
আধুনিক সভ্যতা আমাদেরকে একটাই কথা শেখায় : কাজ করো, ফল দাও, নিজেকে প্রমাণ করো;—আরও দ্রুত হও। বিয়ং-চুল হান-এর Vita Contemplativa (২০২২) এই মন্ত্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে থামতে বলে। বইটি আমাদের বলে,—মানুষ কেবল কাজের প্রাণী নয়। মানুষ মানুষ হয়, যখন কাজে বিরতি নিতে জানে। লক্ষ্য-দক্ষতা-পারফরম্যান্সের জাল থেকে সরে এসে কেবল থাকতে পারে, দেখতে পারে, শুনতে পারে ও অপেক্ষা করতে পারে।
হান এর থেকে যা উদ্ধার করতে চান তার নাম হলো ধ্যানমগ্ন জীবন বা Vita Contemplativa. সন্ন্যাসবাদে পলায়ন নয় এটা। অলসতার অজুহাতও নয়। এটা একটা শক্তি;—‘না’ বলাটাকে এমন এক ‘নৈতিক’ ভঙ্গি করে তোলা, যা কর্মকে মানবিক করে, সত্যকে ঘটতে দেয়, সংস্কৃতির জন্ম দিয়ে থাকে, আর পৃথিবীকে নিছক অপটিমাইজেশনের হাত থেকে বাঁচানোর শর্ত জন্ম দেয়।
বিয়ং-চুল হান প্রথমেই ‘অবসর’কে উল্টে দেন। পুঁজিবাদ অবসরকে ধ্বংস করে না;—অবসরকে সে কাজে লাগায়। অবসর হয়ে দাঁড়ায় কাজের প্রস্তুতি;—রিফ্রেশ, রিচার্জ ইত্যাদি। আরও বেশি উৎপাদন করা যেন সম্ভব হয় মানুষের পক্ষে। ফ্রি-টাইম আর মুক্ত সময় নয়, ওটা কাজেরই ছায়া। আমরা সেই ছায়া ভরাট করি স্ক্রল, ভোগ ও উত্তেজনা দিয়ে। ব্যস্ততা অবসিত হয় না, তা কেবল রূপ বদল করে সেখানে। বিশ্রাম আর নেওয়া হয় না, আরেক ধরনের তাড়াহুড়াকে তা অনিবার্য করে। আরামকে উৎপাদনের অংশ বানিয়ে ফেলাটা হলো আধুনিক কৌশল। হানের দাবি এখানে পরিষ্কার,—জীবনের আসল তীব্রতা সেই মুহূর্তে আসে, যা কিছু উৎপাদন করে না, এবং জীবন কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া যেখানে দীপ্ত হয়।
একটি নীরব সত্য সামনে আনেন এই ভাবুক,—নিষ্ক্রিয়তা ছাড়া কাজ কখনো মানবিক হয়ে ওঠে না। ‘থামা’, ‘দ্বিধা’, ‘নীরবতা’… এসবকে আধুনিক যুগে মানুষ দুর্বলতা বলে ভাবে, সময়ের অপচয় মনে করে। যদিও জীবনে ‘থামা’র প্রয়োজন রয়েছে। ওটা না থাকলে কাজ অন্ধ হয়ে যায়। নীরবতা না থাকলে সংগীত থাকে না;—একরাশ শব্দ থাকে শুধু! খেলা না থাকলে জীবনে প্রয়োজন, আর লক্ষ্য ও আদেশের সংকীর্ণতা নেমে আসে। আমরা তখন ‘বেঁচে থাকি’ না, এর পরিবর্তে টিকে থাকার হিসাব কষতে থাকি অবিরত। সত্যিকারের জীবন শুরু হয়, যখন টিকে থাকার তাড়না কিছুক্ষণের জন্য বিরতি নেয়, যখন জীবন নিজের দিকে ফিরে তাকায় ও ফেরত আসতে মরিয়া হয়। ‘থামতে জানা’টা যে-কারণে বিলাসিতা নয়;—এটা হলো মানুষের বেঁচে থাকার পূর্বশর্ত।
হান ইতিহাস আর সংস্কৃতির পার্থক্য টেনেছেন এখানে। কর্মের ইতিহাস তৈরি করে অগ্রগতি, কৃতিত্ব, নতুনত্ব, সংঘর্ষ, উৎপাদনের ধারাবাহিকতা, কিন্তু সংস্কৃতি জন্ম নেয় উৎসব ও অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত থেকে। ভোজ, নৃত্য, অলঙ্কার, আচার, ক্রীড়া ইত্যাদি মানুষের জীবনে ব্যবহারিক লক্ষ্য পূরণ করে না;—এগুলো তার জীবনকে নান্দনিক করে তোলে। সভ্যতা যখন উৎসব করতে ভুলে যায়, তখনো সে কার্যকর থাকে ঠিকই, কিন্তু নান্দনিক ও মানবিক হওয়ার শক্তি হারায়।
উৎসব সভ্যতায় নেই তা নয়। ভলোভাবেই উৎসবের উপস্থিতি আজো রয়েছে সর্বত্র, তবে সকল উৎসবকে পণ্যে রূপান্তরিত করা হয়েছে। ‘কমিউনিটি’ স্বয়ং পণ্যায়িত উৎসবের অংশ সেখানে। প্রকৃত ‘আমরা’ হয়ে ওঠার যে-উৎসব, তা হারিয়ে গেছে মানুষের জীবন থেকে। কেননা, ডিজিটাল যোগাযোগে রূপান্তরিত উৎসবে শব্দ থাকলেও শ্রবণ নেই; কোনো উপস্থিতি নেই;—কেবল সংযোগ ও সামাজিকতার আনুষ্ঠানিক প্রয়োজন ছাড়া কিছু অনুভব করে না মানুষ!
হান মনে করেন, শোনা বা শ্রবণ করার ক্ষমতাটি স্বয়ং ধ্যানের সমতুল্য। শ্রবণ করা মানে কাজ করা নয়। কিছু শোনার মুহূর্তে আমাদের ভিতরের ‘অহংসর্বস্ব আমি’টা নরম হয়ে আসে। নিজের কেন্দ্র থেকে অমিত্বের রোগ দূরে সরে দাঁড়ায়। যোগাযোগের উন্মাদনায় এই নরম হতে থাকা ‘আমি’ হারিয়ে যেতে বসেছে। আমরা কথা বলছি বেশি, শুনছি কম। সত্য-উপলব্ধি যে-কারণে অতি অল্প জন্ম নিচ্ছে এখন।
বিয়ং-চুল হান যে-কারণে ‘নিষ্ক্রিয়তা’র পাশে ‘বিলাস’ শব্দটি বসাচ্ছেন। এটা ভোগবাদী ‘বিলাস’ নয়। তাঁর ‘বিলাস’ হলো প্রয়োজনের কঠিন শাসন থেকে সাময়িক মুক্তি নেওয়া। ধীরে হাঁটা… উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ানো… কোথাও পৌঁছানোর তাড়না ছাড়া শহরের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া… এসব এক অদ্ভুত স্বাধীনতার সুখ ও তৃপ্তি বয়ে আনে মনে। ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের flâneur-কে এখানে গুরুত্বপূর্ণ করেছেন হান। কোনো গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য সে হাঁটে না। কোনোকিছু দখলে নেওয়ার তাড়না থেকে চারপাশটা দেখে না। সময় সে ‘খরচ’ করে না, বরং তাকে তার ভিতরে ‘থাকতে’ দেয়। জীবন কোনো ‘প্রকল্প’ নয়;—ওটা কেবল ‘ঘটে’ চলে’। ‘ঘটে’ শব্দটির ভেতরে হান সত্যকে ছেকে তুলছেন। তাঁর মতে, ‘সত্য তৈরি করা যায় না, তা ঘটে চলে।’

‘ঘটে চলা’ বা ‘ঘটতে দেওয়া’র এই নৈতিকতা বোঝাতে ঝুয়াংজির রাঁধুনি গল্পটি তিনি আমাদেরকে শোনাচ্ছেন। নিজেকে যে-রাঁধুনি ‘নিষ্ক্রিয়তার গুরু’ বলে প্রমাণ করেছিল ‘কিছু না-করা’ অনুশীলনের মধ্য দিয়ে। সে এমনভাবে গরু জবাই করে, যেন ছুরিটি গরুর শরীরের ভেতরে আগে থেকে বিদ্যমান ফাঁক-ফোকর দিয়ে সহজ স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারে। একজন ভালো রাঁধুনি, তার মতে,—খুব কমই ছুরি বদলায়; কারণ, মাংস কাটতে ছুরি কীভাবে চালাতে হয় তা তার জানা। অদক্ষ রাঁধুনির সঙ্গে এখানে সে ভিন্ন। অদক্ষ রাঁধুনি ঘনঘন ছুরি পালটায় ও সমস্ত শক্তি দিয়ে মাংস কাটে।
ঝুয়াংজির রাঁধুনি সামান্য বলপ্রয়োগ ছাড়াও গরু জবাই করে;—‘আমি সাবধানে নিজেকে সংযত রাখি। দেখি কোথায় থামতে হবে, তারপর ধীরে ধীরে ছুরি চালাই। যেন অদৃশ্য কিছু, ছুরিটি এরকম নাড়াতে থাকি, আর পশুটি হঠাৎ মাটির ঢেলার মতো চামড়া থেকে আলগা হয়ে যায়।’ ঝুয়াংজির রাঁধুনির এই ছুরি চালানোর দক্ষতা কোনো শক্তি বা বলপ্রয়োগের বিষয় নয় সেখানে; ওটা হলো পশু জবাই, তার ছাল ছাড়িয়ে নেওয়া ও মাংস কাটার ঘটনায় সক্রিয় সংযম ও নমনীয়তার প্রকাশ। দক্ষতা ও সাফল্য এখানে পশুর ওপর নিজের দখল নেয় না। তা কেবল ‘ঘটতে দেওয়া’য় রূপান্তরিত হয়। রাঁধুনি কর্তা হয়ে ওঠে না, ‘ঘটনা’র সঙ্গী হয়ে তার ভূমিকা পালন করে। তার কাজটি এখানে বাধ্যবাধকতা নয়, তা কেবল আপনা থেকে ‘হয়ে যায়’ বা ‘ঘটে চলে’।
প্রাকৃতিক কৃষির পথিকৃৎ মাসানোবু ফুকুওকা ঝুয়াংজির এই নিষ্ক্রিয়তার শিক্ষাকে তাঁর কৃষিচর্চায় কঠোরভাবে প্রয়োগ করেছিলেন। তিনি একে ‘অতিরিক্ত কিছু না-করা কৃষি’ নামে ডেকেছেন। ফুকুওকা নিশ্চিত-যে, আধুনিক কৃষি পদ্ধতিগুলো প্রকৃতির কোমল বিধানকে ধ্বংস করছে। এগুলো সমাধান দেয় এমন সমস্যার… যেগুলো আবার তারা নিজে ডেকে এনেছিল।
ফুকুওকার ‘অতিরিক্ত কিছু না-করা কৃষি’র ধারণা হানের যুক্তিকে আরও জোরালো করে তোলে। আধুনিক কৃষি মনে করে আরও সার, আরও কীটনাশক, আরও যন্ত্র, আরও নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি আরোপ করা গেলে উৎপাদন বাড়বে, চাহিদা মিটবে, ফলাফল জুটবে, আর মানবজাতি হবে উপকৃত। ফুকুওকা দেখান,—প্রকৃতি নিজেই মাটিকে ‘চাষ’ করতে জানে। শিকড়ের কাজ, অণুজীবের কাজ, কেঁচোর কাজ ও যথাযথ সময় দিলে মাটি নিজ থেকে ফসল ফলায়। মানুষ যত বেশি তার ওপর খবরদারি ও হস্তক্ষেপ করে, ভারসাম্যে তৈরি হয় গভীর ক্ষত। ক্ষত সাারানোর জন্য তখন আরও বেশি হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।
ফুকুওকার ইশারা পরিষ্কার,—ভালো কৃষক প্রকৃতির ওপর মাতব্বরি করে না। কবে কখন কতটা ও তা কীভাবে করতে হবে এই জ্ঞান প্রকৃতির থেকে সে জেনে নেয়। এর ফলে কোথায় থামতে হবে এই বিষয়ে তাকে বলে দিতে হয় না। ‘থামা’র ভেতরে নিহিত থাকে দীর্ঘস্থায়ী উর্বরতা;—কম সহিংসতা ও কম অহংকার। প্রকৃতির সঙ্গে কৃষকের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। মানুষ এখানে কোনো মালিক নয়, সে হলো প্রকৃতির বুকে সঙ্গী। ‘অতিরিক্ত কিছু না-করা’টা কৃষকের নিষ্ক্রিয়তাও নয়, এটা হলো অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ থেকে নিজেকে বিরত রাখা, যেন মাটির বুকে উদ্ভিদপ্রাণ নিজ নিয়মে অঙ্কুরিত ও জীবিত থাকতে পারে।
বিয়ং-চুল হানের যুক্তি এখানে এসে আরও গভীর হয়। ‘ঘটতে দেওয়া’টা কৃষিকৌশল মাত্র নয়, এটা হলো আধুনিক পথ-পন্থা মেনে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ ও শাসনের বিপরীত প্রান্তে দাঁড়ানোর দৃষ্টিভঙ্গি। হাইডেগারের Gelassenheit; অর্থাৎ নির্ভারভাবে ‘ছেড়ে দেওয়া’টা এখানে পৌঁছে অর্থ খুঁজে পায়। পৃথিবীকে রক্ষা করা মানে হচ্ছে তাকে তার সম্ভাবনার স্বাভাবিক বৃত্তে স্থির থাকতে দেওয়া। তাকে উপযোগ সরবরাহের সামগ্রী করা নয়। অসম্ভবের ভার তার ওপর চাপানোও নয়। ঝুয়াংজি-ফুকুওকা-হাইডেগার… তিনজনের সুর সেখানে অভিন্ন। সত্যিকার দক্ষতা জোর করে ‘কিছু করতে বলে না’;—ফাঁক চিনে নেওয়া, সংযম ও জিনিসকে তার নিজ পন্থায় ঘটতে দেওয়ার মধ্যে তৈরি হয় সম্ভাবনা।
এই দৃষ্টিতে ‘প্রগতি’ নতুন অর্থ লাভ করে। আমরা যাকে প্রগতি বলছি, তা অনেকসময় থামতে না-পারার আরেক নাম হয়ে ওঠে। বেঞ্জামিনের ‘ইতিহাসের ফেরেশতা’ তখন অতীতের দিকে তাকিয়ে দেখে ধ্বংসস্তূপ, আর ভবিষ্যৎ থেকে আসা ঝড় তাকে টেনে নিচ্ছে; যে-ঝড়ের নাম আমরা রেখেছি ‘প্রগতি’। কর্মঝড় যখন জীবনকে গ্রাস করে, এর থেকে মুক্তি মানে কিন্তু ‘আরও কাজ’ করা নয়। মুক্তি মানে হলো ‘বিরতি’;—একটি ছেদ, যার মধ্যে মানুষ আবার ‘মনন’ করতে পারবে। হাইডেগারের Besinnung বা ‘মনন’ সামনে আগানো বোঝায় না, বরং সেই স্থানে ফিরে আসা বোঝায়, যেখানে আমরা সকল কাজ শুরু হওয়ার আগে উপস্থিত ছিলাম। ‘মনন’ হলো শোনা, আক্রান্ত হওয়া ও প্রশ্নের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়া। সত্যকে তৈরি করা যায় না, সত্যটা ‘ঘটে’!—এই অভিজ্ঞতার জন্য দরকার ধৈর্য, নীরবতা ও অপেক্ষা।
ডিজিটাল আধুনিকতা এই অনধিগম্যতাকে মুছে দেয়। সবকিছু দ্রুত, প্রাপ্য, গণনাযোগ্য করে তোলা হয় এখানে। তথ্যের শাসন বলে,—সব জানো, সব ব্যবহার করো। কিন্তু হান জোর দিয়ে বলছেন,—সত্তা কোনো তথ্য নয়। সত্তা হচ্ছে পরিসর;—মানুষ এখানে শ্বাস নেয়। ‘মনন’ হারালে সে নিছক একটা ‘কাজের প্রাণী’ বা শ্রমযন্ত্রে রূপান্তরিত হয়। সংকট তখন কেবল মানসিক থাকে না, এটা রাজনৈতিক হয়ে পড়ে। মানুষকে এমনভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে, যেন সে শুধু উৎপাদন করে যাবে, কিন্তু ‘বেঁচে থাকবে’ না।

বিয়ং-চুল হান ‘সত্তার অভাব’ বা আরও স্পষ্ট করে বললে খরা কিংবা বন্ধ্যাত্বকে সামনে নিয়ে এসেছেন। আমরা ডেটা জমাই অথচ সংস্কৃতি তৈরি করি না। অসংখ্য ‘এখন’ জড়ো করি, কিন্তু জীবনকে বয়ানে গেঁথে নিতেপারি না, মানুষ যদিও মূলত আখ্যান-নির্মাতা প্রাণী! অর্থ, দিশা, প্রতিশ্রুতি, ‘চিরদিনের জন্য’… এসব বয়ান থেকে আসে। প্রতীকও তাই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতীক আমাদেরকে একই পরিসরে ফিরিয়ে আনে, আমাদেরকে ‘আমরা’ ভাবতে সাহায্য করে। সহ-অনুভবের ক্ষেত্রটি তৈরি হয়।
প্রতীক শুকিয়ে গেলে সমাজ বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিতে ভেঙে পড়ে, আর এই অভাব ঢাকার জন্য আমরা উৎপাদন বাড়াই, সংযোগ বাড়াই, অপটিমাইজেশন বাড়াই,—এগুলো আমাদের টিকে থাকার মেয়াদ বৃদ্ধি করলেও সত্তাকে খুন করে ফেলে! আমরা যত বেশি সংযুক্ত হই, তত বেশি একা হয়ে পড়ি, কারণ ধীরে ধীরে ‘তুমি’ আর মানুষ থাকে না, সে হয়ে ওঠে ব্যবহারযোগ্য উপস্থিতি;—সম্পর্ক কেবল প্রাপ্য আর বিনিময়ের হিসাব-নিকাশে পতিত হয়। ‘ইরোস’ বা অপরের দিকে যে-আকর্ষণ ও উন্মুক্ততা, তা কমে গেলে উদ্বেগ বাড়ে। জীবন তখন নিজের ভেতরে জট পাকিয়ে বসে!
এই জায়গায় সাব্বাথ ও উৎসব হানের কাছে অন্য ছন্দের ইঙ্গিত হয়ে ধরা দিয়েছে। সাব্বাথ তাঁর ভাষায় ‘সময়ের মধ্যে এক প্রাসাদ’;—এটা এমন এক বিরামের কথা বলে, যেখানে সময় আর কেবল ক্ষয়ের রেখা নয়, ওটা ‘থামে’ ও ‘ঘনীভূত’ হতে থাকে, এবং এভাবে ‘বাসযোগ্য’ হয়ে ওঠে।
আর উৎসব? উৎসব সেই সময়, যা কেবল বয়ে যায় না, এটা ‘থাকে’। তার কোনো লক্ষ্য নেই, কোনো ফলের হিসাব-নিাকশ নেই, সে নিজে তার কারণ। কাজ-উন্মত্ত সভ্যতা উৎসবের এই উদ্দেশ্যহীনতা সইতে পারে না। উৎসবকে সে ইভেন্টে নামিয়ে আনে, পণ্যে পরিণত করে ও ক্যালেন্ডারের ভিড়ে ঠেলে দেয়। আয়োজন থাকে, কিন্তু প্রাণটা সরে যায়। কারণ, উৎসবের আসল শক্তি উৎপাদন করার মধ্যে নয়, তার শক্তি উপস্থিতির মাঝে থাকে সজীব। মানুষ শুধু কাজ করার মধ্যে বেঁচে থাকে না, দেখার মধ্যেও সে বাঁচে। ‘দেখা’, অর্থাৎ মনোযোগ দিয়ে কিছু গ্রহণ করা ও বিস্ময়ের জায়গায় এসে ‘থামতে জানা’। স্তবের আনন্দ, নিরুদ্দেশ প্রশংসা… অপ্রয়োজনীয় এই অতিরিক্তরা জীবনকে মানবিক করে তোলে। এগুলো কোনো ফল বহন করে না, তবে মানুষের জীবনে রং নিয়ে আসে।
বিয়ং-চুল হানের কাছে স্তব হলো ভাষার সাব্বাথ;—বিরাম নেওয়া, যেখানে ভাষা কিছু বিক্রি করে না, কিছু দাবি করে না, কেবল স্বীকার ও উদযাপন করে। এর বিপরীতে বিজ্ঞাপন হলো অভাবের ভাষা। সে বলে ‘তুমি যথেষ্ট নও, আরও চাই।’ আজ যখন আমাদের যোগাযোগের জগৎ ক্রমশ জ্ঞাপনের ছন্দে কথা বলছে, সেখানে স্তব হারিয়ে যেতে বসেছে! আর স্তব হারালে সৌন্দর্য সরে যেতে থাকে;—জীবন আবার কাজের অঙ্কে নেমে আসে।
Vita Contemplativa-র সুর তাই স্পষ্ট,—জীবনকে শুধু কাজ-উৎপাদন-সাফল্যের মানদণ্ডে মাপতে যেয়ে আধুনিকতা মানুষের ভেতরের ধ্যানমগ্ন ক্ষমতাকে শুকনো করে দিয়েছে। প্রতিকার মানে ‘আরও দক্ষতা’ নয়, প্রতিকার হলো ‘থামার ক্ষমতা’, ‘শোনার ক্ষমতা’ ও ‘ঘটতে দেওয়ার’ ক্ষমতা। ধ্যান, নীরবতা, অপেক্ষা, খেলা, উৎসব, অলঙ্কার ইত্যাদিরা হচ্ছে সেই বিশেষ ‘বিলাস’। মানুষের জীবনে এগুলো কোনো ঘাটতি নয়। এগুলো হলো সংস্কৃতির উৎস, সেইসঙ্গে সত্যের দরজা ও নতুনের জন্মভূমি।
. . .
লেখক পরিচিতি : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন
. . .

অবদায়ক : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ : থার্ড লেন স্পেস
… বিয়ং-চুল হানের ওপর আরো রচনা পাঠের জন্য এখানে চাপুন …
মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ-এর অন্যান রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন




