কবিতা সিরিজ : ভাঙা সময়ের কবিতা-৩
রচনা : ফজলুররহমান বাবুল

২৬.
নদীর জলে মুখ দেখা যায় না আজ,
শুধু ভেসে ওঠে ভাঙা সময়।
আমরা হাত ছুঁই—
তরঙ্গগুলো পিছিয়ে যায় ধীরে।
২৭.
কেউ-একজন দরজায় কড়া নাড়ে,
খুলে দেখি দাঁড়িয়ে আছে নীরবতা।
আমরা কিছু বলতে যাই—
শব্দগুলো ফিরে যায় ভিতরের দিকে।
২৮.
কখনও সব আলো জ্বলে ওঠে একসঙ্গে,
তবু রাস্তাগুলো অন্ধকার থেকে যায়।
আমরা হাঁটতে থাকি—
ছায়ারাই পথ দেখায় সামনে।
২৯.
দেয়ালের ওপাশ থেকে
ভেসে আসে সমুদ্রের শব্দ,
কিন্তু কোথাও জল নেই—
ঢেউ ভাঙে মাথার ভিতর।
৩০.
হঠাৎ আকাশ নিচু হয়ে আসে,
মেঘেরা হাঁটে জানালার সমান।
আমরা মাথা তুলে থাকি—
চোখের ভিতরে জমে ওঠে দূরত্ব।

৩১.
কুরুক্ষেত্র শেষ হয়ে গেছে বহু আগে,
তবু রাতের ভিতর রথের চাকা ঘোরে।
অন্ধ রাজারা হাতড়ে ফেরে সিংহাসন—
আমরা কুড়িয়ে নিই ভাঙা মুকুট,
ইতিহাসের ভিতর রক্ত তখনও গরম।
৩২.
আহা, বেহুলা আজও ভাসে মৃত নদীতে,
লখিন্দরের শরীরে জমে ওঠে শেওলা।
স্বর্গের উঠানে আজ কেউ নামে না আর—
তবু কে বইঠা চালায় সময়ের বিপরীতে?
৩৩.
ট্রয়ের কাঠের ঘোড়াটি পুড়েছে বহু আগে,
শহরগুলো তবু দরজা খুলে দেয় বিশ্বাসে।
রাতের ভিতর সৈন্যেরা নামে নিঃশব্দে—
ঘুম ভাঙলে দেখি নিজেদের ঘরেই আগুন।
৩৪.
শাহজাহান আজও তাকায় যমুনার দিকে,
পাথরের বুকে আটকে থাকে দীর্ঘশ্বাস।
মমতাজ কি এখন শুধু ইতিহাস,
নাকি এক সাম্রাজ্যের ক্লান্ত হৃদয়—
যেখানে প্রেম শেষপর্যন্ত সমাধি হয়?
৩৫.
রূপকথার রাজকন্যা ঘুমিয়ে নেই আর,
শতবর্ষ পেরিয়ে তার চোখে জমেছে ধুলো।
যে-রাজপুত্রেরা এসেছিল জাদুর ঘোড়ায়—
তারাও পথ ভুলে গেছে বহু আগে।
দুর্গের ভিতরে আজ শুধু বাদুড়েরা ওড়ে।

৩৬.
দেখছি—মহাপ্লাবনের জল নেমে গেছে,
নুহের নৌকা আটকে আছে পাহাড়ের স্মৃতিতে।
তবু মানুষ এখনও কাঠ জোগাড় করে—
কারণ প্রতিটি যুগই ভাবে শেষ বৃষ্টি এখনও বাকি।
৩৭.
মিনোটরের গোলকধাঁধা ভেঙে পড়েছে কবে,
তবু শহরগুলো আজও পথ হারায়।
আমরা ভাঙা সময়ে সুতো ধরে এগোতে চাই—
দেখি সুতোটাই জড়িয়ে গেছে গলায়।
৩৮.
ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান শুকিয়ে গেছে,
কিন্তু শূন্যে এখনও দুলে ওঠে পাতা।
রাজারা মৃত, সাম্রাজ্য ধুলো—
তবু মানুষের মধ্যে উঁচু হয়ে ওঠার ক্ষুধা বেঁচে থাকে।
৩৯.
রবীন্দ্রনাথের নৌকা ভিড়ে না আর সেই ঘাটে,
জীবনানন্দ হাঁটেন কুয়াশার ভিতরে।
আমরা ইতিহাসের পাতা উল্টাই—
শব্দগুলো ঝরে পড়ে শুকনো পাতার মতো।
৪০.
শেষ রাজ্যের পতাকা নেমে গেলে
দুর্গগুলো হঠাৎ খুব নিঃশব্দ হয়ে যায়।
আমরা ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে দেখি—
সময় আসলে কোনও সাম্রাজ্যের নয়,
সে কেবল ধীরে ধীরে ভাঙতে জানে।
. . .
লেখক পরিচয় : ফজলুররহমান বাবুল : উপরের ছবি অথবা এখানে চাপুন
. . .

অবদায়ক ফজলুররহমান বাবুল : থার্ড লেন স্পেস
ফজলুররহমান বাবুল-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন



