
উপমহাদেশে স্থাপনাশিল্পের বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহাসিক বিবর্তনকে ধর্মের লেবেল দিয়ে ভাগ করাটা কী কারণে অবান্তর, তা উপলব্ধির জন্য মৌখিক ইতিহাসবিদ (Oral historian) সোহেল হাশমির (Sohail Hashmi) অনুসন্ধানে উঠে আসা ব্যাখ্যাকে মনে হয় আমলে নেওয়া প্রয়োজন। স্থাপনাশিল্পের মূলগত বৈশিষ্ট্যকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে এর আগে কেউ ব্যাখ্যা করেছেন বলে আমি অন্তত অবগত নই। সোহেল হাশমিকে এখানটায় এসে ব্যতিক্রম মানতেই হচ্ছে। অনলাইন ঘেঁটে যেসব রসদ পাওয়া গেল, তাঁর বক্তব্য বুঝে ওঠার পক্ষে সেগুলোকে সহায়ক ভাবা যেতে পারে। সারনির্যাসটা এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করব। তবে, মূল প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে উপমহাদেশে স্থাপনাশিল্পের ইতিহাসগত বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধানে অনেকদিন ধরে নিবেদিত মানুষটিকে সংক্ষেপে চিনে নেওয়া যাক।
গুণী লোকজনে ঠাসা সোহেল হাশমির পরিবার ভারতবর্ষে সুপরিচিতি। মঞ্চনাটকের কিংবদন্তি সফদার হাশমি ও সমাজকর্মী শবনম হাশমির তিনি অগ্রজ। বলিউডে নাম লেখানো সাবা আজাদ-এর তিনি চাচা হন। স্থাপনাশিল্পের সঙ্গে বেড়ে ওঠার ঐতিহ্যটাও হাশমি পরিবারে নতুন ঘটনা নয়। পরিবারের অনেকেই স্থাপত্য পেশায় সম্পৃক্ত ছিলেন বা লতায়পাতায় এর সঙ্গে জড়িত এখনো।
সোহেল হাশমির অনুজ সফদার হাশমি বাংলাদেশে সুপরিচিত। মঞ্চ নাটক, পথনাটক ও গ্রামীণ থিয়েটারের বিকাশপর্বে বাদল সরকারের পাশাপাশি তাঁর নামটিও বহুচর্চিত থেকেছে। নানা গুণে গুণান্বিত ছিল প্রায় চল্লিশ বছর আগে মবসন্ত্রাসে নিহত নাট্যজনের স্বল্পায়ু জীবন। নিবেদিত বামপন্থী সফদার হাশমির সাংস্কৃতিক সক্রিয়তা কংগ্রেস সরকারের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল তখন। অকালে খুন হয়ে যার মূল্য দিতে হয় তাঁকে।
গত শতাব্দীর আশির দশকের শেষ দিকটায় গাজিয়াবাদে মেহনতি শ্রমিক-মজুরদের সামনে ‘হল্লাবোল’ নাটক নিয়ে হাজির হলেন সফদার হাশমি। নাটক চলাকালে পরিকল্পিতভাবে গণ্ডগোল বাঁধানো হয়। পুলিশ ও লেলিয়ে দেওয়া মবের অকথ্য নির্যাতনে প্রাণ হারান গান ও নাটকে মেহনতি মানুষের মুখপত্র সফদার। বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে তাঁর নামখানা এই ঘটনার জের ধরে দীর্ঘদিন প্রাসঙ্গিক থেকেছে। এমন এক বিপ্লবী প্রেরণা ছিলেন সফদার,—থিয়েটার করতে নামা শিল্পীরা তাঁকে ফিরে-ফিরে স্মরণ করেছেন নিজ তাগিদে।
সাংস্কৃতিক হাশমি পরিবারে সোহেল হাশমি অবশ্য অনুজের পথে হাঁটেননি। ইতিহাসের অলিগলি ঘুরে বেড়ানোর নেশাকে নিজের করে নিয়েছিলেন। সরাসরি ইতিহাসের ছাত্র না হলেও, ভারতবর্ষ জুড়ে ছড়ানো ঐতিহাসিক স্থাপনাকে পাখির চোখ দিয়ে বীক্ষণের কাজে নেমে পড়েন তিনি। জনসমাজে প্রচলিত মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহ ও তথ্য বিশ্লেষণ যেখানে তাঁকে অনন্য করে তোলে। ওরাল হিস্টোয়িরান বা মৌখিক ইতিহাবিদ-এর স্বীকৃতিও জুটেছে পরে।
ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, ঘটনা, স্থাপনা ইত্যাদি নিয়ে লোকজনের সঙ্গে আলাপ ও তথ্য সংরক্ষণের কাজে নিবেদিতজনকে ওরাল হিস্টোরিয়ান নামে সম্মানিত করার রেওয়াজ বেশ পুরোনো। সোহেল হাশমি কঠিন এই পথে নিরলস হেঁটেছেন। ভারতবর্ষ, বিশেষত দিল্লি শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মৌখিক ইতিহাস সংরক্ষণে লোকজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ, কথালাপ ও তথ্য বিশ্লেষণে তাঁকে আজো তৎপর দেখা যায়। স্থাপনাগুলো সুরক্ষায় তৎপর তিনি। সব মিলিয়ে যে-প্রোফাইলটি পাচ্ছি, এর অনুরণন ধরা পড়েছে অনলাইনে ছড়ানো-ছিটানো তাঁর লেখালেখি ও কথাবার্তায়। সারবস্তুটি মনে হয় এবার দেখে নেওয়া যায় সংক্ষেপে :

সোহেল হাশমি জানাচ্ছেন,—ঐতিহাসিক স্থাপনার গায়ে ধর্মের লেবেলিং ইতিহাসসম্মত নয়। ভারতীয় উপমহাদেশে ঐতিহাসিক বলে গণ্য মন্দির-মসজিদের মতো স্থাপনাকে হিন্দু ও মুসলমান স্থাপনারীতিতে ভাগ করার প্রথাকে এখানে দাঁড়িয়ে খারিজ করে দিয়েছেন তিনি। তাঁর যুক্তি,—ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য, জলবায়ু ও যাপন-সংস্কৃতি অনুসারে কালের ধারায় এসব স্থাপনা গড়ে উঠেছিল। এর সঙ্গে ধর্মপ্রসূত আবেগ ও ভাবাদর্শকে জড়িত করা অনুচিত।
সোহেল হাশমি দেখাচ্ছেন, বাংলায় তৈরি মন্দির-মসজিদের স্থাপনাশৈলীর সঙ্গে দিল্লির স্থাপনাশৈলী এক নয়। বাংলা বা দিল্লির সঙ্গে বরফঠাণ্ডি কাশ্মীর অথবা আর্দ্র ও বৃষ্টিবহুল দক্ষিণ ভারতের স্থাপনারীতির বৈপরীত্য চোখে পড়বে। ভূগোল, জলবায়ু, নির্মাণ উপকরণ ও জীবনধারার স্থানীয় সব বৈশিষ্ট্য মিলেঝুলে স্থাপনাগুলো গড়ে উঠেছে। এগুলোকে এখন হিন্দু বা মুসলমান যুগের স্থাপনা নামে শ্রেণিকরণ যুক্তিসংগত হতে পারে না। এতে বরং স্থাপনাশিল্পকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির গুটি রূপে ব্যবহারের মওকা রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর হাতে আমরা তুলে দিচ্ছি।
মসজিদে গম্বুজ ও মিনারের সংযুক্তিকে বড়ো আকারে সামনে এনেছেন সোহেল হাশমি। দেশভেদে মসজিদ নির্মাণে স্থাপনারীতির ভিন্নতা তাঁর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। যেমন, ভারতবর্ষে মুসলমান শাসনের প্রায় হাজারবর্ষী ইতিহাসের লম্বা সময় মসজিদ নির্মাণে গম্বুজ ও মিনারের প্রচলন ছিল না। দিল্লিতে ত্রয়োদশ শতকে নির্মিত কুতুব মিনারকে মিনার নির্ভর স্থাপনার আদি নিদর্শন গণ্য করা হয়। সোহেল হাশমির মতে ওটা মসজিদ ও মিনারকে মাথায় রেখে পরিকল্পিত হয়নি। বিজয়স্তম্ভ হিসেবে কুতবউদ্দিন আইবক স্থাপনাটি নির্মাণ করেছিলেন। কুতুব মিনারের বাইরে মসজিদ তৈরি হয়েছে পরে। আলতামিশ ওরফে ইলতুতমিশ শাসক হওয়ার পর স্থাপনা দুটির সংস্কার ও সম্প্রসারণ ঘটান। মিনার কেন্দ্রিক স্থাপনার নজির বলে যদি ধরেও নেই, কুতুব মিনারে এর সংযোজন আজানের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না।
খিলান, গম্বুজ ও মিনারের সংযোজন মোগল বাদশাহ শাহজাহান ও পরবর্তী সময়ে অধিক চোখে পড়ছে। তাজমহলের নান্দনিক সৌন্দর্যে পেঁয়াজ আকৃতির গম্বুজের দেখা আমরা পাচ্ছি। দিল্লির জামে মসজিদে তিনটি গম্বুজের ফ্রেমিংয়ে মিনার রয়েছে। আগ্রার মোতি মসজিদও শাহজাহান তৈরি করান, যেখানে গম্বুজ ও মিনারের নান্দনিক সংযোজন চোখে পড়বে। স্থাপনারীতিটি পরে সমগ্র ভারতবর্ষে গড়ে ওঠা মসজিদগুলোয় গণহারে কপি করা হতে থাকে বলে মত রেখেছেন সোহেল হাশমি। তার আগে দিল্লি শহরে তৈরি স্থাপনায় গম্বুজ ও মিনার সংযোজনের প্রথা ছিল না।
সোহেল হাশমির দাবির সঙ্গে অবশ্য ভিন্নতা পোষণ করছে পাণ্ডুয়ায় তৈরি আদিনা ও বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ। দুটি মসজিদই যথাক্রমে পনেরো ও ষোল শতকে সুলতানি শাসনামলে নির্মিত হয়। আদিনা ও ষাট গম্বুজের স্থাপনারীতি স্থানিক, ইরানের সাসানীয় ও দামেস্কের স্থাপত্য রীতির সংমিশ্রণে নির্মিত। সোহেল হাশমির মতে মিনার তৈরি হয় আজান দেওয়ার জন্য। শাহজাহানের সময় তৈরি দিল্লির জামে মসজিদের মিনার থেকে কিন্তু আজান মাটিতে পৌঁছায় না। সোহেল হাশমি সুতরাং এই ধারণায় উপনীত হয়েছেন,—মসজিদের নান্দনিক সৌন্দর্য বৃদ্ধির ভাবনা থেকে গম্বুজের ফ্রেমে মিনার সংযুক্ত করান সম্রাট শাহজাহান। সেখান থেকে আজান দেওয়ানোর ভাবনা তাঁর পরিকল্পনায় ছিল না। সহজ কথা, শিল্পরসিক শাহজাহানের আগে মসজিদে মিনার ও গম্বুজ সংযোজন গুরুত্ব পায়নি।
কাশ্মীর অঞ্চলের ঐতিহাসিক মসজিদগুলোর উদাহরণ টেনেছেন সোহেল হাশমি। হযরতবাল মসজিদে গম্বুজ ও মিনার রয়েছে, যা আদি স্থাপনার অংশ নয়। হযরত মোহাম্মদের কেশগুচ্ছ এই মসজিদে সংরক্ষিত আছে বলে মিথ প্রচলিত আছে। মোগল প্রাসাদ থেকে মসজিদে রূপান্তরিত হযরতবালকে গত শতাব্দীর ষাটের দশকে সংস্কারের উদ্যোগ নেয় ভারত সরকার। সোহেল হাশমির চাচা মসজিদ সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের অন্যতম পরিকল্পক ছিলেন। মসজিদের নকশায় গম্বুজ ও মিনার তিনিই সংযুক্ত করান। ব্যতিক্রমটি বাদ দিলে মধ্য এশিয়ার আদলে মসজিদে গম্বুজ, মিনার সংযুক্তির স্থাপনারীতি কাশ্মীরে দীর্ঘ সময় প্রভাব রাখেনি। অনুরূপ ভিন্নতা আরব দেশগুলোয় চোখে পড়বে। এক দেশে তৈরি মসজিদের সঙ্গে অন্য দেশের মসজিদে স্থাপনারীতি আবহাওয়া, জলবায়ু ও যাপন সংস্কৃতিকে সারবস্তু মেনে গড়ে উঠেছিল।
এখানে এসে প্রশ্ন জাগে, আজানের জন্য মিনার তৈরির যুক্তি না-হয় বোঝা গেল;—মন্দির ও মসজিদকে ঊর্ধ্বমুখী করে তৈরির নেপথ্য কারণ কী থাকতে পারে? সোহেল হাশমি এখানটায় এসে আকর্ষণীয় যুক্তি পেশ করেছেন। তাঁর মতে, ঈশ্বর ওপরে অবস্থান করেন;—ধারণাটি মোটের ওপর সকল ধর্মে কমবেশি চর্চিত। উঁচু পাহাড়ে উপাসনালয় তৈরির রীতি সব দেশে মিলবে। সমতলেও উপাসনালয় তৈরির সময় ঊর্ধ্বমুখী/উলম্ব ও সুচালো করে তৈরি হয়। মিনার সংযোজন হয়তো এ-কারণে,—এর মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের কাছে নিজের বার্তা পৌঁছানো যায় বলে মানুষ বিশ্বাস করছেন।
মসজিদের মতো স্থাপনায় গম্বুজ ও মিনারের প্রচলন ইহুদি ও খ্রিস্ট ধর্মের বিকাশলগ্নে তৈরি উপাসনালয় থেকে মুসলমান নৃপতি ও নকশাবিদরা একটা সময় ধার করেন। সোহেল হাশমির এই ব্যাখ্যা বেঞ্জামিন ওয়াকার রচিত ‘ফাউন্ডেশন অব ইসলাম’কে স্মৃতিতে উজ্জ্বল করে তোলে। মসজিদ, দুর্গ ও প্রাসাদ কেন্দ্রিক স্থাপনায় ইউরোপীয় স্থাপত্যের প্রভাব নিয়ে বেঞ্জামিন ওয়াকার তাঁর বইয়ে বিশদ আলোচনা করেছিলেন। বইটির বাংলা ভাষান্তর বাংলাদেশে প্রকাশিত হওয়ার পর শরিয়া ও জামায়াতপন্থী মোল্লাদের আপত্তির কারণে অবিলম্বে নিষিদ্ধ করা হয়। বিএনপি সরকার তখন ক্ষমতায় ছিল। বইটির ইংরেজি ও বাংলা সংস্করণ অবশ্য অনলাইনে সুলভ এখন।
সে যাকগে, এখানে এটা বিবেচ্য,—ভারতবর্ষের মসজিদগুলোয় গম্বুজ, মিনার সংযোজন কাল পরম্পরায় রীতি হয়ে দাঁড়ালেও, ভূবর্ষে ইসলামের অনুপ্রবেশ ঘটার সুদীর্ঘ সময়জুড়ে উক্ত স্থাপনারীতিকে মানুষ অনিবার্য ভাবেনি। মোগল আমলে প্রধানত গম্বুজ, মিনার সংযোজনের চল মান্যতা পায়, যার পেছনে আবার স্থাপনায় নান্দনিকতা সঞ্চার ছিল মূল কারণ। ইংরেজ আমলে পা রাখার দিনকালে ‘নান্দনিকতা’ ছাপিয়ে ধর্মীয় অনুষঙ্গ রূপে মসজিদে মিনার ও গম্বুজকে অপরিহার্য করে তোলা হয়েছিল।

সে নাহয় হলো। একটি প্রশ্ন অনেকদিন ধরে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, আর সেটা হলো,—হযরত মোহাম্মদ ভারতবর্ষের ব্যাপারে কতটা অবগত ছিলেন? নানা মুনির একশো মত থাকায় প্রশ্নটির পরিষ্কার উত্তর কখনো পাইনি। সোহেল হাশমি এখানে এসে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি দিচ্ছেন এইবেলা :
দক্ষিণ ভারতের কেরালা রাজ্যে চেরামন পেরুমল জুমা মসজিদকে ভারতবর্ষের প্রথম মসজিদ বলে তিনি চিহ্নিত করছেন। মসজিদটি নাকি ইসলামের নবি ধরায় জীবিত থাকার সময় তৈরি হয়েছিল! হযরত মোহাম্মদ প্রচারিত ধর্মের কথা অত্র অঞ্চলের এক রাজন্যের কানে পৌঁঁছায়। মোহাম্মদী দীনের ব্যাপারে তাঁর মনে প্রবল কৌতূহল জন্ম নেয়। কিছু সঙ্গী-সাথী নিয়ে মক্কায় হাজির হলেন তিনি। হযরত মোহাম্মদের সঙ্গে মক্কায় দেখাসাক্ষাতের পর সেখানে ইসলাম কবুল করেন। দেশে ফেরার পথে রাজা চেরামন পেরুমল মারা যান। মারা যাওয়ার আগে সঙ্গীদের বলে গিয়েছিলেন,—কেরালায় তারা যেন একটি মসজিদ তৈরি করে ও সেখানে নতুন ধর্মের উপাসনা চালু করা হয়।
ভারতবর্ষে সাগর-বাণিজ্যের ইতিহাস যাঁর লেখায় একটা সময় আমরা প্রবল আগ্রহ নিয়ে পাঠ করেছি, সেই অশীন দাশগুপ্তের বিবরণের সঙ্গে সোহেল হাশমির তথ্য ভালো ম্যাচ করে যায়। অশীন দাশগুপ্ত দক্ষিণ ভারতের সাগরবন্দর দিয়ে আরব বণিকদের মশলা বাণিজ্যের ইতিহাস তুলে ধরেছিলেন। ভারতবর্ষে ইসলামের তরঙ্গ পৌঁছানোর অনেক আগে থেকে মালাবার হয়ে আরব বণিকদের যাতায়াত নিয়মিত ঘটনা ছিল। কেরালার ওই রাজন্য, বোঝাই যাচ্ছে, বণিক মারফত মোহাম্মদ প্রচারিত দীন সম্পর্কে অবগত হয়েছিলেন। ভারতবর্ষে ইসলামের প্রবেশের ওপর মসজিদটি নতুন আলো ফেলছে তাতে সন্দেহ নেই।
সোহেল হাশমি আরো জানাচ্ছেন, মসজিদটি কেরালায় সহজপ্রাপ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। মসজিদে গম্বুজ ও মিনারের সংযুক্তি মোটের ওপর সাম্প্রতিক। প্রাচীন রীতি মেনে এর স্থাপনা থেকে অবশ্য আদি কাঠামো গায়েব করা হয়নি। উপাসনাও চালু রয়েছে যথারীতি।
ইনফ্যাক্ট, হযরত মোহাম্মদ স্বয়ং মিনার-গম্বুজ কেন্দ্রিক মসজিদকাঠামোর বিষয়ে অবগত ছিলেন না। বেঞ্জামিন ওয়াকার তাঁর লেখা বইয়ে তথ্য-প্রমাণ ও যুক্তি সহকারে বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। উমাইয়া শাসক আমির মুয়াবিয়ার সময় ইসলামি স্থাপত্য নামে পরে স্বীকৃত স্থাপনারীতিতে ইউরোপীয় প্রভাব প্রবল থাকার একাধিক উদাহরণ তিনি বইয়ে জুড়েছিলেন। খ্রিস্টানদের সঙ্গে উমাইয়া গ্রোত্রের সংযোগ এদিক থেকে ঐতিহাসিক। আমির মুয়াবিয়ার সময় থেকে তা চলে আসছিল। স্পেনে উমাইয়া খেলাফতের বিস্তারকালে যা পরিপূর্ণতা লাভ করে। পৃথিবীজুড়ে দেশে-দেশে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক স্থাপনার উদাহরণ টেনে সোহেল হাশমি গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বলেছেন অতঃপর :
ইউরোপে প্রচীন যুগ, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগে গড়ে ওঠা স্থাপনাকে ধর্মীয় পরিচয়ে লেবেলিং করা হয় না। ধ্রুপদি, গথিক, বারোখ, নব্য ধ্রুপদি, নবজাগরণ ইত্যাদি সংজ্ঞায় ফেলে ভিন্ন কালপর্বে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক স্থাপনার বৈশিষ্ট্য ও বিবর্তনকে বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করে থাকেন। ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত স্থাপনাও এসব ধারায় ফেলে তাঁরা ব্যাখ্যা করেন। এর ফলে সংকীর্ণ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ প্রচারের হাতিয়ার রূপে স্থাপনাশিল্পকে ব্যবহারের সুযোগ ইউরোপ সীমিত করে আনতে পেরেছে।
তুরস্কের আয়া সোফিয়া এখন না-হয় এরদোয়ান পুনরায় মসজিদে রূপান্তরিত করেছেন। ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমান সকলে এর দাবিদার দেখে কামাল আতাতুর্ক স্থাপনাটিকে জাদুঘর ঘোষণা করে সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। এরদোয়ান এসে তা তুলে দেওয়ার পেছনে উম্মাহ কেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পালে হাওয়া দেওয়ার মতলব কাজ করছে বৈকি। সে যাকগে, আমাদের এখানে স্থাপনাশৈলীকে ধর্মীয় যুগপর্ব দিয়ে লেবেলিং কেন করা হয় বা হচ্ছে এখনো? উত্তরে সোহেল হাশমি ব্যাখ্যা দিচ্ছেন :

ইংরেজরা ভারতবর্ষ দখলে নেওয়ার আগে পর্যন্ত ইতিহাস রচনার বালাই ভারতবর্ষে ছিল না। রাজন্যরা নিজের কীর্তিগাথা লিপিবদ্ধ করাতেন মাত্র। শিলালিপি, আত্মজীবনী, দালিলিক বিবরণ, কাব্যসাহিত্য ও লোকমুখে প্রচলিত কাহিনিতে ছড়ানো থাকত রাজবংশের কীর্তিকাহিনি। ইতিহাস বলতে এটুকুন। সুনির্দিষ্ট কালপর্বে ভাগ করে ইতিহাস রচনার নজির ভারতবর্ষে ইংরেজরা আসার আগে ছিল না।
উক্ত সূত্রগুলোয় গমন করলে এখানে গড়ে ওঠা স্থাপনাকে হিন্দু, মুসলমান, এমনকি বৌদ্ধ বা জৈন রূপে পরিচিত করানোর কোনো নিদর্শন ও প্রমাণ পাওয়া যাবে না। বিভিন্ন কালপর্বে ভারতবর্ষ শাসন করা রাজবংশের সঙ্গে জুড়ে স্থাপনাগুলোর বিবরণ প্রদান করা হতো। অনেক পরে যা মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন, সুলতানি ও মোগল ইত্যাদিতে ভাগ করে ঐতিহাসিকরা ব্যাখ্যা করেছেন।
ইংরেজরা ভারতবর্ষ দখলে নেওয়ার পর ইউরোপীয় ঘরানায় ইতিহাস পাঠ ও রচনার ধারাকে এখানে সবল করে তোলা হয়। ভারতবর্ষের ঐতিহাসিক বিবর্তন ও বিকাশকে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান আমলে ভাগ করে ইংরেজরা। নিজেদের কালপর্বকে আবার খ্রিস্টানের সঙ্গে তারা যুক্ত করেনি। ইংরেজ আমল বলে বয়ান সাজিয়েছিল। ইংরেজের এই শ্রেণিকরণ এমন একটি মানসকাঠামো জন্ম দেয় পরে, সেইসঙ্গে বিভাজন,—যার ফাঁদ কেটে বেরিয়ে আসা আজো সম্ভব হয়নি। একুশ শতকে পা দিয়েও ভারতবর্ষের ইতিহাস ও স্থাপনশিল্পকে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক পরিচয়ে লেবেলিং করার খাসলতটি আমরা ছাড়তে পারছি না!
সোহেল হাশমি মনে করেন, ভারতবর্ষের সমাজ বিন্যাসে ইংরেজের আগমন গুরুত্বপূর্ণ কালান্তর নিয়ে আসে। ভ্রান্ত ইতিহাসবোধে ভারতবাসীকে নিমজ্জিত রাখবার কৌশলে তারা সফল হয়। স্কলারগণ এর মধ্যে পড়ে আজো খাবি খাচ্ছেন! ক্ষতিকর জাতীয়তার ধারণা এভাবে সবল করে তোলা হয়েছে। যেটি এখন উপমহাদেশে কারা ‘আদি’ ও কারা ‘বহিরাগত’ প্রমাণের হাতিয়ারে মোড় নিচ্ছে ক্রমশ!
ভারতবর্ষে ঐতিহাসিক স্থাপনা, যেমন কেল্লা, দুর্গ, প্রাসাদ থেকে মন্দির-মসজিদ নির্মাণের যে-বিবর্তন, সেখানে মোগল আমল পর্যন্ত লাইমস্টোন বা চুনাপাথর গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ ছিল। আফগানিস্তানে লাইমস্টোন ব্যবহার করে নির্মিত ভবনাদি থেকে ধারণাটি ভারতবর্ষে দিল্লিসহ অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। লাইমস্টোন আর্দ্রতা প্রতিরোধী শক্তি রাখে। এর জন্য আবার এক বছরের মতো সময় তাকে পুরোপুরি শুকানোর জন্য দিতে হয়। পরবর্তী আরো ত্রিশ-চল্লিশ বছরে চুনাপাথরে তৈরি ভবন সম্পূর্ণ আর্দ্রতা প্রতিরোধক হয়ে ওঠে। মোগল আমল পর্যন্ত ভবন নির্মাণে এই সুস্থির পরিকল্পনা বজায় ছিল। স্থানীয় জলবায়ু ও আবহাওয়াকে বিবেচনায় রেখে স্থাপনা গড়ে তুলছেন মোগলরা। তারা সময় দিয়েছেন, যাতে করে একটি স্থাপনা টেকসই হয় বা দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে। রাগ সংগীতের ধ্রুপদ-ধামারের মতো ধীর কিন্তু ব্যঞ্জনাগর্ভ রাগিণী যেন এক-একটি মোগল স্থাপত্য!
ইংরেজ আমলে পৌঁছে স্থাপনাশিল্প নয়া বাঁক নিতে শুরু করে। ইউরোপীয় ছকে ভবন নির্মাণের চল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। লাইমস্টোনে ইট ও সিমেন্টের মিশ্রণ ঘটায় ইংরেজরা। সিমেন্টের প্রলেপ দিয়ে তৈরি ভবন আর্দ্রতা শোষণ করে ভিতরে জমিয়ে রাখে ও কখনো পুরোপুরি শুষ্ক হতে দেয় না। এর ফলে ভবনে চিড় ও পরে ফাটল দেখা দিয়ে থাকে। স্থাপনাকৌশলে ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য ও জলবায়ুকে ইংরেজরা গভীর বিবেচনায় নেওয়ার অবস্থায় ছিল না। কম সময়ে ভবন তৈরির কারিগরি ততদিনে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ইউরোপের জলবায়ুতে এটা সমস্যার কারণ নয়, তবে এখানকার আর্দ্রতা-আচ্ছন্ন জলবায়ুর জন্য সমস্যা তো বটেই!
মোদ্দা কথা, স্থাপনাশিল্পের ক্ষেত্রে ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য, জলবায়ু, জীবনাচার ও উপকরণের সহজলভ্যতা বড়ো বিষয়। ধর্মীয় আবেগ ও প্রেরণার চেয়ে এর গুরুত্ব বরং স্থাপনাশিল্পে বরাবর প্রবল থেকেছে। মানবদেহের বিবর্তন ও অভিযোজনে যা নিয়ন্ত্রক ভূমিকা রাখে। সোহেল হাশমি যেমন তথ্যটি দিচ্ছেন :
আমাদের এখানে ইংরেজরা আসার আগে অসবাবপত্রের ব্যবহার ব্যাপক ছিল না। খাদ্য উৎপাদন ও চলাফেরা থেকে শুরু করে আহার-শয়নের সবটাই মাটি বা জমিনে সেরেছে মানুষ। মাটিতে দস্তরখান পেতে খাওয়া-দাওয়া করেছে। শয্যা হিসেবে মাটিই ছিল আধেয়। ওই সময়টায় এখানকার লোকজনের হাঁটুজনিত সমস্যার বড়ো কোনো রেকর্ড পাওয়া যায় না। ইংরেজরা শীতপ্রধান দেশ থেকে এখানে এলো। ঠাণ্ডি হাওয়ায় মাটিতে দস্তর পেতে খানাপিনা ও শয়ন কঠিন। তারা প্রয়োজনীয় আসবাপত্র গড়ে নিলো। ভারতবর্ষেও তা চালু ও জনপ্রিয় হয় দ্রুত। এর ফলে হাঁটুজনিত সমস্যার প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। কেননা, আমাদের দেহকে এখন এই নতুন উপবেশন রীতির সঙ্গে অভিযোজিত হতে হচ্ছিল।
সোহেল হাশমির কথাটি বলার মূল উদ্দেশ্য হলো এটা প্রতিষ্ঠা করা-যে,—স্থাপনার রকমারি বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা মূলত ভূগোল ও জলবায়ুর সঙ্গে অভিযোজিত হওয়ার কৌশলকে আমলে নিয়েই গড়ে ওঠে। সুতরাং, এক অঞ্চলের স্থাপত্য অন্য অঞ্চলের ওপর সরাসরি চাপিয়ে দেওয়ার আগে ভাবনা ও বিবেচনার জায়গা থেকেই যায়। আধুনিক কালপর্বে তৈরি স্থাপনাগুলোর দীর্ঘমেয়াদে ঐতিহাসিক স্থায়িত্ব লাভের সম্ভাবনা যে-কারণে কমে এসেছে। আধুনিক স্থাপনায় বৈচিত্র্য ও চমক রয়েছে, তবে পরিবেশ ও জীবন-সংস্কৃতির মতো বিষয়গুলো সেখানে গৌণ বা উপেক্ষিত। স্থাপনাব্যয়ও অসমান।
সাংস্কৃতিক অধিপত্যকে যেনতেনভাবে চাপানোর জায়গা থেকে যদি ভাবি, তাহলে মানতেই হবে,—গ্যেটের ভাষায় ‘স্থাপনাকে জমাট সংগীত’ হতে হলে পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য ও যাপন-সংস্কৃতি বাদ দিয়ে হতে পারে না। ধর্মীয় প্রথাচার ও বিশ্বাস প্রসূত বিষয়াদির প্রভাব সেখানে স্বাভাবিক নিয়মে থাকছে, তবে একে দিয়ে স্থাপনা-সংস্কৃতির ইতিহাসকে শ্রেণিকরণ সংকীর্ণতার ঝুঁকি প্রবল করে এই ব্যাপারে সন্দেহ না রাখাটাই সমীচীন।
. . .
. . .
… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …
জনতুষ্টির রাজনীতি ও ‘হিন্দু সুপ্রিমেসি’ : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
নেটালাপ : ‘মনু’ নিয়ে ‘মনের গোলযোগ’
নেটালাপ : সিলেটি ‘ভাষা’ ‘উপভাষা’ বিতর্ক
. . .

অবদায়ক : আহমদ মিনহাজ : থার্ড লেন স্পেস.কম
আহমদ মিনহাজ-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন


