
সময়ের ক্ষয় বুঝতে হলে আমাদেরকে সবার আগে ফিরতে হয় ‘থাকার’ প্রশ্নে;—আমরা কীভাবে থাকি? নিজের ভেতরে কেন্দ্র বানিয়ে থাকি? তার চারপাশে সবকিছু সাজাই? নিজের পরিচয়, নিজের দেওয়া সত্য, সাফল্য ও নিরাপত্তা নিজে তৈরি করি? নাকি এমনভাবে থাকা সম্ভব, যেখানে ‘কেন্দ্র’ শক্ত হয়ে জমাট বাঁধতে পারে না, ওটা বরং আলগা থাকে, যেন জীবন দখলে মোড় না নেয়, সম্পর্ক মালিকানায় পরিণত না হয়, আর সত্য কোনো এক পরম আশ্রয়ে বন্দি হতে না পারে?
মৌলিক এই জিজ্ঞাসাগুলো বিয়ং-চুল হানের চিন্তার সূত্রপাত ঘটানোর পেছনে বড়ো ভূমিকা নিয়েছিল। আধুনিকতার সংকটকে এই ভাবুক কেবল অর্থনীতি বা রাজনীতির কাঠামোয় সীমায়িত করে দেখেন না। হান একে নামিয়ে আনেন মানুষের আত্মঅভিজ্ঞতার গভীরে, যেখানে ‘আমি’ তার নিজেকে প্রকল্প ও কেন্দ্র রূপে জাহির করার মধ্য দিয়ে দৃঢ় করে তুলছে। তাঁর কাছে এই কেন্দ্র নির্মাণের অভ্যাসটাই হচ্ছে আধুনিক সহিংসতার গোপন উৎস। সহিংসতা কেবল বাইরের দমন নয়, এটা এমন এক অস্তিত্বগত ভঙ্গি, যেখানে দেখা-জানা-ভালোবাসা ও কাজের সবকিছু ধীরে-ধীরে দখলের দিকে ঝুঁকে পড়ে, আর এই দখলটাই শেষপর্যন্ত মানুষকে তার নিজের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়।
হান যে-কারণে প্রথমে মনোনিবেশ করেন জেন বৌদ্ধধর্ম ও দূরপ্রাচ্যের চিন্তায়। তিনি সেখানে খুঁজে পান অন্য এক অস্তিত্বগত অবস্থান। এখানে থাকা মানে দখল নয়, উপস্থিতি মানে প্রদর্শন নয়, আর স্বাধীনতা মানে ‘শক্ত’ হয়ে ওঠা নয়। শূন্যতা কোনো অভাব নয়, বরং এমন এক অবস্থা, যার কোনো চূড়ান্ত কেন্দ্র নেই, কোনো পরম মালিক নেই, কোনো শক্ত ‘আমি’ নেই। অনুপস্থিতি মানে বিলোপ নয়, বরং এমনভাবে থাকা, যেখানে নিজেকে জাহির না করেও গভীরে গমন করা সম্ভব। বিয়ং-চুল হানের পরবর্তী সমগ্র সমাজ-সমালোচনার ভিত এখানে নিহিত;—যদি থাকার ধরন সহিংস হয়ে ওঠে, তাহলে মুক্তির সম্ভাবনা শুরু করতে হবে থাকার এই ভঙ্গিটি পালটানোর মধ্য দিয়ে।
এই ভিত্তির সবচেয়ে স্পষ্ট নির্মাণ ঘটেছিল ২০০২ সনে প্রকাশিত The Philosophy of Zen Buddhism-এ। হান এখানে জেনকে ‘শান্ত থাকার অনুশীলন’ বা ‘পূর্বের রহস্য’ রূপে তোলে ধরেননি। এর পরিবের্তে একসঙ্গে তিনটি কাজ করেছেন তিনি :
জেনকে পাশ্চাত্য দর্শনের পরিচিত ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে সহজ না করে জেনের সামনে পাশ্চাত্য দর্শনের সীমাবদ্ধতাগুলো তিনি উন্মুক্ত করেছেন।
দর্শন বলতে আমরা যেসব বড়ো বড়ো কাঠামো বুঝি,—বিষয়, সারবস্তু, ঈশ্বর, উদ্দেশ্য, ভিত্তি… এরকম ধারণাগুলোকে ভিতর থেকে নড়বড়ে করে দিয়েছেন।
এবং, জেনকে রহস্যময় ‘প্রাচ্য জ্ঞান’ হিসেবে নয়, বরং ‘এভাবে থাকা, এভাবে দেখা, এভাবে শোনা ও এভাবে নীরব থাকা’র মতো এক অস্তিত্বগত ভঙ্গি হিসেবে হাজির করেছেন।
বইয়ের কেন্দ্রে কয়েকটি জেন-ধারণা ঘুরেফিরে আসে। শূন্যতা মানে ‘কিছু নেই’ নয়, এটা হলো স্থায়ী সারবস্তুর অনুপস্থিতি। কোনোকিছুর ভেতরে এমন কোনো কেন্দ্র নেই, যা সবকিছুকে একবিন্দুতে জমাট বেঁধে শাসন করবে। অন্তর্লৌকিক মানে অতীন্দ্রিয় কোনো ‘ওখানে’ নয়, বরং চরমভাবে ‘এখানে’;—জগৎ ত্যাগ না করে জগতের মধ্যে অন্যভাবে থাকা। ‘দৈনন্দিন মন’, অর্থাৎ জেনপথে ‘বোধিলাভ’ অলৌকিক ঘটনা নয়। ওটা হলো ক্ষুধা লাগলে খাওয়া, ঘুম এলে ঘুমানোর মতো সাধারণ জীবনচর্চায় নিজের জাগরণ টের পাওয়া। আর, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিষয়ত্বের এই ভাঙন-যে,—এখানে কোনো শক্ত ‘আমি’র উপস্থিতি নেই, কোনো কেন্দ্রীয় অধিকারী নেই, যে-কিনা নিজের নামে সবকিছু দখল করবে, ব্যাখ্যা করবে ও নিয়ন্ত্রণ করতে থাকবে। এর ফলে জেন ধর্মীয় ডগমায় পরিণত হওয়ার পরিবর্তে ক্ষমতা, সারবস্তু ও কেন্দ্র নামক ত্রয়ীর বিরুদ্ধে মৌলিক অস্তিত্বগত অবস্থানে মোড় নেয়।

বইটির বড়ো শক্তি হলো জেনকে পাশ্চাত্য দর্শনের সঙ্গে কোমলভাবে মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা তিনি করেন না। জেনকে বরং পাশ্চাত্য দর্শনের বড়ো বড়ো স্তম্ভগুলোর মুখোমুখি করেন বিয়ং-চুল হান;—যেখানে বিরাজ করছে হেগেলের ‘ঈশ্বর ও সারবস্তুর ধারণা’, দেকার্তের ‘আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি’র মতো cogito-নিশ্চয়তা, লাইবনিজের ‘কেন’, হাইডেগারের ‘ভিত্তি অনুসন্ধান’, এমনকি মাইস্টার একহার্টের ‘মিস্টিসিজম’-র মতো বিরাট দার্শনিকতা। সবকিছুর বিপরীতে জেনকে দাঁড় করিয়ে পরখ করেছেন এই ভাবুক।
তুলনাগুলোর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে জেন এমন এক বিশ্বদৃষ্টি, যেখানে কোনোকিছু তার নিজেকে কেন্দ্র করে তুলছে না। কোনোকিছু নিজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতেও অধীর নয়। চূড়ান্ত ক্ষমতা হয়ে চেপে বসার বাতিকও তার নেই। এই জেন হলো ঈশ্বরবিহীন, উদ্দেশ্যবিহীন ও ক্ষমতাবিহীন, তবে এটা কিন্তু নৈরাশ্যবাদী নয় কোনোভাবে। এই জেন একধরনের খোলা, নির্ভার, নীরব উপস্থিতির পথ দেখায় আমাদের।
হান দেখান, পশ্চিমা দার্শনিকরা শেষপর্যন্ত এমন এক আশ্রয়ের সন্ধান করেন, যা ‘আমি’কে নিরাপদ করবে, ‘বিশ্ব’কে ব্যাখ্যার ভেতর ধরে রাখবে, আর সত্যকে কোনো চূড়ান্ত আধারে স্থির করবে। জেন সেই আশ্রয়ের দিকে অগ্রসর হয় না। এখানে মুক্তি মানে নতুন কোনো ভিত্তিতে উপনীত হওয়া বোঝায় না। এটা বরং ভিত্তি খোঁজার আসক্তি থেকে সরে আসে। সত্য কখনো ব্যাখ্যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। ব্যাখ্যার অভ্যাস এখানে তাই শিথিল হয়ে আসে, যাতে করে সত্য নিজের থেকে উদ্ভাসিত হতে পারে। উদ্ভাসিত এই সত্যের স্বরূপ এমন-যে, এটা কখনো ‘পরম’-এর আসনে বসে শাসনের ছড়ি ঘোরাতে পারে না।
হান এখানে এসে হেগেলের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। পাশ্চাত্য চিন্তা স্বভাবত ‘পরম’কে কেন্দ্র করে তুলতে আগ্রহী। হেগেল বৌদ্ধ-শূন্যতাকে ঈশ্বরের মতো পরম সারবস্তু রূপে বিবেচনা করতে অধীর। হান সেখানে বলছেন : শূন্যতাকে পরম করে তুললে জেন হারিয়ে যায়। জেনের শূন্যতা কোনো নতুন ক্ষমতার উৎস নয়। শূন্যতার Radicality হলো ক্ষমতার আসনটি ফাঁকা রাখা। শূন্যতা ভয় দেখায় না, এটা বরং ভিত্তিহীনতাকে বসবাসযোগ্য করে। মানুষ পরম আশ্রয়ের দাবিতে দখলদারে ভূমিকায় অবতীর্ণ হোক তা এই বৌদ্ধ-শূন্যতা অথবা জেনের লক্ষ্য নয়।
বিয়ং-চুল হানের জেনপাঠে হাইকু কোনো অলংকার নয়, এটা হলো যুক্তির একটা ভঙ্গি। হাইকু সেখানে কোনো তত্ত্ব দাঁড় করায় না, ওটা কেবল উপস্থিতি তুলে ধরে। ‘কেন?’… এই প্রশ্নকে হানের ‘হাইকু’ থামিয়ে দেয়। থামানোর মধ্য দিয়ে আবার মানুষকে তা শূন্যতায় ঝুলিয়ে রেখে আতঙ্কিত করে না। এই ‘হাইকু’ শূন্যতাকে এমনভাবে বাসযোগ্য করে তোলে, যার ফলে ‘আমি’র পরম প্রত্যাশা নমনীয় হয়ে আসে। শিকির হাইকু উক্ত আবহকে উদ্ভাসিত করে যায় :
দেখো সেই মহান বুদ্ধকে—
সে ঘুমোচ্ছে আর ঘুমোচ্ছে
পুরো বসন্তদিন জুড়ে।
—শিকি
‘ঘুম’ এখানে গূঢ় কোনো বার্তা নয়, এটা একধরনের নীরব ঘোষণা বা জেনের পরম ‘ক্ষমতাহীন অবস্থান’ তুলে ধরে। ওটা আর কেন্দ্র হয়ে বিরাজ করছে না। শাসন করছে না কিছু। নিজের মাপে জগৎকে সাজানোর চেষ্টাও করছে না। হান দেখান,—জেন গুরুদের বচন (কৌআন) কোনো ধাঁধা নয়, ওগুলো হলো কেন্দ্র ভাঙার কৌশল। একটি ছোট্ট জেন কাহিনি এখানে ভাবনাটিকে পরিষ্কার তুলে ধরে :
এক ভিক্ষু জিজ্ঞেস করল, ‘বুদ্ধ কে?’
গুরু বললেন, ‘তিন পাউন্ড শণ।’
উত্তরটি কোনো রূপক নয়। ধাঁধা ভাবলে ভুল হবে। বুদ্ধ মানে অতীন্দ্রিয় সত্তা ও সত্য-র মতো কিছু নয়, সেই আভাসটাই বরং এখানে ধরা পড়ছে। এই বুদ্ধ দৃশ্যমান জগতে যা-কিছু আছে তার অনুরূপ। ‘যা-কিছু আছে’টা আবার এমনভাবে ‘আছে’, তাদের পক্ষে কেন্দ্র হওয়ার প্রশ্ন অবান্তর হয়ে ওঠে। জেন মাস্টার ডোগেনের কথাগুলো হেগেলকে নিশ্চয় বিভ্রান্ত করত :
তুমি যখন বুদ্ধ সম্পর্কে কথা বলো, তখন ভাবো বুদ্ধের নিশ্চয় নানা শারীরিক বৈশিষ্ট্য আছে, এবং তাঁর চারপাশে এক উজ্জ্বল আভা রয়েছে। আমি যদি বলি বুদ্ধ হলো ভাঙা টালি আর নুড়িপাথর, তখন তুমি বিস্মিত হয়ে পড়ো!
আর ‘বুদ্ধকে হত্যা করো’… লিনজির এই উগ্র বাক্যটিও ধ্বংসের আহবান নয়। এটা হলো সতর্কতা,—যে-মুহূর্তে তুমি পবিত্রকে বিশেষ অধিকার দিয়ে কেন্দ্রে বসাও, সেই মুহূর্তে আধিপত্য জন্ম নেয় ও কেন্দ্র তৈরি হয়। জেন সেই কেন্দ্রকে শূন্য রাখতে চায়।

এই শূন্যকেন্দ্র জেনকে চরমভাবে অন্তর্লৌকিক করে তোলে, যেখানে জেন অন্য কোনো ‘ওখানে’র প্রতিশ্রুতি কাউকে দেয় না। জেন কেবল এখানকার জীবনের ভেতরে অন্যভাবে থাকার পথটা বলে দিতে থাকে। ‘দৈনন্দিন মন’ যে-কারণে ‘জাগরণের ভূমি’। ক্ষুধা লাগলে খাওয়া, ঘুম এলে ঘুমানো… এগুলো নীতিবাক্য মাত্র নয়, এগুলো হলো প্রশিক্ষণ, যেন ‘আমি’ তার নিজেকে বিশেষ কেন্দ্র করে তুলতে না পারে।
দেকার্ত ‘সন্দেহ’কে ‘আমি’ ও ‘ঈশ্বর’-এ গ্রন্থিবদ্ধ করতে মরিয়া থেকেছেন। জেন সেরকম কিছু নয়। সন্দেহকে ওটা আরও গভীরে ঠেলে দেয়, যেখানে সন্দেহের ভেতরে থাকা ‘আমি’ আলগা হতে থাকে। লাইবনিজের ‘কেন কিছু আছে, কিছু না থাকার পরিবর্তে’… এই প্রশ্নকে জেন তাই স্থগিত করে। কারণ, ‘কেন কিছু আছে, কিছু না থাকার পরিবর্তে’… এরকম প্রশ্ন তোলার মানে হলো ভিত্তির খোঁজ করা ও সারবস্তুর ধারণায় উপনীত হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকা। কার্যকারণ খোঁজা ও শেষপর্যন্ত ক্ষমতা ও ঈশ্বরকে খুঁজে বের করা বা সেরকম কোনো ধারণায় অটল হতে মানুষ সেখানে মরিয়া হয়। এর ফলে জীবনের চারপাশে বিদ্যমান বাকি সবকিছু গৌণ হয়ে পড়ে।
এরকম অন্বেষণকে জেন বাতিল করে দিচ্ছে। বিয়ং-চুল হান দেখাচ্ছেন,—চূড়ান্ত উত্তর বা মীমাংসা এর লক্ষ্য নয়। জেনের লক্ষ্য হলো ‘কেন’ এই প্রশ্নকে থামিয়ে দেওয়া। জেন যে-কারণে কোনো আশ্রয় দেয় না, ওটা বরং ভিত্তিহীনতাকে বাসযোগ্য করে এমনভাবে, জীবনের সারসত্য যেখানে কারো দখলের বস্তু নয়। ‘কেউ নেই’ বাক্যটি হানের কাছে সম্পূর্ণরূপে এক সত্তাগত দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে ধরা দেয়। এমন এক থাকা তা বোঝায়, যেখানে ‘আমি’ তার নিজের ভারে, নিজ ইচ্ছায় ও নিজের প্রকল্পে জগৎকে দখল করতে মরিয়া হয় না। পথ আছে, গোধূলি আছে, শরৎ আছে, তবে পথের ওপর কারো মালিকানা নেই। ‘কেউ নেই’ কথাটি অনেকসময় ভুল বোঝাবুঝির জন্ম দিয়ে থাকে। হান কিন্তু এখানে ব্যক্তিকে মুছে ফেলার কথা বলছেন না, তিনি কেবল দখলদার ‘আমি’কে নিজের থেকে আলগা করার কথাটি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন।
পাশ্চাত্য ‘আমি’ অনেকসময় ভেতরে ভেতরে আয়ত্তে আনার আকাঙ্ক্ষা বহন করে চলে, যার ফলে দেখা, জানা, ভালোবাসার মতো বিষগুলো দখলের দিকে ঝুঁকে থাকে। জেন তার বিপরীতে এমন এক ‘দেখা’র কথা বলছে, যেখানে দৃষ্টি কোনো মালিকানা নয়, ওটা বরং আতিথ্যশূন্য দর্পণের মতো;—কোনোকিছুকে আঁকড়ে ধরে থাকার চেয়ে সবকিছুকে নিজের মধ্যে জায়গা দিতে সে স্বচ্ছন্দ। ডোগেনের ‘নীল পর্বত হাঁটে’ উক্তিটি এখানে এসে নতুন অর্থ পায়;—জগৎকে স্থির বস্তু রূপে নয়, বরং প্রবহমান উপস্থিতি হিসেবে দেখার সত্যকে তা ভাসিয়ে তোলে। কেন্দ্র করে তোলার অভ্যাস ঢিলে হলে হাঁটা কেবল মানুষের নয়, জগতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয়ে ওঠে। দেখাটা তখন দখলের পরিবর্তে আতিথ্যে মোড় নিয়ে নেয়। ইসা-র হাইকু সেই আতিথ্যকে দৃশ্যমান করছে :
একজন মানুষ,
একটি মাছি,
একটি বড়ো ঘরে
—ইসা’র হাইকু
মানুষের মুকুট খুলে গেলে জগৎ আর নৈতিক বিধানে অটল থাকে না। নিজস্ব দৃশ্যে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আর, এখানেই জেনের আরেকটি ধারালো দিক প্রকাশ পায় : পবিত্র/অপবিত্র, উচ্চ/নিম্ন ইত্যাদি বিভাজন গলে যায়। জেন জগৎকে ‘শুদ্ধ’ হতে বাধ্য করে না; সে শুধু বলে,—কেন্দ্র বানিয়ে তুমি-যে ঝাড়াই-বাছাই চালাচ্ছো, ওটা আধিপত্যের ভাষাকে নগ্ন করছে। বাশোর হাইকুতে নির্মোহ সত্যটি আমরা ফুটে উঠতে দেখি :
পিসু, উকুন,
আমার বালিশের কাছে
একটি ঘোড়ার প্রস্রাব
— বাশোর হাইকু
এখানে কোনো ‘উচ্চতা’র আয়োজন নেই, কিন্তু এই ‘আয়োজন না থাকাটাই’ হলো জেনের শান্তি। কেননা, শান্তি সেখানে সাজানো নৈতিকতা নয়। শান্তি হলো কেন্দ্রহীন এক উপস্থিতির মাঝে বিরাজিত থাকা।

কেন্দ্রহীনতা এভাবে বিয়ং-চুল হানকে নন্দনতত্ত্বে নিয়ে যায়। জেনশিল্প ‘নিজেকে প্রকাশ’ নয়, আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে সরে এসে জগৎকে নিজের মতো করে ভিতরে আসতে দিতে তৈরি থাকে। অনির্দিষ্ট রেখা, নো থিয়েটারের মুখোশ, হাইকুর উন্মুক্ততা… সর্বত্র একই ব্যাকরণ কাজ করে। এগুলোর কোনোটাই নিজেকে কারো ওপর চাপিয়ে দেয় না। উপস্থিতি সবকিছু দখল নিতে মরিয়া না হওয়ার কারণে শ্বাস নেওয়ার অবকাশ বজায় থাকে। হান একে অহিংসতার সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন;—কেননা যেখানে কোনো কেন্দ্র নেই, সেখানে ক্ষমতা সহজে জমাট বাঁধতে পারে না;—জমাট বাঁধতে হলে আগে ‘কেন্দ্র’ থাকা চাই।
উক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে হানের পরের বইগুলোকে পড়া সহজ হয়ে ওঠে। নিওলিবারাল সমাজে মানুষ নিজেকে শোষণ করে, কারণ নিজেকে সে প্রকল্প রূপে ভাবতে শেখে! সে হলো একটা সারবস্তু;—পারফরম্যান্স অথবা ইমেজ! জেন এখানে তাকে বিপরীত শিক্ষাটাই দেয়,—নিজেকে ‘কিছু’ একটা ভাবার কারণে সমস্যা জন্ম নেয়। ‘আমি’কে সারবস্তু করে তোলায় ক্লান্তি ও সহিংসতা শক্তিমান হয়ে ওঠে।
আর, যে-অতিরিক্ত ইতিবাচকতার সমালোচনা পরে হানের ভাবনায় ফেরত আসবে, অর্থাৎ সবকিছুকে জোর করে উজ্জ্বল, স্বচ্ছ, ইতিবাচক দেখানোর চাপ,—এর দার্শনিক ভিত্তি জেন থেকে তিনি শুষে নিয়েছিলেন। সত্যকে জোর করে জাহির করা যায় না;—যা বলা হয়নি, সেই নীরবতা বরং অনেকসময় সত্যের হয়ে অধিক কথা বলে। এটা হলো জেনের মূল শিক্ষা।
এই জেনপাঠের ভেতর দিয়ে হাঁটা ও ‘ঘর’ বিষয়ক ধারণা হানের কাছে নতুন অর্থ পায়। হাঁটা কোনো লক্ষ্যসিদ্ধির জন্য নয়। হাঁটতে থাকার মধ্যে পৌঁছানোর ঘটনাটি ঘটে যায়। যেহেতু, ভবিষ্যৎ নির্ভর প্রতিশ্রুতি কমে গেলে বর্তমান নিজে ঘন হয়। আর, ‘ঘর’ মানে শুধু ছাদ নয়; ঘর মানে নিরাপত্তার কাঠামো, মালিকানার কাঠামো, নিশ্চয়তার কাঠামো। এসব কাঠামো ‘আমি’কে শক্তিশালী করে। ‘কোথাও বাস না করা’ মানে পৃথিবী ত্যাগ করা নয়, বরং পৃথিবীতে এমনভাবে থাকা, যেন জীবন কোনোকিছুর ওপর ‘দখল কায়েম করার প্রকল্প’ না হয়ে সহাবস্থানের ছন্দ হতে পারে। যা-কিছু আসে-যায়, তাকে দখলে নেওয়ার পরিবর্তে জায়গা দেওয়াটা যেখানে মূল লক্ষ্য।
মৃত্যুর প্রশ্নেও হানের যুক্তি তীক্ষ্ণ,—পাশ্চাত্য দর্শন প্রায়ই মৃত্যুকে ‘আমার ব্যক্তিগত নাটক’ বানিয়ে ‘আমি’কে আরও দৃঢ় করে তোলে। জেন ব্যাখ্যা দেয় না, কেবল সম্পর্ক বদলায়। ‘মহামৃত্যু’ মানে শরীরের শেষ নয়, ‘আমার মৃত্যু’কে আঁকড়ে ধরা মানে ‘আমি’র পতন। ‘আমি’ আলগা হলে অনিত্যতার সঙ্গে শান্ত সহবাস সম্ভব হয়; কারণ, গ্রহণ করার মতো কঠিন কেন্দ্র আর সেখানে থাকে না। এমনকি বন্ধুত্বও কোনো নৈতিক পদক নয়। এটা ঘটে, যখন ‘আমি’ আর ‘অন্য’র কঠিন দাগ নরম হয়, যখন ‘থাকাটুকুতে’ কৃতিত্বের কেন্দ্র থাকে না। বুদ্ধ ফুল তুলে ধরেন, কাশ্যপ হাসেন;—এই হাসি ব্যাখ্যা নয়, এটা হলো কেন্দ্রহীনতার ভাষা। বন্ধুত্ব এখানে একধরনের অহিংস সহাবস্থান। কাউকে দখল না করে তার পাশে থাকা। কাউকে ‘আমার অর্থ’ দিয়ে আটকে না রেখে মুক্ত করে দেওয়া। এখানে ‘বি-ইয়ান-লু’র কৌআনটি খুবই প্রতীকী :
‘তোমার নাম কী?’
উত্তর : ‘হুই-জি’|
‘কিন্তু আমি তো হুই-জি!’
তখন সে বলে, ‘তাহলে আমার নাম হুই-রান।’
এই নামবদল বা নিজের নাম অন্যকে দান করা… বিয়ং-চুল হান একে ‘নিজেকে সরিয়ে দেওয়া’ হিসেবে ভাবেন। মানুষ নিজেকে একটু ঠেলে দেয় সেই জায়গায়, যেখানে ‘আমি’ আর ‘অন্য’ বলে কোনো দাগ টানা নেই। নীরব, মালিকানাহীন উপস্থিতি হলো হানের কাছে বন্ধুত্বের প্রকৃত ভাষা। বাশোর হাইকু এই খোলা দৃষ্টিকে ধারণ করছে এখানে :
গভীর শরৎ—
আমার প্রতিবেশী,
সে কেমন করে বাঁচে, ভাবি।
এটা সহানুভূতি জাহির করা নয়। এটা হলো এমন এক সম্পর্ককে ধরে রাখা, যেখানে অন্যকে দখল করা বা ব্যাখ্যার ভার নেই, তবু সম্পর্ক বজায় থাকছে। জেনের স্বর তাই একটাই,—পালিয়ে বাঁচা যায় না, কেন্দ্র তৈরির অভ্যাসের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিরোধ কেবল মানুষকে সুস্থির রাখে জগতে।
আধুনিকতা আমাদের শিখিয়েছে নিজেকে সারবস্তু বানাও, প্রকল্প বানাও, নিজেকে উজ্জ্বল করো, স্বচ্ছ করো, ফল দাও ইত্যাদি;—আর এই কেন্দ্র নির্মাণের বাসনা থেকে ক্লান্তি, আত্মশোষণ, মনোজাগতিক ক্ষমতা ও সম্পর্কের শুষ্কতারা জন্ম নেয়। জেন এসবের বিপরীতে নতুন ‘সত্য’ তুলে ধরে তা নয়। জেন শুধু দেখায় এক ভিন্ন ব্যাকরণ,—কেন্দ্র শূন্য রাখা, ভিত্তিহীনতাকে বাসযোগ্য করা, দৈনন্দিনে ফেরত যাওয়া, আর নীরবতার ফাঁকে এমনভাবে থাকা, যেখানে সত্য কোনো দূরবর্তী পরম কিছুতে নয়, বরং চারপাশ ও সেখানকার সবকিছুর মাঝে নিহিত;—যেখানে কোনো দাবি ও দখল নেই। বাশোর হাইকু জেনপাঠের এই নৈতিক ফলাফলকে দৃশ্যমান করে :
একই ঘরে
পতিতারাও ঘুমিয়েছিল :
ঝোপঝাড় আর চাঁদ
—বাশোর হাইকু
. . .
লেখক পরিচিতি : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন
. . .

অবদায়ক : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ : থার্ড লেন স্পেস.কম
… বিয়ং-চুল হানের ওপর অন্যান্য রচনা পাঠের জন্য এখানে চাপুন …
মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ-এর অন্যান রচনা ও
প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন



