
বর্ষবন্দনা ‘এই বৈশাখে’
লাল কাপড়ে মোড়া হালখাতা
মিষ্টিমুখ পহেলা বৈশাখের
দোকানি ব্যস্ত খতিয়ানে
ভুলচুক লেনদেন জীবনের
ক্যালেন্ডারে বাহারি সাজ
সন পয়লা বৈশাখের।
রাস্তায় জনস্রোত, রঙের ফোয়ারা
পয়লা বৈশাখে দিবাকর ঢালছে কিরণ
লালপাড় শাড়ি ললনারা হলুদিয়া পাখি
খোঁপায় গুঞ্জা ফুল যেন শবরী
ছোট্ট শিশুর গালে মানচিত্র দেশের
বৈশাখ বিলায় কিরণ গ্রামে ও নগরে
পাহাড়ে বৈসাবি, পুষ্প ওই ভাসে জলে
পানিখেলা শাকান্ন ব্যঞ্জনে মধুরিমা
গম্ভীর পাহাড়সারি চপল নর্তকি
রমনার বটমূলে সমবেত বর্ষবরণ
অগ্নিস্নানে শুচি হবে ধরা
কণ্ঠে আবাহন নতুন দিনের
রাজপথে শোভাযাত্রা মাঙ্গলিক
ধান দূর্বা পশু পক্ষী একাকার
অফুরান রঙের মিছিলে
বাংলার হাজার বছর।
গ্রামে ও নগরে মেলা বারোয়ারি
জারি সারি নৌকাবাইচে অঢেল আমোদ
কুস্তি খেলায় ধরাশায়ী মল্লবীর
জব্বারের বলিখেলায় রঙিন বৈশাখ
উড়ে ঘুড়ি, ভোকাট্টা হারায় আসমানে
শহরে পান্তা-ইলিশ, গানের কনসার্ট,
তারি ফাঁকে নামে সন্ধ্যা
আকাশে ঘনায় মেঘ কালবৈশাখীর।
বৈশাখী ঝড়ে উড়ে যাবে চৈতি ঝরাপাতা
পলাশ শিমুলে লাল বাসন্তী কোকিল
উড়ে যাবে জীর্ণ মলিন, মেঘের হুঙ্কারে,
আকাশে বিজলি বাঘিনী-গর্জনে
সবুজ ধানখেতে একা হিরালি
জপবে মন্ত্র তার …
হুঁশিয়ার … সামাল হুঙ্কার যাবে মিশে
হাওরের লিলুয়া বাতাসে।
যেন স্বপ্নে পাওয়া দিন এই বৈশাখ!
আমি-তুমি প্রসন্ন সকালে
হাতে রেখে হাত, হাঁটছি পথ
বৈশাখের প্রসন্ন রোদে পুড়ে
পিচঢালা পথে গেছি হারিয়ে
বাংলার অন্ধ মেঠোপথে!
খোঁপায় গুঞ্জাফুল শবরী তুমি
বাংলার মেঠোপথে দেখো শশাঙ্ক রাজা
আকবর, বাদশাহ্ নামদার
নিচ্ছে হিসাব খাজনা ফসলিসনের
ঘরে-ঘরে পিঠা-পুলি পায়েসান্ন দুধের সন্দেশ
ডোবাজলে ডাকছে ডাহুক, ভেকের কলরব
সবই কি স্বপ্ন বৈশাখে!
রোদজ্বলা শহরে বেকুব হাঁটছি পথ
জীবনের মিলেনি হিসাব!
গুঞ্জাফুল শবরী খোঁপায় তবু বৈশাখী
কালো মেঘকেশে উঠাও মাতন
গ্রামে নগরে পাহাড়ে উঠুক ঝড়
উড়ে যাক জীর্ণ পুরাতন
লাল কাপড়ে মোড়া হালখাতা
লেখা থাক নতুন বছর
. . .
. . .

সংযুক্তি
নতুন বছরে কিছু কি ঘটে নতুন? নাকি পুরাতন আসে ফিরে-ফিরে? জানি না… প্রশ্নের উত্তর জানি না! তবু ওই সূর্য নক্ষত্রকে ঘিরে পাক খায় পৃথিবী অন্ধ নিয়মে। সূর্য ঘুরে অক্ষে তার… অন্ধ নিয়মে। ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে খসে যায় দিন… মাস… বছর। আসে নতুন দিন, পুরাতন অন্ধনিয়মে। নতুন বছর, পুরাতনি বিধির লিখনে।
নক্ষত্ররা জ্বলে মহানভে। বিশখা জ্বলে ওই মহানভে;—আনে অকাল বৈশাখী। আমরাও জ্বলি মিটিমিটি এখানে… এই বাংলায়… অন্ধ অভিশাপে। আকাশে ঘনায় কালো মেঘ কালবৈশাখীর। পুঞ্জ মেঘ ফুঁড়ে মেঘ-রোদের লুকোচুরি আনে উৎসবের নতুন বারতা। সব ভুলে আবাহন প্রসন্ন সকালের। পুরাতন হয়ে ওঠে নতুন আমাদের মনের আসমানে। আবির ছিটায় সূর্যকিরণ। অগ্নিস্নানে এই বর্ষবরণ তবু কি নতুন? উত্তর তোলা থাক মহানভে। গানালেখ্য নিবেদন করি পুরাতনকে নতুন ভাবার আবেশ উৎসবে…;—অজানা বিধির অন্ধ নিয়মে। স্বপ্নে বিভোর কাটুক না-হয় কিছুখন গানে ও পার্বণে;—ভুলে গিয়ে জীবনের অনেক অসুখ!
. . .
গানালেখ্য-র এই ত্রুটিভরা সামান্য নিবেদনে দুটি সংস্করণের মধ্যে নিচেরটিতে যন্ত্রগায়ক রোদহীন বোধে গানের শেষ চরণের শেষ শব্দ ‘বছর’ উচ্চারণে করেছেন ভুল;—পুরাতন ভুলের অন্ধ নিয়মফেরে। এটুকু ত্রুটি যেন মার্জনীয় হয় বছরের পয়লা বৈশাখে। আর, উক্ত সংস্করণে ব্যবহৃত চারুকর্মের জন্য কৃতজ্ঞ সজল কান্তি সরকারের কাছে। এ-গানালেখ্য রচনায় চারুকর্মটির ছিল বিশেষ ভূমিকা।
—আহমদ মিনহাজ
. . .

. . .


