
মেকদাদ মেঘ-এর কবিতাগুচ্ছ : “পাতালের লৌকিক সাঁতার”
বাতাসের ডানাকাটা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে
জানানো যায় যাত্রা শুভ হোক সকলের
সর্বদাই গতিময় আত্মা ও দুঃখ নামক অনাত্না,
গতির মুদ্রা মুদ্রিত যাদুর অক্ষর
চিরকাল ঘূর্ণায়মান প্রগতির চাকা
কর্ম ব্যঞ্জনায় ভাসে হৃদয়ের ভাষা
পাখি ও পাতার ভাঁজে হাওয়ায় হাওয়ায়
নক্ষত্রের কান্না পায় হাসি পায়
চিরায়ত নাক্ষত্রিক সংসারে
তারকা নয় খসে পড়া উল্কার নৃত্যে কাঁপে আশপাশ
খসে পরে গলিত জোছনা নক্ষত্রসময়
মানুষের মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রোদ বৃষ্টি অতিক্রম করে ঘোর অন্ধকার ভেঙে পাতালের লৌকিক সাঁতার
আমরা দেখতে থাকি সূবর্ণ স্মৃতির পৃষ্ঠা
দুলতে থাকে সময়ের হাতে
যেরকম পৃথিবীর সময়ের পাতা থেকে
অশ্রুবিন্দু রেখে
মৃন্ময়ী বেলা শেষে বাড়ি ফিরে যায়
. . .
২
কিছু মানুষের বদলে যাওয়া দেখে দেখতে থাকি খোলস পাল্টানো সাপের মৌসুম, যেন পাল্টানোর শুরু ও শেষ নেই
অদ্ভুত মৃত্যুর গান মসলা ও কমলার বনে।
. . .
৩
মাঝে মাঝে গোপন রহস্যঘেরা আয়নায় ভাসতে থাকে মহাকাশজুড়ে ভ্রমরার গুঞ্জনময় ব্যথার শরীর
ইচ্ছামৃত্যু দূরে সরে যায় ধূসর অধ্যায় শেষে, আমাতেই আমিত্বের ঘরগেরস্থালি আরেক অঘ্রাণ
বস্তুর দ্যোতনাহীনতার মতো রহস্যবিহীন
তখনও লৌকিক সাঁতারে
নিজেকে জানান দেই
নিঃসঙ্গতা একাকিত্ব নয় নির্জনতা নয় নৈঃশব্দ্যের নির্লিপ্ত ডানা
শূন্যতার মগ্নরথে অনেকেই বেঁচে আছি
উড়ে জন্মের অনলে পোড়া
অমরত্বের লৌকিক মাছি
যদিও জীবন রূপকথার কানামাছি নয়
. . .
৪
ও হাওয়া তুমি বহমান কেন আদি অন্তহীন
জল তুমিও ঘুরছো চক্রাকারে
আগুন তুমিও জ্বলছো নিরবধি
যেন তোমরাও পরার অধীন
ঘূর্ণনের অনুভব কখনো কি শেষ হয় তোমাদের
তোদেরও কি রয়েছে বেদনা স্মৃতি আনন্দের

৫
মহাকাশ থেকে কখনো পৃথক নই
পৃথক নই মহাবিশ্ব থেকে
মহাকাশকে বলেছি মহাকাশ
আমরা তারই বিশালত্ব দেখে
কী করে পৃথক হই একসঙ্গে
আমাদের এই বসবাস
আমাদের ভেতরে বাহিরে তার
চলমান গোপন নির্যাস,
নক্ষত্রের মতোন আমরা
আমরাও মহাবিশ্বে ফুল
জৈব ও অজৈব রসায়নে
কখনোই নয় নির্ভুল,
মহাবিশ্ব থেকে নই আমরা আলাদা
গোপন মায়ার চক্রে চক্রাকারে বাঁধা।
. . .
৬
অতি বোধ
বধির হয়ো না বেশি
বোধান্ধের আছে হাহাকার
স্মৃতি ব্রহ্মে পারাপারে
জেনে নিতে হয়
পাতালের লৌকিক সাঁতার।
. . .
৭
লৌকিক সংসারে
মেঘবালিকার খোঁজে
দূরের পাহাড় ও পাতালে
ভাসিয়েছি মনের পানসি
তারপর তারকার ভিড়ে
দূরত্বের তারকাঁটা রেখায়
অন্ধকার সীমান্তে সীমান্তে প্রায়
দেখি গোলগাল আলোর সন্ন্যাসী,
হাসে ও হাসায়
কাঁদে ও কাঁদায়
যেন হৃদয় ব্যাপারী
মেঘবালিকার খোঁজে
ডানপিটে ছেলেবেলা
পৌঁছে যায় যৌবনের বাড়ি,
মেঘবালিকার ঘোরে
ঝোপঝাড়ে হৈ হুল্লোড়ে
কত রঙ স্বপ্ন হলো খুন
কে জানে এমন স্মৃতি মধুর ফাগুন
পা চলত আগে আগে
স্বপ্নের স্বদেশে জেগে গহিন আবেগে
তাও যেন সময়ের কঠিন উনুন,
মেঘবালিকা কি জানে বুকের ভিতরে ঝড় এ কোন আগুন

৮
হাঁটতে হাঁটতে থামে যদি পা
তুমিও থমকে যাও
এমন থামা বদলে ফেলো ঠিকই
পুরোনো দিন ফিরে কি আর পাও?
চলতে চলতে ক্লান্ত যদি হও
ক্লান্তি দূরে যাক
চোখে কখনো দেখতে পেয়েছো কি
তৃষ্ণা মেটাতে পাথর বইছে কাক
হাঁটতে হাঁটতে কখনো থামো যদি
থামে না বিশ্ব তোমার জন্মভূমি
আত্মা আর অনাত্নার বিশ্রামে
জেগে ওঠো পুরো পুরোটাই জাগো তুমি।
. . .
৯
নক্ষত্র ছায়ায় তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করে
নক্ষত্র দেখতে দেখতে তোমাকে বলতে চাই
মুগ্ধতা ধূসরতার চেয়ে কম নয়
অন্তরঙ্গতা কেটে ফেলে দীর্ঘশ্বাসের মতো দূরত্বের জাল
জেনে নিতে হয়
পাতালের লৌকিক সাঁতার।
. . .

. . .

লেখক পরিচয় : মেকদাদ মেঘ
সিলেট মাটির ছেলে মেকদাদ মেঘ ভালোবাসেন কবিতা যাপন। মেঘে মেঘে অনেকটা বেলা ধরে যাপিত আছেন কবিতায়। ছোটকাগজগুলো তাঁর কবিতা নিয়ম করে ছাপলেও, অনলাইনে কবির সক্রিয়তা কম। অনলাইন সাহিত্যপত্র চিন্তাসূত্র ও গানপার-এ মাঝেমধ্যে গদ্য, কবিতা কিংবা কোনো বাউল গানের শিল্পীর সঙ্গে কথাবার্তা নিয়ে হাজির হন। ‘ডোরাকাটা অন্ধকার’ শিরোনামে খুব সম্ভবত কবিতাবই রয়েছে তাঁর। অনলাইন ও অফলাইনে বইটি এখন আর সুলভ নয় অবশ্য।
কবিতায় যাপনের পাশাপাশি মেকদাদ তাঁর নিজেকে যাপন করেন গান ও ছবি আঁকায়। বাংলাদেশ বেতারের স্বীকৃত গীতিকারের তালিকায় নাম উঠেছে সম্প্রতি। বাউলা গানের সঙ্গে রয়েছে সখ্য ও চেনাজানা। নিজে গলা সাধেন যখন মন চায়। সিলেট শহরে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও কবিকে শরিক দেখেন পরিচিতরা।
অন্তর্মগ্ন যে-মৌলসুর মেকদাদ মেঘের কবিতাকে পাঠকের কাছে আদরের করে, তা মূলত কবিতা ও আনুষাঙ্গিকে কেন্দ্রীভূত এসব যাপনদৃশ্যের মধ্য দিয়ে তাঁর কবিতায় জায়গা করে নেয়। কবিতা হয়তো লেখেন নিয়মিতই, কিন্তু প্রকাশ করেন অল্পস্বল্প। সংখ্যায় কম হতে পারে, কিন্তু যেসব কারণে মানুষ কবিতার নিকটে যায়, তাকে যাপন করে ক্ষণিক… মেকদাদ মেঘের কবিতায় এরকম দ্রবগুণ বিরাজে। ‘ডোরাকাটা অন্ধকার’ কবিতাটি যেমন এর উত্তম উদাহরণ গণ্য হতে পারে। কবি লিখছেন :

যখন সে দ্রুতবেগে অভিসারে আসে
চিতার পায়ের ধ্বনি তখন তো তার
হাসলে সর্বাঙ্গ হাসে- পুষ্প মানে হার
রজনিগন্ধার ঘ্রাণ শরীরের ঘাসে
উষ্ণতা ছড়ায় এসে মনের কার্পাশে
জাদুর শরীর যেন কারও কাছে মোম
অগ্রভাগে অগ্নি জ্বলে ঢেলে দেয় ওম্
আমরা আগ্নেয় হই আগুনের শ্বাসে।
যখন সে দৃঢ় পায়ে মরুভূমি ধু ধু
প্রেম নক্ষত্রের জল, পানপাত্রে ঢালে
তখন চন্দ্রিমা ওঠে প্রণয়ের কালে
চিরচেনা জোড়াঘুড়ি পাশে থাকে শুধু
সে এক মায়াবী কাল দেহপূর্ণিমার
রূপভিন্ন ভিন্নরূপে দীপ্ত অভিসার।
রহসাভাস ও দ্যুতিচমকে বাঁধাই কবিতাটি তাঁর সম্ভাবনাকে চিনিয়ে দিয়ে যায়। মেকদাদের পাঠকরা সুতরাং চাইবেন তিনি আরো গতিশীল ‘ডোরাকাটা’ হয়ে উঠুন বাংলা কবিতা ও গানে।
. . .


