দিল ওয়ালো কে দিল কা কারার্ লুটনে
ম্যায় আয়ি হু ইউপি বিহার লুটনে

জেন-জি প্রজন্মের মতিগতি বোঝা ভার! শ্রীলংকা, নেপাল ও বাংলাদেশের দেখানো পথে এবার রাস্তায় নেমেছিল ভারতের জেন-জি। দাবি আদায় করতে নেমে সরকারকে সোজা গদি থেকে নামানোর হট্টগোলে তারা মেতে থাকল কিছুদিন। সমাজমাধ্যমে এটা নিয়ে খবর আর রিলের বন্যা দেখল বিশ্ব। ন্যায্য দাবি নিয়ে ভারতের জেন-জি রাস্তায় নেমেছিল বটে, কিন্তু ফলাফল ঘরে তুলতে পারল কি?
পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, বছরের-পর-বছর ধরে চলে আসা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার চাপ ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তো আছেই,—কর্মসংস্থান জটিলতা ও পারিবারিক নানান চাপের মাশুল গুনতে ভারতে প্রতি বছর গড়ে ১৪ হাজার শিক্ষার্থী স্বেচ্ছায় নিজের প্রাণ হরণ করে। সরকারি পরিসংখ্যান গত দশ বছরে লাখো শিক্ষার্থীর স্বেচ্ছাহননে যাওয়ার তথ্য দিচ্ছে।
দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার ‘নিয়মে পরিণত হওয়ার ছবিটা’ শুধু ভারতে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার প্রত্যেকটা দেশে মিলবে। ডাক্তারি পড়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসবার পর প্রশ্নপত্র ফাঁসের সিনারিটা যদি রিপিট করতে থাকে,—ক্ষোভের বিস্ফার একটা সময়ে এসে অনিবার্য হবে। বিগত বছরগুলোয় তা ঘটতে গিয়েও ঘটেনি, এবার পুঞ্জিভূত ক্ষোভ আকারে রাস্তায় ফেটে পড়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে পরিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে সুতরাং অবান্তর ভাবার সুযোগ নেই। যেমন অবান্তর ছিল না ধারাবাহিক অনিয়মের বিরুদ্ধে সাধারণের সমর্থন, সহানুভূতি ও ‘বিস্ফার’।
হরকিছিমের আরশোলারা মিলে সেই ‘বিস্ফারকে’ একাই খেয়ে দিলো! ভারতজুড়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনের আসল বারুদ জেন-জির দলবেঁধে রাস্তায় নামার দৃশ্যটা ছিল স্বাভাবিক। তবে, বাংলাদেশ ও নেপালে ঘটে যাওয়া আন্দোলনে দেখে ফেলা কিছু দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি সব মাটি করে দিয়েছে। জেন-জিকে দাবার বড়ে বানিয়ে সিনিয়র প্রজন্মের ধেড়েলগুলো ষড়যন্ত্রে মেতে উঠল। পৃথিবীকে দোজখ বানানোর কাজে সুদক্ষ ধেড়েলরা মানবধরায় গিজগিজ করছে। খতরনাক মালগুলোর চক্করে পড়ে ভারতের জেন-জিরা আন্দোলনের মেওয়া নরেন্দ্র মোদির হাতে তুলে দিলো স্বেচ্ছায়!
সাচ্চা একটা আন্দোলনকে সংহত ও ন্যায্য প্রমাণের দায়বোধ থেকে বুড়ো আরশোলারা জেন-জিদের সঙ্গী হয়নি। ভারতের অখণ্ডতা ভেঙে খানখান করার পরিকল্পনা বুকে ধরে খেলতে নেমেছিল। নিজেকে বালপাকনা ভেবে পরিতুষ্ট জেন-জি তার বিন্দুবিসর্গ টের পাওয়ার অবস্থায় ছিল না। বুড়ো আরশোলারা জানত,—এই টিকটকারদের দিয়ে ভালোই বিভীষিকা পয়দা করানো যায়। শ্রীলংকা, বাংলাদেশ ও নেপালে করেছে, ভারত সেখানে কোন চ্যাটের বাল-যে ওটা করা যাবে না? সরকার ঠাণ্ডা মাথায় পুরো বিষয়টি ডিল করায় বুড়ো আরশোলাদের উদ্দেশ্য সেখানে ভেস্তে গেছে।
মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে আসা লাডলি জেন-জি কোনোকিছু তলিয়ে দেখার ধৈর্য ও গভীরতা রাখে না;—বাংলাদেশ ও নেপালে তা প্রমাণিত। বুড়ো আরশোলাদের মিশন পুরা করার হাতিয়ার রূপে তারা ব্যবহৃত হতে পারে;—অনেকে তা আগেভাগে আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। সেটাই কার্যত ঘটেছে ভারতে। সরকারকে চাপে রাখার নামে বিশ্বকে তামাশায় ভরপুর বিনোদনে মাতিয়ে রাখল ভারতের জেন-জি।
দিল্লি, মুম্বাই, কলকাতার মতো মস্ত শহরে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ সয়লাব ছিল মৌজ-মাস্তির মুজরোয়। কী ছিল না বটেক! মার্ভেল কমিকের বাটম্যান, সুপারম্যান, স্পাইডারম্যানরা সেখানে হাজির ছিলেন। মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, রবি ঠাকুর, নজরুলও বাদ যাননি। এঁনাদের সাজে সজ্জিত জেন-জি হরবোলারা টানা সার্কাস দেখাল রাস্তায়। আধন্যাংটা মেয়েগুলো ক্লিভেজ ও নাভির সুড়ং শুধু নয়, যোনিকেশ দেখিয়ে এনজিও স্টাইলে শো-অফ করল প্রচুর! মনে হচ্ছিল ব্যারিকেড, লাটিচার্জ, বারুদ আর টিয়ার গ্যাসে উত্তাল আন্দোলন নয়, বরং টিকটকের মহড়া চলছে রাস্তায়! জেন-জি প্রজন্ম টিকটক বিশারদ বটে!
পুলিশকে টিকটকের খোরাক বানাতে তারা উপহার দিয়েছে লাল গোলাপ। ‘শাদি করেগা মুজকো?’—মশকরার ছলে বিয়ের প্রস্তাব দিতেও ছাড়েনি জেন-জি তরুণী। আর, রাস্তায় নাচাগানা, খানাপিনা ও কামাসনের মচ্ছব উল্লু প্লাটফর্মে দেখানো রগরগে ছবিকে হার মেনে নিতে বাধ্য করেছে। কামসূত্রকে তারা নামিয়ে এনেছিল রাজপথে। বিশ্ব আরো দেখেছে চ-বর্গে সয়লাব ভাষার বাহার! প্রধানমন্ত্রী মোদি থেকে উজির-নাজির পর্ষদ ও তাদের বাপ-মাকে একখালে ভাসিয়ে টানা খিস্তি মেরে গেল রাতদিন মোবাইল স্ক্রিনে পড়ে থাকা বাপ-মায়ের লাডলি ছেলেমেয়েরা।

রগরগে এই বিনোদনের তোড়ে সব গেল ভেসে! দশ-বারো-চৌদ্দ হাজার করে স্বেচ্ছাহননে যাওয়া ছেলেমেয়ের কথা কে আর মনে রাখে ভাই! খোদ জেন-জি তাদেরকে ভুলে গিয়েছিল বেমালুম! বুঝতেও চাইল না,—সরকার চুপচাপ মোক্ষম দান ফেলার অপেক্ষায় আছে। সময় হলে দানটি ফেলবেন মোদিজি, আর তাতেই ওপেনটি বাইস্কোপ, নাইন টেন টেস্কোপ আওরাতে-আওরাতে মেওয়া ভরবেন নিজ পকেটে।
অবশেষে তাই হয়েছে। জেন-জি বিনোদনে ভরপুর আন্দোলনের ক্রিম মোদিজির সরকার ভোগ করতে যাচ্ছেন সামনে। লোকসভা ও বিধানসভায় জনসংখ্যার ঘনত্ব অনুযায়ী আসন সংখ্যা বাড়ানো ও পুনর্বিন্যাসের বিল পাস করানো নিয়ে সমস্যায় ছিলেন। কঠিন কাজটিকে জেন-জিরা সহজ করে দিয়েছে তাঁর জন্য। শোনা যাচ্ছে, লোকসভায় আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে সাড়ে আটশোয় উঠবে। বিজেপি নিয়ন্ত্রিত রাজ্যগুলো, বিশেষত উত্তর ভারত ও রাজস্থানে জনঘনত্ব বেশি হওয়ার কারণে আসন সংখ্যা বেশি হওয়ার কথা। আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার রাস্তা এভাবে বানিয়ে নিলেন নরন্দ্রে মোদি। কংগ্রেস, আম আদমি কিংবা বাম নিয়ন্ত্রিত এলাকায় জনঘনত্ব যেহেতু কম,—আসন সংখ্যা অধিক বাড়বে না। তেনাদের ভাগে অগত্যা জুটছে কাঁচকলা।
বিষয়টি আঁচ করতে পেরে বিলটির বিরোধিতা করে আসছিলেন মোদি বিরোধী শিবির। আন্দোলনের কারণে পরিস্থিতি বদলে গেছে। আসন সংখ্যার পুনর্বিন্যাসের জন্য ডিলিমিটেশন বা সীমানা পুনর্নির্ধারণ বিল তো ছিলই, নাটের গুরু এনজিওর মাধ্যমে আসা অনুদানের অসৎ ব্যবহার ঠেকানোর জন্য প্রস্তাবিত আইন সংসদে পাশ করানো নিয়ে ঝামেলায় ছিল বিজেপি। এরকম অনেকগুলো বিল নাকি আসন্ন বাদল অধিবেশনে টপাটপ পাশ করানোর মওকা উদ্ভটরসে নিমজ্জিত আন্দোলন সরকারের হাতে তুলে দিয়েছে! জেন-জি সোনারা, বোঝাই যাচ্ছে, ব্যবহৃত বলদ হয়ে পুনরায় ফেরত যাবে টিকটক ও রিল বানানোর দুনিয়ায়। সরকারকে মধ্যম আঙুল দেখানো বাচ্চারা এখন অবসন্ন! বাংলাদেশ ও নেপালের মতো ভারতেও অর্জনের ঝুলি তাদের জন্য শূন্যই থেকে গেল মনে হচ্ছে।
ষাট-সত্তর থেকে নব্বই দশকের পরিসীমায় বেড়ে ওঠা প্রজন্মও বিশ্বজুড়ে বিরাট আন্দোলন জন্ম দিয়েছে অতীতে। সমাজ বদলের নেশায় নিজেকে হত্যা হতে দেওয়ার ভয় তাদেরকে কাবু করতে পারেনি। জেন-জির মতো তারাও মতলবি লোকজনের হাতে ব্যবহৃত বা প্রতারিত হয়েছে। ব্যর্থ ছিল বা ব্যর্থ হতে তাদেরকেও বাধ্য করা হয়েছিল। তবু, ষাট-সত্তরের বেবি বুমার্স কিংবা নব্বইয়ের জেনারেশন-এক্স প্রজন্মের আন্দোলনে সৃষ্টিশীলতার ঘাটতি ছিল না। জেন-জি প্রজন্মের আন্দোলনে এর কোনো নজির বিশ্ব এখনো দেখতে পায়নি!
বেবি বুমার্স, জেনারেশন-এক্স কিংবা মিলেনিয়ারা জীবনবোধের মাপে গভীর ও নিবেদিত ছিল। দশকের-পর-দশক ধরে অনন্য সাংস্কৃতিক মুহূর্ত তারা জন্ম দিয়েছে। ব্যর্থতা ও প্রতারিত হওয়ার বেদনা ছাপিয়ে কেবল এই একটি অর্জনের গুণে তারা আজো স্মরণীয় হয়ে আছে বহু মানুষের অন্তরে। প্রেরণাদায়ী অগ্নিশিখা হয়ে অনেকের হৃদয়ে বেঁচে আছে তাদের করা এক-একটা আন্দোলন। দূর ভবিষ্যতেও যার প্রাসঙ্গিকতা থাকবে মনে হচ্ছে। জেন-জিরা এখনেও ব্যর্থ। আমরা, বুড়ো আরশোলার দলবল ছিবড়ে বানিয়ে ছেড়েছি এই বাচ্চাগুলোকে! মায়া হয়, সত্যি মায়া হয় তাদের মুখের দিকে তাকালে।
জেন-জি প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা আসলে হতভাগা। যেসব বেবি বুমার্স কিংবা জেনারেশন-এক্স একটা সময় সৃষ্টিশীল বিস্ফারে দুনিয়া কাঁপিয়েছে, সময়ের সঙ্গে তারা সৃষ্টিশীল থাকেনি। সিস্টেমের সঙ্গে আপস করেছে একযোগে। তারাই আবার জেন-জির জন্য দোজখঠাসা এক দুনিয়া গড়ে তুলেছে পৃথিবীজুড়ে। টাকা কামানো, ফান ও মাস্তি ছাড়া কিছু আর অবশিষ্ট রাখেনি উত্তর প্রজন্মটির জন্য। ফলাফল,—আমেরিকার জেন-জি প্রজন্মের একাংশ স্মার্টফোন ছেড়ে বাটনফোন হাতে তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। স্মার্টফোনের পর্দায় দেখানো দুনিয়াটা ঘুরে বেড়াতে তাদের ভালো লাগছে না! তারা এখন সমুদ্রসফেন ক্লান্ত। ম্যাসেজিং, টিকটক ও এআইর সঙ্গে পাল্লা দিতে নেমে গভীর বিবমিষা ও বিষাদরোগ তাদের দেহমন খুবলে খাচ্ছে প্রতিদিন।
শোনা যায়, ফ্যাটিগ ভালোভাবে চেপে ধরেছে আমেরিকান জেন-জির একাংশকে। স্মার্টফোন ফেলে ফ্লিপফোনের পানসে জগতে ফেরার জন্য উতলা হয়েছে। ফ্লিপফোনে তোলা ছবি, তারা বিশ্বাস করে,—এটা অন্তত রিয়েল হবে। স্মার্টফোনে তো সবটাই ফিল্টারের কারসাজি। এআইকে দিয়ে রঙিন ও চকচকে করা ব্যাপার নেই আর! বাটনফোনের দুনিয়ায় ফিরতে চায় ভালো কথা, কিন্তু ওটা-যে পুনরায় ক্লান্ত করে তুলবে না,—এই গ্যারান্টি কি দিতে পারবে তারা? উদ্দেশ্যহীন অবসন্ন আমেরিকার জেন-জি;—হায়!
উপমহাদেশের জেন-জি ওদিকে সরকারের সঙ্গে লড়াই করে ক্লান্ত, হতাশ ও বিভ্রান্ত। বুড়ো বদমাশরা তাদেরকে নিয়ে খেলা করছে;—এই সত্যটি বোঝার অবস্থায় তারা নেই। নেপালে নিজ পছন্দের সরকার বসিয়েছিল। তাকে ফেলে দিতে আবার রাস্তায়। বালেন্দ্র প্রসাদের সরকারের বয়স ছয় মাস পার করেনি এখনো। জেন-জিরা এরিমধ্যে বুঝে গেছে,—এই শালা বালেন্দ্রকে দিয়ে ‘বাল’ ছেঁড়া যাবে না সিস্টেমের। হায় নেপালিজ জেন-জি!

বাংলাদেশের সিনারি আবার অন্যরকম! সরকার ফেলার মাস্তি নাইটমেয়ার হয়ে তাড়া করছে অনেক জেন-জিকে। শোধ তুলতে খিস্তি ও আক্রোশে ভরপুর এক ভাষা-দুনিয়া তারা বানিয়ে নিয়েছে। শেখ হাসিনা, নরেন্দ্র মোদি, তারেক রহমান, ভারত অথবা ইউনূস থেকে আরম্ভ করে কারো রেহাই মিলছে না;—চুটিয়ে খিস্তি করে যাচ্ছে সবাইকে। উপমহাদেশের জেন-জি চ-বর্গ ছাড়া দ্বিতীয় ভাষা ব্যবহারে অক্ষম!
আমাদের মতো বুড়ো বদমাশগুলোর জন্য এর সবটাই বিরক্তি ও তামাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে! ভারতে একই ছবি দেখতে হচ্ছে পুনরায়। দিল্লি, মুম্বাই ও কলকাতা শহরে একপাল বুড়ো বদশমাশের সঙ্গে তাল দিয়ে হাঙ্গামা ও তামাশার অ্যান্ডসিনটা যদিও বিহার প্রদেশে ঘটিয়েছে ভারতের জেন-জি! শিল্পা শেঠি স্টাইলে আইটেম সংয়ের মহড়া দেখতে সবাইকে বাধ্য করেছে তারা। ‘ম্যায় আয়ি হু ইউপি বিহার লুটনে’ গাইতে-গাইতে মোদি সরকারকে ট্রিট দিলো বিহারি জেন-জি। পুলিশ ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিকম্মা বানিয়ে রাখল তামাশাভরা সার্কাসের বাহার দিয়ে!
যে-আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল শিক্ষাব্যবস্থায় বিদ্যমান দুর্নীতি ও অনিয়মের অবসান ঘটানোর জন্য সরকারকে বাধ্য করা, সেই আন্দোলনটা দিল্লি ও মুম্বাইয়ে আগেই বরবাদ হয়ে গিয়েছিল। বুড়ো আরশোলাদের হাত থেকে বাঁচিয়ে একে সঠিক রাস্তায় ফেরত আনার কঠিন কাজটি জেন-জিরা করে উঠতে পারেনি। এলেম নাই,—পারবে কী করে! আন্দোলন ভেস্তে গেল দেখে বিহারি জেন-জি আর দেরি করেনি,—নিজহাতে ওটাকে নিকাশ করেছে পাটনায়।
তারা বুঝে গিয়েছিল,—আন্দোলনটির পেছনে কোনো দল নেই, নেতা নেই, নেতৃত্ব নেই, কর্মসূচী নেই, সংহতি ও লড়ে যাওয়ার ক্ষুধাটাও মৃত। কিছু যেহেতু নেই, একে বাঁচিয়ে রাখার চেয়ে মকারি দিয়ে মেরে ফেলাটাই বরং পুণ্যের কাজ। বিহার সেটা দাপটের সঙ্গে করে দেখিয়েছে। শিল্পা শেঠির আইটেম ফেল মারবে সেখানে! দিনভর মকারি দিয়ে পুলিশি প্রতিরোধকে অচল করে দিয়েছিল তারা। নেট দুনিয়ার মানুষ বিনোদনটা উপভোগ করেছেন মনভরে। বিহারের জেন-জিকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন সকলে মিলে। কিন্তু, আড়ালের আর্তনাদ নেটিজেনরা টের পেলেন কি? বিহারে জেন-জিরা যে-কাণ্ড করেছে, তা আর নিছক তামাশা থাকেনি দিল্লি, মুম্বাই কিংবা কলকাতার মতো,—সেখানে উঁকি দিয়ে গেছে হাহাকার ও নিরাশায় ভারাতুর তরুণ হৃদয়ের আর্তনাদ।
বিহারি জেন-জি যেসব মশকরা পুলিশের সঙ্গে করেছে, এর সবটাই কি মোদি সরকারকে নাজেহাল করার জন্য করেছে? এমনটা ধরে নেওয়া সরলীকরণ হয়ে যাবে। ভারত ও দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা আমাদের মতো বুড়ো বদমাশের জন্য ওটা ছিল সতর্কবার্তা। বিহারি জেন-জির কাণ্ড উপভোগে ব্যস্ত সিনিয়র নেটিজেনরা তা উপলব্ধি করতে পারছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেল না! আত্মসমালোচনা করতে দেখা গেল না কাউকে!
আরে ভাই, আমরা, বাপ-মায়েরা হচ্ছি আসল ক্রিমিনাল! গভীরতাহীন ঠুনকো পরিবেশে ছেলেমেয়েগুলোকে জন্ম দিয়েছি। এমন এক পরিবেশ, নিজের হাতে আমরা ওটা বানিয়েছি এবং স্বেচ্ছায় কবর খুঁড়ছি তারপর থেকে। নিজেকে গড়েপিটে নেওয়া আমাদেরকে দিয়ে হয়ে ওঠেনি। বাচ্চাগুলোকে গড়েপিটে নেওয়ার দায় তাই আমাদের মধ্যে গভীর নেই এখন। দোজখে ঠাসা ধরায় জেন-জিগুলো অবিকল আমাদের নকল! দমবদ্ধ এক খাঁচায় আমরা নিজেকে পিষে মারছি। বাচ্চাগুলো সেখানেই জন্ম নেওয়ার কারণে আবর্জনায় পরিণত হওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনো ভবিষ্যৎ তারা পাবে কোথায়!
জেনারেশন গ্যাপের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দায়মুক্তি খুঁজছি আমরা। তা সেটা করার অধিকার কি আছে কারো? রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবারকে বিষাক্ত রেখে কোনো প্রজন্মের কাছে ভালো কিছু আশা করা অবান্তর। সব জেনেবুঝে আমরা কিছু করে উঠতে পারিনি। জেন-জিকে দায়ী করে কী লাভ! সমাপ্তি টানতে বিহারি জেন-জি সুতরাং কাজের কাজটাই করে দেখিয়েছে। আন্দোলনকে মৌজ-মাস্তি দিয়ে লঘু করে দিয়েছে তারা। এর জন্য হলেও তাদেরেক কুর্নিশ ঠুকতে হয় ব্রো!
আপাত হতভম্ব সরকারের অবশ্য তাতে বাল ছেঁড়া গেছে। মোদি বুঝে নিলেন,—এটা এখন তামাশায় গিয়ে অ্যান্ডিং টানছে। তারপর? ‘তারপরটা’ কি বুঝতে বাকি আছে কিছু? পুলিশ এখন তালিকা ধরে হাঙ্গামা বাঁধিয়ে তোলা জেন-জিকে খুঁজে বের করবে। বিরোধীদের দিকে অনেক আগে ছোঁড়া বিজেপিবাণ ‘ঘরকে ঘুসকে মারউঙ্গা’ ষোলকলায় পূর্ণ করবে সরকার। মাঝখান থেকে চাপা পড়ে যাবে রূঢ় সত্যটা,—আমাদের মতো বুড়ো ভাম মিলে বানিয়ে তোলা সিস্টেমের কারণে প্রতি বছর বারো-চৌদ্দ হাজার তাজা প্রাণ ‘যে তুমি হরণ’ করো বলে যায় আত্মহননে।
. . .
. . .
… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …
জনতুষ্টির রাজনীতি ও ‘হিন্দু সুপ্রিমেসি’ : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
চার্লি কার্ক কতটা ‘বিকল্প’ ছিলেন?
. . .

অবদায়ক : আহমদ মিনহাজ : থার্ড লেন স্পেস.কম
আহমদ মিনহাজ-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন


