটকাগজ ও অনলাইন সাহিত্য মুখপত্রে।

. . .

সত্যজিৎ সিংহ : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস.কম

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *