পোস্ট শোকেস - সাহিত্যবাসর

কয়েদিগুচ্ছ-২ : মেকদাদ মেঘ

Reading time 4 minute
5
(14)
Imprisoned: Conceptual Artwork-I; Image Source & Credit: Collected; Google Image

২১.
জেলখানায় এক কয়েদি মাঝেমাঝে বেলুন উড়িয়ে প্রতীকী কেক কেটে বলত ‘হেপি বার্থ ডে, হেপি বার্থ ডে।’ অন্যান্য কয়েদি কথাগুলো শুনে হাসত। ‎একবার এক রাষ্ট্রপতি জেলখানা পরিদর্শন করতে এসে দেখলেন কয়েদিটি বেলুন উড়িয়ে বলছে,‎—লাইলিরে লাইলি তুই আমারে খাইলি।

‎রাষ্ট্রপতি কারারক্ষীকে জিজ্ঞেস করলেন,‎—ওই লোকটার কী হয়েছে?

‎—কিছু না। ওই লোকটা লাইলিরে ভালোবাসতে-বাসতে ফতুর হয়েছে। না পেয়ে পাগলের মতো আচরণ করে।

‎রাষ্ট্রপতি দেখলেন আরেকজন কয়েদিও বলছে,‎‎—লাইলি রে লাইলি তুই আমারে খাইলি।

‎রাষ্ট্রপতি জিজ্ঞেস করলেন কারারক্ষীকে,‎—একজন না-হয় লাইলিরে না পেয়ে অপরাধী হয়েছে, পাগল হয়েছে, অন্যজনের কী হয়েছে?

‎—একজন পাইয়া পাগল, আরেকজন না পাইয়া পাগল।

‎২২.
‎কারারক্ষী কয়েদিকে বলল :

‎—কারাগারের  সবচেয়ে বড়ো ভিন্নতা কী?

‎—জানি না।

‎—কারাগারের সবচেয়ে শক্ত জিনিস কি জানো?

‎—লোহার দরজা?

‎—না।

‎—তাহলে কী?

‎—তালা?‎

—তাও না। সবচেয়ে শক্ত হলো তোমাদের মুক্তির ইচ্ছা। তালা ভাঙে, সেটা ভাঙে না!

‎‎—কয়েদি মুচকি হেসে বলল,‎—তাহলে স্যার, আপনার চাকরিটাই বিপদে!

‎২৩.
‎কয়েদিদের দিনরাত চিন্তামগ্নতায় যায়। আশায় আশায় যায়। কত ঘটনা কত স্মৃতি জমে ওঠে কারাগারে। এইসব গহিন কারাযাপন কালে এক কয়েদি প্রতিদিন কারারক্ষীকে জিজ্ঞেস করে,—স্যার, কয়টা বাজে?

‎কারারক্ষী বিরক্ত হয়ে বলল,‎—ঘড়ি তো তোমার সামনেই!

‎—ঘড়ি সময় বলে, স্যার। আপনি বলেন—আর কত দিন!

‎কারারক্ষী চুপ হয়ে গেল। পরদিন কয়েদি আর সময় জানতে চাইল না। কারারক্ষী নিজেই বলল,‎—আজ আটটা।

‎—সকাল না রাত?

‎কারারক্ষী বলল,‎—তোমার কাছে দুটোই একই।

‎২৪.
‎মানুষের আচরণ অনেকরকম। ভালো আচরণ ভলোর দিকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে। একদিন ‎কারারক্ষী বলল,‎—ভালো আচরণ করলে জেল থেকে আগে ছাড়া পেতে পারো।

‎কয়েদি বলল, কয়জনই-বা ভালো আচরণ করে? তারপরও,‎—আজ থেকেই আমি খুব ভালো মানুষ।

‎—কীভাবে বুঝব?

‎—কারাগারে মারামরি করবো না। আপনাকে গালি দেব না।

‎কারারক্ষী খুশি হয়ে বলল,‎—বাহ!

‎কয়েদি যোগ করল,‎—তবে মনে মনে দেবো।

‎কারারক্ষী বলল,‎—মানুষের মতো আশ্চর্য জীবন কার আছে জানি না? তবে তোমার ভালো মানুষ হওয়ার প্রক্রিয়াটা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে!

‎২৫.
‎এক কয়েদিকে দেখতে গিয়ে একজন বলল,‎—পাপীকে নয় পাপকে ঘৃণা করো।

‎কয়েদি বলল,‎—পাপ করেই তো পাপী হয়!

Freedom: Conceptual Artwork-I; Image Source & Credit: Collected; Google Image

‎২৬.
জেলখানায় চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়ন প্রয়োজন। কয়েদি ডাক্তারকে বলল,‎—ডাক্তার সাহেব, আমার স্মৃতিশক্তি খুব খারাপ হয়ে গেছে।

‎—কতদিন ধরে?

‎কয়েদি কিছুক্ষণ ভেবে বলল,‎—কী কতদিন ধরে?

‎পাশ থেকে কারারক্ষী বলল,‎—এই লোককে সুস্থ করার আগে আমাকে সুস্থ করেন!

‎২৭.
‎কয়েদি কারারক্ষীকে বলল,‎—স্যার, আমি পালানোর একটা দুর্দান্ত পরিকল্পনা করেছি।

‎কারারক্ষী শান্তভাবে বলল,‎—বলো।

‎—রাতে সবাই ঘুমালে আমি পালাব।

‎কারারক্ষী বলল,‎—চমৎকার পরিকল্পনা, কিন্তু একটা সমস্যা আছে।

‎—কী?

‎—তুমি যখন পরিকল্পনা করো, আমরাও তখন ঘুমাই না!

‎কয়েদি বলল,‎—তাহলে পরিকল্পনাটা বাতিল। ঘুমের বিরুদ্ধে আমার কোনো পরিকল্পনা নেই।

‎২৮.
‎কয়েদি বাড়িতে চিঠি লিখে। এক চিঠিতে কয়েদি লিখল—‎প্রিয় মা, ‎কারাগরে ভালো আছি। এখানে সবাই খুব নিয়ম মেনে চলে, শুধু আমি ছাড়া।

‎চিঠিটা কারারক্ষী পড়ে বলল,‎—তুমি নিজেকে খারাপ ভাবো কেন?

‎—আমি তো নিজের কথা বলিনি। চিঠিটা পড়ে আপনি নিজেই ধরে নিয়েছেন!

‎কারারক্ষী চিঠিটা ফেরত দিয়ে বলল,‎—এজন্যই তোমাকে বেশি কথা বলতে দিই না।

‎২৯.
‎কয়েদি বলল,‎—স্যার, জেলে এসে আমি অনেককিছু শিখেছি।

‎—কী শিখেছ?

‎—ধৈর্য।

‎—আর?

‎—অল্প খাবারে বেঁচে থাকা।

‎—আর?

‎—দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চিন্তা করা।

‎—আর

‎—বড়ো থেকে বড়ো হওয়া।

‎—তুমি তো পণ্ডিত হয়ে গেছ!

‎—হ্যাঁ স্যার, শুধু ডিগ্রিটা এখনো দেয়ালের ওপারে। ‎সার্টিফিকেট কোথায় কে জানে!

৩০.
‎কয়েদিদের গল্পে হাসি উঠেও ওঠে না। কয়েদি একদিন কারারক্ষীকে বলল,‎—স্যার, আপনার হাতে যে-চাবিটা থাকে, সেটা খুব মূল্যবান।

‎—জানি।

‎—কত দাম?

‎—দাম দিয়ে মাপা যায় না।

‎—আমার কাছে এর দাম স্বাধীনতা।

‎—আর আমার কাছে?

‎—আপনার কাছে এটা চাকরি বাঁচানোর চাবি।

Prison-life: Conceptual Artwork-I; Image Source & Credit: Collected; Google Image

‎৩১.
‎‎কারারক্ষী ও কয়েদির আলাপে জীবনের গহিন যাপন ফুটে ওঠে।

‎—কাল রাতে কী স্বপ্ন দেখেছ?

‎—আমি কারাগারের বাইরে হাঁটছি।

‎—তারপর?

‎—আপনি আমাকে ধরে ফেললেন।

‎—তারপর?

‎—ঘুম ভেঙে দেখি আমি কারাগারের ভেতরেই!

‎—স্বপ্নেও আমার ডিউটি আছে!

‎—স্যার, আপনি মানুষ না—আপনি যেন দুঃস্বপ্ন!

‎৩২.
‎কয়েদি দিনরাত গুণতে থাকে। বেলা-অবেলায় ভাবতে থাকে অনেককিছু। একদিন কারারক্ষী বলল,‎—তোমার মুক্তির দিন ঘনিয়ে এসেছে।

‎—স্যার, একটা কথা বলব?

‎—বলো।

‎—জেল থেকে বের হওয়ার পর আপনাকে খুব মিস করব।

‎কারারক্ষী আবেগাপ্লুত হয়ে বলল,‎—আমিও তোমাকে মিস করব।

‎কয়েদি বলল,‎—না, আপনি আমাকে মিস করবেন না। আমি আপনার কাছ থেকে যে-ধার নিয়েছি, সেটা ফেরত দিতে চাই না—এইজন্য বললাম!

‎—তোমার মুক্তির তারিখটা আবার একটু পিছিয়ে দিই?

‎—স্যার, এটাই তো আমি ভয় পাচ্ছিলাম!

‎৩৩.
‎—স্বাধীনতা কী?

‎—যখন কেউ আপনাকে বলে না কখন ঘুমাবেন, কখন উঠবেন, কখন খাবেন।

‎—তাহলে আমিও স্বাধীন নই!

‎—আপনিও বন্দি?

‎—হ্যাঁ। আমার জেলখানার নাম ‘ডিউটি রোস্টার’।

‎দুজনেই কিছুক্ষণ নীরব রইল। নীরবতা নির্জনতার সিঁড়ি পেরিয়ে তারপর দুজনেই হেসে উঠল।

৩৪.
‎—স্যার, মানুষ কেন জেলে আসে?

‎—ভুলের কারণে। কর্মফলে।

‎—আর কারারক্ষী?

‎—চাকরির কারণে।

‎—তাহলে আমরা দুজনেই ভুল করেছি। আমাদের কর্মফলের হিসাব-নিকাশ কষতে হবে।

‎—কী ভুল?

‎—আপনি চাকরিটা নিয়েছেন, আমি পৃথিবীতে জন্মেছি!

‎—তোমার রসবোধের জন্যই বোধহয় জেলখানাটা এখনো টিকে আছে।
. . .

The Prisoner (1878); Artist: Nikolai Yaroshenko; Image Source & Credit: Collected; Pinterest

. . .

‘কয়েদিগুচ্ছ’ আগের পর্ব পাঠে নিচের লিংক চাপুন …

কয়েদিগুচ্ছ : মেকদাদ মেঘ

. . .

লেখক পরিচয় মেকদাদ মেঘ : এখানে অথবা ওপরে ছবিতে চাপুন

. . .

অবদায়ক : মেকদাদ মেঘ : থার্ড লেন স্পেস.কম

মেকদাদ মেঘ-এর অন্যান্য রচনা পাঠের জন্য এখানে চাপুন

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 14

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *