পোস্ট শোকেস - সাহিত্যবাসর

‘কবিতাকবিতা’ : মেটা-কবিতায় কবিতা-বীক্ষণ : আবুল ফতেহ ফাত্তাহ

Reading time 6 minute
5
(21)
Book Cover: KobitaKobita by Fazlurrahman Babul; Image Source & Credit: Author

ফজলুররহমান বাবুলের নতুন ভাবনার কাব্যযাত্রা ‘কবিতাকবিতা’

কাব্যযাত্রা বা কবিতাযাপন বস্তু ও ভাবের মননজিজ্ঞাসা। অনির্বচনীয় ভাবপুঞ্জ পারিপার্শ্বিক দৃশ্যপটে রঙ ফলায়। আবার বিষাদ-বিস্ময় রূপকল্প ভাবনার দেউড়িতে বিরহ-মহিমার জন্ম দেয়। নিরন্তর এই সৃজনপ্রক্রিয়া চেতন ও অবচেতনে খেলা করে। কাব্যজিজ্ঞাসা ওই পথে হেঁটে যায়;—নদীপ্রান্তর-সাগর, নিঃসীম আকাশনীলিমা আর বাস্তব পৃথিবীর মানব-অন্তরে। অনুভবের ছোঁয়ায় মূর্ত হয় মহাকাল-জিজ্ঞাসা, আবার শব্দতুলির আঁচড়েও সৃষ্ট হয় মহাকাল। অতিরেখ ভাবকল্প শব্দাতীত চেতনরসে শিল্পদ্যুতির জন্ম দেয়। জীবন ও মহাজীবনের চেতনাধারা বিন্দুর মধ্যে সিন্ধুর গভীরতা পরিব্যাপ্ত হয়, আর এভাবেই কাব্যযাত্রা বিস্তার লাভ করে।

এই ধারা অব্যাহত গতিতে মানবমনে ক্রিয়াশীল হয়। তাই জীবনের পরতে পরতে কবিতানির্যাস শিল্পমেধার স্মারকচিহ্নরূপে স্বীকৃত। প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে,—কলাবিদ চেতনা বাস্তবের কঠিন পেষণে কতটা আলোকদীপ্তি লাভ করে? জিজ্ঞাসার আপেক্ষিক জবাব ফজলুররহমান বাবুল-এর সদ্যপ্রসূত কাব্য ‘কবিতাকবিতা’ (২০২৬)-য় সলাজভঙিতে আবর্তিত।


প্রথানুগ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের বাইরে তাঁর ‘কবিতাকবিতা প্রসঙ্গ’ কবির ভাববিশ্বাস ও কবিতাযাত্রার অনুঘটক সূত্ররূপে চিহ্নিত। কাব্যগ্রন্থের বত্রিশটি কবিতা জিজ্ঞাসু চোখে প্রথার দেয়াল টপকে অনুভবের খেয়ায় পাড়ি দিতে আগ্রহী। এই পরিপ্রক্ষিতে নিবন্ধকার প্রণীত ‘সুবর্ণ সনেট’ (২০১৮)-এর ‘মিশ্রবৃত্ত : কবিতার স্বপ্নহ্রদ’ সনেট থেকে শেষ পুচ্ছটি প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় এখানে উদ্ধার করছি :

যতি ও চরণসীমা ছেড়ে, এসো ভাবছন্দে লেখি
কবিতার স্বপ্নহ্রদে নদীর তরঙ্গখেলা দেখি।

ধ্রুপদরীতির কাব্যকলায় ছন্দশাসনের কড়ারোদ এড়িয়ে ধবল জোছনার সুনীল আকাশে ভাবের ছন্দে স্বপ্নঘুড়ি ওড়ানোর কৃৎকৌশল কবিদের কবিতাযাপনের মধ্য দিয়ে কালক্রমে সূচিত হয়। তিরিশ ও তিরিশোত্তর কবিদের কাব্যযাত্রা ওই পথে এগিয়ে চলে। কবিকিশোর সুকান্তকাব্যে পাঠক শুনতে পান :

কবিতা তােমায় দিলাম আজকে ছুটি,
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল‍্সানাে রুটি॥

বাস্তবের কষাঘাতে কাব্যকলা কতটা রূঢ় ও কঠিন পথে যাত্রা শুরু করে, কবির এই ভাষ্য তা অনুভবে সাহায্য করে, যেখানে প্রচলিত ধারণায় ছেদ ঘটে। এই ধারায় কবির সংখ্যা কম নয়। উদাহরণে নাইবা গেলাম। মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। বাবুল তাঁর ‘কবিতাকবিতা’য় বত্রিশটি কবিতা নিবেদন করেছেন। প্রথম তিরিশটি কবিতায় কবি বহু চিন্তা, বহু উৎস চষে কবিতার সংজ্ঞার্থ নির্ণয়ে তাঁর চিন্তা ও অভিজ্ঞতা যুক্ত করে পাঠকের অনুভূতি ও সংবেদকে পরখ করতে চেয়েছেন।

প্রাত্যহিক জীবনবোধ, সংশ্লেষ, দেখা ও অদেখা দৃশ্যকল্প, চেতন-অবচেতন ভাববস্তু, বোধির জগৎ ছুঁয়ে অন্যলোকে অবস্থানের মহাজাগতিক চেতনরস তাঁর কাব্যচেতনাকে বাস্তবের সিঁড়ি বেয়ে অতীন্দ্রিয় জগতে নিয়ে যায়। সময় বা কাল তাঁকে দৃশ্য-অদৃশ্য জগতের শিলালেখ বেয়ে আকাশ-বাতাস নীলিমা থেকে মানুষের অন্তর্জাত দুঃখসুখ ও বেদনাগাথা লিখিয়ে নেয়, অলৌকিক অনুভবের স্রোতধারায়। এ-কাব্যের কবি বহুভাবে, বহুবার, বহু স্থানে, বহুজনে, বহুমনে আশ্রয় খোঁজায় সচেষ্ট হয়েছেন। তাঁর প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির সঞ্চিত অভিজ্ঞান ‘কবিতাকবিতা’ শিল্পজিজ্ঞাসার বেদীমূলে কতটা পারদ নিষিক্তবোধ সঞ্চয় করেছে, সেই চেতনরসের অভিমুখে এই কাব্যের কবির উদ্দিষ্ট-যাত্রা পাঠকসহযোগে এগিয়ে যাক প্রত্যাশা করি।

‘কবিতাকবিতা’ মূলত কবিতার ভিতরে কবিতারই অনুসন্ধান। এখানে কবিতা নিজেই বিষয়, নিজেই পথ, এবং কখনও কখনও নিজেই গন্তব্য। তাই বইটির বত্রিশটি কবিতাকে পৃথক পৃথক রচনা হিশেবে নয়, বরং একটি বৃহত্তর অস্তিত্বের বত্রিশটি উন্মুক্ত দরজা হিশেবে ভাবা যেতে পারে।

—ফজলুররহমান বাবুল


আমাদের উদ্দিষ্ট ‘কবিতাকবিতা’ গ্রন্থের নিরিখে কবিতা পদবাচ্যটি কোন অর্থ বহন করে অথবা এর অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনা পাঠক কীভাবে বিবেচনা করছেন, তাদের উপলব্ধি কবির উদ্দিষ্টের সঙ্গে কতটা সাযুজ্য-সমিল ভাবকল্পে উজ্জীবিত—সেটা মুখ্য বিষয় নয়। তবে পাঠকের রুচিপ্রজ্ঞা ও জীবনবোধের নানাবিধ কৌণিক সীমারেখা অতিক্রমণের কাছাকাছি পর্যায়ে থাকলে পাঠকমন নিজস্ব ভাবনায় সূক্ষ্মতর অনুভব সঞ্চার করতে পারেন। আর এই অবারিত ক্ষেত্র সৃষ্টিতে একজন কবির চিন্তাদর্শন, সৌন্দর্যচেতনা ও শিল্পবিকাশের মাত্রা যদি আপেক্ষিকসূত্রে রসগ্রাহী হয়, তবে ওই কাব্যের শিল্পযাত্রা বহুমাত্রিক রূপকল্পে উন্নীত হতে পারে।

প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক-যে, কবির ভাবকল্প আর পাঠকবিচিন্তা সবসময় সমান্তরাল হবে, এমনটি না-ও হতে পারে এবং এটাই স্বাভাবিক। কবির চিন্তাযোগের সঙ্গে পাঠকের রুচিপ্রজ্ঞা হুবহু মিলে গেলে সেটা অনিবার্যরূপে বিজ্ঞান হয়ে যায়। আর, যদি সেটা আপেক্ষিকসূত্রে স্বতন্ত্র জিজ্ঞাসার জন্ম দেয়, নানা প্রশ্ন উঁকি দেয়, তবে সেটা সাহিত্য-শিল্প বা দর্শন রূপে মর্যাদা লাভ করে। ফজলুররহমান বাবুলের এই কাব্যপাঠে কবিতার নিবিড় পাঠ ও নন্দন-জিজ্ঞাসায় কবির বহুতর অনুভব একই লক্ষ্যে আলো ফেলেছে। তাঁর জিজ্ঞাসাবিন্দু কবিতার সংজ্ঞার্থ নির্ণয়ের প্রেক্ষাভূমিতে দাঁড়িয়ে বিচিত্র অভিজ্ঞতার নিরিখে অর্থদ্যোতনা শুধু নয়, এর বহুতর ব্যঞ্জনা রূপকল্পের ছায়ায় বসে সূক্ষ্মতর অনুভবের শিল্পিত পথরেখা বিনির্মাণের প্রয়াস পেয়েছে।

কবির পর্যবেক্ষণ ও বিবেচনা সময়-পরিসরে নির্ণয়সাপেক্ষ বয়ান। তিরিশ বসন্তের বাস্তব ভূমিতে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসু কবির চোখে মননসঞ্জাত অনুভবগুলো ফুলের চৌষট্টি পাপড়ির পৃথক অথচ যূথবদ্ধ আবেদন ও মহিমারসে নিবেদিত। কবির জিজ্ঞাসা-উৎস বহুমাত্রিক রূপরসে আকীর্ণ। কাব্যসূত্রে পাঠক জ্ঞাতসারে নিবিড়নিসর্গ ছায়ায় এবং অজ্ঞাত অনুভবে লোক-লোকাতীত আলোছায়ায় নিজেকে সমর্পণ করে অভিজ্ঞতার ঝুলিটাকে স্ফীত করতে পারেন। এ-কাব্যের কবিতাগুলোর প্রথম পঙক্তির ফর্দের ওপর চোখ বোলানোর জন্য পাঠকদের অনুরোধ করি।


বৈচিত্র্যেভরা অনুভবের লতাগুল্ম কবির জিজ্ঞাসাবৃক্ষের শোভাবর্ধন করেছে। সেই ফর্দ থেকে কবিতা-বিষয়ে কবি-অনুভব উদ্ধার করছি :

‘কথার আধার’, ‘জলধারা’, ‘পুথি’, ‘দলিল’, ‘শোকগাথা’, ‘নিদ্রা’, ‘নদী’, ‘ঠিকানা’, ‘দেয়ালঘড়ি’, ‘শিখা’, ‘তীর’, ‘বৃক্ষ’, ‘ডানা’, ‘সুর’, ‘শব্দ’, ‘ধর্মগ্রন্থ’, ‘ভূচিত্র’, ‘প্রেমপত্র’, ‘কাচ’, ‘বন্দর’, ‘ঘর’, ‘চাঁদ’, ‘পরিচয়পত্র’, ‘ছায়াপথ’, ‘ফল’, ‘দিনলিপি’, ‘অভিধান’, ‘শূন্য পাত্র’, ‘কণ্ঠস্বর’, ‘নির্জন দ্বীপ’;—এইসব শব্দ বা শব্দবন্ধ বা বস্তুনিচয় শুধু কবিতা নয়, কবিতার অধিক বোধ ও বোধির পরিশীলিত চিন্তা ও বহুরৈখিক চেতনরসের সারাৎসার। এ-কাব্যের একত্রিশ ও বত্রিশ সংখ্যক কবিতায় বাবুলের কাব্যের রূপকল্প আপাতবোধের সময়ছুঁয়ে পাঠকমনে ভাবের বিস্তার দৃশ্যমান। যা শাশ্বত ও চিরায়ত অনুভবের শিল্পিত প্রকাশ। কবির বাচনি থেকে বিষয়টি আরও স্পষ্ট ও সংযত ভঙিতে পরিস্ফুট :

এখানে কবিতা নিজেই বিষয়, নিজেই পথ, এবং কখনও কখনও নিজেই গন্তব্য।

এইসূত্রে কবিতার পথরেখা বিষয়-নিরিখে অভীষ্টে গমনের সামিল। জিজ্ঞাসুমন প্রথার দেয়াল ভাঙে;—এই বোধ অনিবার্য। তাই, আজ যে-ভাবনাসেতুর সূত্রপাত, সমকাল সেটাকে সমীহ করে, আবার সেটা অনুবর্তন সূত্রে সেকেলে রূপ ধারণ করে। তাহলে অনুবর্তনের কালপরিসর আমরা কোন সূত্রে ধারণা করতে পারি! এটা অনেকটা মননসঞ্জাত অনুভব। বোধ ও বোধির সমানুপাত সাহিত্যশিল্পে প্রাগ্রসর চিন্তার প্রক্ষেপ ও বিস্তার একটি বিশেষ শ্রেণিকে আলোড়িত- আন্দোলিত করে। সংশ্লেষ সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা যদি বিশেষ অঞ্চল, গোষ্ঠী/শ্রেণি ও কালপরিধি নির্ভর চিন্তাপ্রস্থান হয়, তবে সেটা অনুবর্তনসূত্রে মেধাশৈলীর পথ ধরে নতুন রূপ পরিগ্রহ করে বা করতে পারে।

আমাদের প্রাচীন কাব্যকলা যুগবিভায় সেকাল-সমকাল ও ভাবিকালরূপে পরিজ্ঞাত। কিন্তু এর রূপভেদে রকমফের হলেও অবিনাশিতাবাদসূত্রের আলোকে চিরায়ত সৌন্দর্যবোধ ও চেতনা অপরিবর্তনীয় সূত্রের অনুসারী। যেখানে রজনৈতিক ভূগোল নয়, প্রকৃতিক/সাংস্কৃতিক ভূগোল প্রত্যাশিত সত্যবলে প্রাধান্য পাবে। বাবুলকাব্যের রসাস্বাদন আমাদের এমন প্রতীতির জন্ম দেয়। দুটো দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক :

সময়, স্মৃতি, প্রেম,
বেদনা কিংবা বিস্মৃতির স্পর্শে
কবির সঙ্গে
কবিতারও রূপ বদলায়।

[একত্রিশ সংখ্যক কবিতাংশ।]

অতঃপর মনে হয়,
শব্দের চেয়ে অর্থ গভীর
আর
অর্থের চেয়েও গভীর তার নীরবতা।

[বত্রিশ সংখ্যক কবিতাংশ।]

কবিতা কোনও শিখা নয়—
তবু তার অক্ষরের ভিতর জ্বলতে থাকে
আদিম আগুনের বীজ;
যেন প্রথম আগুন আজও বহন করে
পাথরের নিদ্রা,
নক্ষত্রের জন্ম,
এবং
পৃথিবীর প্রথম কৌতূহলের স্মৃতি।

কবিতাকবিতা-১০ : ফজলুররহমান বাবুল


ইংরেজি সাহিত্যের বিদগ্ধ কবি কোলরিজ কবিতার সংজ্ঞার্থ নির্ণয়ে বলেন, ‘অপরিহার্য শব্দবিন্যাসই কবিতা।’—তাঁর এই সংজ্ঞার্থ দেশদেশান্তরে কাব্যরসিকজন সানন্দে গ্রহণ করেন। সময়ের গতিধারায় সাহিত্যভাবনায়ও পরিবর্তনের হাওয়া বইতে থাকে। এখন আর আমরা অপরিহার্য শব্দ আর অর্থের মধ্যে ঘুরপাক না খেয়ে শব্দের-অতীত ‘চেতনা’য় আশ্রয় খুঁজি। অর্থাৎ বস্তু বা শব্দের অর্থদ্যোতনার চেয়ে শব্দাতীত অনুষঙ্গের প্রতি পাঠকের অভিনিবেশ অধিকতর মাত্রায় লক্ষণীয়। সেই বিবেচনায় কবিতার সংজ্ঞার্থের পরিবর্তন ঘটে। সুধী পাঠকের চিন্তাযোগ ও চেতনার প্রতি লক্ষ রেখে কোলরিজ প্রদত্ত সংজ্ঞার্থের বিনির্মাণ প্রয়াস বহুলাংশে সমর্থিত হয়। নতুন সংজ্ঞার্থটি নিম্নরূপ :

শব্দাতীত চেতনার অপরিহার্য বিন্যাসই কবিতা।

কোলরিজ যেখানে শব্দ ও অর্থের অপরিহার্য রূপের বিন্যাস চিন্তা করেছেন, বিনির্মাণ প্রয়াসে শব্দাতীত চেতনার বিন্যাস যুক্ত হচ্ছে। এই সূত্রে ফজলুররহমান বাবুল শব্দের চেয়ে অর্থ-গভীর আর অর্থের চেয়ে তার নীরবতাকে প্রাধান্য দেবার পক্ষপাতী।

ঘুরেফিরে শব্দের অতীত চেতনা আজকাল কবিতার মুখ্য অনুষঙ্গরূপে নন্দিত। অভ্র প্রকাশন কর্তৃক শিল্পশোভন প্রকাশনা ‘কবিতাকবিতা’ পাঠরুচির পরিবর্তন সৃষ্টি করুক। কবি ফজলুররহমান বাবুলের কবিতাযাপন স্বকীয়বোধে মহিমা ছড়াক এই প্রত্যাশা আন্তরিক।
. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …

কবিতা ‘অন্তর্গত ভাষা’-১ : ফজলুররহমান বাবুল

যুগলমুদ্রায় দুই কবি

অগ্নিঝরা দিন : কবিভাষ্যকথা — আবুল ফতেহ ফাত্তাহ

. . .

লেখক পরিচয় : আবুল ফতেহ ফাত্তাহ

শিক্ষাবিদ, লেখক, গবেষক ও কবিতাকর্মী ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ সিলেট তথা বাংলাদেশের সুধীমহলে তাঁর বহুমাত্রিক কর্ম পরিধির কারণে সুপরিচিত ও সমাদৃত। পঞ্চাশ দশকের অন্তভাগে হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার গহরপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারিচাঁদ কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি শেষে আবুল ফতেহ ফাত্তাহ শিক্ষকতাকে পেশা করে নেন। গদ্য ও কবিতার পাশাপাশি লোকসাহিত্য গবেষণায় মনোনিবেশ করেন এই সময়টায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর মুহম্মদ ইরিস আলীর তত্ত্বাবধানে পিএইচডি অভিসন্দর্ভ ‘সিলেট-গীতিকার বৈচিত্র্য : সমাজ ও সংস্কৃতির নিরিখে’ সুধীমহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়। মধ্যযুগের কবি সৈয়দ সুলতানকে নিয়ে গবেষণাধর্মী কাজের জন্যও তিনি আলোচিত এবং সমাদৃত।

তিন দশকের অধিক সময়জুড়ে শিক্ষকতা পেশায় ব্রতী আবুল ফতেহ ফাত্তাহ নবীগঞ্জ কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। পরে ঐতিহ্যবাহী মদন মোহন কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান ও অধ্যক্ষর দায়িত্ব পালন করেছেন। সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও ডিন পদেও ছাত্র পড়ানো ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলেছেন এই কৃতবিদ্য। সুদীর্ঘ শিক্ষক জীবনে ছাত্র পড়ানোর পাশাপাশি নিরলস ছিলেন লোকসাহিত্যের গবেষণা, সম্পাদনা ও নানামুখী সৃজনশীল রচনায়।

তিন সন্তানের জনক অধ্যাপক আবুল ফতেহ ফাত্তাহ গবেষণা ও সম্পাদনার পাশাপাশি সাহিত্যিক গদ্য, কবিতা ও ছড়াচর্চায় ব্রতী থাকলেও, গত শতাব্দীর নয়ের দশক থেকে তাঁর রচনা সমূহ একে-একে বই আকারে পাঠকের সামনে আসে। উল্লেখযোগ্য প্রকাশনার মধ্যে রয়েছে : ‘সিলেট-গীতিকা : সমাজ ও সংস্কৃতি’ (গবেষণা, ২০০৫); ‘সিলেটের শতবর্ষের সাংবাদিকতা’ (সম্পাদনা, ২০০৬); ‘খানবাহাদুর আহসান উল্লাহ : তাঁর শিক্ষামিশন ও সমাজদর্শন (গবেষণা, ২০০৯) ইত্যাদি। সিলেট অঞ্চলের ইতিহাস নিয়ে তাঁর রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। এরই ধরাবাহিকতায় শুভেন্দু ইমামের সঙ্গে দুই খণ্ডে যৌথ সম্পাদনা করেন ‘বৃহত্তর সিলেটের ইতিহাস’ নামক আকর সংকলন। এর প্রথম খণ্ড ১৯৯৭ সনে ও দ্বিতীয় খণ্ড ২০০৬ সনে প্রকাশিত হয়।

গবেষণা ও সম্পাদনার বাইরে তাঁর কবিতাবই ‘নেপথ্যে জলের ছায়া’ নয়ের দশকে ও ‘কুসুমের তরবারি’ এর প্রায় এক দশক পরে আলোর মুখ দেখে। ছড়াগ্রন্থ ‘সবুজিমা বাংলাদেশ’ কাছকাছি সময়ে পাঠকের নজরে আসে। আর, ‘উপেক্ষার দরোজা’ শিরোনামে কবিতাবই প্রকাশ পেয়েছে সম্প্রতি। এছাড়াও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে ‘রবীন্দ্র-অসীমে’ ও সিলেটের কৃতিজন প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে নিয়ে সম্পাদনা সংকলন ‘প্রজ্ঞাদীপ মুহিতমানস’ পাঠকমহলে আলোচিত।

সিলেটের শিক্ষা ও সংস্কৃতি অঙ্গনে পরিচিত মুখ অধ্যাপক আবুল ফতেহ ফাত্তাহ সম্মুখগামী ও প্রাগ্রসর মেধা-মনস্বীতা চর্চায় নিবেদিতপ্রাণ শুরু থেকে। শহরে প্রাগ্রসর সাংস্কৃতিক তৎপরতায় জড়িত রাখেন নিজেকে। তারুণ্যসঙ্গ ও তাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে ভালোবাসেন। সিলেটের নানা অনুষ্ঠানে আতিথ্য ও সভাপতিত্বেও তাঁকে নিয়মিত সক্রিয় দেখা যায়।
. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 21

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *