
ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ‘হিন্দুত্ববাদ বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা’ কিংবা ‘বিজেপি বনাম সংখ্যালঘু’ এই সরল সমীকরণে ব্যাখ্যা করা যৌক্তিক হবে না। এরকম করতে গেলে বাস্তবতার অনেকগুলো স্তর ধরতে আমরা ব্যর্থ হবো। কারণ বিজেপির উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, আবার এটিকে কেবল ‘ঘৃণার রাজনীতি’ নাম দিয়ে পরিশেষ টানা যাবে না। একইভাবে কংগ্রেস, কমিউনিস্ট বা তৃণমূলের সংকটও কেবল সাংগঠনিক দুর্বলতার প্রশ্ন নয়;—এর ভেতরে আছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক ক্লান্তি, সামাজিক পরিবর্তন, সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা ও রাজনৈতিক ভুল পাঠের ইতিহাস। তবে এই সংকটের শিকড় স্বাধীনতা উত্তর ভারতের ব্যর্থতায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর গভীরে আছে ঔপনিবেশিক ভারতের নির্মিত এক দীর্ঘ মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার।
ব্রিটিশ শাসন শুধু ভারতকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করেনি;—তারা ভারতীয় সমাজকে নতুন আঙ্গিকে শ্রেণিবদ্ধ, ব্যাখ্যা ও কল্পনা করেছিল। ‘হিন্দু’ ও ‘মুসলমান’ পরিচয়কে ইংরেজ শাসন এমনভাবে প্রশাসনিক ও ঐতিহাসিক কাঠামোয় স্থাপন করে, দেখে মনে হবে দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে হাজার বছর ধরে অবিচ্ছিন্ন ও অনিবার্য সংঘাত বিদ্যমান ছিল। আদমশুমারি, ঔপনিবেশিক ইতিহাসচর্চা, জনগোষ্ঠীভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব, পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা… সব মিলিয়ে দুশো বছরের ইংরেজ শাসন ভারতীয় সমাজকে ক্রমশ ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাজনৈতিক সত্তায় রূপান্তরিত করে।
বাস্তবে উপমহাদেশের ইতিহাস অনেকবেশি জটিল, মিশ্র ও সহাবস্থানভিত্তিক ছিল। মানুষের পরিচয় এখানে বহুস্তরীয় ছিল;—অঞ্চল, ভাষা, বর্ণ, পেশা, পরিবার, সামন্ত-সম্পর্ক, এমনকি স্থানীয় সংস্কৃতি অনেক ক্ষেত্রেই ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়েছে অতীতে। ঔপনিবেশিক আধুনিকতা ভারতবাসীকে তার নিজের অতীতকে নতুনভাবে দেখতে প্ররোচিত ও বাধ্য করে। বিশেষত উচ্চবর্ণের শিক্ষিত হিন্দু সমাজের একটি অংশ ইংরেজ বয়ান দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। মূলত এখান থেকে ‘হিন্দু পতন’, ‘মুসলমান আগ্রাসান’, ‘সভ্যতার অবক্ষয়’ ও ‘হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার’-র মতো ধারণাগুলো শক্তিশালী হতে থাকে।
এই ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বের ভেতর থেকেই পরে হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসচেতনার জন্ম হয়। আজকের বিজেপির ইতিহাস-রাজনীতি শুধু সমকালীন নিরাপত্তাভয় বা নির্বাচনী কৌশলের ফলাফল নয়, বরং এটি ঔপনিবেশিক যুগে নির্মিত হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের দীর্ঘ সম্প্রসারণ। বিজেপি সেই পুরোনো মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত, অপমানবোধ ও সভ্যতাগত নিরাপত্তাহীনতাকে নতুন রাজনৈতিক ভাষা দিয়েছে মাত্র।
ভারতের স্বাধীনতার পর কংগ্রেস যে-রাষ্ট্র নির্মাণ করেছিল, তার ভিত্তি ছিল নেহরুবাদী ধর্মনিরপেক্ষতা, সাংবিধানিক গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদী ভারতীয় জাতীয়তাবাদ। এই ধারণা ভারতকে দীর্ঘ সময় ধরে একত্রে রেখেছিল। কিন্তু এই রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরেই কিছু অন্তর্নিহিত দুর্বলতা ছিল। কংগ্রেস একদিকে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেছে, অন্যদিকে বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে পরিচয়ভিত্তিক সমঝোতার রাজনীতি করেছে। মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বদলে অনেক সময় প্রতীকী ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করা হয়েছে। শাহ বানো মামলা থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে কংগ্রেসের আপসকামী অবস্থান সংখ্যাগুরু হিন্দু সমাজের একাংশের মধ্যে এই ধারণা তৈরি করে যে-রাষ্ট্র ‘সংখ্যালঘু তুষ্টি’ করছে।
এই ‘তুষ্টি’র ধারণাটি পুরোপুরি কাল্পনিক ছিল না, আবার পুরোপুরি বাস্তবও ছিল না। বাস্তব ছিল এই অর্থে-যে কংগ্রেস প্রায়ই নীতিগত ধর্মনিরপেক্ষতার বদলে ভোটকেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িক ভারসাম্যের রাজনীতি করেছে। একইসঙ্গে এটিও সত্য-যে, ভারতের মুসলমানরা সামগ্রিকভাবে শিক্ষা, চাকরি, আয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্ব—সব ক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল। এর ফলে ‘মুসলিম তুষ্টি’র রাজনৈতিক ভাষ্য অনেক সময় বাস্তব বৈষম্য আড়াল করার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এই শূন্যতার মধ্যেই বিজেপি ও আরএসএস নিজেদের বিকল্প শক্তি হিসেবে গড়ে তোলে। তাদের সবচেয়ে বড়ো সাফল্য শুধু সাংগঠনিক নয়, তারা ভারতীয় ইতিহাস ও পরিচয়ের ভাষা পুনর্লিখন করতে পেরেছে। বিজেপি বুঝেছিল, কেবল ধর্মীয় প্রচার দিয়ে আধুনিক রাষ্ট্র দখল করা যাবে না। তাই তারা ইতিহাসকে রাজনৈতিক অস্ত্রে রূপান্তরিত করে।

রামমন্দির আন্দোলন ছিল সেই পুনর্জাগরণের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক। বহু হিন্দুর কাছে এটি হয়ে উঠেছিল ঐতিহাসিক অপমান ও সাংস্কৃতিক পুনর্দখলের প্রতীক। বিজেপি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এই আবেগকে ব্যবহার করে। তারা বুঝতে পেরেছিল, অর্থনীতি বা নীতির চেয়ে পরিচয় অনেকবেশি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি। অন্যদিকে কংগ্রেস ক্রমশ নিজের ভাষা হারাতে থাকে। একসময় যে-দল স্বাধীনতার ইতিহাস, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রধান বাহক ছিল, সেই দল ধীরে ধীরে একধরনের প্রশাসনিক যন্ত্রে পরিণত হয়। আদর্শিক স্পষ্টতা, সাংগঠনিক শক্তি ও সাংস্কৃতিক সংযোগ—সবই দুর্বল হয়ে পড়ে। বিজেপি যখন ‘সভ্যতার পুনর্জাগরণ-র নতুন গল্প তৈরি করছিল, কংগ্রেস তখনও মূলত পুরোনো গৌরব আর অতীতের স্মৃতির ভরসায় রাজনীতি করছিল।
পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতা এই বৃহত্তর ভারতীয় বাস্তবতার আঞ্চলিক সংস্করণ। কমিউনিস্টদের ৩৪ বছরের শাসন শুরু হয়েছিল ভূমি সংস্কার, গ্রামীণ ক্ষমতায়ন ও শ্রেণিভিত্তিক রাজনীতির মাধ্যমে। প্রথম দুই দশকে তারা বাস্তব পরিবর্তনও এনেছিল। কিন্তু দীর্ঘ শাসন শেষে সেই শক্তি আমলাতান্ত্রিক, জড় ও আত্মতুষ্ট হয়ে ওঠে। দল ও রাষ্ট্র একাকার হয়ে যায়। স্থানীয় স্তরে দমন, দলীয়করণ ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরক্তি তৈরি করে। শিল্পনীতি নিয়ে বিভ্রান্তি, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের মতো ঘটনাগুলো সেই সংকটকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।
পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের ব্যর্থতা শুধু রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক ছিল না; এর ভেতরে একটি গভীর সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাও কাজ করেছে। দীর্ঘদিন তারা সমাজকে মূলত শ্রেণির চোখ দিয়ে বিচার করেছে। ধর্ম, পরিচয়, সাংস্কৃতিক আবেগ, ঐতিহাসিক স্মৃতি বা সংখ্যাগুরু হিন্দু মধ্যবিত্তের নিরাপত্তাহীনতাকে অনেক সময় গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার দেয়নি। এসব প্রশ্নকে প্রায়শই ‘পশ্চাৎমুখী’ বা ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ ভেবে পাশ কাটিয়ে গেছে। কিন্তু সমাজ কখনও কেবল অর্থনীতি বা শ্রেণি দিয়ে পরিচালিত হয় না। মানুষের ভেতরে ধর্মীয় অনুভূতি, সাংস্কৃতিক পরিচয়, ঐতিহাসিক গর্ব, এমনকি মান-অপমানবোধ গভীরভাবে কাজ করে। বাম রাজনীতি মানুষের এই আবেগগুলোর সঙ্গে সংলাপ তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছিল। শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্তের একাংশের মধ্যে যার ফলে এই ধারণা জন্ম নিতে থাকে,—বামপন্থীরা তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে বুঝতে চায় না ও অবজ্ঞা করে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ক্ষোভকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় আসেন। ক্ষমতায় আসার পর মমতা স্বয়ং একধরনের প্রতীকী সংখ্যালঘু রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েন। মুসলমানদের বাস্তব সামাজিক সংস্কারের বদলে দৃশ্যমান ধর্মীয় উপস্থিতি ও পরিচয়ভিত্তিক আশ্বাস তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। বিজেপি যারপরনাই ‘তুষ্টিকরণ’র অভিযোগকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়। তবে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা এখনও ভারতের অন্যতম পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর অংশ। ফলে বিজেপির প্রচারের বিপরীতে এ-কথাও সত্য-যে, ‘সংখ্যালঘু তুষ্টি’র রাজনৈতিক ভাষ্য অনেকসময় বাস্তব বঞ্চনার তুলনায় অতিরঞ্জিত ছিল। কিন্তু রাজনীতিতে perception বা ধারণা প্রায়ই বাস্তবতার চেয়ে বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে একে সফলভাবে কাজে লাগিয়েছে।
আজকের হিন্দুত্ববাদ তাই শুধু একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়, এটি বহু হিন্দুর কাছে সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা, ঐতিহাসিক আত্মসম্মান ও সংখ্যাগুরু আত্মপরিচয়ের ভাষায় রূপ নিয়েছে। এর ভেতরে যেমন বাস্তব উদ্বেগ আছে, তেমনি বিপজ্জনক অতিরঞ্জনও রয়েছে। একদিকে ইসলামি মৌলবাদ, জিহাদি সহিংসতা বা পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির বাস্তবতা, অন্যদিকে মুসলমানদের সামগ্রিকভাবে ‘আভ্যন্তরীণ শত্রু’তে পরিণত করার প্রবণতাও সেখানে প্রবল। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ভারতের রাজনৈতিক কেন্দ্র ক্রমশ সরে যাচ্ছে। অনেক বিরোধী দলও হিন্দুত্বের মূল কাঠামোকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ঠুকতে ভয় পায়। রাজনৈতিক লড়াই যে-কারণে এখন আর আদর্শিক নয়, বরং কে ‘ভালো হিন্দু’ সেই প্রতিযোগিতায় পরিণত হচ্ছে।
ভারতীয় সমাজকে একরৈখিকভাবে পড়া অবশ্য ভুল হবে। যেমন হিন্দুত্ববাদ বেড়েছে, তেমনি অসংখ্য হিন্দু নাগরিক, লেখক, ছাত্র, নারী, মানবাধিকারকর্মী, দলিত আন্দোলনকারী ও উদারপন্থী মানুষও এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। একইভাবে মুসলমান সমাজও একমুখী নয়, সেখানে রক্ষণশীলতা ব্যাপক হারে যেমন রয়েছে, তেমনি কিছুক্ষেত্রে আত্মসমালোচনা, সংস্কারচিন্তা ও গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের ভাবনাও কাজ করছে। ভারতের সংকট তাই বিজেপির উত্থান নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সামাজিক অবিশ্বাস, রাজনৈতিক ভণ্ডামি, সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যর্থ আধুনিকতার সংকট। বিজেপি এই শূন্যতাকে ব্যবহার করেছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান শুধু রাজ্যের অভ্যন্তরীণ মুসলিমতুষ্টি বিরোধী প্রতিক্রিয়া নয়, এর সঙ্গে ভারতের বৃহত্তর নিরাপত্তা-মনস্তত্ত্ব, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতি, পাকিস্তান-ফ্যাক্টর, সীমান্ত-উদ্বেগ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের ভূরাজনৈতিক ভয়ের গভীর সম্পর্ক উপেক্ষা করা যাবে না।

বাংলাদেশে শেখ হাসিনার পতনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক দ্রুত অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশে ইসলামপন্থী ও ভারতবিরোধী শক্তির দৃশ্যমানতা বেড়েছে;—এমন উদ্বেগ ভারতের নিরাপত্তা-বিশ্লেষক মহলে প্রবলভাবে আলোচনার জন্ম দেয়। হাসিনা-পরবর্তী রাজনৈতিক শূন্যতা, রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা ও ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের সুযোগে কিছু ইসলামপন্থী ও ভারতবিরোধী শক্তি নতুন করে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পায়। ভারতের জন্য বাংলাদেশ শুধু প্রতিবেশী নয়, এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা ভূগোলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মিজোরাম—সব মিলিয়ে সীমান্ত, অভিবাসন, চোরাচালান, জঙ্গিরুট, জাতিগত অস্থিরতা ও রাজনৈতিক প্রচারের প্রশ্ন ভারতের জনমনে একধরনের স্থায়ী উদ্বেগ তৈরি করে। ‘সেভেন সিস্টার্স’ প্রসঙ্গ ভারতীয় সমাজে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরে ভারতের উত্তর-পূর্বকে ‘landlocked’ বলে উল্লেখ করা ও বাংলাদেশকে সমুদ্রপথের একমাত্র গেটওয়ে হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা ভারতীয় রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
আরও সরাসরি উদ্বেগ তৈরি হয় যখন বাংলাদেশি রাজনৈতিক বক্তব্যে ‘সেভেন সিস্টার্স’ বিচ্ছিন্ন করার মতো ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। ভারত এ-নিয়ে বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে তলবও করে। এইধরনের বক্তব্য বাস্তবে রাষ্ট্রীয় নীতি হোক বা না হোক, ভারতীয় জনমানসে তা ‘বাংলাদেশ এখন আর নিরাপদ প্রতিবেশী নয়’ এই ধারণাকে শক্তিশালী করে ব্যাপক। রাজনীতিতে বাস্তবতার মতো perception-ও বড়ো শক্তি। এই পরিস্থিতি বিজেপির জন্য বিশেষভাবে সহায়ক হয়েছে। কারণ, বিজেপির রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে তিনটি ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে : সীমান্ত-নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশ বিরোধিতা, এবং মুসলিম পরিচয়কে নিরাপত্তা প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করা। পশ্চিমবঙ্গে এই ভাষা আরও কার্যকর হয়, কারণ রাজ্যটির সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্ত আছে, এবং অভিবাসন নিয়ে বহু বছরের রাজনৈতিক সন্দেহ আজো বিদ্যমান। বাংলাদেশে ভারতবিরোধী ভাষা বা ইসলামপন্থী দৃশ্যমানতার যে-কোনো বৃদ্ধি বিজেপির ‘ভারতবর্ষকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত রাখার একমাত্র বিকল্প’-র দাবিকে আরও শক্তিশালী করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই উদ্বেগকে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন পুরোপুরি।
এর সঙ্গে পাকিস্তান ফ্যাক্টর যুক্ত হলে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা মনস্তত্ত্ব আরও তীব্র হয়। ভারত-পাকিস্তান সংঘাত কেবল কাশ্মীর বা সীমান্তবিরোধ নয়;—১৯৪৭, ১৯৬৫, ১৯৭১, কারগিল, মুম্বাই হামলা মিলিয়ে পাকিস্তানের অবস্থান ভারতীয় রাজনৈতিক পরিকল্পনায় স্থায়ী নিরাপত্তা হুমকি রূপে বিবেচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সংঘাত, ড্রোন, সন্ত্রাসবাদী হামলা ও সামরিক প্রতিক্রিয়ার রাজনীতি এই নিরাপত্তা মনস্তত্ত্বকে আরও তীব্র করেছে। ভারতীয় হিন্দু ভোটারের একাংশের মনে এখান থেকে বৃহত্তর নিরাপত্তা-ভাবনা তৈরি হয়েছে :—পশ্চিমে পাকিস্তান, পূর্বে অস্থির বাংলাদেশ, ভেতরে ‘অনুপ্রবেশ’ ও ‘জিহাদি নেটওয়ার্ক’… তিনটি বিষয়য়ে একত্রে গেঁথে বিজেপি শক্তিশালী রাজনৈতিক বয়ান তৈরিতে সক্ষম হয়। বয়ানটি শতভাগ বাস্তবভিত্তিক তা নয়, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কার্যকর।
পশ্চিমবঙ্গে মমতার পরাজয় বুঝতে গেলে এর সামগ্রিক প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিতে হবে। তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সিন্ডিকেট, প্রশাসনিক পক্ষপাত, স্থানীয় দাপটের অভিযোগ তো ছিলই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুসলিমতুষ্টি নিয়ে হিন্দু মনস্তত্ত্বে তৈরি সংক্ষোভ। মমতা অনেক ক্ষেত্রে মুসলমানদের প্রকৃত উন্নয়নের বদলে প্রতীকী পরিচয়ের রাজনীতিকে গুরুত্ব দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের বাস্তব অংশ যতটুকুই হোক, বিজেপি একে নিরাপত্তা-প্রশ্নে রূপ দিতে পেরেছে। ‘তুষ্টি’ আর শুধু ভোটব্যাংকের অভিযোগ থাকেনি, তা হয়ে গেছে ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা অবহেলা’র অভিযোগ। তবে একথা ঠিক, ভারতের সব হিন্দু মুসলিমবিরোধী নয়, পশ্চিমবঙ্গের সব মুসলমানও সবাই তৃণমূলপন্থী নয়, এবং বিজেপির সকল ভোটার কট্টর হিন্দুত্ববাদী নয়। অনেক মানুষ নিরাপত্তা, দুর্নীতি বিরোধিতা, প্রশাসনিক পরিবর্তন, উন্নয়ন ও মমতাবিরোধী ক্লান্তি থেকে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। আবার অনেক হিন্দু নাগরিক আজও মুসলমানদের নিরাপত্তা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন।
বিজেপির সাফল্য এখানে,—তারা বিচ্ছিন্ন ক্ষোভগুলোকে একত্র করতে সফল হয়েছে। বাংলাদেশের অস্থিরতা, পাকিস্তানের হুমকি, সীমান্ত অনুপ্রবেশ, মমতার মুসলিমতুষ্টি, কংগ্রেস-বামেদের দুর্বলতা সবকিছুকে তারা ‘হিন্দু নিরাপত্তা বনাম তুষ্টির রাজনীতি’র সহজ কিন্তু শক্তিশালী ভাষায় রূপান্তরিত করায় দলটির অবস্থান ভারতে এই মুহূর্তে অনেকবেশি সুসংহত। অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষ ও বামপন্থী রাজনীতি নতুন নিরাপত্তা মনস্তত্ত্বের ভাষার ফলাফল উপলব্ধি ও বিকল্প ভাষা তৈরিতে ব্যর্থ বলা চলে। তারা অনেক সময় শুধু বিজেপিকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের সীমান্তভয়, ইসলামি উগ্রবাদের আশঙ্কা, হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশের অস্থিরতা বা পাকিস্তানের কারণে তৈরি হতে থাকা নিরাপত্তা হুমকিকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেনি। যার ফলে বিজেপি একাই ‘বাস্তববাদী’ শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে আজকের ভারতবর্ষে।

ভারতীয় জনমানসে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অস্থিরতা ও ভারতবিরোধী অবস্থানের প্রভাব আছে, সেটি বিজেপির পক্ষে কাজ করেছে। একইসঙ্গে এটিও সত্য-যে, বিজেপি এই উদ্বেগকে অনেক সময় মুসলমানবিরোধী রাজনৈতিক আবেগে রূপ দিয়েছে,—এখানেই বিপদ। নিরাপত্তা উদ্বেগ বাস্তব হতে পারে, কিন্তু সেই উদ্বেগ যদি নাগরিক সমাজের একটি সম্পূর্ণ ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে সন্দেহের চোখে দেখার লাইসেন্সে পরিণত হয়, তাহলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়।
ভারতের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ তাই এখন দ্বিমুখী। একদিকে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সীমান্ত উগ্রবাদ নিয়ে বাস্তব নিরাপত্তা সতর্কতা দরকার। অন্যদিকে সেই সতর্কতাকে হিন্দু-মুসলমান নাগরিক সম্পর্ক ভাঙার অস্ত্রে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। বিজেপি প্রথম অংশটি জোর দিয়ে বলছে, কিন্তু দ্বিতীয় অংশটি প্রায়ই অবহেলা করছে। কংগ্রেস, বাম ও তৃণমূল দ্বিতীয় অংশটি বলছে, কিন্তু প্রথম অংশের বাস্তবতা অস্বীকার বা হালকা করে দেখছে। আজকের ভারতীয় রাজনীতিকে বোঝার জন্য ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সালে প্রকাশিত মিহির দালালের Inventing Hindu Supremacy প্রবন্ধটি একটি রূপরেখা দিতে পারে। এটি মূলত ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ঐতিহাসিক ও মতাদর্শিক শিকড় অনুসন্ধানী বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধ। মিহির দালাল দেখানোর চেষ্টা করেছেন,—আজকের বিজেপি-আরএসএস রাজনীতি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। দীর্ঘ ঔপনিবেশিক ইতিহাস, ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদ, হিন্দু উচ্চবর্ণের আত্মসংকট ও সাভারকরের নির্মিত ‘হিন্দুত্ব’ ধারণার ফলাফল।
প্রবন্ধটির মূল আলোচনার বিষয়বস্তু বিনায়ক দামোদর সাভারকর। লেখক তাঁকে কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেখেন না, বরং এমন একজন চিন্তক হিসেবে দেখান, যিনি ‘হিন্দু’ পরিচয়কে ধর্মীয় পরিচয় থেকে সরিয়ে ইতিহাসভিত্তিক, যুদ্ধকেন্দ্রিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ে রূপ দিতে চেয়েছিলেন। সাভারকরের কাছে হিন্দুত্ব কোনো আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় ধারণা ছিল না, এটি ছিল শক্তি, ঐক্য ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রকল্প। লেখক দেখান কীভাবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ককে নতুনভাবে নির্মাণ করেছিল। ব্রিটিশ ইতিহাসচর্চা ভারতীয় ইতিহাসকে এমনভাবে সাজায়, যেন হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে হাজার বছরের অবিচ্ছিন্ন শত্রুতা ছিল। বাস্তবে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস ছিল অনেক বেশি জটিল, মিশ্র ও সহাবস্থানভিত্তিক। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসন জনগণকে ‘হিন্দু’ ও ‘মুসলমান’ নামে বৃহৎ একরৈখিক গোষ্ঠীতে পরিণত করে।
এই পরিবেশেই সাভারকর ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের ধারণাকে ভারতীয় বাস্তবতায় প্রয়োগ করেন। তাঁর মতে, একটি জাতি গঠনের জন্য দরকার অভিন্ন ইতিহাস, অভিন্ন সাংস্কৃতিক চেতনা ও এক ‘শত্রু’র বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধতা। সহিংসতাকে তিনি কেবল রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে নয়, জাতিগত ঐক্য গঠনের মাধ্যম হিসেবেও দেখেছিলেন। তাঁর ভাষায়, হিন্দুরা মুসলমানদের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতের মধ্য দিয়ে নিজেদের ‘হিন্দু’ হিসেবে চিনতে শিখেছে।
লেখাটি আরও দেখায়, সাভারকরের হিন্দুত্ব মূলত ধর্মীয় আচারভিত্তিক হিন্দুধর্মেরও সমালোচক ছিল। তিনি অহিংসা, সহনশীলতা, এমনকি প্রতিপক্ষের প্রতি নৈতিক আচরণকেও ‘বিকৃত গুণ’ বলে মনে করতেন। তাঁর চোখে এগুলো হিন্দুদের দুর্বল করে দিয়েছিল। একধরনের ‘যুদ্ধমুখী সভ্যতা’র ধারণা তিনি দাঁড় করান, যেখানে জাতিগত শক্তি ও আধিপত্যই প্রধান মূল্যবোধ হিসেবে পরিগণিত হয়। মিহির দালাল দেখান,—আজকের বিজেপি-আরএসএস এই ঐতিহাসিক কল্পনাকেই নতুনভাবে ব্যবহার করছে। তারা বেদ বা গীতার মতো ধর্মগ্রন্থের বদলে ‘সভ্যতাগত ইতিহাস’কে নিজেদের বৈধতার উৎস হিসেবে হাজির করে। রামমন্দির আন্দোলনও এ-কারণেই শুধু ধর্মীয় ভক্তির বিষয় ছিল না, বরং রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হিন্দু শক্তির প্রদর্শন।
প্রবন্ধে লেখক বলেন, বিজেপি-আরএসএসের একটি মৌলিক দুর্বলতা হলো ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তাদের প্রায় অনুপস্থিতি। ভারত স্বাধীন হয়েছে গান্ধীর নেতৃত্বে ও অহিংস পদ্ধতিতে, অথচ হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কেন্দ্রে আছে গান্ধীবিরোধিতা। সাভারকরকে সামনে আনা তাদের জন্য সুতরাং জরুরি হয়ে ওঠে;—কারণ তিনিই এমন একজন ব্যক্তি যাঁকে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবের সঙ্গে যুক্ত দেখানো যায়, এবং যার মাধ্যমে একটি ‘বিকল্প ইতিহাস’ নির্মাণ সম্ভব। পুরো লেখাটি দেখায়, ইতিহাস কীভাবে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়, জাতীয়তাবাদ কীভাবে অতীতকে পুনর্নির্মাণ করে, এবং ‘সভ্যতার পুনর্জাগরণ’ নামক ভাষা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নিরাপত্তা আতঙ্ক, সাংস্কৃতিক আধিপত্য ও সহিংস পরিচয়-রাজনীতির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
. . .

সংযুক্তি : মিহির দালাল রচিত Inventing Hindu Supremac নিবন্ধের লেখককৃত বাংলা ভাষান্তর পাঠে নিচের পিডিএফ দেখুন। ডেক্সটপ/ ট্যাব ডিভাইস হলে সরাসরি এখানেই পাঠ করতে পারবেন। মোবাইল ডিভাইস হলে সংযুক্ত পিডিএফ লিংক চাপুন অথবা সরাসরি ডাউনলোড করে পাঠ করুন।
. . .

লেখক পরিচিতি : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন
… মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ-র অন্যান্য রচনা পড়তে এখানে চাপুন …
. . .


