ছবির অন্তরালে - পোস্ট শোকেস

ছবির অন্তরালে : ‘শরবত গুলা’

Reading time 5 minute
5
(1)

‘শরবত গুলা’র ছবি যখন তুলছি, ওর বয়স দশ-বারো বছর চলছে। বাদশাখানের দুর্বোধ্য পাহাড়ঘেরা চড়াই-উতরাইয়ের ফোকর গলে আমি তখন পেশোয়ারে ঢুকে পড়েছি। বাদশাখান ও পেশোয়ারের মধ্যে তফাত খুঁজে পাইনি। পরে মনে হয়েছিল,—ইতিহাসের পাতা থেকে সোজা উঠে আসা পেশোয়ারের পাহাড়ি উপত্যকারা বাদশাখানের চেয়ে কম দুর্বোধ্য, আর তারা অনেকবেশি রৌদ্রজ্জ্বল!

আমার গন্তব্য বাদশাখান হয়ে কাবুল। এটা জানা ছিল,—আমি সেখানে ঢুকতে পারব না। কারাকুরাম পর্বতমালার বিস্তার আফগানিস্তানের যে-অংশটিকে দুর্ভেদ্য করে রেখেছে, ওইসব সংকীর্ণ খিলানগুলো ততদিনে রুশ সেনাদের গোলার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। প্রতিটি খিলানের ফাঁকফোকর দিয়ে যুদ্ধটা চলছিল। বাদশাখানে ঢোকার দিন থেকে জানতাম,—রুশ সেনারা আমাকে কাবুলে ঢুকতে দেবে না। আফগানরাও চাইবে না তাদের মাঝখানে ক্যামেরা হাতে ঢুকে পড়ি। পেশোয়ার হয়ে বাদশাখানে ঢোকার পর আমাকে অগত্যা পেশোয়ারেই ফেরত যেতে হয়েছিল।

এ-যুদ্ধ থামবার নয়! আফগানরা রুশদের হামলা ঠেকাতে লড়ছে। ছবিটা কাল হয়তো পালটে যাবে! আমি দেখব,—মার্কিন সেনারা কারাকুরামের সংকীর্ণ পাহাড়ি গুহাগুলোয় ঝাঁক বেঁধে বোমা ফেলছে। যুদ্ধ আজো প্রহেলিকা আমার কাছে। আর এখন, পেশোয়ারে ফেরত আসার মুহূর্তে আমি ওইসব হতচ্ছাড়া স্মৃতি মাথা থেকে বিদায় করতে মরিয়া ছিলাম।

অবাক লাগছিল ভেবে,—ধূসর অতীতে গুম হয়ে থাকা পেশোয়ারের চোখধাঁধানো পাহাড়ি সৌন্দর্য কিংবা মান্ডির চাপিলা কাবাব… কিছুই আমায় টানছিল না। হাঁপ ধরে গিয়েছিল বুকটায়। আমি আসলে পালাতে চাইছিলাম এখান থেকে। পেশাদার আলোকচিত্রীর জন্য এটা অপরাধ। কারাকুরামের ফোকর দিয়ে স্রোতের মতো নামতে থাকা আর্তনাদে নিজেকে খাপ খাওয়ানো সত্যি কঠিন! এইসব দুর্বোধ্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠী গুলি-বোমার জখম গায়ে বারবার ছিটকে পড়ছে, আচমকা তারা ঢুকে পড়ছে প্রতিবেশীর সীমানায়, আর খ্যাপা মোষের মতো মাটিতে শিং ঢুকিয়ে শত্রুর বিপক্ষে তবু লড়ছে… যুদ্ধের চিরাচরিত এই ছবি আমাকে ক্লান্ত করে ঈশ্বর! মাথা খারাপ গোলযোগটি কবে কোথায় গিয়ে শেষ হবে জানি না! নাহ! সবকিছু যথেষ্টের চেয়ে বেশি এখানে!

মনে পড়ছিল, পেশোয়ারের প্রান্তরেখায় আমি তখন পৌঁছে গেছি। প্রান্তরেখা ঘেঁষে ঢুকে পড়েছি নাসির বাগ শরণার্থী শিবিরে। আমার গা গুলিয়ে উঠেছিল। শরণার্থী শিবিরে ঢোকার মুখটায় বসে গলগল করে বমি করেছিলাম। কাঁধে ঝুলানো ক্যামেরা ছিটকে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। বমি করার পর চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। টের পাচ্ছিলাম, ছবি তুলতে এসে কারাকুরামের অনুপম এই শ্বাসরোধী ফাঁদে আমি আটকে গেছি। রুশ ও আফগানরা মিলে আমাকে ক্রুশে লটকে দিয়েছে, আর আকাশের দিকে মুখ করে যিশুর মতো আমিও তারস্বরে চিৎকার জুড়েছি, ‘এলি এলি লামা সাবাক্তানি।’ ঈশ্বর ঈশ্বর, তুমি কি আমায় পরিত্যাগ করেছো!

চোখ দিয়ে নীরবে জলের ধারা বইলেও এক অন্ধ প্রেরণা সেদিন আমায় বাঁচিয়ে দিলো! কে যেন কানের কাছে ফিসফিস করে বলছিল, ‘উঠে দাঁড়াও। ফেঁসে যেতে না চাইলে তোমাকে উঠে দাঁড়াতেই হবে। ওইসব হতভাগা উদ্বাস্তুদের দঙ্গলে ঢুকে টপাটপ ছবিগুলো তুলে ফেলো। এটাই তোমার কাজ এখানে। কাজটি করতে তুমি বাধ্য। যেমন ওরা বাধ্য লড়াই চালিয়ে যেতে।’

ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমাকে উঠে দাঁড়াতে হয়েছিল সেদিন! আর, তাকে দেখতে পেলাম! আমার গা ঘেঁষেই দাঁড়িয়ে ছিল। দশ-বারো বছরের ছোট্ট পশতুন বালিকা। মাটিতে ছিটকে পড়া ক্যামেরা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখছিল সে। ওটা যেন উল্কাপিণ্ড! আকাশ থেকে দুম করে তার পায়ের কাছে এসে পড়েছে। কাঁধে হাত রাখতে ক্যামেরাটি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল।

Afghan Girl, Pakistan (1984) by Steve Mccurry; Image Source: Collected; publicdelivery.org

নাসিরবাগের গা ঘিনঘিনে প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে আমি তাকে অবাক হয়ে দেখছি তখন! কারাকুরামের দুর্বোধ্য উপত্যকার চেয়ে জটিল দেখাচ্ছিল তাকে। নরোম ফ্যাকাশে গালের ওপর রোদের ছটা পিছলে যাচ্ছে, আর সবুজ রংয়ের চোখের তারায় কী যেন খেলা করছিল! আমি স্থানু হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ। মাথা কাজ করছে না। ধমনী হিম হয়ে আসছিল তাকে দেখে। মেয়েটি এই গ্রহের জীব নয়! সুদূর অচেনা থেকে ঈশ্বর তাকে পাঠিয়েছেন মানুষের লীলা দেখতে!

বিস্ময় কাটিয়ে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছি ততক্ষণে। মেয়েটির শীর্ণ গণ্ডদেশে কারাকুরামের বরফ-শীতল রোদের ঝাপটা আরো চওড়া হয়েছে। আমি জানলাম ওর নাম ‘শরবত গুলা’। লোকজন তাকে শরবত বিবি নামেও ডাকে এখানে। আমাকে ঘিরে তার সমবয়সীদের ছোটোখাটো একটা ভিড় জমে উঠেছে। উদ্বাস্তু শিবিরে একমাত্র বিদ্যাপিঠে তারা পড়ছে এখন।

একজনকে টুল নিয়ে আসতে বলি ও শরবতকে টুলে বসাই। সে কোনো প্রশ্ন করেনি। একবারও জানতে চায়নি,—আমি এটা কেন করছি! টুলের ওপর পা ছড়িয়ে বসার পর আমি তার মুখের দিকে ক্যামেরা তাক করি। বালিকারা যেমন হয়ে থাকে, ক্যামেরার সামনে তারা হাসে, বিব্রত চোখ মেলে তাকায়, লজ্জায় মুখটা নামিয়ে নেয়, আর আচমকা হি হি করে হেসে ওঠে,—টুলে বসে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকা ‘শরবত গুলা’র মধ্যে ওসবের বালাই ছিল না!

ক্যামেরার শাটারে চাপ দেওয়ার সময় আমি দেখতে পাচ্ছিলাম সে চোথের পলক না ফেলে তাকিয়ে রয়েছে। তার সবুজ চোখের তারা বহুদিন ধরে স্থির ঘড়ির কাঁটার মতো নিশ্চল ছিল! নিষ্কম্প দুটি চোখ অবশ্য মৃত নয়। কারাকুরামের উপত্যকার মতো হেঁয়ালিভরা জিজ্ঞাসায় কেবল ফেটে পড়তে চাইছিল তারা! আমি চোখ বুজে ক্যামেরায় চাপ দেই। মনে হচ্ছিল, শরবতের চোখ কারাকুরাম পর্বতমালার হেঁয়ালিভরা বিস্ময়ে একাকার হয়ে আমার কাছে জানতে চাইছে,—তার চোখের ভাষা আমি পড়তে পারছি কি?

‘শরবত গুলা’কে উত্তরটি সেদিন দিতে পারিনি। আমি জানি ওর বয়স এখন পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে। চোখের হেঁয়ালিভরা তীব্রতা নাসির বাগের দিনগুলোর মতো কি অটুট এখনো? আমি হয়তো আরেকবার তার সাক্ষাতে কাবুলে যাবো। ছবি তুলতে নয়, তাকে শুধু জানিয়ে দিতে-যে,—এতো বছর পেরিয়ে গেছে, আমি তবু তার চোখের ভাষা আজো পড়তে পারিনি!

লোকেরা বলাবলি করে ‘শরবত গুলা’ হচ্ছে একালের মোনালিসা। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, যাদের হয়ে ছবিটি আমি তুলেছিলাম, বিশ্বজুড়ে প্রচার পাওয়ার পর শরবতের হাড়ির খবর তারা বের করে আনে। আমার তাতে কিচ্ছু যায় আসেনি। এটাও ভাবতে চাইনি,—দ্য ভিঞ্চির মোনালিসার সঙ্গে শরবতের মিল রয়েছে! নতুন রূপে মোনালিসা নাসির বাগের গা ঘিনঘিনে শিবির থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে! আমি শুধু এটা জানি,—ওর চোখের ভাষা পড়তে আমার আজো সমস্যা হয়। আমার কাছে এই ভাষা এখনো দুর্বোধ্য!

বাদশাখানের জটিল উপত্যকার ফোকর গলে যেসব পশতু ও আফগানরা আচমকা বেরিয়ে আসে জগৎকে চমকে দিতে, আমি দেখেছি কোনো এক দুর্বোধ্য খোঁয়ারি-ঘোরে তারা মার খাচ্ছে ও উঠে দাঁড়াচ্ছে, সচল ঘড়ির কাঁটার মতো বারবার উঠে দাঁড়াচ্ছে, আর মার খাচ্ছে! এটা অন্তহীন!

কাবুলে আমি যাবো এজন্য-যে, শরবতের জানা উচিত তার চোখের ভাষা কারাকুরামের দুর্বোধ্য পাহাড়সারির মতো অতলান্ত ও জটিল। নিস্ফল আক্রোশ সেখানে গুম হয়ে আছে! সত্যি আছে কি-না তা জানতে চাইব তার কাছে। এবার যদি কাবুল যাই, তাকে জিজ্ঞেস করব,—আমি তো বুঝি না! সে তার চোখের ভাষা বুঝে কি-না!
. . .

সংযুক্তি

‘Afgan Girl’ শিরোনামে ‘শরবত গুলা’র আলোকচিত্রের অন্তরালবর্তী কাহিনি বিশ্বখ্যাত আলোকচিত্র সাংবাদিক স্টিভ ম্যাককারি’র ছবিটি তোলা ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকে পাঠ করে ওঠার দায় থেকে রচিত। রচয়িতা তার নিজস্ব বয়ানে ছবিখানার পাঠ-বিনির্মাণ ঘটিয়েছেন। শরণার্থী শিবিরে আলোকচিত্রীর ভ্রমণ ও ছবি তোলার যেসব বিবরণ অত্র জায়গা নিয়েছে, এর সঙ্গে আলোকচিত্রী ম্যাককারির ‘শরবত গুলা’কে ক্যামেরাবন্দি করার কোনো যোগ নেই। রচনার প্রয়োজনে কল্পনার আশ্রয় নিতে লেখক কার্পণ্য করেননি। ‘Afgan Girl’ আলোকচিত্রের এই পাঠকে সুতরাং স্টিভ ম্যাককারির আত্মবিবৃতি হিসেবে বিবেচনা না করাটাই যুক্তিসংগত।
. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ ‘শরবত গুলা’ নিয়ে পাঠের জন্য আরো দেখুন …

ছবির অন্তরালে : কাবুল দেশের শরবত গুলা : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ

. . .

অবদায়ক : আহমদ মিনহাজ : থার্ড লেন স্পেস.কম

আহমদ মিনহাজ-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 1

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *