
. . .
সিলেটি ‘ভাষা’ ‘উপভাষা’ বিতর্ক-১

সারগর্ভ আলোচনা করেছেন সেতু ভাই। সিলেটি ভাষা কি ‘স্বতন্ত্র ভাষারূপ’, নাকি ‘উপভাষা’?—এ-নিয়ে বিতর্ক আজকের নয়। মাঝখানে স্তিমিত হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে সিলেটের সাংস্কৃতিক-ঐতিহাসিক বিবর্তন ও নাগরী লিপি নিয়ে যাঁরা কাজ করেছেন একসময়, তাঁরা একে-একে বিগত হওয়ার পর বিতর্ক মিইয়ে আসে। যুক্তরাজ্যে সিলেটি ভাষা ও সংস্কৃতির আধিপত্য তৈরি হওয়ার কারণে সম্ভবত ভাষা নিয়ে পুরোনো বিতর্ক নতুন করে সামনে আনছেন অনেকে। নাগরী লিপি চর্চার পালেও হাওয়া লেগেছে বেশ! ভাষা ও উপভাষা বিতর্কে অনলাইনে যেসব কথাবার্তা উড়তে দেখি,—সংকীর্ণ আঞ্চলিকতার বাষ্পে তা আচ্ছন্ন হওয়ার ফলে কারো পক্ষে উপসংহারে পৌঁছানো কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন নিবিড় গবেষণা। আপনার আলোচনা সেই দায় অনেকখানি পূরণ করেছে।
‘ভাষা’ ও ‘উপভাষার’ প্রশ্নে ভাষাতাত্ত্বিক যেসব দৃষ্টান্ত লেখায় তুলে ধরেছেন, সেগুলোর ব্যাপারে আমার গভীর জানাশোনা নেই। ভাষাতত্ত্ব এতটাই কম জানি ও বুঝি,—প্রশ্নই ওঠে না এসব নিয়ে আলাপ তোলার। আপনার আলোচনায় ভাষাতত্ত্বর পাশাপাশি আরো যেসব প্রসঙ্গ এসেছে, যেসব তত্ত্বের নিরিখে বিতর্কের সারসত্য পরখ করেছেন, এবং সব মিলিয়ে উপসংহারটি পাচ্ছি,—তার থেকে কিছু ভাবনা মনে উদয় হয়েছে। আশা করি ভেবে দেখবেন :
ক. দীর্ঘ আলোচনায় সিলেটি জনজাতির নৃতাত্ত্বিক বিবর্তনের মানচিত্র পাবো আশা করেছিলাম। তা মনে হলো উপেক্ষিত এখানে। কথাটি এ-কারণে বলছি,—ভাষার বিবর্তন ও স্বাতন্ত্র্যর হদিশ যদি পেতেই হয়, একটি নৃগোষ্ঠীর কোনো একটি অঞ্চলে বসতি স্থাপনের ইতিহাস অনুসরণ করা জরুরি। অন্যথায় তার ব্যবহৃত ভাষার আদিরূপ কেমন ছিল ও সময়ের পালাবদলে তা কীভাবে পরিবর্তীত হয়েছে,—এর কিনারা করা কঠিন হয়।
ওইটা ধরে অগ্রসর হলে ভারত ও বাংলাদেশের যে-অঞ্চলজুড়ে সিলেটিরা এখন ছড়িয়ে আছেন, সেখানে তারা কখন এলেন, কীভাবে এলেন, আসার পথে কী-নিয়ে এসেছিলেন, পরে কী-কী নতুন যোগ হলো সেখানে… সব মিলিয়ে একটি ছবি আঁকা সম্ভব। এর মধ্য দিয়ে ভাষার আদি স্বাতন্ত্র্য ও পরবর্তী বিবর্তনের রূপরেখা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকছে। আলোচনায় এই দিকটির ওপর জোর প্রায় পড়েনি মনে হয়েছে।
যতদূর জানি, বর্তমান যে-অঞ্চলজুড়ে সিলেটিরা বসবাস করছেন, এর ভূপ্রাকৃতিক গঠন অতি প্রাচীন। উপরন্তু, অত্র অঞ্চলে মানববসতির ইতিহাসও পুরাতন। সিলেটি রূপে যারা এখানে স্বতন্ত্র হচ্ছেন, তারা কি রক্তসংকর বাঙালি জাতির উত্তরসূরি অথবা দূর ও নিকট দূরত্বে অন্য জাতিসত্তা থেকে পর্যায়ক্রমে বাঙালি রক্তসংকরে একীভূত হয়েছিলেন? তাদের সংস্কৃতি ও ভাষার আদিরূপ কেমন ছিল তা কিন্তু এর ওপর অনেকখানি নির্ভর করছে।
আমার কাছে এটি সবসময় গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। কৌতূহল থেকে মাঝখানে কিছুদিন ঘাঁটাঘাঁটি করেছিলাম। পর্যাপ্ত বইপত্র ও উৎস না-পাওয়ার কারণে সুরাহা মেলেনি। ডিএনএ ট্র্যাকিং এখানে ভালো একটি উপাদান হতে পারে। আমাদের এখানে এটি নিয়ে কতটা কী কাজ হয়েছে তার খবর নিতে হবে। সিলেটিদের ‘নরতাত্ত্বিক’ উৎস ও বিবর্তনের জায়গা থেকে ভাষার প্রশ্নকে তলিয়ে দেখা যায় কি-না ও এর যৌক্তিকতা নিয়ে ভাবার তাই অনুরোধ থাকছে।
খ. প্রণম্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কে সূত্র মেনে আপনি লিখেছেন :
বাংলার ব-দ্বীপ অঞ্চলের নিজস্ব কোনো উপভাষা ছিল না, বিভিন্ন উপভাষার পারস্পারিক প্রভাবে এ অঞ্চলের নিজস্ব বাংলা ভাষা গড়ে উঠেছে। আর, তাঁর অন্যকথায় মান্য বাংলা হলো হচ্ছে, ‘the speech of upper classes in the western part of the, delta’ (Chatterji, 1986: 139)। এ-তথ্য থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বিভিন্ন স্ট্যান্ডার্ড বা মান্যভাষা ঐতিহাসিক বা সামাজিক কারণে কোনো না কোনো উপভাষা হতেই উদ্ভূত। অর্থাৎ কোনো ভাষা একটি সামাজিক উপভাষা ছাড়া অন্যকিছু নয়।
সুনীতিকুমারের এই দাবিও কিন্তু জনজাতির অত্র অঞ্চলে সেটলার হওয়ার কালপর্বে আমাদের নিয়ে যায়। প্রশ্ন ওঠে মনে,—‘বিভিন্ন উপভাষা’ বলতে তিনি কী মিন্ করছেন? কারা এগুলোর ব্যবহারজীবী ছিলেন তখন? এসব উপভাষার মিশ্রণ যদি বাংলা ভাষার জন্ম দিয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে এখন যে-সিলেটি ভাষাকে অনেকে উপভাষা বলছেন, তা কি বাংলা ভাষা জন্ম নেওয়ার কালপর্বে ছিল? নাকি, পরে এসেছে?
সমস্যা এখানে জটিল। তা এ-কারণে,—সুনীতিকুমার ‘মাগধী-প্রাকৃত’ থেকে বাংলা ভাষার স্বীকৃত বিকাশপর্বকে অনির্দিষ্ট করে দিচ্ছেন। সেইসঙ্গে, উচ্চবর্ণের প্রসঙ্গও টানছেন তিনি। যেটি আবার আপনার আলোচনায় আসা মিশেল ফুকোর ক্ষমতাকাঠামোর রাজনীতিতে ভাষার আধিপত্য ও অবনমনের থিয়োরি দিয়ে বাজিয়ে দেখার তাগিদ তোলে।
আপনার আলোচনার শক্তির জায়গা মূলত এখানে। মান ভাষা তো মূলত উপভাষার মিশ্রণজাত একটি রূপ। যেটি সর্বজনবোধ্য বলে আমরা ধরে নিচ্ছি। যার ওপর ভর দিয়ে আঞ্চলিক ভাষাভাষি সকলের কাছে বোধগম্য উপায়ে পৌঁছানোর সড়কটি তৈরি হচ্ছে। এখন, ফুকোর থিয়োরি মেনে ভাষার রজনীতি তো নিশ্চয় রয়েছে সেখানে, এবং তা পৃথক প্রসঙ্গ রূপে আলোচনার দাবি রাখে যথেষ্ট। তথাপি, ফুকোর থিয়োরি ব্যবহার করে সিলেটিকে স্বতন্ত্র ভাষা রূপে প্রতিষ্ঠা দেওয়া কঠিন। এদিকটা আলোচক হিসেবে আপনি মনে হলো এড়াতে চেয়েছেন। এড়ানো কি যায় সত্যি?
মেনে নিচ্ছি, যুক্তরাজ্যে বাংলা মান ভাষার বেইল নেই। সিলেটি ভাষা সেখানে ফুকোর থিয়োরি অনুসারে মান ভাষার ওপর ডমিনেট করছে। প্রশ্ন হলো তা কি ক্ষমতা রাজনীতির কারণে সম্ভব হয়েছে? নাকি জনসংখ্যার একচেটে আধিপত্য ও নিজের সংস্কৃতিকে ধরে থাকার রক্ষণশীল মানসিকতা ও ঐতিহ্য এখানে মূল ভূমিকা রেখেছিল?
সিলেটিরা নিজের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এখনো প্রচণ্ডভাবে ধারণ করেন অন্তরে। ভাষা সেখানে অন্যতম। বাংলা মান ভাষায় তারা কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। সিলেটি হিসেবে আমি-আপনি কেউই তা করি না। এবং, আমার এতে সমর্থন আছে ষোলআনা। তথাপি… তথাপি… এই ডিনায়েলের পেছনে মূল কারণটি ইতিহাসের কোনো এক ধূসর কালপর্বে নিহিত বলে মনে হয়। যেখানে, সেটলার হিসেবে সিলেটিরা অন্য সেটলারদের ‘আবাদি’ বলে বুঝে নিচ্ছেন।
সৈয়দ মুজতবা আলীর কোনো এক লেখায় বোধহয় পড়েছিলাম,—সিলেটবাসীর লন্ডনমুখী হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল ফসল ফলানোর মতো অনুকুল পরিস্থিতি না থাকা। আপনি ইংরেজ আমলের দলিল-দস্তাবেজ যদি দেখেন, তাহলে দেখবেন,—ইংরেজ প্রশাসন রাজস্ব অদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে উদ্বিগ্ন। কারণ, পাহাড়-জঙ্গল ও জলাভূমির কারণে এখানে ফসলি জমি ল্যান্ড ডিমার্কেশনের অনুপাতে এক তৃতীয়াংশ ছিল। খেয়েপরে বেঁচে থাকা সহজ ছিল না অতটা। সুতরাং, ইংরেজ আমলের আগে থেকে সিলেট জনপদের মানুষ বাইরে ভাগ্যান্বেষণে বেরিয়েছেন। পরিযায়ী বা মাইগ্রেন্ট হওয়ার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় অন্য জায়গা থেকে লোকজনের এখানে আগমন ও সেটলার হওয়ার চেষ্টাকে সিলেটিরা নিজের জন্য অনুকূল ভাবেনি। যে-কারণে ‘আবাদি’ বলে তাদেরকে পৃথক দেখাটা রীতি হয়ে দাঁড়ায়।
ফুকোর থিয়োরি মেনে একে এখন ক্ষমতা রাজনীতির একটি দিক হয়তো বলা যেতে পারে, কিন্তু একে ছাপিয়ে বড়ো হয়ে উঠেছিল আত্মরক্ষার তাগিদ। সিলেটি মনস্তত্ব ও তার ডিএনএতে এটি পরে সাংস্কৃতিক রক্ষণশীলতায় মোড় নিয়ে থাকতে পারে। এর লাভক্ষতি কী তা পৃথক প্রসঙ্গ, তবে এর ফলে সিলেটিদের মধ্যে নিজের ভাষাকে হাতিয়ার করার ঝোঁক সম্ভবত প্রবল হয়েছিল। যুক্তরাজ্যে এর প্রতিফলন দেখছি এখন।
জনসংখ্যা এখানে ফ্যাক্টর মানতে হবে। যুক্তরাজ্যে অভিবাসী বাঙালির শতকরা নব্বই ভাগ সিলেটি ভাষার লোকজন দিয়ে বোঝাই হয়ে আছে। সেটলার হিসেবে তারা সেখানে শক্তিশালী সিলটি সমাজ হয়ে উঠেছেন। জন-অনুপাতের বিচারে ইংরেজির পরে যে-কারণে সিলেটি হচ্ছে দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত ভাষা। সংগতকারণে, সিলেটি ভাষা সেখানে বাংলা মান ভাষার কারণে অবনমিত নয়। জনসংখ্যার এই অনুপাত যদি এরকম না হতো, সেক্ষেত্রে মান ভাষাই হয়ে দাঁড়াত মুখ্য। ফুকোর থিয়োরি দিয়ে একে তখন বিচার করাটা কি যৌক্তিক থাকত সেভাবে?
গ. চর্যাপদের সঙ্গে সিলেটি ভাষার মিল সম্পর্কিত মুহম্মদ আসাদ্দর আলী ও সৈয়দ মুর্তাজা আলীর দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে কথা বলার মতো বিশেষজ্ঞ জ্ঞান আমার নেই। তবে বিষয়টি প্রচণ্ড কৌতূহল জাগিয়ে তোলে মনে। আলোচনার এই অংশটি উদাহরণ সহকারে বিস্তারিত হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। কেননা, এটি স্পর্শকাতর একটি দাবি তুলছে এখানে!
চর্যাপদের সাম্প্রতিক গবেষণা যে-পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, সেখানে এইটা ক্রমশ পরিষ্কার,—চর্যাপদ কোনোভাবেই বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন নয়। চর্যা গবেষক মামুন অর রশীদের কথাই ধরুন, তাঁর গবেষণার যেটুকুন আমরা জানি, সেখানে উনি এই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন ইদানীং।
চর্যাকে বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন দাবি করার মধ্যে একধরনের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি আছে বলে মামুন অর রশীদ মত দিচ্ছেন। যেহেতু, চর্যা কেবল সেইসময়কার বাঙালি বৌদ্ধ ভিক্ষুরা রচনা করেছেন, ঘটনা মোটেও তা ছিল না। নেপালে গোর্খাদের মতো নেওয়ারি নামের আদিবাসী সম্প্রদায়ের অস্তিত্বিক ইতিহাস ও বিবর্তন অতি পুরাতন। বৌদ্ধ যুগপর্বে বৌদ্ধভাবে মাথা মোড়ানো নেওয়ারি ভিক্ষুরাও চর্যা বেঁধেছেন ও গেয়েছেন। কেবল তাই নয়, চর্যাপুথির ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে বাংলা, মৈথিলি, নেওয়ারি ছাড়াও একাধিক ভাষার উপস্থিতি প্রমাণ করে সাধন তরিকার অংশ রূপে এগুলো রচিত ও গীত হয়েছিল সেইসময়। যেখানে, টীকাভাষ্য সংস্কৃতে লেখা, আর লিপি দেবনাগরী, নেওয়ার ও বাংলায় রচিত। কথা যেন বিকৃত না-হয়, সেজন্য এগুলো লিখে রাখা হতো।
দ্বিতীয়ত, মূল চর্যাপুথি হরপ্রসাদ শাস্ত্রী দেখে থাকলেও তাঁর হাতে এসেছিল এর প্রতিলিপি। এটি এখন কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটিতে সংরক্ষিত আছে বলে মামুন অর রশীদ জানাচ্ছেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সুবাদে পাওয়া চর্যাপুথির ভাষা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। কারো মতে এর ভাষা আদি বাংলা, কারো মতে কুটিল। অর্থোদ্ধারে দুরূহতার কারণে সান্ধ্যভাষা অভিধাটি পণ্ডিতরা দিয়েছিলেন।
মামুন অর রশীদের গবেষণা জানাচ্ছে,—নেপালে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর দেখা ও প্রতিলিপি, যেটি এখন বাংলা সাহিত্যের ছাত্র-শিক্ষক ছাড়াও সাহিত্য অনুরাগীরা পাঠ করে চলেছি, এটি ছাড়াও শত-শত পুথি রাজদরবারসহ একাধিক মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। তিনি এই তথ্যও দিচ্ছেন,—নেপালিরা চর্যাকে তাদের জাতীয় ইতিহাসে এভাবে বিজড়িত করেনি, যেমনটি বিংশ শতকের প্রথমদিকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সুবাদে বাঙালি বিদ্বানমহল করেছিলেন। তাঁর মতে, শাস্ত্রী মহাশয়ের আবিষ্কৃত চর্যাপুথি প্রতিলিপির ভাষা কেবল বাংলা নয়, বাংলা ও নেওয়ারের মিশ্রণ সেখানে রয়েছে।
দুটি মিলিয়ে তিনি মত দাঁড় করিয়েছেন : ”চর্যাপদ নেপাল ও বাংলাদেশ সন্নিহিত অঞ্চলের যৌথ সংস্কৃতির ফল।” যদি তাই হয়, সেক্ষেত্রে চর্যাপদে সিলেটি ডায়ালেক্টের প্রভাব নিয়ে বোধহয় আরো সবিস্তার হওয়া প্রয়োজন ছিল। অন্যথায় এ-নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি ও গোল বাঁধার সম্ভাবনা থাকছে। যেহেতু, চর্যায় চাঁটগা অঞ্চলের ভাষিক সূত্রও তো আছে বলে জানি। চাঁটগাইয়া কোনো বৌদ্ধ শ্রমণ হয়তো চর্যায় তা ঢুকিয়েছেন। সিলেটিও থাকতে পারে। স্রেফ এর ওপর দাঁড়িয়ে সিলেটিকে স্বতন্ত্র ভাষা রূপে মত প্রতিষ্ঠা কিন্তু দুরূহ।
আপাতত এই তিনটিকে পিনপয়েন্ট করছি এখানে। আরো কিছু ভাবনা ও প্রশ্ন আছে মনে! সেগুলো আপনার থেকে সবিস্তারে জানতে পারলে তুলব ভাবছি। সুখ্যপাঠ্য ও সারগর্ভ আলোচনাটি পাঠের সুযোগ দিলেন বলে ধন্যবাদ জানবেন।
. . .

সেতু ভাইকে ধন্যবাদ লেখাটি শেয়ার করার জন্য। খুব সম্ভবত এটি আপনার পিএইচডি গবেষণার একটি অংশ;—এবং সে অর্থে এর গুরুত্ব নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিশেষ করে আপনি যেভাবে ভাষাকে কেবল ব্যাকরণগত কাঠামো হিসেবে না দেখে তার সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতির ভেতরে স্থাপন করেছেন, সেই জায়গাটি অত্যন্ত শক্তিশালী। কেন একটি ভাষা টিকে থাকে, কেন আরেকটি হারিয়ে যায়,—এই প্রশ্নকে আপনি সময়ের ধারাবাহিকতার ভেতরে এনে দেখেছেন;—এই দৃষ্টিভঙ্গি নিঃসন্দেহে প্রাসঙ্গিক।
আপনার লেখার সূত্র ধরে হিব্রু ভাষার পুনর্জাগরণ কিংবা ইদ্দিশ ভাষার পতন ও সীমিত পুনরুত্থানের প্রসঙ্গ মনে পড়ে; যা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে, ভাষা কেবল ভাষা নয়, এটি রাজনৈতিক ইচ্ছা, সামাজিক কাঠামো ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেরও ফসল।
আমি ধরে নিচ্ছি, লেখাটি নিখাদ গবেষণার জায়গা থেকে লেখা;—এর বাইরে কোনো প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। তবুও কৌতূহল থেকে কিছু প্রশ্ন সামনে আসে, যেগুলো আলোচনাকে আরও স্পষ্ট ও পরিপূর্ণ করতে পারে। প্রথমে বলা দরকার, লেখাটি একটি সংবেদনশীল জায়গায় হাত দিয়েছে—‘সিলেটি কি ভাষা, না উপভাষা?’। এই প্রশ্নটি ভাষাবিজ্ঞানের হলেও এর প্রভাব সহজে সমাজ-রাজনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। ভাষাগত পার্থক্যকে যদি পরিচয়ের একমাত্র ভিত্তি করা হয়, তাহলে তা আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের দিকে মোড় নিতে পারে। আপনি সরাসরি সেই অবস্থান নেননি, কিন্তু লেখার ভেতরে একটি সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে বলে মনে হয়েছে;—অবশ্য আমার এই ‘মনে হওয়াটা’ ভুলও হতে পারে।
উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর উত্তর আপনার পূর্ণাঙ্গ থিসিসে থাকতে পারে। না পড়ার কারণে সেগুলো মিস করে যেতে পারি;—এই সীমাবদ্ধতা আগেই স্বীকার করে নিচ্ছি। শুরুতেই বলে নিচ্ছি :—সিলেটি ভাষাকে সাংস্কৃতিক সত্তা হিসেবে আপনি সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। লোকগান, আঞ্চলিক অভিব্যক্তি, পুঁথি… এসবের ভেতর দিয়ে যে- জীবনজগত ধরতে চেয়েছেন, তা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ‘ভাষা বনাম উপভাষা’ প্রশ্নটিকে ক্ষমতা-কাঠামোর ভেতরে এনে যে-পাঠ তৈরি করেছেন, তা সমসাময়িক সমাজভাষাবিজ্ঞানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এই জায়গায় আপনার লেখাটি জরুরি হয়ে ওঠে।
তবে একইসঙ্গে বাস্তবতার দিকে তাকানো দরকার বলে মনে হয়। সিলেটি ভাষা এখন পর্যন্ত লেখার ভাষা হিসেবে বড়ো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অর্জন ও স্বীকৃতি আদায় করতে পারেনি। এর কোনো মান্য বানানরীতিও গড়ে ওঠেনি। বিস্তৃত লিখিত সাহিত্যধারা তৈরি হয়নি। শিক্ষা ব্যবস্থায় এর ব্যবহার নেই। প্রশাসনিক বা একাডেমিক ক্ষেত্রেও উপস্থিতি সীমিত। অর্থাৎ, এটি একটি শক্তিশালী কথ্য ভাষা হলেও লিখিত ও প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এই বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে কেবল সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের ভিত্তিতে একে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার প্রশ্ন কিছুটা অসম্পূর্ণ মনে হয়। এই জায়গা থেকে কিছু প্রশ্ন মাথায় আসে, যেগুলো না তুললে আলোচনাটি যেন অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে!
কথ্য ভাষার শক্তি নিঃসন্দেহে আছে, কিন্তু সেই শক্তি কি লিখিত ভাষায় রূপান্তরিত হওয়ার মতো সুসংহত ভিত্তি তৈরি করতে পেরেছে? সিলেটি ভাষায় এমন কোনো সাহিত্যকর্ম কি রচিত হয়েছে, যাকে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় আনতে পারি? লোকগান নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ, কিন্তু সেগুলো মূলত কথ্যরূপের ওপর দাঁড়িয়ে। সেই জায়গা থেকে কি উৎকৃষ্ট কবিতা, গল্প বা উপন্যাসের ধারাবাহিক লিখিত সাহিত্য গড়ে উঠেছে? যদি না হয়ে থাকে, তাহলে ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটিকে কি সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখা যায় না?
নাগরী লিপির প্রসঙ্গও তোলা যেতে পারে। এর একটি সাংস্কৃতিক ভিত্তি ছিল;—এ-নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, যদি সেই ভিত্তি কিছুটা হলেও শক্তিশালী হতো, তাহলে এটি প্রায় সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেল কেন? স্বাতন্ত্র্যবোধের জায়গা থেকে যদি এই লিপির উৎপত্তি ও ব্যবহার শুরু হয়ে থাকে, তাহলে কোনো-না-কোনোভাবে কি এর ব্যবহার টিকে থাকার কথা ছিল না? ইতিহাসে আমরা দেখি—যে-লিপির পেছনে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে ওঠে, তা রূপান্তরিত হলেও একেবারে হারিয়ে যায় না। সেই তুলনায় নাগরী লিপি ধীরে ধীরে ব্যবহারের পরিসর হারিয়েছে, এবং আজ প্রায় হারিয়েই গেছে। এতে মনে হয়, এর প্রাসঙ্গিকতা মূলত একটি সীমিত ঐতিহাসিক পরিসরে আবদ্ধ ছিল, এবং বৃহত্তর ভাষিক কাঠামোর সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারেনি।
আরেকটি প্রশ্ন—ইংল্যান্ডে সিলেটি ভাষার ব্যবহারকে আমরা প্রায়ই গুরুত্ব দিয়ে দেখি। কিন্তু এই ব্যবহার কি কথ্যরূপের বাইরে কোনো নতুন লিখিত বা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ তৈরি করেছে? নাকি এটি মূলত প্রবাসী পরিচয়ের অংশ হিসেবে কথ্য ভাষার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে?
এই প্রশ্নগুলো বিরোধিতার জায়গা থেকে নয়, বরং আলোচনাকে আরও স্পষ্ট ও গভীর করার উদ্দেশ্যে। আপনার লেখাটি নতুন করে ভাবার অবকাশ তৈরি করেছে। তবে সেই ভাবনার গভীরে গিয়ে ভাষাটির বাস্তব অর্জন, সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনাকে আরও নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন বলে মনে হয়। মিনহাজ ভাইও ইতোমধ্যে লেখাটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আপনার লেখা নিয়মিতভাবে পড়ার সুযোগ পাবো এই প্রত্যাশা রাখি।
আরেকটি বিষয়—আপনার লেখায় একজায়গায় উল্লেখ করেছেন, বোধগম্যতার মাত্রার বিচারে সিলেটি ও প্রমিত বাংলাভাষীদের সম্পর্কটি একটি অসম পারস্পরিক বোধগম্যতার (asymmetrical intelligibility) উদাহরণ। বাস্তবে দেখা যায়, সিলেটিভাষীরা শিক্ষা, গণমাধ্যম ও প্রশাসনিক ব্যবহারের কারণে প্রমিত বাংলা তুলনামূলক সহজে বুঝতে পারেন, কিন্তু প্রমিত বাংলাভাষীদের কাছে সিলেটি অনেকসময় দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে,—ধ্বনি, টোন, রূপতাত্ত্বিক গঠন ও শব্দভাণ্ডারের ভিন্নতার কারণে। এর ফলে একটি একমুখী (unidirectional) বোধগম্যতার পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাই ভাষাবিচারে সিলেটিকে একটি স্বতন্ত্র রূপ হিসেবে বিবেচনার সুযোগ তৈরি হয়।
একই যুক্তি প্রয়োগ করলে চট্টগ্রাম, নোয়াখালি, বরিশাল কিংবা রংপুর অঞ্চলের ভাষাগুলোর ক্ষেত্রেও কি অনুরূপ দাবি উত্থাপন করা যায় না? সেখানেও তো প্রমিত বাংলাভাষীদের জন্য বোধগম্যতার ঘাটতি রয়েছে, আর স্থানীয় ভাষাভাষীরা তুলনামূলকভাবে প্রমিত বাংলা সহজে বুঝতে সক্ষম। আপনি অবশ্য একইসঙ্গে উল্লেখ করেছেন,—এর চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণে সামাজিক ও রাজনৈতিক উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
. . .

সিলেটি ভাষা/উপভাষা প্রসঙ্গ➿
মিনহাজ ভাই, জাভেদ ভাই, সেতু ভাই! সিলেটি ভাষা কি ভাষা না উপভাষা—এই প্রশ্নটি এখন আর কেবল সংজ্ঞার সীমার মধ্যে আটকে নেই;—এটি বরং পরিচয়, ইতিহাস, ক্ষমতা এবং ভাষাতাত্ত্বিক বাস্তবতার এক জটিল আন্তঃসম্পর্কে এসে দাঁড়িয়েছে।
আলোচনার শক্তি যেমন এর বিস্তারে, তেমনই এর ঝুঁকিও সেই বিস্তারের মধ্যেই। কারণ একদিকে নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস, অন্যদিকে প্রবাসী জনসংখ্যার প্রভাব, আবার তৃতীয়দিকে চর্যাপদ, নাগরী লিপি বা ফুকোর ক্ষমতা-তত্ত্ব মিলিয়ে এমন-এক ঘন ব্যাখ্যাজাল তৈরি হয়েছে, যেখানে ভাষার কঠোর বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড অনেক সময় পরিচয়-আবেগ ও রাজনৈতিক পাঠের ভিতরে ঢুকে পড়ছে। নৃতাত্ত্বিক উৎস বা ডিএনএ ট্র্যাকিংয়ের প্রসঙ্গ এখানে কৌতূহল জাগালেও ভাষার শ্রেণিবিন্যাসে তা নির্ধারক হতে পারে না, কারণ ভাষা কোনও জনগোষ্ঠীর জৈবিক ধারাবাহিকতা নয়; এটি সামাজিক যোগাযোগের ইতিহাস ও পরিবর্তনের ফল। একই জনগোষ্ঠী একাধিক ভাষা গ্রহণ করতে পারে, আবার ভিন্ন জনগোষ্ঠী একই ভাষিক পরিসরে মিশে যেতে পারে। তাই ‘সিলেটিরা কারা ছিল’ প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও ‘সিলেটি ভাষা কী’—এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর তা হতে পারে না।
একইভাবে যুক্তরাজ্যের প্রবাসী বাস্তবতায় সিলেটির সংখ্যাগরিষ্ঠতা একটি বাস্তব সামাজিক তথ্য, কিন্তু সেটি ভাষার মর্যাদা বা শ্রেণি নির্ধারণ করে না। সেখানে যা ঘটছে, তা হল ভাষার একটি নতুন সমাজে পুনর্গঠিত ব্যবহারক্ষেত্র তৈরি হওয়া। অর্থাৎ এটি ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং ব্যবহারিক আধিক্যের পুনর্বিন্যাস। ফুকোর দৃষ্টিকোণ এখানে ব্যাখ্যামূলকভাবে সহায়ক হলেও একমাত্র নির্ধারক কাঠামো নয়।
চর্যাপদ প্রসঙ্গেও একই সতর্কতা প্রযোজ্য। এটিকে একক কোনও আধুনিক ভাষার সরাসরি উৎস হিশেবে দেখা যেমন সমস্যাযুক্ত, তেমনি একে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বহুভাষিক পাঠ হিশেবে সরলীকরণ করাও যথেষ্ট নয়। চর্যাপদ ছিল একটি বহুভাষিক ও বহুআঞ্চলিক সাংস্কৃতিক পরিসরের কাব্যভাষা, যেখানে বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপের মিশ্রণ স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সেখান থেকে সরাসরি সিলেটি বা অন্য কোনও আধুনিক উপভাষার প্রমাণ টেনে আনা বৈজ্ঞানিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
নাগরী লিপির প্রসঙ্গও এখানে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একইসঙ্গে সীমিত। কোনও লিপির বিলুপ্তি ভাষার স্বাতন্ত্র্যকে অস্বীকার করে না; কারণ লিপি টিকে থাকা বা হারিয়ে যাওয়া অনেক সময় রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উপর নির্ভরশীল। ভাষা নিজে দীর্ঘ সময় কথ্য পরিসরে টিকে থাকতে পারে, এমনকী লিপি হারালেও, সিলেটির ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছে।
একইভাবে লিখিত সাহিত্য না-থাকাকে ভাষার ‘অপূর্ণতা’ হিশেবে দেখা একটি মানকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা আধুনিক ভাষাতত্ত্বের একমাত্র মানদণ্ড নয়। বহু ভাষাই দীর্ঘ সময় কেবল কথ্যরূপে টিকে থেকেছে, পরে লিখিত সাহিত্য তৈরি করেছে। তাই লিখিত ঐতিহ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা ভাষা হওয়ার একমাত্র শর্ত নয়।
এইসব মিলিয়ে মূল প্রশ্নটি দাঁড়ায় মানদণ্ডের প্রশ্নে। যদি মানদণ্ড হয় পারস্পরিক বোধগম্যতা, ধ্বনি-ব্যাকরণগত স্বাতন্ত্র্য এবং দীর্ঘস্থায়ী ভাষিক বিবর্তন, তাহলে সিলেটির ভিন্নতাকে অস্বীকার করা কঠিন। আবার যদি মানদণ্ড হয় প্রমিত বাংলার সঙ্গে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা ও বৃহত্তর বাংলা ভাষাপরিবারের সংযোগ, তাহলে একে উপভাষা-কাঠামোর মধ্যেই দেখা যৌক্তিক।
এই দ্বৈত অবস্থানই সম্ভবত সবচেয়ে বাস্তবসম্মত স্বীকৃতি। কারণ ভাষা কোনও স্থির শ্রেণি নয়; এটি একটি চলমান সামাজিক প্রক্রিয়া, যেখানে একইসঙ্গে কেন্দ্র ও প্রান্ত, মান ও আঞ্চলিকতা, ক্ষমতা ও ব্যবহার একসঙ্গে কাজ করে। সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে সিলেটি একদিকে বাংলা ভাষাপরিবারের অংশ, অন্যদিকে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র এক ভাষিক অভিজ্ঞতা।
এই বিতর্কের কোনও চূড়ান্ত লেবেল নির্ধারণের চেয়ে বরং এটুকু বোঝা বেশি জরুরি যে,—সিলেটি ভাষা/উপভাষা প্রশ্নটি আসলে ভাষা কীভাবে সমাজ, ইতিহাস ও ক্ষমতার সঙ্গে মিশে নিজের রূপ নির্মাণ করে, তারই একটি জটিল ও চলমান উদাহরণ।
. . .

সিলেটি ‘ভাষা’ ‘উপভাষা’ বিতর্ক-২
সেতু ভাইয়ের আলোচনাটি গবেষণা অভিসন্দের্ভের অংশ, তা আমারও মনে হয়েছে জাভেদ। মূল গবেষণার নির্যাস যেখানে তিনি সন্নিবেশ করেছেন। সম্পূর্ণ গবেষণাপত্র পাঠ না-করে কাজেই মন্তব্য ও আলোচনা কিছুটা অসুবিধাজনক। তারপরেও মূল কথাগুলো এখানে ভালোই এসেছে মনে করি, এবং একে ভিত্তি মেনে পাঠ হতে পারে। তো এই জায়গা থেকে আমার বলেও না-বলা কথাগুলো আপনি সামনে এনেছেন। সেতু ভাই আশা করি সব মিলিয়ে ব্যাখ্যা করবেন পুরো বিষয়টি। তাতে আমাদের পঠনে কোনো বোঝার সীমাবদ্ধতা যদি থাকে, তা দূর ও স্পষ্ট হবে।
সে যাকগে, সিলেটি ভাষা স্বয়ং একটি ‘স্বতন্ত্র ভাষারূপ’ নাকি ‘উপভাষা’ এই বিতর্কে সেতু ভাইয়ের গবেষণাপত্রের শক্তিশালী জায়গা দুটি। একটি অবশ্যই ভাষাতত্ত্বের জায়গা থেকে বিতর্কের যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখার চেষ্টা। ভাষাতত্ত্বের কোন মডেল ধরে বিষয়টি দেখা হচ্ছে, তা যদিও আমার কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। কথার কথা, কৌতূহলবশত আমরা যদি গুগলিং করি বা এআইর সঙ্গেও আলাপ করি প্রাথমিক, তারা চট করে একাধিক মডেল সামনে আনবে। আমি মনে করেন সেটি এখন করছি। ‘ভাষা’ ও ‘উপভাষা’-র সুরাহায় গুগল মামা যেসব মডেল সামনে আনলেন, সেগুলো চটজলদি দেখে নেওয়া যাক। প্রয়োজনে পরে আরো বিস্তারে যাওয়া যাবে…
ক. পারস্পরিক বোধগম্যতা তত্ত্ব (Mutual Intelligibility Criterion) : এই মডেল জানাচ্ছে, দুটি ভাষা (যেমন সিলটি ও চাটগাঁইয়া) পরস্পর থেকে ভিন্ন, কিন্তু তা-সত্ত্বেও ব্যবহারকারী একে অন্যের ভাষা বুঝতে সক্ষম। যদি তাই হয়, তাহলে তারা ‘উপভাষা’। তা যদি না হয় (যেমন সিলেটি বাংলা ও হিন্দি বা উর্দু), সেক্ষেত্রে তারা পৃথক ‘ভাষা’। হিন্দি ও উর্দু অবশ্য পরস্পরের নিকটবর্তী ও বোধগম্য অনেকখানি। এরা-যে পৃথক ভাষা হলেন, তার পেছনে লিপি ও অন্যান্য সমাজ-ভাষাতাত্ত্বিক কার্যকরণ রয়েছে।
খ. সমাজভাষাতাত্ত্বিক মডেল (Sociolinguistic Models): উইলিয়াম ল্যাবভের তত্ত্ব থেকে জন্ম নেওয়া এই মডেল আমাদের একটি ভাষা কোন-কোন সামাজিক গোষ্ঠী (Social group), শ্রেণী (Class) ও বয়সের মানুষ ব্যবহার করছেন, তা ব্যাখ্যা করে। গুগল এখানে মজার তথ্য দিচ্ছেন, আর তা হলো : ‘উপভাষা যখন খুব বেশি সামাজিক কুসংস্কার বা শ্রেণীর দ্বারা চিহ্নিত হয়, তখন তাকে মান ভাষা (Standard Language) থেকে আলাদা করে দেখা হয়।’ কথাটি সম্ভবত এটা বোঝায়-যে, কোনো ভাষাগোষ্ঠী যখন তার ব্যবহৃত ভাষার ব্যাপারে অতি রক্ষণশীল হয়ে ওঠে ও সচরাচর অন্য ভাষাকে (এখানে ধরেন বাংলা ভাষার বর্তমানে প্রচলিত মান্য রূপ) নিজ ভাষায় সহজে একসেস দিতে চায় না, তখন ল্যাবভের মডেল মেনে একে আপনি ‘উপভাষা’ চাইলে বলতে পারছেন। বলাটা কতখানি যৌক্তিক, তা পৃথক আলোচনার বিষয়।
গ. মানকরণ বা কোডিফিকেশন তত্ত্ব (Standardization & Codification) : একটি ভাষার লিপিসম্মত লিখিত রূপ ও ব্যাকরণ যদি না থাকে, সেটিকে সহজে আপনি ‘উপভাষা’ রূপে চিহ্নিত করতে পারছেন। এই ভাষার সাহায্যে যোগাযোগ সম্ভব, কিন্তু লিপির অনুপস্থিতি লিখিত রূপে তার চর্চাকে অসম্ভব করে তোলে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিসরে তখন তাকে স্বতন্ত্র ভাষা রূপে ব্যবহার করা কঠিন হয়।
ঘ. ডায়ালেক্টোলজির মডেল (Dialectology & Isogloss) : ভৌগলিক পরিসীমা থেকে ভাষার বিবর্তন নিয়ে এটি কাজ করে। এখানে ‘আইসোগ্লোস’ নামক অভিধাটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কোনো ভৌগলিক মানচিত্রে নির্দিষ্ট কোনো ভাষার ভাষিক বৈশিষ্ট্য (যেমন, একটি বিশেষ শব্দের উচ্চারণ বা ব্যাকরণ) যেখানে শেষ হয়, সেই সীমারেখাকে বলা হয় আইসোগ্লোস। এরকম আইসোগ্লাসের আধিক্য যদি থাকে, সেক্ষেত্রে একে উপভাষা বলে ধরে নেয় এই মডেল।
ঙ. ভাষা ধারাবাহিকতা বা কন্টিনুয়াম (Dialect Continuum) : ভৌগলিক অবস্থান ও দূরত্বের নিরিখে একটি ভাষিক জনগোষ্ঠীর ওপর অন্য ভাষিক জনগোষ্ঠীর বিনিময় ও প্রভাব থেকে ভাষার বিবর্তনকে এটি আমলে নেয়। এর সাহায্যে ‘ভাষা’ না ‘উপভাষা’ তা বোঝার চেষ্টাও করে। এখানে, গুগল মামা ভালো উদাহরণ দিচ্ছেন। যেমন, সীমান্তলগ্ন দুটি ভিন্নভাষী মানুষ যতটা পরস্পরের ভাষা বোঝে, যত দূরবর্তী হতে থাকে, বোঝাটা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়! এই সূত্রে ইবনে ইবনে খালদুনের ‘আল মুকাদ্দিমা’র কথা ইয়াদ করতে বাধ্য হচ্ছি। ভাষা ধারাবাহিকতা বা কন্টিনুয়ামের জায়গাটি তাঁর অনুসন্ধানে আমরা পাই। বইয়ের এক জায়গায় (যদি স্মরণশক্তি প্রতারণা না করে) পড়েছিলাম, আরবি ভাষা কীভাবে নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর রূপ পালটাচ্ছে, তা তিনি উল্লেখ করেছিলেন। অর্থাৎ, দূরত্ব যত বাড়ছে, মূল ভাষারূপ থেকে তার বোধগম্যতা মুখের বুলি ও উচারণরীতির কারণে পালটে যায়। ‘ভাষা’ ও ‘উপভাষা’ নির্ণয়ে এটি একটি চমৎকার মডেল বলে আমার ধারণা।
চ. ফাংশনাল বা কার্যকরী দৃষ্টিভঙ্গি (Functional Definition) : মাইকেল হ্যালিডের বিখ্যাত এই মডেলও ‘ভাষা’ এবং ‘উপভাষা’র চরিত্র নির্ধারণে কার্যকর। তিনি সহজ পথ বেছে নিচ্ছেন, আর তা হলো, ঘরোয়া বা ছোট পরিসরে ব্যবহৃত হলে তা ‘উপভাষা’র বৈশিষ্ট্য ধারণ করছে। আর, বৃহৎ পরিসরে ব্যবহৃত হললে তাকে স্বতন্ত্র ভাষারূপ বলা যেতে পারে। তাঁর এই মডেল যদিও মিশেল ফুকো হাতে নিলে টিকবে না অতটা। ক্ষমতা-রাজনীতি অনেকসময় ভাষার পরিসরকে এমনভাবে নির্ধারণ করে দেয়, একে তখন উপেক্ষা করা কঠিন হয়। সংস্কৃত তো সাধারণের ভাষা ছিল না, কিন্তু ক্ষমতাকেন্দ্র একে এমন শক্তি দিয়েছিল, যার জোরে এটি একক ভাষায় রূপ নেয়, এবং এখান থেকে পরে আরো অনেক উপভাষার জড় আমরা পাচ্ছি। কৃত্রিম ভাষা রূপে সংস্কৃত হয়তো উপভাষার সংমিশ্রেণে আদিতে তৈরি হয়েছিল। দেবভাষা এই মিথটি এখানে বর্জনীয় অবশ্যই। কেননা, এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
ছ. ডাচস্পরাখ তত্ত্ব (Dachsprache – ‘Roof Language’): গুগল মামার মতানুসারে এটি এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে বিভিন্ন উপভাষার ওপর একটি সাধারণ ‘মান’ বা ‘আদর্শ’ ভাষা ‘ছাদ’ (roof) হিসেবে কাজ করে। যেমন, জার্মানির বিভিন্ন উপভাষা যা আলাদা হলেও স্ট্যান্ডার্ড জার্মান তাদের ওপর ছাদ হিসেবে কাজ করে, তাই তাদের উপভাষা বলা হয়।
তাৎক্ষণিক এই নির্যাস এখানে পেশ করছি এ-কারণে-যে, সিলেটি কি ‘স্বতন্ত্র ভাষারূপ’ অথবা ‘উপভাষা’… এ-প্রশ্নের সুরাহায় সেতু ভাই কোন মডেলকে ‘মান’ ধরছেন, তা আলোচনা থেকে স্পষ্ট নয়। হয়তো মূল থিসিসে তা আছে। হতে পারে, তিনি এগুলোকে মোটের ওপর এড়িয়ে গিয়ে অন্য প্রসঙ্গে ফোকাস করেছেন। যদিও, কোনো-না-কোনো একটি মডেল অথবা একাধিক মডেল ছাড়া ‘ভাষা’ ও ‘উপভাষা’র মীমাংসা তাঁর জন্যও কঠিন থাকছে। যার ফলে, সেতু ভাইয়ের আলোচনার সকল ভর গিয়ে পড়েছে মিশেল ফুকোর ওপর। ফুকোকে সেই হাতিয়ার হিসেব তিনি ব্যবহার করতে চেয়েছেন, যেটি সিলেটি ভাষা ‘স্বতন্ত্র ভাষা’ অথবা ‘উপভাষা’… এই তর্কে একটি মত প্রতিষ্ঠা করতে পারে। সংগতকারণে, এখানে সংকীর্ণ আঞ্চলিকতা ও আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের ঝুঁকি থাকছে। সেতু ভাইয়ের হয়তো এটি উদ্দেশ্য নয়, তবে আলোচনার সুরে তা প্রচ্ছন্ন নেই, এ-কথা ক্যামনে বলি। আশা করি তিনি এটি নিজের জায়গা থেকে পরিষ্কার করবেন। ভুল বুঝে থাকলে তার নিরসন হবে তাহলে।
. . .

ধন্যবাদ, প্রিয় আহমদ মিনহাজকে।
ক. আমি মূল থিসিসে নৃতত্ত্বকে খুব গুরুত্ব দিয়েছি, বিশেষ করে ভাষাতাত্ত্বিক স্ট্রাটাম তৈরির ব্যাপারে। এখানে বিষয়টির যে-গ্যাপ রয়ে গেছে আমিও বুঝেছিলাম। সেটা পরিসরের কারণেও। তা আপনি উপলব্ধি করেছেন এবং ধরিয়ে দিয়েছেন এজন্য ধন্যবাদ। সিলেটি ধ্বনি, রূপমূল, টোন ইত্যাদিতে আর্য-অনার্য অনেক জনজাতির উপাদান স্বীকৃত। ডিএনএ ট্র্যাকিং নিয়ে কাজ এখানে হয়নি।
খ. সুনীতিকুমারের সূত্রমতে অপভ্রংশ স্তর পেরোনোর সময় স্ব স্ব স্থানে আলাদা আলাদা স্থানিক ভাষারূপ ছিল, এগুলোকেই তিনি উপভাষা বলে থাকবেন। বিষয়টি আসলেই জটিল। আমিও ভেবেছি এ-নিয়ে। এই সমস্যার সমাধান পাইনি এখনও।
ফুকোর থিয়োরি ভাষার স্বতন্ত্রতা বিচারের একটি নিক্তি, তবে তার আগে ভাষারূপ ও অন্যান্য শর্তও ভাষাকে পূরণ করতে হয়। এক্ষেত্রে আলোচক হিসেবে এড়িয়ে যাওয়ার অবকাশ নেই। আমি বিষয়টির অবতারণা করেছি মাত্র। এ-নিয়ে স্বতন্ত্র আলাপ-বিচারের প্রয়োজন আমি স্বীকার করি।
গ. বিলাতে বাংলার উপরে সিলেটের গ্রহণযোগ্যতায় ভাষাভাষীর সংখ্যাকে আপনি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে দেখেছেন। আমিও তা মনে করি। তবে এছাড়াও আমার মনে হয় কমিউনিটির ঐতিহ্য, ভাষিক পরিচয়সূত্রে গোষ্ঠীচেতনা (সিলেটি পরিচয়), রক্ষণশীলতা, সংস্কৃতি : সাংস্কৃতিক কার্যক্রম আমার মনে হয় একধরনের ক্ষমতা তৈরি করে। যে-ক্ষমতা বিলেতের সরকারকে ভাষাটির ব্যবহারকে বাধ্য করে তোলে। আসলে এছাড়া সরকারের দ্বিতীয় অপশন ছিল না। সিলেটির ওপরে মান বাংলা চাপিয়ে দিলে সিলেটিরা তা মানতও না; বাস্তবতাও এমন ছিল না। সুতরাং আংশিক হলেও তা ক্ষমতাসূত্রে সম্পর্কিত।
ঘ. শ্রদ্ধেয় আসাদ্দর আলী মহোদয় সিলেটিকে আলাদা ভাষা মনে করতেন। তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন চর্যাপদ সিলেটিতে রচিত। সৈয়দ মুর্তাজা আলী চর্যার ভাষার সঙ্গে সিলেটির সাদৃশ্য খুঁজেছেন।… অবশ্যই এটা সংবেদনশীল বিষয়। আজকাল আমিও মনে করি চর্যা বাংলা নাও হতে পারে। চর্যার সঙ্গে বাংলা বা সিলেটির মিলটা স্বাভাবিক এ-কারণে-যে, নতুন ভারতীয় আর্যভাষার পরস্পরের রূপে সমান মিল রয়েছে; কারণ তাদের উৎস এক। তাই মৈথিলি, অসমিয়া, উড়িয়া, ভোজপুরিয়া এমনকি হিন্দির দাবিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তারা করেও আসছে। চর্যা কোনো বিশেষ ডায়েলেক্ট না হয়ে পালির মতো সাহিত্যিক ভাষাও হওয়া সম্ভব। তাই আমিও মনে করি কতিপয় শব্দ, ক্রিয়ার রূপ ইত্যাদি দিয়ে চর্যাকে সিলেটি দাবি প্রশ্নসাপেক্ষ। আপনি ঠিকই বলেছেন সিলেটি যদি এ-দাবি করে চাটগাঁয়ের দোষটা কোথায়?
মনোযোগ দিয়ে পাঠ করে প্রবন্ধের সীমাবদ্ধতাগুলো যুক্তি সহ তুলে ধরার জন্য আবারো আপনাকে ধন্যবাদ জানাই।
. . .

সিলেটি ‘ভাষা’ ‘উপভাষা’ বিতর্ক-৩
‘ডিএনএ ট্র্যাকিং’ কথাটি আমি মনে হয় পরিষ্কার করতে পারিনি বাবুল ভাই। সেতু ভাই মনে হলো ধরতে পেরেছেন কী বোঝাচ্ছি এটি দিয়ে। কেননা, মাত্র তিনি ক্লিয়ার করেছেন, তাঁর মূল অভিসন্দর্ভে (থিসিস শব্দখানার পরিভাষা ‘অভিসন্দর্ভ’ সম্ভবত পরম শ্রদ্ধেয় তপোধীরদা করেছিলেন। আমার পছন্দের।) জনজাতির নৃতাত্ত্বিক বিবর্তনের জায়গা থেকে ভাষার উৎস ও উৎপত্তি নিয়ে সবিস্তারে আলোচনা করেছেন।
ডিএনএ ট্র্যাকিং এখানে এসে এখন কার্যকর ধরা হয়। এর ফলে একটি জনগোষ্ঠীর স্থানান্তরের ইতিহাস যেমন অনুসরণ করা যায়, তার সঙ্গে অন্য জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণের বয়ান-মানচিত্রও তৈরি করে নেওয়া সহজ হয়। তার ভাষা ব্যবহারের আদি উৎস কী ছিল, এবং পরে কী দাঁড়িয়েছে, তার একটি রূপরেখা আমরা পাই। এটি ‘ভাষা’ ও ‘উপভাষা’ নির্ণয়ে বেশ সাহায্য করে। স্মরণ রাখা দরকারি, ডিএনএ লিপিতে লিখিত ও ক্রোমোজম বিনিময়ে স্থানান্তরতি রাসায়নিক সংকেত কোনো অনড়-অটল বিষয় নয়। দীর্ঘ কালপর্বে তা যেমন মানবদেহে বাহিত হয়, বারবার কপিপেস্ট হতে থাকে, অভিযোজনের ধারায় তাতে কিছু-না-কিছু পরিবর্তন, সংযোজন, বিয়োজন সবসময় ঘটে চলেছে।
মানবদেহের জিন মানচিত্র আমাদেরকে জানায়, সেখানে সক্রিয় ডিএনএর সংখ্যা বেশি হলে ৫ শতাংশ। বাকি ৯৫ শতাংশ নিষ্ক্রিয় বা জাঙ্ক রূপে দেহকোষে পড়ে থাকে। যদিও দেহকোষ আবার এগুলোকে বাদ দিয়ে গঠিত হওয়ার নয়। অর্থাৎ, আমরা জাঙ্ক বয়ে বেড়াচ্ছি, এবং এগুলোর কোনো একটি জিনোম বিবর্তনের ধারায় পুনরায় সক্রিয় হবে না, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।
যেমন ধরেন, পুরুষ মানবদেহে স্তন চুপসে গিয়ে ভেস্টিয়াল বা মৃত জিন হিসেবে দেহে পড়ে আছে। মূল কারণ, বিবর্তনে পুরুষের হরমোন দুগ্ধ উৎপাদনে ভূমিকা রাখেনি, যেটি নারীস্তন রেখেছিল। তো এভাবে, ভাষা ব্যবহারের ধারা বুঝতে একটি জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক বিবর্তনকে যদি ডিএনএ ট্র্যাকিং করা যায়, তাহলে এমনসব মিসিং লিংক বেরিয়ে আসতে পারে, যা পুরো বিষয়টির ওপর নতুন করে আলোকপাতে সাহায্য করতে পারে। আমি সেই জায়গা থেকে প্রসঙ্গটি তুলেছি।
এখানে এতটা সরাসরি একে খারিজ করার আগে আপনাকে বিবেচনায় নিতে হচ্ছে এর পরীক্ষণ সম্ভাব্যতা। মানবজ্ঞানের এলাকাগুলো এখন একটা আরেকটার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। আর ভাষাতত্ত্ব কিন্তু নিখাদ বিজ্ঞান হিসেবে স্বীকৃত। এ-কথা আমরা অনেকসময় খেয়াল করি না। যেখানে, মানবশাস্ত্রের সকল অঞ্চল কিংবা তত্ত্ব বা মডেল দরকারি হয়ে উঠতেও পারে কোনো একটি বিষয়ে মীমাংসায় পৌঁছানোর জন্য।
. . .

ডিএনএ ট্র্যাকিং প্রসঙ্গটি এখানে মূলত ভাষার উৎস ও জনগোষ্ঠীর ইতিহাস বোঝার একটি সহায়ক প্রেক্ষাপট হিশেবে এসেছে। কিন্তু, মিনহাজ ভাই, আমি ইঙ্গিত করতে চাইছিলাম যে—ভাষা ‘কি’ বা ‘উপভাষা নাকি স্বতন্ত্র ভাষা’;—এই প্রশ্নের নির্ধারণে এটি কোনও সিদ্ধান্তমূলক মানদণ্ড হতে পারে না। যেহেতু—ভাষা কোনও জনগোষ্ঠীর জিনগত ধারাবাহিকতার প্রতিফলন নয়; এটি সামাজিক ব্যবহার, যোগাযোগের ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়ার ফল। একই জিনগত গোষ্ঠী সময়ের সঙ্গে ভাষা বদলাতে পারে, আবার ভিন্ন জিনগত উৎসের মানুষ একই ভাষিক পরিসরে যুক্ত হতে পারে। তাই ডিএনএ মানচিত্র ভাষার ইতিহাস বোঝাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু ভাষার শ্রেণিবিন্যাস নির্ধারণে তার সীমা আছে।
মানবশাস্ত্রের আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে যে-যুক্তি এসেছে, সেটিও একটি সাধারণ সত্য;—জ্ঞান এখন একক শাস্ত্রভিত্তিক নয়। তবে আন্তঃসম্পর্ক মানে এক শাস্ত্রের পদ্ধতিকে অন্য শাস্ত্রে সরাসরি প্রয়োগ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো নয়। ভাষাতত্ত্ব এখানে জীববিজ্ঞানের তথ্য ব্যবহার করতে পারে প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য, কিন্তু ভাষার সংজ্ঞা বা শ্রেণিবিন্যাস শেষপর্যন্ত ভাষাতাত্ত্বিক মানদণ্ডে নির্ধারিত হয়; যেমন—ধ্বনি-ব্যাকরণ কাঠামো, পারস্পরিক বোধগম্যতা, ও দীর্ঘস্থায়ী ভাষিক বিবর্তন।
জাঙ্ক ডিএনএ বা জৈবিক উদাহরণ টেনে ভাষার কাঠামো ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা উত্তম। ভাষায় তো কোনও স্থায়ী ‘অকার্যকর অংশ’ ধারণা নেই; ভাষার উপাদান সবই ব্যবহারের প্রেক্ষিতে অর্থ ও কার্যকারিতা পায়, যা জৈবিক অবশিষ্টাংশের ধারণার সঙ্গে এক নয়।
বলা যায়, ডিএনএ ট্র্যাকিং অভিবাসন ও জনজাতির ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু ‘ভাষা না উপভাষা’—এই ধরনের ভাষাতাত্ত্বিক প্রশ্নের চূড়ান্ত মীমাংসার উপায় এটি নয়। আর, ভাষার অবস্থান নির্ধারিত হয় মূলত তার অভ্যন্তরীণ কাঠামো, ব্যবহারিক বাস্তবতা এবং সামাজিক-ঐতিহাসিক স্বীকৃতির সমন্বয়ে।
. . .

বাবুল ভাই, আপনার বিশ্লেষণটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে। ভাষা নির্ধারণে মানদণ্ডের প্রশ্নটিকে আপনি যেভাবে সামনে এনেছেন, তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে আপনার আলোচনার কিছু জায়গা নিয়ে আমার কিছু প্রশ্ন ও দ্বিমত রয়ে গেছে। সেগুলো পয়েন্ট ধরে তুলে ধরছি :
১. মানদণ্ডের দ্বৈততা : আপনি বলেছেন, একদিকে ভাষাতাত্ত্বিক স্বাতন্ত্র্য, অন্যদিকে ভাষাপরিবারের ঐতিহাসিক সংযোগ;—এই দুই মানদণ্ডে ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি একইসঙ্গে দুটি বিপরীত সিদ্ধান্ত সম্ভব হয়, তাহলে বাস্তবে কোন মানদণ্ড কার্যকর হবে? শুধু তাত্ত্বিক দ্বৈততা দেখিয়ে দিলে মূল প্রশ্নটি অনির্দিষ্ট থেকে যায়।
২.পারস্পরিক বোধগম্যতার যুক্তি : আপনি পারস্পরিক বোধগম্যতা ও ধ্বনি-ব্যাকরণগত স্বাতন্ত্র্যকে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে ধরেছেন। কিন্তু একই যুক্তি প্রয়োগ করলে চট্টগ্রামসহ অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার ক্ষেত্রেও কি একই দাবি ওঠে না? আমরা কি সেগুলোকেও স্বতন্ত্র ভাষা বলব? যদি না বলি, তাহলে এই মানদণ্ড একা যথেষ্ট নয়—এ-কথা স্বীকার করতে হয়।
৩. লিপি ও লিখিত সাহিত্য প্রসঙ্গ : আপনি বলেছেন, লিপির বিলুপ্তি ভাষার স্বাতন্ত্র্যকে অস্বীকার করে না, এবং লিখিত সাহিত্য না-থাকাও ভাষার অযোগ্যতা নয়;—এটি তাত্ত্বিকভাবে ঠিক। কিন্তু বাস্তবে একটি ভাষার বিস্তৃতি, মান্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠার জন্য লিপি ও লিখিত কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। লিপি ছাড়া ভাষা টিকে থাকতে পারে, কিন্তু বিস্তৃতভাবে বিকশিত হওয়া কঠিন;—এই বাস্তবতাকে কি পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া যায়?
৪. নাগরী লিপির প্রশ্ন : নাগরী লিপির প্রায় বিলুপ্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। যদি এটি একটি শক্তিশালী সামাজিক ও ভাষিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকত, তাহলে কি কোনো-না-কোনোভাবে এর ব্যবহার টিকে থাকার কথা ছিল না? নাকি এটি মূলত একটি সীমিত সামাজিক পরিসরের ভেতরে আবদ্ধ ছিল? এই প্রশ্নটির সরাসরি উত্তর আপনার লেখায় পাওয়া যায় না। প্রসঙ্গক্রমে বলি, এ-ধরনের লিপির পুনরুদ্ধার সচেতন সামাজিক-রাজনৈতিক উদ্যোগ ছাড়া সম্ভব নয়, যার বাস্তব উপস্থিতি এই মুহূর্তে চোখে পড়ে না।
৫. তাত্ত্বিকতা বনাম বাস্তবতা : আপনার আলোচনায় একটি তাত্ত্বিক ভারসাম্য আছে, কিন্তু বাস্তবতার স্তরে অবস্থানটি কিছুটা অনির্দিষ্ট থেকে যায়। একটি ভাষার সম্ভাবনা থাকতে পারে;—কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে যে-সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও লিখিত কাঠামো প্রয়োজন, সিলেটির ক্ষেত্রে সেগুলো কতটুকু গড়ে উঠেছে? এই প্রশ্নটিকে আমি গুরুত্বের সঙ্গে সামনে আনতে চাই।
সব মিলিয়ে মনে হয়, সিলেটি ভাষা/উপভাষা প্রশ্নটি কেবল তাত্ত্বিক মানদণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সম্ভাবনা ও বাস্তবতার মধ্যকার একটি টানাপোড়েন। তাত্ত্বিকভাবে একে একাধিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব, কিন্তু বাস্তবে এর কার্যকর অবস্থান নির্ধারণে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা যায় না।
. . .

সিদ্ধান্তমূলক মানদণ্ডের কথা তো আমি বলিনি বাবুল ভাই। ‘ভাষা’ ও ‘উপভাষা’ নির্ধারণে বিচিত্র সব তত্ত্ব ও তাত্ত্বিক মডেল গবেষকরা ব্যবহার করেন। এমন নয়, একটির ওপর ভর দিয়ে মীমাংসাসূত্র খোঁজেন তাাঁরা। মডেলগুলোর ব্যাপারে প্রাথমিক আলোচনা আজকেই করেছি।
ডিএনএন ট্র্যাকিংও একটি পরীক্ষণযোগ্য সম্ভাব্যতা। এর সাহায্যে একটি জনগোষ্ঠী বা নৃগোষ্ঠীর স্থানান্তরিত হওয়ার ইতিহাসকে আমরা ট্র্যাক করছি। ট্র্যাকিং যেসব তথ্য দিতে পারে বা আমরা পাবো বলে আশা করছি, তা ভাষার ওপর আলোকপাতে সাহায্য করবে না এমন নিশ্চয়তা আপনাকে কে দিলো? আপনি একে এতো নির্দিষ্ট করে নিচ্ছেন কেন তা আমার মাথায় ঢুকছে না!
ভাষা অবশ্যই জিনের ভিতর তৈরি হয় না। তবে মানুষের এই-যে ভাষা ব্যবহারের ক্ষমতা, তার পেছনে জিনের ভূমিকা আছে বলে অনেকে মনে করেন। নওম চমস্কি তাঁদের মধ্যে অন্যতম। চমস্কি মনে করেন, মানুষের ভাষা শেখার এই-যে ক্ষমতা, এর পেছনে বিবর্তনের ধারায় তার দেহে ভাষা জিন ভূমিকা রাখতে পারে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় তা অপ্রমাণিত এমন কিন্তু নয়। হ্যাঁ, ভাষা শেখা আর একটি ভাষা জিনলিপিতে বাহিত হওয়া এক বিষয় নয়। আমি তা বলিওনি।
আমার মূল উদ্দেশ্য হলো, কথার কথা, সিলেটি জনজাতির ঐতিহাসিক বিবর্তনরেখা বা আদি শিকড়টি ডিএনএ ট্র্যাকিংয়ের মধ্য দিয়ে খুঁজে বের করা। যেমন ধরেন, আমরা সবাই আফ্রিকার সাভানা থেকে ষাট-সত্তর হাজার বছর আগে ভাগ্যান্বেষণে বেরিয়ে পড়েছিলাম। সেখানে এসে নিয়ানডার্থালদের সঙ্গে হোমো স্যাপিয়েন্সের সাক্ষাৎ ও ক্ষেত্রবিশেষে প্রজনন ঘটে। জিনের একটি বিনিময় তখন ঘটেছে। একইসঙ্গে দুটি মানব প্রজাতির প্রাগৈতিহাসিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ও ঘটেছে। তারা তখন অপরিণতি ভাষায় যে-বিনিময় করেছে, তাও এই ইতিহাসে পড়ছে। এখান থেকে ট্রেইল করে যত আগাচ্ছেন, হোমো স্যাপিয়েন্সেদের বিভিন্ন গোত্রে ভাগ হওয়া, ছড়িয়ে পড়া, কোনো একটা অঞ্চলে আটকে যাওয়া, এভাবে একে অন্যের সঙ্গে ভাষা বিনিময়ের অভিজ্ঞতা বহন করার ঘটনা ডিএনএ ট্র্যাকিং আপনাকে ধরতে সাহায্য করবে। বাকি যা সে দিতে পারবে না, তার জন্য আরো একশোটা মডেল রয়েছে, এসব যাচাই ও বোঝার জন্য। সুতরাং সরাসরি খারিজ করার যুক্তি থাকছে না এখানে।
সংস্কৃতি একটি সামাজিক ঘটনা ঠিক আছে, কিন্তু সংস্কৃতির সেরকম বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ঘটনা মানবদেহ ও মানবমস্তিষ্কে সংরক্ষিত হতে পারে। গবেষণা ছাড়া আপনি এই ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারবেন না। ভাষা মূলত একটি মস্তিষ্ক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া; এবং মস্তিষ্কের ভাষাকেন্দ্র নামক অঞ্চলটি জিনগত ব্যবস্থাপনার অংশ। যে-কারণে ভাষা ও উপভাষাকে বোঝার প্রয়োজনে আমি ফিরে-ফিরে একটি জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক বিবর্তনকে আমলে নেওয়ার পক্ষে। সেখানে, ডিএনএন একটি সহায়ক টুল। আমি তো বলিনি এটিই একমাত্র মানদণ্ড! এরকম রিজিডিটি ভাষাতত্ত্বে অচল। কথাটি মনে রাখা বোধহয় ভালো।
. . .

ধন্যবাদ, জাভেদ। পাঠ করার জন্য এবং প্রশ্নগুলো তোলার জন্য। এসব প্রশ্ন খুবই জরুরি। একটি গবেষণা একার কোনো বিষয় নয়, এটি একটি কালেক্টিভ কাজ। যদিও আমাদের দেশে তা মানা হয় না। প্রথমেই আমি বলে রাখি এটা ঠিক আমার পিএইচডির অংশ নয়, একটা ধারাবাহিক চিন্তার একটা রূপ। আপনি ঠিকই অনুধাবন করেছেন-যে, ভাষা কেবল ভাষা নয়; এটি রাজনৈতিক ইচ্ছা, সামাজিক কাঠামো এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেরও ফল। সিলেটির স্বতন্ত্রতা বিচারে তা-ই দেখতে হয়।
এটাও ঠিক বলেছেন-যে, ‘ভাষাগত পার্থক্যকে যদি পরিচয়ের একমাত্র ভিত্তি করা হয়, তাহলে তা আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের দিকে মোড় নিতে পারে।’ তাহলে সকল আঞ্চলিক ভাষাই ভাষার দাবিদার হয়ে ওঠে। ‘কিন্তু লেখার ভেতরে একটি সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে বলে মনে হয়েছে’;—এই কথার জবাবে বলতে পারি, হয়তো কোনো কথা বা যুক্তিতে এমন হয়েছে। আমি বস্তুনিষ্ঠভাবে দেখতে চেয়েছি। যাইহোক।
হ্যাঁ, শুধু সাংস্কৃতিক দিক থেকে ভাষার দাবিটা যুক্তির ধোপে টিকে না। আপনি ঠিকই বলেছেন, নাগরী লিপিটির প্রাসঙ্গিকতা মূলত একটি সীমিত ঐতিহাসিক পরিসরের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল, এবং বৃহত্তর ভাষিক কাঠামোর সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারেনি। এজন্যই সম্ভবত সিলেটি নাগরীর উদ্ভব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আপনার প্রশ্নগুলো বিরোধিতার জায়গা থেকে নয়, বোঝাই যায়।
বিলেতে সিলেটি লিখিত নয়, কথ্যরূপে স্বীকৃতি পেয়েছে। সেটা ব্যবহারিক জীবনের উপযোগ মিটাতেই। সিলেটিতে আধুনিক উন্নত সাহিত্যকর্ম না থাকা, ভাষা হয়ে না ওঠার যে-অন্তরায় হিসেবে দেখেছেন; একই কারণে আমি একে তাই ভাষিক রূপের কন্টিন্যুয়াম হিসেবে উল্লেখ করেছি;—ভাষা ঠিক নয়। এ-নিয়ে অবশ্যই বিস্তারিত আলাপের প্রয়োজন রয়েছে। আর, অসম পারস্পরিক বোধগম্যতার ব্যাপারে আমার মনে হয় একমাত্র চাটগাঁইয়া ভাষা ছাড়া এ সমস্যা অন্য উপভাষায় নেই। এমন সুন্দর করে যুক্তিগুলো তুলে ধরার জন্য আবারো ধন্যবাদ।
. . .

ধন্যবাদ ফজলুররহমান বাবুল। এটা ভালো বলেছেন-যে, ভাষা আর জাতি এক নয়;—এটা মিমাংসিত প্রশ্ন। তবে মিনহাজ ডিএনএ ট্র্যাকিং বলতে অন্য কিছু বুঝাতে চেয়েছেন; ভাষাবিচারের এটা এক অত্যাধুনিক পদ্ধতি। বাংলায় এটা দিয়ে তেমন বিশ্লেষণ চোখে পড়ে না। বিলেতে সিলেটির প্রতিষ্ঠাকে আপনি-যে ‘ব্যবহারিক আধিক্যের পুনর্বিন্যাস’ বলে অভিহিত করেছেন, এটা আমিও মানি। আর, ‘ফুকোর দৃষ্টিকোণ এখানে ব্যাখ্যামূলকভাবে সহায়ক হলেও একমাত্র নির্ধারক কাঠামো নয়’;—সেটাও ঠিক বলেছেন।
চর্যাপদের ব্যাপারে আমার বক্তব্য আমি আগে দিয়েছি। লিপির ব্যপারে আপনার বক্তব্য খুবই প্রাসঙ্গিক-যে, ‘কোনও লিপির বিলুপ্তি ভাষার স্বাতন্ত্র্যকে অস্বীকার করে না; কারণ লিপি টিকে থাকা বা হারিয়ে যাওয়া অনেকসময় রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উপর নির্ভরশীল’;—এর অনেক উদাহরণও আছে। এই রাজনৈতিক কারণে অনেক ভাষা নিজের লিপিটিও নির্মাণ করতে পারেনি। ক্ষমতার দ্বারাই তাদের লিপির ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছে। সবমিলিয়ে আপনার ভাষাছাঁচ হিসেবে সিলেটির ‘দ্বৈত অবস্থানই সম্ভবত সবচেয়ে বাস্তবসম্মত স্বীকৃতি’;—এটা এক গুরুত্বপূর্ণ অবজারবেশন বলে মনে হয়। ধন্যবাদ।
. . .

মিনহাজ ভাই, আপনার মূল বক্তব্য থেকে আসলে আমি যেটা বুঝছি, সেটা হলো—ডিএনএ ট্র্যাকিংকে আপনি ভাষা নির্ধারণের একমাত্র মানদণ্ড হিশেবে নয়, বরং ভাষার ইতিহাস ও বিবর্তন বোঝার একটি ‘সহায়ক প্রেক্ষিত-টুল’ হিশেবে দেখছেন। এই জায়গায় আপনার সঙ্গে দ্বিমত হওয়ার শক্ত কারণ নেই; কারণ আধুনিক মানববিজ্ঞানে সত্যিই একাধিক মডেল একসঙ্গে কাজ করে। মূল আপত্তি ডিএনএ ট্র্যাকিংকে খারিজ করা নয়;—এটাকে ভাষার শ্রেণিবিন্যাস বা ভাষা-উপভাষা নির্ধারণের সরাসরি কার্যকর যন্ত্র হিশেবে না-দেখার সতর্কতা। এটি একটি শক্তিশালী ঐতিহাসিক সহায়ক টুল হতে পারে, কিন্তু ভাষাতাত্ত্বিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রীয় মানদণ্ড নয়;—এই পার্থক্যটা না-রাখলে ভাষা-বিশ্লেষণ ধীরে ধীরে জেনেটিক ডিটারমিনিজমের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ধন্যবাদ।
. . .

সিলেটি ‘ভাষা’ ‘উপভাষা’ বিতর্ক-৪
সেতু ভাই, আপনার আলোচনায় মিশেল ফুকোর অবতারণা যেমন অনিবার্য মানতে হবে, অন্যদিকে এর ফলে ঝুঁকি ও ভুল বোঝার সম্ভাবনা তা তৈরি করে। নাগরী লিপিকে ভিত্তি ধরে সিলেটি ভাষাকে বাংলা থেকে স্বতন্ত্র ভাষারূপ দাবি করাটা তার মধ্যে অন্যতম। আপনি যদিও এর যৌক্তিকতা ও অযৌক্তিকতা দুটোই আলোচনায় ভালোই টেনেছেন।
সমস্যা হলো, সিলেটি ভাষাকে স্বতন্ত্র ভাষারূপ ভাবার পক্ষে যারা বর্তমানে আওয়াজ তুলছেন, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের সিলেটি কমিউনিটির একটি অংশ, তাদের তৎপরতা আমার কাছে হাস্যকর মনে হয়েছে। এর কারণ হলো তারা নাগরী লিপির গঠন ও নাগরীতে রচিত হালাতুন্নবি-সহ অন্যান্য পুঁথি সাহিত্যে আরবি-ফারসি শব্দের প্রভাব ও তার আঞ্চলিক রূপান্তরকে অ্যানক্যাশ করছেন উদ্দেশ্যমূলকভাবে। তাদের উদ্দেশ্য হলো, বাংলা মান ভাষাকে হিন্দুয়ানী চিহ্নিত করে সিলেটি ভাষার খৎনাকরণ। যেখানে, ফুকোর ক্ষমতা-রাজনীতির তাত্ত্বিকতাকে এই মত প্রতিষ্ঠায় ব্যবহার বা অপব্যবহার করা ব্যাপার থাকছে না।
আপনার জন্য চ্যালেঞ্জ হলো এই ঝুঁকিটি এড়ানো। এই টাইপের লোকজন যেন পরে আপনার বক্তব্যকে অ্যানক্যাশ করে অসৎ ফায়দা তুলতে না পারে। নাগরী লিপি মুসলমান শাসনামলে সৃষ্ট অন্যন ঘটনা তাতে সন্দেহ নেই। উর্দু লিপিও কাছাকাছি বা সামান্য আগে জন্ম নিয়েছিল। মোগলদের সযত্ন পরিচর্যায় রাজসভার পরিধি ছাপিয়ে তা অভিজাত সমাজে চর্চিত হয়েছে দীর্ঘদিন।
ভারতের উর্দুভাষী বলয়ে এখনো উর্দু হচ্ছে আভিজাত্যের প্রতীক। পাকিস্তানে ফুকোর ছক মেনে রাষ্ট্র একে প্রমোট করায়, এটি এখন মান রূপে সর্বজনবোধ্য ও চর্চিত। ভারতে আবার অতখানি নয়, যেহেতু সেখানে হিন্দি ও অন্যান্য প্রাদেশিক ভাষার দাপট অনেক ব্যাপক। উর্দু ক্ষমতা রাজনীতির মারপ্যাঁচে টিকে যেতে পেরেছে, এর বড়ো কারণ হলো এর মৌখিক ও লিখিত রূপ সর্বজনীনভাবে চর্চিত। এমনকি ভারতে হিন্দি গানের বড়ো অংশে উর্দুর দাপট শুরু থেকে ব্যাপক ছিল। জাভেদ আখতাররা গানগুলো মূলত উর্দুতেই লিখে থাকেন, যা হিন্দির নিকটবর্তী।
দুটি ভাষার এই বিনিময় এখানে পারস্পরিক বোধগম্যতা তত্ত্বে (Mutual Intelligibility Criterion) বর্ণিত মডেলের প্রতিধ্বনি করেছে সার্থকভাবে। নাগরী লিপির বড়ো সমস্যা এখানে-যে (আমার ধারণা ভুল হলে শুধরে দিয়েন) এটি সেকালের মুসলমান অভিজাত সমাজে চর্চিত হলেও, উর্দুর মতো নিজেকে ছড়াতে পারেনি। ছড়ানোর জন্য যে-আর্থ-সামজিক ক্ষমতা-কাঠামো তার দরকার ছিল, সেটি নাগরীর ক্ষেত্রে ঘটেনি। সময়ান্তরে যে-কারণে নাগরী ব্যাকফুটে চলে যায়। আরো একটি কারণ হলো, উর্দুর মতো অন্য ভাষারূপের সঙ্গে তার বিনিময়-সীমাবদ্ধতা। উর্দু বা হিন্দি তখনো বা এখনো অবিরত বিচিত্র ভাষার সঙ্গে সংযোগপ্রবণ। তার শব্দভাণ্ডার ও সময়ের সঙ্গে রূপান্তর-সক্ষমতা ও স্থিতিস্থাপকতা অতি ব্যাপক। নাগরী সেখানে নিছক আঞ্চলিক পরিসরে গুম থেকেছে, যার আভাস আপনার লেখায়ও আমরা পাই।
এই দিকটি আশা করি আপনার মূল আলোচনায় এমনভাবে আসবে, একে অ্যানক্যাশ করে যেন সংকীর্ণ আঞ্চলিকতার ঝাণ্ডা কেউ উড়াতে না পারে। বাংলাদেশে প্রবণতাটি মারাত্মক। এখানে ভাষার হিন্দুকরণ ও মুসলমানিকরণের প্রবণতা তো দেখছি অহরহ। যে-কারণে সতর্কতা কাম্য।
. . .

ধন্যবাদ, আহমদ মিনহাজ। আপনার যে-কোনো বিবেচনা আমি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখি। এটা ঠিক-যে, ফুকোর তত্ত্ব ব্যবহারে ঝুঁকি আছে। আমি এটা অস্বীকার করি না। যে-কোনো তত্ত্ব যেমন ল্যাভব কিংবা সুস্যুরেও অপব্যবহার হতে পারে। আমার মনে হয়, এজন্য আমার সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত। তবে তত্ত্বকে উপেক্ষা করে নয়।
শুধু নাগরী লিপি দিয়ে ভাষার স্বতন্ত্রতা, এটাও আমি মানি না। তত্ত্বও মানে না। এক্ষেত্রে ভাষাগত কাঠামো সবচেয়ে বড়ো বিষয়। কারণ লিপি ছাড়াও ভাষা আছে এবং থাকবেও। নাগরী লিপির দুর্বলতা হলো সে সর্বজনীন হতে পারেনি এবং টিকে থাকতে পারেনি। তবে যারা একে ভাষা বলে দাবি করছেন, তাদের উদ্দেশ্য যদি সংকীর্ণ হয় অর্থাৎ খৎনাকরণ করে মুসলমানি ভাষার রূপ বলে পরিচয় করিয়ে দিতে চান, (বাংলার বিপরীতে), সেটা মনে হয় না আজকের দিনে সম্ভব। যদিও এই অপতৎপরতা চলতেই থাকবে। তাই ভাষার হিন্দুকরণ/মুসলমানিকরণ প্রসঙ্গে সতর্কতা দরকার, কিন্তু বাস্তবতাও অস্বীকার করা যায় না যেহেতু দক্ষিণ এশিয়ায় ভাষা ও ধর্মের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে জটিল।
Mutual Intelligibility –র ব্যপারে কথা হচ্ছে পারস্পরিক বোধগম্যতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একমাত্র মানদণ্ড নয়। তাই স্ক্যান্ডিনেভীয় ভাষাগুলো কিংবা Hindi language ও Urdu language—উচ্চমাত্রার পারস্পরিক বোধগম্যতা থাকা সত্ত্বেও আলাদা ভাষা। আর আপনি ঠিকই বলেছেন, নাগরী একটা বিশেষ শ্রেণিতে চর্চিত হয়, এবং উর্দুর মতো ছড়াতে পারেনি। হ্যাঁ, নাগরী একটা বৃত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কারণও আপনি বলেছেন, আমিও তা মনে করি। ভাষার বিকাশ সীমাবদ্ধতায় নয়, বিস্তৃত পরিসরে।
সবশেষে বলব, আমার আলোচনায় ভাষার তত্ত্বকে রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িকভাবে ব্যবহার করার ঝুঁকির দিকটি তুলে ধরার জন্য এবং বিবেচনা করার যে-প্রস্তাব তা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। ধন্যবাদ আপনাকে।
. . .

ভাষা নিয়ে যত কিছুই করি না কেন, ওটা সচল রাখতে না পারলে তেমন কাজে আসে না। সংস্কৃত ভাষাটা মৃত হলেও ওটার বিশাল নির্মাণ ও বৈভবের কারণে এখনো পাঠ্য, কিন্তু ল্যাটিন ওভাবে নয়, এমনকি পালিও না। মৃত ভাষায় নতুন নির্মাণ সম্ভব না।
. . .

ঠিক। তবে মৃত ভাষার নতুন নির্মাণ ক্ষেত্রবিশেষ সম্ভব, যদি সেই ভাষা হয় প্রচণ্ড ঐশ্বর্যমণ্ডিত। এর সবচেয়ে উত্তম উদাহরণ হচ্ছে হিব্রু। প্রায় মরতে বসেছিল। সেই হিব্রু এখন পুরোদমে সজীব। প্রাচীন ভাষার মধ্যে এটি সবচেয়ে ভালোভাবে সার্ভাইব করেছে।
ইহুদি সম্প্রদায় এখানে বড়ো ভূমিকা রেখেছেন। এর পেছনে ইসরায়েল সরকারের পরিকল্পনা ও এ্যাফোর্ট অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ইহুদি সম্প্রদায়ের ক্ষমতা কেন্দ্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান, জ্ঞানচর্চার শক্তি, অর্থনৈতিক আধিপত্য ও ধর্ম প্রসূত ঐতিহ্যকে লালন করার সংস্কৃতি বিরাট ভূমিকা রাখছে। হিব্রুতে শব্দসংখ্যাও ক্রমবর্ধমান।
হাসিদিক ইহুদিরা যেমন ইদ্দিশকে নবজীবন দিয়েছে। আইজ্যাক বাশেভিস সিঙ্গার তো ইদ্দিশে লিখেই নোবেল পেলেন। কী দুর্দান্ত সব গল্প! বাংলা অনুবাদে পড়েছি একসময়, তারপরেও দুর্দান্ত লেগেছে পাঠ করে। ইদ্দিশ এখন পুরোদস্তুর সজীব ভাষা রূপে নবজীবন পেয়েছে। এমনকি হাসিদিক ইহুদি বলয়ের বাইরেও এটি চর্চিত।
সুতরাং, মৃত ভাষায় নতুন নির্মাণ সম্ভব, যদি তা পুনর্জীবিত হয়। এখানে আবার মিশেল ফুকোর ক্ষমতা রাজনীতির ভূমিকা আছে বটে! ইহুদি সম্প্রদায়ের ক্ষমতা কেন্দ্রে নির্ধারক ভূমিকা ভাষাকে নবজীবন দান করছে। সংস্কৃতও মূলত ভারতে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ধারায় এখন চর্চিত হচ্ছে। কিন্তু হিব্রুর মতো নতুন করে শব্দভাণ্ডার বাড়ছে এমন নয়। সংস্কৃতে যে-বিপুল ভাণ্ডার পড়ে আছে, তার সামান্য অংশ বর্তমানে চর্চিত হচ্ছে। যেখানে আবার রাজনৈতিক নানা মতলব থেকে সংস্কৃত টেক্সটের উদ্দেশ্যমূলক ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে। সংস্কৃত চর্চা বরং ইংরেজ শাসনের গোড়ায় অনেক ভালোভাবে হয়েছিল। উপনিবেশ তার প্রয়োজনে তা করলেও, সংস্কৃতর ভাষান্তর ও ইউরোপে এর নানামুখী প্রভাব ছিল যুগান্তকারী। এখন কি সেই অবস্থায় আছে সংস্কৃত?
ভাষার রাজনৈতিক বর্গীকরণ আমাদের এখানে যেমন সংস্কৃত থেকে আসা শব্দকে প্রতিস্থাপনের বয়ানে ছেয়ে গেছে। ফরহাদ মজহার–এবাদুর রহমানদের পূর্ব বাঙলার ভাষা প্রকল্প কী করে ভুলি। ভাষাকে কলকাতার প্রভাব থেকে মুক্ত করার বয়ান হাজির করা হলো। ভাষার হিন্দুয়ানি ও মুসলমানির কত-না খেল্ দেখলাম এই জীবনে। দেখছি এখনো।
ভাষা মৃত হয় অনেকানেক কারণে, তবে এর মধ্যে ক্ষমতা রাজনীতির আবেদন অন্যতম। বাংলা যেমন একটা সময় পশ্চিমবঙ্গে বিপন্ন মনে হচ্ছিল। এখন কিন্তু সার্ভাইব করেছে ভালোই। কারণ এর ভিতরকার শোষণ ও ধারণক্ষমতা। সেইসঙ্গে দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে তার নবায়ন। ক্ষমতাকেন্দ্রে বাংলা ভাষা নেই বটে, তবে টিকে থাকছে জনসংখ্যা ও ঐতিহ্যের প্রতি একধরনের অঙ্গীকার থেকে। যদিও ভাষা রাজনীতির কারণে ভবিষ্যতে এটি হারাতে পারে তার মৌল বৈশিষ্ট্য।
. . .

আই বি সিঙ্গার যখন ইদ্দিশে লিখতেন তখন শদুয়েকের মতো মানুষ ইদ্দিশ ভাষায় কথা বলত, মিনহাজ। যে-কারণে ওগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করে বৃহৎ পাঠকের কাছে উপস্থাপন করতে হতো। হিব্রু এখন সংস্কৃতের মতোই। স্তোস্ত্র উচ্চারণের জন্য এখনো সচল। মুখের ভাষা হিসেবে নয়!
. . .

তথ্যটি মনে হয় সঠিক নয় কামাল ভাই। হিব্রু কেবল স্তোস্ত্র বা মন্ত্র রূপে রাবাইদের চর্চায় এখন আর সীমিত নেই। গুগলিং করলেও দেখবেন এই তথ্য দিচ্ছে, ইসরায়েলে হিব্রু সরকারি ভাষা। নয় মিলিয়ন ইহুদির মধ্যে পাঁচ মিলিয়ন হিব্রু ভাষায় কথা বলেন নিয়মিত। হিব্রুতে লেখালেখির চর্চা আরো ব্যাপক। ইদ্দিশ হাসিদিক কমিউনিটিতে নেসেসারি রূপে চর্চিত না হলেও মৃত নয়। সিঙ্গারের ওই দুশোর ঘরেও তা আটকে নেই। হাসিদিকরা হিব্রুর মতো না হলেও একে লালন করছেন।
. . .

এ-হিব্রু আমাদের চর্যাগীতির বাংলা থেকে ক্রমোত্তীর্ণ বা পরিবর্তিত বর্তমান বাংলা। বাংলায় যদি ইহুদিদের মতো একটা সম্প্রদায় থাকত তাহলে হয়তো ওদের ভাষাটার নাম দিত চর্যা।
শুধু নামটাই হিব্রু আছে। যদিও ইহুদিদের বাস আরবে কিন্তু আরবিরা যেহেতু হিব্রু ও ইদ্দিশের মিশেলটাকে অনেককাল আগে আরবি ভাষা বলে নামকরণ করেছে তাই ওরা প্রাচীন শব্দটাই রেখেছে। এখানেও রাজনীতি, মিনহাজ!
. . .

তা হতে পারে কামাল ভাই। তবে তাতে আমি সমস্যার কারণ দেখি না। ভাষা তো স্ট্যাটিক কিছু নয়। সময়ের সঙ্গে তার বিবর্তন অনিবার্য। জায়োনিস্ট মুভমেন্টের কার্যকারণে সম্পূর্ণরূপে মৃত হিব্রুকে পুনরুদ্ধার করার ভাবনাটি ছিল এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এখন দুই হাজার বছর আগের একটি ভাষাকে জনতার মুখের ভাষায় নিয়ে আসতে হলে তাকে অবিকল রাখা কী করে সম্ভব! সময় তো বদলে গেছে অনেক।
সুতরাং, রাবাই ও ধর্মতাত্ত্বিকরা হিব্রুকে রিলিজিয়াস টেক্সট রূপে চর্চা করেছেন। জনগণ হিব্রুর আধুনিক ও বিবর্তিত রূপটি চর্চা করছে। যদিও পরিসংখ্যান বলছে, জনগণের মুখে চর্চিত আধুনিক হিব্রুতেও ৬০ শতাংশের কাছাকাছি শব্দ আদি হিব্রু থেকে বিবর্তিত। অন্যভাষার মতোই এটা এখানে ঘটছে। এইটা সমস্যা হবে কেন? ভাষা তো শব্দের গ্রহণ সক্ষমতার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। হিব্রুও হচ্ছে। ফুকোর ক্ষমতা-রাজনীতি এখানে হিব্রুকে নতুন করে জীবিত করেছে সপ্রাণ ভাষা রূপে। যেটি সংস্কৃততে ঘটছে না। এটি চর্চিত হয়েও যে-কারণে মৃতের মতো দেখায় এখন। কারণ, দৈনন্দিন জীবনধারার সঙ্গে এর কোনো যোগ নেই।
আর চর্যা কিন্তু কোনোভাবেই বাংলার একচ্ছত্র নয় কামাল ভাই। এ-নিয়ে প্রশ্ন অতীতেও উঠেছিল, এখন নতুন সব গবেষণা ও তত্ত্ব চর্যাকে বাংলার আদি নিদর্শন বলার পক্ষে নয়। কেননা, চর্যায় বাংলা উপভাষার নানা আদিরূপ ছাড়াও নেপালের নেওয়ার, হিন্দি, সংস্কৃত ছাড়াও নানা উপভাষার আধিক্য রয়েছে। শত-শত পুথি তাই বলছে এখন।
চর্যাকে বাংলার আদি নিদর্শন চিহ্নিত করাটা ছিল তখন বাংলার নবজাগরণ প্রসূত উদ্দীপনা ও অতি-উৎসাহজনিত ভাষা রাজনীতির স্বরূপ। বাংলা ভাষার আদি বিবর্তনসূত্র হয়তো আরো পেছনে নিহিত, যেটি এখনো গবেষণায় উঠে আসেনি। না-আসা পর্যন্ত বরং সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ভাষ্য অধিক যুক্তিযুক্ত এখানে-যে, বঙ্গীয় ডেল্টায় বাংলা মূলত অনেকগুলো উপভাষার সংমিশ্রণ থেকে উদ্ভুত ও বিবর্তিত। যদিও উপভাষাগুলোর ব্যাপারে সুনীতিকুমার কিছু ঝেড়ে কাশেননি রেফারেন্সের অভাবে। সেতু ভাই আরো ভালো বলতে পারবেন হয়তো এই ব্যাপারে।
. . .

যে-ভাষা যত বেশি উৎস থেকে শব্দ সম্ভার নিতে পারে সেটা তত বেশি প্রাণবন্ত, বাংলা, ইংরেজি প্রভৃতি ভাষা যে-কারণে অনেক শক্তিশালী। বাংলা ভাষাভাষীদের দুর্ভাগ্য-যে এটার প্রসার না ঘটে সংকোচন শুরু হয়েছে। যাহোক, ভাষা নিয়ে স্বল্প পরিসরে কথা বলা কষ্টকর। ভালো থাকবেন মিনহাজ।
. . .

ভাষা-উপভাষা নিয়ে এমন বিতর্কের মাঝে আমি তিন দিন ধরে টুকিটাকি কাজের সাথে ইয়ারফোনে এটা শুনে শুনে শেষ করলাম। তো আজ সকালে, সদ্য কলকাতা ঘুরে আসা আমার স্কুলপড়ুয়া মেয়ে বলছে, ‘কী ব্যাপার বাবা! তুমি এমন কলকাতার ভাষায় কথা বলছ কেন?’ বুঝলাম আমার কথায় ‘অমিত’র টোন এসে গেছে সাময়িক।
. . .



