আসুন ভাবি - পোস্ট শোকেস

কবি ও ঈশ্বর : অলোকরঞ্জন ও আরোনোফস্কি

Reading time 16 minute
5
(2)
Alokeranjan Dasgupta & Darren Aronofsky; Image Source: Collected; Google Image

ড্যারেন আরোনোফস্কির ‘মাদার’ ছবিটি ফিরে দেখতে বসে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের ‘ঈশ্বরের প্রতি’ কবিতার চরণগুলো মনের তারে গুনগুন করে উঠল। ‘যৌবনবাউল’, ‘নিষিদ্ধ কোজাগরী’, রক্তাক্ত ঝরোখা’র মতো কবিতাবই রেখে গেছেন অলোকরঞ্জন। জার্মানিতে অধ্যাপনায় টানা জীবন পার করলেও কবিতা ও গদ্যে থেকেছেন সমান সাবলীল।

তাঁর কবিতা ও মেধাবী গদ্যের গুণগ্রাহী ছিলাম বটে! একটা সময় ছিল, যখন টানা পড়তে ক্লান্তি আসেনি। সম্মোহক নিভৃত মগ্নতা অলোকরঞ্জনের কবিতায় সুলভ বলে হয়তো তাঁকে পড়তে আরাম। কবিতার ভিতরে আলো-আঁধিয়ারে ঢাকা অনুক্ত যেসব ইশারা অলোকরঞ্জন রেখে যান অবরিত,—সেগুলো যদিও সহজ বোধগম্য নয়। কবিতার ট্রেডমার্ক রহসঘনতা সেখানে জারি থাকে,—এবং জারি থাকে মেধাবী মগ্নতা, যা হয়তো বাংলা কবিতায় অতীত দিনের মতো অতটা সুলভ নেই এখন। তিনি কি লাবণ্যপ্রাণ কবিতা লিখে গেছেন আমৃত্যু? হয়তো! তাঁর কবিতার ভাষা ও বয়ান নিয়ে বলতে পারা লোকের অভাব নেই বাংলায়। তাঁরা ভালো বলতে ও ব্যাখ্যা করতে পারবেন তা।

আমার কাছে অলোকরঞ্জন পছন্দের মূলত তাঁর মেধাবী মগ্নতা-গুণে। প্রচণ্ড পড়ুয়া মানুষ ছিলেন। বিচিত্র বিষয় নিয়ে গদ্য লিখেছেন টানা। বাচিকতায় থেকেছেন আকর্ষণীয়। মাস্টার ছিলেন যেহেতু, স্বভাব বাগ্মীতা তাঁর কাছে ব্যাপার থাকেনি। তথাপি, অতীতে যখন যেটুুকু পড়েছি, সেখানে তাঁর কবিতাকে সহজাত প্রতিভার স্মারক মনে হয়নি কখনো। উপমা করে যদি বলি তাহলে বলতে হয়,—কবি মাত্র হৃদয় থেকে উৎসারিত আবেগের দাস হলেও, অলোকরঞ্জন কবিতায় ব্যবহার করেছেন মস্তিষ্ক,—যেখানে কবিতার পঙক্তিগুলো যেন-বা ভেবেচিন্তে মাপজোঁক করে বসাচ্ছেন তিনি। জ্যামিতিক ছন্দ মেনে তারা পরপর বসছে, এবং এভাবে অনুক্ত ইশারা দিয়ে সরে যাচ্ছে নিভৃতে।

বলা যেতেই পারে,—অলোকরঞ্জন কবিতা নির্মাণ করেন মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে। দেশি-বিদেশি কবিদের পাঠ-অভিজ্ঞতার বড়ো ভূমিকা সেখানে খুঁজলে মিলবে। পাঠ-নির্মিতির ভিতরে অবগাহন করে কবিতারা গড়েপিটে নেয় নিজ পরিসর;—যেখানে সচেতনভাবে কবিতা লিখতে থাকা এক কবির অবয়ব মূর্ত হয়। আমার তাঁকে এরকম লাগে পড়তে বসলে। অতীতে যেমন, এখনো তাই বটে। বাংলা কবিতা পড়ুয়াদের অনেকের কাছে শঙ্খ ঘোষের মতো তিনিও আদরের। নিশ্চয় কোনো দ্রবগুণ আছে সেখানে, যার গুণে অলোকরঞ্জনের কবিতায় সঞ্চারিত উচ্চারণ পাঠককে টানে। তাঁর কবিতায় নিভৃতে মগ্ন হতে প্ররোচিতও করে।

সে যাইহোক, অলোকরঞ্জনকে নিয়ে কথা বলব বলে কি-বোর্ডে আঙুল চলছে না। বলার কেবল এটুকুন,—মার্কিন দেশের এক চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রায় দশ বছর আগে যে-ছবিখানা তৈরি করেছিলেন দর্শকের জন্য, এবং আগে-পরে আরো অনেক ছবি তৈরি করেছেন এভাবে, যেগুলো তাঁর ছবির প্রতি আগ্রহ ও আকর্ষণ থেকে দেখেছি টানা,— সেখানে ‘পাই’, ‘রিকুয়েম ফর অ্যা ড্রিম’, ‘ব্ল্যাক সোয়ান’ ও ‘মাদার’ আমার কাছে সবচেয়ে মেধাবী নির্মাণ মনে হয়েছে সবসময়।

বেশ লম্বা বিরতির পর এই-যে ‘মাদার’ ছবিটি পুনরায় দেখতে বসলাম, ছবির শুরু থেকে শেষ অবধি অলোকরঞ্জনের ঈশ্বরকে লক্ষ করে বলা চরণগুলো মনে গুনগুন করছিল। পুরো কবিতা স্মরণে নেই, তবে সারনির্যাস এতদিন পরেও মস্তিষ্কের কোষে জীবিত টের পাচ্ছি! আরোনোফস্কির ঈশ্বর বিষয়ক অতিকল্পনায় সুবাসিত কাহিনিতে যাওয়ার আগে অলোকরঞ্জনের কবিতাটি পড়তে চাই আগে। কবি লিখছেন অথবা বলছেন আসলে, ঈশ্বর অথবা অনামা কাউকে লক্ষ করে বলছেন…

Poet Alokeranjan Dasgupta; Image Source: Collected; Google Image

যেদিকে ফেরাও উট, যত দূরে-দূরে তুমি কীর্ণ কর তাঁবু,
মানুষের বুকের পালক নিয়ে হরেকরকম পাখি তোমার আকাশে
ওড়াও যতই, কিংবা এদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে গিয়ে
পরীদের খাদ্যের সংস্থান কর, প্রসন্ন হবার মন্ত্র জান;


যেদিকে ফেরাও তব অতীন্দ্রিয় ইন্দ্রিয়ের বিবিধ কৌশল;
যদি পড়ে থাকি নিষ্কাশিত আশা খড়, ব্যাপ্ত বালির শয্যায়;
যতই রাঙাও একচক্ষু সূর্য একচক্ষু চাঁদ,
নিয়তির নীলাকাশে কৃষ্ণপতাকার রাত্রি উত্তোলন কর;

যে-ধারেই ফেলে রাখ আমার শরীর — পুবে, পশ্চিমে, শ্মশানে,
কেটে দিতে চাও উল্কি ডানহাতে, জোর করে দীক্ষা দিতে চাও—
অথবা উচিত শিক্ষা দেবে বলে পাপী কর পরিতাপী কর;
প্রেমিকের স্বাভাবিক গভীরতা নষ্ট করতে ব্রতী হও;

মানুষের ঘরনীকে মধ্যরাতে টেনে নিয়ে তোমার মন্দিরে
যতই লেখাও আরো থেরীগাথা, সিঁথি ‘পরে কর অবৈধতা,
যেদিকে ফেরাও উট, এই দ্যাখো করপুটে একটি গণ্ডুষ
বিশ্বাসের জল, তুমি পান কর, আমি জল না খেয়ে মরব॥

কবিতাটির সারার্থ পাঠকভেদে ভিন্ন হবে জানা কথা। কবি স্বয়ং কী বলিতে চাহিয়েছেন… এসব নিয়ে ক্যাচাল করবে লোকজন। আমার তাতে আপত্তি ও অনাপত্তি কোনোটাই নেই। আমি কেবল মিল দেখছি এখানে,—আরোনোফস্কি তাঁর ছবিতে নামকরা কবির আড়ালে ঈশ্বর ও ঈশ্বরীকে (ছবিতে যিনি কবির স্ত্রী বটে) নিয়ে মাথাখারাপ করে দেওয়া যে-নৈরাজ্য হাজির পর্দায় তুলে ধরেছিলেন, যার পরিশেষ ঘটে ঈশ্বর ও ঈশ্বরীর প্রকৃত সারবত্তা উদঘাটনের মধ্য দিয়ে, তা এখন অলোকরঞ্জনের ঈশ্বরের প্রতি কবিতায় মর্মরিত আভাসের সঙ্গে তৈরি করছে মিলন ও স্ববিরোধ।

ড্যারেন আরোনোফস্কির ‘মাদার’ ছবিতে কবির আলখাল্লায় ধরায় চলে আসা ঈশ্বর ও তাঁর স্ত্রী কোনোকিছু আরোপ করেন না;—না তাঁরা চাপিয়ে দিতে থাকেন বিধি-বিধান;—তাঁরা বরং তাঁদের দুজনকে সকল উপায়ে উত্যক্ত করতে থাকা কবিভক্ত বা ভক্তের আড়ালে সংগোপন ঈশ্বরবিদ্বেষীদের অকথ্য অত্যাচার সইতে থাকেন। ছবিতে এর সবচেয়ে বড়ো দণ্ড দিতে দেখি কবির স্ত্রীকে। কারণটি যথাসময়ে ব্যক্ত করেন কবি; আর তা হলো,—তথাপি তিনি তাঁর সৃষ্টির প্রতি বিশ্বাস হারাতে পারেন না। যদি তা হারান, তাঁর ঈশ্বরত্ব মিথ্যে হয়ে যাবে। কবির স্ত্রী, যিনি আসলে ধরিত্রী, যাঁর গর্ভে জন্ম নিচ্ছে শুভ-এষণা, এবং পরিবেশগুণে হয়ে উঠছে অশুভ… এখন এর দায় তিনি বহন করতে বাধ্য।

ঈশ্বর,—নিজের সৃষ্টিকে তিনি কী-করে ঘৃণা করবেন! নিজের লেখা কবিতাকে যেমন তাঁর পক্ষে ঘৃণায় বাতিল করা হয়ে উঠবে না, ঈশ্বরের ভূমিকাও এখানে তদ্রূপ। সৃষ্টিতে সক্রিয় অশুভকে তিনি প্রত্যাখ্যান করতে পারেন না। তাঁর জন্য এটি নিয়তি। অলোকরঞ্জনের কাছে ঈশ্বর হলেন তাঁর একার নির্মাণ। ঈশ্বরকে নিজের মর্জি মতো ধারণ করাটা তাঁর পছন্দের। অন্যরা ‘ইনিই ঈশ্বর’ বলে যতই নিদান হাঁকুক, বাধ্য করুক তাঁকে তা মেনে নিতে, কবি অন্যদের এই দাবি নাকচ করে বলবেনই বলবেন :

যেদিকে ফেরাও উট, এই দ্যাখো করপুটে একটি গণ্ডুষ
বিশ্বাসের জল, তুমি পান কর, আমি জল না খেয়ে মরব॥

‘জল না খেয়ে মরব’ ডাবল মিনিংয়ের আভাস দিয়ে যায়। কবি যেন বলতে চাইছেন, তাঁর ঈশ্বর অন্য কেউ বলে দিক, এটি তাঁর হজম হবে না। তাঁর বিশ্বাসকে কেউ চাপিয়ে দেবে তা তিনি মেনে নিতে সম্মত নন। সুতরাং এই ঈশ্বরকে তিনি প্রত্যাখ্যান করছেন। ঈশ্বরকে প্রত্যাখ্যান মানে আবার ঈশ্বর নেই বা তিনি অপ্রয়োজনীয়… এসব বলা কবির উদ্দেশ্য নয়। তিনি কেবল এই বিবৃতিতে স্থির,—তাঁর ঈশ্বর তাঁর নিজের। এই ঈশ্বর রবি ঠাকুরের জীবনদেবতার মতো কবির স্বজ্ঞায় ধরা দেয় ও তাঁকে বিশ্বাসে থিতু রাখে। এর সঙ্গে তাঁর বোঝপড়া ও লেনদেন কেবল তাঁর ও ঈশ্বরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাকিরা কী বলছে না বলছে তাতে কিছু যায় আসে না।

Jennifer Lawrence in Mother by Darren Aronofsky; Image Source: Collected; Google Image

আরোনোফস্কির ছবিতে চিত্রিত ঈশ্বর সেরকমটি নন। তিনি সেখানে অটল স্থৈর্যের প্রতিভূ;—এবং তা এ-কারণে,—সৃষ্টি করে তিনি ভুল করেছেন, বারবার তাঁর পরিকল্পনাকে গড়বড় করে দিয়ে সব পণ্ড হচ্ছে জেনেও,—সৃ্ষ্টিকে ফিরে-ফির জারি রাখতে তিনি বাধ্য। এই ঈশ্বর যেন নিজের মরণফাঁদে নিজে বন্দি!

এতক্ষণ যা বললাম, তা কতটা বোঝানো গেল জানি না। ‘মাদার’ ছবিটি একুশ শতকে আমাদের মনের মুকুরে নিজেকে দেখার উপায় হিসেবে আমি গণ্য করি। বিশেষ করে দুই-দুইখান সাম্রাজ্যবাদী শক্তির লড়াই চলছে এই মুহূর্তে। ধর্মীয় সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদের ধুন্ধুমার লড়াই ও নৈরাজ্য আমরা দেখছি চোখের সামনে। ঈশ্বর কি করবেন এখন? কী তাঁর করা উচিত? কী করার থাকতে পারে তাঁর? গায়েব থেকে মীমাংসকের ভূমিকায় তাঁর পক্ষে দেখা দেওয়া কি সম্ভব?

অলোকরঞ্জন এর একটি সমাধান কবিতায় বাউলদের মতো করে বলে গেছেন। আরোনোফস্কি তা বলতে পারেছেন না। তিনি যা বলছেন তা মর্মান্তিক। যে-ঈশ্বরকে নিয়ে এতো গোলযোগ, কবির পোশাকে তাঁকে ধরায় হাজির করছেন তিনি। সবকিছু ধ্বংস হওয়ার পর কবি যেখানে স্ত্রীকে দিয়ে পুনরায় নতুন করে সৃষ্টি করছেন এই অনিশ্চয়তা মেনে নিয়ে-যে, এবারও তাঁকে হয়তো প্রতারিতই হতে হবে!

কবি ওরফে ঈশ্বরের মনে আশা,—এবার এই সৃষ্টিতে তিনি যা-কিছু রাখবেন, সেখানে ফুল ফুটবে সুগন্ধ নিয়ে। থাকবে না অশুভের মাতন। সৃষ্টি হবে তাঁর মতো;—তাঁর স্ত্রী ঈশ্বরীর মতো চিরকল্যাণকর! আর, যদি তা না হয়, যদি আবারও প্রমাণ হয় তিনি সৃষ্টিতে ভুল করেছেন আবারো, তাঁর আশা ব্যর্থ করে নারকীয় গোলযোগ ও অবিশ্বাসের অশুভ মাতনে ধ্বংস হচ্ছে সব… এই প্রশ্নের কোনো উত্তর আসলেও নেই।

আরোনোফস্কি যেন পরিষ্কার বলে দিলেন,—ঈশ্বর বারবার ভুল করতেই থাকবেন… করতেই থাকবেন… কারণ, ঈশ্বর হতে হলে তাঁকে ভুল করতে হবে। ভুল ছাড়া নতুন করে সৃজন নহে সম্ভব। এ-যেন তাঁর নিজ পরিকল্পনার বিপক্ষে নিজের অবস্থান। অলোকরঞ্জনের মতো করে নিজেকে নিজে বলা :

যেদিকে ফেরাও উট, এই দ্যাখো করপুটে একটি গণ্ডুষ
বিশ্বাসের জল, তুমি পান কর, আমি জল না খেয়ে মরব॥

Mother (2017) Movie Poster by Darren Aronofsky; Image Source: Collected; Google Image

সংযুক্তি :

‘মাদার’ ছবিটি সকল কবিতাকারের দেখা উচিত। আমার তাই মনে হয়েছে সদা। অনেকে হয়তো দেখেছেন। আনেকে হয়তো দেখেননি এখনো। দেখা উচিত। ছবিটি আমাদের সময়ের এপিক। নিচে কাহিনি সংক্ষেপ দিয়ে রাখছি সেজন্য :

কবিতা লেখার খরা কাটাতে শহরের বিখ্যাত এক কবি জননির্জন প্রাচীন প্রাসাদে বিবাহিত স্ত্রীকে নিয়ে গমন করেন। নির্জনতাটি স্বর্গীয় নীরবতায় বাঙ্ময় ধরিত্রীর ছবি মনে জাগিয়ে তোলে। কাহিনির টানে কবির বিচিত্র গুণগ্রাহী নানা অছিলায় একে-একে সেখানে ভিড় জমাতে শুরু করলে আবেশ ভঙ্গ হয়।

গুণগ্রাহীদের হুলুস্থূল সমাবেশ ও বিশৃঙ্খলায় জননির্জন প্রাসাদ অচিরে নরকে পরিণত হয়। কবি কাউকে মানা করেন না। ভক্ত-আশেকানের দুঃসহ বাড়াবাড়ি সামাল দিতে গিয়ে ত্যক্তবিরক্ত স্ত্রী অভিযোগ করলে স্মিত হেসে তাকে আশ্বস্ত করেন, ‘ওসব নিয়ে ভেবো না। ওগুলো তুচ্ছ জিনিস বৈ কিছু নয়। পরে সারিয়ে নেওয়া যাবে।’

কবি যেন-বা তার ভক্তদের হাতের পুতুল! ভক্তরা তাকে ক্ষণে মিত্র ও পরক্ষণে শত্রু ঠাউরায়। বিতিকিচ্ছিরি কাজকারবার সারতে তার উদারতার সুযোগ নিতে শরম বোধ করে না। হলুদের সঙ্গে আবছায়া রংয়ের আবহে গাঁথা ছবির অদ্ভুত কাহিনি এভাবে একসময় ক্লাইমেক্স ছুঁয়ে ফেলে।

ভক্তকুলের গর্হিত কাজ-কারবার পর্দায় তুলে ধরতে আরোনোফোস্কি দয়ামায়ার লেশ মাত্র ছবিতে রাখেননি। তাদের আচার-ব্যবহারে ভদ্রতা, শালীনতা ও মাত্রাজ্ঞান তাই চোখে পড়ে না। কবি মহাশয়ের বাড়িখানাকে নিজের সম্পত্তি ভেবে যেমন ইচ্ছা ভাংচুর করে।

স্ত্রী বাধা দিতে গেলে কবির দোহাই পাড়ে তারা। তার পঙক্তি আউরে বুঝিয়ে দেয় কবির কেন কোনো বাড়িঘর থাকতে নেই। স্ত্রী যাকে নিজের বাড়ি মনে করছেন, কবি স্বয়ং সেই বাড়িখানাকে নিজের ভেবে তাদেরকে ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। কবি সকল কিছু উপেক্ষা করলেও তাকে এক মুহূর্তের জন্য কাছে না পাওয়ার ক্ষোভে হয়রান স্ত্রী এই হরর মেনে নেওয়ার শেষ সহ্যশক্তি হারিয়ে ফেলেন।

Mother (2017) Movie Scene: Uninvited Guest and Enerchy by Darren Aronofsky; Source: Paramount Movies YTC

কবির বইয়ের প্রকাশক ও ভক্তরা প্রাসাদে জড়ো হলে হরর চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। কিতাবে মুদ্রিত কবিতাকে তারা বিচিত্র অর্থে পাঠ করতে শুরু করে, এবং একাধিক সংঘে বিভক্ত হয়। ঘোর ধার্মিক, পাঁড় নাস্তিক, উগ্রচণ্ডী সংশয়ী আর চরম নৈরাজ্যবাদীর লম্ফঝম্পে প্রাসাদ ধসে পড়ার উপক্রম করে।

নিজের স্ত্রীকে কবিতার প্রধান অনুপ্রেরণা বলে প্রচার করে কবি সমস্যা আরো গুরুতর করে তোলেন। অনুপ্রেরণার গর্ভে ধ্বংসের বীজ নিহিত রয়েছে;—এই প্রেরণায় উজ্জীবিত বইয়ের প্রকাশক কবিকে অনুপ্রাণিত করার দায়ে তার স্ত্রীকে হত্যা করতে উদ্যত হয়।

নারকীয় পরিবেশে বসে কবির গর্ভবতী স্ত্রী নিজের শিশু সন্তানকে জন্ম দিলেও তাকে বাঁচাতে পারে না। প্রাসাদ জুড়ে তাণ্ডবমত্ত ভক্ত-আশেকান সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুকে একনজর দেখার আকুতি পেশ করলে ক্ষমা ও করুণায় কবি আবারো বিগলিত হয়ে পড়েন। সদ্যোজাত শিশুর সুরক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন স্ত্রী জোর করে নিজেকে সজাগ রাখে। সন্তান প্রসবের ধকলে নিদ্রা তাকে ক্ষণিক অভিভূত করলে কবি এই সুযোগে নবজাতককে ভক্তদের হাতে তুলে দেন।

বিচিত্র সংঘে বিভক্ত ভক্তকুলের একটি দল ততক্ষণে নরহত্যা ও নরমাংসভক্ষণের প্রাগৈতিহাসিক অভ্যাসে ফেরত গিয়েছে। নবজাতককে তারা হত্যা ও পরে ভক্ষণ করে। সদ্য ভূমিষ্ট সন্তান হারানোর দুঃখে কবির স্ত্রী নারকীয় বিশৃঙ্খলার পরিশেষ টানতে মরিয়া হয়। ক্ষমায় অভ্যস্ত কবির অনুরোধ-উপরোধ এইবার পায়ে দলে বাড়িটিকে হুতাশনের করাল গ্রাসে ভস্মীভূত করে সে।

স্বর্গীয় আবেশে সুস্থির প্রাসাদ ধ্বংস হলে বাস্তবতা ও অতিকল্পনার দোলাচল সরে যায়। অগ্নিদগ্ধ স্ত্রীকে কোলে তুলে নিলে দর্শক জানতে পায় কবি হচ্ছেন স্বয়ং ঈশ্বর আর তার স্ত্রী হলেন ধরিত্রী। স্ত্রীর হৃদয় থেকে খাঁজকাটা এক গোলক তিনি বারবার সৃজন করেন। সৃষ্টির চাবি গোলকে লুকানো রয়েছে। ইনি হচ্ছেন সেই ধরিত্রী যাকে সহ্যশক্তির পরীক্ষা জগতে মানবজাতির আবির্ভাব ঘটার পর থেকে দিয়ে যেতে হচ্ছে। তাদের দুরাচারী স্বভাব দিবারাত তাকে ক্ষতবিক্ষত করে।

Mother (2017) Movie Poster by Darren Aronofsky; Image Source: Collected; Google Image

তার হৃদয়কে গোলক সৃষ্টির কাজে ব্যবহার করলেও ঈশ্বরকে সাধ মিটিয়ে ভালোবাসার ইচ্ছা ধরিত্রীর আজো পূরণ হয়নি! বেচারিকে একলা রেখে তিনি মানুষের জগতে বুঁদ থাকেন আর তাদের জঘন্য স্বভাবকে ক্ষমাঘেন্নায় প্রশ্রয় দিয়ে চলেন। এই আশায়, একদিন তারা ধরিত্রীকে আপন ভেবে বসবাস করতে শিখবে আর স্বর্গীয় শান্তির ছটায় স্নিগ্ধ হবে নরলোক।

আশাভারাতুর ঈশ্বরের কাছে ধরিত্রী তাকে রেহাই দেওয়ার অনুরোধ করেন, ‘অনেক হয়েছে, এইবার ক্ষান্ত দাও। আমি বোধহয় পর্যাপ্ত নই। তাদের অনাচার সইবার শক্তি আমার নেই।’ তার চোখের দিকে তাকিয়ে ঈশ্বর স্মিতবচনে উত্তর করেন, ‘তোমার হৃদয় হচ্ছে ভালোবাসার খনি আর ওটা অনিঃশেষ।’

খাঁজকাটা গোলক সৃষ্টিতে ধরিত্রী অগত্যা আরেকবার ঈশ্বরের ইচ্ছার কাছে নিজেকে বলি দিতে বাধ্য হন। গোলকটি তার হৃদয় থেকে পুনরায় জন্ম নিলে ছবি সূচনাদৃশ্যে ফেরত যায়। কবির বেশ ধরে ধরায় অবতীর্ণ ঈশ্বরের খোঁজে ধরিত্রী শয্যা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। কবি তখন স্বর্গীয় নিঃস্তব্ধতায় পূর্ণ প্রাসাদের দরোজা খুলে নিজের সৃষ্টিকে নয়নভরে দেখছিলেন। মানুষের শত অনাচার সত্ত্বেও ভালোবাসার অমেয় শক্তির জোরে সৃষ্টি টিকে থাকে;—বার্তাটি মাদার-এ আরেকবার তরঙ্গ উঠায়।

. . .

পাঠ-অনুভবে কবি ও ঈশ্বর : নেটালাপ
[থার্ড লেন স্পেস হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে সংকলিত]

মিনহাজ ভাই, আপনার বদৌলতে একসময় এই ছবিটি দেখেছিলাম—এটা এখনো মনে আছে। ঠিক কবে দেখেছিলাম তা আর স্পষ্ট মনে নেই, তবে বছর কয়েক তো হবেই। আপনার এই লেখাটি পড়তে গিয়ে যেন সেই পুরোনো অভিজ্ঞতা আবার নতুন করে ফিরে এলো। মনে পড়ে, ছবিটি দেখার সময় এক ধরনের তীব্র স্নায়ুচাপ তৈরি হয়েছিল। পুরো বিষয়টি তাৎক্ষণিক হৃদয়ঙ্গম করা সহজ ছিল না; বুঝতে সময় লেগেছিল। পরে আপনার ব্যাখ্যা শুনে ধীরে ধীরে ছবির প্রতীকী স্তরগুলো ধরতে পেরেছিলাম।

অনেক দিন পর আজ এই লেখার সূত্রে আবার সময়ের বাস্তবতার দিকে ফিরে তাকানোর সুযোগ হলো। কিন্তু বাস্তবতা হলো—সময়ের ভেতরে খুব একটা বদল ঘটেনি। সেই কারণে মনে হয়, Mother আজও এতটা প্রাসঙ্গিক হয়ে ফিরে আসে। ছবির প্রতীকী নির্মাণ যেন আজকের পৃথিবীকে অবিরত প্রতিফলিত করে।

প্রতীকী নির্মাণে যে-নারকীয় দৃশ্যগুলো উঠে আসে, সেগুলো যেন আমাদের পৃথিবীর নির্মম প্রতিচ্ছবি। কবি বা তাঁকে যদি ঈশ্বর বলি—নিজের সৃষ্টির আনন্দে ভয়াবহকে ঘটতে দেন। সৃষ্টির অনুভূতি যেন তাঁকে একধরনের উত্তেজনায় ধরে রাখে। ফলে ধ্বংস, সহিংসতা বা নৈরাজ্য তাঁকে বিচলিত করে না। রং মনে হয়, তিনি যেন সৃষ্টির আদিম উল্লাসে ডুবে আছেন। মানুষের আচরণ যতই বিকৃত হোক, সৃষ্টির প্রক্রিয়া যেন তাঁকে থামতে দেবে না!

তবে, একটি জায়গায় ছোট্ট আপত্তি জানাতে চাই। আপনি বলেছেন—কবিদের এই চলচ্চিত্রটি দেখা উচিত। কথাটি অবশ্যই ঠিক। কিন্তু আমার মনে হয় ছবিটি আসলে আরও অনেকের দেখা প্রয়োজন। কবি, লেখক, বুদ্ধিজীবী তো বটেই; পাশাপাশি ধর্মীয় উন্মাদনায় আক্রান্ত মানুষ, রাষ্ট্রক্ষমতার আসনে বসে থাকা শাসকগোষ্ঠী, মুনাফাকেন্দ্রিক ব্যবসায়ী কিংবা শিল্পপতিরা—যারা পৃথিবীর পরিবেশ ও মানবজীবনের ভারসাম্য নষ্ট করে চলেছে—তাদের এই চলচ্চিত্র দেখা উচিত। কারণ ছবিটির নির্মম দৃশ্যগুলো আমাদের সময়কে সরাসরি সামনে দাঁড় করায়। যেন এক ধরনের তীব্র আঘাতের মতো আমাদেরকে বাস্তবতার মুখোমুখি করে দেয়।

Mother in Contrast of Alokeranjan Dasgupta’s Poetry To The God Collage; Image Source: Collected; Google Image

আপনার আলোচনার একটি বড় শক্তি হলো আপনি এই চলচ্চিত্রকে কেবল সিনেমা-রিভিউয়ে সীমাবদ্ধ রাখেননি। কবিতা, ধর্মচিন্তা, শিল্পতত্ত্ব ও সমকালীন সহিংসতায় যুক্ত করে বিস্তৃত বৌদ্ধিক পরিসরে নিয়ে গেছেন। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতা ও Mother–কে পাশাপাশি রেখে যে-প্রশ্নটি তুলেছেন তা গভীরভাবে গুরুত্বপূর্ণ : মানুষের সহিংসতা, ধ্বংস এবং যুদ্ধের মুখে ঈশ্বর ও সৃষ্টির সম্পর্ক আমরা কীভাবে বুঝব?

এই আলোচনায় আপনি অলোকরঞ্জনের ব্যক্তিগত ঈশ্বর ধারণাটিকে সামনে এনেছেন। সেখানে, ঈশ্বর একান্ত অন্তর্জগতের বিষয়;—একধরনের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও নৈতিকতার ক্ষেত্র। এর বিপরীতে ড্যারেন আরোনোফস্কির চলচ্চিত্রকে দাঁড় করিয়েছেন। ঈশ্বর এখানে কোনো অন্তর্মুখী অভিজ্ঞতা নন;—তিনি স্রষ্টা। নিজের সৃষ্টি মানুষের দ্বারা বারবার প্রতারিত ও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া চরিত্র রূপে তাঁকে আমরা পর্দায় বিচরণ করতে দেখি। চলচ্চিত্রে কবির চরিত্রটি ঈশ্বরের রূপক, আর তাঁর স্ত্রী পৃথিবী বা ধরিত্রী। এই সম্পর্কের ভেতরে গভীর ট্রাজেডি কাজ করে। ঈশ্বর ভালোবাসা দিয়ে সৃষ্টি করেন, কিন্তু মানুষ সেই সৃষ্টি ধ্বংস করে। তবু ঈশ্বর সৃষ্টি বন্ধ করেন না। এই দ্বন্দ্বই ছবিটির প্রাণ।

ছবির শেষে যখন সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায় এবং আবার নতুন করে সৃষ্টি শুরু হয়, তখন বোঝা যায় : সৃষ্টি এক অন্তহীন চক্র। ধ্বংসের পর সৃষ্টি… আবার সৃষ্টির পর ধ্বংস। মানবসভ্যতা যেন বারবার একই ভুলে ফিরে যায়। আপনার পাঠ এই বহুবিধ ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ একটি মাত্রা সমকালীন সহিংসতার দার্শনিক তাৎপর্যকে সামনে এনেছে। ছবির শেষাংশে যে-ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা দেখা যায়—যুদ্ধ, ধর্মীয় উন্মত্ততা, সহিংসতার বিস্তার—তা আসলে আমাদের বর্তমান পৃথিবীর প্রতীক। এখানে এসে আলোচনাটি চলচ্চিত্রের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। আপনি ইঙ্গিত করেন, আজকের বিশ্বে ধর্মীয় শক্তি, পুঁজিবাদী শক্তি ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সংঘর্ষ একধরনের বৈশ্বিক সহিংসতার জন্ম দিয়েছে। এর ফলে প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে : এই বিশৃঙ্খলার ভেতরে ঈশ্বর কোথায়?

ছবির মাঝামাঝি থেকে আরেকটি প্রতীকী স্তর উন্মোচিত হয়। কবির লেখা একটি বই মানুষ নানাভাবে ব্যাখ্যা করতে শুরু করে;—কেউ সেটিকে ধর্মগ্রন্থ বানায়, কেউ রাজনৈতিক স্লোগানে রূপ দেয়, কেউ আবার সহিংসতার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। ছবিটি এখানে ধর্মীয় ইতিহাসের এক গভীর সত্য তুলে ধরে : মানুষ যখন কোনো পবিত্র বাণীকে নিজের মতো ব্যাখ্যা করতে শুরু করে, তখন তা প্রায়ই সহিংসতায় মোড় নেয়।

চলচ্চিত্রটির আরেকটি শক্তিশালী পাঠ-পরিবেশ ও পুঁজিবাদের সমালোচনার সঙ্গে যুক্ত। মায়ের চরিত্রটি আসলে পৃথিবীর প্রতীক। তিনি ঘরটি নির্মাণ করেন, সাজান, যত্ন নেন, যেমন পৃথিবী মানুষকে বাসযোগ্য পরিবেশ দেয়, কিন্তু মানুষ এসে সেই ঘর ভাঙে, জিনিসপত্র নষ্ট করে ও সবকিছু ধ্বংস করে। ছবির দৃশ্যগুলো আধুনিক ভোগবাদী সভ্যতার নির্মম রূপক।

Mother (2017) Movie Trailer by Darren Aronofsky; Source: Zero Media YTC

Mother ছবিটির সবচেয়ে মর্মান্তিক মুহূর্ত আসে নবজাতক শিশুর মৃত্যু-দৃশ্যে। এই শিশুটি ভবিষ্যতের সম্ভাবনার প্রতীক—নতুন মানবসভ্যতার প্রতীক। মানুষ তাকেই হত্যা করছে! ছবিটি এই জায়গায় দাঁড়িয়ে ভয়াবহ সত্যকে উন্মোচিত করে : মানুষ কেবল পৃথিবী ধ্বংস করে না, নিজের ভবিষ্যৎকেও সে ধ্বংস করে। শেষ দৃশ্যে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার পর নতুন সৃষ্টির সূচনা আমরা দেখি। এই চক্র আমাদের বলে : মানবসভ্যতা ধ্বংস হয়, আবার শুরু হয়, কিন্তু মানুষের স্বভাব খুব একটা বদলায় না। এ-কারণে অনেক দর্শকের কাছে Mother মুভিটি অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। কেননা তা কোনো নিরাপদ দূরত্ব তৈরি করে না, বরং সরাসরি মানুষের সহিংসতা, ধর্মীয় উন্মত্ততা ও ভোগবাদী ধ্বংসযজ্ঞের পরিণামকে সামনে হাজির করায়। দর্শক বুঝতে বাধ্য হয় : এই নৈরাজ্যের বাইরে আমরা কেউ নই, বরং আমরা স্বয়ং এর অংশ।

এই অর্থে Mother ছবিটি আসলে আমাদের যুগবাস্তবতার প্রতীকী রূপ। আমরা দেখতে পাই মানুষের ধর্মীয় উন্মত্ততা, পুঁজিবাদী ভোগের নিষ্ঠুরতা ও পৃথিবীর প্রতি মানুষের নির্মম আচরণ। আরোনোফস্কির চলচ্চিত্রে ঈশ্বর যেন নিজের সৃষ্টিচক্রে বন্দি! তিনি বারবার সৃষ্টি করেন, কারণ সৃষ্টি করা ছাড়া তাঁর কোনো উপায় নেই। প্রশ্নটি তখন আরও জোরালো হয় : মানুষের সহিংসতা কি ঈশ্বরের ব্যর্থতা, নাকি মানুষের স্বাধীনতার ফল? ঈশ্বর যদি সৃষ্টি করেন, তাহলে কি সৃষ্টির পরিণতি ও এর দায় তাঁর উপরেই বর্তায়? আর, মানুষের স্বাধীনতা যদি ধ্বংসের কারণ হয়ে থাকে, তাহলে ঈশ্বরের ভূমিকা সেখানে কোথায়?
. . .

কবি ও ঈশ্বর : দায় কার?

পরিশেষে পৌঁছে আপনি যে-প্রশ্ন উঠিয়েছেন জাভেদ, তার সঠিক উত্তর আমার অজানা। কারো পক্ষেই বোধহয় এই প্রশ্নের মীমাংসা টানা সম্ভব নয়। প্রচলিত ধর্মশাস্ত্রে ঈশ্বর সৃষ্টির কাণ্ডারি। ধর্মশাস্ত্র ভেদে তাঁর দুইখান স্বরূপ আমরা পাই,—অ্যাক্টিভ এবং প্যাসিভ। একভাগে সৃষ্টি পর্যন্ত তিনি সক্রিয়। সৃষ্টি হয়ে যাবার পর তাঁর ভূমিকা প্রচ্ছন্ন অথবা নিষ্ক্রিয়। অর্থাৎ, সৃষ্টিতে ভালোমন্দ যাই ঘটুক-না-কেন,—সেখানে তাঁর কিছু করণীয় নেই। একটি নিয়মের মধ্য দিয়ে সৃষ্টিকে তিনি বিন্যস্ত করছেন কেবল! অতঃপর তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে চলে বিধায় নিজেকে প্রত্যাহার করা ছাড়া তাঁর কোনো কাজ থাকতে নেই।

এই প্রত্যাহারকে আবার অনেকে এভাবে দেখছেন,—সৃষ্টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঈশ্বরের সর্বব্যাপ্ত বিরাটত্বে সক্রিয় ও তাঁর মধ্যে বিলয় ও আভির্ভূত ফিরে-ফিরে। এই অর্থে সৃষ্টির কোনো চূড়ান্ত পরিণাম নেই। এটি অনাদি কাল ধরে সক্রিয় ছিল ও থাকবে। ঈশ্বরের নৈতিক কোনো দায় যেখানে থাকার কথা নয়।

ঈশ্বর, তিনি সেখানে অ্যারিস্টোটলের ‘প্রথম কারণ’ বা ফার্স্ট মুভার। ইবনে সিনা যাঁকে ‘ওয়াজিব-আল-ওজুদ’ বা ‘আবশ্যক কারণ’ রূপে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর কাজ বলতে তিনি সৃষ্টির মৌলগুণ, যেটি ছাড়া যৌগ কোনোকিছুর আবির্ভাব সম্ভব নয়। বিজ্ঞান যেমন একালে সৃষ্টির মৌল উপাদান বলে কিছু সত্যি আছে কি-না তার অনুসন্ধানে নেমে গড পার্টিকেল বা ঈশ্বরকণার ধারণা সামনে এনেছে।

সব মিলিয়ে এই আদিকারণ সৃষ্টির জন্য দায়ী হলেও সৃষ্টির গতি ও পরিণামে তাঁর ভূমিকা প্যাসিভ বা নিষ্ক্রিয়। সুতরাং পরে যা-কিছু ঘটছে তাকে আমরা প্রাকৃতিক ফলাফল বলতে পারি। বিজ্ঞান যেমন ল অব নেচার নামে একগুচ্ছ বিধান হাজির করছে সেখানে। মানুষের মধ্যে নিহিত সহিংসতা সেরকম একটি উপাদান। এটি ওই স্বয়ংক্রিয়তার ভিতর দিয়ে কালে-কালে বিবর্তিত হয়ে আজকের অবস্থায় পৌঁছেছে।

অন্যভাগে, ঈশ্বরের ভূমিকা দ্বৈত। তিনি একইসঙ্গে অ্যাক্টিভ ও প্যাসিভ। সৃষ্টির সূচনা তাঁকে দিয়ে ঘটছে। সৃষ্টির পরিণতি তিনিই ঘটাবেন। সূচনা ও পরিণতির মধ্যবর্তী পরিসরে তাঁর ভূমিকা জটিল। বলা হচ্ছে, তিনি সরাসরি মানুষের জন্য স্থির করে দেওয়া বিধি-বিধানে হস্তক্ষেপ করেন না। করার প্রয়োজন নেই। যেহেতু, মানুষের জন্য স্থিরকৃত বা নির্দেশিত স্বাধীনতাকে তিনি সেখানে নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতায় স্থির করে দিয়েছেন। মানুষ কতটা যেতে পারবে, কতটা কী করলে বিধির লঙ্ঘন ঘটবে না… এরকম একগুচ্ছ নির্দেশনা স্থির করে দেওয়া হয়েছে। এখন একে মেনে চললে পরিণতি একরকম দাঁড়াবে, লঙ্ঘন করলে অন্য ফল মিলবে ভাগ্যে।

David Hume quote on God’s Existence; Quote Source – Collected; Google Image; @thirdlanespace.com

মানা ও না-মানার অধিকারকে এখানে মানুষের জন্য ‘স্বাধীনতা’ বলা যেতে পারে। এই ঈশ্বর মূলত নৈতিক ঈশ্বর। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রসারিত একেশ্বরবাদী ধর্মমত যাঁকে সৃষ্টির একমাত্র নিয়ত্তা রূপে মান্য করে। তাঁর স্থির করে দেওয়া নৈতিক অনুশাসনে নিয়ে যেখানে আবার মতভেদের অন্ত নেই। ফলত, ইনি মানুষের কাছে অ্যাক্টিভ ও প্যাসিভ রূপে ভীষণ সক্রিয়। যেন-বা তিনি মানুষকে একটি কক্ষে ছেড়ে দিয়েছেন। যেখানে সে কী কী করতে পারবে ও কোনটা করা তার উচিত নয়… সব বলে দেওয়া আছে। কক্ষটি সেভাবে সাজানো। সিসিটিভি সার্বক্ষণিক তার গতিবিধি রেকর্ড করছে। ঈশ্বর তা দেখছেন, এবং সেই অনুসারে মানুষের পুরস্কার ও শাস্তি নির্ধারিত হচ্ছে আপনা-আপনি। যেন তিনি পরীক্ষা করছেন, তাঁর স্থির করে দেওয়া নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতাকে ব্যবহারের প্রশ্নে মানুষ কতখানি নিজের ‘আকল’ খাটাতে পারছে অথবা ডেকে আনছে বিষম পরিণতি।

বর্ণিত দুটি ভাগের বাইরে যদি মানুষকে বিবেচনা করি, তাহলে সৃষ্ট জীব রূপে জগতে তার যাবতীয় কাণ্ডকীর্তির জনয়িতা মানুষ নিজে। যেখানে, ঈশ্বর নামধারী নিয়ত্তাকে সে হয়তো নিজে সৃজন করেছে ও কালের বিবর্তনে তাঁকে বিচিত্র রূপ দিয়ে চলেছে। এটি হয়তো বিবর্তন ও অভিযোজনের ছক, যেখানে সে নিজে নিজের নৈতিক অনুশাসনের নিয়ত্তা। ঈশ্বরের নামে একে সে হাজির করছে নিজের কাছে। এমন এক শক্তি, যে কি-না জন্ম-মৃত্যুর কারণ। কেন কিছু আছে, কিছু না থাকার পরিবর্তে… এর একমাত্র বৈধ সমাধান। কেবল তাই নয়, মরণের পর তার কী গতি হবে? এই প্রশ্নের সদুত্তর সে এভাবে ঈশ্বরকে দিয়ে বৈধ করিয়ে নিচ্ছে।

এভাবে যদি দেখি, তাহলে মানুষকে সবকিছুর জন্য দায়ী ভাবতে হয়। মানুষ কখনো অকাট্য প্রমাণ দিতে পারবে না ঈশ্বর বলে কিছু আসলেও আছে। আবার ঈশ্বর নেই এটিও অকাট্য প্রমাণ করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। প্রমাণ ও অপ্রমাণের ঊর্ধ্বাতীত প্রহেলিকায় যাপন করা এজন্য-যে,—তার নিজের স্থির করা ভালোমন্দের একটি বাটখারা বা পরিমাপক দরকার পড়ছে। ঈশ্বরকে দিয়ে তা সে করিয়ে নিতে পারছে। হিন্দু ধর্মশাস্ত্রে তো অবশ্যই, অন্যগুলোয়ও মোটের ওপর এই ফ্রেমটিকে ‘কর্মফল’ রূপে বৈধতা দিচ্ছে। অর্থাৎ, যেমন কর্ম তুমি বা তোমার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা করবে, কার্যকারণ মারফতে সেরকম ফলাফল তুমি পাবে। ‘সহিংসতা’ও অনেকগুলো কর্মফলের একটি।

মহাভারত-এর বিস্তীর্ণ পটভূমিকায় এর সুরত আমরা ‍খুব ভালোভাবে টের পাই। যেখানে, সকলেই কোনো-না-কোনোভাবে সহিংসতার শক্তিগুণে সম্মোহিত, এবং পরিণামে সকলকে কোনো-না-কোনোভাবে ভুগতে হচ্ছে। কাউকে এককভাবে দায়ী করার যুক্তি রাখছেন না মহাভারতকার। পরিণামে সবকিছু লীন হচ্ছে এখানে-যে,—বস্তুজীবনে মানুষকে কেন্দ্র করে যতকিছু রয়েছে ও তার জীবনধারাকে প্রভাবিত করছে, এখন এসবের সঙ্গে তার সংযুক্তির রসায়ন সবসময় ইচ্ছামাফিক ঘটবে না। যেহেতু ঘটবে না, মানুষ যাকে ‘ভালো’ বলে মনে করছে, তা ‘খারাপ’ পরিণতি বয়ে আনতে পারে। অন্যদিকে, তার জন্য ‘খারাপ’ অন্যজনের ক্ষেত্রে ‘ভালো’ ফলাফল হয়ে দেখা দিতেও পারে। অন্যজনের জন্য ‘ভালো’ আবার আরো অন্য একজনের জন্য ‘ভালো’ নাও হতে পারে।

সবটাই পরিস্থিতি ও কার্যকারণের ফলাফল। এই জটিলতার কারণে ‘সহিংসতা’ হয়ে ওঠে প্রহেলিকায় গোলমেলে এক প্রপঞ্চ। যেটি হয়তো প্রমাণ করে, মানুষের জন্য স্বাধীনতা অনন্ত নয়। স্বাধীনতা স্বয়ং যেখানে কার্যকারণের ছকে কর্মফলে মোড় নিচ্ছে। এখন, এই কর্মফলের ওপর নির্ভর করে জগৎ তথা মানুষের সকল কল্যাণ অথবা অকল্যাণ।

Poetry (2010) Movie Poster by Lee Chang-Dong; Image Source: Collected; Google Image

সংযুক্তি : লি চ্যাং-ডংয়ের কর্মফল মীমাংসা

ড্যারেন আরোনোফস্কির ‘মাদার’ ছবিতে ঈশ্বরের ভুল ও বারবার ভুল করতে থাকাটা হয়তো স্বয়ং তাঁর কর্মফল! তিনি এভাবে সৃষ্টিকে জারি রাখতে বাধ্য সেখানে। অর্থাৎ, ঈশ্বর নিজে স্বাধীন নন প্রকৃত অর্থে। তাঁর স্বাধীনতাও মোটের ওপর অনেকগুলো কার্যকারণের ফলাফল দ্বারা সীমিত। তিনি অনন্ত কিন্তু তার স্বাধীনতা অনন্ত নয়। এভাবেও ভাবা যায় বোধহয়।

সে যাকগে, মাথাখারাপ এই জটিলতার মধ্যে আরেকখানা ছবির কথা ইয়াদ হচ্ছে। তারকোভস্কির মতো পোয়েটিক ঘরানায় যাঁরা ছবিটবি করেন, তাঁদের মধ্যে কোরিয়ার লি চ্যাং-ডং অন্যতম। তাঁর পোয়েট্রি ছবিটি এইবেলা মনে পড়ছে। কাহিনি-সংক্ষেপ তুলে দিই বরং :

আলজেইমারে আক্রান্ত এক রমণী, ছবিতে তাকে ইয়ান মি-জা নামে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন লি চ্যাং-ডং। প্রায় ষাটের কাছাকাছি বয়স তার। স্মৃত্মিশক্তির বিভ্রাট থেকে রেহাই পেতে কবিতা রচনায় মনোনিবেশ করবেন বলে স্থির করেছেন। হাইকু ঘরানার কবিতা রচনার কলোকৌশল রপ্ত করতে পোয়েট্রি ক্লাবে নিয়মিত যাওয়া-আসা করেন।

ছেলেমেয়েরা তার থেকে নানা কারণে বিচ্ছিন্ন। মেয়ে একটি আছে বটে, কিন্তু তার সঙ্গে সম্পর্ক অতটা সুস্থির নয়। টিনএজ নাতিকে নিয়ে একলার সংসার। নাতির দেখাশোনা ও পড়ালেখার খর্চা এই বয়সেও তাকে টানতে হয়। নাতিটি বখাটে হয়ে ওঠে তার অজান্তে। স্কুল পড়ুয়া বন্ধুদের নিয়ে সহপাঠী গরিব এক কৃষকের মেয়েকে দিনের পর দিন তারা ধর্ষণ করে চলে। মেয়েটি সইতে না পেরে ব্রিজ থেকে লাফ দিয়ে জীবনের ইতি টানে। পুলিশি তদন্তে তার ডায়েরিতে মর্মান্তিকভাবে ধর্ষিত হওয়ার কাহিনি সে লিপিবদ্ধ রেখেছিল। মি-জার নাতি তার একজন।

Poetry (2010) Movie Scene by Lee Chang-Dong; Source: Mishka Tchelidze YTC

স্কুল কমিটি মানইজ্জত রক্ষায় ঘটনা ধামাচাপা দিতে মেয়েটির পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দানের সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। ধর্ষক ছিল পাঁচজন। সবার অভিভাবকের ওপর ক্ষতিপূরণ ধার্য হয় সমান। অঙ্কটি বিপুল, অন্তত মি-জার জন্য। নাতির কর্মফলের দণ্ডি দিতে গিয়ে মি-জা এই বয়সে যা তার করার কথা নয়, এরকম কাজ করতে বাধ্য হন। নিজ দেহে অবশিষ্ট যেটুুকু যৌন-আবেদন ছিল, তা ব্যবহার করতেও তাকে বাধ্য হতে দেখি আমরা।

বিকারগ্রস্ত এক দুর্নীতিবাজ পুলিশের পাল্লায় পড়েন মি-জা। তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল, এবং সে কবিতাও লেখে। পোয়েট্রি ক্লাবে তার ইজ্জত ও প্রভাব সীমাহীন। কবি কাম পুলিশের কামেচ্ছার কবলে পড়েন মি-জা। অনুভূতিহীন যৌনসঙ্গম থেকে আরম্ভ করে অসুস্থ এক বৃদ্ধকে টাকার বিনিময়ে দেখাশোনা ও তার বিচিত্র আচরণের ভোগান্তি সইতে হয় তাকে। দুঃসহ এই অবস্থার মধ্যে কবিতা ও পোয়েট্রি ক্লাবে যাওয়া-আসা এজন্য-যে,—মর্মান্তিক এই পরিস্থিতির মধ্যেও কবিতার মতো নান্দনিক সত্য লেখা সম্ভব কি-না সেই পরীক্ষা দিয়ে যেতে থাকেন মি-জা।

ছবির পরিশেষে আমরা কর্মফলকে নির্মমভাবে মি-জার ওপর নিপতিত হতে দেখি। ধর্ষিতা মেয়েটিকে (ছবিতে তার নাম ছিল সম্ভবত এগনেস) নিয়ে মি-জার লেখা কবিতা তার হয়ে পাঠ করেন পোয়েট্রি ক্লাবের শিক্ষক। ক্লাবে কবিতাপাঠের আসরে তার থাকার কথা ছিল। কিন্তু তাকে অনুপস্থিত রাখেন পরিচালক। সময়মতো একগুচ্ছ ফুল দিয়ে সাজানো ঝুড়ির মধ্যে এগনেসকে নিয়ে লেখা কবিতাটি কেবল হাতে পায় ক্লাব। শিক্ষক অগত্যা তা পাঠ করেন মন্ত্রমুগ্ধতায়।

মি-জাকে আমরা দেখি এগনেসের কণ্ঠ অনুসরণ করে রাস্তা ধরে হেঁটে যাচ্ছেন। সেই রাস্তা, সেই মোড় ও সেতু… যেখানে এগনেসকে মি-জার নাতি ও বন্ধুরা মিলে ধর্ষণ করেছিল, এবং তা তারা পুনরাবৃত্তি করেছে বারবার।

ছবির অন্তদৃৃশ্য মর্মান্তিক। এগনেসকে আমরা দেখি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছে। আর মি-জা ততক্ষণে বরণ করতে চলেছেন এগনেসের পরিণতি। কেননা, ততক্ষণে তিনি ও এগনেস অভিন্ন, পরস্পরের মধ্যে এককার… এবং ব্রিজ থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়তে বাধ্যও বটে। নদীর জলরাশিতে কেবল পড়ে থাকবে ফ্লানেলের হ্যাট, আর এগনেসের ডায়েরি, যেটি ততক্ষণে মি-জার লেখা কবিতা হয়ে পোয়েট্রি ক্লাবে পঠিত হচ্ছিল।

পোয়েট্রি ছবিটি মাদার-এর মতো রূপকায়িত নয়। সহিংসতাও নয় এর প্রধান অনুষঙ্গ। শান্ত-সুস্থির এর গতি ও দৃশ্যায়ন। তথাপি, প্রতিটি ফ্রেম প্রতিটি সেকেন্ড শ্বাসরোধী। হাইকুর মতো নিস্তরঙ্গ, কিন্তু অন্তরালে বইছে সাফারিংয়ের মর্মন্তুদ সত্য।

জীবন পেলব নয়, এমনকি কবিতায়ও। যেমন নয় একজনের কর্মফলের দুর্ভোগ অন্যজনকে বইতে থাকার আজব খেলাটিও। কে এই জীবননাট্যের জনয়িতা তা আমরা জানি না। কেবল এটুকু হয়তো অনুমেয় : মানুষ এই প্রকৃতিতে সবচেয়ে ব্যতিক্রম প্রাণী, যে নিজ হাতে নিজের অভিশাপকে ফিরে-ফিরে লিখে চলেছে।
. . .

Poetry (2010) Movie End-Scene by Lee Chang-Dong; Source: Mishka Tchelidze YTC

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 2

No votes so far! Be the first to rate this post.

Contributor@thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *