সংস্কৃতির সীমারেখা নেই। নিপাট স্থানিকতা বলে কিছু আসলেই কি বিরাজ করে কোথাও? এক দেশে উচ্ছল স্থানিক সংস্কৃতির দেহে ভিনদেশি কত-না উপাদান প্রবেশ যায় প্রতিনিয়ত! তুর্কে ওরফে তুরস্কের লোকসমাজে যুগ-যুগান্ত ধরে গীত ‘কাতিবিম’ (Kâtibim) গানটিও সেরকম। তুরস্কে সচরাচর ‘উস্কুদার গিদের ইকেন’ নামে সমধিক পরিচিত গানটিতে কান পাতলে চিরন্তন সত্য মনে আবারো টোকা দিয়ে যায়।
উস্কুদার গিদের ইকেন… কী আছে গানে? ছোট করে বলা যায়,—লোকসমাজে ভূমিষ্ঠ গানটি সরকারি দপ্তরে নিয়োজিত এক কেরানির সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়। ইস্তাম্বুল প্রদেশের উস্কুদার শহরে কর্মরত কেরানি মহাশয়কে ঘিরে তার স্ত্রী অথবা প্রণয়ীর আবেগ-উচ্ছল অনুভূতি হচ্ছে গানটির মূল উপজীব্য।
দাপ্তরিক কাজে উস্কুদারে রওয়ানা দিয়েছেন কেরানি। শূন্যতা ও বিরহ-যাতনা ভুলতে দুজনের একসঙ্গে কাটানো দিনগুলো এইবেলা ইয়াদ করছেন স্ত্রী বা প্রণয়ী। কেরানি মহাশয় এভাবে গানের কলিতে নিজের ব্যক্তিত্বসমেত আভাসিত হচ্ছেন শ্রোতার কানে।
স্ত্রী/প্রণয়ীর চোখে কেরানির সবকিছু সুন্দরে মোড়ানো। ঘুম থেকে জেগে ওঠা, ঝাপসা দু-চোখ মেলে বাইরে তাকানো, শহরের পথে যাত্রা করতে যেয়ে লম্বা ফারের কোটে কাদার দাগ লেগে যাওয়া… সব… সবকিছু অর্থবহ হয়ে উঠছে তার কাছে। আর, সবচেয়ে সুন্দর হলো কেরানির গায়ে চড়ানো মাড় দেওয়া শার্টখানা। শার্টে নাকি দারুণ সুদর্শন দেখায় তাকে।
দাপ্তরিক কাজে কেরানির শহরে গমন করা মানে কিন্তু বিচ্ছেদ নয়। দূরবর্তী শহরে যাচ্ছে সে, তবে স্ত্রী/প্রণয়ী এই দূরত্বকে দূরত্ব মেনে নিতে অপারগ। তার কাছে যাওয়া প্রশ্নটি যেন অবান্তর! তারা দুজনে একে অন্যের কাছাকাছি ছিল, এবং এখনো তাই আছে। দূরত্ব বাস্তবে নয়, বরং অলীক ঘটছে কোথাও! লায়লী-মজনুর একে অন্যকে অনুভব করার মতো চিরবাস্তব কেরানির সঙ্গে তার সান্নিধ্য ও মিলন।
লোকসুরের উচ্ছল তরঙ্গ গানটির প্রতি অঙ্গে বহমান। কাজী নজরুল ইসলামের মর্মে গানটি সেইসময় গেঁথে গিয়েছিল বলে কথা চাউর আছে। আমরা জানি, নজরুল সৈনিকের ভূমিকা নিভিয়েছেন কিছুদিন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিতে হয় তাঁকে। টার্কিশ গানটির সঙ্গে সেই সুবাদে পরিচয় ঘটার সম্ভানা রয়েছে বিলক্ষণ।
ধারণা ভুল হতেও পারে, তবে গানটির সুরতরঙ্গের অনুরণন আমরা নজরুলের জনপ্রিয় দুটি গান ‘শুকনো পাতার নূপুর পায়ে’ ও ‘মোমের পুতল’-এ পাই বটে! নজরুল সুর লাগিয়েছেন তাঁর লেখা গানের ভাবব্যঞ্জনা ও স্থানিকরস মাথায় রেখে। সংগতকারণে গানের কথায় নিহিত ব্যঞ্জনা ফুটিয়ে তুলতে লয়তানে উচ্চকিত দ্রুতলয় এনেছিলেন কবি। ফিরোজা বেগম, অনুরাধা পাড়োয়াল ও ফেরদৌস আরার কণ্ঠে ‘মোমের পুতুল’ ও ‘শুকনো পাতার নূপুর’ নজরুলানুগ। ঊষা উত্থুপের হাইপিচ ভয়েসে ‘মোমের পুতুল’ যদিও অন্যমাত্রায় মোড় নিতে থাকে।
নজরুল তাঁর গানে সুরারোপের ব্যাপারে কমবেশি খামখেয়ালি ছিলেন। নিজের অনেক গান অন্যকে দিয়ে করিয়েছেন হুটহাট। আবার নিজে করতে বসে কমিবেশিও করেছেন ব্যাপক। তাঁর নিজকৃত আদিসুরের অনুরণন অবশ্য ‘মোমের পুতুল’ ও‘শুকনো পাতার নূপুর’-এ আজো জীবিত ও সচল।
যাইহোক, ইরান অথবা কুর্দিস্থানে গুঞ্জরিত কোনো সুর ‘মোমের পুতুল ও শুকনো পাতার নূপুর’-এ ব্যবহার করে থাকতেও পারেন নজরুল। অন্যদিকে, তুরস্কে লোকপ্রিয় ‘কাতিবিম’র সঙ্গে ‘মোমের পুতুল ও শুকনো পাতার নূপুর’র সখ্য অধিক নিবিড় শোনায় কানে। এর মর্মে যেন বইছে দূর তুরস্কে একসময় মানুষের মুখে-মুখে ফেরা গানটির অনুরণন। কেরানি মজনুকে নিয়ে তার প্রিয় লায়লীর অনুরাগ-নিবিড় উচ্ছাস। গানটি সেই থেকে আজো নানা আঙ্গিকে ব্যবহৃত হয়ে চলেছে। সিনেমা থেকে ঐকতান বাদন, এমনকি ইংরেজি ও অন্যভাষার গানেও তার প্রভাব এখনো অমলিন।
. . .
. . .


