পোস্ট শোকেস - সাহিত্যবাসর

‘একাকী, শব্দ নৈঃশব্দ্য’-এ কবি : অনন্ত নিগার

Reading time 12 minute
5
(22)

বই আলোচনা : “একাকী, শব্দ নৈঃশব্দ্য”
কবিচেতনার অন্তর্লোকে ঘটে যাওয়া ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সারৎসার
কবি জওয়াহের হোসেন-এর কবিতাযাপন

Book Cover: Lonely in sound and silence by Zawahar Hussain; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

কবিতা তাই যা কাব্যের ভেতরে তোমাকে কাঁদায়, হাসায়, খোঁচায়, কাঁপিয়ে তুলে পায়ের নখ, তোমাকে প্রলুদ্ধ করে এটা করতে, ওটা করতে কিংবা কোনওকিছু না করতে, জানায় এই পৃথিবীতে তুমি একা, তোমার আনন্দ আর দুঃখ চিরকাল ভাগ করে নেওয়ার এবং চিরকাল একা বইবার। —ডিলান টমাস

. . .
বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকে বাঙালি কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে রবীন্দ্রোত্তর আধুনিকতার একটি বোধ জেগে উঠতে শুরু করেছিল, যার রেশ পরবর্তী প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে প্রবলভাবে ক্রিয়াশীল ছিল। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে এই তিরিশের দশক কেন্দ্রিক আধুনিকতার ধারণার বিপক্ষে উত্তরাধুনিকতার বোধ জেগে উঠতে শুরু করে। নব্বইয়ের দশকে বাংলা কবিতা একটি নতুন পথে হেঁটেছিল। যদিও বহু সমালোচক ওই সময়ের কাব্যচর্চার মুণ্ডুপাত করতে চেয়েছেন। সৃষ্টি সুখের উল্লাস উদযাপন করতে ওই সময়টাতে একদল কবি মিলে একটি নতুন কাব্যভাষা তৈরি করেছিলেন, যেখানে একক কোনও কবির অবদান ছিল না, বরং অনেকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তা গড়ে উঠেছিল। জওয়াহের হোসেন ছিলেন সেই কবিদের মধ্যে একজন, যিনি নীরবে, কোনো হইচই ছাড়াই কাব্যচর্চা চালিয়ে গেছেন।

তাঁর আবির্ভাব নব্বইয়ের দশকে। যদিও কোনও দশক একজন কবির পরিচায়ক হতে পারে না, তবে প্রথাগতভাবে কবিকে চিহ্নিত করতে হলে বা তাঁর আবির্ভাবকাল নির্দেশ করতে গেলে একটা দশকের কথা উল্লেখ করতে হয়। যেমন, তিরিশের পঞ্চপাণ্ডব বললেই বিখ্যাত পাঁচটি মুখ ভেসে ওঠে অতি সহজেবুদ্ধদেব বসু, জীবননান্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে ও অমিয় চক্রবর্তী। তাই দশকের প্রসঙ্গটি বোধহয় প্রাসঙ্গিক। তবে কবিরা তো কালোত্তীর্ণ হোন। সবাই হয়তো হোন না। কবি জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত উক্তি (‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’) বাক্যটির অনুকরণে বলতে হয় ‘কেউ কেউ কালোত্তীর্ণ’।

নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের কিছু কবি সমাজ ও সংস্কৃতিকে নতুন শিল্পচর্চার মাধ্যমে তুলে ধরার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। জওয়াহের হোসেনও ছিলেন সেই কাতারে শামিল। এ-যাবত তাঁর কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে মাত্র ৩টি। এ-যেন নববধূর কদাচিৎ উঠানে বেরুবার মতোসলজ্জ, দ্বিধান্বিত। যদিও কবিতায় তাঁর অভিযাত্রা কয়েকদশকের। নববধূর মতো তিনি ‘নবকবি’ আর নন।

শুনেছিলাম, রবীন্দ্রনাথ তার প্রথম দিকের সাহিত্যকর্ম নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না। বহু জনপ্রিয় কবি-সাহিত্যিকেরাই তাদের প্রথম জীবনের সাহিত্যকর্মকে ম্যাচিউরড হওয়ার পরে প্রায় অস্বীকার করেছিলেন। কবি জওয়াহের হোসেন সম্ভবত সেই অনুতাপ সৃষ্টি করতে চাননি সচেতনভাবেই। তাই সন্তর্পণে হয়তো তিনি প্রকাশনার ডামাডোল, উৎসব-আবেগকে এড়িয়ে গেছেন।

শেষ তিন দশকে তাঁর ৩টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে। সতীর্থদের সঙ্গে এখানেই তাঁর একটি দৃশ্যমান পার্থক্যের সৃষ্টি হয়। শূন্য দশকে প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘যুগিভাবসঙ্গ’ (২০০৪), প্রথম দশকে ‘নগর মুসাফির ও মোনাজাত’ (২০১২) এবং চলতি দশকে ‘একাকী, শব্দ নৈঃশব্দ্য’ (২০২৪) প্রকাশ হয় । সাধারণত লিটলম্যাগ আর ওয়েবজিনেই এই কবির কাব্যচর্চার নির্ভরতার নিদর্শন মিলে।

নব্বই দশকের কবি ও কবিতার প্রকরণ, বৈশিষ্ট্য নিয়ে পড়াশোনা করলে জানা যায়, ওই সময় চলছিল লিটলম্যাগ নির্ভর বাংলা কবিতার শৈলী বিনির্মাণের প্রচেষ্টা। সফল হয়েছেন ও সুনাম কুড়িয়েছেন ডজন ডজন কবিরা। সুনামের ক্ষেত্রে কবি জওয়াহের হোসেনের নাম হয়তো সহজে আসবে না, কারণ তিনি বিজ্ঞাপননির্ভর দুনিয়ায় বরাবরই প্রচারবিমুখ ছিলেন। অন্য অনেকের মতো কোনও বইমেলায় তিনি কলম হাতে উদগ্রীব হয়ে কাস্টমার ধরার কায়দায় দাঁড়িয়ে থাকেননি কখনও। মানুষ হিশেবেও তিনি স্বল্পভাষী,বিনয়ী। তাই কবিতার বাজারে তিনি মার্কেটিংয়ের কাজে উদ্বুদ্ধ হননি। তবে সফলতার বিষয়টা আলাদা। এ-যাবত তাঁর অর্জন উপলদ্ধি করছি, অনেকদূর এগিয়েছে। যদিও-বা ডজন ডজন কবিদের মধ্যে তিনি থেকে গেছেন প্রায় সবার অলক্ষ্যে।

Book Cover: Nagar Musafir O Munajat & Zugivab Songo by Zawahar Hussain; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

নগরবাসী এবং বর্তমানে প্রবাসজীবন যাপনকারী এই কবির বৈরাগ্যভাব ব্যক্তিজীবনে কতটা তা অস্পষ্ট হলেও তাঁর কবিতায় সেটা স্পষ্ট। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন : ‘বৈরাগ্যসাধনে মুক্তি, সে আমার নয়।/ অসংখ্য বন্ধন-মাঝে মহানন্দময়/ লভিব মুক্তির স্বাদ।’ (মুক্তি)। জওয়াহের হোসেন লিখেছেন :

প্রতিরাত মৃত্যু এসে আমার অবয়ব নেড়ে চলে যায় একা—
…তীক্ষ্ণ কুয়াশার নীলাভাটুকু জ্বেলে জীবন ফুরনো গল্পে ভেবেছি
সব অর্থহীন

—আর্ত-অনুভূতি

এই অর্থহীনতার মধ্যেই তাঁর বৈরাগী স্বভাবটা প্রকাশ পেয়েছে। এই স্তবকে নিহিত আছে বিষাদগ্রস্ত জীবনের ক্লান্তি, অবসন্নতা আর জীবন ফুরানোর পরে এক হতাশাজনক মুক্তি। জওয়াহের হোসেন অসংখ্য বন্ধনের ভেতরেই সন্ন্যাসযাপন করছেন কাব্যসাধনার ভেতর দিয়েই। ‘একাকী, শব্দ নৈঃশব্দ্য’ নামটিতেই কি সে গন্ধ পাওয়া যায় না? গন্ধই তো। কবিতা তো গন্ধ শুঁকে শুঁকে এগুবার জিনিস। এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিকভাবে রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তি চলে আসে :

কিছু একটা বুঝাইবার জন্য কেহ তো কবিতা লেখে না। হৃদয়ের অনুভূতি কবিতার ভিতর দিয়া আকার ধারণ করিতে চেষ্টা করে। এই জন্য কবিতা শুনিয়া কেহ যখন বলে, ‘বুঝিলাম না’ তখন বিষম মুশকিলে পড়তে হয়। কেহ যদি ফুলের গন্ধ শুঁকিয়া বলে, ‘কিছু বুঝিলাম না’ তাহাকে এই কথা বলতে হয়, ইহাতে বুঝবার কিছু নাই, এ যে কেবল গন্ধ। —জীবনস্মৃতি : প্রভাতসংগীত : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তো, জওয়াহের হোসেনের কবিতায় শুধু বৈরাগ্যভাব নয়, দেখা যায় জীবনের অনেক হিসাবনিকাশ যেন না-মেলায় জন্ম দিয়েছে ঘাত-অভিঘাতের এক ব্যর্থ গণিতের ধারণার। এমন ভাবনাটা অমূলক মনে হয়নি। ভেতর থেকে একটি লাইনের উদ্ধৃতি দিচ্ছি :

রাত্রি হাওয়ায় যেতে যেতে ভালো লাগে—
এ-বিস্তৃত তামুক ধোঁয়া
কী-এক ব্যবস্থাপনাপত্রে একা একা ঘুরেছি,
অন্ধকার গলিপথ আর মর্মে জেগে থাকা

—ব্যর্থ গণিত কাব্যাশ্রয়ী ও নিশাচরগণ

উত্তরাধুনিক কাব্যচর্চার এই যুগে কবির কাব্যভাষায় রয়েছে বেশ অস্পষ্টতা। সবগুলো কবিতা ফ্রি-ভার্সে লেখা। উপমা, ভাষার অলঙ্কার আর শব্দের যাদু এক কুহক তৈরি করে রেখেছে। তাই মর্মোদ্ধার কিংবা স্পষ্ট উপলদ্ধি করাটাও অনেকটা অন্ধকারে হাতড়ে এগিয়ে চলার মতোই। এ-কথা আগেই বলে রাখলাম, কারণ, এই কাব্যালোচনা কোনও স্বচ্ছ বোধ না-ও তৈরি করতে পারে।

Ivan Turgenev: A Giant in the Shadow; Source: Fiction Beast YTC

কবির এই কবিতার বই পড়তে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে, তাঁর এই উত্তরাধুনিক কাব্যচর্চায় নিটশের শক্তিশালী নিহিলিজমের ধারণাটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে চলে আসছে, তথাপি মনে হয় তিনি হেঁটেছেন আধ্যাত্মবাদের পথেও। মরমিবাদের চর্চায় নিবেদিত সুইস ভাবুক জ্যাকব হারমান ওবেরাইট ও জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিখ হেনরিক জ্যাকোবিকে নিহিলিজম ধারণার প্রস্তাবক গণ্য করা হয়। নিহিলিজম যদিও রুশ লেখক ইভান তুর্গেনেভের ‘পিতা ও পুত্র’ উপন্যাসে এসে গভীর ভাবনার বিষয় হয়ে উঠেছিল। নিহিলিজমের মধ্য দিয়ে খ্রিস্টান চার্চ, রাষ্ট্র ও সামাজিক কাঠামো শুধু নয়, পারিবারিক কাঠামোয় কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্বকে তির্যক পরিহাসে আঘাত হানেন তুর্গেনেভ। রুশ সাহিত্যে যেটি একটি ভাবধারার জন্ম দেয় পরে। নিহিলিজম অবশ্য পূর্ণতা পায় ফ্রেডরিখ নিটশের হাত ধরে। তাঁকে যে-কারণে এই দার্শনিক ভাববীজের প্রবক্তা বলাটা অত্যুক্তি হয় না।

নিহিলিজম তত্ত্বে আমরা পাই, বিশ্বাসের সাথে সাথে ভেঙে পড়ছে মানুষের আস্থা ও চিন্তার মূল্যবোধ। নিটশে মনে করতেন-যে, নিহিলিজম একটি কঠিন সমস্যা, তবে এর সমাধানও সম্ভব। তিনি মানুষকে নিজেদের মূল্যবোধ তৈরি করতে এবং জীবনের অর্থ খুঁজে বের করতেও উৎসাহিত করেছেন। আর সেগুলো আমাদের আলোচ্য কবির বিভিন্ন স্তবকে দেখা মেলে। সেইসাথে যোগ আছে নারীর বিরহ। নারীর বিরহও কি চূড়ান্ত পর্যায়ে নিহিলিজম তৈরি করে? জানি না। ‘…তার দেহ নির্জলা ত্রস্ত দিশেহারা অতৃপ্ত বিরহের কথা বলে…’ (ত্রস্ত, দিশেহারা)।

আলবাট্রস নামক সামুদ্রিক পাখি সাধারণত স্বাধীনতা, সৌন্দর্য ও সামুদ্রিক জীবনের প্রতীক। আবার সাহিত্যে মাঝে মাঝে উক্ত পাখির প্রসঙ্গটি ‘বোঝা বা ভার’ হিশেবেও উপস্থাপিত হয়। প্রাচীনকালে নাবিকেরা অনেকেই আলবাট্রসকে সৌভাগ্যের বাহক, আবার কেউ-বা দুর্ভাগ্যের প্রতীক ভাবত। শার্ল বোদলেয়ারের বিখ্যাত একটি কবিতা আছে আলবাট্রস পাখি নিয়ে। কবিতাটি অনুবাদ করেছিলেন প্রখ্যাত কবি বুদ্ধদেব বসু :

মাঝে মাঝে, কৌতুকের খেয়ালে, জাহাজের মাঝিমাল্লা
ধরে সেই বিশাল সমুদ্র-পাখি আলবাট্রস,
…এই আকাশযাত্রী, কী দুর্বল সে হ’য়ে যায়, যার দাপটে
মেঘ ছেড়ে দিত পথ! একটু আগেও এত যে সুন্দর ছিলো,
কী কুৎসিত এখন, জবড়জং
…কবিরাও তাই, মেঘলোকের রাজপুত্র, শিকারীর তীর
হাসিতে খানখান ক’রে দিয়ে ঝড়ের বুকে তার আনাগোনা,
এই পৃথিবীতে নির্বাসিত

—আলবাট্রস : শার্ল বোদলেয়ার; ভাষান্তর : বুদ্ধদেব বসু

জওয়াহের হোসেন-এর ‘মৃত আলবাট্রস’ কবিতায় পাই :

এখানে জলের মধ্যে তুমি বেজে ওঠো দগ্ধ আলবাট্রস
তোমার পোড়া হাড়ে যেন বিষাদ বিঁধেছে আর
রক্তে অগ্নি, জলে লুকিয়ে আছে জীবন

—মৃত আলবাট্রস

এই স্তবকে কি কষ্টের তীব্রতা আর আত্মদহনের বার্তা দিচ্ছে? এই আত্মদহনের বোধ থেকে আবার অন্যত্র দেখি অন্য প্রসঙ্গে বিরহের সুরে লিখেছেন :

খুব কেঁদেছিলে আর ঈর্ষায় গ্রীবা বাড়িয়ে ভয়ে ভরা চোখে তুমি চিরদুখি
জানি মেঘ ওই গুপ্ত হিমদানা নির্জন অসুখ নিয়ে তুমি উদাসিনী
…এই ঋতুবদলের দিনে কাঁপছে আর্তশরীর আর ঘোর মহুয়ার বন
তবু অসহায় অন্ধকার অপ্রেমে আজীবন কলঙ্ক নিয়ে আছি দুঃসহ দুর্দিনে

—আর্তশরীর

অসহায় অন্ধকার অপ্রেমে আজীবন কলঙ্ক নিয়ে দুঃসহ বেঁচে থাকাটা বোধহয় নারীর অপ্রেমে দীর্ঘ অন্তর্দহনের ইঙ্গিত বিহন করছে। নারীর স্পর্শের তীব্র আকুতির বার্তা পেয়েছিলাম কবি হেলাল হাফিজের একটি কবিতায় : ‘আমাকে স্পর্শ করো, নিবিড় স্পর্শ করো নারী।/ অলৌকিক কিছু নয়,/ নিতান্তই মানবিক যাদুর মালিক তুমি/ তোমার স্পর্শেই শুধু আমার উদ্ধার।‘ (দুঃখের আরেক নাম)। অলৌকিক নয় অথচ মানবিক শব্দের পরে ‘যাদু’ বসিয়ে কবি ঠিকই এক অতিমানবীয় অনুভূতির প্রকাশ ঘটিয়েছেন কী স্বতঃস্ফূর্তভাবে!

Poet Zawahar Hussain; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন : ‘মানুষের মৃত্যু হ’লে তবুও মানব/ থেকে যায়; অতীতের থেকে উঠে আজকের মানুষের কাছে/ প্রথমত চেতনার পরিমাপ নিতে আসে’ (মানুষের মৃত্যু হলে)। জওয়াহের হোসেনের মৃত্যু-উপলদ্ধি আমরা পাই এভাবে :

মৃত্যু এতসব হিম, ভেঙে ভেঙে নামছে কবর বিবরে
তারও গভীরে অন্ধ চোখ গুঁজে যে-অনুসন্ধান আঁকছি
ওটা কিছু নয় — ওটা তোমারই রূপান্তর

—শোকস্তবক

প্রেম নামের এক তীব্র মাদক যা সবচেয়ে শক্তিশালী মানবীয় মৌলিক অনুভূতি, যা প্রথমে দারুর মতো তেষ্টা মিটিয়ে অপার্থিব অনুভূতি দেয়, এরপর আগুনের মতো সব পোড়াতে থাকে, ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে ফেলে সব। অতঃপর একটা সময় আসে যখন ঘূর্ণিঝড়ের মতো ফণাধর সেই অনুভূতি স্তিমিত হয়ে আসে, যেন ক্লান্ত ও নিঃস্ব এক মানুষ সন্ন্যাসব্রত নিয়ে সব ত্যাগ করে সাধনার পথে পা বাড়ায়। ‘দারু’ কবিতায় কবির এমনই এক অভিব্যক্তি এসেছে : ‘সব খালি করে ধীরে ধীরে এই প্রেম, এই অগ্নিচ্ছটা/ পোড়া নিমজ্জন গ্রহণ করে সাধুবেশে একা‘ (দারু)।

সংঘাতমুখর প্রথাগত জীবনে তাল মেলানোর আওয়াজ পাওয়া যায় ‘ত্রস্ত, দিশেহারা’ শীর্ষক কবিতায়। ‘বিরহের বহুদিন পরে এ-ব্যঞ্জনা খুবই প্রাসঙ্গিক বটে : ‘তবু/ পেতেছি আবারও উনুন’ (ত্রস্ত, দিশেহারা)। বিরহের বহুদিন পরে আবারও উনুন পেতে তবে কি আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছে? অবশ্যই আশা-নিরাশার দোলাচলে, চিন্তার দ্বন্দ্বে জীবনের কোনও এক পর্যায়ে এসে কিংবা কোনও এক বিশেষ (বা বিশেষত্বহীন) সময়ে এসে সবারই মনে হতে পারেএ-জীবন অর্থহীন! আর কবি, কবিতাপাঠকদের ক্ষেত্রে প্রায় অবধারিতভাবেই একটি পর্যায়ে এ-প্রশ্ন হাজির হবে, কোনও একসময় মুখোমুখি করাবে এই অনিবার্য আত্মজিজ্ঞাসার।

এ-পন্থায় আউটসাইডার হিশেবে অনেকেই নিজেকে আবিষ্কার করতে পারেন। যদিও কেবল প্রথাকে অস্বীকার করলেই জীবনের অর্থকে অস্বীকার করা হয় বলে মনে হয় না। যখন কোনওকিছুতেই আর মানুষ আগ্রহ খুঁজে পায় না, তখন হয়তো সত্যিকার অর্থেই মানুষ অ্যাবসার্ডিস্ট হয়ে পড়ে। আলবেয়ার কামুর ‘আউটসাইডার’ উপন্যাসের নায়ক মারসোর শেষ পরিণতি পর্যন্ত পড়ে এমন সুস্পষ্ট আভাস মেলে। আর আলোচ্য কবিতার বইটিতে এই অনুষঙ্গ বারবার মনে উঁকি দিয়েছে।

বইয়ের কবিতাগুলো যতই পড়েছি, ততই মনে হলো দ্বাদশ ব্যক্তি হিশেবে কবির পর্যবেক্ষণ, ভাবনা ও অভিজ্ঞতা ক্রমাগত বেড়েছে আর এর ছাপ পড়েছে তার কৃত সাহিত্যকর্মে। এরই ধারাবাহিকতায় তাঁর পুরনো ভাষাগত স্টাইলের সাথে পার্থক্য রচিত হয়েছে। মনে হয়েছে তাঁর চেতনা যতই দগ্ধ হয়েছে, ততই ঋদ্ধতা পেয়েছে তাঁর ভাষা, পরিশ্রুত হয়েছে তাঁর কবিসত্তা। ‘তীক্ষ্ণ কুয়াশায় নীলাভাটুকু জ্বেলে জীবন ফুরানো গল্পে ভেবেছি/ সব অর্থহীন…/ আজ দেখি মৃত্যুমৌসুম লেগে আছে শীত-কুয়াশার ঘন রাতে।‘(আর্ত-অনুভূতিহীন)

কবি জওয়াহের হোসেন নিঃসঙ্গতা, বেদনা, স্মৃতিরোমন্থন আর অনিশ্চয়তার অনুভূতি দিয়ে তৈরি করেছেন এক রহস্যময় বলয়। ছন্দ ব্যবহার করেননি। উপমা, রূপক, বিষয় প্রকরণ ও বহুমাত্রিকতার দেখা মিলে তাঁর কবিতায়। বাদ যায়নি রাজনৈতিক উথান-পতনের প্রসঙ্গও :

এই বোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে কার্ল মার্কস
কতবার হাত উঁচু করে তুলবে আর নামবে বিপ্লব
আমাদের মহাকালের পথে মানবকল্যাণ
রেখেছিল জনমিছিল…

—মানবকল্যাণ

ওই ছবিঘরের সুর-বণিকগণ… আমার কানে কেন যে অর্গ্যান ছুঁড়ে দেয় আমিতো সরব দর্শক
Poet Confession; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

কবিতা তো প্রকৃতপক্ষে মানবীয় অনুভূতি ও বোধকেই নবসৃষ্ট উপায়ে প্রকাশ করার এক নান্দনিক শিল্প-ই বটে। জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে জওয়াহের হোসেনের কবিতার ভাবধারার একটা সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। জীবনানন্দের কবিতায় পরিচায়ক বিষয়বস্তু হিশেবে পাওয়া যায় ব্যক্তিগত নিবিড় নিঃসঙ্গতা, নারীর অনুপস্থিতিতে সৃষ্ট এক ক্লাসিক্যাল বিরহ, যা শেষ পর্যন্ত প্রকৃতির রূপকথার মতো সৌন্দর্যের ভেতর আশ্রয় নেয়। কবি জওয়াহের হোসেনের কবিতার বিষয়-অনুষঙ্গও ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা, ভাবনার ইন্দ্রজাল, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, তার অন্তর্জগত ও শেষমেষ বেদনাবিধুর এই সবকিছু ঘোচাবার এক ডেসপারেট কিন্তু নান্দনিক প্রয়াস আমরা দেখতে পাই, যার বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে তাঁর এই শিল্পকর্ম। অধিকন্তু, নগর মুসাফির এই কবির কাব্যিক সৃষ্টিমালায় জীবনানন্দের মতো বাংলার গ্রামীণ নৈসর্গিকতা অনুপস্থিত।

তিনি একজন আহত পথিকের মতো জীবন পার করছেন এবং অতীতের স্মৃতিগুলো তাকে তাড়া করে ফেরে। তাঁর কবিতায় বারবার উঠে এসেছে ব্যক্তিগত হতাশা আর ব্যর্থতার প্রকট চিত্র, এসেছে আত্মশ্লাঘা ও গ্লানিবোধ :

এই নিঃসঙ্গ চূর্ণস্মৃতি ছেড়ে নেমে পড়ছি আহত বিপথিক
দূরের রাত্রিগুঞ্জরিত দ্বিধায়
সে সজল অশ্রুর কাছে বিচলিত আজ

এত মৌন, এত গ্রহণব্যথা নিয়ে ফিরে যেতে দেখি
অগত্যা দূর-তলাটের এক সন্ধ্যার শরীর।

একই অনূভুতি পাওয়া যায় ‘ত্রস্ত, দিশেহারা ‘ কবিতা থেকেও : ‘দূরদাহে আমি তো খুঁজেছি চূর্ণিত স্বপ্নের ভিতর / অজস্র রাত্রি স্মৃতিহারা যোজন ব্যাপী।’ জওয়াহের হোসেনের কবিতায় যেমন মানবজীবনের বিভিন্ন বাহ্য ও নিগূঢ় বিষয়ের চিত্র চিত্রিত হয়েছে, তেমনই তার পারিপার্শ্বিক উপাদানের প্রতিও তাঁর গভীর অনুরাগ প্রকাশ পেয়েছে। নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা এবং যান্ত্রিকতার মধ্যে থেকেও তিনি সবার অলক্ষ্যে যাপন করছেন এক সন্ন্যাস জীবন, যেখানে প্রতিনিয়ত তিনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন দৃশ্যমান সত্য আর পার্থিব-অপার্থিব বোধ, বিরহ আর পোষণ করছেন নিঃসঙ্গতা ঘোচাবার এক আকূল বাসনা। মাঝে মাঝে গভীর নৈরাশ্যবাদ ও বিবমিষা ফুটে ওঠে তাঁর লেখায় :

কোন উজানে যাবে? বরং ঝাঁপ দাও
গহিন জলের প্রপাতে উড়ে উড়ে কতদূর আর যাবে…
আনন্দের জন্য যত বিশুদ্ধ সরোবর গ্রহণ করো
পৃথিবীতে অন্ধকার বলে কিছু নেই, অক্ষয় বলে কিছু নেই

কাব্যাশ্রয়ী ও নিশাচরগণ

কুয়াশা, রাত্রি, শরীর, শীত, মেঘ, একাকী, নিঃসঙ্গ এই শব্দগুলো বারবার দেখা গেছে তাঁর কবিতার ভাষায়। কবির কবিতায় দর্শন এবং আধ্যাত্মবাদের একটি বিশেষ প্রভাবও লক্ষ করা যায়। তিনি জীবনের বিভিন্ন জটিল প্রশ্ন এবং রহস্য নিয়ে গভীর চিন্তা করেছেন এবং তাঁর কবিতায় সেই চিন্তাগুলোর প্রতিফলনও ধরা পড়ে। পাঠককে আত্মবিশ্লেষণ এবং জীবনের গভীরতা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতেও তাড়িত করে।

. . .

Idle Hours Of a Monarch … : Poet’s Photography; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

সুরা ও জাদুমোহ : পাঠ-উন্মোচন

এই বইটির দ্বিতীয় অংশ ‘সুরা ও জাদুমোহ’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যে-অংশকে তাঁর কবিতার একটি জাদুকরী জগৎ বলে অভিহিত করা যায়। হ্যাঁ, দ্বিতীয় অংশই বলা যায়। বইয়ের পেছনে বই বিষয়ে যে-ভাষ্য দেওয়া আছে তার এক অংশে লেখা রয়েছে : ‘এক অর্থে এই বই একের ভেতর দুই : দ্বিতীয়াংশ ‘সুরা ও জাদুমোহ’ বাংলাদেশের ডামাডোলভরা কাব্যচর্চায় মার্ক করে রাখার মতো।’ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লাইনে পরিব্যাপ্ত সুবিশাল ভাবনাগুলো সন্নিবিষ্ট হয়েছে ‘সুরা ও জাদুমোহ’ অংশে। এই অংশের স্তবকগুলো যেন বহুস্বরিক ও বিযুক্ত কবিতা, যেখানে ভাবের ধারাবাহিকতা থাকে না। একটি কবিতা হলেও এর ভেতর বিচ্ছিন্ন চিন্তা বা চিত্রকল্প স্থান পেয়েছে।

‘ক্ষত আমাকে ব্যথা দেয় না, ব্যথা দেয় তোমার বদলে যাওয়া সময়’লাইনটি স্থবির করে দেওয়ার মতো! কী এক আচ্ছন্নতা তৈরি হয় এই অংশটি পড়ে। সামনে আরও এগিয়ে দেখতে পাই ছোট ছোট শ্লোকের মতো এ-যেন জাদুকরী কিছু লিপিকলা। ‘পানপাত্রে অহর্নিশ তোমাকে দেখি, চোখ অন্ধ হয়ে গেছে জাদুর স্নিগ্ধ-মধুরিমায়।’ এই লাইনগুলো যেন বিরহী এক কবির ক্রমাগত আত্মদহনের বহিঃপ্রকাশ। তবে তাঁর বিরহে নারী কিংবা হোক অন্য কোনও প্রসঙ্গ, তা বিমূর্ত থেকে গেছে।

ব্যক্তিজীবনে আজীবন অজস্র দুঃখময় ঘটনার সাক্ষী মার্কিন লেখক মার্ক টোয়েনের মতো হয়তো কবি জওয়াহের হোসেনও নিজেকে দুর্ভাগা ভাবেন। তাই তো লিখেছেন : ‘আমি আর মার্ক টোয়েন কালো বিড়ালের সাথে জেগে আছি দীর্ঘতর রাত্রি ‘। এই অংশে আরও অনেক কবি ও সাহিত্যিকের প্রসঙ্গ টেনে এনে অর্থদ্যোতনা তৈরি করেছেন তিনি।

যেমন, ‘আমিহীন যন্ত্রণায় আধপোড়ানো শ্মশানঘাটে দাঁড়িয়ে আছি আমি আর সুবিমল মিশ্র।’ ‘ভিক্টর হুগোর হাঁসদল জলে ভাসে, এই শীত-শিশিরে আমিও খুলে রাখি দেহের জামা দীর্ঘ একটি স্নানে।’ আধিপত্যবাদ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভীক বুদ্ধিজীবী ও একালের সক্রেটিস নামে খ্যাত মার্কিন লেখক নোয়াম চমস্কিকে নিয়ে অনেক অনেক কথন মাত্র এক স্তবকে প্রকাশ পেয়েছে :

নোয়াম চমস্কিকে ইগনোর করতে পারব না, কারণ অগ্রগতি আমাদের মুক্তি দিলেও গোলাপ ও আফিমের চাষ কখনও বন্ধ হবে না।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির অনেক পড়াশোনা আর চমস্কির লেখালেখির মধ্য দিয়ে এর সংশ্লিষ্টতা এই এক বাক্যেই একটি বুদবুদের মতো ভেসে ওঠেছে। সিজোফ্রোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন নিরুদ্দেশ থাকা কবি বিষ্ণু বিশ্বাসকে নিয়ে তিনি বলেছেন : ‘আমার কোনও বন্ধু নেই অভিমানী স্বরে বলেছিলেন কবি বিষ্ণু বিশ্বাস, সৌভাগ্যজনিত সিজোফ্রনিয়া আমাকে দিয়েছে সিদ্ধিলাভের জীবন ‘। কতটা নিঃসঙ্গতা বোধ এ-কাব্য-ভাবনার সৃষ্টি করে ‘সৌভাগ্যজনিত সিজফ্রোনিয়া আমাকে দিয়েছে সিদ্ধিলাভের জীবন’লাইনটি?

Milan Kundera; Image Source: Collected; Google Image

নির্বাসিত চেক লেখক মিলান কুন্ডেরা নিষিদ্ধ ও নির্বাসিত হয়েছিলেন সমাজতান্ত্রিক লেখাজোখা প্রকাশের কারণে। প্যারিসে দীর্ঘ নির্বাসন-জীবন কাটিয়ে এর মাশুল দিতে হয়েছিল তাঁকে। তাঁকে নিয়ে কবির অভিব্যক্তি : ‘আমলাতন্ত্রের মধ্যে মেধা বর্জন করতে চেয়েছিলেন মিলান কুন্ডেরা, কী তীব্রতা দীর্ঘতর ছিল’। আর প্রবাসজীবনে শীতের বিষণ্নতা বারবার হানা দিয়েছে তাঁর নস্টালজিয়া আকাশে :

‘কাঁপাকাঁপা দূর-গৃহবাসের পাশে পরাক্রম গেয়ে উঠছে কতিপয় শীতের আগুন ও মোটিফ’।
‘রাত্রি কাপছে, পরিবৃত ডিপ্রেশন এখন খুব, স্ফীত হয়ে ওঠা একাকিনী দূর — মৌন মেঘ।’
‘জীবনভর তবু ভ্রম জাগে, মন ভরেছে শুধু ব্যর্থ শব্দভারে একাকী, শব্দ নৈঃশব্দ্য ‘।

তাঁর আধ্যাত্মবাদের বিষয়টা আসে এই লাইনটিতে : ‘মৃত্যু তো একটা জীবনেরই নাম, যেখানে বেঁচে থাকা শুরু হয়’। এই ‘বেঁচে থাকাটা’ হতে পারে পরকালীন মহাযাত্রার ধারণা কিংবা বিলীন হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে মানবজনমের সমস্ত অনুভূতির যবনিকাপাত। আবার, ‘দরবেশদর্শনে এসে থেমে যায়নি অহিংসা/ তাই তো বলি বুদ্ধের মন এত উতলা কেন’—লাইনেও একই ভাবনার উদয় হয়। প্রবাসজীবনে কবি তাঁর নিঃসঙ্গতা ও ব্যাকুলতা ব্যক্ত করে ইতি টেনেছেন একাকী, শব্দ নৈঃশব্দ্যের দীর্ঘ এক যুগের অভিযাত্রা :

অধম জেনো এই জওয়াহেরকে, একা-একা পরবাসে যে একা চিরকাঙাল…

পরবাস শব্দটি একইসঙ্গে তাঁর প্রবাসজীবন ও অপরিচিত পরিবেশে মানসিক একাকীত্ব এবং চিরকাঙাল শব্দের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন পরিবেশে এক অপূর্ণতা কিংবা দৈন্যদশার কথা সহজেই প্রকাশ পেয়েছে, যা তাঁর গভীর বেদনা ও নিঃসঙ্গতার বিমূর্ত রূপকে কিছুটা পরিমাপ করেছে।

জওয়াহের হোসেনের কবিতা ভাবনায় সমকালীন প্রসঙ্গের সমান্তরালে প্রেম, বিরহ, নিঃসঙ্গতা, পার্থিব জীবনের প্রতি উদাসীনতা, বৈরাগ্যভাব এবং একপ্রকার ব্যাকুলতা… এইসব ভাবনাগুলো যুগপৎ সামনে এগিয়েছে, পরিশেষে যেখানে তাঁর নিঃশব্দ উতলা মন পরিত্রাণের জন্য হয়তো উতলা হয়েছে । কবিমনের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তার জটিলতা, অবিরাম দ্বন্দ্ব আর অভিজ্ঞতার মিলনেই সম্ভবত তাঁর কাব্যচর্চা পেয়েছে অভিজ্ঞান; এক স্বতন্ত্র, শৈল্পিক ধারা। তাঁর নীরব নিঃসঙ্গ আরাধনায় নগর জীবনের ভাবনার উপাদান পরিলক্ষিত হয় ‘একাকী, শব্দ নৈঃশব্দ্য’ বইয়ে। বইটির পরিসর ক্ষুদ্র হলেও মনোজগতে এক তীব্র প্রভাব সৃষ্টি করে এবং ব্যাপক চিন্তার বিস্তৃতি ঘটায় প্রায় অনিবার্যভাবে।
. . .

Poet Zawahar Hussain; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

… কবিকে জানতে আরো দেখুন …

যুগলমুদ্রায় দুই কবি : থার্ড লেন স্পেস.কম

. . .

লেখক পরিচয় : অনন্ত নিগার

বিজ্ঞানলেখক অনন্ত নিগারের জন্ম নদী সুরমা পরিবেষ্টিত সিলেট শহরের বাগবাড়ি এলাকায়। পদার্থ বিজ্ঞানে ছাতত্ব শেষে যোগ দেন অধ্যাপনায়। উচ্চতর বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য এখন ইউরোপ মহাদেশে দিয়েছেন পাড়ি। বাংলাদেশে নিস্তেজ প্রায় বিজ্ঞানচর্চায় অনন্ত নিগার তাঁর লেখক-জীবনের শুরু থেকে সক্রিয়। নতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞানে আগ্রহী করে তুলতে পূর্বসূরী বিজ্ঞান-লেখক মোহাম্মদ ইব্রাহিম, জহুরুল হক, আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিন, মোহাম্মদ জাফর ইকবালের পথেই হাঁটছেন নিরলস।

বিজ্ঞানের বিবিধ প্রসঙ্গ নিয়ে অনন্ত লিখেছেন একাধিক বই। তার মধ্যে ‘বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের বিস্ময়’, ‘কেন বিজ্ঞান পড়ব?’, ‘আইনস্টাইনের জগৎ’, ‘বিজ্ঞান বনাম অপবিজ্ঞান’, ‘বিগ ব্যাং থেকে আজকের পৃথিবী, ‘আলফ্রেড নোবেল’ কুড়িয়েছে পাঠ-সমাদর। সহজ ভাষায় পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন বিজ্ঞানের ওইসব খুঁটিনাটি প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গ, যা পাঠককে উৎসাহী করবে বিজ্ঞানমনস্ক হতে।

বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি অনন্ত নিগার সাহিত্যকেও আপন করে নিয়েছেন করপুটে। লিখছেন কবি ও কবিতা নিয়ে নানামুখী গদ্য। কবি ফজলুররহমান বাবুলের কবিতাযাত্রার ওপর তাঁর আলোকপাত ও কবির সঙ্গে আলাপ নিয়ে ‘ফজলুররহমান বাবুলের সঙ্গে’ শিরোনামে বই প্রকাশিত হয়েছে ইতোমধ্যে। সাহিত্যিক অনুবাদেও তাঁকে সক্রিয় দেখে পাঠক। এছাড়া সিলেটের স্থানিকতাকে জানার আগ্রহ তাঁর কাজের এলাকাকে দিয়েছে বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা। ‘সিলেট চরিত কথা ছদরুদ্দিন আহমদ চৌধুরী’ শিরোনামে লিখেছেন বই।

Books written by Ananta Nigar: Collage; Image Source: Collected; Google Image; @thirdlanespace.com

কবিতাপ্রিয় অনন্ত নিগার নিজে কবিতা সেভাবে না লিখলেও কবি ও কবিতাপাঠে তাঁর সজাগ ঔৎসুক্য ধরা পড়ে কবি ফজলুররহমান বাবুলের কবিতা বিষয়ক গদ্যবই ‘কবিতার পথে পথে’ নিয়ে প্রাণবন্ত ও পাঠ-উপভোগ্য আলোচনায়। অনন্ত শুরুতে লিখছেন :

সকলেই কবি হয় না, কেউ কেউ কবি হয়। কবি ও কবিতা বিষয়ে আছে নানান মত। আমি ব্যক্তিগতভাবে কবিতা লিখি না। কেবল কবিতাকে ভালোবাসলে, কবিতা নিয়ে শুধু চিন্তাভাবনা করলেই কবি হওয়া যায় না। আমি কবিতার একজন পাঠকমাত্র। কবিতা নিয়ে কবিদের জটিল বাহাসে জড়াই না। এড়িয়ে যাই। এছাড়াও কবিতা বিষয়ক জ্ঞান আমার অপ্রতুল বলে তর্কেও সাহস পাই না। কবিতার নিশ্চুপ পাঠক হিশেবে সাহিত্যের এ-শাখাটি নিয়ে আমার অনেক জিজ্ঞাসা আছে, কৌতূহল আছে। হয়ত নিজস্ব মতামতও আছে—যা আমার নিজের কাছেও তেমন স্পষ্ট নয়।

অনায়াস এই স্বীকারোক্তির মধ্যে প্রশ্নমনস্ক এক মন ধরা পড়ে, যে কিনা বিজ্ঞানের অসম্ভব বৈচিত্র্যময় সব এলাকায় নিহিত নিগূঢ় রহস্যের মতো কবিতাকেও ‘অমীমাংসিত রমণী’ ভেবে হয়ে উঠছে কৌতূহলী। কবিতাকে জানতে চাওয়ার এই অনুসন্ধিৎসা তাঁর কবিতা বিষয়ক গদ্যে ধরা পড়ে ফিরে-ফিরে।

কবি জওয়াহের হোসেনের কবিতামগ্নতা নিয়ে রচিত গদ্যেও যথারীতি সেই ছাপ মুদ্রিত। অনন্ত নিগার সক্রিয় পাঠ এবং লেখায়;—ছোটকাগজ ও প্রকাশনায়। নানাবিধ পশ্চাদপদতায় নিমজ্জিত দেশে বিজ্ঞান ও সাহিত্যের যৌথতায় লেখালেখিতে সক্রিয় থাকার কঠিন পথ ভাঙছেন এই লেখক, যা এই মহূর্তে বিরল… ভীষণ বিরল।
. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 22

No votes so far! Be the first to rate this post.

thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *