শর্ট ইন্ট্রো
এপার-ওপার দুই বাংলায় উত্তর আধুনিক বাংলা কবিতা চর্চার পালে হাওয়া লেগেছিল একটা সময়। বিংশ শতকের আধুনিকতাবাদী সাহিত্যের প্রভাব বাংলা কবিতাকে মাটি ও শিকড় বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে;—এরকম একখানা অভিযোগের তির ছুড়ে দিচ্ছিলেন একদল কবি ও তাত্ত্বিক। বি-উপনিবেশকরণ ওরফে ডি-কলোনাইজেশন-এর তাত্ত্বিক বাতাবরণ সেখানে ভূমিকা রাখছিল বটে! বাংলা কবিতাকে তার নিজস্ব ধারায় ফেরত নিতে পশ্চিম বঙ্গে অমিতাভ গুপ্ত, অঞ্জন সেন প্রমুখ ও বাংলাদেশে এজাজ ইউসুফী সম্পাদিত ‘লিরিক’ ছোটকাগজের বরাতে একধরনের তত্ত্বাশ্রয়ী কবিতা রচনার প্রেরণায় মেতে উঠেছিলেন কবিতাকর্মী অনেকে।
কামাল রাহমানের নাতিদীর্ঘ গদ্যটি আট-নয় দশকে ফেলে আসা দিনগুলোকে মনে করিয়ে যায়। নয়ের দশকের গোড়ায় লেখা গদ্যের আয়নায় সময়ান্তরটাও অনুভব করতে চেয়েছেন তিনি। গদ্যশরীরে উত্তর আধুনিক কবিতাচর্চার অতীত পটভূমি যেমন উঠে এসেছে, এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক পালাবদলকেও নিয়েছেন বিবেচনায়। আদি গদ্যের শরীরে সংগতকারণে কিছু পরিমার্জনা ঘটেছে বোঝা যায়।
পাঠ-প্রাসঙ্গিক ও স্মৃতি-মৈথুনের কথা ভেবে ‘সাবস্টেক’-এ কামাল রাহমানের নিজস্ব লেখালেখির পরিসর থেকে রচনাটি আমরা এখানে সংকলিত করছি। পাঠককে আশা করি এই রচনা ফেরত নিয়ে যাবে ওই সময়টায়, যখন বাংলা কবিতা নানামাত্রায় পাশ ফিরছিল ও বাঁক নিচ্ছিল পুনরায়।
—সঞ্চালক : থার্ড লেন স্পেস
. . .

গদ্যকার-ভণিতা আশির দশকে বাংলা কবিতায় উত্তর আধুনিক কবিতা ভাবনাটির উত্থান ঘটেছিল। এটার প্রবক্তারা নিজেদের ‘রাগী’ তরুণ হিসেবে চিহ্নিত করতে প্রয়াসী ছিলেন। এপার বাংলায় কবি ও সম্পাদক এজাজ ইউসুফী সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন ‘লিরিক’ ছিল এটার মূল বাহন। এর বিপরীতে কোনো কোনো ছোট কাগজে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু প্রবন্ধ/নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। এ- লেখাটি ‘সাহিত্যের ছোট কাগজ: ১৪০০’ তৃতীয় সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। বলা যেতে পারে-যে, আশির দশকটা ছিল বাংলাদেশের ছোট কাগজের শেষ সফল দশক। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য ছোট কাগজ প্রকাশিত হতো তখন। ঐ দশকের লেখালেখির কিছুটা আবহ পাঠক ছোট্ট এ-নিবন্ধটির ভেতর পেতে পারেন।
. . .
পরিণত ও পরিশীলিত একটা মানবগোষ্ঠীর সরল প্রত্যাশা-যে, যাবতীয় সব বিষয়গুলোর ভেতর একটা পরিমিত স্বচ্ছতা থাকুক। এটা কোনো অলীক চাওয়া নয়, যুগের স্বাভাবিক চাহিদা। অগ্রসর দেশগুলোয় স্বচ্ছতার প্রকাশ ও প্রচলন অনেক আগেই শুরু হয়েছিল। একজন লেখকের স্বাধীনতার প্রশ্ন অথবা তার অধিকার ও ব্যক্তি-চাহিদার প্রসঙ্গ বিশেষভাবে জড়িয়ে রয়েছে এখানে। লেখকের স্বাধীনতা যে-সমাজগোষ্ঠী দেয় না বা দিতে চায় না সে-সমাজের পিছিয়ে না পড়ার কোনো কারণ থাকে না। যে-সমাজের প্রায় কোনো ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা নেই, সেখানে লেখকের স্বাধীনতা সত্যিই সীমিত।
ঘোলাজলে মাছ শিকার ঘোড়েলদের বিষয়। কিন্তু একজন প্রকৃত লেখক কখনোই ঘোলাজলে বিচরণ করেন না। সাদা চোখে তিনি যা দেখেন তাই তাঁর পাঠককেও দেখাতে চান। তাঁর দৃষ্টির স্বচ্ছতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত থাকে তাঁর কল্পচোখের দৃষ্টি যা শিল্পসৃষ্টির জন্য সহায়ক ও একান্ত অপরিহার্য। প্রকৃত লেখকের সঙ্গে ঘোড়েলদের পার্থক্য এখানেই।
একুশ শতকের সামনে দাঁড়িয়ে দ্বিধাহীনভাবে এটা উচ্চারণের সময় আমাদেরও এসেছে। মানুষজীবনের অন্যান্য অনুষঙ্গে যেমন তেমনি শিল্পেও এবং সেইসূত্রে কবিতায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার প্রত্যাশা ধীরে ধীরে সোচ্চার হতে শুরু করেছে। অপ্রয়োজনীয় কৃৎকৌশল ছেড়ে ও ধোঁয়াশার ভেতর পাঠককে ডুবিয়ে না রেখে পাঠকের ভালো লাগার সুরসুতোয় টান দেবার সময় এসেছে।
কবিতা থেকে চোখ সরানো পাঠককে এবার নিসর্গের সরল শোভা দেখানোর মতো কবিতার সৌন্দর্যও খুলে দেখাতে হবে। যেভাবে এক কবি-হৃদয়ে কবিতার রূপ ফুটে উঠেছিল, ঠিক সেভাবেই এটার পরিস্ফুটন অনিবার্য হয়ে দেখা দিয়েছে। এখানে কবির একান্ত ব্যক্তিগত ভাষার চাতুর্য বা উৎকর্ষ থাকতে পারে, কিন্তু কোনো আড়াল নয়। পাঠককে কবিতার ভেতরের কবিতা খুঁজে নিতে বলা নয়, সরাসরি কবিতা উপহার দিতে হবে। বলা যেতে পারে-যে, স্বচ্ছতার পূর্বশর্ত এটা। কবিতা সমালোচকের করণীয় হচ্ছে এই স্বচ্ছতার অনুবাদ।
কবিতা বিশ্লেষণ নিশ্চয় প্রশংসিত ও সৃজনশীল কাজ। কিন্তু এটা-যে খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা কিন্তু নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটাও পাঠককে বিভ্রান্ত করে ও এক ধরণের ধাঁধার ভেতর নিক্ষেপ করে কবিতার রং বদলে দেয়। এ-সময়ে এটার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কিনা তা বরং ভেবে দেখা যেতে পারে। কবিতা একটা বিশেষ বোধ কিংবা অপূর্ব অনুভবের শব্দসূত্র মাত্র, যেটার উৎপত্তি একটা বাস্তব অথবা কল্পবাস্তবের অনুকরণ বা অনুসরণের উপর নির্ভরশীল। এ-অর্থে আবার প্রায় সব শিল্পই বাস্তবের কল্পরূপ অথবা কল্পবাস্তব। কখনও কখনও আবার ওটাকে অবাস্তবও বলা যেতে পারে।
কবিতা বা যে-কোনো শিল্প বোঝার জন্য পাঠক অথবা ঐ শিল্পবোদ্ধাকে সংবেদনশীল হতে হয়। তা নাহলে তার অন্তর ঐ শিল্পীর নির্মাণ বা মনোজগতকে ছুঁতে পারে না। মানুষের উপলব্ধির অতীত কোনো রহস্য নেই। দৃশ্যমান নয় এমন কিছু রহস্যলোকেও নেই যার কল্পনা করা যায়। অলৌকিক ভাবনার জন্যও মানুষের প্রয়োজন আপাত-লব্ধ উপমা। কবিতা যখন কবি হৃদয়ের আধেয়, তুচ্ছ কিংবা তীব্র ছায়ারূপ, তখন অনুকরণের অনুরণনে কোনো যুক্তি থাকতে পারে না।

কোনো শিল্প যত গভীর তত গভীর ঐ শিল্পনির্মাতার অন্তর্বেদনা। শিল্পনির্মাণের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শিল্পনির্মাতার ব্যক্তিজীবন ও সমাজ-বলয়, তাঁর পরিপার্শ্ব ও অন্তর্বেদনা, যে-সবের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে তাঁর কল্পজগৎ। শিল্পস্রষ্টার নিভৃত ও একান্ত এ-জগৎ ও অন্তর্বেদনা শব্দে যেহেতু পুরোপুরিভাবে প্রকাশযোগ্য নয়, তাই শিল্পের ভেতরও এটা প্রচ্ছন্ন বা বিমূর্ত থেকে যেতে পারে। কবিতায় এটা আরো বেশি হেঁয়ালি হয়ে দেখা দিতে পারে অথবা প্রচ্ছন্ন থেকে যেতে পারে। কবিদের ছাড় পাওয়ার জায়গা কিছুটা রয়েছে এখানে। কবিতা পাঠকেরও কিছুটা দায়িত্ব অবশ্যই রয়েছে। কাব্যভাষাটা শেখা ও চর্চ্চার বিষয়। ওটা না জেনে কবিতা পড়া হলে পাঠক কবিতার উপরিস্তরেই থেকে যায়। কবিতার ভেতরে প্রবেশ করার জন্য পাঠকের শিল্পবোদ্ধা হতে হয়।
সাহিত্যের সব চেয়ে জটিল প্রকাশ কবিতা। এটা বুঝতে হলে পাঠককে অবশ্যই শিল্পশিক্ষিত হবে। এটার ঘাটতি থাকলে কবিতার দুর্বোধ্যতার বিষয়টি থেকে যাবে পাঠকের ভেতর। একজন শিল্পবোদ্ধা তথা পাঠক তার মনের মাধুরি মিশিয়ে শিল্পটিকে পুনর্নির্মাণ করেন। যদি তার মনে মাধুরি না থাকে তাহলে তার পক্ষে শিল্প উপভোগ করা হয়ে ওঠে না। শিল্পমাধুর্য গ্রহণকারীদের প্রত্যেকেই আবার ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলোকে দেখে থাকেন। ফলে সব ভোক্তার কাছে একই বিষয় হুবহু একইরকমভাবে দেখা দেয় না।
কবিতায় যদি শিল্পসুষমা না থাকে তাহলে ওটা শব্দজঞ্জাল ভিন্ন অন্য কিছু নয়। অসংখ্য কবি এই শব্দজঞ্জাল তৈরি করে চলেছেন। ফলে কবিতার পাঠক এখান থেকে সরে গেছে। এটাই রূঢ় বাস্তবতা। এটা গ্রহণ না করে আমরা বরং কবিতার পাঠকের উপর দায় চাপিয়ে চলেছি। এখন কিছু কবিতাপাঠক, এমনকি এরা ভালো পাঠকও না, এরাই কবিতা লিখে চলেছে। এরা অন্যের কবিতাও পড়ে না।
মাত্রাজ্ঞান-রহিত এ-সময়ে সংঘবদ্ধভাবে অনেকে নিজেদের কবিতার বিশ্লেষণেও নেমেছেন। স্বভাবতঃই পাঠকের ভেতর প্রশ্ন দেখা দিতে পারে-যে, এটার কোনো প্রয়োজনীয়তা বা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে কিনা? এটার বিপরীতে বরং নিজেদেরকে ভূয়োদর্শী হিসেবে চিহ্নিত করানোর সম্ভাবনাও থেকে যায়। একজন প্রকৃত কবি কখনো তাঁর চারপাশে অপ্রকৃত আলোর বলয় কামনা করেন না ও ঐ আলোয় নিজেকে রঙিন দেখতে ভালোবাসেন না। এমন অপ্রকৃত বলয় আকাশের রামধনুর মতো। আলো অথবা জলকণার ভারসাম্য বিঘ্নিত হলে ঐ ক্ষণিকের সৌন্দর্য মিলিয়ে যায়।
একক ব্যক্তিত্বের অপ্রাচুর্যের ফলে যদি কোনো ঋণগ্রস্থ ও দায়বদ্ধ, দোদুল্যমান মেধার গোষ্ঠীগত আস্ফালন দেখা দেয়, তাহলে ওটা ব্যক্তি-প্রতিভার উন্মেষে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। অকারণ মেধার অপচয় মুক্তমন তারুণ্যের প্রতি হুমকি হয়ে দেখা দেয়। একজন কবি ও ব্যক্তির অহমকেন্দ্র ভিন্নও হতে পারে। অহম ব্যক্তিকে এভাবে পরিচালিত করতে পারে যাতে তার নৈর্ব্যক্তিক-সত্তা মানবেতর পর্যায়ে উৎক্ষিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অপর দিকে কবির অহম কল্পিত পরম সত্তার দিকে ধাবিত, যেখানে কোনো কবি নিজেকে ঈশ্বর-প্রতীমও কল্পনা করতে পারে। ঐ অবস্থার জন্য নিশ্চয় তার সৃষ্টিও অকৃত্রিম ও অভূতপূর্ব মৌলিক গুণসম্পন্ন হতে হয়। এখন এটা হচ্ছে কিনা বরং ঐ প্রশ্নটি করা যেতে পারে।
শিল্প সৃষ্টিতে প্রসব-বেদনার ধারণা মনে হয় এ-সময়ে ততটা মূল্য বয়ে আনে না। এখন বরং প্রসব-আনন্দ অনেকটা আগ্রহের বিষয়। এটার পেছনে হয়তো যুক্তিও রয়েছে। যে-কোনো সৃষ্টির প্রাক্কালে অনুশীলনের শ্রম থাকে। কিন্তু নির্মাণকালে শিল্পীর আনন্দই তাকে প্রাণিত করে ঐ শিল্পটির সফল সমাপ্তির পথে। অনুশীলনের শ্রম ভিন্ন কেবল প্রসব-আনন্দে শিল্প সৃষ্টি অযৌক্তিক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন। শিল্পের অনুসরণে শিল্পের প্রতিকল্প নির্মাণ শুধু সংখ্যা বাড়ায়। শিল্পভোক্তাকে তৃপ্তি দেয়ার পেছনে এটার তোমন কোনো ভূমিকা নেই।
একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে : দেবী দুর্গার প্রতিমা নির্মাণ স্মরণাতীত কাল থেকে হয়ে আসছে। এখানে একজন মৃৎশিল্পী তাঁর অন্তর-সৌন্দর্য দেবীরূপে ফুটিয়ে তোলার জন্য নিজের অন্তরের সকল শিল্পসুষমা নিবেদন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু শ্রীমতি দুর্গা নতুন কোনো ব্যঞ্জনা দর্শক হৃদয়ে সৃষ্টি করতে পারেন না। প্রতি বছর যেমন নতুন রূপে দেখা দেন তিনি, তেমনই থেকে যায় তাঁর অন্তর্গত ব্যঞ্জনা। এখন অধিকাংশ কবি ওরকম মৃৎশিল্পীর ভূমিকায় নেমেছেন। পুরোনো কবিতায় নতুন পোশাক পরিয়ে পরিবেশন করছেন। ফলে নতুন কবিতা থেকে পাঠক বঞ্চিত হচ্ছেন।

সাহিত্য জগতে দায়িত্বজ্ঞানহীন এ-সকল কবি শুধু শব্দের মোহে শব্দ ও পঙক্তি রচনা করে পাঠককে ক্লান্ত করে চলেছেন। প্রকৃত কবিতার পাঠ থেকে তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। এখন সময় এসেছে এসব আবর্জনা নির্মাণ রহিতকরণে কবিদের সোচ্চার হওয়ার। স্বচ্ছ কবিতা রচনা করে পাঠক হৃদয়ে স্বচ্ছতার নির্মল আনন্দ সৃষ্টিতে নিয়ামক ভূমিকা কবিদেরই গ্রহণ করতে হবে। তাত্ত্বিকদের কাচ চিবোনো আর নয়, স্বভাব-কবির ধারণাও অনেক আগে বাতিল হয়েছে। নিরন্তর অনুশীলন ও স্বচ্ছ কল্পনাশক্তির ভিত্তিতে রচিত দায়িত্ববোধ সম্পন্ন ভাষার চর্চা ও ব্যবহার অবশ্যই শুরু করতে হবে।
বর্তমান সময়ের কবিতা আলোচনায় স্বভাবতই উত্তর আধুনিক কবিতা ভাবনাটি উঠে আসে। যুক্তি-নিরিখে এর অবস্থান নড়বড়ে হলেও অনেকটা শিথিলভাবে এখনও আলোচনায় রয়েছে এটা। উত্তর আধুনিক কবিতায় শব্দের গৌরবাত্মক সংগঠন বর্ণনায় উত্তর আধুনিকতা সূত্রের একজন প্রবক্তা, কবি ও প্রাবন্ধিক অমিতাভ গুপ্ত লেখেন ‘ভাষাবোধ আধুনিক কবিতায় যতটা পরিমাণ শব্দ নির্ভর কিংবা শব্দ সংস্থাপন নির্ভর উত্তর আধুনিক কবিতায় নিশ্চয় সেই শব্দ নির্ভরতা কম, ঘুরিয়ে বললে, উত্তর আধুনিকেরা আর আধুনিকদের মত শব্দ সন্ধানী নন।’
এমন সিদ্ধান্তে আসা কতটা যুক্তিযুক্ত তা ভেবে দেখার বিষয়। কারণ এটা বোঝা যায় না-যে, কী কারণে উত্তর আধুনিক কবিগোষ্ঠী শব্দের শক্তির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন,—যেখানে তাঁরা আর শব্দ-সন্ধানী নন! পনেরো শতকের মাঝামাঝি সময়ে গুটেনবার্গের ছাপ-যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়েছিল। ওটা বিশ্বকে বেশ ভালোভাবেই বুঝিয়েছে, শব্দের শক্তি ও ব্যঞ্জনা কত গভীর হতে পারে। ইউরোপের হাজার বছরের অন্ধকার ‘শব্দের সহস্র ধারায়’ শুধু তাদেরকেই আলোকিত করেনি বরং পুরো পৃথিবীকে পদানত করার ক্ষমতা তাদের এনে দিয়েছিল। কেবলমাত্র বারুদ তাদের বিজয়কে স্থায়ী রূপ দিতে সক্ষম হতো না, যদি-না অধিবিদ্যক শব্দের যাদু বিজিত মানুষগুলোর মগজ ধোলাই করে তাদের কৃষ্টিকে ছিন্নভিন্ন করে দিত।
আজকের কবিগণ শব্দ-সন্ধানে গুরূত্ব দেন না;—এমন ভাবনা মনে হয় না গ্রহণযোগ্য হতে পারে। বিচ্ছিন্নভাবে এদের কোনো কোনো লেখায় একধরণের অস্বচ্ছতা অনুপ্রবিষ্ট বা প্রচ্ছন্ন রয়েছে। ফলে পাঠকের যথেষ্ট আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও উত্তর আধুনিক ধারণাটা দু-বাংলার কোথাও প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। অবশ্য কেউ কেউ বলে থাকেন,—এটার পেছনে কোনো প্রখর মেধা ছিল না। এটা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। নতুন কোনো তত্ত্ব বা ধারণার বিকাশ কখনোই পুরোপুরিভাবে মেধানির্ভর নয়।
জীবনের জন্য শিল্প। শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতি প্রভৃতি সকল ক্ষেত্রে যখন স্বচ্ছতা প্রত্যাশা করা হচ্ছে, তখন অস্পষ্ট ঘূর্ণি কোনো সুবাতাস বয়ে আনে না। ক্রমাগত বৈপরীত্য সৃষ্টি পাঠককে একধরণের বিভ্রান্তির ভেতর ফেলে দিতে পারে। কোথাও উত্তর আধুনিকতার উৎস বলা হয়েছে রবীন্দ্রনাথ আবার কোথাও লালন ও হাছন রাজাকে উত্তর আধুনিকতার পোশাক পরিয়ে দেয়া হয়েছে। বস্তু বা ভাবনা উৎস ছাড়িয়ে অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারে না। আরো অনেক উদাহরণ টেনে লেখার কলেবর বাড়ানো যায়। এতে পাঠকের কোনো আগ্রহ থাকার কথা না।
এ-আলোচনা কোনো কোনো কবির মনোঃপীড়ার কারণ হতে পারে। আজকাল কবিসত্তার প্রতি উচ্চারিত প্রশ্ন ব্যক্তিসত্তার দিকে চালিয়ে দেয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এদের আক্রমণের লক্ষ্যস্থলেও ভিন্নতা রয়েছে। কেউ যদি তিরিশের কবিদের লক্ষ্য করে শব্দ-বাণ নিক্ষেপ করেন তো অন্যেরা আবার পঞ্চাশের কবিদের। আক্রমণ প্রতি-আক্রমণ না করে বরং ভেবে দেখা যেতে পারে,—বাংলা কবিতার আজকের অর্জন কোথায় দাঁড়িয়ে! ওখান থেকে নতুন নির্মাণ ও প্রতিনির্মাণ করে দেখানো যেতে পারে কবিতার বিপরীত উৎকর্ষ। অকারণ বাগাড়ম্বর সাহিত্যে অনাসৃষ্টি ডেকে আনার কারণ হয়ে দেখা দেয়।
উত্তর আধুনিক আলোচনায় বেশ উচ্চস্বরে ঐতিহ্যের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এর বিপরীতে প্রশ্ন রাখা যায়-যে,—ঐতিহ্য কি খুব ঠুনকো কিছু? অগ্রসর সমাজগুলোয় প্রতি প্রজন্মে নতুনভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। পিঠেপিঠি দুটো প্রজন্মের ভেতর কিছু সময়ের পর দূরত্ব সূচিত হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। তবে প্রজন্মগুলোর আত্মিক বন্ধনে যোগসূত্র কিন্তু ছিন্ন হয়ে যায় না। একটা ধারাবাহিকতা থাকে। প্রবীণদের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন না করে সামঞ্জস্য বিধানের আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। নতুন নতুন তত্ত্ব উত্থাপন করা যেতে পারে। ওটা অতীতের সকল কিছু বিসর্জন দিয়ে নয়, পূর্বসূরিদেরকে বর্জনের মাধ্যমে নয়।

পুরোনো ধ্যন-ধারণার প্রতি স্বাভাবিক বিরোধ থাকতেই পারে। এটা যৌক্তিকও। এর বিপরীত প্রক্রিয়াটিই বরং নৈতিকতার প্রতি প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে। এটা মনে করার কোনো কারণ নেই-যে, নতুন কোনো সাহিত্য উদ্যোগের প্রতি উদাসীনতা প্রকাশ করা হচ্ছে। যুক্তিনির্ভর যে-কোনো সাহিত্য প্রেরণাকে নতুনেরাই সবার আগে স্বাগত জানায়। কবি নজরুলের প্রতি তথাকথিত মোমিনদের বিষোদ্গারে তরুণদেরই সামনে ঠেলে দেয়া হয়েছিল। মোল্লা ও বাবু সাহিত্যিকগোষ্ঠী একটা তরুণ প্রজন্মের মুখোমুখি আরেকটা প্রাচীন-ভাবাপন্ন তরুণ গোষ্ঠীকে দাঁড় করানোর ব্যর্থ প্রয়াস গ্রহণ করেছিল। প্রগতির বিপক্ষে ওসব টিকতে পারেনি।
পাঠকের হতাশ হওয়ারও যথেষ্ট কারণ রয়ে যায়, যখন দেখা যায় কোনো কোনো তরুণ কবি প্রয়োজনে মিথ নিয়ে যথেচ্ছাচার করেন। প্রশ্ন করা যেতে পারে,—কোন বিষয়টা মিথ হয়ে উঠবে তা কি এখনই ধারণা করা যায় অথবা কেউ কি ফিরে যেতে চাইবে ঐসব সামন্ত-প্রভুদের কল্পকথায়, মধ্যযুগের অন্ধকার-আশ্রয়ী কুসংস্কারে, নাকি থাকবে বিজ্ঞানের আধুনিক বিশ্ববীক্ষায়? বিজ্ঞান যখন আলোর গতিসম্পন্ন যানের কল্পনা চোখের সামনে এনে ধরে তখন নূহের সাম্পানের কেচ্ছা শিশুতোষ ছড়ায় হয়তো মানিয়ে যেতে পারে, কিন্তু পরিণত চিত্তে তা কোনো আলোড়ন সৃষ্টি করে না।
কোনো কোনো তাত্ত্বিক শেকড় সন্ধানের কথা বলেন। এটা অবশ্যই করা যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা কিন্তু তাই করে চলেছেন। কোনো প্রজন্মকে পেছনে ঠেলে দিতে চাওয়ার প্রবণতাকে মৌলবাদের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। শেকড় সন্ধানের প্রয়োজন অবশ্যই রয়েছে। এটা অস্বীকার না করেও বলা যায়,—এ-বিষয়ে উৎকণ্ঠিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বাঙালি ও বাংলা ভাষার শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। যথাযথ পরিচর্যা করলে ফলে ফুলেফসলে ভরে উঠবে এটা ও বিশ্বব্যাপী ছড়াবে। গাছের পরিচয় ফলে, নিম্নগামী শেকড়ে নয়।
একুশ শতকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অগ্রসর সমাজগুলো ঝুঁকে পড়েছে সাংস্কৃতিক মিশ্রণের প্রতি। যে-জার্মানরা নিজেদের ভাবত নীললোহিত তাদের আবেষ্টনীতে এখন বাঁধা পড়ছে আফ্রো-এশিয়ান তরুণ-তরুণীরা। বলা যেতে পারে, মিশ্র সমাজ হচ্ছে চলতি প্রথা বা আধুনিক কেতা। এটা যদিও পুজিঁবাদের ফসল কিন্তু এখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। কোনো জনগোষ্ঠীর পক্ষে এখন পুরোপুরিভাবে মূলাশ্রয়ী হওয়াও সম্ভব না। শত শত বছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের সমাজগুলো যে-মিশ্রণ জ্ঞাত কিংবা অজ্ঞাতসারে, ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় ঘটিয়ে এসেছে, ওখান থেকে বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব বলা যেতে পারে।
. . .
লেখক পরিচয় : কামাল রাহমান : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন
. . .

কামাল রাহমান : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস
কামাল রাহমান-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন



