কবিতা সিরিজ : নভশ্চিল লাইলাক : পর্ব-৩
রচনা : হেলাল চৌধুরী

বৃক্ষ তুমি, গতর শিলাজিৎ
পাতার ছোঁয়া চাই
ডালে ডালে ফুটুক
তোমার সবুজ আবিরে মাখা সিলসিলা রোদ
বৃষ্টি নামুক ভিজুক তোমার শুকনো জরায়ুজ গতর…
দূর হোক সামন্তবাদ
পরগাছাদের উচ্ছেদ হোক; তুমি রেখো না
তোমার গতরে ও ক্ষীরে সামন্তবাদের বোধ
নুয়ে পড়ো না বিপুল অন্ধকারে ছুঁয়ে আগাছা সতর…
বৃক্ষ ও গণতন্ত্র আজ শত্রুর মুখোমুখি; পুঁজিবাদ
বানায় তারে অসাড় কাঠ; ফ্যাসিস্ট কুঠার
কলুষিত করে বৃক্ষ; তবে শায়িত হয়ে পড়ে নিয়ো
তুমি
সমাজতন্ত্রপাঠ নদীর খরস্রোতা জলের ওমশীত
হও বৃক্ষ, হও দৃপ্ত ও ব্যাপ্ত, হও আপাদমস্তক মানব
বৃক্ষ
কতকাল, আর কতকাল তোমার শহর — গতর শিলাজিৎ…
. . .
জলঢুপির শরীর
ভরাপাতার দিন এলে
শরীর পেতে চায় তখন সবুজ সাকার ঠোঁট
নদীর বুকে শুয়ে তবুও দেখা
বসন্তেও অজস্র ব্যর্থতা নিষ্ফল আকাশটির…
মৃত শেয়ালেরা তখন ঘুরে দাঁড়ায়
হানা দেয় পইঠায় তার ঘুমনারী
পেতে চায় শরীর অজস্র চোখ
কাঁটাবনে হেঁটে যায় কাঁচপোকাদের শরীর…
নদী হাঁটলে
সরে যায় জলের বাতিক; চায়
শরীর তার, হেলেনার বিহ্বল হাত ঠোঁট ঠ্যাং
কারও কারও ত্রস্তজরায়ু — ভ্রূণেই
বাদুড়ের ঠোঁট চায় সাকার যখন ঘুমকুমারী
তারপর উপচে পড়ে তার টসটসে যৌবন
আবারও হাঁটে শরীর নদী ও জলে
ফেঁপে ওঠে জলঢুপির টইটম্বুর হলুদ শরীর।
. . .
বুকে কীর্তিনাশা এখনও
সাহারা জয় করে এসো
পদ্মাপারে দাঁড়িয়ে তুমি
দেখে নিয়ো এখানেও বুক মরুর বালিয়াড়ি
জেলেদের নাও ইলিশের খরায় জরায় মরা…
গঙ্গা, বুকে রেখেছে তার ফারাক্কা যৌবন
আমাদের অর্থনীতি মন্দা
বুকে কীর্তিনাশা এখনও
বেলায় দাঁড়িয়ে দেখো সাগরের বুকেও চরা…
হাকালুকি হাঁটি, আমি বতুতা রাখি হাড়ে
চাই শ্রাবণের জলে ক্যামেলিয়া কলাপাতা নারী
চলনবিল ছুঁই
ছুটি নাটোরে এখনও রাণী ভবানীর দেশ
পথে পথে ফেলে যাই পাতার হাড্ডিসার বুক
অজস্র চোখ শকুনদের এখনও উন্মুখ
প্রহর গোনে নখে, ঠোঁটে ও চোখে
কবে তবে ছুঁবে তারা পাতাদের অসাড় শরীর।
. . .
মেঘ
কবিতা
ঘরে থেকো, সোনা
এখনই ডুবতে পারে অন্ধকারে পথ
শ্রাবণের আকাশে দেখো মেঘের কী ঘন ডাট!
সাবধানে থেকো
সোনা
বৃষ্টি নামিয়ে ডুবাতে পারে মেঘবালক
তোমার সুনসান নদীর এখনও পরিপাটি ঘাট;
রক্তে
দুর্বৃত্তের পরাগায়ন
কমবেশি সবারই থাকে;
সবারই শরীরে বাস করে
সুরাসুর কাম
অসুরের কামে জানি তুমি হারাবে সম্বিত
কবিতা, ঘরে থেকো সোনা, নয় তারা তোমার সব
অন্ধকারে উঠোনেই কেড়ে নেবে নিশ্চিত!
. . .

বৃষ্টি
কবিতা
বাড়ি যাও, সোনা
এখনই বৃষ্টি নামতে পারে;
কবিরও আকাশে ওড়ে দুষ্টকালো জমাট বৃষ্টি।
সাবধানে থেকো
সোনা
এখনই ভেসে যেতে পারে
বৃষ্টির তোড়ে তােমার নয়াগাঙের — নতুন কৃষ্টি;
বুকে
মৌসুমি দুর্যোগ
কমবেশি
সবারই থাকে,
কবিরও আকাশে মেঘ জমে
তার বৃষ্টি ফোঁটা ভাঙে আল;
কবিতা
বাড়ি যাও সোনা, গায়ে বৃষ্টি পড়ার আগে।
. . .
বাদল
কবিতা, সোনা
ঘরে শুয়ে থেকো না
ওঠো, বাদলের দিনে মাঠে মাঠে হাতে হাত রাখো
ভেজাও ঠোঁট, কতকাল হয় পড়ে আছে খরার দুই শরীর;
একটু না-হয়, আজি
বাদলের জলে ভিজি
কতকাল থেকে পড়ে আছে বিশুষ্ক দুই বৃক্ষ ও নদী
বাদলের জল চেয়ে আগুনের গতর কতকাল হয় অধীর!
গতর
শুদ্ধাশুদ্ধির উঠোন মানি;
মানি, সবারই থাকে
দেহে রক্তবাদলের ধারা
শ্রাবণের আকাশ;
যুগলের তাই
বাদলের জলে ভেজার প্রবল আকুতি দেখি; ওঠো
এসো, বাদলজলে সিক্ত করি বিশুষ্ক শরীর দুই পৃথিবীর।
. . .
ও
ও
জোছনার আলোয় কোনও এক শরীরিণী ঝিল
নদী ছুঁয়ে ছোঁয় সাগরের নীল জলাভূমি ফেনিল
টিলার বুক রচে নেয় পাহাড় সিলনে আদমের শীল
হাড়ে হাড় রাখে মার্টিন তার মানবীর মতো মসৃণ
নলুয়ার ঘাসতৃণ ভাসে যেন কবে হাকালুকি বিল
কারিতাশ ছুঁতে চায় আকাশ তবে মেঘালয় চিল
হাসঠোঁটে চুমু চেয়ে জলপিপি এখনও ‘ও’ শঙ্খচিল
মেঘনারী
আজ, ‘ও’;
চায় বুঝি শ্রাবণের বারি
চায় বুঝি, আজও ও তারে দেহে আদেহে নাওখানি যার ঝিল
শরীরিণী সুয়োরানি
ভুলে যায় দুয়োরানি
আকাশে মাগে ‘ও’, পাহাড়ের জল মেঘেদের নীল
হাকালুকি ছুঁয়ে নলুয়ার বিল, আকাশে খোঁজে মেঘালয় চিল।
. . .

বোহেমিয়ান
শরীরের মাঝে অজস্র রোগশোক ভরা
অথচ আমি দিব্যি আছি
খাচ্ছি ধাচ্ছি এবং দিব্যি ঘুমাচ্ছিও
সকাল-সন্ধ্যা এদিক ওদিক বেড়াচ্ছি আরামসে ঘুরে…
কী দরকার ওষুধ পথ্যির, এই তো আছি বেশ
কেটে যাচ্ছে জীবনের রেশ
চাওয়া নেই পাওয়া নেই
যা ছিল তার সবগুলো পুষিয়ে নিয়েছি ত্যাগ শিকারে…
মাঝে মাঝে খুক্ খুক্ কাশিতে, বলুন তো মশাই
কী দরকার উষ্ম জল চেয়ে গিন্নিকে বিরক্ত করবার
কেনই-বা ভেজাব শার্টের পকেট!
দুঃখগুলো টেনে এনে টানিয়ে রাখি বুকে ঝুলবারান্দায়
উল্টাপাল্টা
ঝড়ের ঝাঁপটা
এসবই তো নিত্য দিনের বিষয় সোজাসাপটা, তবে
অযথাই কেন কালির খরচা দিনলিপিতে ফুলের চর্চায়!
. . .
এখনও কিশোরী
বিকেলের নরম রোদে পাখিদের ঘরে ফিরা
দেখে হেঁটে যাই আমি কৈশোরের ধান কাটা শেষ
নাড়ার মাঠে; নদীর পারের হিজল গাছটিরে দেখি
একা একা এখনও শীতের কুয়াশা মাখে আজও বাকলে…
আমার মতো তারও কোনও এক নাগর আছে
বুঝি তার নির্জলা নদীর সন্ধ্যায় ঘাটে আশ্রয়ে
আছে দূরতর মেঘালয় বুক পাখির নরম পালক
চেরাপুঞ্জির বালক; আজও তারে চোখে রাখে আগলে…
সন্ধ্যার উলুপোকারা
আজও উড়ে উড়ে
নদীর পারে ক্লান্ত
চায় বেতবন ভুলে আকাশ ছুঁয়ে নিতে সন্ধ্যা হাওয়ায়
স্নান সেরে
তাই হেঁটে যায় আজও সে মৌনতায়;
সরিষা খেতের আল ধরে
নরম রোদে এখনও কিশোরী সে, হোয়াংহুরাঙা পায়।
. . .
কালপুরুষ-০১
যদি তুমি
কানন দেবী হতে চাও
তবে
প্রতীতি ও প্রমিতির ক্যাম্পাস এখনই তুমি — ডিঙিয়ে যাও…
বালা তো ছিল না সে, তুমিই তার গায়ে লেপিয়েছ বালা;
কানন দেবী কি কাননবালা হওয়া সহজ কথা নয় জানি
নয় কোনও অপরাধও; তোমার আকাশ কালোমেঘে ঢেকে
রেখেছ তুমি, তাই কারিতাস উঠোনে তুমি কর্দমাই মাখাও…
লম্পট আর লুইচ্ছারাই
টানিয়েছে দেহে তার
বালার পোস্টার
পুরুষ, আমি জানি তুমি আগে তার যতসব নষ্টের ঈশ্বর
অন্ধকারের ফতোয়াবাজ;
তারই দেহে শুয়ে
তুমিই ছাড়ো আজ ফতোয়ার কামশ্বাস; ভণ্ডরা
শুনো, বালা নয় সে, সমাজের কালপুরুষ এক অনশ্বর।
. . .
কালপুরুষ-২
বুকে সুরমা নয়, খরস্রোতা পিয়াইন চাই
পাহাড়ের ঢলে নিরলস হাঁটা দেখো
অস্থির পুরুষ আমি, আলস্য জানি না
মানি না — পাথরের পাষাণবেড়ি…
প্রণতি চিনি না, হ্যামার চিনি
জলে নয় পাথরেই বন্ধুতা রাখি
হ্যামারে পাথরে টুকে টুকে
ভাঙি — জীবনের জটিল বেদি…
কালপুরুষ আমি
বুকে জন হেনরি রাখি
রাখি হাড়ে পাহাড়ের কঠিন শিলাজিৎ
আদমসুরত রোদে পোড়া আমি এক নগ্ন ইতর
পিস্তলে পোড়াই
উন্দালের আগুন
ঠাণ্ডা জলে ডুবাই গতর
ঢাক-নুড়িতে নিয়ত কুড়াই দুঃখ-সুখের পাথর।
. . .

. . .

লেখক পরিচয় : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপ দিন
. . .


