
২১.
জেলখানায় এক কয়েদি মাঝেমাঝে বেলুন উড়িয়ে প্রতীকী কেক কেটে বলত ‘হেপি বার্থ ডে, হেপি বার্থ ডে।’ অন্যান্য কয়েদি কথাগুলো শুনে হাসত। একবার এক রাষ্ট্রপতি জেলখানা পরিদর্শন করতে এসে দেখলেন কয়েদিটি বেলুন উড়িয়ে বলছে,—লাইলিরে লাইলি তুই আমারে খাইলি।
রাষ্ট্রপতি কারারক্ষীকে জিজ্ঞেস করলেন,—ওই লোকটার কী হয়েছে?
—কিছু না। ওই লোকটা লাইলিরে ভালোবাসতে-বাসতে ফতুর হয়েছে। না পেয়ে পাগলের মতো আচরণ করে।
রাষ্ট্রপতি দেখলেন আরেকজন কয়েদিও বলছে,—লাইলি রে লাইলি তুই আমারে খাইলি।
রাষ্ট্রপতি জিজ্ঞেস করলেন কারারক্ষীকে,—একজন না-হয় লাইলিরে না পেয়ে অপরাধী হয়েছে, পাগল হয়েছে, অন্যজনের কী হয়েছে?
—একজন পাইয়া পাগল, আরেকজন না পাইয়া পাগল।
২২.
কারারক্ষী কয়েদিকে বলল :
—কারাগারের সবচেয়ে বড়ো ভিন্নতা কী?
—জানি না।
—কারাগারের সবচেয়ে শক্ত জিনিস কি জানো?
—লোহার দরজা?
—না।
—তাহলে কী?
—তালা?
—তাও না। সবচেয়ে শক্ত হলো তোমাদের মুক্তির ইচ্ছা। তালা ভাঙে, সেটা ভাঙে না!
—কয়েদি মুচকি হেসে বলল,—তাহলে স্যার, আপনার চাকরিটাই বিপদে!
২৩.
কয়েদিদের দিনরাত চিন্তামগ্নতায় যায়। আশায় আশায় যায়। কত ঘটনা কত স্মৃতি জমে ওঠে কারাগারে। এইসব গহিন কারাযাপন কালে এক কয়েদি প্রতিদিন কারারক্ষীকে জিজ্ঞেস করে,—স্যার, কয়টা বাজে?
কারারক্ষী বিরক্ত হয়ে বলল,—ঘড়ি তো তোমার সামনেই!
—ঘড়ি সময় বলে, স্যার। আপনি বলেন—আর কত দিন!
কারারক্ষী চুপ হয়ে গেল। পরদিন কয়েদি আর সময় জানতে চাইল না। কারারক্ষী নিজেই বলল,—আজ আটটা।
—সকাল না রাত?
কারারক্ষী বলল,—তোমার কাছে দুটোই একই।
২৪.
মানুষের আচরণ অনেকরকম। ভালো আচরণ ভলোর দিকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে। একদিন কারারক্ষী বলল,—ভালো আচরণ করলে জেল থেকে আগে ছাড়া পেতে পারো।
কয়েদি বলল, কয়জনই-বা ভালো আচরণ করে? তারপরও,—আজ থেকেই আমি খুব ভালো মানুষ।
—কীভাবে বুঝব?
—কারাগারে মারামরি করবো না। আপনাকে গালি দেব না।
কারারক্ষী খুশি হয়ে বলল,—বাহ!
কয়েদি যোগ করল,—তবে মনে মনে দেবো।
কারারক্ষী বলল,—মানুষের মতো আশ্চর্য জীবন কার আছে জানি না? তবে তোমার ভালো মানুষ হওয়ার প্রক্রিয়াটা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে!
২৫.
এক কয়েদিকে দেখতে গিয়ে একজন বলল,—পাপীকে নয় পাপকে ঘৃণা করো।
কয়েদি বলল,—পাপ করেই তো পাপী হয়!

২৬.
জেলখানায় চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়ন প্রয়োজন। কয়েদি ডাক্তারকে বলল,—ডাক্তার সাহেব, আমার স্মৃতিশক্তি খুব খারাপ হয়ে গেছে।
—কতদিন ধরে?
কয়েদি কিছুক্ষণ ভেবে বলল,—কী কতদিন ধরে?
পাশ থেকে কারারক্ষী বলল,—এই লোককে সুস্থ করার আগে আমাকে সুস্থ করেন!
২৭.
কয়েদি কারারক্ষীকে বলল,—স্যার, আমি পালানোর একটা দুর্দান্ত পরিকল্পনা করেছি।
কারারক্ষী শান্তভাবে বলল,—বলো।
—রাতে সবাই ঘুমালে আমি পালাব।
কারারক্ষী বলল,—চমৎকার পরিকল্পনা, কিন্তু একটা সমস্যা আছে।
—কী?
—তুমি যখন পরিকল্পনা করো, আমরাও তখন ঘুমাই না!
কয়েদি বলল,—তাহলে পরিকল্পনাটা বাতিল। ঘুমের বিরুদ্ধে আমার কোনো পরিকল্পনা নেই।
২৮.
কয়েদি বাড়িতে চিঠি লিখে। এক চিঠিতে কয়েদি লিখল—প্রিয় মা, কারাগরে ভালো আছি। এখানে সবাই খুব নিয়ম মেনে চলে, শুধু আমি ছাড়া।
চিঠিটা কারারক্ষী পড়ে বলল,—তুমি নিজেকে খারাপ ভাবো কেন?
—আমি তো নিজের কথা বলিনি। চিঠিটা পড়ে আপনি নিজেই ধরে নিয়েছেন!
কারারক্ষী চিঠিটা ফেরত দিয়ে বলল,—এজন্যই তোমাকে বেশি কথা বলতে দিই না।
২৯.
কয়েদি বলল,—স্যার, জেলে এসে আমি অনেককিছু শিখেছি।
—কী শিখেছ?
—ধৈর্য।
—আর?
—অল্প খাবারে বেঁচে থাকা।
—আর?
—দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চিন্তা করা।
—আর
—বড়ো থেকে বড়ো হওয়া।
—তুমি তো পণ্ডিত হয়ে গেছ!
—হ্যাঁ স্যার, শুধু ডিগ্রিটা এখনো দেয়ালের ওপারে। সার্টিফিকেট কোথায় কে জানে!
৩০.
কয়েদিদের গল্পে হাসি উঠেও ওঠে না। কয়েদি একদিন কারারক্ষীকে বলল,—স্যার, আপনার হাতে যে-চাবিটা থাকে, সেটা খুব মূল্যবান।
—জানি।
—কত দাম?
—দাম দিয়ে মাপা যায় না।
—আমার কাছে এর দাম স্বাধীনতা।
—আর আমার কাছে?
—আপনার কাছে এটা চাকরি বাঁচানোর চাবি।

৩১.
কারারক্ষী ও কয়েদির আলাপে জীবনের গহিন যাপন ফুটে ওঠে।
—কাল রাতে কী স্বপ্ন দেখেছ?
—আমি কারাগারের বাইরে হাঁটছি।
—তারপর?
—আপনি আমাকে ধরে ফেললেন।
—তারপর?
—ঘুম ভেঙে দেখি আমি কারাগারের ভেতরেই!
—স্বপ্নেও আমার ডিউটি আছে!
—স্যার, আপনি মানুষ না—আপনি যেন দুঃস্বপ্ন!
৩২.
কয়েদি দিনরাত গুণতে থাকে। বেলা-অবেলায় ভাবতে থাকে অনেককিছু। একদিন কারারক্ষী বলল,—তোমার মুক্তির দিন ঘনিয়ে এসেছে।
—স্যার, একটা কথা বলব?
—বলো।
—জেল থেকে বের হওয়ার পর আপনাকে খুব মিস করব।
কারারক্ষী আবেগাপ্লুত হয়ে বলল,—আমিও তোমাকে মিস করব।
কয়েদি বলল,—না, আপনি আমাকে মিস করবেন না। আমি আপনার কাছ থেকে যে-ধার নিয়েছি, সেটা ফেরত দিতে চাই না—এইজন্য বললাম!
—তোমার মুক্তির তারিখটা আবার একটু পিছিয়ে দিই?
—স্যার, এটাই তো আমি ভয় পাচ্ছিলাম!
৩৩.
—স্বাধীনতা কী?
—যখন কেউ আপনাকে বলে না কখন ঘুমাবেন, কখন উঠবেন, কখন খাবেন।
—তাহলে আমিও স্বাধীন নই!
—আপনিও বন্দি?
—হ্যাঁ। আমার জেলখানার নাম ‘ডিউটি রোস্টার’।
দুজনেই কিছুক্ষণ নীরব রইল। নীরবতা নির্জনতার সিঁড়ি পেরিয়ে তারপর দুজনেই হেসে উঠল।
৩৪.
—স্যার, মানুষ কেন জেলে আসে?
—ভুলের কারণে। কর্মফলে।
—আর কারারক্ষী?
—চাকরির কারণে।
—তাহলে আমরা দুজনেই ভুল করেছি। আমাদের কর্মফলের হিসাব-নিকাশ কষতে হবে।
—কী ভুল?
—আপনি চাকরিটা নিয়েছেন, আমি পৃথিবীতে জন্মেছি!
—তোমার রসবোধের জন্যই বোধহয় জেলখানাটা এখনো টিকে আছে।
. . .

. . .
… ‘কয়েদিগুচ্ছ’ আগের পর্ব পাঠে নিচের লিংক চাপুন …
. . .
লেখক পরিচয় মেকদাদ মেঘ : এখানে অথবা ওপরে ছবিতে চাপুন
. . .

অবদায়ক : মেকদাদ মেঘ : থার্ড লেন স্পেস.কম



