পোস্ট শোকেস - সাহিত্যবাসর

কয়েদিগুচ্ছ : মেকদাদ মেঘ

Reading time 7 minute
5
(5)
Conceptual Photograph-I: Prison Cell; Image Source & Credit: Collected; Google Image

‎১.
‎শব্দ নৈঃশব্দ ক্রিয়াশীল। কারাগারের প্রধান দরজাটি বন্ধ হওয়ার শব্দে মেঘরাজ আরিয়ানের মনে হলো—বিশাল পৃথিবী যেন হঠাৎ তার পেছনে তালাবদ্ধ হয়ে গেল। সে কারাগারে এসেছিল গবেষণার কাজে। উদ্দেশ্য ছিল কয়েদিদের জীবন নিয়ে প্রতিবেদন লেখা। কিন্তু প্রথম দিনেই বুঝল, কারাগারে মানুষের গল্প লেখা যায় না;—গল্পগুলো নিজেই মানুষকে লিখে ফেলে। প্রথম যে-কয়েদির সঙ্গে তার দেখা হলো, তার নাম মজিদ। মজিদ রসিক। মজিদ বলল,—বাবু, আপনি কি আমার অপরাধের কথা শুনবেন?

মেঘরাজ খাতা খুলল,—হ্যাঁ।

‎মজিদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,—আমি মানুষ খুন করেছি।

মেঘরাজ কলম থামিয়ে দিলো,‎—কেন?

‎মজিদ জানালার দিকে তাকাল,—কারণ সেদিন আমার চোখের সামনে আমার মেয়েটাকে কেউ অপমান করেছিল। আমি আইনকে ডাকতে পারিনি। আমার হাতে শুধু একটা ছুরি ছিল। তারপর সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিন্তু জানেন, বাবু,—মানুষ খুন করার পর আমি বুঝেছি, মৃত মানুষটা শুধু একজন মানুষ ছিল না। সে আমার ভেতরেও এক মানুষকে মেরে গেছে।

মেঘরাজ লিখল,—কিছু অপরাধের বিচার আদালত করে, কিছু অপরাধের বিচার সারাজীবন নিজের ভেতর চলতে থাকে। সেদিন প্রথমবার তার মনে হলো, কারাগারের দেয়ালগুলো মানুষের শরীর আটকে রাখে, কিন্তু অপরাধের স্মৃতি আটকে রাখা যায় না।

২.
এরপর যে-মানুষটি চিঠি লিখে তার সঙ্গে দ্বিতীয়দিন মেঘরাজ আরিয়ানের দেখা হলো। সেই কয়েদি প্রতিদিন একইসময়ে চিঠি লেখে। কাদের অন্যরকম লোক।

‎—কাকে লিখছেন?

‎কাদের মৃদু হাসল,‎—আমার স্ত্রীকে।

‎—চিঠি পাঠান?

‎—না।

‎—তাহলে?

‎কাদের চিঠিটা ভাঁজ করে বালিশের নিচে রেখে দিলো;‎—সে তো আর বেঁচে নেই।

মেঘরাজ অবাক হয়ে গেল! ‎কাদের বলল,‎—আমি জেলে আসার পর প্রথম তিন বছর তাকে চিঠি লিখিনি। ভাবতাম, আমি তো অপরাধী। আমার কোনো কথা তার কাছে পৌঁছানোর অধিকার নেই।

‎—তারপর?

‎—একরাতে স্বপ্নে সে এসে বলল, ‘তুমি চিঠি না লিখলে আমি কীভাবে জানব তুমি বদলেছ?’

তারপর থেকে কাদের প্রতিদিন একটি করে চিঠি লেখে। পরের দিন মেঘরাজ জানতে চাইল,‎—কী লিখেছেন আজ?

কাদের বলল,‎—আজ লিখেছি, ‘তুমি আমাকে ক্ষমা করো। আমি তোমাকে ভালোবাসতে শিখেছিলাম, কিন্তু তোমার পাশে থাকতে শিখিনি।

মেঘরাজ খাতায় কিছু লিখল না। তার মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ চিঠিগুলো কখনো ডাকঘরে যায় না।

‎৩.
মেঘরাজের দেখা হয় আকাশ ‎রফিকের সাথে। সে কখনো কারাগারের উঠোনে দাঁড়ায় না। সে সবসময় দেয়ালের ছায়ায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাকে একদিন জিজ্ঞেস করল,‎—আপনি এত আকাশ দেখেন কেন?

‎—আমি আগে আকাশ দেখতাম না।

‎—কেন?

‎—আমি ছিলাম ট্রাকচালক। রাতদিন রাস্তা। আকাশ ছিল শুধু ট্রাকের কাচের ওপরে কালো পর্দা। তারপর সে বলল,‎—একরাতে দুর্ঘটনা হলো। আমার ট্রাকের নিচে একজন মানুষ মারা গেল।

‎—আপনি কি ইচ্ছা করে করেছিলেন?

‎রফিক মাথা নাড়ল,‎—না।

‎—তবু?

‎—আইনের কাছে দুর্ঘটনা। আমার কাছে প্রতিদিন একটি মৃত্যু দুঃখজনক।

সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,‎—এখন বুঝি, আকাশ অসীম উদার। মানুষ যত দূরে পালাক, নিজের আকাশ থেকে পালাতে পারে না।

মেঘরাজ লক্ষ করল,‎—আকাশ রফিকের চোখে আকাশের চেয়েও বেশি নীল শূন্যতা জমে আছে।

‎৪.
‎একদিন দেখা হলো এক কবি কয়েদির সঙ্গে। ‎কারাগারের সবচেয়ে নীরব মানুষটির নাম ছিল সামস। সে কথা বলত না। কিন্তু পুরোনো সিমেন্টের দেয়ালে কয়লার টুকরো দিয়ে কবিতা লিখত। মেঘরাজ ‎আরিয়ান সেদিন পড়ল :

দেয়াল আমাকে আটকে রাখেনি
‎আটকে আছি নিজের তৈরি দরজায়।

মেঘরাজ জিজ্ঞেস করল,‎—আপনি কবিতা লেখেন?

‎সামস বলল,‎—আগে মানুষ ছিলাম, পরে কবি হয়েছি।

‎—অপরাধ?

‎—শব্দ ও ঈর্ষা।

‎—ঈর্ষা?

‎—বন্ধুর সাফল্য সহ্য করতে পারিনি। একটা মিথ্যা বলেছিলাম। সেই মিথ্যা একজন নির্দোষ মানুষের জীবন নষ্ট করেছিল। সে দেয়ালে আরেকটি লাইন লিখল :

মিথ্যারও কারাগার আছে, সেখানে সত্যি সবচেয়ে বড়ো কয়েদি।

মেঘরাজ আরিয়ান অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

‎৫.
মেঘরাজের দেখা হলো আলমগীরের সাথে। আলমগীরের বয়স মাত্র বাইশ। তার পকেটে একটি পুরোনো ছবি ছিল। ছবিতে একজন বৃদ্ধা।

‎—আপনার মা?

‎—হ্যাঁ।

‎—আপনি তাকে দেখতে পারেন?

‎—না।

‎—কেন?

‎আলমগীর চোখ ফিরিয়ে বলল,‎—মা জানেন না আমি জেলে আছি।

‎—তাহলে?

‎—পরিচিতদের বলেছি আমি ঢাকায় কাজ করি।

‎—কেন মিথ্যা বললেন?

‎—মা হার্টের রোগী। সত্যিটা শুনলে হয়তো বাঁচবেন না। তারপর সে ছবিটা বুকে চেপে ধরে বলল,‎—আমি চুরি করেছিলাম মায়ের চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে। শেষপর্যন্ত টাকা পেলাম না, মাও চিকিৎসা পেলেন না, আর আমি জেলে এলাম। কর্মফল পিছু ছাড়ে না।

মেঘরাজ জিজ্ঞেস করল,‎—আপনার সবচেয়ে বড়ো কষ্ট কী?

‎—মা আমাকে অপরাধী ভাবেন না। তিনি ভাবেন, তার ছেলে অনেক দূরে গিয়ে কাজ করছে। কিছু মানুষ কারাগারে বন্দি হয়। কিছু মানুষ মায়ের ভালোবাসার মিথ্যার ভেতরে বন্দি থাকে।

৬.
এরপর বৃদ্ধ কয়েদির ঘড়ি দেখে মেঘরাজ আরিয়ান অবাক হয়। হাবিব সাহেবের কাছে একটি ঘড়ি ছিল। ঘড়িটি কখনো চলত না। তবু তিনি প্রতিদিন সেটি পরিষ্কার করতেন।

মেঘরাজ জিজ্ঞেস করল,‎—ঘড়িটা ঠিক করেন না কেন?

হাবিব বললেন,‎—সময়টা ঠিক করতে পারব না।

‎হাবিব রহমান একসময় স্কুলশিক্ষক ছিলেন। এক রাজনৈতিক সংঘর্ষের রাতে তার ছেলে মারা যায়। প্রতিশোধ নিতে গিয়ে তিনি এমন এক সিদ্ধান্ত নেন, যার ফলে আরেকটি পরিবার ধ্বংস হয়। তিনি বললেন,‎—আমি ছেলেকে হারিয়েছিলাম, তারপর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নিজের জীবনের বাকি সবাইকে হারালাম।

‎—আপনি কি অনুতপ্ত?

‎তিনি ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে বললেন,‎—অনুতাপ হলো এমন একটি ঘড়ি, যার কাঁটা শুধু পেছনের দিকে ঘোরে।

Conceptual Photograph-II: Prison Cell; Image Source & Credit: Collected; Google Image

‎৭.
‎কখনো কিছু চুরি করেনি তবু সংকুকে সবাই চোর বলে ডাকত। কিন্তু মেঘরাজ আরিয়ান তার সঙ্গে কথা বলে জানতে পারল, সে জীবনে কোনো চুরি করেনি। সে মানুষের বিশ্বাস চুরি করেছিল। নকল কাগজপত্র তৈরি করে মানুষের জমি দখল করত। রীতিমতো ডাকাতি!

‎—আপনি এত মানুষের সর্বনাশ করলেন কেন?

‎—আমি গরিব ছিলাম।

‎—গরিব হলেই কি মানুষ প্রতারক হয়?

‎সংকু মাথা নিচু করে বলল,‎—না। কিন্তু গরিব মানুষ যখন দেখে অন্যরা আইন কিনে নেয়, তখন তার ভেতরেও আইনকে বিক্রি করে দেওয়ার ইচ্ছা জন্মায়। তারপর সে বলল,‎—আমি টাকা চুরি করিনি, বাবু। মানুষের নিরাপত্তাবোধ চুরি করতে গিয়ে কয়েদি হয়েছি।

‎৮.
‎কারাগার তো কারাগারই। কারাগার তো অনেক দেশে এখনো সংশোধনাগার হয়নি। সংশোধনাগার হলে ভালোই হয়। কারাগারের জানালা থেকে কতটুকু আকাশ দেখা যায়? সে পুরোটা জানে না, তারপরও এক কয়েদি প্রতিদিন সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে।

‎একদিন নতুন একজন জিজ্ঞেস করল,‎—কী দেখেন?

সেই কয়েদি বলল,‎—আমার মুক্তির তারিখ।

‎—কোথায় লেখা?

‎কয়েদি আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল,‎—প্রতিদিনই তো একটু একটু করে বদলায়। ‎বদলানোর নিয়মে বদলায়।

সেদিন প্রথমবার সে বুঝল—কারাগারের দেয়াল মানুষকে আটকে রাখতে পারে, আকাশকে নয়, মহাকাশকে নয়।

‎৯.
‎প্রযুক্তির গতিশীল যুগে কয়জন চিঠি লিখে? প্রযুক্তির উৎকর্ষের যাত্রার যুগেও এক কয়েদির কাছে প্রতি মাসে একটি চিঠি আসত। ‎চিঠির শেষে লেখা থাকত—‎বাবা, তুমি কবে বাড়ি আসবে?

সে উত্তর দিত না। কারণ চিঠিগুলো তার মৃত মেয়ের লেখা। আশ্চর্যের বিষয়। মৃত্যুর পরেও ডাকপিয়ন ভুল করে সেগুলো পৌঁছে দিত পুরোনো ঠিকানায়। একদিন সে উত্তর লিখল,—‘বাবা আসবে না মা। যেখানে আছি, সেখানেই আমার বাড়ি।’

‎চিঠিটা ফেরত আসল। খামের ওপর লেখা,—‎প্রাপক : মৃত।

সে অনেকক্ষণ চিঠিটা বুকে চেপে রাখল নিরাপদ তন্দ্রার মতো।

‎১০.
‎কারারক্ষীরও গল্প আছে কয়েদিদের বিচিত্র গল্পের মতো। একজন কারারক্ষীর পকেটে সারাক্ষণ একটি বড়ো চাবি ঝুলত। সেই ঝুলতে থাকা চাবি দেখে একদিন এক কয়েদি বলল,‎—ওটা দিয়ে কি সব দরজা খোলা যায়?

‎রক্ষী হেসে হেসে বলল,‎—সব না।

‎—কোন দরজা খুলে না?

‎রক্ষী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,‎—যে-দরজা মানুষ নিজের ভেতরে বন্ধ করে রাখে, সে-দরজা সহজে খুলে না!

সেদিন রাতে কয়েদি প্রথমবার নিজের সঙ্গে কথা বলল। সকালে তার চোখে অদ্ভুত শান্তি অনুভব করল, যদিও শান্তি-প্রশান্তি অতি সহজে মিলে না।

‎১১.
কে কার বিচার করে? বিচারের ওপরে বিচার। বিচারক কয়েদিকে বললেন,‎—তোমার অপরাধ প্রমাণিত।

‎কয়েদি মাথা নিচু করল। কারাগারে যাওয়ার পথে সে জানালার বাইরে দেখল একজন ক্ষুধার্ত শিশু ডাস্টবিনে খাবার খুঁজছে। সে হঠাৎ বুঝল, আদালত তার অপরাধের বিচার করেছে, কিন্তু শিশুটির ক্ষুধার বিচার করার মতো কি কোনো আদালত নেই?

সেদিন থেকে সে নিজের সাজাকে শুধু শাস্তি বলে ভাবল না; ভাবল—বিচার, শাস্তি যুদ্ধ-সংঘর্ষ-শান্তি হয়তো মানুষের তৈরি যান্ত্রিক জগৎ ও পৃথিবীকে নতুন করে পড়ার বিশ্ববিদ্যালয়।

‎১২.
‎গল্পের শুরু ও শেষ নিয়ে ভেবে দেখি গল্পও আদিঅন্তহীন। গল্পচ্ছলে দুজন কয়েদি পাশাপাশি বসে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ছিল। কী যেন দেখছিল! ‎

একজন বলল,‎—দেয়ালটা কত উঁচু!

‎অন্যজন বলল,‎—হ্যাঁ।

‎—ওপারে কী আছে?

‎—জানি না।

‎দুজনে হ্যাঁ না জানিনা-র ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল। তারপর দুজনেই দেয়ালে হাত রাখল। দেয়ালের ওপাশ থেকে শিশুর হাসির শব্দ ভেসে আসল। দুজনেই চুপ হয়ে গেল। তারা অনুভব করল অন্যকিছু। কারাগারের শক্ত দেয়ালটিও সেদিন তাদের কাছে কাগজের মতো পাতলা মনে হলো। কাগজের মতো পলকা মনে হলো।

Egyptian Artist Yassin Mohammed painted his time inside prison; Image Source & Credit: bbc.com/news

‎১৩.
‎কারাগারে কত লোক আসে কত লোক যায়! একদিন কারাগারে দেখা করতে এসে একজন বৃদ্ধ মা ছেলের হাত ধরলেন। লোহার জালের দুপাশে মা ছেলের হাত। মা বললেন,‎—খাবার ঠিকমতো খাস?

‎—হ্যাঁ।

‎মা জানতেন, সে মিথ্যা বলছে। মায়ের চোখে সত্য-মিথ্যে আড়াল করা কঠিন। ছেলেও জানত,‎—মা জানেন। তবু দুজনেই হাসল। কারণ কিছু মিথ্যা মাঝেমাঝে সত্যের চেয়েও ভিন্ন ভিন্নতায় ভালোবাসা বহন করে! যদিও সত্য সবসময় সত্য।

‎১৪.
‎কারাগার আর কয়েদি নাম্বার বিচিত্র। কারাগারের রেজিস্টারে কয়েদির নামের পাশে লেখা ছিল কয়েদি নম্বর ৪৭। বছরের পর বছর কেউ তাকে নামে ধরে ডাকেনি। একদিন এক কয়েদি এসে জিজ্ঞেস করল,‎—আপনার নাম কী?

‎—নাম নীল।

‎নতুন মানুষটি বলল,‎—শুধু নীল কেন?

‎—অনেকদিন কেউ ডাকেনি তো। ভাবলাম, নামটাও হয়তো মারা গেছে কিনা কে জানে!

পরদিন সকাল থেকে সবাই তাকে নীল বলে ডাকতে শুরু করল। কারাগারে সেদিন যেন একজন মানুষ আবার নতুন রূপে জন্ম নিলো।

‎১৫.
‎মানুষ মুক্তি চায়। জীবনের বহুরৈখিক মুক্তি। কারামুক্তির কাগজ হাতে নিয়ে কয়েদি দরজার সামনে দাঁড়াল। দরজা খুলে গেল। ‎রক্ষী বলল,‎—যাও।

সে নড়ল না।

‎—কী হলো?

কয়েদি বলল,‎—বাইরে তো আমার জন্য কেউ অপেক্ষা করছে না।

‎রক্ষী অবাক হয়ে  দীর্ঘশ্বাস ফেলল! তারপর বলল,‎—তাহলে আজ থেকে তুমি নিজেই নিজের অপেক্ষা করো।

‎কয়েদি বাইরে পা রাখল। অনেক বছর পর সে নিজের ছায়াটাকে সঙ্গে হাঁটতে দেখল, যেন হাঁটছে ছায়া হাজার বছর।

‎১৬.
রোদ ওঠে, বৃষ্টি নামে। কারাগারের উঠোনে বৃষ্টি নামলে সব কয়েদি আকাশের দিকে তাকাত। একজন হাত বাড়িয়ে বলল,‎—বৃষ্টি কি জানে আমরা কয়েদি?

‎পাশেরজন বলল,‎—না।

‎—তাহলে সে আমাদের ছুঁয়ে যায় কেন?

কেউ উত্তর দিল না।

‎১৭.
‎দিন যায় রাত আসে। শুধু কথা থেকে যায়।

‎রাত তিনটায় সবাই ঘুমিয়েছিল। এক কয়েদি জেগে জানালার পাশে বসে। হঠাৎ সে শুনল—দূরে আজানের মতো কোনো শব্দ ভেসে আসছে।

সে চোখ বন্ধ করল। তার মনে হলো, কারাগারটি আসলে ঘুমিয়ে আছে, আর তার ভেতরের মানুষগুলো জেগে উঠছে। ভোর হলে সে দেখল—কারাগার কারাগারই আছে, শুধু তার ভেতরের অন্ধকারটা একটু কমেছে।

‎১৮.
‎সাক্ষাতের শেষ নেই। সাক্ষাত বৈচিত্র্যময়। প্রতি সাক্ষাতের দিনে এক কয়েদি একটি খালি চেয়ার নিজের সামনে রাখত। অন্যরা হাসত। জিজ্ঞেস করত,‎—কার জন্য?

‎—আমার বাবার জন্য।

‎বাবা মারা গেছেন দশ বছর আগে। একদিন জিজ্ঞেস করা হলো,‎—তিনি তো আসবেন না।

‎—জানি। তাই তো চেয়ারটা খালি রাখি।

‎তারপর কয়েদি ধীরে ধীরে বলল,‎—কিছু মানুষ না এলেও তাদের জন্য জায়গা রেখে দিতে হয়।

১৯.
‎জগতে বিচিত্র সাজা। এক কয়েদি সাজা শেষে বেরিয়ে আসল। অনেকে তাকে চিনল না। পুরোনো বন্ধুরা কেউ নেই। পুরোনো বাড়ি পুরোনো প্রেমও নেই। যেন আগের অনেক কিছু নেই। সে নদীর ধারে গিয়ে বসে রইল। একটি ছেলে এসে জিজ্ঞেস করল,‎—চাচা, আপনি এখানে একা কেন?

‎—আমি নতুন জীবন শুরু করতে এসেছি।

—নতুন জীবন কোথায় পাওয়া যায়?

সে জলভরা নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,‎—যেখানে পুরোনো জীবনটা শেষ করতে সাহস লাগে। নদী তখন নদীর মতো শব্দ-নিঃশব্দ নিয়ে বয়ে যাচ্ছিল।

‎২০.
‎—কেন অপরাধ করো?

‎‎—অগণিত তাড়নায়?

‎—কেন কারাগারে আসো?

‎—কারণ ছাড়া কিছুই হয় না। মাঝেমাঝে পৃথিবীকেও কারাগার মনে হয়!
. . .

The Prisoner (1878); Artist: Nikolai Yaroshenko; Image Source & Credit: Collected; Pinterest

. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …

গোলা কাদের : কামাল রাহমান

তুমি কতটা জানাতে পারো অপর্ণা?—একটি এআই কথন

তামেশগির আলতামিশ ও এলিয়েন জাকারবার্গ

নগরসেনা ও আম্রিকার শিশুপাঠ্য গল্প

. . .

লেখক পরিচয় মেকদাদ মেঘ : এখানে অথবা ওপরে ছবিতে চাপুন

. . .

অবদায়ক : মেকদাদ মেঘ : থার্ড লেন স্পেস.কম

মেকদাদ মেঘ-এর অন্যান্য রচনা পাঠের জন্য এখানে চাপুন

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 5

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *