কবিতা সিরিজ
তোমার কটিমেখলায় আমি-৩
রচনা : হেলাল চৌধুরী

হায় সেলুকাস, হায়!
অ্যারিস্টটলের জীবন্ত-যন্ত্র
কেনাবেচা হয় হাটে গোপনে আজও
গবাদিপশু কেনাবেচা হয় যেমন…
আজও প্রান্তিক মানুষদের
প্রভুদের একচেটিয়া সম্পত্তি
মনে করে কিছু বিকারগ্রস্ত পিতারা;
তারা ভাবে — তারা যেন পাই-পুয়ের-পুত্র
তবে কেনাবেচা যায় হাটে তাদের।
জেনোফেন জানালেন বিষণ্ণতায়—
কাজ করো, খাও — শাস্তি পাও
এই তিনে কেনা তোমার গোলামের জীবন
অনিয়মের অভিযোগ হলে বেচে দেবো অন্য হাটে;
শুধু কি তা-ই স্পার্টায়
ইতিহাসের পৃষ্ঠার…
আজও কিছু মানুষ জীবন্ত-যন্ত্র গবাদি-পশু;
এখনও এখানে তেমন পিতাদের দেখি
পিতারা লুকায় পুত্রের সততা
প্রভুদের নিকট লুকায় নিজেদের নাশকতা
আজ
তাদের অনিয়মে অভিযোগ করা দায়…
হায় সেলুকাস, হায়! হায় সেলুকাস, হায়!!
. . .
আমাদের প্রগতির মগজের গল্প
কী নির্লজ্জের মতো বসে আছ তোমরা
আমাদেরই ভাড়াকাটা আসনে
জনতার অধিকার ক্ষুণ্ণ করে
আমরা প্রকৃত টিকেট ক্রেতারা
কেবল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে দেখে এগুচ্ছি
বাড়ি যাওয়ার খেয়ালে
অসহায় বিড়ালের মতো নির্বোধ জনতা যেন
ত্যাগের উৎসব পালনে
আজ আমরা নিদারুণভাবে ত্যাগী হয়ে…
তোমরা শুধু কথা না-বলে… হায়েনা নয়
হায়ানা হয়ে
দাঁত কেলিয়ে হেসেই যাচ্ছ… বেহায়া বেশরম
বেওয়ারিশ… লাশ
দেখো, হায়ানা বানানেও হায়া আছে
না-এর জন্যে সে সংগতই হায়ানা
তোমাদের শরীরে হায়ার ছিটেফোঁটাও নাই
একতিলও না
তোমরা মানুষ… মান আর হুঁশ ছাড়া
তোমরা তাই হায়েনার চেয়েও জঘন্য হায়ানা…
এভাবেই অজস্র ভণ্ড-হায়ানা নিয়ে দেখি… এগিয়ে
চলছে আমাদের শ্লথ, তার বিদঘুটে সংস্কারের শব্দ
হুইসেল বাজিয়ে নির্বিকার…
ছুটে চলছে আমাদের সবুজরঙের প্রগতির ট্রেনটি
আজ, আমাদের প্রগতির মগজের গল্প এমনটিই।
. . .
আমার খাড়ুবিল প্রান্তর-৬
আমরা কেবলই আসন চাই। পদ চাই। বেহায়া বেশরম নির্লজ্জের মতো। চেয়ারে বসা ছাড়া আমাদের যেন আর কোনও গতি নেই। কোনও মানুষের অধিকার খর্ব করে আমরা তবু চেয়ারে বসতেই চাই। আমাদের তাই দুঃখ কষ্ট মিথ্যা নিষ্ফলতা বেড়ে যায় নিয়তই। আমরা পদবি চাই। অন্যের যোগ্যতাকে নিদারুণভাবে খাটো করে চাই। নিজে অযোগ্য জেনেও নির্লজ্জের মতো চামচা লাগিয়ে যোগ্যতা অর্জন করি — পদ, পদবি আর তুচ্ছ একটি চেয়ারের লালসায়…
আমরা নিয়তই কাষ্টঘরের শুয়োরদের মতো পাঁক খুঁজি পাছা নাচিয়ে নাচিয়ে। আমরা বেমালুম ভুলে যাই আমাদের অতীত। আমাদের জীবনের ফেলে আসা লাল-কালো অধ্যায়গুলো…
মনে পড়ে কবে এক ভোরের আলোয় দেখেছিলাম আমি এক সিলসিলা নারীর নদীর উৎসব। শুনেছি তার কণ্ঠে বিলাপের গান…
সে-এক অপরূপ হারমোনিয়াম বাজিয়ে আমার নদীজার মতো;
আইভি লতার মতো ঋজু চিকন দেবদারু সে। আঙুলের কারিশমায় তার দেবদারু পাতা। ঘাসের রঙের মতো তারা সবুজ। আর কেঁপে উঠেছিল গোধূলিরাঙা তার গোলাপি ঠোঁট। প্ৰেম নিবেদন করে সে ঘাসের রঙের মতন এক গাব বৃক্ষের কাছে; পাখিদের ঠোঁটে সারসের নরম পালকে সারারাত শ্রাবণের বৃষ্টির ভিতর…
এই পৃথিবী তারে একবার পেয়েছে, বারবার পেতে চায় ঘুমে…
তার প্রেম কাম কি ভাঁড়ামি নয় — একথা জানে তার হৃদয় — জানে তার নদীজা নারী — জানে প্রেম তার পৃথিবীর মতো বিশাল আর অক্ষয় — ভালোবাসায় ভেজা এশিয়ার সাংহাই…
তার প্রেম গণিকার উল্লাস নয়
কাকের ঠোঁটের মতো দৃঢ় আর ডানার মতো সংকল্পবদ্ধ…
. . .
আমার খাড়ুবিল প্রান্তর-৭
আমরা ছুঁয়েছিলাম একদিন শিশুকাল
রূপ-রস-গন্ধে
তার খাড়ুবিল প্রান্তর
ডিবির হাওর
খলারবন্দ
তার সাংহাই জোছনা
চিয়াংমাই আকাশ
আমরা স্নান করেছি তার আলোর ভিতরে বিকেলে — কখনও রাতে অন্ধকার পথে হেঁটে হেঁটে; রক্তের সঞ্চালনে শতাব্দীর অন্তহীন আগুনের পাহাড় দেখে দেখে; যে-আগুন দেখেনি পৃথিবী কখনও…
মাঝে মাঝে
বানভাসি হয় আমার শিশুমন — ভাসে আমার খাড়ুবিল প্রান্তর…
তবুও আমরা কাল কাল শতাব্দীর হিসাবনিকাশ ভুলচুক শেষ করে দূর জোয়াই পাহাড়ে শকটের আগুন দেখে বুঝে নিই এই পৃথিবীর সব মানুষের হৃদয় — স্নিগ্ধ নয় বরং ভীতসন্ত্রস্ত… মানুষের গুণ আকাশের মতো নির্মল অনন্ত নক্ষত্র…
. . .

আমার খাড়ুবিল প্রান্তর-৮
আমাদের অজস্র প্রান্তর আছে, আমাদের খাড়ুবিল প্রান্তর শুধু একটা
আমাদের অজস্র শাপলাবিল আছে, আমাদের ডিবির হাওর শুধু একটা
আমাদের অজস্র বাগানবাড়ি আছে, আমাদের ময়নার বাড়ি শুধু একটা
আমাদের অজস্র হোটেল আছে, আমাদের মনাই ভাইয়ের হোটেল শুধু একটা
আমাদের অজস্র চায়ের দোকান আছে, আমাদের কাজী হোসেন চাচার চায়ের দোকান শুধু একটা
আমাদের অজস্র ভাই আছে, আমাদের তোতাভাই শুধু একজন
আমাদের অজস্র কদু আছে, আমাদের কোম্পানিকদু শুধু একজন
আমাদের অজস্র মামা আছে, আমাদের ছানুমামা শুধু একজন
আমাদের অজস্র নানি আছে, আমাদের রঞ্জুনানি শুধু একজন
আমাদের অজস্র দাদি আছে, আমাদের ছানুদাদি শুধু একজন
আমাদের অজস্র দাদা আছে, আমাদের নরসিংদাদা শুধু একজন
আামাদের অজস্র ঘরামি আছে, আমাদের আলী আজম ভাই শুধু একজন…
আমাদের অজস্র খিলিপানের দোকান আছে, আমাদের দেশি ভাইয়ের পানের দোকান শুধু একটা
আমাদের অজস্র পরোটার দোকান আছে, আমাদের সত্তার ভাইয়ের পরোটার দোকান শুধু একটা
আমাদের অজস্র জিলিপির দোকান আছে, আমাদের ইব্রাহিম চাচার জিলিপির দোকান শুধু একটা…
এবং
এমতই
মাঝে মাঝে
বানভাসি হয় আমার শিশুমন, ভাসে আমার খাড়ুবিল প্রান্তর।
. . .
বাংলার জোয়ান অব আর্ক
অজস্র কালো কালো অ্যানাকোন্ডা তেড়ে আসছে তোমার দিকে
প্রিয়…, গতরে তাদের মেখে নিয়ে কালো কালো
কদাকার অন্ধকার… আর খাটাশের গন্ধে আলাউদ্দিনেরা বোর
আজ, এখানে কোনওকালে এই অসুরেরা চায় না-যে স্বর্গীয় সুর…
অন্ধকারে ভরা উদ্ভট সব আলখাল্লা তেড়ে আসছে
তেড়ে আসছে নূহের প্লাবন
নোংরা জলে ডুবাতে চায় তারা তোমার সোনালি কেশর
উপড়ে ফেলতে চায় তোমার দুই পারমিতা চোখ
কালা করে দিতে চায় তোমার ঐশ্বরিয়া কর্ণদ্বয়
স্খলিত করতে চায় খুলি থেকে তোমার বেহেশতি মেওয়া
কলুষিত করে রাখতে চায়
স্বদেশপ্রেমী পিতার মতো তোমার রুপালি রঙের জোছনা।
এমন গোরঅন্ধকারে নেমে এলে তুমি… হে বীর সূর্যসন্তান
গন্দম হাতে বদ্ধ জানালায় উদ্ভট এক অন্ধনগরে
তুমি জানো না
পার্থিব আপেল খেয়ে খেয়ে কতকাল হয় তারা অন্ধ আর সদোম
বাস করে নক্ষত্রভরা এই উজ্জ্বল নগরে; তেনাদের মতো নিষ্প্রভ
করে রাখতে চায় বি-বাড়িয়ার অজস্র নক্ষত্র এবং তার আসমান।
কন্যা নও জানি… তুমি রাশিদার গড়া এক উজ্জ্বল বাতিঘর
বীর আহাদের রক্তবীজ সূর্যসৈনিক
অলির নিরবচ্ছিন্ন ডানা… নজরুলের যৌবনের পাখি… মুক্তকণ্ঠ
আজ, অসংখ্য বায়স ফিঙের গতর নাড়িয়ে দিলে
বিজয়নগরের হাইপাতিয়া তুমি… পাখনায় তাদের লাগিয়ে দিলে
তোমার ভীষণ ঠোঁটের আগুনের ফুলকি
তোমাকে প্রণতি বারবার
তোমাকেই মানি… আমি
বাংলার জোয়ান অব আর্ক, বি-বাড়িয়ার ডিওটিমার… তুমি।
. . .
তাঁবু
দেখছি, অজস্র তাঁবু আজ ঢেকে ফেলছে শহর নগর পাড়াগাঁ সবুজ প্রান্তর। ঢেকে ফেলছে নদী অরণ্য সবুজ বনানী এবং চত্বর, টিলা পাহাড় পর্বত হিমালয়। তছনছ করছে কাশবন পদ্মবিল। আটকে দিচ্ছে ঝরনার উচ্ছল চল। অবরুদ্ধ করছে আকাশের বৃষ্টির প্রেম।
ভেঙে ফেলছে শীতাংশুর হাত। উপড়ে ফেলছে সবিতার চোখ। কামড়ে খাচ্ছে কবিতার ওষ্ঠাধর। খাবলে খাচ্ছে অদ্রির স্তন। চিপে ধরছে নীলিমার আঙুল। শুষে নিচ্ছে অনুরাধার নাভি। গ্রাস করছে বিশাখার চিবুক। নাশ করছে রোহিনীর নাক।
তাঁবু, পাড়ায় পাড়ায় গ্রামে-গঞ্জে আজ রচনা করে যাচ্ছে অজস্র ব্যারিকেড। কয়েদ করছে আমাদের নদীর প্রসারিত বুক, প্রাণচঞ্চল সাগরের অনাবৃত যৌবন।
দিকে দিকে আজ দেখি শুধু তাঁবু, হাজার হাজার সলিমুল্লাহ ইবনে আলিমুল্লাহ; এক-দুইজন কেবল বিস্তৃত আসমান হুমায়ুন আজাদ।
. . .

. . .
…‘তোমার কটিমেখলায় আমি’-র পূর্ববর্তী পর্বগুলো পাঠের জন্য দেখুন …
তোমার কটিমেখলায় আমি-২ : হেলাল চৌধুরী
তোমার কটিমেখলায় আমি-১ : হেলাল চৌধুরী
. . .
লেখক পরিচয় : হেলাল চৌধুরী : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপ দিন
. . .

অবদায়ক : হেলাল চৌধুরী : থার্ড লেন স্পেস.কম
হেলাল চৌধুরী-র অন্যান্য ও প্রাসঙ্গিক রচনা পাঠের জন্য এখানে চাপুন



